#আমার_বোবাফুল(৫০.১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
||৫০—প্রথমার্ধ•বিবাহ স্প্যাশাল||
বিকেল গড়ালেই রাতে হলুদ অনুষ্ঠান। নিবাসেই আয়োজন করা হবে।সুখের ইচ্ছেতেই। পাঁচ তলা উঁচু নিবাস ঝিকিমিকি করছে রূপালি ঝিনুক বাতিতে। অবশ্য দিনের আলোতে ঝিকিমিকি ততোটা দৃশ্যমান নয়।আর্টিফিশিয়াল ফুল, লাইটিং,রঙিন কাপড়ে পুরো বাড়ি সজ্জিত।এ যেন রূপকথার কোন রাজ্য। অতিথি আসা শুরু করে দিয়েছে ইতোমধ্যে। পাঁচ পাঁচটি ফ্লোরই আজ পরিপূর্ণ।কোন কক্ষ খালি নেই। দীর্ঘ বছর পর ইট-পাথরে গড়া বাড়িটাও যেন ধন্য হলো শিকদারদের কাজে আসতে পেরে।
দরজায় খিল দিয়ে নিজের রুমে সুখ। সকাল থেকে কিছু খায়নি। আম্মুর জোরাজুরি অগ্রাহ্য করেছে আজ।বেডে ছড়িয়ে আছে এ্যাশ কালার ঝকমকে পাথরের প্রিন্সেস গাউনটি।যেটা বর্ণর পছন্দ বলে উপেক্ষা করেছিল মলে।এটিই পার্সেল এসেছিল সেদিন সুখের নামে।ডেলিভারি দিতে এসেছিল কোন মহিলা।এটা দেখার পর বিয়ের লেহেঙ্গা নষ্ট হয়ে যাওয়ার শোক নিমেষেই ভুলে বসেছিল সকলে। এমনকি মায়রাও ভীষণ পছন্দ করেছে।
কাঁপা হাতে গাউনটিতে হাত বুলিয়ে দেয় সুখ। ঠোঁট কামড়ে ধরে দাঁতের নিচে পিষ্ট করে। ফোনে অনবরত কল আসছে। নাম্বারটা আননোন। আজকের দিনে এসবে কোনো আগ্রহ নেই তার।সুইচ অফ করে দিতে গিয়েও কী মনে করে শেষ কলটা রিসিভ করে কানে তুললো। এমনিতেই, হুটহাট মন চাইল রিসিভ করে ওপাশে কে আছে জানতে।
‘ হ্যালো সুইটহার্ট… ইয়্যু হেয়ার মি?আমি তোর আশিক দিওয়ানা বলছি!’
কান থেকে ফোন নামাল না সুখ।কেটেও দিল না।কানে চেপে চোখ বুজল আবেশে।কন্ঠটা তার খুব চেনা।
বর্ণ ইজি চেয়ারে দুলছে।হাতে স্মাইলি বল। উভয়পক্ষের নিরবতায় কেবল নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ শুনছে দুজন। দরজা হালকা ভিড়িয়ে রাখা।ঠিক কিনারে একজোড়া পায়ের ছায়া দেখা যায়।ছায়াটা মাহিরের।মাথায় হাত দিয়ে আহাম্মকের মতো কান পেতে আছে।সবে রিহার্সাল থেকে বেরিয়ে এসেছে বর্ণ। সচরাচর জবাবদিহিতার ব্যাপারটা তার জবানে না মিললেও আজ নিজ উদ্যোগে বলে এসেছে —তার ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে।তার তড়িঘড়ি দেখে অত্যন্ত ভয়ে ছিল মাহির। কোথাও বিপদ হলো নাতো কারো?অথবা কোন বোম ব্লাস্ট?তাইতো নিজেও ছুটে এসেছিল পিছু।অথচ দেখো কান্ড! ফ্ল্যাটে এসে সুইটহার্টকে কলে দিওয়ানা গিরি দেখাচ্ছে।
মাহির মুখটা এমনভাবে কুচকায়, যেভাবে দুধের শিশুর মুখে টক ঢেলে দিলে এক্সপ্রেশন দেয়।ভাবতে লাগল –প্রেমে পড়লে কঠোর হৃদয়ে গড়া মানুষেরও এমন অধঃপতন সম্ভব?হয়তো! চোখের সামনেই জলজ্যান্ত প্রমাণ!তবে, এই দিওয়ানা বর্ণ’র জন্য ভীষণ মায়া হচ্ছে মাহিরের।একটু আধটু হিংসেও কাজ করছে বেচারি সুখের প্রতি। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, আজ বাদে কাল সুখের বিয়ে অথচ বস এতোটা ঠান্ডা মস্তিষ্কে কীভাবে বসে?
