#আমার_বোবাফুল(৬৬•২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
মেহরাবকে জিসানই নিয়ে এসেছে জোরপূর্বক।আসতে না করেছিল সে।
“ হাই!” –জিসান হাসল মৃদু। প্রত্যুত্তরে সুখও আড়চোখে একপলক মেহরাবকে পরখ করে অপ্রস্তুত হেসে মাথা নাড়ে।সিয়ামও উপস্থিত সেখানে।সে জানতে চাইলো, “ বর্ণ কোথায় ভ-ভাবী?ফোন তুলছিল না আমাদের।”
সুখ বাড়ির দিকে ইশারা করে বুঝাল, “ ভেতরেই আছে হয়তো।আমি দেখছি আপনারা বসুন না।”
রাজবীর এসে স্টেজের সামনে পাতানো চেয়ারে বসাতে নিয়ে গেল তাদের। মেহরাবকে দেখে নূরা ছুটে এলো। সপ্তাহে অন্তত দু থেকে তিনবার তাদের কথা হয় এখনো।তবে এখন আর আগের মতো সুখকে দেখার তৃষ্ণায়, কিংবা তার সাথে একটু কথা বলার অযুহাত খোঁজে হাঁসফাঁস করে না মেহরাব।নূরার সাথে কথা বলার ফাঁকে কখনো সখনো হানিফা বেগম বা আযাদ সাহেবের সাথেও কথা হয়ে যায় অল্পবিস্তর। মেহরাব বেশিক্ষণ থাকেনি। মিনিট বিশেক পর একাই ফিরে গেছে এবং রাতেই জেসিকে নিয়ে রওনা দিয়েছে ঢাকার উদ্দেশ্যে। মেয়েটা তবু ‘মেহরাবের সাথে ঘর করবে না,করবে না ’ জেদ দেখিয়েছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ জেদে স্থির থাকতে পারেনি।পরে আরো দু’দিন থেকে যাওয়ার আবেদন রাখল। মেহরাব কী শুনবে সেসব আবেদন? উপায়ান্তর না পেয়ে ভাইয়াকে কল করল। জিসানও মেহরাবের দলে যোগ দিয়ে বলল,- ক’দিন পর আবার সে নিজে গিয়ে জেসিকে আনবে।’তখন ভাইয়ার উপর কী যে অভিমান হলো জেসির।
•
আজ বহুদিন পর বর্ণ মা’র কোলে মাথা রেখে সময় কাটিয়েছে। শেষ কবে এই শান্তির জায়গায় এমন মাথা রেখেছিল ইয়াত্তা নেই।বর্ণ চলে আসার সময় আইজা পিছু থেকে বললেন, “ কাল থেকে নিশ্চয়ই আবার আগের মতো সেই রুক্ষ, গম্ভীর বর্ণ’টা হয়ে যাবে?”
বর্ণ পিছু ফিরে এসে একহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল সন্দিহান হয়ে, “ সিরিয়াসলি? সবার সামনে আর যাই হই তোমার কাছে অলোয়েজ ইম-ম্যাচিওর সেজেছি। এরপরও বলবে আমি রুক্ষ, গম্ভীর ইত্যাদি ইত্যাদি?”
গালে গাল লাগিয়ে একহাতে বর্ণ’র মাথা ছুঁয়ে অভিমানী গলায় বললেন, “ সত্যিই ইম-ম্যাচিওর! নিজেকে অতি চতুর মনে করো অথচ…! ইচ্ছে করছে ছোট বেলার মতো কান টেনে পিঠে কয়েক ঘা বসাই।”
“ বড় হয়েছি তো!”
“ তাই ইচ্ছেটাও মাটি চাপা দিয়েছি।”
বর্ণ’ হাসল নিঃশব্দে। নিজেকে আজ হঠাৎ ছোট ছোট মনে হচ্ছে নিজের কাছেই।মন হচ্ছে- বহু যুগ পর মা’র সান্নিধ্যে এসেছে। চলতি পথে হারিয়ে যাওয়া মা’কে দীর্ঘ দিন পর পুণরায় ফিরে পেয়েছে।একটু পর বলল, “ আমার সাথে আরও একজন পৃথিবীতে এসেছিল।বলোনি কেনো কখনো?”
