আমার_বোবাফুল(০৬) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
91

#আমার_বোবাফুল(০৬)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

আকম্মাৎ মুখে মিষ্টি পুরে দিতেই বিষ্মিত চোখে তাকালো মিশ্মি।বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো বর্ণ নিজ হাতে তাকে মিষ্টিমুখ করালো!সে বাকশূণ্য চোখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়েই ছিল অল্পক্ষণ। বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললো মৃদু স্বরে,

“ নতুন জীবনে পদার্পণের জন্য শুভকামনা.. বেস্ট অফ লাক”

“ তুমি পাশে থাকলে সবকিছুই বেস্ট হবে আই উইশ ”

বর্ণ’র ঠোঁটের হাসি প্রসস্থ হয়। আড়চোখে চেয়ে সুখকে দেখা গেলো না।এতো দ্রুত চলে গেলো মেয়েটা?আরেকটু থেকে যেতে পারতো।

পরদিন থেকেই পুরোদমে বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিলো মিশ্মি ও তার পরিবার। শপিং থেকে শুরু করে জুয়েলারি সব মনের মতো হয়েছে।বর্ণ ক্রেডিট কার্ড মিশ্মির হাতে তুলে দিয়েছে নিজের। মেয়েটা এতেও ভেতরে ভেতরে বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ।বর্ণ সত্যিই এতো কিছু করছে তার জন্য?

শপিংয়ে তুহফাকে সাথে নিয়েছিল মিশ্মি। প্রথমে যাবে না বলায় বর্ণ’র ধমক খেয়ে হাস্য হীন মুখে গাড়িতে গিয়ে বসেছিলো।অভ্র ও গেলো তার পাশে বসে।হানিফা বেগমের মিশ্মিকে মনে ধরেছে প্রচন্ড। বর্ণ’র পাশে মর্ডান মেয়েটাকে ভীষণ মানিয়েছে কী না! তিনিও সঙ্গে যেতে আবদার রেখেছিলেন,পরে মিশ্মির অসন্তোষ মুখশ্রী দেখে আর কথা বাড়ায়নি।

সুখ তখন গার্ডেনে বসে দোল খাচ্ছে।ফোর্থ ফ্লোরের ব্যালকনি থেকে বর্ণ’র গিটারের মৃদু টুংটাং আওয়াজ ভেসে আসে।হবু বউয়ের সাথে যায়নি নাকি?সুখ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে গা ঝেঁকে মাথা থেকে সেসব চিন্তা বের করে দিলো। দোলনায় পা তুলে বসে বই মেলে ধরলো বেখেয়ালি মনোযোগে।সামনে ইয়ার ফাইনাল এক্সাম। প্রচুর পড়া বাকি।যে পুরুষ কোন কালেই তার আপন হবে না –তার জন্য গুমড়ে মরে কী লাভ?

বর্ণ’র গিটারের আওয়াজ পেয়েই লাফাতে লাফাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো নূরা।সুখের কাছে ছুটছে সে।অন্যদিন গিটারের আওয়াজ কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই সুখ গুটিসুটি পায়ে তার রুমে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসতো,তবে একা নয়।নূরাকেও টেনে হিঁচড়ে সাথে নিতো। সঙ্গী থাকলে ধমক অথবা বকা খেতে খুব একটা খারাপ লাগে না।যদিও বর্ণ তেমন একটা ধমকাতো না ওই সময়টায়।

“ বর্ণ গিটার বাজাচ্ছে সুখপাখি।তুমি কী আজো যাবে না?”

