আফরিন_আখ্যান #পর্ব_১৫(খ)

0
39

#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১৫(খ)
#সমৃদ্ধি_রিধী

আহিয়ান আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। ফারিন ওর বড় হওয়ার প্রতিটা মুহুর্ত দারুণভাবে উপভোগ করে। মা ছেলের সকাল হয় দশটা, এগারোটার পরে। মা হওয়ার পর থেকে ফারিন ভোরের সূর্য দেখেইনি বলতে গেলে। ফারিন উঠে নিজে ফ্রেশ হয়ে আহিয়ানকে ফ্রেশ করায়। কাপড়চোপড় ধুতে না পারা মেয়েটা আহিয়ানের ব্যবহৃত কাঁথা, জামাকাপড় ধোঁয়। আহিয়ানকে খাওয়ায়। আহিয়ান বসতে পারে না, আহিয়ানের দুহাত দিয়ে চেপে বসিয়ে রাখে। গল্প করে, আহিয়ানও হাসে। মাঝেমধ্যেই মা, ছেলে মিলে ঘুরে আসে। মা, ছেলে মিলে শপিং করে। আহিয়ানের জন্য শপিং করতে গেলে মেয়েদের সেকশনের জামা দেখলে ফারিনের লোভ লাগে। তাই ও একদিন মেয়েদের ফ্রগ কিনে আহিয়ানকে পড়িয়েছিল। নিজে নিজেই হেসেছিল অনেক। আহসান দেখলেও কি হাসতো? নাকি বকা দিয়ে বলতো, “এই মেয়ে আমার ছেলেকে মেয়ে সাজিয়েছো কেনো? কেমন মা তুমি?” ফারিন এইসব কল্পনা করে করেই দিন পার করে। সত্যি বলতে ওর এখন দিনকাল খুব ভালো যায়।

তবে ছোট্ট ছয়মাসের আহিয়ান সারাদিন মায়ের আদর সোহাগে থাকলেও প্রতিদিন রাতেই মায়ের কাছে আদুরে গলায় খুব বকা খায়। তার কারণ সাতটা, সাড়ে সাতটার দিকে কলিংবেল বাজলেই আহিয়ানকে ধরে রাখা দায় হয়ে যায়। হামাগুড়ি দিয়ে দরজার সামনে এসে বসে থাকে। ফারিন দরজা খোলার সময় নিমকহারামের বাচ্চার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। আহসান মেঝেতে থাবা মারতে থাকে। আহসানকে বাসায় ঢুকতে দেখেই হাসে। আহসান ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করে। ফারিন চলে যায় সামনে থাকে। আহসান ফারিনের মধ্যে একটা ডিউটি চলে। সারাদিন ফারিন রাখে, সন্ধ্যার পর থেকে আহসান রাখে, খাওয়ানোর আগ পর্যন্ত। মাঝেমাঝে ফারিন বাবা, ছেলের মাঝে ঢুকে ডায়পার চেঞ্জ করার কাজটা করে দিয়ে যায়।

ঘুমানোর সময় আহিয়ান অনেক জ্বালাতন করে বিধায় ফারিন ওকে নিয়ে পাশের রুমে চলে যায়। আহিয়ানের রাত হলে এনার্জি বাড়ে। আহসানকে চোখ বন্ধ করতে দেখলেই নানান ধরনের শব্দ করতে থাকে। ভাবখানা এমন ‘আমার সাথে মাও জাগবে, বাবাও জাগবে। কেউ ঘুমাতে পারবে না তোমরা।’ আহিয়ানকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখতে ফারিন ওর সাথে কথা বলে। ওকে গান গেয়ে শোনায়। আহসান মা ছেলের কথার মাঝে ঘুমাতে পারে না। সারাদিন পরিশ্রম করার পর না ঘুম হলে অসহনীয় মাথাব্যথায় টিকতে পারে না। ফারিন আহিয়ানকে চেংদোলা করে পাশের রুমে নিয়ে যেতে যেতে বলে,

“বাবাকে এত ডিস্টার্ব করো কেনো?”