‘ পার্মিশন ছাড়া কারো প্রাইভেসিতে কান পাতা ব্যাড ম্যানার্স,জানিস সেটা?’ —কড়কড়ে স্বরটা রুমের ভেতর থেকে ভেসে এসেছে।মাহির বোকা হাসল। দরজার নবে হাত রেখে মুখটা উঁকি দেওয়ার মতো বাড়িয়ে বলল,
‘ বস কথাটা আমাকে বললেন?’
‘ পাশে তুই ছাড়া দ্বিতীয় কেউ আছে!’
‘ নো বস… !’
বর্ণ’র মুখশ্রী শীতল।রাগ কিংবা অসন্তুষ্টির কোন আভা নেই, -‘ ফ্ল্যাট ছেড়ে এই মুহূর্তে ত্রিসীমানা থেকে যেতে পারিস! তোকে আপাতত আর কোন কাজে লাগছে না আমার’
মাহির এক কথায় মেনে নিল। বেরিয়ে আসার আগে ফের বলল,
‘ বেয়ার, ওয়াইন, সিগারেট কিছু লাগবে বস?’
‘ এসবের প্রয়োজন পড়তে পারে,কেনো মনে হলো?’ —সরু চোখে চায় বর্ণ। ঈষৎ হেসে মাথা চুলকায় মাহির।বলে,
‘ ওই আরকি.. মনে হলো!’
‘ আউট!’ —আকম্মাৎ ধমকে মাহির টু শব্দ না করে দ্রুত পদে বেরিয়ে গেল । আজকাল মানুষের উপকার করতে নেই। প্রায় পাঁচ-ছয়দিন হলো এসবের ধারে কাছে যাচ্ছে না বস।তাই তো সেধে সেধে জানতে চাইছিল।
•
‘ফুল… এ্যাই বোবাফুল!শুনতে পাচ্ছিস আমায়?’
এই নেশাক্ত স্বর, আবেগী কন্ঠ; সুখ নিতে পারছে না। শ্বাস-প্রশ্বাসে উদ্বেগ বেড়ে চলেছে আপনা-আপনি।ধফ করে চোখ বুজে নেয় সে। শ্বাসকষ্ট রুগীর মতো বক্ষস্থল উঠানামা করছে ক্রমাগত।
‘ ওপেন ইয়্যুর আইস মাই ফ্লাওয়ার কুইন!’
হুট করে ঝটপট চোখ মেলে সুখ। চকিতে আশেপাশে নজর ছিটায়।সে চোখ বুজেছিল, লোকটা কীভাবে জানল?
‘ আয়নায় তাকা!’ —ওপাশ থেকে বর্ণ’র কন্ঠে পুণরায় বেজে উঠে।সুখ বাধ্য মেয়ের মতো অদূরের আয়নায় নজর রাখে।তার ফ্যাকাশে প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে সেখানে।
‘ বুকে হাত রাখ!’
