আমার_বোবাফুল🪽 #তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্ “বোনাস”-(০২)

0
54

#আমার_বোবাফুল🪽
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
“বোনাস”-(০২)

সুখ কক্ষের একধারে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে।তুহফা,মাহির, জিসান, তামিজ সাহেব, রুবাইয়্যাত ও অভ্র কক্ষেই অবস্থান করছে, এদিক-ওদিক।বর্ণ’র কটে’র পাশে, টুলে আইজা। স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছিলেন তাকে। ফাঁকে হঠাৎ বললেন–

‘ কীরে সুখ দূরে দূরে কেনো?কাছে আয়! ক’দিন ধরে তো আমার ছেলের জন্য কান্নাকাটি করে নিজের বেহাল অবস্থা বানিয়ে ফেলেছিস।এখন ওতো দূরে সরে আছিস যে?’

ছোট-বড় সকলের সামনে আকম্মাৎ এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত বোধ করল সুখ।লজ্জা মিশ্রিত হেসে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নজর লুকায়।গাল দুটো অজান্তেই লাল রঙে ভরে উঠে।তখন বর্ণকে কিছুই করতে বা বলতে পারেনি সবাই প্রবেশ করায়।মূলত কেউ জানত না সে ভেতরে ছিল।

বর্ণ হুট করে তাকালো সামনে। চোয়াল শক্ত, চোখের চাহনি কী যে ক্ষুরধার,রাগী রাগী। চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি নামিয়ে নিল সুখ। মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যায় অচিরেই।দ্যাখো কীভাবে তাকিয়েছে লোকটা। ভালোবাসে না, পেছনের ফেলে আসা দিনগুলোর পাগলামী সব মিথ্যে অভিনয় ছিল নির্ঘাত। কেবল তাকে দুর্বল করে দিতে। এখন যখন নিজের শক্ত খোলস ছেড়ে সে বেরিয়ে এলো, ওমনিই চোখ রাঙানি?সেও মুখ তুলল কঠিন চোখে।চেয়েই থাকল।

বর্ণ দাঁতে দাঁত পিষে। অদূরের বোকা ফুল টাকে কিছু করে ফেলতে ইচ্ছে করছে এবার।চোখ খুলতেই তার অবচেতনে বিগত দিনগুলোর সব ইনফর্মেশন কানে এসেছে।খুব তো কেঁদে ভাসিয়ে দিয়েছিল। এখন মন খচখচ করছে,হাত নিসপিস করছে অথচ বলতে পারছে না বর্ণকে স্যুপটা সে-ই খাইয়ে দেবে? উপরন্তু, তখন কাঁপা কাঁপি, লজ্জা-শরমের দোঁহায় দিয়ে কিছু বলতেও পারেনি।নাহ্, বোবাফুল! এবারে আসফিয়ান বর্ণ পাগলামী করবে না,নাতো যেচে কথা বলবে। এবার ফুলের পালা।দেহ, ভোগ ইত্যাদি ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর শব্দ গুচ্ছ প্রয়োগের বিনিময়ে শাস্তি তো পেতেই হবে।আরও কঠিন শাস্তি সামনে অপেক্ষা করছে।আইজা ফের বললেন–

‘ সুখরে আয় এদিকে?’

তুহফা কাঁধে কাঁধ ধাক্কিয়ে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেয়। অগত্যা সে ধীর পায়ে গেল সামনে। রুবাইয়্যাত বর্ণ’র বাহুর পাশে বসিয়ে দিলেন।সেসময় আড়চোখে চায় সুখ। বর্ণ’র মাঝে কোন হেলদোল দেখা গেল না। গম্ভীর মুখে অন্যদিকে ফিরে আছে।