আহিয়ান অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ করে। মায়ের বিরুদ্ধে অদৃশ্যে নালিশ করছে, “আমাকে বাবার কাছ থেকে নিয়ে এলে কেনো? আমি আরো কিছুক্ষণ বাবার সাথে থাকবো।”

ফারিন বেডরুমের দরজা টেনে পাশের রুমে যেতে যেতে বলে, “তোমার বাবা একটা খারাপ মানুষ। তুমিও দেখি তার মতো হয়ে যাচ্ছো। ঘটনা কি? টুকটাক বশ করার কাজ শুরু করলো নাকি? তোমার বাপ সামান্য তোমার ডায়পারও চেঞ্জ করতে পারে না। একটু হাগু, মুতু করলেই ফারিন ফারিন বলে চিল্লাতে থাকে। নাক, মুখ কুঁচকে রাখে। তাও বাবাকে এত ভালোবাসো? আর আমি যে কষ্ট করে জন্ম দিলাম? একেকটা লাথি দিলে যে ব্যথা পেতাম? আমি খেতে বসলেই তো হাগু, মুতু করো, আমি না খেয়েদেয়ে পরিষ্কার করি, আমার তো তোমার বাবার মতো বমি পায় না? বেশি ভালোবাসি বলে আমার প্রতি মায়া মহব্বত নেই, না? তুমিও সবার মতোই পঁচা। তুমিও আমাকে ভালোবাসো না।”

আহিয়ান হাসে।

“আবার হাসেও! ভালোই তো। বাপ খবরও নেয়নি, পাশেও বসেনি, পেটে থাকতে কথাও বলেনি। সেই বাপের প্রতি কত ভালোবাসা! আহাগো! মা এখন সেরা খারাপ মানুষ না? মা যে সন্ধ্যার পর থেকে একা একা থাকে? খারাপ লাগে না মায়ের? বাবার সাথে তো খুব আহ উহু করো। একটা দাঁতের মাথা দেখা যায়, ওই দাঁত দেখিয়ে হাসোও? কারণ কি? বাবার সাথে নামেও মিল, চেহারায়ও মিল, ব্লাডগ্রুপও মিল, ভাবেও মিল। হারামির বাচ্চাটার সাথে সব মিললেও বড় হলে আর মিলবে না। তোমাকে আমি ভালো মানুষ বানাবো। বুঝেছো?”

আহিয়ান আঙুল চোষে। ফারিন মুখ থেকে আঙুল সরিয়ে রুমে নিয়ে এসে পাছায় চাপড় মেরে চেংদোলা করে হাঁটতে হাঁটতে ফারিন আদুরে গলায় বলে,

“বাবার সাথে খুব ভাব? খুব ভাব? বাবা বাসায় না থাকলে যে আমি রাখি সারাদিন? বাবাকে দেখলে মায়ের কথা মনে পড়ে না তাই না?”

আহিয়ান মায়ের বকা বোঝে। ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে থাকে–প্রত্যাশায় মা এখনই আদর করবে। ফারিন ওকে আদর করতে করতে বলে,

“তোমার ওই বাপ তুমি পেটে থাকতে খবরও নেয়নি তোমার মায়ের। সেই বাপের প্রতি এত ভালোবাসা? তাকে নিয়ে একটু পঁচা কথা বলছি, তাকে একটু বকছি বলেই কাঁদতে হবে? সে তোমার আকিকার দিন চলে গিয়েছিল কাজে। তার জন্য এত ভালোবাসা?”

আহিয়ান ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদা আরম্ভ করে দেয়। ফারিন তখন হাসে। আহিয়ানকে আদর করে কান্না থামায়। গান গেয়ে শোনায়। ফারিনের গাওয়া একটা গান আহিয়ানের খুব পছন্দের। আহিয়ান কান্না শুরু করলেই ফারিন “মেরে চান্দা হে তু” গানটা গায়। আহিয়ানও কান্না থামিয়ে গান শোনে তখন। হয়তো ওর মা ও পেটে থাকাকালীনও রাতে রাতে গানটা গেয়ে শোনাতো বলেই গানটা ওর খুব পরিচিত? ফারিন আদর করে ছেলেকে। চুমু খায়, আহিয়ান গোলগাল চেহারায় হাসি ফুটে ফারিনের গান শোনার সময়। পেটে থাকতে লাথি দিয়ে জানান দিতো আর এখন হেসে জানান দেয় ওর মা ঠিক ওর কতটা প্রিয়। মা ছেলের এইসব খুনসুটি ভোর রাত পর্যন্ত চলে। আহিয়ানকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে রোজ ভোর তো হয়েই যায়।

