আমার_বোবাফুল #তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্ #বোনাস_পর্ব–০১.

0
58

#আমার_বোবাফুল
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
#বোনাস_পর্ব–০১.

যন্ত্রনায় ছটফট করে ব্যথাতুর মুখে জোসেফ আওড়ালো,-‘ ড্যাড, ড্যাডের প্ল্যানে সব হয়েছিল।’

নিরুত্তাপ মুখে সূক্ষ্ম দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলো বর্ণ। জোসেফের বায়োডাটা’য় তার বাবা সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ ছিল না। প্রশ্ন ছুঁড়ল দৃঢ় গলায়–

‘ কোথায় ওই ব্লাডি বাস্টার্ড?’

জোসেফ একটু জিরিয়ে নেয়। হা করে ঘনঘন প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে ক্ষীণ আওয়াজে বলে,

‘ হি পাস্ড এ্যাওয়ে!কারা যেন খু!ন করেছে ড্যাডকে টু ইয়ার্স এ্যাগো।’

‘ কারা?’
‘ জানা যায়নি আজও।’

সেদিনের স্মাইলি বল’টা হাতে ছিল বর্ণ’র।সেটা দেখিয়ে বলল,-‘ তাহলে সেদিন আমার হাত থেকে তোকে বাঁচাতে চেয়ে এটা কে ছুঁড়ে গিয়েছিল?গেম খেলতে চায় আসফিয়ান বর্ণ’র সাথে?ওয়াও, সুপার খিলাড়ি!’

আয়নার সামনে বসে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করছে তুহফা। শুষ্ক ঠোঁট,লিপ বাম শুকিয়ে গেছে।মুখশ্রী ফ্যাকাশে।তার কোলে গোলাপি রঙা একটা টেডি।টেডির বুকে দুটো শব্দ —Love you jaan! এটা দেওয়া হয়েছে তাকে, ভালোবাসা দিবসের রাতে। তখন পুরো বাড়ি ঘুমন্ত। আচানক ফোনে আননোন নাম্বার থেকে কল এলো, ধড়পড়িয়ে ঘুম ছেড়ে উঠতেই পরপর দরজার আলতো টোকা পড়ল। অথচ ওপারে কোন মানব অস্তিত্ব ছিল না, ছিল কেবল এই টেডি। পরবর্তীতে না আননোন নাম্বারটা থেকে দ্বিতীয় বার কল এলো,আর না এই টেডি’র মালিক সামনে এলো।তুহফা দ্বিধাগ্রস্ত।বাড়িতে সেদিন বাহিরের কেউ ছিল না।তবে কে দিল এটা? একবার মাহিরের নামটা মনে উদয় হলেও পরে নাক কুঁচকাল বিষন্ন মনে।উনি কেন আড়াল থেকে এসব দিতে যাবে তাকে?সে ওই পাষণ্ডের জন্য পাগলীনি হলেও, মানুষটা তো তার অনুভূতি সম্পর্কে জেনেও নির্বিকার।

দরজায় দুবার করাঘাত পড়তেই তড়িঘড়ি করে উঠে টেডিটা বেডে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। অনুমতি দেয়–

‘ ভেতরে আসতে পারিস।’

সুখ হাসিমুখে প্রবেশ করে।বেডে বসল পায়ে পা তুলে।হাসছে মিটমিট।তুহফা সরু চোখে চেয়ে মুখে হাত বুলিয়ে,চুল ঠিক করে বলে,

‘ হাসছিস কেনো?দেখতে বাজে লাগছে আমায়?’
‘ মাহির ভাই এসেছে নিচে।’–ইশারায় বলল সুখ। ঠোঁটের হাসি কমলো না।তুহফা নড়েচড়ে বসে,

‘ যার কাজে যে এসেছে,আ-আমাকে কেনো বলছিস?’