থুতনি গলায় ঠেকিয়ে সুখ মাথা নিচু করে রাখল নীরবে।চোখের তারায় ভাসে বর্ণ’র সেই পাগলামীগুলো।তার জন্য ছিল সব, কেবলি তার জন্য।বুকটা ধড়ফড় করে উঠে।সেই দিনগুলোতে সুখ মুখে কঠোর,নির্দয় আচরণ করলেও মনটা ভীষণ কোমল, ভঙ্গুর ছিল। বর্ণ’র কাতর কন্ঠ , আবেগঘন স্বর, মোহনীয় চাহনিগুলো তার হৃদয়ে কখনো হাহাকার এনে দিয়েছে অথবা কখনো অসীম প্রফুল্লতা। কিন্তু সেসব কভু বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ করেনি।মনের গহীনে চেপে রেখেছে,খুব যত্নে। আচ্ছা,ভালোবাসা এমন কেনো?সে এতো চেয়েও পারেনি আসফিয়ান বর্ণকে ঘৃণা করতে!আর মায়া?মায়া জিনিসটা তো আরও বহুগুণ ভয়ঙ্কর। ভালোবাসলে একসময় ভুলে যাওয়া যায়, মনের অনুভূতি পরিবর্তন হয়; কিন্তু মায়া? একবার যে মানুষ মায়া নামক বিষপান করেছে, তার রেহাই নেই আ-মরণ!সেকী মায়ায় পড়ে গেল তবে?সুখ জানে না। শুধু এটুকুই জানে, পাশের এই পুরুষকে সে হাজার চেয়েও ঘৃণা করতে পারেনি।না পেরেছে হৃদয় থেকে মুছে দিতে।

আযাদ সাহেব আসতেই বর্ণ বলল,

‘ তোমাদের একটা কথা জানানোর আছে!’
‘ কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ না হলে এখন বলো না।তুমি এখনো অসুস্থ।’

‘ শরীরের এসব ব্যাথা-ট্যাথা আমার জন্য কিছুই না।’

হতাশার দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন ভদ্রলোক। একঝলক বর্ণ’র পাশে সুখকে দেখে মৃদু হাসলেন। এরপর গম্ভীর গলায় বললেন–

‘ বলো কী বলবে?’

বর্ণ খানিক সময় চুপ থাকে।সরু চোখে একবার মাহিরকে দেখে, এরপর তুহফাকে প্রত্যক্ষ করে বলে নির্বিকার কন্ঠে,

‘ তুহফার বিয়ে ঠিক করেছি। আগামী সপ্তাহে তারা দেখতে আসবে আর সেদিনই আংটি বদল হবে!’

আলাদা আলাদা ভাবাবেগ-এ কক্ষে উপস্থিত সকলের মুখশ্রীর রঙ পাল্টে গেল।সাহসা তুহফার নজর মাহিরের দিকে ঘুরে গেল অজান্তেই।তখন সেও চেয়েছিল। চোখাচোখি হয়, ক্ষণিকের জন্য দুটো জোড়া চোখের মিলন ঘটে। অব্যক্ত কতো কথাই না ছিল তাদের দৃষ্টিতে। ঠোঁটে ঠোঁট ভিজিয়ে তুহফা চোখ নামিয়ে নিল অতিদ্রুত। তড়িঘড়ি করে জায়গা প্রস্থান করার নিমিত্তে পা বাড়াতে গেলে বর্ণ কঠোর গলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে–

‘ আমি বলছি, ওদিকে আর এক পা-ও বাড়াসনা তুফ!’

তুহফা থামল।ঢোক গিলে আগের অবস্থানে এসে দাঁড়াল।আযাদ সাহেব বললেন বিরক্ত গলায়,

‘ নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবগত আছো? হসপিটালের বেডে বসে আছো তুমি।এই মূহুর্তে বিয়েশাদীর আলাপের প্রয়োজনীয়তা দেখছি না। এসবের জন্য আরও বহু সময় পড়ে আছে।’

‘ পরবর্তীতে তোমাদের মাঝে আমি না-ও থাকতে পারি।তাই এখনই সব বলছি। জিসান বাকি ডিটেইলস দিয়ে দিস ড্যাডকে।’

ফট করে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো সুখ।কী বলল বর্ণ? পরবর্তীতে না-ও থাকতে পারে সবার মাঝে? কোথায় যাবেন উনি?

বর্ণ সত্যিই ছিল না পরবর্তীতে। হসপিটাল থেকে বাড়ি না এসে কোথাও চলে গেল। একবার সুখ জানতেও পারল না।বাড়ির অন্যরা জানে কী না কে জানে।গত ছয়দিন ধরে সে অপেক্ষার প্রহর গুনছে, এই বুঝি মানুষটা এলো।সুখের পাশে শুয়ে, ঘুমের ভাব ধরে একহাত তার গায়ে তুলে দিল, মধ্যরাতে। অথচ এমন কিছুই হলো না।এলো না বর্ণ। অস্থির সুখ ভেতরে ভেতরে অধৈর্য হয়ে পড়ছে। কেমন আছেন মানুষটা? হাতের হাড়ে জখম হয়েছে।সুতরাং,ব্যান্ডেজ রাখতে হবে মাস খানেক।শেষ বার যখন দেখেছিল তখন মাথাতেও ব্যান্ডেজ।এখনও তেমনি আছে?