ছয়মাস পর….বাইরে প্রচন্ড চেঁচামেচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফারিন আঁচল কাঁধে সেফটিপিন মেরে আহিয়ানের দিকে তাকায়। বসে বসে খেলনা দিয়ে খেলছে। আদৃতের হলুদ, বিয়ে একটা রিসোর্টে করা হচ্ছে। ওরা আজ রিসোর্টেই আছে। হলুদ উপলক্ষে ছেলেরা সাদা, হলুদের মিশেলে পাঞ্জাবি পড়েছে, আহিয়ানের গায়েও সাদা, হলুদে মেলানো পাঞ্জাবি। ফারিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ায়। দরজা ঠকঠক শব্দ হলো। ফারিন চিরুনি রেখে দরজা খোলে। আহনাফ দাঁড়িয়ে আছে। ফারিন মুচকি হেসে বলে,

“মেজে চাচ্চু তো ঘরে নেই।”

আহনাফ উঁকি দিয়ে দেখে ভাঙা বাংলায় বলে, “আহিয়ানের কাছে যাই একটু?”

ফারিন ঘরে আসার জন্য পথ করে দিলো। আহনাফ আহিয়ানের সাথে বসে খেলে। ফারিন চুল আঁচড়ে নেয়। চুল খোলাই রাখে। ফারিন মোবাইল নিয়ে বলে,

“তোমার মা কোথায়?”

“সেজোম্মুর সাথে পার্লারে গিয়েছে।”

“তোমার বাবাও গিয়েছে?”

“হ্যাঁ।”

“ওহহ।”

ফারিন আহনাফের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিয়ের সময় আহনাফ আহিয়ানের মতোই সাড়ে ছয় বা সাড়ে সাত মাসের ছিল। এখন বড় হয়ে গিয়েছে। ওর আহিয়ানটাও একসময় বড় হয়ে যাবে এই ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললে। এখনকার মতো থাকতো সবসময়? অবুঝ, শান্ত, মায়ের আদূরে বাচ্চা আর থাকবে না। ফারিন খাটে বসলো। আহনাফ আহিয়ানকে কোলে নেয়। ফারিন ওদেরকে দেখতে থাকে। ফারিন অবচেতন মনে আফসোস করে ওঠে আহনাফ একটা হেলদি ফ্যামিলিতে বড় হচ্ছে, বাবা, মায়ের বন্ডিং ভালো, যতটুকু দেখলো ওকে ওর বাবা মা সমানভাবে এফোর্ট দেয়। কিন্তু আহিয়ান তো এইসব পাবে না।

ফারিন ওদের দুটো ছবি তুলে রাখে। সেসময় আহসান রুমে আসে। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়ি পড়ে। আড়চোখে ফারিনের দিকে তাকায়। মারাত্মক সুন্দর লাগছে ফারিনকে রানী গোলাপি রঙের শাড়ি পড়ে। আহসান গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

“নিচে যাচ্ছো না কেনো?”

“যাবো এখন।”

আহসান এসে আহিয়ানকে কোলে তুলে নেয়। আহনাফের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, “তুমিও আসো।”

আহনাফ আহসানের কোলে ওঠে। আহসান দুজনকে দুইহাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তবে তার আগে ফারিনকেও দ্রুত নিচে নামতে বলে। আদৃত, ইশার এন্ট্রি হলো, কেক খাওয়ানো হলো, স্টেজে ছবি তোলা হলো, নাচগান হলো। ফারিন ছেলেকে নিয়ে এনজয় করেছে অনেক। আহসানের সাথে তেমনভাবে ছবিও তোলেনি। আহসানও দূরে দূরে ছিল, ফারিনও এগোয়নি। ফারিন ছেলেকে নিয়ে আলাদা ছবি তুলেছে, আহসানও ছেলেকে নিয়ে আলাদা ছবি তুলেছে। তিনজনের একসাথে কোনো ছবি নেই। ফারিন লক্ষ্য করেছে সবাই কত হ্যাপি। প্রতিটা কাপল হ্যাপি শুধু ওরা বাদে। ফারিন বেশ অনেকক্ষণ যাবতই নিচে ছিল। কিন্তু বারোটার দিকে যখন ডিজে চালু করা হলো তখন আহিয়ান কান্না করা আরম্ভ করে দেয় তখন আহসানকে বলে ফারিন উপরে চলে আসে।

আহিয়ানের জামাকাপড় খুলে দিয়ে ওকে পাউডার মাখিয়ে ভুত বানিয়ে দেয়। পেটে হাত বুলিয়ে, ফোলাফোলা গাল চেপে আদর করে। আহিয়ান ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে। ফারিন আহিয়ানের নাকে নাক ঘষে গেয়ে ওঠে,