মন খারাপি ভঙ্গিমায় শুধালো নূরা।সুখের মতো তারও –কাজটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে। যদিও প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগতো।
বর্ণ চোখ বুজে যখন গান ধরতো, ওপাশ থেকে সুখ অপলক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকতো কেবল।যেনো দুজন হারিয়ে যেতো ভিন্ন জগতে।এতে তার প্রয়োজনটা কোথায় ঠিক বুঝতে পারতো না নূরা। বিরক্তিতে উঠে আসতে নিলে সুখ হাত চেপে ধরে করুন চোখে তাকালে –তা উপেক্ষা করে চলে আসতে নূরার ছোট্ট মনটাও সায় দিতো না।

এই ব্যবহারটা আবার তুহফার উপর প্রয়োগ করে দেখার সাহস করেনি সুখ।আপি পাশে থাকলে অগোচরে বর্ণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখের তৃষ্ণা মেটাতে পারতো না যে?

পুরোনো দিনের কথাগুলো আরো একবার স্মরণ করে তপ্ত শ্বাস ফেললো সুখ।অনুভূতি সব অপাত্রেই কী তবে দান করে এলো এতো দিন?

“ আর কখনো যাবো না বলে দিলাম তো সেদিন!তুমি একাই যাও নূরা”

হাতে থাকা খাতায় কলম কষে কথাটি লিখে দিলো সে। এতো দিন বিপরীত পক্ষ থেকে কিছু পাওয়ার লোভে যেতো, তবে আর না। সেদিনের এতো অপমানের পরো বেহায়ার মতো তার পাশে গিয়ে বসার প্রশ্নই উঠেনা।তারও আত্মসম্মানবোধ আছে।বাবা সব সময় বুঝিয়ে এসেছে “যেখানে তোমার সম্মান থাকবে না;অবহেলা, অপমান, অকৃতজ্ঞতা ছাড়া।মনে রেখো, সেই স্থান তোমার উপযুক্ত নয়।”

মনের দিক থেকে কিছুটা ভীতু হওয়ায় সুখ বাবার উপদেশ”টা সব জায়গায় প্রয়োগ করতে পারতো না!তবে এখন থেকে করার চেষ্টা করবে!

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো।শহরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত নামিদামি রিসোর্ট “অর্কিড হাউজ” বুক করা হলো।বর্ণ চেয়েছিল বিয়ের খবর মিডিয়ার সামনে প্রকাশ না করতে কিন্তু মিশ্মি শুনলো না। হাজারো মেয়ের স্বপ্ন পুরুষকে আজ নিজের নামে দলিল করে নেবে আর পৃথিবীর সামনে তাদের পূর্ণতা তুলে ধরবে না? এমনটা হয় নাকি আবার?এতে বরং নিজের প্রতিই অন্যায়ের সামিল হবে!

অ্যাঁশ কালার ভারী লেহেঙ্গাটা নিসংকোচে জড়িয়ে আছে শরীর। ঠোঁটে নিউড লিপস্টিক।কানে ঝুমকা।হাতের কব্জিতে তোড়া তোড়া চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ।শেষ বারের মতো চোখের পাপড়িতে মাশকারা লাগিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে দাঁড়ালো সুখ। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে ঘুরেফিরে নিজেকে দেখে নিলো সে। সিল্কি চুলগুলো ছড়িয়ে রাখলো পিঠে।কিছুটা সামনে এনে ফেলে রাখলো।

সুখ নিজের হাতে সেজেছে। সাজবে না?আজ তো বর্ণ ভাইয়ের বিয়ে। সম্পর্কে তার কাজিন হয়। কতো হৈ হুল্লোড় আনন্দ করা বাকি। অথচ বাড়ির অধিকাংশ মুখ গোমড়া করে আছে।এই যেমন বড় মা –ভদ্রমহিলা ক্ষণে ক্ষণে ছেলের উপর অভিমানের জুড়ে কেঁদে ফেলছেন। তাকে স্বান্তনা দিতে ব্যস্ত হলেন ফ্যাকাশে মুখে রুবাইয়্যাত।আযাদ শিকদার কোথায় বেরিয়ে গেছেন কে জানে।তামিজ শিকদার দেশে ফিরেছেন কাল মধ্যরাতে। তিনিও পরিপাটি হয়ে ড্রয়িং রুমে এসে বসলেন। আড়াইটা বাজে সবাই রওনা দেবে রিসোর্টের উদ্দেশ্যে।এখন বাজে দুপুর দু”টা।বাড়ির কর্তা কর্ত্রীদের পক্ষ থেকে কোন গেস্টকেই ইনভাইট করা হয়নি।

