#আমার_বোবাফুল(৫৬)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
‘ এতো বারণ,এতো দূরত্ব মাড়িয়ে আপনি কেনো আমাকেই ভালোবাসলেন।কেনো?কেনোও?’–দুহাতের মুঠোয় বর্ণ’র শার্টের কলার চেপে ধরে সুখ, ঝাকাতে থাকে ।চোখের অশ্রু বাঁধ ভেঙেছে। এলোমেলো চুল।বর্ণ সব সয়ে নিয়ে শীতল চোখে চেয়ে রয়।টু শব্দটিও করল না।
সুখ নিজের চুল খামচে ধরে দুহাতে।টেনে হিঁচড়ে গোড়া থেকে উপড়ে হাতে নিয়ে আসার জোগাড়। কান্নার দাপটে শরীর দুলে উঠে।ফের বর্ণকে বুঝাল–
‘ কেনো এমনটা করলেন? সেদিনের মতো মুখ ফিরিয়ে নেননি কেনো?কেনো সেদিন বাঁচিয়ে এনেছেন আমায়?কেনো বিয়ে করলেন?ভালোবাসলেন কেনোও? এতো গুলো কেনো’র উত্তর চাই আমার এখুনি।’ —নিজের উপর আঘাত শুরু করে।বর্ণ উঠে এলো পাশে। অস্থির হাতে সুখের মুখে ছুঁতে গেলে সরিয়ে দেয় সে,
‘ ছেড়ে দিন না আমায়।মুক্তি দিন, আমি আপনাকে ছেড়ে অনেক… অনেক দূরে পালিয়ে যাবো।কথা দিচ্ছি, কখনো ফেরত আসব না!’
বর্ণ হাসে কেমন করে। একদৃষ্টে চেয়ে বলল,-‘যখন আমি শিকারি,তো তুই আমার একমাত্র শিকার!নো সেক্রিফাইস,নো গিভিং আপ!ইয়্যু আর অনলি মাইন। তোকে আমার কাছেই থাকতে হবে আ-মরণ।’
কাছে আসতে চেয়েছিল সে।সুখ অশ্রুভেজা চোখে ধাক্কা দেয় বুকে। ঠোঁট ও হাতের ইশারায় বলল–
‘ আমি ভুলব না আপনার এসব কথায়।আমি আপনার হতে পারি না। সেদিনও আপনার যোগ্য ছিলাম না।এখন আরও নেই!’
‘ আমার পাশে কে যোগ্য, কে অযোগ্য সেটা ডিসাইড করার তুই কে?কোন অধিকার?’
বর্ণ’র কথা সে শুনতে চায়না একটুও। ঘনঘন দুদিক মাথা নেড়ে বলে–
‘ পৃথিবীতে আমার মতো আরও অনেক আছে আপনার পাশে মানানসই…!’
‘ তোর… মতো আছে। কিন্তু তুই তো নস? আমার পুরো তুই-টাকেই চাই। মতো, অনুরূপ কাউকে নয়!’
গলায় কান্না আটকে দম বন্ধ হয়ে আসে প্রায়। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে সুখ করুণ চোখে তাকায়–
‘ আপনি বুঝতে পারছেন না…’
বর্ণ খানিক চুপ থেকে জবাব করে,-‘ হ্যাঁ আমি অবুঝই।তুই বুঝিয়ে দে?’
বুকের ভেতরের পাঁজরটা ভীষণ যন্ত্রণা করছিল। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে,মনে হয় কেউ ছুড়ির আঁচড় কাটছে পরম যত্নে।সুখ গোঙিয়ে কেঁদে দুহাতে মুখ চেপে ধরে ঠোঁট কামড়ে।চোখ উপচে অশ্রু ধারা বয়ে যায়। বর্ণ তখনো চেয়ে আছে। কাঁদতে সময় দিচ্ছে ফুলকে।জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে সুখ বলে–
‘ আমি…
আমি অ-পবিত্র,কুলষিত ’
কুঞ্চিৎ কপাল শিথিল হয়ে এলো বর্ণ’র। তড়িৎ সুখের মুখটা দুহাতের আঁজলায় তুলে জানতে চায়,-‘ উুঁ?’