“আকাশ যখন গাইবে বলে
আকাশ যখন গাইবে বলে বাদলেরই গান
বাতাস তখন বইতে গিয়েও দেখায় অভিমান অভিমান, আকাশ যখন ফিরতি পথে মন খারাপের সুর বাতাস তখন নীরব চিঠি পাঠায় বহুদূর বহুদূর~~”

আহিয়ানের কি হয় কে জানে! ও বাংলা গান শুনলেই কেঁদে ওঠে। ফারিনও ছেলেকে কাঁদাতে দিনে একটা হলেও বাংলা গান গায়। আহিয়ানকে ওভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে ওর হাসি পায়। ছোট্ট বাচ্চাটা কান্না আটকানোর কত প্রয়াশ করে কিন্তু পারে না। ঠোঁট উল্টে কেঁদেই ফেলে। ফারিনও পরে আদর করেই কান্না থামায়৷ কান্না থামিয়ে আহিয়ান মায়ের মুখে লালা লাগিয়ে থাবা মারতে মারতে অভিযোগ করে ‘জানো না আমি পছন্দ করি না? তাও গাও কেনো?’ বাচ্চাটাকে কাঁদাতে ফারিনের খারাপ লাগলেও বাপের চেহারা পাওয়া বাচ্চাকে ও কাঁদাবেই।

আহসান মাঝে একবার এসে মোবাইল, ঘড়ি খুলে পাঁচ মিনিটের জন্য শুয়ে আবারও বের হয়ে গিয়েছিল। আহসান বের হওয়ার পর আহিয়ানকে খাইয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে ফারিনের দেড়টার মতো তো বাজেই। ফারিন আজ হাফ ছাড়ে। অনেক তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে আজ ওর ছেলে। ফারিন আহসানের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

কিন্তু সময় দুইটার মতো। আহসান তখনও ঘরে না আসায় ফারিন চিন্তিত হয়ে ওকে কল করে। কিন্তু মোবাইল বিছানার একপ্রান্তে অবহেলায় পড়ে ছিল। সেখানেই বেজে ওঠে। ফারিন শাড়ি বদলায় না৷ ডান কাঁধে আঁচল তুলে নিয়ে ছাদের দিকে যায়। আহসান চোখ বন্ধ করে ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে আছে। ফারিন ব্যস্তপায়ে ছাদে এসে আহসানকে ওভাবে বসে থাকতে দেখেই ওর কুঁচকানো কপাল শিথিল হলো। ধীর পা ফেলে এগিয়ে গেল আহসানের দিকে।

আহসানের সামনে বসে। আহসান উরুতে হাত রাখতেই আহসান চোখ মেলে তাকায়। ফারিন শান্ত গলায় বলে,

“ড্রিংকস করেছো?”

সহজসরল স্বীকারোক্তি। “হ্যাঁ।”

“কেনো?”

“সবাই করেছে তাই।”

ফারিন বুঝলো বেশি খায়নি। হুশে আছে। ও নরম গলায় জিজ্ঞাসা করে, “তুমি না সহ্য করতে পারো না? তাহলে খেয়েছো কেনো?”

“কারণ তুমি পছন্দ করো না।”

“আমি তোমার শত্রু?”

“বন্ধু?”

পায়ের শব্দে ফারিন একটু দূরে বসলো। পিছনে ফিরে তাকায়। ইশাকে ছাদে আসতে দেখে বলে,

“কিছু লাগবে?”

ইশা অপ্রস্তুত হলো বেশ। “আদৃত আছে?”

“না, নিচে বোধহয়। খুঁজে দেখো।”

ইশা যে বেগে এসেছিল, তারচেয়েও দ্বিগুণ বেগে চলে গেল। ফারিন আহসানের দিকে তাকায়।

“ড্রিংকস করেছো কেনো? তোমার একটা ছেলে আছে। তোমার ছেলে তোমার কাছ থেকে কি শিখবে?”

আহসান ফারিনের হাত টেনে নিজে কাছে আনে। কোমর চেপে ধরে বলে, “তোমার এত দম্ভ কিসের? তোমার ছেলে তোমার কাছ থেকে কি শিখবে?”

“তোমার থেকে ভালো আমি।”

“ভালো তুমি?”

