#আমার_বোবাফুল(০৫)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
“দাড়া”
নিস্তেজ পরিবেশে হঠাৎ বর্ণ’র আদেশ সূচক কন্ঠ।সেকেন্ড কয়েক সুখের পা থেমেছিল এক ক্ষণের জন্য। পরপরই আবার পা চালায় অগ্রে।যেনো আদেশ টুকু তার উদ্দেশ্যেই ছিল না। বর্ণ’র কপালে ভাঁজ পড়ে।অবাক সে তেমন একটা হলো না বোধহয়।বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে ফের বললো গম্ভীর গলায়,
“ দাঁড়া বলছি”
সুখ এবারেও থামে।তবে পিছু ফেরেনা।ঢোক গিলে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে –‘যেই পুরুষটির আশেপাশে থাকার লোভে একটু ছুঁতো খুঁজে ফিরতো,পোষা বিড়ালের মতো ঘুরঘুর করতো আগেপিছে’ আজ অনুমতি বলো বা সম্মতি দুটো পেয়েও সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সুখ পুণরায় সামনে এগিয়ে চলে।আর সাড়া দেবে না ওই নিষ্ঠুর পুরুষের আদেশে।সে বাধ্য নয়।নিজেই তো দূরে সরে যেতে বাধ্য করেছিল।সুখের কানে আরো একবার বাজল বর্ণ’র কঠোর স্বর,
“ শেষ বারের মতো বলছি -দাড়া!নায়তো ভালো কিছু হবে না তোর সাথে ”
খারাপ হওয়ার কী বাকি রেখেছে?সুখ স্থির হলো এবারে। কিন্তু পিছু ঘুরে তাকালো না বর্ণ’র দিকে।কাছে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো বর্ণ। অবাধ্য মেয়েটা এমনিতেই দু দুবার পিছুডাক অগ্রাহ্য করে তার প্রেস্টিজে আঘাত করেছে।কাছে আসতে বললে যে সুখ সুড়সুড় করে আগের মতো চলে আসবে না –তা বেশ ভালো করেই বুঝে নিলো সে।বর্ণ গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেই এগিয়ে এলো। যেখানে হাজারো মেয়েরা বীনা শর্তে তার কাছে ছুটে আসে সেখানে গো ধরে পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা বোবাফুলের দিকে নিজ থেকেই যাচ্ছে দেখে প্রতিটি ধাপ বাড়াতেই যেনো ইগোতে লাগছিল খুব।
“ সেদিন এই গালে চড় মেরেছিলি মনে আছে?”
সুখের নজর মেঝেতে। পিটপিট করে সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে।বর্ণ’ বেশ নিকটে এসেই থেমেছে। চোখে চোখ রাখলে হৃদস্পন্দন যদি তাল-মাতাল ছুটে? পুরুষটি হৃদয়ের ছন্দহীন সেই শব্দে বুঝে যাবে সে এখনো দূর্বল। তারপর হয়তো আবার অপমান করবে! কিন্তু তেমন সুযোগ আর দেবে না সে।
নিজেকে সামলাতে বর্ণ’র কষ্টই হচ্ছে এবার। মস্তিষ্ক টগবগিয়ে রাগ উঠছে।তবে তা নিজের প্রতি নাকি সুখের প্রতি বুঝে উঠা দায়। দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে তীর্যক চোখে নজর নামিয়ে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকা সুখের মুখশ্রীর দিকে চেয়ে রয় বর্ণ।কিছু বলেছে; তার প্রত্যুত্তর না করে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেলো কোথায় মেয়েটা?
সুখ একঝলক চোখ তুললো।বর্ণ তখনো তাকিয়ে আছে নিষ্পলক।এখনই যেনো সুখকে ভষ্ম করে দেবে চোখের আগুনে।ঘড়ি ধরা পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড আগে করা প্রশ্নের জবাব দেয়ার ইচ্ছে হলো সুখের। নিঃশব্দে দুদিকে মাথা নেড়ে জানালো “ তার মনে নেই”।
জবাব এলো এতোক্ষণ পর –তাও মিথ্যে।গমগমে গলায় ধমকের সুরে বলে উঠলো বর্ণ,
“ এখনি চোখের সামনে থেকে দূর হ্!আর এক মূহুর্ত এখানে দেখতে পেলে –তোর গাল আর আমার হাত!”
অবিলম্বে মেজাজ খারাপ হয় সুখের। ডেকেছে নিজ থেকে,নিজে হেঁটেই তার সামনে এসেছে,আবার হুমকিও নিজেই দিচ্ছে? দুহাত কিড়মিড়িয়ে জেদি চোখে তাকিয়ে রইলো সে।একপাও সরলো না নিজের জায়গা থেকে।বর্ণ চোখ ফেটে তাকায়।এই মেয়ে কী এমন অবাধ্য হতেই থাকবে সমানে?
সুখকে হাত কিড়মিড় করে একদৃষ্টে মাথার দিকে চেয়ে থাকতে দেখে সুচালো স্বরে বললো আকম্মাৎ,
“ আজ কী চুল টানার ইচ্ছে আছে?”