উফফ্…এবার রাগ হচ্ছে সুখের।তবে কার উপর সঠিক ইয়াত্তা নেই, কিন্তু হচ্ছে। একবার চুল খামচে ধরে কক্ষের অস্থির পায়ে এদিক ওদিক পায়চারি করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো।এই কক্ষে বসে থাকলে লোকটাকে আরও বেশি মনে পড়ে।মনে হয় রুমটা অসম্পূর্ণ।
•··
‘ কী হয়েছে। কাঁদছো কেন?’ – প্রশ্নটি সুখ করেছে ইশারায়।তাতে কোন আওয়াজ ছিল না।নূরা বুকে হাত চেপে নড়েচড়ে বসল গাল ফুলিয়ে।চোখ জলে টইটুম্বুর। ভাব-ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল, সে কথা বলতে চায়না, অভিমান করেছে।

‘ বলবে না তো?’
‘ তুফফ্ ধমকেছে।চড়ও মারতে চেয়েছিল!’

সুখ চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে ক্ষণকাল। সচরাচর তুহফাকে এমন আচরণ করতে দেখা যায় না।ছোটদের সাথে তো একদমই না।সে সবসময় শান্তশিষ্ট থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে।নূরার গা ঘেঁষে স্ব ভাষায় জানতে চাইল–

‘ এর আগে তুফ্ কখনো ধমকেছে তোমায়?গায়ে হাত তুলেছে?’

ঠোঁট উল্টেপাল্টে দুদিক মাথা ঝাঁকায় নূরা।এই প্রথম এমন করেছে দেখেই তো কান্না পাচ্ছে তার।সুখ মৃদু হেসে বুঝাল–

‘ বি পজেটিভ নূরা।হয়তো তুফের মন-মেজাজ তখন খারাপ ছিল। মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে এমনটা করে ফেলেছে।’

নাক টেনে ঘাড় কাত করে নেমে নিল নূরা।সুখ বুঝায়–

‘ এই তো গুড গার্ল।তুফ্ এখন কোথায় জানো?’
‘ গার্ডেনে!’
•··
সুখকে কাছে আসতে দেখেই মুখ অন্যত্র ঘুরিয়ে চোখ মুছে নেয়। এগিয়ে আসার ফাঁকে সুখ স্পষ্ট দেখল তা। কাঁদছিল তুহফা। পাপড়ি এখনো ভেজা।সুখ নিশ্চুপ পাশের চেয়ারে বসল।তুহফা জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে হাসার চেষ্টা করে জোরপূর্বক। নীরবতা চলল অল্পক্ষণ। এরপর তুহফা মুখ খুলল–

‘ ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে তোর? শরীরে ব্যান্ডেজ অবস্থায় কোথায় চলে গেল?বাড়ি ফিরছে না কতোদিন।’

মুখে আঁধার নেমে এলেও ঠোঁটে টিপে দুর্বোধ্য হাসে সুখ।বুঝায়–

‘ কথা হয়নি।জানি না কোথায় আছে!’
‘ ওহ্!’ –স্বল্প আওয়াজ ঠোঁট গোল করে শব্দটি আওড়ে আকম্মাৎ সুখের দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল। ক্রন্দনরত গলায় বলে গেল গড়গড়,

‘ প্লীজ ভাইয়াকে বুঝা না আমি এখন বিয়েতে বসতে প্রস্তুত নয়।এখনই বিয়ে করতে চাই না।’–চোখ টলমল করছে। অশ্রু গড়াবে এখনই।সুখ থমকে গেল। চোখের অবাক চাহনিরা যেন প্রশ্ন করছে,

‘ আমি বলবো? শুনবেন উনি?’
‘ প্লীজ চেষ্টা করে দ্যাখ। অবশ্যই ভাইয়া তোর কথা শুনবে। ভালোবাসে তো তোকে।’

মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়ায় সুখ। মিথ্যে!লোকটা একটুও ভালোবাসে না তাকে।তুহফা ফের বলল–

‘ কী হলো, বলবি তো ভাইয়াকে?’
‘ আমি বললেই উনি কেনো শুনবে?কে হই আমি উনার?’