‘ তোমাকে একঝলক দেখার আশায় ছটফট করছে বেচারা।’

‘ এ্যাঁই বেয়াদব, বানোয়াট কথা বলবি না।’

তড়িৎ দু আঙুলে কন্ঠমণি ছুঁলো সে।বুঝাল,

‘ সত্যি বলছি।নূরাকে চুপিচুপি জিজ্ঞেসও করেছে।’

‘ কিহ!’–তুহফার চোখ পাকিয়ে এলো। সত্যিই এমন কিছু হয়েছে?সুখ হাসছে এখনো।নূরা বাচ্চাটা তখন কী কান্ডটায় না ঘটিয়ে ফেলল।মাহির তাকে বলেছিল হয়তো কানে কানে। মেয়েটা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল তখনই,

‘ তুফফ্, মাহির তোমায় খুঁজছে।তুমি কোথায়?’

হতভম্ব মাহির যদিও কথা সম্পূর্ণ করার আগে তার মুখ চেপে ধরেছিল।তবু, আইজা আর রামসা ছুটে এসেছিল ড্রয়িং স্পেসে। লজ্জায় পড়ে বেচারা শেষে পকেট হাতড়ে ময়ূর অঙ্কিত কলম বের করে বোকা হেসে বলে–

‘ সেদিন তুহফার কাছ থেকে পেন’টা নিয়েছিলাম।ফেরত দেওয়া হয়নি। ভাবলাম আজ দিয়ে দেই।’

সুখ অপলক তাকিয়ে থাকে। দুজন পরষ্পরের প্রেমে ডুবে মরছে। অথচ…
ভাবনার মাঝেই ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ভিডিও কল এসেছে, নাম্বারটা বর্ণ’র। দু’দিন ধরে মানুষটা বাড়ি ফেরেনি। এরপর এই প্রথম‌ কল দিয়েছে। তড়িৎ উঠে দাঁড়ায় সুখ।তুহফাকে বুঝাল,

‘ আসছি একটু।’—রিসিভ করতে করতে দরজার বাহিরে ছুটল।তুহফা পিছু থেকে মজার ছলে বলে,

‘ ভাইয়ার কল নিশ্চয়ই?বাঃ বাহ্…কী প্রেম দু’জনের,লা জবাব।’

তামিজ শিকদার সবে গার্ডেন থেকে এসে ড্রয়িং স্পেসে বসেছেন।টুকটাক কথা সারছে মাহিরের সাথে।মাহির এখন বর্ণ’র এ্যাসিস্ট্যান্ট ছাড়াও ছোটখাটো বিজনেস-এ হাত দিয়েছে।এই ব্যাপারেই কথা হচ্ছিল। ফাঁকে রামসা এসে দু-কাপ চা দিয়ে গেল।মাহির কাপে চুমুক রেখে মৃদু হেসে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই হাসি মিলিয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে সামনে হাত তুলে চেঁচায়,

‘ স-সুখ!’

সুখ ততোক্ষণে দ্রুত সিঁড়ি মাড়াতে গিয়ে পা বিঁধে ফ্লোরে ছিটকে পড়েছে।ধুমম শব্দে তামিজ সাহেব চমকে পিছু ঘাড় বাঁকিয়ে চেয়ে মেয়েকে ফ্লোরে দেখে তড়িৎ উঠে ছুটে গেলেন,

‘ আম্মু পড়ে গেলে কী করে? ইশশ্!’

শরীরের আঘাত নিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। চোখে পানি উপচে পড়ছে। থমকে যাওয়া দৃষ্টি। রুবাইয়্যাত তড়িঘড়ি করে এগিয়ে আসে।

‘ আম্মা খুব জোরে লেগেছে না? এভাবে ছুটে কেউ?’

সুখ কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু খেই হারিয়ে কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না।আব্বুর হাত ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ইশারায় পিছু দেখিয়ে কিছু বুঝায়। ভদ্রলোক অস্থির হলেন–

‘ কী হয়েছে মা?ব্যাথা বেশি পেয়েছো।চলো সোফায় এসো।’

অশ্রুসিক্ত চোখে ঘনঘন দুদিক মাথা ঝাঁকায় সুখ,

‘ যা বলতে চাইছে, তার কাছে এই সামান্য ব্যাথা কিছুই নয়।’

সুখ পা টেনে টেনে উম্মাদের মতো ছুটে আইজার কাছে গেলো,হাতের ইশারায় কিছু একটা বুঝাতেই তিনি বললেন–

‘ বর্ণ’র কথা বলছিস?কী হয়েছে আমার ছেলের?’