কথাগুলো যেনো তাকে সম্মোহিত করছিল। অবচেতন মনেই সুখ বুকে কম্পিত ডান হাতটা রাখে। অনুভূত হয় অ-তৃপ্ত হৃদয়ের চঞ্চলতা।যেনো বড্ড তৃষ্ণায় কাতরাচ্ছে সেটা।
‘ বুকে যন্ত্রনা বেশি? হৃদস্পন্দন ছুটছে ক্রমশ?বলতে পারিস হৃদয়ের ওই অবাধ্য স্পন্দন কার নামে ছটপট করছে?’
আর সইতে পারে না সুখ। শরীর কাঁপছে থরথর। বিড়বিড় করে নিঃশব্দে,
‘ আমায় দূর্বল করে দিতে চান আসফিয়ান বর্ণ?নেভার.. আমি আর দূর্বল হবো না।কেনো বুঝতে চাইছেন না; আমি সেই সুখ আর নেই,যে আপনার প্রেমে মাতোয়ারা ছিল।আমি বদলে নিয়েছি নিজেকে।অনেক… অনেকটা!কেনো দেখেও দেখছেন না? ’
•
দ্বার ধাক্কিয়ে সুখকে বের করল তুহফা,রুশ্মিতা, ইবরাত সহ আরো কজন কাজিন। তাদের সঙ্গে ফাহাও রয়েছে। গতকালই চলে এসেছিল সে তামিজ সাহেবের সুপারিশে।
বাড়ির ভেতরকার সিঁড়ি থেকে শুরু করে রেলিং সহ প্রতিটি কক্ষ ঝিনুক বাতি,ফুলে, রঙিন কাপড়ে নতুন রূপে সজ্জিত। ফ্যালফ্যাল চোখে সেসব দেখতে দেখতে নিচে নামে সুখ। অতিথি সামাল দিতে খালামনিরা সব মহাব্যস্ত। রুবাইয়্যাত, আইজার পা দুটো একস্থানে স্থির নেই বললেই চলে। এদিক থেকে ওদিক ছুটছেন কেবলি।
হানিফা বেগম সকাল থেকেই নতুন শাড়ি পড়ে একদম ফিটফাট।শাড়িটা কাল রাতেই এনে বৃদ্ধার হাতে তুলে দিয়েছেন আযাদ সাহেব।যদিও সুখের বিয়ে উপলক্ষে নাজ্জামাইয়ের তরফ থেকে সুন্দর দেখতে একখানা শাড়ি উপহার পেয়েছেন।সেটা নাকি বিয়ের দিনই পড়বেন এবং পণ করেছেন এই শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নাতিদের সাথে গেইট ও ধরবেন।
‘ মন খারাপ?’
দাদু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনে সুখ। একজন ভদ্রমহিলা হাসিমুখে দাঁড়িয়েছে সামনে। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা।ঝকঝকে খয়েরী পাড়ের ধূসর রঙা শাড়ির উপর দু কাঁধে চাদর জড়িয়ে।সাইমা বুয়া… মাস খানেক আগে এ-বাড়ি থেকে বুয়ার কাজ থেকে ছুটি নিয়ে এখন শিক্ষকতাকে বেঁচে নিয়েছেন।গত পরশু এমনটাই শুনেছে সুখ।আর আশ্চর্যের শীর্ষে পৌঁছেছে।
ঠোঁটে হাসি টেনে সুখ জবাব করে নিজস্ব ভাষায়,
‘ ব্যাস একটু!’
কেমন করে যেন তাকিয়ে রইলেন ভদ্রমহিলা। হ্যাঁ ,ভদ্রমহিলা-ই। এখন তাকে বুয়া বললেও পাপ হবে এমন সাজেই সাইমা বুয়া তার সামনে দাঁড়িয়ে।
‘ বাবার বাড়ি ছেড়ে শশুর বাড়ি পাড়ি দিতে এমন একটু মন খারাপ হয়ই। সময়ের সাথে সাথে সেসব মিলিয়েও যায়। চিন্তা করোনা সবকিছু ভালো হবে, প্রার্থনা করি!’