দুহাতে লেহেঙ্গা ইষৎ উঁচিয়ে চঞ্চল পায়ে একেরপর এক সিঁড়ি পার করে নিচে নেমে এলো সুখ।অভ্র হাতের সাহায্যে চুলে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে আচমকা থেমে গেলো। পরপর চোখ পাকিয়ে তার চতুর্দিকে ঘুরঘুর করতে করতে বুকে হাত চেপে বললো,

“ ইউ আর লুকিং লাইক অ্যা প্রিন্সেস সুখ আপি.. ইশশ্ যদি আর একবছর তোমার চেয়ে বড় হতাম। ট্রাস্ট মি.. তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিতাম!”

“ মুখে কোন কিছু বলা আর তা করে দেখানো কিন্তু এক নয় মিস্টার জুনিয়র”

ফোনের লেখাগুলো সরু চোখে চেয়ে পুণরায় সুখের হাতে দিয়ে দিলো সেটা।বললো ক্ষুণ্ন মনে,

“ সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছো কেনো?আমাকে পাত্র হিসেবে কোন অংশে কম মনে হয়? ”

“ লিলিপুট.. এখনো দুধ দাঁত পড়েনি অথচ সিনিয়র আপুকে প্রপোজ করা শুরু করেছিস?”

তুহফা এগিয়ে আসে।তার গায়েও পেঁয়াজি রঙের লেহেঙ্গা।অভ্র ক্ষিপ্র চোখে তাকায়। “লিলিপুট” কথাটা গায়ে লেগেছে খুব।আপি কী জানে এই লিলিপুট আজ অব্দি কতোবার প্রপোজাল পেয়েছে?

সুখ ছুটে এসে তামিজ শিকদারের পাশে বসে পড়লো। ভদ্রলোক হাসলেন।মেয়েকে উপর নিচ পরখ করতে করতে বললেন,

“ মাশা-আল্লাহ আমার আম্মাকে তো পুতুল বউ লাগছে একদম!”

মেয়েটা লজ্জা পেলো বোধহয়। চোখ বুজে বাবার বাহুতে মুখ লুকালো।হানিফা বেগম নাক কুঁচকে অন্যদিকে ফিরেও আড়চোখে সুখকে দেখতে ভুললেন না। সুন্দরই লাগছে তাকে।মনে মনে মাশা-আল্লাহ বলে নিলেন একবার।তবে উপরে কঠোর রইলেন।বোবা মেয়েটা আসার পর ছোট ছেলেটা তারচেয়ে বেশি ওকেই ভালোবাসে।আম্মা আম্মা করে মুখে ফ্যানা তুলে তারই চোখের সামনে।তার কী এই নিয়ে ওই মেয়ের উপর ক্ষোভ থাকবে না?

বর্ণ’কে দেখা গেলো না আশেপাশে।এমনকি রিসোর্টেও না।লাইট, ক্যাবল ,ক্যামেরা হাতে ক্যামেরাম্যান ছুটছেন এদিক ওদিক। রকস্টারের বিয়ে বলে কথা! “আকর্ষণীয় শিরোনাম তৈরি করতে হবে তো?