চিৎকার করে বলতে খুব ইচ্ছে হলো “হ্যাঁ,ওই ঝাঁকড়া চুল গুলো একটা একটা ছিঁড়ে আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবল ইচ্ছে আছে”!তবে সুখ তৎক্ষণাৎ কিছু বললো না। নিঃশব্দে বর্ণ’র পাশ কাটিয়ে সিঁড়িতে উঠেই হুট করে পিছু ঘুরে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইচ্ছের কথাটা জানান দিয়ে গেলো।
বর্ণ’র হাত মুঠ পাকিয়ে আসে আপনাআপনি। চোখের কৌটরে বিষ্ময় সমেত একরাশ রাগ ধরা দিলো।ভীতু বোবাফুলের সাহস তবে আকাশচুম্বী বেড়েছে এই কয়দিনে?
নীলাম্বরে শুভ্র মেঘের ছুটোছুটি খেলা চলছিল তখন। বর্ণ’র আর দেখা হলো না তা।রাগে আশপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে তার।কফির কাপ ওখানেই ছুঁড়ে ফেলে হনহনিয়ে সিঁড়ি পার করলো সে।
সুখ নিচে এসে কিচেনে ঢুকলো। রুবাইয়্যাত আর আইজা সেখানেই আছে।নূরাকে দাদুর পাশে দেখা গেলো।হয়তো আটকে রেখেছেন। বৃদ্ধা মানুষ। কতো সময় একা একা বসে থাকা যায়?
“ সুখ.. ভালোই হলো এসেছিস!এই চা’ টা তোর বড় বাবাকে দিয়ে আয় না ”
সুখের চোখ জ্বলে উঠল।হাতে ট্রে নিতে নিতে ইশারায় জানতে চাইলো,
“ বড় আব্বু এসেছে?”
“ সেতো কাল রাতেই ফিরেছে। একদিন হতে চললো।তোর খেয়াল আছে এসবে?থাকিস তো কোণে কোণে”
ইশশ্। জলজ্যান্ত একটা মানুষ কাল থেকে এসেছে অথচ সে জানেই না!সুখ জিভ কাটে।ট্রে নিয়ে ফুরফুরে মনে এগিয়ে গেলো সিঁড়ি বেয়ে।বড় আব্বু ঢাকায় থাকে মাসের কমবেশি সময়।ব্যবসাটা ওখানেই। এখানেরটা দেখার দায়িত্বে আছেন তামিজ শিকদার। সেই হিসেবে আব্বুকে কাছেই পায় সুখ।
একহাতে ট্রে ধরে রেখে অন্যহাতে দরজায় টোকা দেয় সুখ। উঁকি দিলে দেখতে পাওয়া যায় ভেতরে অবস্থানরত ভদ্রলোক রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে মুখের উপর বই মেলে রেখেছেন।বইখানা চোখ হতে ঈষৎ নিচে নামিয়ে চশমার আড়াল থেকে দরজার দিকে দৃষ্টি ফেললেন আযাদ শিকদার।সুখকে দেখে হাসি চৌড়া হলো।উঠে বেডের দিকে যেতে যেতে বললেন,
“ অবশেষে আমার সুখপাখির দেখা মিললো তবে? এসো এসো .. ভেতরে এসো?”
ভদ্রলোক কোলে বালিশ নিয়ে সেথায় বই রেখে পুণরায় চোখ ডুবালেন। সুখ হাসিমুখে ট্রে টি-টেবিলে রেখে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে নিকটে দাঁড়ালো।
ঘনঘন পল্লব ঝাপ্টে দাঁতে নখ কুটে রুমময় নজর বুলিয়ে দুবার পরখ করে নিলো সুখ। ভদ্রলোক আড়চোখে তার কার্যকলাপ দেখে মনে মনে হাসলেন বোধহয়।তবে পুরোটা সময় নিশ্চুপ রইলেন।সুখ হতাশ মনে উৎসুক চোখে কতোক্ষণ আযাদ শিকদারের দিকে তাকিয়েও উনার পক্ষ থেমে কোন মন্তব্য পেলো না।হাতে হাত বাজিয়ে সুখ ভদ্রলোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বুকে দমিয়ে রাখা প্রশ্নটা করেই ফেললো হাত নেড়েচেড়ে,
“ আমার চকলেট?”
আযাদ শিকদার সুখের ইশারা বুঝে মুখটা দুঃখী দুঃখী করলেন।জবাবে বললেন,
“ এবারে.. তো আনা হয়নি ”
সুখের মুখ কুঁচকে আসে অসন্তুষ্টিতে।চা’র কাপের দিকে ইশারা দিয়ে বললো,
“ তাহলে.. চা নিয়ে যাই?”
অবাক হয়ে পরপর শব্দ করে হেসে ফেললেন ভদ্রলোক।সুখকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বললেন,
“ সুখপখি’র ফেবারিট চকলেট আনতে বড় আব্বুর ভুল হয় নাকী কখনো?”