সুখ শুধু হাসল মলিন।তার উপরের রূপ দেখে কেউ বুঝতেও পারছে না ভেতরের তাণ্ডব। অবশ্য বুঝার কথাও নয়।
কাল রাত থেকে বর্ণ বাড়ি ফিরেনি।তবে, মাহিরকে পাঠিয়ে দিয়েছে সময় মতো।সাথে সিয়াম,তামিম এবং জিসান সহ আরো অনেকে।ছেলের উপর অসন্তুষ্ট হতে গিয়েও হলেন না আযাদ সাহেব। আজকের দিনেও এতো কীসের ব্যস্ততা তার?
ডেকোরেশনের লোকদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে মাহির। ভীষণ মনোযোগে। ক্ষণে ক্ষণে কী যেন লিখছে খাতায়।পড়নে কালো পাঞ্জাবি।হাতা কুনুই অব্দি গুটানো।উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মাহিরকে কালো রংটা যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে।আড়াল থেকে একদৃষ্টে তার কার্যকলাপ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তুহফা।দু চোখের দ্যুতি ছড়ানো মণিদ্বয় অবলোকন করেই বুঝা যায়, সে কতোটা বিমোহিত।
হাতের পাতায় খাতা মেলে চোখের সামনে ধরে মাহির। কিছু একটা লিখতে গিয়েও কলমের নিপ কামড়ে অল্পক্ষণ কপাল কুঁচকে থম মেরে রইল। এরপর পকেট থেকে ফোন বার করে কীবোর্ড চেপে কী যেন লিখে, নির্দিষ্ট নাম্বারে পাঠিয়ে দিল।
‘ এভাবে চেয়ে থাকলে নজর লেগে যাবে।একটু কম কম তাকিও! অস্বস্তিতে পড়ে যাই তো!’
মাহিরের নম্বর থেকে আসা টেক্সট খানা দেখেই শিরদাঁড়া শিরশির করে উঠল।ঢোক গিলল তুহফা।তার সামনে লম্বালম্বি কাঁচা ফুলের দেওয়াল।ওধার থেকে এধার ঠাহর করা মুশকিল ব্যাপার।তবু, মানুষটা কীভাবে জানল –সে তাকিয়ে আছে বেহায়ার মতো? তড়িঘড়ি করে পালিয়ে আসার তাগিদে পিছু ঘুরতেই ঘটে আরেক বিপত্তি।
বুকে হাত চেপে সুখ দাঁড়িয়ে।আজ বোধহয় নিস্তার নেই।
‘ ক_কী? এভাবে চেয়ে আছিস যে?’ —মেকি হাসার চেষ্টা করল অল্প।সুখ ইশারায় কিছু বলল।যার অর্থ,
‘ তাকে অনেক ভালোবাসো তাই না?’
লজ্জায় দুগালে আবিরের মেলা বসে তুহফার। দুহাতে ফোন নেড়েচেড়ে হাঁসফাঁস করে উঠে। তাকে এই যাত্রায় বাঁচিয়ে নিতে ছুটে এলো রাইসা আর ফাহা।
‘ আরে কনে সাহেবা!তোকে খুঁজতে পুরো বাড়ি চষে বেড়াচ্ছি আমরা।আর তুই এখানে?চল…চল…’
•
বিউটিশিয়ান এসে পৌঁছেছে। সুখের রুমে হুরহুর করে ভিড় জমে নিমেষেই।সব সম বয়সী কাজিন।তুহফা নিজের কক্ষে কাউকে প্রবেশ করতে দেবে না।তাই বেরোনোর সাথে সাথেই তালাবদ্ধ করে রেখেছিল সেই সকালে। সুখের হাতে মেহেদি পড়ানো হচ্ছে। এরপর তুহফার পালা। অপেক্ষা করতে হবে কিছুক্ষণ।সে ছুটল নিজ কক্ষে। গোসল দেবে।
গোসল সেরে তাওয়ালে চুল পেছাতে পেছাতে আয়নার সামনে গিয়ে থামে।শীতে ঠকঠক গা কাঁপছে। মুখের চোয়ালটাও থরথর করছে সেই কাঁপুনিতে।নজর গেল ড্রেসিং টেবিলের এক প্রান্তে।একটা শপিং ব্যাগ চোখে পড়ে।লঘু দেখেই বোঝা যাচ্ছে —এটা সুখের বিয়ের কেনাকাটা করা মলের। কৌতুহল বশত প্যাকেটটা হাতে নিল সে। এরপর বেডে গিয়ে বসল। ভেতরের জিনিস আন-প্যাক করেই স্তম্ভিত হয় তুহফা।সেই শাড়িটা, যেটা সে ছুঁয়েছিল কিন্তু নেয়নি।এটা…এখানে কীভাবে এলো?কে রেখেছে?কে!
