#আমার_বোবাফুল(৫৮)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
স্ক্যাচ বুকে সবচেয়ে আপন চৌদ্দ জনের নাম তালিকা করার আদেশ দিয়েছে বর্ণ। এবং পাশে নামটির সাথে তার কী সম্পর্ক ,তাও উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।সুখ দ্বিধান্বিত মনে ভেবে ভেবে চৌদ্দ জনের নাম লিখে দিল। শুধু নামই তো; কঠিন কোন কাজ নয়!সবার শেষে রাখল আসফিয়ান বর্ণকে।এটা তার উপর করে আসা নিষ্ঠুরতার সামান্য প্রতিশোধ মাত্র।বর্ণ ভ্রু তুলে ক্ষণকাল চেয়ে রইলো সেদিকে। ঠোঁটে একপেশে হাসল অল্প। এরপর বলল,” রিমোভ ফাইভ নেইম’স হেয়ার।”
বাক্যটি শ্রুতিপথে পৌঁছাতেই থমকে মাথা তুলল সুখ। হৃদয় ও মস্তিষ্ক বিচরণ করে যে আপনদের নাম স্ক্যাচ বুকে তুলেছে অঢেল আবেগ দিয়ে।এখন তাদের মধ্য থেকে যেকোনো পাঁচজনের নাম কেটে দিতে হবে!মানে আপনদের তালিকা থেকে তাদের বহিষ্কার করার সামিল!সুখের কী অযথাই কষ্ট হবে না এতে? হচ্ছে তো!জানতে চাইল,” এটা করব কেনো?”
” এটাই তো খেলার নিয়ম।সবে স্ট্যার্ট হয়েছে।”
রাত দিন যাদের মাঝে অবস্থান,তারাই সুখের প্রিয়দের শীর্ষে।কেনো যেনো মনটা ছটফট করছিল তার। কাঁপা হাতে রামসা,সাইমা বুয়া,অনিতা, ইবরাত ও ফাহা’র নাম তালিকা থেকে কেটে দেয় সুখ।বর্ণ বলল,” এবার আরো তিনটি রিমোভ কর!”
” উুঁ?”–সুখ হতবিহ্বল হয়। যাদের নাম কেটেছে তারা সুখের ততটা প্রিয় না হলেও বাকিরা সব তার খুব… খুব আপন। দুদিকে মাথা ঝাঁকায় সুখ।সে পারবে না।বর্ণ বলল,” কী না না করছিস?যেই খেলা শুরু করেছিস, সেটা তো মাঝপথে থামিয়ে দেয়া চলবে না, সুইটহার্ট। ক্যারি অন!”
এরপর বড়-আব্বু,বড়-আম্মু আর দাদু’র নামও কাটা গেল।বাকি রইল ছয়টি। বর্ণ ফের আরও তিনটি নাম কাটতে বাধ্য করল সুখকে।চোখ ছলছল করছিল সুখের। বুকের ভেতরের কলিজাটা যেন কেউ চেপে ধরে রেখেছে।বহু কষ্টে তুহফা,অভ্র আর নূরা’র নাম কেটে কলম রেখে দেয় সে।বাকি তিনটি নাম বেঁচে আছে। প্রথম দুটি– আম্মু,আব্বু আর… আর শেষ নামটি তার শখের পুরুষ আসফিয়ান বর্ণ।ঢোক গিলল সুখ।ভয় পাচ্ছে এবার। বর্ণ প্রায় অনেক্ষণ চেয়ে থেকে ঠোঁট কামড়ে, এরপর মুখ খুলতে গেলে সুখ তড়িৎ ঠোঁটে হাত রেখে তাকে থামিয়ে দেয়। দুদিকে মাথা ঝাঁকায়; অনুনয় মুখশ্রীতে বুঝাতে চায় –যেটা বলতে চাইছে, সেটা যেন মুখে না আনে। কিন্তু সুখ কী ভুলে গেল আসফিয়ান বর্ণ যে নিষ্ঠুর? চোখের অশ্রু, অনুনয়-বিনয় তার মন গলাতে পারে না; যতোক্ষণ না সে নিজে চাইছে। সুখের হাতটা সরিয়ে বলল ধীর গলায়,” নাউ, কাট ওয়ান নেইম ফ্রম হেয়ার!”