ঢোক গিলে সুখ বুঝায়, -‘ এ-ক্সি-ডেন্ট!’

দিন-দুনিয়া, জন-মান ভুলে এলোমেলো পায়ে সুখ হসপিটালে ঢুকে।পাগলের মতো এদিক ওদিক ছুটে কাঙ্ক্ষিত জনের দেখা পেয়ে থম মেরে স্থির দাঁড়িয়ে যায়। অদূরে স্ট্রেচারে রক্তাক্ত শরীর পড়ে আছে বর্ণ’র শরীর।নিস্তেজ, নিরুত্তাপ।পা দুটো অবশ হয়ে এলো সুখের। সর্বাঙ্গ কাঁপে থরথর। চোখের পলকে হিতাহিত জ্ঞান শূণ্য হয়ে একছুটে নিকটে চলে এলো। বর্ণ’র চোখ তখন নিভু নিভু, ঝাঁপসা। মুখশ্রী জুড়ে লাল তরলের ছড়াছড়ি।হাতের দুটো আঙ্গুল কাঁপছে,তুলতে চাইছে সুখের দিকে কিন্তু শক্তিতে আজ পেরে উঠছে না।দুঃখ, যন্ত্রণা,হতাশা ভুলে রক্তে ভেজা হাতটা আঁকড়ে ধরল সুখ। বর্ণ’র দুর্বোধ্য হাসে, অতঃপর অর্ধ-বুজা চোখদুটো পুরোপুরি বুজে নেয়। কাঁপা কাঁপা হাতে তার গালে হাত রাখে সুখ।র/ক্তে ফোবিয়া জন্মেছিল তার অথচ সেসবের তোয়াক্কা করল না আজ।বার কয়েক ঝাঁকায়।বর্ণ সাড়া দেয় না। নিঃশ্বাসটাও নিচ্ছে ধীরে ধীরে।সুখ আচমকা দুহাতে বুকে জাপটে ধরে বর্ণ’র মাথা। কেঁদে যায় নিরবে।তামিজ সাহেব এসে ছাড়িয়ে নিলেন।

‘ ছেড়ে দাও আম্মু।ওটিতে নিতে হবে ওকে।’

সুখের কানে পৌঁছায় না সেসব।একহাতে বর্ণ’র হাত চেপে,অপর হাত গালে রেখে ঝাঁকাতে থাকে।

“ আপনি পাষণ্ড, নিষ্ঠুর, খুব খুব খুব স্বার্থপর।
ব্যস, আমাকে কাঁদাবেন বলে নিজের এই অবস্থা করেছেন?প্লীজ একবার চোখ খুলুন।দেখুন আমি ছুটে এসেছি,কাঁদছি আমি, ছটপট করছি। প্লীজ চোখ মেলে দেখুন। আমার একা চলতে খুব ভয়।আপনার হাত ধরে নির্ভয়ে জীবনের বাকি পথ হাঁটতে চাই!কথা দিচ্ছি আর কখনো আপনাকে দূরে ঠেলে দেবো না। প্লীজ কথা বলুন আমার সাথে…!’