•
‘ আর খাবো না আম্মু!’
‘ কোন কথা হবে না!খালি পেটে আর কতোক্ষণ? সকাল থেকে কিছুই মুখে তুলোনি,মনে আছে?’
সুখের অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখে খাবার পুরে দিলেন রুবাইয়্যাত। দু’পাশে দুজন মেহেদী আর্টিস্ট। সুখের হাতে মেহেদী পড়িয়ে দিচ্ছে। প্রায়ই শেষের দিকে।
দুহাত ভর্তি গাঢ় মেহেদীর রঙ। কব্জিতে বেলী,গোলাপের চুড়ি। শরীরে হলুদ এবং সবুজের মিশেলে হলুদ অনুষ্ঠানের উপযোগী পোশাক। মুখে ভারী মেকআপের প্রলেপ।মাথার উপরিভাগ থেকে পিঠে ছড়িয়ে আছে ঘোমটা।কানে,গলায় কাঁচা ফুলের গহনা। সিঁথিতে ফুলের টিকলি। সুখকে এমন সাজে অপরূপা লাগছে।তামিজ সাহেব মেয়ের মুখটা হাতের আঁজলায় করলেন। ঠোঁট কামড়ে ধরে সুখ। চোখে পানি চিকচিক করছে।
‘ রাজকন্যা…
এতো নয় রূপকথারি গল্প,
সূর্য উদয়ের মতো সত্য।
রাজা নেই, রাণীও নেই;
নেই-কো রাজত্ব!’
সুখ অশ্রুসিক্ত চোখে ঠোঁট কামড়ে প্রতিবাদ করল আব্বুর।আম্মু-আব্বু দু’জনকেই দু’পাশে জড়িয়ে বুঝাল,
‘ এইতো রাজা আর রাণী।আর আমি তাদের একমাত্র রাজকন্যা!’
কক্ষ থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলো সাইমা। আড়ালে গিয়ে চোখের অশ্রু মুছে হাসার চেষ্টা করে।দোয়া করলেন, সুখের এই সুখে যেনো দুঃখরা কখনো উঁকি না দেয়।
‘ হয়েছে তোমাদের?অনেক তো কেঁদেছো।আমরা কী ছবি তুলব না?’ —কোমরে হাত চেপে গুরুগম্ভীর গলায় বলল নূরা।
‘ এ্যাই নূরা বুড়ি।মুখ অফ রাখ কিছু সময়ের জন্য!’
‘ না.. আমি আর আমার ফ্রেন্ডস সেই কখন থেকে অপেক্ষায় আছি সুখের সাথে ছবি তুলব বলে!’
সাহসাই কয়েক জোড়া দৃষ্টি তাদের ঘিরে ধরে।নূরা’র সাইজের আরো চার-পাঁচ জন একত্রে।তামিজ সাহেব হেসে ফেললেন।নূরাকে টেনে সুখের পাশে এনে বললেন,
‘ কান্নাকাটি শেষ।তোমাদের ছবি তুলতে এখন আর কোন বাঁধা নেই!’
সুখের চোখে তখনো অশ্রু গড়াচ্ছে।হঠাৎ রুশ্মিতা বলল হড়বড় করে,
‘ সুখ সাজ খারাপ হয়ে যাবে।আর কাঁদে না মা। স্টেজে যাওয়া, ফটোশুট এখনো বাকি!’