‘ হুঁ!’–ঝরঝর অশ্রু ঝেড়ে উপর নিচ মাথা ঝাঁকায় সুখ,হাত দু’টো সামনে তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বুঝায়,
‘ ওরা আমাকে ভীষণ বাজে ভাবে ছুঁয়েছে। ঘৃ”ণ্য অ-পবিত্র ছিল সেই ছোঁয়া।’
ছোট বাচ্চাকে আদর করার মতো তার কপালে আঁচড়ে আসা চুল সরিয়ে দিল বর্ণ।বলল,
‘ পাগলি.. এমন কিছুই হয়নি।তুইও জানিস!’
‘ ওরা জানে, আমি জানি হয়তো আপনিও জানেন ওরা নিজেদের বাসনা পূরণে সফলকাম হয়নি। কিন্তু ছুঁয়েছে তো?যেটা আমি শুধুমাত্র এক পুরুষের জন্যই আগলে রেখেছিলাম।ওরা আমায় কলঙ্কিত করে দিয়েছে নিমেষেই। সত্য কখনো গোপন থাকে না। সবাই জানে আমার
এ/ক্সি/ডেন্ট হয়েছিল কিন্তু যেদিন সত্যিটা সামনে আসবে পুরো পৃথিবীকে হাজার বুঝালেও ওরা বুঝবে না আমি শেষ পর্যন্ত আমার সম্ভ্রম রক্ষা করতে পেরেছি সেদিন।ওরা ঠিকই সেই নামটা আমার সাথে জুড়ে দেবে যেটা থেকে বাঁচতে আমি প্রাণ দিয়ে দিতেও প্রস্তুত ছিলাম। আমাকে স্ত্রী রূপে গ্রহন করার অপরাধে ওরা আপনাকে প্রশ্ন করবে,হেও করবে। আপনার নাম-জস এক লহমায় ধূলিসাৎ করে দিতে সময় নেবে না।আমি এটা হতে দিতে পারি না।’
বর্ণ বাকরুদ্ধ চোখে অনিমেষ তাকিয়ে থাকল। চোখের সাদা অংশ জোড়া রক্তিম।
‘ জেনেশুনে ভালোবাসার মানুষকে অপমান, অপদস্থ, জঘন্য প্রশ্নের মুখে ছুঁড়ে ফেলা যায় না।আমি আপনার মতো এতোটাও স্বার্থপর নই!তাই , আজ আপনাকে চিরদিনের মতো নিজের একান্ত করে পাওয়ার সুযোগ পেয়েও আপনার জন্য, আপনাকে ভালোবাসি বলেই, আপনাকে ছেড়ে দিতে চাই।’– হৃদয়ে তোলপাড় তুলা কথাগুলো জানাল না সুখ।ভেজা চোখে চাতক পাখির মতো বর্ণ’র প্রসস্থ বুকের দিকে চেয়ে রইল অপলক।খুব ইচ্ছে করছে ওই বুকটাতে মাথা রেখে মনের খোয়াইশ মিটিয়ে অশ্রুপাত করতে।
বৃদ্ধাঙ্গুলিতে চোখ মুছিয়ে দিয়ে বর্ণ আচমকা শক্ত করে বুকে চেপে ধরল সুখকে। বিড়বিড় করল–
‘ কেউ জানবে না।তারা কেউ বেঁচে নেই।কেউ নেই।ওই ঘটনার দাফন ওখানেই শেষ। পুনরাবৃত্তি হবে না কখনো।’
সুখ বোধকরি শুনল, অথবা শুনলই না।অনেক্ষণ চোখ বুজে চুপ করে পড়ে থাকল বুকে। এরপর মাথা তুলে সরে আসে।বর্ণ ফের মোহিত চোখে সুখের গালে হাত রাখে। আঙুলে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলে–
‘ একবার স্বীকার কর এখনো ভালবাসিস?’
‘ ভাসি তো।হয়তো নিজের চেয়েও বেশি!’–প্রিয় পুরুষটিকে জানানো হলো-না কথাটা। বরং জানাল,
‘ যেখানে আমি নিজেকেই ভালোবাসতে ভুলে গেছি, সেখানে আপনাকে ভালোবাসি কী করে?’
উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো বর্ণ,
‘ নো নিড! আমার একার টাই যথেষ্ট হবে। ব্যাস, সয়ে নে আমায়!’
তড়িৎ গাল থেকে বর্ণ’র হাত সরিয়ে দিল সুখ।বলল–
‘ ছুঁবেন না আমায়।হাতে নোংরা লেগে অপবিত্র হয়ে যাবেন।’
অচিরেই চোয়াল শক্ত করে বর্ণ কঠিন চোখে তাকায়,-‘ আমায় রাগাস না ফুল। ব্যাপারটা তোর জন্য একটুও সুখকর হবে না!’
‘ কী করবেন?’
চোখের পলকে তা’র শক্তপোক্ত হাতের থাবা এসে গলা চেপে ধরল সুখের। ঝটকায় মুখোমুখি এনে বলল হিসহিসিয়ে,-‘ সোজা দাফন করে দেব!যদি আরেকবার আজেবাজে বকেছিস।’
ব্যাথা পেলেও সুখ ছাড়া পাওয়ার জন্য মুটেও ছটফট করল না।শান্ত দীঘির মতো নীরব থেকে চোখে চোখ রেখে ঠোঁট নাড়ল–
‘ প্লীজ মেরেই ফেলুন আমায়। এরপর সব ঝঞ্ঝাট আজীবনের মতো শেষ হয়ে যাবে।’
ছেড়ে দেয়া হয় তাকে।হাত মুঠোবন্দী করে অন্যত্র মুখ ফিরিয়ে রাগ সংবরণের চেষ্টা করে বর্ণ। মস্তিষ্কে যেন লাভা উতলে পড়ছে টগবগ করে।গলায় হাত রেখে সুখ কেশে উঠে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ে। এরপর লাজুক পাতার মতো গুটিয়ে যায়। বিগত দিনগুলোতে প্রতি মূহুর্তের মতো কল্পিত দৃশ্যটি আজও চোখের সামনে ভেসে উঠল- তার মতো মেয়েকে জীবনসঙ্গী করার অপরাধে পুরো এক সমাজ –যারা বর্ণ’কে ভালোবাসতো, সম্মান করতো তারাই আবার হেও-প্রতিপন্ন করছে, ঘৃণিত দৃষ্টি ছুঁড়ছে। চোখের সামনে এসব কীভাবে সহ্য করবে সে?এর আগে ম-র-ণ ই সই!
ফোন বাজছে,কল এসেছে।বর্ণ কেটে দিল প্রথমবার। চুপসে যাওয়া সুখের দিকে কোমল দৃষ্টি ফেলে। কাছে এগিয়ে দু বাহু ধরে বলতে নেয়– ‘ ফুল…’
‘ কথায় কথায় শরীর ছুঁয়ে দেওয়াতে ভালোবাসা নিহিত থাকে না।ওটাকে ভোগ বলে।ভোগ করতে চান তো আমায়?নিন, ইচ্ছে মিটিয়ে নিন।কোন বাঁধা দেবো না আজ!’
বর্ণ’র দৃষ্টিরা বোধকরি এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল। বিমূঢ় চোখে তাকাল সুখের নিষ্প্রাণ চোখে।হাত আলগা হয়ে এসেছে ততোক্ষণে।ঢোক গিলে ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে, গুটিয়ে নিল নিঃশব্দে।ফোনে কল এসেছে পুণরায়। কেমন বিমূর্ত চোখে সুখকে দেখতে দেখতে রিসিভ করে কানে তুলে গটগট করে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। যাকে কথার বাণে সুখ কখনো হারাতে পারেনি, কখনো যে হার মানেনি,আজ সে নিঃশব্দে প্রত্যুত্তর বিহীন হারিয়ে গেল চোখের পলকে।হয়তো কন্ঠ তার ভাষা হারিয়েছে।
•
শিকদার নিবাসের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীর মতো পিচঢালা রাস্তার একধারে বর্ণ’র কার। ড্রাইভিং সিটে থম মেরে বসা।ফ্রন্ট মিররে ধূসর কালো মণি চোখ জোড়া দৃশ্যমান হয়। চকচক করছে র-ক্তি-ম চোখ দুটো। মাহির নেই আজ।বর্ণ বুকে হাত রাখে । কেমন হাঁসফাঁস লাগছে, হৃদয়টা অশান্ত।সে কী তবে ফুলের আচরণে কষ্ট পেয়েছে? কিন্তু… এই অনূভুতি শূন্য পাথর হৃদয়ে দুঃখ-কষ্টদের উঁকি দেওয়া বারণ ছিল তো!