আইজা হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। এরপর বললেন, “ বলে কী হবে?ওই জা-নো-য়ার বলেছে ওকে নাকি সে মে!রে ফেলে দিয়েছে।তাই তো খোঁজতে খোঁজতে ব্যর্থ হয়ে একসময় খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু আমি আজও বিশ্বাস করি, ভাগ্যের জোরে সে হয়তো বেঁচে আছে। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও থেকে শ্বাস নিচ্ছে।”
“ হুঁ!”–বর্ণ অন্যমনস্ক হয়ে কপাল গুটিয়ে কী যেন ভাবে।আইজা পুণরায় বললেন, “ আমি আজও ভয় পাই।সব সময় তোমাদের নিজের কাছাকাছি আগলে রাখার চেষ্টা করি ছোট বেলার মতোই। আমার কী মনে হয় জনো? সুখের সাথে যা হলো, আর যে লোক শাস্তি পেলো।সে তো চোখে দেখতে পায়না,কানেও নাকি শুনে না। নিশ্চয়ই জানো-য়ারটাই এসব ঘটিয়ে এরপর ভয় দেখিয়ে ওই লোকটাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আমার ধারনা ভুলও হতে পারে। কিন্তু…”
গলা খাঁকারি দিয়ে বর্ণ বলল, “ যা কিছু হতে পারে মম। সত্যিটা কেউ জানে না।”
মিউজিক থেমে গিয়েছে হঠাৎ। নিরবতার মাঝে দরজায় নক করার আওয়াজ আসে।বর্ণ না তাকিয়েই বলল, “ আসু–ন।”
লজ্জা মিশ্রিত হেসে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করে সুখ।গায়ে পার্পল কালার লেহেঙ্গা জড়িয়ে।উভয় হাতে মেহেদির আঁকিবুঁকি।খুব নিখুঁত পর্যবেক্ষণী দৃষ্টিতে চোখ বুলালে দেখা যাবে তাতে লেখা- Ashfiyan Barna’s bowful!লেখার উপরে নিচে চারপাশে ডিজাইন করা।তাই এক দেখায় লেখাটা ঠাহর করা যায় না।সুখ কাল রাত অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল।বর্ণ কখন এসে এই কাজ সম্পাদন করেছে সে সঠিক জানে না।তবে ভোরে চোখ মেলেতেই দেখতে পেয়েছিল- মানুষটা সজাগ।তার মেহেদীর রঙা হাত দুটোর রক্ষাকর্তা হিসেবে উৎসুক চেয়ে আছে।
তপ্ত শ্বাস ছেড়ে সুখ এগিয়ে গেল। আসার পর থেকে সে লক্ষ্য করেছে বর্ণ ভাই বড়মাকে এড়িয়ে চলছিল।আজ আবার তাদের একসাথে দেখে ফ্যালফ্যাল করে সামনে চেয়ে হাঁটার মাঝে পায়ের নিচে লেহেঙ্গা বিঁধে গিয়ে মুখ থুবড়ে সোজা গিয়ে পড়লো বর্ণ’র প্রসস্থ বুকে। স্তম্ভিত হয়ে লজ্জায় কুঁকড়ে যায় সুখ। বড়মার সামনে মান হানি। উপরন্তু বর্ণ দোপাট্টা’র অভ্যন্তরে হাত গলিয়ে কোমর আঁকড়ে ধরেছে। সরে আসতে চাইলে বাঁধন আরো গাঢ় করেছে।
আইজা অপ্রস্তুত এদিক ওদিক নজর ছিটালেন।ছেলে মেয়ে তিনজনেই লজ্জা জিনিসটার ঘাটতি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে।গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “ ঠিক আছিস সুখ?”