•
সুইমিং পুলে গোলাপের পাপড়ির আস্তরণ।তাতে খানিক অন্তর-অন্তর ভাসমান স্টিলের বাটিতে মোমের নম্র আলো জ্বলছে। গার্ডেনের গাছগুলো সব ঝিকিমিকি করছে ঝিনুক বাতিতে। সন্ধ্যা নেমে আসায় প্রতিটি দৃশ্যপট ভীষণ…ভীষণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এখন।পুলের উত্তর পাশে খোলা মাঠের মতো জায়গাটায় প্রকাণ্ড স্টেজ তৈরি হয়েছে।
সাউন্ড সিস্টেম চলছে মৃদু গানের ঝংকারে।সুখকে আনা হচ্ছে স্টেজে।মাথার উপর হাত উঁচিয়ে চারপাশ থেকে বিশাল বড় ঘোমটা ধরে রেখেছে রাজবীর, অভ্র, তৌকির, তাশরিক। মধ্যখানে সুখ হেঁটে আসছে ধীর পায়ে। দু’পাশ এবং পিছু সকল মেয়ে কাজিনরা। আকাশে আতশবাজি ফাটানো হচ্ছে অদূরে।হৈ হৈ রৈ রৈ পরিবেশ।বাজির শব্দে ছোট অনেক বাচ্চা স্বর কেঁদে উঠে।মাহির ও জিসান ছুটে গেলো বাজি ফাটাতে নিষেধ করতে।
আশ্চর্য-মণ্ডিত কাণ্ড ঘটে গেছে।এতো এতো আয়োজনের মাঝে ক্যামেরা ম্যান আনা হয়নি। হয়নি বললে ভুল হবে, হয়েছিল তবে…পরবর্তীতে তাদের নিষিদ্ধ করে দিয়েছে আসফিয়ান বর্ণ নামের কেউ।তবে এই মূহুর্তে ক্যামেরা ম্যানের অভাব নেই বললেই চলে।অভ্র, মাহির, জিসানের হাতে একেকটা ক্যামেরা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবং ফটোশুট চলছে পুরোদমে।
বর্ণকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও।কতো জনে,কতো কী যে বলছে এই নিয়ে।
হুটহাট আলো নিভে গেল সব। একেবারে আঁধারে তলিয়ে গেল। শুধু রয়ে গেল চাঁদ থেকে ছিটকে আসা নম্র আলোক রশ্মি।
সেকেন্ডে বিশেক পর…
ফের জ্বলে উঠলো স্টেজের মুখোমুখি স্থানের লাইট।তাতে একটি অস্তিত্ব দৃশ্যমান।আসফিয়ান বর্ণ! সাউন্ড বক্সে সর্বোচ্চ আওয়াজে গান বেজে উঠল তখনই—-
“ তোর ইক্কির-বিক্কির চাওনি;
আমার নজর কেড়েছে।
তোর কিলার হওয়ার লোক-টা ;
আমার মনে ধরেছে।”
হৈ চৈ করে উঠলো যুবক থেকে প্রাপ্তবয়স্করাও। বর্ণ’র সঙ্গ দিতে মাঠে হামলে পড়ল অধিকাংশ।সুখ স্তব্ধ, বিমূঢ়। ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই রইল।বর্ণ স্টেজে উঠে এলো এক লাফে। স্টেজের উপর থাকা মেয়েরা তখন নেমে গিয়ে নাচছে হেলেদুলে। বর্ণ’র গায়ে পায়জামা, পাঞ্জাবি।রঙটা অনেকটা সুখের পড়নের লেহেঙ্গার মতোই।গলায় ওড়না—-
“তুই নিসনা কোন চাপ,
শুধু খেজুরে আলাপ।
আজ রাতটা হলে পার,
হবো যে-যার সে-তার।”
সুখের আশেপাশে ঘুরঘুর করে গাওয়ার ফাঁকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।সায় দেয়নি সুখ।থম মেরে বসে রইলো যথাস্থানে। পরবর্তী লাইন মাহির আর জিসান গাওয়ার তালে তালে নাচল—-
“ নাম কীরে তোর রিংকি-পিংকি,
নেই কোন দরকার,
আমাদের কর্পোরেশনে নেই কোন সরকার।
খাও-দাও জিও -পিও,
টেইক ইট ইজি ইয়ার(!!)
