আমার_বোবাফুল(৪৯.২) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
57

#আমার_বোবাফুল(৪৯.২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

৪৯–শেষার্ধ·
বিয়ের প্রয়োজনীয় যাবতীয় পণ্য সামগ্রী কিনতে রাত প্রায় নয়টা বেজে গেল।বাড়ি ফিরতে আরো দেড় ঘণ্টা।অতো রাতে ত্রিশাধিক বড় মাপের শপিং ব্যাগ খুলে খুলে সেসব দেখার মন মানসিকতা ছিল না কারো। অতঃপর যেভাবে গাড়ি থেকে নামিয়ে এনেছে সেভাবেই কোন এক রুমে রেখে দেয়া হয়। সকালে একত্রে বসে দেখবে সবাই।বাড়িতে মেহমান।রুশ্মিতা আর রাজবীর আগে-ভাগেই বিয়ে উপলক্ষে হাজির ।শুধু তারা নয়, আরো কাজিন এসেছে।

ড্রয়িং রুমে একে একে উপস্থিত হলো ছোট বড় সকলে।রুশ্মিতা, তুহফা, বীর, অভ্র ধরাধরি করে শপিং ব্যাগ তুলে আনছে।

‘ কই দেখি দেখি তাত্তাড়ি খোল রে।খুইলা নাতনির গায়ে জড়ায়ে দেখা.. দেখি কেমনডা লাগে তারে!’ —হানিফা বেগমকে বেশ উচ্ছ্বসিত মনে হলো। উৎসুক চেয়ে আছেন ব্যাগগুলোর দিকে।পারলে নিজেই টেনে হিঁচড়ে খুলে খুলে দেখতেন।তবে, তা যে অসম্ভব।নাতনি গুলো হয়েছে তার মতোই খিটখিটে।দেখা যাবে শপিং-য়ে দিতে গেলেই একেকজন ক্যাট ক্যাট করে উঠছে,

‘ বুড়ি হয়েছো.. সব রং ফুড়ুৎ। এবার এক কিনারে চুপচাপ বসে থাকো।আর আমাদের কাজ আমাদেরই করতে দাও!’

বজ্জাতি গুলো বুড়ি হয়েছে বলে পাত্তাই দিতে চায় না।আদবের বালাই-ই নাই। বেয়াদব গুলো!

শিকদার রা কেউই বাড়ি নেই। ইনভাইটেশন কার্ড নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন ব্রেকফাস্ট সেরেই। প্রথমে নিকটাত্মীয়দের বাড়ি যাবেন। এরপর বাকিদের।

বিয়েতে বেশি দেরি নেই।চার থেকে পাঁচদিনের মতো হাতে আছে খুব সম্ভবত।

সুখকে হানিফা বেগমের পাশে বসিয়েছেন। ঠোঁটের কিনারায় সস লেগে আছে।খানিক আগে রুবাইয়্যাত খাইয়ে দিয়েছেন। উপোস থাকার মনোবাসনায় খেতে চাইছিল না।আম্মু জোর করেছে পরে। খাবার নিয়ে তিনি আপোস করেননা কখনোই‌। মিনিট দুয়েক আগেই বাড়ি ছেড়ে কোথাও একটা বেরিয়েছে আম্মু।কে জানে গন্তব্য কতোদূরে। জিজ্ঞেস করা হয়নি।সুখের দুচোখের সাদা অংশ রক্তিম।রুশ্মিতা মজার ছলে জিজ্ঞেস করেছিল তা দেখে,

‘ চোখ লাল হয়ে ফোলে উঠেছে।রাতে খুব কেঁদেছিলে মনে হচ্ছে?’

অপ্রস্তুত হেসে এড়িয়ে গেছে সুখ। শুষ্ক সুখে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ফাহাকে টেক্সট দিল,

‘ আজি চলে আয়!’
‘ মাকে ফুঁসলিয়ে-ফাঁসলিয়ে রাজি করেছি বাট ভাইয়া কিছুতেই এতো তাড়াতাড়ি যেতে দিবে না।’ —ফাহার রিপ্লাই আসে।

‘ কোন ব্যাপার না।আব্বু ফিরলেই ভাইয়ার সাথে কথা বলিয়ে দেবো।দেখি কীভাবে আসতে বাঁধা দেয়।’