মুখে অসন্তোষের ছাপ ফুটিয়ে সুখ উপর নিচ মাথা দুলায়।বর্ণ তাকে ছুঁড়ে ফেলার মতো এ-হাত থেকে ও-হাতে হস্তান্তর করে নিজের সাথে মিশিয়ে বলল, “ মম আমাদের দুজনকে একসাথে কেমন মানায়, কখনো প্রেইজ করোনি, ডোন্ট ফরগেট দ্যাট!”
ইচ্ছে করেই সে যেন পুরোনো ঘা তরতাজা করে দিল।ভদ্রমহিলা চোখ কঠিন করে তাকালেন,“ বিয়ে করার সময় বলেছিলে আমায়?”
“ তুমি তো জানোই মম, প্ল্যান নয় সাকসেস অর রেজাল্ট দেখাতেই আমি বেশি ভালোবাসি?”
“ ও–হ্ তার মানে ওকে আবার নিজের সাথে নিয়ে গিয়ে, এরপর সাকসেস হিসেবে একদিন হুটহাট কোলে আমার নাতিকে নিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াতে তোমার বিবেকে বাঁধবে না?”
‘নাতি’ শব্দটা শুনে গুটিসুটি মেরে রয় সুখ।কেন এসেছিল, কী বলতে এসেছিল সব ভুলে বসেছে! বর্ণ ধূর্ত চোখ মানিয়ে তার মিইয়ে যাওয়ার মুখের দিকে চেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “ প্ল্যান তো এমনই।আজ, কাল, পরশু বা তরশু যেকোনো রাত প্রসেসে এন্টার করতে পারি।গেট রেডি সুইটহার্ট!”
•
আইজার কাছ থেকে সরে এসে,জিসানদের সাথে বেরিয়ে গিয়েছিল বর্ণ। যাওয়ার আগে আযাদ সাহেবের মুখোমুখি হলে ‘ আব্বু’ বলে জড়িয়ে ধরল কিছুক্ষণ। ভদ্রলোক আবাক হয়েছেন বটে। তিনি খাঁটি বাঙাল।উনার মতে- ড্যাড, মম শব্দগুলো ইংরেজদের। আম্মু-আব্বু অথবা, বাবা-মা ডাকে যতোটা আবেগ মিশে থাকে, ইংরেজি শব্দগুলোতে তেমনটা থাকে না।বর্ণকে কতোবার যে নিষেধ করেছে এসব সম্বোধনে না যেতে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা মানাতে পারেনি।
‘ কেউ হাগ করলে, বিপরীত জনকে-ও আগলে নিতে হয় মিস্টার শিকদার।নয়তো ইনসাল্ট ফিলিং হয় তার।”
অবাকতার রেশ কাটিয়ে ছেলের পিঠ চাপড়ে তিনি বললেন মৃদু হেসে, “ মা’র সাথে অনুযোগ, অভিমানের পর্ব চুকে কম্প্রোমাইজ করে নিয়েছো অবশেষে, মাই বয়?”
বর্ণ হাসল।কানে কানে কিছু বলতেই ভদ্রলোক অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে চোখ রাঙিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন।আড়ালে গিয়ে পরপর হেসেও ফেললেন আবার।
•
জেসি ঘুমে ঢলে পড়তে চাইছে, পরক্ষণে চমকে পুণরায় সিটে মাথা এলিয়ে দিচ্ছে। মেহরাব ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখল তার অবস্থা, কিছুই বলল না। ড্রাইভার গাড়ি চালাতে মনোযোগী।তারা ব্যাক সিটে।
জেসি এক সময় সন্তর্পণে মেহরাবের কাঁধে মাথা রাখে। নিঃশ্বাসের শব্দ ভারী শুনাচ্ছে।বাঁকা চোখে একঝলক দেখে সম্পূর্ণ ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল মেহরাব। মেয়েটাকে অনুভূতিতে, ভালো লাগায়, ভালোবাসায় কোন কিছুতে ঠাঁই দিতে চায়নি সে, কিন্তু না চাইতেও মেয়েটা জীবনের একটি অংশ হিসেবে জড়িয়ে গেল তার সাথে।এটাই কী তিন কবুলের শক্তি?