আহসান ফারিনের অধরে অধর মিলিয়ে দেয়। ফারিন আহসানের চুল টেনে ধরে৷ আহসান তাও ছাড়ে না। হালকা ড্রিংকস করলেও গন্ধ লাগছে ফারিনের ভীষণ। একটু পরে আহসান ওকে ছেড়ে দেয়। ফারিন আহসানকে ধাক্কা মেরে দূরে সরে যায়। উঠে চলে যেতে নিলে আহসানও উঠে দাঁড়ায়। ফারিনের হাত টেনে ওকে ঘুরিয়ে নিজের সাথে চেপে ধরে। ফারিন নিজেকে ছাড়াতে চায় তবে পারে না। আহসান ফারিনের চোয়াল শক্ত করে ধরে বলে,

“এত পালাই পালাই কিসের? আমি কখনো জোর করেছি তোমাকে? তাও এত ঘৃণা কেনো তোমার আমার প্রতি?”

“আহসান ছাড়ো আমাকে।”

“তুমি উত্তর দাও আজকে। সবাই হ্যাপি কাপল, সবাই হ্যাপি কাপল। ভাইয়া, আদৃত, রাহিম ভাইয়া, রিজভী ভাইয়া, সুমাইয়া আপু সবাই হ্যাপি কাপল। সবাই নিজের ফ্যামিলি, নিজেদেরকে নিয়ে হ্যাপি। আমি? আমার জীবন এমন কেনো? ছেলের ছয়মাস বয়স, সংসারের প্রায় সাড়ে তিন বছর। প্রথম দশ, এগারোমাস ছাড়া একদিনও শান্তি পাইনি এতদিনে। আমি তো সুন্দর সংসার চেয়েছিলাম। বলো আমার দোষ কোথায়? তোমাকে ভালোবাসা দোষ?”

“আমাকে ভালোবাসো না তুমি।”

“তুমি তো আমার সংসারই করতে চাও না। আমার ভালোবাসা কি করে বুঝবে তুমি?”

ফারিন আহসানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো তড়িৎবেগে ছাদ থেকে বেরিয়ে গেল। আহসানও ওর পিছন পিছন আসে। ফারিন ছুটে রুমে আসে, আহসানও তাই। আহসান ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। একটানে পাঞ্জাবি খুলে ফেলে বলে,

“আমার প্রশ্নের জবাব দিবে তুমি এখন। আম জেলাস, সবার এত এত ভালো মোমেন্ট, কাপল মোমেন্ট দেখে আমি জেলাস ফিল করি। তোমার সমস্যা কি আমাকে বলো তুমি।”

“তুমি আগে শুনতে চেয়েছিলে? আমি বলতে চাইনি?”

“কি বলতে ডিভোর্স চাও? সেটাই তো বলতে?”

“এই তোমার ভালোবাসার নমুনা?”

আহসান ফারিনকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে। “ভালোবাসিনি তোমায়?”

ফারিন আহিয়ানের দিকে তাকালো। “তোমার জন্য যদি আমার ছেলে উঠে যায় তাহলে….”

আহসান আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে ফারিনের উপর চড়াও হলো। “তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম। তোমাকে আমি অন্যরকম ভেবেছিলাম, তোমার সাথে বাকি সবার মতো সংসার করার প্ল্যান ছিল। কিন্তু তুমি স্বার্থপরের মতো…”

আহসান থেমে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ফারিন আহসানের চুল টেনে ধরে বলে, “কি করেছি আমি স্বার্থপরের মতো?”

“আমি যখন তোমাকে বিয়ের পর প্রথম সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম তখন তুমি তোমার বাবার বাড়ি গিয়েছিলে কিনা?”

“তো?”

“তুমি তখন কোটে দৌড়াদৌড়ি করেছিলে কিনা?”

“হ্যাঁ?”

আহসান ফারিনের গলায় দাঁত বসিয়ে দিলো। ফারিন আহসানের পিঠে ধামধাম করে কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দিলো। আহসান মুখ তুলে ফারিনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তুমি চরম অহংকারী একটা মেয়ে।”

“তোমার মতো নির্বোধ নই আমি।”

“কি করেছি আমি?”

“ডিভোর্স দিতে চাওনি আমাকে?”

“না।”

“ইউ লায়ার।”

“কে বলেছে আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছি?”

“তোমার মা, ভাই, বোন।”

ফারিন চুপ করে রইলো। আহসান বলে, “কথা নেই কেনো? সত্যিটা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে তাই?”