‘ ওখেই জানু.. থুড়ি কদিন পরেই তো অন্যকারো জানু হয়ে যাবি। তোকে এ-নামে ডাকার আর কোন অধিকারই থাকবে না রে আমার।’

মলিন মুখটা ঘন আঁধারে তৎক্ষণাৎ ঢেকে গেল সুখের। অন্তঃস্থলের কিছু একটা ছটফটে ব্যথায় কাতরে উঠে। ফোন অফ করে কোলের উপর রেখে, কপাল চেপে চোখ ঢেকে নিল দুহাতে।সেকি ভুল সিদ্ধান্তে অটল?তা ছাড়াও যে গতি নেই। কাউকে সারাজীবনের অপমান, অপদস্থ, দোনামোনা থেকে রেহাই দিতে এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত মনে হচ্ছে।যতো দুঃখ হোক, হৃদয়ে যতো রক্তক্ষরণ হোক, সে পিছু হটবে না।

মায়রা আসল শিকদার নিবাসে। তাকে পৌঁছে দিয়ে মেহরাব গেছে পাশের একটি হসপিটালে।আইজা তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে ছুটতে গেলে বাধাঁ দিল,

‘ আন্টি প্লিজ এমন তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। দু’দিন পর আমিও তো এই পরিবারেরই সদস্য হতে যাচ্ছি!’

‘ তাই বলে খালি মুখে থাকবে?’ — ভদ্রমহিলা তার নিষেধ না শুনেই রান্না ঘরে চলে গেলেন রামসা সহ।

মায়রা ড্রয়িং রুমে বসল বাকিদের সাথে। আগেই রুবাইয়্যাতকে ফোনে আসবে বলে রেখেছিল সে।তার অপেক্ষাতেই ছিল সবাই।এখনো শপিং খুলা হয়নি।

মীরাভকে পেয়ে নূরার খুশি দেখে কে?রুমে টেনেটুনে নিয়ে গিয়ে ছোট বেলাকার সব খেলনা বেডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে মীরাভকে মাঝে বসিয়ে দিল। রান্না বাটি খেলবে তারা।

‘ এবার তো একটা একটা দেখাও।তর সইছে না আমার।’ —রুশ্মিতা অস্থির চিত্তে সোফায় বসে ধপ করে।

তুহফার একহাত কোমরে।অন্য হাতের তর্জনীতে ঠোঁটে চাপড়ে বলল,

‘ আমি দেখাবো?ওখেই! প্রথমে কোনটা দিয়ে শুরু করবো, আপু তুমিই বলে দাও?’-মেহমানদের সমাদর করা একটা ভালো গুণ।তাই মায়রাকেই জিজ্ঞেস করল।সে হাসল মৃদু,

‘ তোমার যেমন ইচ্ছে!’
‘ প্রথমে বিয়ের লেহেঙ্গা দিয়ে স্ট্যার্ট করি।ওটা আমার বেশ লেগেছে!’

‘বিসমিল্লাহ’ বলে খুশি খুশি মনে ব্যাগ থেকে লেহেঙ্গার ওড়না এবং ওপরের অংশ মেলে রুশ্মিতাকে দিল। অব্যক্ত উল্লাসে চকচক করে উঠল তার চোখ।

তুহফা যেই না নিম্নাংশ হাতে নিয়ে মেলে ধরে ওমনিই চেঁচিয়ে উঠে,

‘ এ_এই এ্_এটা কী? কীভাবে সম্ভব!’ —আতকে উঠে আনমনেই সুখের দিকে ছুঁড়ে দেয় সেটা। চকিত হয় সুখ। হতবিহম্বল দৃষ্টি।

মায়রা চিন্তিত স্বরে জানতে চায়,

‘ হঠাৎ কী হলো!’

‘ নিজেই দেখে নে সুখ!’