বর্ণ গাড়ির ড্যাশবোর্ডের স্ক্রিনের দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকে।রুমের ফুটেজ ভাসমান তাতে।সুখ ফ্লোরে লেপ্টে বসে কাঁদছে ফুঁপিয়ে।হাতের মুঠোয় সেই শো-পিস; ভালোবাসার প্রতীক লাভ আকৃতির পাথরের অভ্যন্তরে তাদের বিয়ের দিনের একটা মূহুর্তে থমকে আছে।যেটা সেদিন অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বর্ণ’র কাছ থেকে পেয়েছিল ”ভালোবাসা দিবস” উপলক্ষে।পাথরটা বুকে চেপে রেখে ঠোঁট কামড়ে ধরে সুখ।জপজপ চোখের পানি গাল বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে পড়ে।পাঁজরটা ছিঁড়ে যেতে চাইছে যন্ত্রনায়।তার সাথেই কেনো এমন হলো?ভাগ্যটা অন্যরকম না হলেও পারতো!
•
ঢাকা শহরের পুরোনো একজন বাসিন্দা মোখলেছ। সংসারে তিনটি ছেলে,মেয়ে।বড় ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকে এখন।বাবা মা’র ভরন-পোষন নেওয়ার সময় নেই।পথে-প্রান্তরে বেলুন বিক্রি করে এবং রিক্সা চালিয়ে বাকি দুটো মেয়ে এবং স্ত্রী’র মুখে কোন রকম দুমুঠো অন্ন তুলে দেন মোখলেছ। কখনো কখনো না খেয়েও দিন পার করতে হয়। নিত্যদিনের মতো আজও রাস্তায় বেরিয়েছিল লাঠির আগায় বেলুনের তোড়া গেঁথে।বাতাসে শীত শীত আবহ অথচ আকাশ থেকে ছিটকে আসা সূর্যের তেজস্বী রশ্মিতে কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে ইতোমধ্যে কেবল তিনটে বেলুনই বিক্রি করতে পারল।এরইমাঝে দুটো জোয়ান ছেলে এলো কাছে।নেয়াৎ মজা করে কথার কথা বলার ফাঁকে একজন আকম্মাৎ বেলুন কেড়ে নিতে চায়।মোখলেছ তড়িৎ পিছু হটে গেল। এখানে তার সন্তানেদের হক গেঁথে আছে।বাড়িতে তেল,মরিচ নেই। ছেলেটা ফের দম্ভ দেখিয়ে কেড়ে নিতে গিয়ে ব্যর্থ।নিন্মাষ্ঠ কামড়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব মোখলেছকে ভয় দেখিয়ে,একসময় হুট করে হেসে ফেলল।মজা করেছিল এতোক্ষণ। তারা চলে যেতেই মোখলেছ রাস্তায় বসে পড়নের ফতুয়া’র বাহুতে অশ্রুতে ভেজা চোখ দুটো মুছে। নিম্ন শ্রেণীর দেখে সবাই এমনই মজা নেয়। এমন অনেকেই তাদের মতো হতদরিদ্র’দের বিনোদনের পাত্র বানিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পায়।
অদূর থেকে দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করে আনমনেই ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে জেসির,কিছু তিক্ত স্মৃতি কল্পনা করে। পরক্ষণে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে ভেবেই তড়িৎ চোখ মুছে ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে তাকাল। দুহাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে মেহরাব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে।মলে এসেছিল তারা। যদিও মেহরাব আসতে চায়নি জেসিকে নিয়ে।মায়রা বলে-কয়ে পাঠিয়েছে।
জেসি কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। মেহরাব তাকে ইতিউতি করতে দেখে গম্ভীর মুখে বলল–
‘ চলো!’