সুখের অন্তঃকরণে নিঃশব্দে তোলপাড় উঠা কথাগুলো কেউ শুনল না,কেউ বুঝল না।কজন লোক বর্ণ’কে তার থেকে আলাদা করে নিয়ে যাচ্ছে কোথায়।হাত আঁকড়ে ধরেও নিজের কাছে রেখে দিতে পারল না।তামিজ সাহেব ছলছল চোখে মেয়েকে টেনে ধরে রেখেছেন।সুখ আব্বুর দিকে ফিরে হাউমাউ করে উঠে–

‘ উনি কথা বলছেন না আব্বু।চোখ বুজে আছে। আব্বু উনাকে এক মূহুর্তের জন্য নিজের থেকে দূরে দূরে ভাবলেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসে,শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আব্বু উনাকে চোখ খুলতে বলো।’

এই দুঃসময়ে মেয়ের কথা বুঝ উঠতে পারলেন কী না কে জানে,তামিজ সাহেব ঠোঁট কামড়ে বুকে চেপে ধরে তাকে–

‘ ওর কিছু হবে না আম্মু।ও-তো স্ট্রং!দেখো ঠিক আমাদের মাঝে আবার সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে।দোয়া করো।’

চোখ বুজতেই জবজব অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কানে এখনো বাজছে বর্ণ’র কথাগুলো– ” লোকে বলে, একজনের দুঃখ নাকি আরেকজন বড়জোর ফিল করতে পারে কিন্তু কেড়ে নিতে পারে না।বাক্যটায় কতোখানি সত্যতা লুকিয়ে আছে আই ডোন্ট নৌ।তোর এই ভেতর-ভেতর ধুঁকে ধুঁকে কুঁড়ে খাওয়া দুঃখের পিছু কোথায় না কোথায় আমি ছিলাম। হুঁ, ফুল আমি;তোর একজনমের শখের পুরুষ।ইতিহাসের বিরুদ্ধে গিয়ে তোর দু্ঃখ গুলো সব কেড়ে নিতে না পারি, কিন্তু এর কাছাকাছি তো যেতেই পারি নিশ্চয়ই!ওয়ান্না সি?’

এরপর বাইকের স্পিড হুরহুর করে বেড়ে গেল।সুখ দিশেহারা হয়ে ফোনের ওপারে ছটফট করে বহুবার বারণ করেছে স্পিড কমাতে, কিন্তু পাষাণ লোকটা শুনল না। বরং চেঁচিয়ে বলে–

‘ তোর গায়ে লাগার আগে কলঙ্ক আমাকেও ছুঁয়ে দিয়েছিল ফুল।কলঙ্ক নামের সামান্য কীটগুলোর বেহায়াপনা আসফিয়ান বর্ণ তোড়ায় কেয়ার করে না বলে ”আফসোস করো”, ”ভেঙে পড়ো” এসব নীতি তার নেই।তোর আর আমার মাঝে এটাই পার্থক্য বাকি থাকবে আজ।এ্যাঁই বোবাফুল শোন… তোর শখের পুরুষ ক্ষমতাসীন হলে কোনো এক যাদুবলে শরীর থেকে ওই কীটেদের ছোঁয়া লাগা অঙ্গের চামড়াগুলো চিরদিনের জন্য উপড়ে দিতো। কিন্তু আফসোস এই ক্ষমতাটা সৃষ্টিকর্তা তাকে দেয়নি।পরকালে তোর সাথে একত্রে বসত করার ভাগ্য মিললে এই ক্ষমতা অবশ্যই চেয়ে নেবো খোদার কাছে।স্মৃতি হারালে মানুষ যেমন ফেলে আসা অতীত ভুলে যায়, তেমনি সেদিনের ওই মূহুর্তগুলো দুঃস্বপ্ন ভেবে মেমোরি থেকে ডিলিট করে দে ফুল।যদি বেঁচে ফিরি,যদি এই নিয়ে তোর ভেতরে কিংবা বাহিরে কোন যন্ত্রনা’র ছাপ দেখি।আই সোয়্যার, প্রতিনিয়ত আর নিজের মৃ ত্যু কামনা করতে হবে না ,আমি নিজেই তোকে খু!ন করব।গট ইট?’