“আর কি বলেছে তারা?”

“তোমার সব কুকীর্তি বলেছে।”

“তুমি বিশ্বাসও করেছো?”

“করবো না কেনো? তোমার মা তোমার নামে বানিয়ে বানিয়ে তো আর কিছু বলবে না। তুমি আমাকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছো, তুমি আমার সাথে সংসার করবে না তাই আহিয়ানের আগেরজনকে নষ্ট করে ফেলেছো সব বলেছে।”

ফারিন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। “তুমি বিশ্বাস করে নিলে?”

খ্যাঁকিয়ে উঠে বলে, “কেনো করবো না হ্যাঁ? কেনো করবো না? তুমি বলোনি আমার সাথে সংসার করবে না? বলোনি আমার বাচ্চা পেটে আসলেও জন্ম দিবে না বলোনি?”

ফারিন নিষ্প্রাণ চাহনিতে চেয়ে রইলো। আহসান ফারিনের গলায় মুখ গুঁজলো। “তোমাকে আমি অনেক ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছো। আমার ভালোবাসাকে তুমি রাস্তার পাগল ছাগলের মতো দূরছাই করেছো। তুমি একটা ফ্রট।”

“তুমি কষ্ট দাওনি আমাকে?”

“না।”

“দিয়েছো, তুমি আরো বেশি দিয়েছো। তোমাকে আমি কত ভালোবেসেছিলাম অথচ তুমি কি করলে?”

“কি করেছি?”

“আমার অনুভূতিকে লাথি মেরে অপমান করেছো। আমার থেকেও বাইরের মানুষ তোমার কাছে ইমপর্টেন্ট।”

“করিনি আমি অপমান। তুমি অপমান করেছো।”

“করেছো তুমি। আমি কিছু করিনি।”

“নাহ।”

“তুমি এত মিথ্যেবাদী?”

“তুমিও আর দশটা পুরুষমানুষেরই মতো। তোমাকে ভিন্ন ভাবা আমার জীবনের সবচেয়ে ভুল।”

“তাই তো ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলে?”

“মানুষ বললো আর বিশ্বাস করে নিলে?”

আহসান হো হো করে হাসতে থাকে। ফারিন আহসানের শার্টের কলার ধরে বলে, “তুমি একটা খারাপ মানুষ। তোমার জন্য আমার সুখের সংসার হয়নি। তোমার জন্য। তোমার নির্বুদ্ধিতার জন্য। তোমার জন্য আমাদের তিনজনের একটা সুন্দর ফ্যামিলি ফটো তোলা হলো না। তুমি আমাদের মাঝে দেওয়াল তৈরি করে দিয়েছো।”

“ওহ তাই? যদি বলি তোমার উদাসীনতার জন্য আমার সংসার হলো না? তোমার জন্য আমরা আর দশটা কাপলের মতো নই? সবাই কত হ্যাপি, সবাই কি খুশি আর আমি? আমাকে শুধুই মিথ্যা অভিনয় করতে হয়।”

“সময় মতো সব শুনলে পস্তাতে হতো না।”

“কোনো প্রয়োজন নেই কিছু শোনার। আমি বোকা নই।”

“তুমি তারও উপরে।”

“আমার ছেলে তোমার মতো একটা স্বার্থপর মা পেলো।”

“সেম টু ইউ। আমার ছেলে তোমার মতো একটা নিবোর্ধ বাবা পেলো যার কাছে ঘরের মানুষের চাইতে পরই আপন।”

আহসান আবারও দাঁত বসিয়ে দেয় ফারিনের গলায়৷ ফারিন আহসানের সরাতে চায় কিন্তু পারে না। আহসান ফারিনের উপর শুয়েই হাত বাড়িয়ে আহিয়ানের বুকে হাত রেখে চোখ বোজে। ফারিন গলার স্বর চওড়া করে বলে, “ সরো তুমি।”

“ঘুমাবো, ঘুমাতে দাও। মেজাজ খারাপ করো না।”

“তুমি একটা বাজে লোক।”

“তোমার মতো নয়। তুমি আমাকে সবার মতো একটা সুখী পরিবার দাওনি। তোমার স্বার্থপরতার জন্য আমার সুখী পরিবার হয়নি। তুমি একটা খারাপ মেয়ে। তুমি শুরু থেকেই আমাকে চাওনি।”