আর্টিফিশিয়াল ফুলে,কাপড়ে, ম্যাজিক লাইটে পুরো রিসোর্ট ডেকোরেটড করা। ঝিকিমিকি করছে চারিধার।খানিক দূরত্বে মুখোমুখি দুটো স্টেজ।দেশের নাম কামানো আরো অনেক সংগীত শিল্পীর পদচারণা হয়েছে আজ।সকলে বউ সাজে স্টেজে বসে থাকা মিশ্মিকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে কেউ তার পাশে বসেছে।বাকিরা নিজেদের বরাদ্দকৃত জায়গায়।

শিকদার বাড়ির সদস্যরা যেনো নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। একস্থানে নিশ্চুপ বসে আছে রুবাইয়্যাত আর আইজা।তুহফা তার সম বয়সী মেয়েদের সাথে কথা বলছে মৃদু হেসে হেসে।তারা হয়তো মিশ্মির পক্ষের গেস্ট।অভ্র কোথায় কে জানে।সুখ মায়ের পাশেই বসে রয় চুপটি করে।উপরে ঠিকঠাক অথচ ভেতরটা টিপটিপ করছে সমানতালে।

রূপকথার গল্পে রাজকুমারের মতো সকলের চোখে তাক লাগিয়ে বর এলো ঘোড়ার পিঠে চড়ে।উপর হতে গোলাপের পাপড়ি ছুঁড়া হলো, আতশবাজির আওয়াজে দূষিত হলো আশপাশ।তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো বর বেশে আসা বর্ণ’র মুখ পুরো ঢেকে গেছে টুপুরের পর্দার আড়ালে।মুখের উপর পাগড়ির সাথে সংযুক্ত ফুলের পর্দাতে থুতনির নিচ পর্যন্ত ঢেকে আছে।চেহারা দেখার উপায় নেই।গায়ে শেরওয়ানি।

কৌতুহলে পরিবেশে হৈ হুল্লোড় বাড়লো যেমন।মাহির সামলে নিলো কিছুটা।জানালো,

“ এটা বসের স্বপ্ন।তার রাজ্যের রাণীকে নিয়ে যাবে পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে। এবং বিয়ের পর রাণীই প্রথমে রাজার মুখ দর্শন করবে!তাই মুখ আড়াল করার এই পন্থা!”

নেট জগতে মূহুর্তেই ছড়িয়ে গেলো সংবাদ। শিরোনাম যেনো কিছু মূহুর্তের জন্য রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’র দখলে।

সুখ তাচ্ছিল্য হেসে না পাওয়ার আফসোসগুলো উড়িয়ে দেয়।একটু দূরে সরে আসে। কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করেন।

বর্ণ’র মুখে কবুল শুনে মিশ্মির কাছে গেলেন কাজী।কাগজে কলমে এবং শরীয়া বিধান অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হতেই মিশ্মির ঠোঁটে বিশ্বজয়ী হাসি ফুটে উঠে। অবশেষে সে জিতে নিয়েছে রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’কে!!

মিশ্মিকে বর্ণ’র পাশে এনে বসানো হলো।বরে’র মুখের পর্দা সরাবে মিশ্মি নিজ হাতে। একাধিক ক্যামারা তখন তাদের ঘিরে আছে। ফটোশুট হবে এখন। কৌতুহল, অস্থিরতায় মিশ্মির শরীর কম্পিত হচ্ছে। বর্ণকে স্বামী রূপে এই প্রথম দেখবে।কিছুটা লজ্জা মিশ্রিত হেসে দুহাতে মুখের পর্দা সরিয়ে অভ্যন্তরে লুকায়িত পুরুষটির মুখশ্রীতে নজর স্থাপিত করতেই তড়িৎ আদলের রঙ বদলে গেলো মিশ্মির। একঝাঁক হতভম্ব, আতঙ্কে তৎক্ষণাৎ “আআহ” শব্দচারণে চেঁচিয়ে উঠে পিছু ছিটকে পড়ে মেয়েটা। উপস্থিত সকলে’র চোখে বিষ্ময় হানা দিলো অবিলম্বে। এভাবে আঁতকে উঠলো কেনো মিশ্মি? পর্দার আড়ালে বর্ণ আছে তো?

#চলবে🕊️
[ রিডার্স মিশ্মি কী দেখেছে পর্দার আড়ালে?আহটের পোড়া থেঁতলে যাওয়া আত্মা নাকি ?]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here