তারপর…ভয়ানক একটা আওয়াজের ধাক্কা, ফোনের স্ক্রিনে ওপারের দৃশ্য এলোমেলো ঘোলাটে হয়ে গেলো পরপর। রক্ত ছিটকে এসে ক্যামেরা ছাপিয়ে দিল। ভাবতেই শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয় সুখের।নিভু নিভু চোখ দুটো আস্তে করে বুজে আচমকা নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ল।

সুখকে পাশের কেভিনে রাখা হয়, স্যালাইন চলছে তার। শরীর দূর্বলতা, উপরন্তু মানসিক চাপে জ্ঞান হারিয়েছে।বাহিরে জিসান আর তামিম দাঁড়িয়ে।সাইমাকেও দেখতে পেলো রুবাইয়্যাত। মূলত, এ/ক্সি/ডেন্ট’টা তার স্কুলের সামনেই ঘটেছে।এককান থেকে দু’কান যেতে যেতে তার কাছেও কীভাবে কীভাবে যেন বর্ণ’র খবরটি পৌঁছে গেছে।তাই,তখনই ছুটে এসেছে।

আইজা কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারানোর জোগাড়। রুবাইয়্যাত কাকে সামলাবে কোল পায়না। একবার ছুটে সুখের কাছে যাচ্ছে তো একবার আইজার কাছে।বাড়ির আর কেউ আপাতত আসেনি।আযাদ সাহেব ঢাকায় আছেন।ছেলের এ/ক্সি/ডেন্টের খবর পেয়ে তিনি সেখানে অস্থির।তামিজ সাহেব জানিয়েছেন–এই হসপিটালে জবাব দিয়ে দিলে হয়তো বর্ণকে চিকিৎসার জন্য ওখানে নিয়ে যেতে হতে পারে।তাই তিনি এখনো ফিরছেন না জেলায়।

জেসি অনেক্ষণ ধরে ভাইয়াকে ট্রাই করছে কিন্তু ফোন তুলছে না।ভাইয়া যতোই ব্যস্ত থাকুক, কখনোই তার কল ইগনোর করে না।তবে,কোন সমস্যা হলো নাকি? চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার জো।ভাইয়ার সে ছাড়া কে নেই। সুতরাং,তার সব চিন্তা জেসিকেই করতে হয়।আরও একবার কল দিল। এরপর আরও একবার।ফোন সাইলেন্ট ছিল জিসানের।কী মনে করে পকেট হাতড়ে ফোন হাতে নিতেই জেসির কল প্রবেশ করে। রিসিভ করে কানে তুলতেই মেয়েটা অস্থির গলায় একেরপর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল–

‘ ভাইয়া তুমি ঠিক আছো?কোন সমস্যা হয়েছে?ফোন তুলতে এতোক্ষণ সময় লাগে?জান বেরিয়ে যাচ্ছিল আমার! কোথায় আছো তুমি?’

জিসান ধীরে ধীরে একেকটা প্রশ্নের জবাব করে,
‘ আমি ঠিক আছি। ফোন সাইলেন্ট ছিল।আর এখন হসপিটালে আছি!’

আতকে উঠল জেসি,–‘ হসপিটালে?কী হয়েছে তোমার, সত্যি সত্যিই বলবে। মিথ্যে বললে খুব খারাপ হবে কিন্তু।’

মেহরাব সোফায় ছিল। ল্যাপটপে কিছু করছে।জেসির কথাগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার কানে পোঁছে যাচ্ছে, মেয়েটা কথা বলছে এতো জোরে জোরেই। তন্মধ্যে হসপিটালের নাম শুনে চোখ তুলল নীরবে।

জিসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বর্ণ’র এক্সিডেন্টের সংবাদ জানাতেই জেসি উতলা হয়,

‘ কী বললে? আমার হিরো’র এ/ক্সি/ডেন্ট হয়েছে? কখন, কীভাবে?আমি যাবো তাকে দেখতে,তুমি আমাকে নিয়ে যাও ভাইয়া।’

‘ বনু…’– জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় জিসান।কী বলবে খোঁজে পায়না। কীভাবে বুঝাবে , যেই মুহুর্তে বিয়ের জন্য কবুল পড়েছে,ওই মূহুর্ত থেকে বোনের উপর তার সকল অধিকার ঢিলে হয়ে পড়েছে আপনাআপনি।এটাই জগৎ সংসারের রীতি।চাইলেই আগের মতো যখন যেখানে খুশি নিয়ে কিংবা দিয়ে আসতে পারবে না।চাপা শ্বাস ছেড়ে বলল–

‘ বাচ্চা… আমি তো তোর হিরোকে নিয়ে হসপিটালে।ওকে এভাবে ছেড়ে যাবো?’