‘ গাড়ি তো ওদিকে। শপিংও শেষ।আমরা এদিকে কেনো এসেছি?’
মেহরাব জবাব দিল না। চুপচাপ হাঁটছে।জেসি তার পিছু পিছু।সে খুব চাইছে ডক্টর যেনো ওই কাকু থেকে অন্তত একটা হলেও বেলুন নেয়। তার চাওয়ার পূর্ণতা দিতে পরো মূহুর্তে হাঁটতে হাঁটতে বেলুন ওয়ালার নিকটে চলে এলো দুজন।জেসি মেহরাবের আগেই অমায়িক গলায় বলে–
‘ কাকু বেলুনের দাম কতো?’
‘ বেশি না মা-জান।মাত্র বিশ টেহা।একটা দিই?’
কতো ভালোবেসে ”মা-জান” ডাকলেন তিনি।জেসির মনটা প্রফুল্লে নেচে উঠল।পরে মনে পড়ে, তার কাছে তো কোন টাকা নেই এই মূহুর্তে। আড়চোখে মেহরাবের চেয়ে খানিক হেলে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল–
‘ একটা কিনে দিন মশাই।বাড়ি ফিরে ভাইয়ার কাছ থেকে নিয়ে আপনার টাকা আপনাকে ফেরত দিয়ে দেবো, পিঙ্কি প্রমিজ!’
দাঁতে দাঁত ঘঁষে মেহরাব চোয়াল শক্ত করল।তার টাকায় দু’হাত ভর্তি শপিং করে এসে,এখন বিশ টাকা ফেরত দেওয়ার বাহাদুরি দেখাচ্ছে! বাহ্…
‘ কয়টা বেলুন আছে এখানে?’
মেহরাবের প্রশ্নে মোখলেজ ক্লান্তিময় হাসল,-‘ জে বা-জান, এহানে মুটে সাতটা বেলুন!’
‘ সব ক’টা দিয়ে দিন।কতো টাকা হয়েছে?’
‘ সবডি নিবেন?’—আনন্দে চোখ চকচক করে উঠল তখন। মেহরা ছোট শব্দে জবাব করে,
‘ হুঁম!’
‘ এট্টা বিশ টেহা কইরা… মুটে একশো চল্লিশ টেহা আসে বা-জান।’
দু’হাতে শপিং ব্যাগ,টাকা দেবে কী করে?সব বেলুন নিচ্ছে দেখে জেসি খুশিতে আত্মহারা। ঠোঁটে হাসি চেপে মেহরাবের দিকে চেয়ে আছে ফ্যালফ্যাল।সে বলল–
‘ ব্লেজার জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে উনাকে টাকাটা দাও!’
জেসি থমথমে খেয়ে গেল,-‘ এ্যাঁ, আমি?’
মেহরাবের ধারালো অস্ত্রের মতো চাহনি দেখে আস্তে করে ব্লেজারে হাত রাখে জেসি। পকেট ভেতরে, বুকের কাছাকাছি। হৃদস্পন্দন ছুটছে ক্রমশ।ঢোক গিলে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখে ওয়ালেট হাতে নিয়ে দুশো টাকার একটা নোট ধরিয়ে দেয় কাকুকে।
‘ মা-জান বাকি টাকা না লইয়া যান কই?’
‘ ওটা আপনার কাছেই রেখে দিন কাকু।কখনো কোনদিন পথে প্রান্তরে দেখা হলে একটা বেলুন দিয়ে শোধ করে দেবেন নাহয়!’
ফের অশ্রু হানা দেয় মোখলেছের চোখে।খানিক আগের অশ্রু আর এই অশ্রুর মাঝে বিস্তর ফারাক।এটা কৃতজ্ঞতার, খুশির বহিঃপ্রকাশ ছিল।
‘ আপনাকে অনেকগুলো থ্যাঙ্কস!’
‘ ওগুলো তোমার নয়, মীরাভের জন্য!’