অতিদ্রুত চোখের সামনে মেলে ধরে সুখ। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয় থম মেরে।হাতের তালু সমান গোল গোল গোলাকৃতির ছিদ্রে মাখো-মাখো পুরো লেহেঙ্গা।একটা দুটো নয়; অনেকগুলো। বেখেয়ালে ছিদ্র ভেদ নজর গেল লেহেঙ্গার ওপাশে। খানিক দূরে, সদর দরজায় বর্ণ হেলে দাঁড়িয়ে।কানে সেই হ্যাড ফোন।চোখ জোড়া এদিকেই। ঠোঁটে খেলা করছে ধূর্ত হাসি।ধীরে চোখের সামনে থেকে জামা নামিয়ে ভ্রু গুটিয়ে চাইল সুখ।সে তাকাতেই বর্ণ ঠোঁট চোকা করে মাথা চুলকে এগিয়ে আসে।

‘ এতো গুলো ছিদ্র কীভাবে হলো?দেখি দেখি সুখ?’

নিরবে মায়রার উদ্দেশ্যে লেহেঙ্গার নিচ অংশ এগিয়ে দেয় সুখ।হা হুতাশ করে উঠে হানিফা বেগম,

‘ কী অলুক্ষুণে কারবার। এখন বিয়াতে কী পড়বে?দ্যাখ তো বাকি জিনিস ঠিকঠাক আছে, না নাই!’

মায়রা সম্মতি দিল তাতে,
‘ দেখো তো তুফ?’

‘ কী ব্যাপার?সবার মুখের নকশার এই হাল কেনো?’ —দাদুর পাশে বসে গম্ভীর গলায় জানতে চাইল বর্ণ।তার বিপরীতে সুখ বসা।

মায়রা চিন্তিত মুখে লেহেঙ্গার বেহাল দশা দেখাতেই বর্ণ মুখের অভ্যন্তরে ‘চুক’ ‘চুক’ শব্দ তুলে বলল আফসোস মিশ্রিত কন্ঠে,

‘ ওহ্ নো! কী সর্বনাশ.. ফুল এটা গায়ে জড়াবি কী করে?জিনিসটা বেশ এট্রাক্টিভ ছিল।এমন নিষ্ঠুর কাজটি কোন ইঁদুরের দ্বারা
ঘটলো?’

সরু চোখে তাকিয়ে থাকে সুখ। হিসেব মিলাচ্ছে।বর্ণ আড়চোখে একপল দেখে ফোনের স্ক্রিনে নজর ডুবায়।

তুহফা আর রুশ্মিতা একে একে কতক প্যাকেট চেক করল।নাহ, সব ঠিকঠাক। শুধু বিয়ের লেহেঙ্গারই এমন অবস্থা।

মায়রা সন্দিহান গলায় বলল,

‘ সত্যিই কী এটা ইঁদুরের কারসাজি?
নাকি..’ —ভালো করে লেহেঙ্গা নেড়েচেড়ে তীক্ষ্ণ খেয়ালে পরখ করে।কাঁচির কাটা মনে হচ্ছে, আবার মনে হচ্ছে সত্যিই কোন ইঁদুরের কাজ।তবে.. খটকা একটা রয়েই যায়।

রুশ্মিতা ইঁদুরে ভয় পায় প্রচন্ড।ছোট কালে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে একবার পায়ে খামচে দিয়েছিল সেই-থেকেই।মায়রার মুখে ইঁদুরের নাম শুনে এক লাফে সোফায় উঠে অভ্রর পিঠের শার্ট খামচে ধরল।

‘ তোমাদের বাড়ি ইঁদুর আছে কখনো বলো নি তো!’

গোঙিয়ে উঠে অভ্র। হাঁটুর বারি দিয়ে পিঠের হাড্ডি হাড্ডির জায়গায় রাখেনি বোধহয় রুশ্মিতা। লেহেঙ্গার ছিদ্র গুনছিলো সে।চোখ রাঙিয়ে একবার পিছু ফিরে রুশ্মিতাকে দেখে ব্যাথাতুর মুখশ্রীতে বলল,

‘ ছিদ্র সংখ্যা মোট ছত্রিশ.. মারহাবা’

এমন ছিদ্র ওয়ালা আরো একটি শাড়ি পাওয়া গেছে।এই শাড়িও মেহরাবের পছন্দসই নেওয়া হয়েছিল।

মায়রা এবার অল্পবিস্তর বিশ্বাস করল এটি হয়তো কোন ইঁদুরের কাজ। কিন্তু মনের খটকা দূর হয়না।

‘ এবার কী হবে?’ —তুহফা বলল হতাশ সুরে।

‘ কী আর করার?বিয়ের লেহেঙ্গা আবার কিনতে হবে!’