তুহফা চেয়ে রইল খানিক সময়। সুখের ইশারা অনুধাবন করে বলল,-‘ বিয়ে হয়েছিল তোদের। একঘরে থাকিস দু’জন। সম্পর্কে হাসবেন্ড-ওয়াইফ।’

সুখ বিনিময়ে জানতে চাইলো,-‘ মাহির ভাই কিছু বলেছে?’

তুহফা চমকে তাকাল । এরপর তপ্ত শ্বাস ছেড়ে নজর সরিয়ে আনে। সেদিন সকলের আড়ালে বলতে চেয়েছিল হয়তো কিছু, কিন্তু সে শুনতে আগ্রহ দেখায়নি।
•··
একেরপর এক কল আসছে ফোনে।জেসি ঘুমের ঘোরে বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। আরামের ঘুমে শত্রুতা কে করল আবার?কার পাকা ধানে মই দিল সে?নাম-দাম পরখ না করেই রিসিভার তুলে কানে চাপল।

‘ হ্যালো কে বলছেন?এই সাত সকালে কেউ কাউকে কল দেয়?’

ওপাশ থেকে অত্যাধিক আশ্চর্য সমেত একটি মেয়েলি স্বর ভেসে এলো,-‘ জেসি… তুমি এখনো ঘুমাচ্ছো?ক’টা বাজে সে-খেয়াল আছে?’

‘ ওওহ্ মিহিকা বেবী? ক’টা বাজে এখন?’
‘ সাড়ে দশ!’

টেনে টেনে জেসি আওড়ালো,-‘ সা—ড়ে দশ।’

‘ ইয়েস… তুমি এখন শশুর বাড়িতে জেসি।এতো বেলা ঘুমাতে এই নিয়ে বহুবার বারণ করেছি কিন্তু।’

আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে জেসি। বেশিক্ষণ ঘুমে থাকার ফলে মুখটা ফোলকো ফোলকো দেখাচ্ছে।মিহিকা হলো জিসানের হবু বউ। ব্যাপারটা এমন হয়েছিল যে,দু বছর আগে জেসিরা যেই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে থাকতো,তার মুখোমুখি মিহিকাদের ফ্ল্যাট। উপরন্তু, মিহিকা জেসির টিউটর।এভাবে আসা যাওয়া ফাঁকে মিহিকা জিসানের প্রেমে ডুবে গেল অজান্তেই। কিন্তু জিসান এসবের তোয়াক্কা করে না।তার কাছে আপাতত জেসিই সব। অন্যদিকে ধ্যান দিয়ে জেসি’র চিন্তা মনের আড়াল করতে চায়না। কিন্তু মাঝখানে বাঁধ সাধলো জেসি নিজেই।মিহিকা’কে ভাইয়ের বউ হিসেবে তার খুব মনে ধরেছে।তারও কারণ আছে। জিসানের কাছে প্রত্যাখ্যান পেয়ে মিহিকা জেসির কাছে এসে খুব কেঁদেছিল।কতো কী বুঝাল।এতে আরও গলে গেল মেয়েটা। এরপর কতো ব্ল্যাকমেইল করে ভাইয়াকে রাজি করিয়েছেন বিয়ের জন্য।তবে, জিসান ততোদিন পর্যন্ত বিয়ে করবে না যতোদিন না জেসি’কে ভরসাযোগ্য কারো হাতে সমর্পণ করতে পারছে।

তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো জেসি। আশেপাশে মেহরাবকে চোখে পড়ল না।হয়তো হসপিটালের জন্য বেরিয়ে গেছে।মায়রা তখন মীরাভকে খাওয়াচ্ছে।জেসি মাথা চুলকায়।দেরী করে ঘুম থেকে উঠলে কেউ কিছু বলে না দেখেই সে পার পেয়ে যায়।নাহ্.. কাল থেকে দ্রুত উঠার চেষ্টা করবে। কিন্তু এই বদভ্যাস পাল্টাবে আদৌও?