জেসির হাসিটা ধফ করে নিভে গেল।বেলুনগুলো সে-ও মীরাভের জন্যই নিয়েছে। কিন্তু তাই বলে মুখের উপর বলে দেবে এভাবে? ”একটা তুমিও নিতে পারো” –কথাটি বললে গাল ছিঁড়ে পড়ে যেতো লোকটার? জেসি ফ্রন্ট সিটে বসতে বসতে বলল,
‘ আপনি একটা কুমড়ো পটাশ!’
•
বর্ণ তখন সদ্য ভার্সিটি উঠেছে।চোখে পৃথিবী জয় করার এক আকাশ স্বপ্ন। ঢাকায়, ভার্সিটির আশেপাশে কোনো এপার্টমেন্টে থাকছে, খাচ্ছে,ঘুরছে-ফিরছে। সে ভ্রমন প্রিয় ছিল খুব।পিকনিক, ট্যুর নিয়ে পাহাড় থেকে সমুদ্র, শহর থেকে গ্রাম দলবল জুট বেঁধে চষে বেড়াতো মাসের অধিকাংশ দিন। প্রাণোচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত এক আসফিয়ান বর্ণ। অভ্র’র মতোই অল্পবিস্তর চঞ্চল স্বভাবের ছিল,তবে বয়সের পরিক্রমায় খানিকটা গম্ভীর ভাবও পরিলক্ষিত।দ্রুতই যেকারও সাথে সখ্য গড়ে তোলার বিশেষ গুণ তার চরিত্রে বিদ্যমান।এমনই একদিন নাফিজ নামের একটা ছেলের সাথে অল্প সময়েই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।নামটা বাংলাদেশীয় হলেও ছেলেটা অদ্ভুত দেখতে, সবার চেয়ে আলাদা। চোখদুটো দেশীয় ছেলেদের চেয়ে অনেকটা ভিন্ন বর্ণের।জানা যায়,তার জন্ম বিদেশেই।তবে, মা বাংলাদেশী।মা বেঁচে নেই, তাই মায়ের দেশ ঘুরে দেখতে এসেছে।তার ভাষ্যমতে- এখানে এসে বর্ণ’র সাথে পরিচিত হয়ে তাকেই বিশ্বস্ত মনে হয়েছে একমাত্র।
যদ্দিন দেশে থাকবে তদ্দিন তাকে নিজের ফ্ল্যাটে রাখার সিদ্ধান্ত নিল বর্ণ। নাফিজ প্রায়শই ক্লাবে যেতো, ড্রিঙ্কসও নিত সময় সময়।বর্ণকেও নিয়ে যায় বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে। ”বিদেশের কালচারে বড় হয়েছে,একটু আধটু এসব দোষ থাকবেই” কথাটি মেনে নিয়ে বর্ণ তার সঙ্গ দিতে শুরু করে। বেশি দিনের তো ব্যাপার নয়। ব্যস, কদিন ঘুরে ফিরেই নিজ জন্মস্থানে ফিরে যাবে পুণরায়।জিসান জেসিকে একা ছাড়তে চাইতো না, আবার তখন ঢাকায় এসে খুঁটি গাঁড়ার সামর্থ্যবানও নয়।সে রংপুর শহরেই পড়ত সেসময়। ওখানে থেকেই বর্ণ’কে সাবধান করেছিল নাফিজের সাথে বেশি ক্লোজ না হতে,তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে সঙ্গ না দিতে।
একদিন হঠাৎ বর্ণ’র ফোনে কল এলো নাফিজের। দু’দিনের জন্য অন্য হোটেলে উঠেছিল সে। পর্যাপ্ত এমাউন্ট না থাকায় এখন বিল পে করতে পারছে না। পরবর্তীতে টাকা নিয়ে বর্ণ গেল সেখানে কিন্তু রুমে নাফিজ ছিল না। শুধু তাই নয়,পুরো হোটেল প্রায় ফাঁকা বললেই চলে,গুটি কয়েক স্টাফ ছাড়া।
মিনিট পাঁচেকের ভেতর হুরহর করে পুলিশ ঢুকে গেল।যা ছিল বর্ণ’র কল্পনাতীত।কিছু বুঝে উঠার আগেই দুজন পুলিশ ধরে নেয় তাকে। রুম জুড়ে তল্লাশি হয়।ড্রাগস্ মিলেছে রুমের আনাচে কানাচে। পরিমাণ এতো বেশি ছিল যে,যার দাম কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে সম্ভবত।
এক নিমেষেই হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছ্বল বর্ণটার ভাগ্যের পাশা পাল্টে গেল।পুলিশের গাড়িতে টেনে ছিঁড়তে নিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে নাফিজের দেখা এক ঝলক পেয়েছিল বর্ণ। ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি টেনে হাত নাড়িয়ে তখন বিদায় দিচ্ছিল সে–
‘ গুড বায় ব্যাড্ডি!’