ফারিন কথা বললো না। আহসান ঘুমিয়ে পড়লে ওকে ঠেলে সরিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদলো। এতদিন পর বুঝতে পারলো আহসানের ওমন ব্যবহারের কারণ। ও নিজের ভাগ্যের উপর রাগ হয়। জীবনে করেছো তো অনেক কষ্ট। তারপরও একটা নিবোর্ধ লোকের সাথেই ওর বিয়ে হওয়ার খুব দরকার ছিল? ফারিন নিজের ভাগ্যকে দোষ করে কাঁদলো সারারাত।

______________

আদৃতের বিয়ের দিন সকালে দুজনের মুখোমুখি বেশ দারুণ একটা ঝগড়া হয়েছে। তারপর সারাদিন ফারিন আর আহসানের তেমন কথা হয়নি। একজন আরেকজনের মুখোমুখি হলেও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। বিয়ে, খাওয়াদাওয়া, ফটোশুট, বিদায় সেড়ে ওরা সবাই ধানমন্ডি চলে এসেছে রাত দশটার মধ্যেই। তখন বারোটার বেশি বাজে। সিদ্দিক নিবাস দশটায় সে তাজা ছিল, করব ছিল তা এখন একটু কমে আসছে৷ সারাদিন ক্লান্ত থাকায় সবাই যার যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ছে। ফারিন আহিয়ানের জামা খুলে ওকে শুধু ডায়পার পড়িয়ে সারা শরীরে পাউডার মেখে দেয়। আহিয়ান ধানমন্ডিতে আসার পথে গাড়িতে ঘুমিয়েছে। তাই ও এখন চাঙ্গা। ফারিন আহিয়ানের পেটে নাক ঘষে ওকে হাসায়। আহিয়ানও হেসে হাত পা ছুঁড়তে থাকে।

ফারিন আহিয়ানকে বসিয়ে দেয়। সামনে খেলনাপাতি ছড়িয়ে দিয়ে ওর পাশে মোবাইল নিয়ে বসে। সামনেই আহসানের জন্মদিন। ও পাঞ্জাবির কালেকশন দেখতে থাকে। আহসানকে বেনামে অফিসের ঠিকানায় গত দুই বছরের মতো উপহার দিবে। আহিয়ানের দিকে তাকায় মাঝেমাঝে, নজরে নজরে রাখে। আহিয়ান ওর পাশে বসেই নিজের মতো খেলছে, তাই ফারিনও খোঁচালো না। ফারিন বালিশে হেলান দিয়ে বসে। একটা খুবই হালকা নীল, বলতে গেলে ওশান ব্লু কালারের পাঞ্জাবি পছন্দ হয়েছে। ভাবছে সেটাই অর্ডার দিবে। আবার একটা ছাই রঙের পাঞ্জাবিও পছন্দ হয়েছে। ফারিন দ্বিধায় পড়ে যায়। নখ কামড়াতে থাকে।

তখন দরজা খোলার শব্দ হয়। এই বাড়ির সবাই নিখাঁদ ভদ্রলোক। আসলে আহসানই এত রাতে ঘরে আসবে। ফারিন তাকিয়ে দেখলো আহসানই এসেছে। আহসানকে দেখে আহিয়ান খুশি হয়, হেসে হামাগুড়ি দিয়ে আহসানের কাছে আসতে নেয়। খাটের কিনারায় আসলে আহসান আঁতকে ওঠে। দ্রুত পা চালিয়ে ফারিনকে ডাক দেয়। ফারিনও আহিয়ানকে খেয়াল করেনি। ফারিন ধরার আগেই আহিয়ান খাট থেকে পড়ে যায়। আহসান দ্রুত আহিয়ানকে উঠে ফেলে। আহিয়ান শব্দ করে কাঁদতে থাকে। আহসান আহিয়ানের কপাল দেখে রেগে গেল।

চেঁচিয়ে বলে, “কেমন মা তুমি? ছেলের দেখভালও ঠিক করে করতে পারো না?”

আহিয়ান অনেক শব্দ করে কাঁদছে। ফারিনের বুক খা খা করে ওঠে। হাত বাড়িয়ে বলে, “ওকে আমার কোলে দাও।”

আহসান রেগে চেঁচিয়ে বলে, “না আছে বউ হওয়ার যোগ্যতা, না আছে মা হওয়ার যোগ্যতা। তুমি চাও কি? আগেরটার মতো আহিয়ানকেও মেরে ফেলতে?”

“আহসান ওকে আমার কাছে দাও। দেখছো না কাঁদছে?”