জেসির খোলা চুল আঁচড়ে এসে মুখ ঢেকে গেছে। ফলস্বরূপ তার চেহারা দেখার জো নেই। আনমনে হেসে মেহরাব হাত বাড়িয়ে মুখ থেকে চুল সরিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিতেই মেয়েলি গমগমে স্বর বেজে উঠল,
“ ননাই দেখাতে আসবেন না মিস্টার।মুড় খারাপ আছে। বাংলা গালি দিয়ে বসতে দিতে পারি।”
হতচকিত হলো মেহরাব।মুখ কুঁচকে বিষ্ময় নিয়ে জানতে চাইল, “ হোয়াট ডু ইয়ু মিন বাই ননাই?”
“ ননাই ইজ অ্যা ননাই। প্রতিশব্দ আলগা পিরিত।”
বেকুব বনে হতবাক হয়ে মেহরাব কেবল চেয়েই রয় ভ্রু গুটিয়ে।কীসব ভাষা! পাশাপাশি থাকার মাঝে কখন না জানি তার মুখেও এসব শব্দ প্রণালী চলে আসে।জেসি পাত্তা দিল না ওসব।চোখ বুজে তার কাঁধে মাথা রেখে পড়ে থাকল।চোখ জ্বালা করছে। ভাইয়াকে ছেড়ে আসতে হচ্ছে বলে খুব কেঁদেছিল কী না!
•
অভ্র বিদেশে পড়তে গিয়েছে বেশ ক’দিন হলো।এখন তুহফার বিয়েতে স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে না পেরে ছটফট করছে। বিকেল থেকে ভিডিও কলে ল্যাপটপের সামনে বসা।এখনো রাজবীরের সাথে সংযুক্ত আছে। কাজিন গুলোও তার অস্থিরতা দেখে দ্বিগুণ উৎসাহে তাকে লোভ দেখাচ্ছে।তুহফার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে মাহিরের নাম্বার থেকে।আজ কোন লাজ লজ্জা নয়।শালীকাদের কাছে তুহফার ছবি চাইছে এই মূহুর্তের।শালীকা’রা তখন গোল মিটিং-য়ে। রিপ্লাইয়ে বলল,“ জিজু, হবু বউয়ের মুখ দর্শন করতে চাইলে- নগদ অর্থ প্রদান করতে হবে।”
মাহির কিছু ভেবে জবাবে বলল,“ সুযোগের সদ্ব্যবহার!তাহলে তো বউয়ের সাথে দেখা করার সুযোগ করে দিতে হবে, এবং সেটা আজ রাতেই!”
তারা পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে অদূরের তুহফাকে দেখল একবার।রুশ্মিতা রিপ্লাই দিল, “ লুকিয়ে চুরিয়ে?”
“ ইয়েস!”
“ জিজু, আপনি এতো ভীতু জানতাম না তো! এতোদিন ধৈর্য্য ধরে আর মাত্র একদিন যেহেতু সহ্য হচ্ছে না।তখন বুক ফুলিয়ে সবার সামনে গেট দিয়ে এসে বর্ণ ভাইয়ার মতো আপনারও তুফ আপির সামনে এসে তাকে চমকে দেওয়া উচিৎ।”
মাহির বুকে হাত চাপল তড়িৎ।এতো দুঃসাহস তার আছে কী?ভাব ধরে বলল, “ এসব ছোটখাটো ব্যাপার। বিয়ের আগের রাতে অতিথিদের চোখে ধুলো দিয়ে,শালীকাদের প্যারায় রেখে বউয়ের সাথে লুকিয়ে দেখা করার অনুভূতিই আলাদা।ডিলে রাজি? কিছু পেতে হলে কিন্তু কিছু দিতেও হয়!”
তারা চোখ বুলাল চারি পাশে। সবখানে অতিথির ঢল।দূর থেকে আসা নিকটাত্মীয়রা সবাই রাতে থাকবে। পরক্ষণে ইবরাত বলল, “ ধরা পড়লেই বা কী!হবু বউয়ের সাথে একটু দেখাই তো করবে।চুরি তো আর করছে না!”
#চলবে🥀