সিয়াম, আরিয়ান, তামিম আর জিসান।তারাই এসেছিল বর্ণ’কে দেখতে। বর্ণ’র কেবল একটাই অনুরোধ ছিল তাদের –
‘ যা-কিছু হয়ে যাক। পরিবারের কেউ যেনো জানতে না পারে এই জঘন্য ব্যাপারটা।এই শহরে মম-ড্যাড দু’জনের স্বপ্ন পূরণ করতে এসেছিল সে।তারা যদি জানতে পারে ড্রাগস পাচারের মিথ্যা, সাজানো অভিযোগ সে কারারুদ্ধ। ঘৃ!ণা ছাড়া কিছুই দেবে না তাকে।হয়তো তেজ্য করবে। বর্ণ’র পৃথিবী এক দিকে আর পরিবার অন্যদিকে। তাদের চোখে সে ঘৃ!ণা দেখতে চায় না!’
অনেক চেষ্টার পরও বর্ণকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারল না জিসান’রা।তার ফোনটাও নিয়ে নেওয়া হয়। নেওয়ার আগে বাড়িতে একটা ছোট মেসেজ পাঠাতে পেরেছিল কেবল–
‘ আমায় খোঁজো না ড্যাড।আমি ফিরব একদিন।’
বর্ণ’কে রাখা হলো অন্ধকার কুঠুরিতে। যেখানে সূর্যের আলো পোঁছা বারণ। পরিবার , বন্ধুবান্ধব, আলো-বাতাস ব্যাতীত, নিঃসঙ্গ একাকী, অন্ধকার ছোট ঘরটায় প্রিতিটি মূহুর্ত, প্রতি সেকেন্ড একেকটা যুগের ন্যায়। উপরন্তু, রোজ নিয়ম করে দুবার মোটা লাঠির আঘাত পড়তো পিঠে। কোন দোষে, কিসের শাস্তি তা জানানো হতো না।
সময়ের পর সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে বর্ণ’র মাঝে পরিবর্তন আসে। চোখের চাহনি, মুখের কোমলতা লোপ পেয়ে রূপ নেয় গম্ভীর, অনূভুতি শূন্যে মতো।সময় এমনো গেছে যে, স্বেচ্ছায় দেয়ালে ঘুষি মেরে নিজেকে নিজে র-ক্তা-ক্ত করত।লাঠির আঘাতগুলোও তাকে প্রথমের মতো আর কাবু করতে পারে না ঠিকই, কিন্তু এই অত্যাচার ,এই অন্ধকার,এই একাকীত্ব মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে হিংস্রতা’র অন্য এক বর্ণকে তৈরি করতে সাহায্য করেছে নিঃসন্দেহে। এরপর একদিন নিয়মকার মতো পিঠে লাঠিকাঘাত পড়ছিল, অথচ বর্ণ’র প্রতিক্রিয়া নির্বিকার। এমনভাবে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল যেনো,তাকে মারছে না বরং মালিশ করে দিচ্ছে। পুলিশ রূপী পাষণ্ডটা ক্লান্ত হয়ে গেল, এরপরও বর্ণ কে নিরুত্তাপ রেগে গালে চড় বসাতে চাইলে প্রথমবারের মতো বর্ণ হাত বাড়ালো লোকটার গলায়।টুটি এমনভাবে চেপে ধরল যে, লোকটার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এলো প্রায়।কোনো রকম প্রাণ হাতে নিয়ে বেঁচে পালিয়েছিল সেইসময়।
পরদিন তো অ’র্ধমৃ’ত করে ছেড়েছিল। এরপর থেকে আর কেউ তাকে আঘাত করতে আসার সাহস দেখায়নি।দু ওয়াক্ত খাবার দিত,তাও দূর থেকে। এমনি ভাবে ওই অন্ধকার কুঠুরিতে আলো বাতাস গায়ে না মাখিয়ে একদিন নয় দুদিন নয়… প্রায় দেড়টি বছর আটকে রাখা হয়েছে তাকে।আদৌ সে জানতো না,ওটা কারাগার ছিল কী না!