‘সুখনীড়’ –একটি আশ্রমের নাম।জেলার পাশ ঘেঁষে আশ্রমটি অবস্থিত।এর পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে সাইমা।এটিই ছিল তার বেড়ে উঠার মাধ্যম। এখানেই তার শৈশব কৈশোরের কতো শতো স্মৃতি বিজড়িত। শিকদার নিবাস থেকে বেরিয়ে পুণরায় যেদিন এখানে পা রেখেছিল তখন জানতে পারে তার একসময়ের উৎকৃষ্ট অভিভাবক পরিচালিকা মাতা এখন শয্যাশায়ী।তাকে দেখে সেদিন কতো যে নিরবে চোখের পানি ঝরিয়েছিল সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধা।তবে তিনি কথা বলতে পারেননা।

আশ্রমের পরিচালিকার পাশাপাশি সাইমার আরো একটি পরিচয় আছে এখন।সে একজন শিক্ষিকা।যেই সার্টিফিকেট গুলো একদিন আগুনে পুড়ে ছাই করেছিল, পুণরায় সেসব আজ তার হাতের নাগালে।আসফিয়ান বর্ণ’র বদৌলতে এটা সহজ হয়েছিল।

প্রতি মাসের আটাশ তারিখ রুবাইয়্যাতের পক্ষ থেকে একাউন্টে ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার করে ঢুকে তার। এসব সে নিজের জন্য খরচ করেনি কোনদিন। আশ্রমের কাজে লাগায়। শিক্ষিকা হওয়ার বিনিময়ে যা সম্মানি পায়, তাতেই তার চলে যায় দিন। অবশ্য, এই চাকরি পাওয়ার পেছনেও বর্ণ’র হাত ছিল।সেটা সে না জানালেও, সাইমা বুঝতে পারে।ওই বাড়ির প্রত্যেকের প্রতি সে কৃতজ্ঞ।

রুবাইয়্যাত আর সাইমা মুখোমুখি বসে। চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয় সাইমা,

‘ নেন না ভাবী।’

রুবাইয়্যাত নিল কাপটা।চুমুক বসায় ধীরে। আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে পর্যবেক্ষণ করে।দুটো রুম আর ছোট একটা কিচেন ব্যবস্থা আছে।সাইমার একার জন্য এতোটাই যথেষ্ট।

‘ কেমন আছো?’ — ছোট একটা প্রশ্ন। অথচ এর উত্তর খুঁজে বের করা অসম্ভব কঠিন।

সাইমা অল্প ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসল। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জবাব দিল,

‘ এইতো,কোন রকম দিন চলে যাচ্ছে।’

নজর স্থির করল রুবাইয়্যাত। অপরাধ বোধ তারও হয় প্রতিনিয়ত। কিন্তু মাতৃ হৃদয়ের তৃপ্তির জন্য সাইমাকে নিজেদের থেকে দূরে না সরিয়ে দিলে হতো না।

‘ মেয়ের বিয়ে হবে জানো তো?’

না জেনে উপায় আছে?রোজ চোখ মুখ ঢেকে চোরের মত নিয়ম করে একবার শিকদার নিবাসের আশেপাশে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার।যদি একপলক হলেও মেয়েটার দেখা পায়।

বলল,
‘ সেদিনের ছোট্ট সুখ পাখিটা আজ বিয়ের উপযুক্ত। কী অদ্ভুত তাই না?’

‘ হুম.. অদ্ভুতই বটে!’ — রুবাইয়্যাত উদাসিন হয়। সুখকে আকারে ইঙ্গিতে কতোবার বুঝাতে চাইলো তাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে আম্মুর।মন পুড়বে। কিন্তু মেয়েটা যে কঠিন প্রতিজ্ঞায় যেন আবদ্ধ।বিয়ে সে করবেই।

‘ আজই চলো আমার সাথে। বিয়ের কাজে তুমি না থাকলে আমার অপরাধ বোধ দ্বিগুণ বাড়বে!’

মলিন হাসে সাইমা। সাথে কিঞ্চিৎ অবাক হয়,
‘ ও বাড়ি যেতে আপনি আমাকে বলছেন,ভাবী?’