হৈ চৈ লেগে গেল এক প্রকার। বর্ণ’র আগমনে এতোক্ষণের অল্প শান্ত-সুষ্ঠু পরিবেশটা আরো বিগড়ে গেল যেন চোখের পলকেই।এক চোখ টিপে সুখের পিছু ছেড়ে কাম্মা আর চাচ্চুকে বগল দাবা করে স্টেজ থেকে পুণরায় নেমে যায় বর্ণ। তামিজ সাহেব বড় ভাইকে টেনে নিতে চেয়েও আযাদ শিকদারের চোখ রাঙানিতে দমে গেলেন। বুড়ো বয়সে কী শুরু করেছে ভাইটা?
গান হলো, নাচ হলো, এবার হলুদ ছোঁয়ানোর পালা।সুখকে বসা থেকে দাঁড় করানো হয়। দু’পাশে হলুদ হাতে মেয়েরা দাঁড়িয়ে। প্রথমে কে হলুদ ছোঁয়াবে? অবশ্যই কন্যার মা-বাবা!
উদরের দিকে ঈষৎ লেহেঙ্গা সরে গিয়েছে। মসৃন ত্বক উন্মুক্ত। আচমকা ব্যথায় চোখ খিচে দাঁতে দাঁত চাপে সুখ। পেটে হাত চলে যায় আপনা-আপনি। ঠান্ডা কিছুর অনুভূতি হয় সেখানে।সাথে চিনচিনে সূক্ষ্ম ব্যাথা।সকলের অগোচরে দেখল, হলুদ ছুঁইয়ে দিয়েছে কেউ।সুখ বিষ্মিত ঢোক গিলে তড়িৎ পিছু ঘুরতে নিলে তুহফা প্রশ্নাতীত চোখে বলল,
‘ কী বিলবিল করে যাচ্ছিস সুখ?বোস!’
সে বসল চুপচাপ। আড়চোখে দৃষ্টিরা কাউকে খুঁজে চলল কিয়ৎক্ষণ।তুহফা ভিডিও কলের ক্যামেরা সুখের সামনে এনে ধরল।মায়রা কল করেছে।তারা যেই রিসোর্টে উঠেছে, সেখানেও আয়োজন হয়েছে হলুদের।
•
লাল-নীল আবির আর হলুদ ছোড়াছুড়ি লেগে গেছে প্রায়।যার মুখে যে বেশি ঘঁষে দিতে পারে সেই-ই জয়ী।তুহফা লুকিয়ে বেঁচে এসেছে এসব থেকে।ছাদে গিয়ে বসে থাকবে। অতিথিরা সবাই বাহিরে।বাড়ির অভ্যন্তরে হাতে গুনা কয়েকজন।লিফট চালু হওয়ার আগে আরো একজনের উপস্থিতি টের পেয়ে তাকাল তুহফা। লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিল তারপর।মাহির তার সামনে।একদম মুখোমুখি।পড়নে হলুদ পাঞ্জাবী।সকল যুবকের ড্রেসআপ একই ছিল আজ।মাহিরও বাদ যায়নি।
অধিকাংশ কাজিন গায়ে হলুদের শাড়ি পড়লেও তুহফা শাড়ি পড়েনি।তবে, লেহেঙ্গার আঁচলটা শাড়ির মতো কাঁধে পেঁচিয়েছে।
‘ শাড়িটা কেমন ছিল?’ —তিন শব্দের একটা প্রশ্ন।রূহ কেঁপে উঠলো তুহফার।
‘ কোন শাড়িটা?’