সুখ নিজেও হেসে ফেললো।হাত বাড়িয়ে দ্রুত চকলেট বক্স বের করতে তাড়া দেয়।চকলেট শেষ হয়ে গিয়েছে আরো তিনদিন আগে।তার মন খারাপির সুযোগে নূরা পাকনিটা ফিনিশ করে দিয়েছে সব।
দুহাতে বক্স আঁকড়ে ধরে সুখ জানতে চাইলো,
“ নূরা আর তুহফা আপি’ পেয়েছে?”
“ ওরা তো আগেই নিয়ে গেছে!”
“ আমিই সবার শেষে?”
মন খারাপির ভান ধরলো সুখ।যেনো ব্যাপারটা ভীষণ ব্যাথিত করেছে তাকে।
“ সুখ পাখির গুলো আলাদা ভাবেই রেখেছিল বড় আব্বু কিন্তু তার তো এই চুলে পাক ধরা লোকটার কথা মনেই নেই।তাই …”
বাঁহাত কোনরকম কানে ঠেকিয়ে করুন চোখে অসহায়ত্ব টেনে এনে “ স্যরি” বলে নিলো সুখ। ভদ্রলোক মুচকি হাসতেই সন্তুষ্ট মনে সে বেরিয়ে গেলো। তার যাওয়ার পানে অপলক চেয়ে রইলেন আযাদ শিকদার।তিনি সবসময় নিজের সন্তানদের চেয়ে সুখকে বেশি ভালোবেসে এসেছেন।যেনো মেয়েটার নিজের অক্ষমতা নিয়ে কখনো মনক্ষুণ্ণ না হয়। নিজেকে সবার চেয়ে কোন অংশে কম মনে না করে।
সুখ যাওয়ার ক্ষণকাল পর বর্ণ এলো কক্ষে।তাকে দেখেই গম্ভীর হয়ে গেলেন আযাদ শিকদার।ছেলের সাথে কথা বন্ধ করেছেন সেদিন –যেদিন মিশ্মিকে সাথে এনে তাকে বিয়ের মনোভাব ব্যক্ত করেছিল। শুধু ব্যক্ত নয় বিয়ের ডেট ও ফিক্স করে রেখেছে।
বর্ণ ডিভানে গিয়ে বসলো মুখোমুখি। উভয়ের মুখশ্রী গম্ভীর।আযাদ শিকদার অন্যত্র নজর সরিয়ে রাখলেন।ছেলের মুখ দেখলেই রাগে পিত্তি জ্বলে উঠছে তার।
“ কথা ছিল!”
“ তোমার সাথে আমার কোন থাকতে পারে বলে মনে হয় না। নিজের সিদ্ধান্ত যেখানে নিজে নিতে শিখে গেছো!”
কাটকাট গলায় প্রত্যুত্তর করলেন ভদ্রলোক।
পরদিন মিশ্মির পরিবার এলো শিকদার বাড়ির দোরগোড়ায়। সংবাদটা-ই আযাদ শিকদারকে দিতে গিয়েছিল বর্ণ। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভদ্রলোক তাদের সম্মুখে বসলেন।মুখে অণু পরিমাণ হাসির রেখা খুঁজে পাওয়া যাবে না।বাড়ির কর্ত্রীরা ক্ষুণ্ন মনে আপ্যায়ন করছেন। মেহমানদের অসম্মান করা এবাড়ির ধর্ম নয়। তাছাড়া ছেলে যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে তার সম্মান রক্ষা করাও জরুরি।সুখ নিচে নামবে না নামবে না ভেবেও মনের কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে ধীরপায়ে ড্রয়িং রুমের কিছুটা দূরে এসে দাঁড়ায়।বর্ণ তখন সেখানে উপস্থিত।পাশে মিশ্মি দাঁড়িয়ে আছে সহাস্যে।তার চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা কতোই না খুশি। বর্ণ’র ঠোঁটের একপেশে হাসি দেখেই বুকটা ধ্বক করে উঠে সুখের। হৃদযন্ত্রটা যেনো থেমে গেলো এক মূহুর্তের জন্য।মিশ্মিকে পেয়ে পুরুষটিও নিশ্চয়ই ভীষণ খুশী! সহ্য ক্ষমতা সুখের কমে এলো।সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে নেয়। নিঃশ্বাস আটকে এলেও উপরে দাঁতে দাঁত খিচে রয়।বেখেয়ালে বর্ণ’র চোখ গেলো তার দিকে। তাকে দেখে ঠোঁটের হাসি বাড়লো বৈকি। বর্ণ’র হাতে মিষ্টির প্লেট ছিল। একঝলক সুখের দিকে চেয়ে হাতে মিষ্টি তুলে নিলো সে এবং আচমকাই….
#চলবে🕊️
®তৃপ্তি এহসান নাওরা•
[এই খচ্চর বর্ণ”টাকে কী করা যায় রিডার্স? 💜]