‘ উঠেছো?’–মীরাভের মুখে খাবার পুরে মায়রা পিছু ঘুরে জানতে চাইলো। কন্ঠে মিষ্টতা মিশ্রিত ছিল কী না বুঝা গেল না।জেসি দাঁতে নখ খুঁটে সোফায় আস্তে করে বসে অপরাধী সুরে বলল–

‘ স্যরি আপু। আজও লেইট হয়ে গেল ঘুম ছেড়ে উঠতে।’

‘ বেলা করে ঘুম ছেড়ে উঠার অপরাধে কটু কথা শুনাতে তোমার শশুর-শাশুড়ি নেই।যখন ইচ্ছে উঠতে পারো।এ্যাজ ইয়্যু উইশ।’

‘ শাশুড়ির জায়গায় তো আপনি আছেন।পাক্কা প্রমিজ কাল থেকে সকাল সকাল উঠে আপনার কাজে হেল্প করবো।’

মায়রা অগোচরে ঠোঁট টিপে হাসল।মীরাভ ড্যাবড্যাব করে জিসির দিকে চেয়ে আছে।কী মিষ্টি গুলুমুলু বাচ্চাটা।অদূর থেকে ঠোঁট চুকা করে চুমু ছুঁড়ে দিল জেসি।এতে বাচ্চাটা ঠোঁট এলিয়ে হাসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো।হাতের তিন আঙুল নাড়ে তাকে কাছে ডাকার ভঙ্গিতে। আধ-ভাঙা গলায় ডাকে,

‘ মা-ম্মা-নি।’ —এই নামে জেসিকেই সম্বোধন করছে।জেসির ইচ্ছে করল মীরাভকে জাপ্টে ধরে গালে দু’চারটা চুমু দিয়ে দিতে। কিন্তু এখন দেওয়া যাবে না। খাচ্ছে সে।মায়রা জানতে চাইল,

‘ রাঁধতে পারো?’

মুখটা অচিরেই মলিন হয়ে গেল। হুটহাট ভাইয়ার কথা মাথায় এলো জেসির।জিসান কখনো রান্না ঘরে যেতে দিতো না তাকে।নিজেই রান্না করে তাকে খাইয়ে দিত; এরপর বাকি কাজ। কিন্তু তবু,সে লুকিয়ে চুরিয়ে ভাইয়ার জন্য অগোছালো হাতের রান্না করে সারপ্রাইজ দিত প্রায়শই।তখন অবশ্য ভাইয়া রাগ দেখাতো না বরং তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে বলতো–

‘ আমার বনু তাহলে বড় হচ্ছে?বিয়ে দিতে হবে নাকি এবার? পাত্র খোঁজা শুরু করবো?’

সেসব দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করে চাপা শ্বাস ছেড়ে জেসি জবাব দেয়,-‘ পারি একটু আধটু।’

মায়রা সজোরে মাথা নাড়ায়। এরপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

‘ উমঃ জামাটা তোমার গায়ে খুব মানিয়েছে।তবে…’

তবে কী?আনমনেই নজর ঘুরে গেল জামার দিকে। পরক্ষণেই চোখ পাকিয়ে আসে। দাঁতে জিভ কেটে বোকা হেসে বলে–

‘ ওহ্,তাড়াহুড়ো’য় উল্টো জামা পড়ে চলে এসেছি।’
•··
সময় কাটছে না সুখের। প্রতিটি মূহুর্ত পার হচ্ছে তড়পাতে-তাড়পাতে।এক ঝলক আসফিয়ান বর্ণকে দেখার নেশায় চোখ দুটো বড্ড জ্বালা করছে।ফোন হাতে নিয়ে বর্ণ’র নাম্বারে প্রবেশ করল। মেসেজ দেবে একটা?নাহ্… তাকে যার মনে পড়ছে না।সে কেনো যেচে খবর নেবে?

ঠিক সেই মূহূর্তে ওই নাম্বার থেকে মেসেজ ঢুকল। হ্যাঁ, বর্ণ’র নাম্বার থেকেই।

‘ শেষ বারের মতো এক নজর দেখতে চাইলে চলে আয় আমার কাছে।নিচে গাড়ি ওয়েট করছে।’

ব্যাস, একুটুই।থমকে গিয়ে হতবুদ্ধির মতো মেসেজটার দিকে চেয়ে রয় সুখ। বোধগম্য হলো না কথাটির যথার্থতা।সে কিছু একটা লিখে পাঠায় কিন্তু পৌঁছায় না ওপাশে। তাকে ব্লক দেওয়া হয়েছে।চোখ খিচে অনেক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে সুখ। এখন আবার কী চাইছে মানুষটা?