‘ ওওহ্। তাহলে আমি হিরোকে দেখবো না?’
‘ তোর ডক্টর’কে বল?’

এতোক্ষণে মনে পড়ল জেসির।খানিক আগে প্রায় ভুলেই বসেছিল সে কোথায় আছে,তার অবস্থানই বা কোথায়।কল কেটে দ্রুত বেড থেকে নেমে মেহরাবের কাছে চলে এলো ।তার জলে চিকচিক করা চোখ দুটো নজর এড়াল না মেহরাবের।জেসি কাঁদো কাঁদো গলায় অনুরোধ করে,

‘ প্লীজ আমায় হসপিটালে নিয়ে চলুন।আমার হিরো এ/ক্সিডে/ন্ট করেছে।ভাইয়া বলল সিচুয়েশন ক্রিটিক্যাল।’

‘ হিরো?’
‘ বর্ণ ভাইয়ার কথা বলছি!’

অনুরোধ ফেলতে পারেনি মেহরাব।জেসি কাঁদছিল ভীষণ।তাই পরদিনই রংপুর শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় দুজন। হসপিটালে নিস্তেজ,মনমরা সুখকে রুবাইয়্যাতের কোলে মাথা রেখে কাঁদতে দেখে মেহরাব চোখ সরিয়ে আনে। অশ্রু গুলো নিশ্চয়ই রকস্টারকে হারানোর ভয়ে?

এতসবের মাঝে দূর থেকে জ্ঞানহীন বর্ণকে দেখে জেসিকে কাঁদতে দেখে বুকের কোথায় জ্বলুনি অনুভব করে।একটা চাপা হিংসে আবিষ্কার করল নিজের মনোভাবে।যাকে ভালোবেসে আপন করতে চেয়েছিল তাকে কেড়ে নিল ওই রকস্টার, অতঃপর যার সাথে তাকে জোরপূর্বক বেঁধে দিল তাকেও আগে থেকেই হাত করে রেখেছে?বাহ্, দ্যাখো বেয়াদব মেয়েটা কেমন প্যাচপ্যাচ কাঁদছে ভাইকে জড়িয়ে।কার জন্য?কার মায়ায়,কোন সম্পর্কে?

প্রায় সাতদিন কোমায় ছিল বর্ণ।এই সাতটা দিন হসপিটাল থেকে সুখকে টলাতে পারেনি কেউ। যতোক্ষণ সজ্ঞানে ছিল, ক্ষীণ দূর্বল শরীরে নির্ঘুম দিন-রাত কাটিয়ে দিয়েছে কেভিনে।মাঝে দুবার জ্ঞানও হারিয়েছে।বর্ণ’র কাছে যেতে নিষেধ ছিল ডক্টরের।ব্যাস,দূর থেকে দিনে একবার বা দুবার দেখার সুযোগ পেতো।

বর্ণ’র জ্ঞান ফিরেছে আজ। কেভিনে শিফ্ট।ঘুমের ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে ঘন্টা খানেক আগে।নীরবে কক্ষে প্রবেশ করে সুখ। বর্ণ’র বুকে, বাহুতে, কপালে,চোয়ালের নিচে ব্যান্ডেজ। ডান হাতটা ভেঙ্গেছে।পায়ে আঁচড় লেগে,ছিলে গেছে।মাথায় জখম বেশি হয়েছে।ঢোক গিলে সে পাশে বসল।ক্ষণকাল একদৃষ্টে ঘুমন্ত মুখশ্রীটা চেয়ে দেখতে দেখতে নীরবে মাথা রাখল ব্যান্ডেজ যুক্ত বুকে।এতে লোকটার ব্যাথা লাগলে লাগুক। স্বেচ্ছায় ম-র-তে যেতে যার বুক কাঁপে না,এই সামান্য ব্যথা তার কাছে কিছুই না।