অমানিশায় কাটানো প্রতিটি মূহুর্তের একেকটি দৃশ্য চোখর সামনে আজও ভাসছে বর্ণ’র। মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে বিষ্ফোরণ ঘটছে যেনো।হাতে আগুনের মশাল নিয়ে ধীর পায়ে এক দু’পা এগোল সে। মুক্তির পর নাফিজকে অনেক খোঁজার পরও দেখা মেলেনি।তার সব ডিটেইলস মিথ্যে ছিল। পরবর্তীতে ইনফর্মেশন আসে– দেশে বিদেশে সে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। তন্মধ্যে একটা নাম- জোসেফ জোয়ার্দার! জোসেফ… জোয়ার্দার!
একহাতে আগুনের মশাল রেখে বর্ণ অপর হাতটা সূক্ষ্ম মনোযোগে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে।জীবনের প্রথম তার শুষ্ক, পবিত্র হাতটা সেই ব্যক্তির কলিজার র/ক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, যিনি খুব দম্ভের সাথে সেদিন জজের দায়িত্ব পালন করে তার শাস্তির রায় শুনিয়েছিল।জজ ইনদ্রোজিত মার্কো’র বাঁচার অন্তিম আকুতি, হাহাকার, প্রাণ হারানোর আর্তনাদ সফ্ট টিউনের মতো পৌঁছেছিল কর্ণকৌঠরে।কী যে শ্রুতিমধুর ছিল।
চুক চুক শব্দ করে ধপ এই হাতের মশাল ওই হাতে পার করল বর্ণ। জোসেফের কাছাকাছি গিয়ে উপর নিচ পরখ করল ।এখন খানিকটা সুস্থ দেখাচ্ছে জোসেফকে। মূলত পুণরায় নতুন করে যন্ত্রণা দিতে সুস্থ করা হয়েছে। প্ল্যান চেঞ্জ করেছে বর্ণ। একেবারে মারা যাবে না তাকে। সুস্থ করবে,ফের টর্চার।এরপর আবার একটু সুস্থ করবে, অতঃপর আবার নতুন টর্চার। বিশ্বাস ভঙ্গ, দেড় বছরের দুঃস্বপ্নময় অন্ধকার জীবনের একেক মূহুর্তের শোধ তুলবে… শোধ!
মশালের আগুনের উপর জোসেফের হাতটা সন্তর্পণে তুলে ধরল বর্ণ। ব্যাথায়, যন্ত্রণায় সে দাঁতে দাঁত চেপে থাকে। বর্ণ’র সামনে নত স্বীকার করা যাবে না।তবে, সিদ্ধান্তে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে না,চেঁচিয়ে উঠল।
‘ না তুই সেদিন ফ্রেন্ডশিপ পাতাতে আসতি,না বিশ্বাসঘাতকতা করতি,না আমার জীবনের দেড়টি বছর অন্ধকারে তলিয়ে থাকতো,না আমার ফুলের গায়ে কলঙ্ক লাগত,না ও দুঃখ পেতো,না আমি।আর না আজ এখানে তুই আমি হার-জিত হয়ে মুখোমুখি দাঁড়াতাম।তোর সাথে আমার কোন শত্রুতা?ছিল বলে মনে পড়ে না।চল… আজ বলেই ফেল কোন হিসেবে, কোন বাহানায় এই হাইড এন্ড সিক খেলায় মেতে উঠেছিস!’
আগুনের তাপে হাতের চামড়া কুঁচকে এসেছে প্রায়।জ্বলে, ছিঁড়ে যাওয়ার জোগাড়। অস্থির গলায় আজ হারটা মেনেই নিল জোসেফ–
‘ বলছি… বলছি আগুন সরিয়ে নে প্লীজ!’
#চলবে🥀