ব্যালকনিতে গিয়ে দেখে সত্যিই গেটের বাহিরে কালো রঙের একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।সুখ কী করবে বুঝে উঠতে পারে না।যাবে? না কি যাবে না?
•··
কাউকে না বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল সুখ।গাড়ি চলছে তো চলছেই।কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানে না।মাথা’য় কেবল একটাই ভাবনা।আসফিয়ান বর্ণ’র দেখা পেলে প্রথমে একটা কষিয়ে থাপ্পড় দেবে।পরে যা হয় হোক।

গাড়ি থামতেই একজন এসে ডোর খুলে দিল।যেন তারই অপেক্ষায় ছিল।ধীরে গেট দিয়ে প্রবেশ করে সুখ।সরু পথের দুধারে একই পোশাকধারী সামরিক বাহিনীর মতো একাধিক তাগড়া যুবক সটান দাঁড়িয়েছিল।তাকে দেখেই একেকজন মাথা নত করে বেরিয়ে যাচ্ছে গেট পেরিয়ে। এলোমেলো পা চালিয়ে বর্ণ কে খোঁজে চলে সুখ। কোথায় আছে সে?

একসময় পা থমকে যায়। থমকে যায় হৃদস্পন্দন।অদূরে… বর্ণ গাড়ির বনেট-এ বসে। দৃষ্টিরা সুখের দিকেই চেয়ে আছে।ডান হাতে এখনো ক্রেপ ব্যাগ বাঁধা।কপালেও ব্যান্ডেজ। সুখের চোখ ভরে উঠল।ধীর পায়ে এগোল সামনে।বর্ণ ঠোঁটের কোণে হাসি তুলে বলে–

‘ ওয়েলকাম টু মাই কিংডম মিসেস আসফিয়ান বর্ণ!’

অন্তঃকরণ ছলকে উঠে; তবু আশেপাশে তাকায় না সুখ।এক পা দু’পা করে বর্ণ’র মুখোমুখি গিয়ে থামল।বোবাফুলকে সূক্ষ্ম চোখে আগাগোড়া পরখ করে ভ্রু নাচিয়ে হাত ধরে নিকটে নিয়ে আসতেই সুখ বুঝাল –

‘ আপনার নামের সাথে আমার নাম আর এক মুহূর্তও জুড়ে থাকুক আমি চাইনা।আই ওয়ান্ট ডিভোর্স।’

সায় দেয় বর্ণ,-‘ খুব শিঘ্রই হয়ে যাবে।লয়্যারের সাথে কথা হয়েছে।’ –সংবাদটি চরম মিথ্যে। কেবল ফুলকে উষ্কে দিতে। সুখের ঠোঁট কেঁপে উঠে। দিগ্বিদিক ভুলে হামলে পড়ে বর্ণ’র প্রসস্থ বুকে।কিল, ঘুষি মেরে ক্ষান্ত হতে না পেরে বুকের পাশের টিশার্ট খামচে ধরে নিকটে টেনে এনে দাঁত বসিয়ে কামড়ে ধরল ঘাড়। ততোক্ষণ পর্যন্ত চেপে ধরল, যতোক্ষণ না জিভে রক্তের নোনতা স্বাদ অনুভব হয়েছে। এরপর ছেড়ে দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস টানে। বর্ণ’ টু শব্দ করে না।ঘাড়ে হাত বুলিয়ে আঙুল চোখের সামনে আনে, র-ক্ত বেরিয়ে এসেছে। মৃদু হেসে সুখের দিকে চেয়ে জানতে চায়–

‘ শান্ত?এই অল্পতেই সব হম্বিতম্বি শেষ?’

সুখ প্রতিক্রিয়া দেখায় না।মুখ বিকৃত করে দাঁড়িয়ে রয়। ওড়না টেনে বর্ণ পুণরায় সুখকে কাছে নিয়ে এলো ।বলল–

‘ ক’দিন হয়েছে?’
‘ টুয়েন্টি ফোর!’

‘ চ্যালেঞ্জ কে জিতেছে?’
‘ অভিয়্যাসলি আমি। ফিফটিন ডে’জ হ্যাভ পাস্ড।’

ঠোঁট গোল করে মাথা নাড়ায় বর্ণ।বলল ভ্রু গুটিয়ে,-‘ জিতিয়ে কে দিয়েছে?’