সুখ আস্তে করে চোখ বুজে বর্ণকে আলতো হাতে জাপটে ধরে। অনেক দিন মস্তিষ্কের কথা সায় দিয়ে নিজেকে কষ্ট দিয়েছে, অনুভূতি-আবেগ সামলে রেখেছে।আজ থেকে শুধু মনের কথাই শুনবে। সমাজের কথা আর ভাববে না।দশ জনে কী বলবে,কী বললো তাতে আর কান দেবে না।এই মানুষটি পাশে থাকলেই আজ থেকে সব কলঙ্ক বরণ করে নিতে রাজি। খানিক পর চোখে অন্ধকার তলিয়ে এলো সুখের। বহুদিনের ক্লান্তি ,নির্ঘুমের অবসান ঘটিয়ে আজ স্বেচ্ছায় ঘুম ধরা দিয়েছে চোখে।এই ঘুম স্বস্তির, প্রশান্তির।

পিটপিট চোখ খুলে অদৃশ্যে চেয়ে থাকে অল্পক্ষণ, এরপর কিছু মনে পড়তেই হতভম্ব চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে উপরে তাকাল সুখ।বর্ণ চোখ খুলে তার দিকেই চেয়ে একদৃষ্টে। শ্বাস আটকে এলো অচিরেই,সুখ ছিটকে দূরে সরে এলো।বেড থেকে নেমে নিচে দাঁড়ায়।মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে গিয়েও সামলে নেয়।সদ্য ঘুম ভেঙ্গে উঠা ফোলকো চোখ দুটোতে ডার্ক সার্কেল। এলোমেলো খোলা চুল। ওড়নাটা অবহেলায় গলায় ঝুলে আছে।বর্ণ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যত্র।যেনো সে ছাড়া কক্ষে কেউ নেই।সুখের কান্না পেলো তাতে। অভিমান হলো।কিন্তু মানুষটাও তো নিশ্চয়ই অভিমানেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে?সেদিন দেহ,ভোগ ইত্যাদি ইত্যাদি বলে কীসব কথা বুঝিয়ে দিয়েছিল না!সেও কী এসব ইচ্ছে করে করেছে? ভেবেছিল ওগুলো বললে– লোকটা দুঃখ পেয়ে তাকে ছেড়ে দেবে,তার জন্য পাগলামি ছেড়ে দেবে। বিচ্ছেদে রাজি হয়ে যাবে। তারপর সে রোজ যেই কল্পনা এঁকে যন্ত্রনাকাতর হয়,সেই কল্পনাটি ভবিষ্যতে কখনো সত্যি হবে না।এতে লোকটা মুক্তি পাবে।

ধীরে সংকোচিত মনে মাথা তুলল সুখ। এখন শখের পুরুষের মান কীভাবে ভাঙবে? ফ্লোরে পা ঘঁষে কচ্ছপের গতিতে পিলপিল পায়ে এগিয়ে যায় সে। লজ্জায়,জড়তায়, অদ্ভুত অনুভুতিতে দেহের ভেতর-বাহির কাঁপছে সেভাবেই, যেভাবে লোকটার সন্নিকটে গেলে প্রতিবার কম্পিত হয়।বর্ণ তখনো মুখ অন্যত্র ঘুরিয়ে রেখেছে।সুখ ঢোক গিলল।একটা দুঃসাহসিক কাজ করার মনস্থির করে।জানে না কতটুকু সফল হবে–

||বিষন্নতা’র অন্তিম প্রহর।সব বিষাদ,মন খারাপির এখানেই সমাপ্তি।আগামী কাল থেকে নতুন কেমিস্ট্রি শুরু হবে যেখানে থাকবে তাদের প্রেম আর প্রেম। এমনি চাওয়া ছিল না আপনাদের,পাঠক?এটাই জানতে চেয়েছিলাম গত পোস্টে||

#চলবে🥀

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here