‘ বলছি!তবে সুখ যেন…’

পরবর্তী বাক্য কেমন হবে সাইমা জানে।আগ বাড়িয়ে সে নিজে থেকেই বলল,

‘ বিশ্বাস রাখতে পারেন,সত্যিটা তাকে কখনো বলবো না।আমি জানি সেই যন্ত্রণাময় সত্যি শুনার সামর্থ্য কোমল মেয়েটার নেই।সে নিজে যেমন ভেঙে পড়বে তেমনি আমাকেও হয়তো ঘৃণা করবে। যেভাবে আমি আমার জন্মদাতা পিতাকে করি।’

‘ আমি দুঃখিত, তোমাকে সরে আসতে বাধ্য করে…!’

‘ না ভাবী।ভুলটা আমিই করেছি।আর এটাই তার শাস্তি আমরণের।’

‘ সেই ভুলের জন্য আজ তোমার কাছে হাজার বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেও আমার দ্বিধা হবে না,সাইমা। ভুলটা করেছিলে বলেই মাতৃত্বের সাধ গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
নয়তো..’ —বিশাল এক দীর্ঘ শ্বাস। রুবাইয়্যাত ফের প্রশ্ন করে,

‘ স্নেহের দৃষ্টিতে তুমি একবার সুখের দিকে তাকালেও আমি সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। হিংসে হয় প্রচন্ড।মনে হয় বুকের ভেতর কিছু পুড়ে ছারখার হচ্ছে। অথচ তুমি আমাকে কীভাবে সহ্য করো?’ —প্রশ্নটি অত্যন্ত কঠিন ছিল।সাইমা ঠোঁট কামড়ে মাথা নামিয়ে নেয়। জবাব দিতে পারে না।চোখে চশমা ঠেলে ঝাপসা চোখ লুকোনোর চেষ্টা করে। সেদিন হসপিটালে টেস্ট করতে গিয়ে চোখে সমস্যা ধরা পড়েছে।এখন চশমা পড়তে হয় তাকে।


‘ লেহেঙ্গা আপনি কেটেছেন?’ — সুখের চোখে মুখে রাগের ছড়াছড়ি।

বর্ণ দেখেও দেখলো না তাকে।এমন ভাব নিয়েই মাথার উপরিভাগ দখল করে একান-ওকান টানা দেওয়া হ্যাড ফোন গেঁথে হেলেদুলে হেঁটে গেলো সামনে।রাগে, দুঃখে চোখে জল এলো সুখের। যেচে পড়ে খারাপ পুরুষটার সাথে কেনো যে কথা বলতে গেল, ভেবেই নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হয়। ফোঁস ফোঁস শ্বাস ছেড়ে ক্ষুব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো স্থির।রাগের তোড়ে মেজাজ ধপ ধপ করছে।

আচমকা হাঁটা থামিয়ে দেয় বর্ণ।দুহাতে চুলে ব্যাকব্রাশ করে আড়চোখে পাশে সুখকে না দেখতে পেয়ে হুট করে পিছু ঘুরে গেল চোখ উল্টে।

“ Tumhare masth akhone…
Iye keisa Haal kardaala…
Iye Dil chiz Kiya hai«
Mang lo tho Jaan denge hum ”

অসভ্যের মতো ঘাড় বাঁকিয়ে সুর টেনে গানটা গেয়ে বর্ণ বলল কানের গোড়ায় হাত আটকে কান পাতার ভান করে,

‘ কিছু একটা বলছিলি তখন?বুঝতে পারিনি জানেমান!’

জান.. জানেমান। কীসব অশ্লীল শব্দ। সেদিন বার বার নিষেধের পর থেকে এখন কথায় কথায় এই শব্দগুলোই আওড়ায় অসভ্যটা। তেড়ে আসার গতিতে এগিয়ে এলো সুখ। মুখে অসন্তোষ নিয়ে পরপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘ আপনার সাথে কথা বলাটাই বেকার!’
‘ আরে..আরে.. রেগে যাচ্ছিস কেনো?দেখতে পাইনি বললাম তো!’ —মুখটাতে অপরাধী ভাব ফুটিয়ে তুলল।

পিচ্চি জ্বলে উঠলো যেন সুখের।নাটকবাজ একটা।

‘ লেহেঙ্গা কেনো কেটেছেন?’
‘ আমি!’ —আশ্চর্যের শীর্ষে পৌঁছাল বর্ণ,-‘ বিয়ের আনন্দে ডুবে-মরে ইঁদুরের সাথে মেইবি আমাকে গুলিয়ে ফেলছিস তুই। সুইটহার্ট, আমি এতোটাও নিচ নই যতোটা তুই ভাবছিস!’ —ঠাস করে এক চোখ টিপ দিল শেষে।

‘ আপনিই এমনটা করেছেন। আমি খুব ভালো করেই জানি!’