মাহির জবাব করল না। মৃদু হাসল কেবল।সেই হাসিতে জবাব খুঁজে পেল তুহফা।আমতা আমতা করে বলল,
‘ প্ প্রয়োজন ছিল না।আমি শাড়ি পড়িনা!’
বিনিময়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো মাহির। দৃষ্টি সামনে লজ্জায় জড়োসড়ো রমণীকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত।
‘ হলুদ লাগাওনি যে?’
দুদিক মাথা দুলাল তুহফা,
‘ নট ইন্ট্রেস্টেড!’
‘ গোসলের ভয়?’
তুহফা কেশে উঠে খুক খুক।কথাটি আংশিক সত্য।বিকেলেই কড়কড়া ঠান্ডা পানিতে গোসল করে কাঁপুনি এখনো যায়নি মনে হচ্ছে। উপরন্তু…
‘ আজ একটুখানি হলুদ ছুঁইয়ে দিলে কী খুব বেশি পাপ হয়ে যাবে? অনুমতি পাবো?’
সচকিতে মাহিরের হাতে নজর রাখে তুহফা।ডান হাতটা পিছমোড়া ছিল, আস্তে করে সেটা সামনে আনল মাহির।
‘ আপনার প্রেয়সীনিকে ঠকানো হবে…’ — চোখ খিচে লেহেঙ্গা খামচে ধরে সে।কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই একটা আঙুলের ,একটু ঠান্ডা হলুদের পরশ এসে গাল ছুঁয়ে দেয়।কী যে শ্বাস আটকে আসা অনুভূতি।লিফট খুলে গেল তখনই।তুহফা চোখ তুলে পুনর্বার তাকালো না। ছুটে বেরিয়ে, সিঁড়ি ভিড়িয়ে গিয়ে ছাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকায়। বুকে হাত চাপে, এরপর আলতো ছুঁয়ে দেয় মাহিরের ছোঁয়া লাগা স্থানে।কী চাইছে লোকটা? সেদিন বলল দূরে থাকতে।সেতো মেনেই নিয়েছিল! ছেড়ে দিয়েছে আশা।রোজ প্রার্থনা করে, যেন লোকটা তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পায়!তবে এসব কী?
লিফট পুণরায় নিচে নামছে।মাহির ঠাঁই দাঁড়িয়ে। একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে হলদেটে রঙা আঙুলের দিকে। ঠোঁটে মলিন হাসি। পারছেনা সে নিজেকে দমিয়ে রাখতে। কোনদিন না জানি হুটহাট বড় কোন ভুলে পা বাড়িয়ে দেয়।
•
গভীর রাত।হৈ হুল্লোড় এখন নিরবতায় বদলি হয়েছে যেমন। শিকদার নিবাস শান্ত পুরিতে রূপান্তরিত।সুখ থম মেরে বসে। হলুদ, মেকআপ কিচ্ছু তুলেনি এখনো।রুমে সে একাই আছে।
ব্যালকনির থাই গ্লাসে ঠকঠক আওয়াজে ধ্যান ভাঙল। একবার.. দুবার.. এমন আওয়াজে অতিষ্ঠ সুখ গ্লাস খুলে দিল গিয়ে।
অতঃপর আশ্চর্য বনে তাকিয়ে রইলো।বর্ণ বুকে হাত চেপে রেলিং হেলে,পা আড়াআড়ি করে দাঁড়িয়ে।গায়ে ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট।তারও ভেতরে আবার ব্ল্যাক শার্ট।গ্লাস খুলতেই সুখের দিকে না চেয়েই হাতে ঘড়ির বেল্ট লাগাতে লাগাতে তার পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতে নেয়। পথ আটকে দাঁড়ায় সুখ।
‘ আপনি এখানে কী করে?আর এসব কী ধরনের অসভ্যতা?’
‘ বলছি ইয়ার.. আগে ভেতরে তো ঢুকতে দে!’
#চলবে🥀
||