‘ কেউ না!’

ঝরে পড়ার আগে আলগোছে সুখের চোখের অশ্রু মুছে দেয় বর্ণ। মুখশ্রী জুড়ে নজরের বিচরণ শেষে স্থির করে থরথর কাঁপছে থাকা অধরে।ঢোক গিলে চেয়ে রইল একদৃষ্টে। নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছে ক্রমশ। আনমনেই মুখটা বাড়িয়ে নিয়ে যায় আস্তে ধীরে। তপ্ত শ্বাস আঁচড়ে পড়ছিল সুখের নাকে। ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁই ছুঁই।ঠিক সেসময় সুখের কম্পিত ঠোঁটজোড়া নড়ে উঠল–

‘ কিস করার চেষ্টা করলেও খুব খারাপ হবে।’

বর্ণ ভ্রু তুলে বলল,-‘ কিস? আমি তো এমন কিছু ভাবিনি এখনো!তুই ভেবেছিস?’

‘উঁহু’–ঘনঘন দুদিকে মাথা ঝাঁকায় সুখ। বর্ণ ‘ও’ ভঙ্গিতে ঠোঁট চোকা করে,

‘ আবঃ কিস কীভাবে করে জানিস? অবশ্য দেখে মনে হয়না এসব জানিস বা এটার মর্ম বুঝিস।’

চরম অপমান বোধ করল সুখ। দুঃসাহসিক এক কাজ করে বসল পরপর।চোখ খিচে পা তুলে বর্ণ’র সমান হয়ে অধর জোড়া ছুঁয়ে দিল তার অধরে। পরক্ষণেই সরে আসে তড়িৎ।দেহ-মন সর্বত্র কেঁপে উঠল থরথর।বর্ণ মুখ বাঁকাল–

‘ এটাকে কিস বলে?’

পর মূহূর্তে বাঁ হাত উঠে এলো সুখের ঘাড়ের পিছে। এবং অধর পাপড়ি জোড়া বন্দী হয়ে গেল পুরুষালী অধরে।বর্ণ পানি খাওয়ার হলো গিলে নিতে লাগে ফুলের অধরের মিষ্টতা। অন্যদিকে সুখ দিশেহারা।খেই হারিয়ে খামচে ধরে বর্ণ’র চুল।

‘ সিয়াম… সিয়াম!’ —জবাব না পেয়ে আরও একবার ডাকল জিসান। এরপর ফোন থেকে নজর তুলে তাকাল সন্তর্পণে।সিয়ামের স্থির দৃষ্টি সামনে।মাথায় বজ্রপাত পড়ে থমকে গেল নাকি?জিসান নিজেও সামনে চাইল। কিছুই নেই,ফুলে ফুলে ভরা গার্ডেন ব্যাতীত।সিয়ামের চোখ থেকে কালো সানগ্লাস’টা খানিক উপরে তুলে কপাল গুটিয়ে নিল জিসান।ছেলেটার মুখ গার্ডেনের দিকে হলেও, চোখের কোণা দৃষ্টি অন্যত্র।সেই দৃষ্টি অনুসরণ করতেই দেখা মিলল বর্ণ-সুখের একান্ত মূহূর্তের দৃশ্যপট। অচিরেই নজর ফিরিয়ে নিল।না তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে সিয়ামের কান টেনে এগিয়ে চলল সামনে,গেটের অভিমুখে।চলতে চলতে বলল–

‘ প্রাইভেসি টাইম স্প্যান্ড বলে এটাকে।সে দেখলে আন-ড্রেস করে আগুনে শুকাতে দেবে, ব্রো!’

সিয়ামের আফসোস বাণী।বলে উঠে অস্থির গলায় -‘ দোস্ত দোস্ত দোস্ত রে। চারপাশে কাপলদের এসব দেখে আর সহ্য করতে পারছি না।আমিও বিয়ে করবো।পাশা খেলব দোস্ত!’

বেপরোয়া,উম্মাদ বর্ণকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সুখ।দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়।সরে আসতে চেয়েও পারে না। হঠাৎ আবেশে এক বিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।তার এক জীবনের শখের পুরুষের এতোটা কাছ থেকে,এতো গভীর ছোঁয়া অনুভব করতে পারবে কখনো।তা কল্পনাতীত ছিল সুখের।

#চলবে🥀

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here