‘ আমার উপর এতোটা বিশ্বাস দেখে হৃদয়টা প্রফুল্ল হয়ে গেল জান।ট্রুলি..’

চোখ বুজে মুঠোবন্দী দুহাত চোখের সামনে এনে রাগ সংবরণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা চালায় সুখ। হুটহাট চোখ মেলে বর্ণ কে রেখেই এগিয়ে গেল সামনে। এর সাথে কথা বলাটাই ভুল।

আপন জায়গাতেই দাঁড়িয়ে তার গতি পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে কাঁধ দুলাল বর্ণ। আকম্মাৎ বাঁ হাতের তর্জনীতে কপাল চুলকে বিড়বিড় করল,

‘ রাগলে তোকে তো স্ট্রবেরির মতো লাগে জানেমান!কখনো খেয়াল করা হয়নি আগে!ছ্যাহ, বিরাট কিছু মিস করে গেলাম।’ —বলেই দ্রুত কদম বাড়াল।পাশ কাটিয়ে যাওয়া মাঝে
হুট করে পিছিয়ে এসে পাশাপাশি হয়।
ক্ষিপ্র বাঘিনীর মতো চেয়ে থাকা সুখের চোখে চোখ রেখে ঘায়েল হওয়ার মতো সুর টেনে গেয়ে উঠল—-

“ Palat ke ishq ki galiyon SE Jaana hai bada mushkil…

বুকে হাত চাপে পরপর,
Dil galthi Kar betaa hai…
galthi Kar betaa hai Dil ”

সুখ থেমে গেল। তড়িঘড়ি করে ঠোঁটে হাত চেপে অন্যত্র ঘুরে গেল।বর্ণ স্থির থাকে সেকেন্ড কয়েক। এরপর ঘুরে সুখের মুখের দিকের দেয়ালে হেলান দিল ঝটপট।

‘ হাসছিলিস?’

ঠোঁটে আলতো হাত চেপে পরখ করে নিল। অতঃপর শক্ত চোয়ালে জবাব করল সুখ,

‘ নেভার!’

ছোট ছোট চোখে ঠোঁট গোল করে বর্ণ বলল,

‘ ন্যাওটা বানিয়ে পিছু ঘুরাতে পেরে খুউ_ব এনজয় করছিস, না?’

‘ ঘুরতে কে বলেছে?আমি?’
‘ আমি খোদ মন মার্জির মালিক।তোর ইশারায় ঘুরতে যাবো কোন দুঃখে?’ — ঠোঁট বাঁকাল সে। ইচ্ছে করেই বলল কথাটি।ফুলের রাগে পেট্রোল ঢালতে।

‘ কী করো?’ —দু শব্দের একটা মেসেজ।এসেছে মেহরাবের নাম্বার থেকে। গত রাত আনব্লক তো হয়েছে আপনাআপনি কিন্তু… মেসেজের রিপ্লাই সে দেওয়ার আগে আগেই হয়ে যাচ্ছে।মানে যা তা অবস্থা..

‘ বর্ণ ভাইয়ের সাথে!’ — সে জবাব সেন্ট করার আগেই বাক্যটা রিপ্লে হয়ে গেল। অথচ এমন কিছু তার কল্পনাতেও ছিল না। চোখ তুলে দেখলো বর্ণ’ নিম্নাষ্ঠ দাঁতে চেপে ফোনে কী যেন টাইপ করছে।মানে..

উত্তপ্ত মেজাজে কিছু বলতে উদ্যত হয় সুখ। সেসময় কলিং বেলের মৃদু শব্দ কানে এসে লাগে। সেকন্ড ফ্লোরের করিডোরে আছে তারা।বর্ণ হুট করে চোখ তুলল। গম্ভীর হয় কন্ঠ,

‘ তোর নামে পার্সেল এসেছে।গিয়ে রিসিভ কর!’

#চলবে🥀

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here