“তোমার মতো মা থাকার দরকার নেই। না তোমাকে আমার দরকার, না আমার ছেলের দরকার।”

“তুমি আহিয়ানকে দাও। ও কাঁদছে।!

“কাঁদুক। ছেলেকে সামলাতে না পারলে সামান্য কান্না দেখলে কিছু হয় বা।”

“তুমি আহিয়ানকে দাও।”

“দিবো না আমার ছেলেকে তোমার মতো স্বার্থপর মায়ের হাতে।”

ফারিন আহসানের হাত থেকে জোর করে আহিয়ানকে ছিনিয়ে নেয়। ছেলের চোখের জল মুছে দিয়ে বলে, “আমি খেয়াল করিনি।”

দুজনের মাঝে আরো কথা-কাটাকাটি হলো। আহসান আহিয়ানকে আবারও ফারিনের কোল থেকে কেড়ে নিলো। ঝগড়ার এক পর্যায়ে এক পর্যায়ে আহসান ফারিনকে ওর জীবন থেকে চলে যেতে বলে। নিজের জীবন থেকে, আহিয়ানের জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যেতে বলে। ফারিনকে ইচ্ছেমতো কথা শুনিয়ে আহসান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফারিন ওদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিছানায় বসে পড়ে।

আহিয়ান ফারিনের ছেলে। আহসান কি করেছো আহিয়ানের জন্য? ফারিন ওকে কষ্ট করে জন্ম দিয়েছে, ফারিন ওকে একা মানুষ করছে। ফারিন একা খাওয়াচ্ছো, একা ওকে দেখে রাখছে, একা ওকে হাসাচ্ছে, একা ওকে কাঁদাচ্ছে। ফারিন একা হাতে ওকে এইটুকু পর্যন্ত আনতে কতবার হাঁপিয়ে উঠেছে, কখনও অভিযোগ করেনি। আহসান সাহায্য করেনি। এখন এসে আহসান কি করে পারলো আহিয়ানকে ফারিনের কোল থেকে কেড়ে নিতে? ফারিনের শ্বাসকষ্ট উঠে গেল। ও দ্রুত নিজের ব্যাগ থেকে ইনহেলার বের করে মুখে নেয়। নিজে ধাতস্থ হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আহসান গেলে আহিয়ানকে নিয়ে ছাদেই বা বাগানেই যাবে? লোকটা কি ভাবেনি এখন ছেলেকে মশা কামড়ালে কি হবে? ফারিন ঘর থেকে বের হয়ে আহানের ঘর অতিক্রম করার সময় আহিয়ানের কান্নার শব্দ পায়। ফারিন চোখ মুছে ওড়না ঠিকঠাক করে আহানের ঘরের দরজার নক করে। ঠিক তাই। আহিয়ান ওখানেই ছিল। আহসান ওকে তিন্নির কাছে গিয়েছে। ফারিন ছেলেকে তিন্নির কাছ থেকে নিয়ে ঘরে চলে আসে। দরজা লাগিয়ে আহিয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে।

ব্যথা পাওয়ার পর থেকে মায়ের আদর পাওয়ার আগ পর্যন্ত আহিয়ান কেঁদেই যাচ্ছিলো। মায়ের আদর পাওয়া মাত্র চুপ করে গেল। উউ, আহ করে মাকে অভিযোগ দিতে থাকে। ফারিন ছেলের হাত পায়ে চুমু খায়। ফারিন আহিয়ানের কাছে ওর বাবার বিরুদ্ধে একরাশ নালিশ জানায়। আহিয়ানও যেন অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ করে প্রতিবাদ করতে থাকে। ফারিন কাঁদলো অনেকক্ষণ। মাকে কাঁদতে দেখে আহিয়ানও কাঁদে। মা ছেলে অনেকক্ষণ পালাক্রমে কাঁদে। ফারিনের বুকের মানিককে ওই নির্বোধ লোক কত কিছু বলে কেড়ে নিলো। ফারিন কক্ষনও আহসানকে ক্ষমা করবে না। ফারিন জীবনে অনেক কষ্ট পেলেও আহিয়ানকে যেভাবে কেড়ে নিয়েছে তার মতো কষ্ট পায়নি। কত বড় স্পর্ধা হলে ওর ছেলেকে কেড়ে নেয়। ফারিনের আছে কে ওর ছেলে ছাড়া?

চলমান…….

(হ্যাপি রিডিং…. রিচেক করিনি।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here