যা ভয় পাচ্ছিল,তাই হলো। টুপটাপ অশ্রু বেয়ে পড়ল সুখের চোখ গলে। পৃথিবীর যা হয় হোক, সব ধ্বসে পড়ে যাক, দুনিয়া এপাশ থেকে ওপাশে উল্টে যাক –এই তিনটি নাম বা মানুষ’কে কখনো পাল্লায় মাপতে পারবে না সে।এরা প্রত্যেকে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, একেকটা অবস্থান, একেকটা নাম। যাদের ব্যতীত সে নিজের অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারে না।এই তিনটি নাম থেকে কাকে ছেড়ে কার নাম কাটবে সুখ?সে হাত জোড় করে অশ্রুসিক্ত চোখে বুঝায় –
” প্রয়োজনে আমি আপনার সাথে এখানে থাকব যতোদিন আপনি চাইবেন।তবু, এই কঠিন পরিক্ষা নেবেন না।আমি পারব না এখান থেকে আর একটি নামও কাটতে।”
বর্ণ সন্তর্পণে কাছে টেনে নিল তাকে। মুখের চুল সরিয়ে অশ্রুভেজা দু চোখে ঠোঁটের পরশ বুলিয়ে বলল,” ডোন্ট ক্রাই মাই কুইন।ব্যস,নামই তো। এর বাহিরে কারো কিচ্ছু হবে না।”
সুখ ঘনঘন মাথা নাড়ে দুদিক।তবু,সে পারবে না।বর্ণ বলল,” ওয়েট অ্যা মিনিট।”–এরপর কিছু লিখল কলম খষে।যাতে লেখা ছিল –বোবাফুল, মম-ড্যাড, ভাই-বোন, পরিবার,পুরো পৃথিবী।
এক নিঃশ্বাসে ,এক লহমায় সব নামের উপর দাগ কেটে ফুলের নামটা রেখে দিয়ে বলল,” দ্যাখ, পুরো পৃথিবীকে ছেড়ে, ব্যস তোকে বেছে নিতে আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না। দিব্যি নির্বিকার আছি আমি,লুক অ্যাট মি!”
সুখ স্তব্ধ হলো স্ক্যাচ বুকে তাকিয়ে। লেখাগুলোয় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। ব্যাস একটুখানি ভালোবাসা চেয়েছিল সে। চাইনি পুরো পৃথিবীকে ছেড়ে বর্ণ তার হোক। বর্ণকে দেখল একবার। পুরুষটি নিরুত্তাপ।কী যেনো ভেবে ধীর লয়ে হাত উঠিয়ে তার বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরে।যদি এতোই নির্বিকার হবে,তবে হৃদস্পন্দন ছুটছে কেনো?বর্ণ বলল চোখ টিপে,” তুই কাছাকাছি এলেই এমন হয় সোনা বউ! তখন একে আর দমিয়ে রাখার সাধ্য থাকে না আমার। ইভেন,এখনো তোর কান্না ভেজা লাল স্ট্রবেরি গাল দুটো দেখে হঠাৎ প্রেম প্রেম পাগলামী করতে ইচ্ছে করছে।বহু কষ্টে কন্ট্রোলে রেখেছি ইচ্ছে গুলোকে।আগে খেলা শেষ করি?”
” আমার মতো একটা মেয়ের সঙ্গ পেতে সব ছেড়ে দিবেন এভাবে?কেনো?”
” উত্তর পরে পাবি, প্রথমে যা বলছি তা কর !”
আবারও সেই কঠিন মূহুর্ত!সুখ নাম তিনটি পড়ল।খুব মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়ল। পুণরায় চোখ ভরে উঠে অশ্রুতে।কী করবে সে?শেষ বারের মতো বর্ণকে বলল,” আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনি দেখতে পাচ্ছেন? পারছেন অনুভব করতে ?”–পরক্ষণেই বলল,” পারবেন না। আপনি খুব নিষ্ঠুর, পাষণ্ড!”
বর্ণ এক শব্দে নেমে নিল শেষের অভিযোগ। সুখের হাত কাঁপছে, কাঁপছে সর্বাঙ্গ।কাকে ছেড়ে কাকে রাখবে? আম্মু?আব্বু?না শখের পুরুষ’কে;যে তার স্বামী; সে যার বাঁ পাঁজরের হাড়?
” এটা করে কী হবে?”
বুকের বাঁ পাশে হাত রাখল বর্ণ। বলল,” শান্তি মিলবে এখানে, অথবা হতাশা!”
সুখ পুণরায় কলম তুলে নিয়ে তাকাল।বুঝাল,” আমি আম্মু-আব্বুর কাছে ফিরব না আপনার মতের বিরোধ করে।তবু, তিনজন থেকে একজনকে বিয়োগ দিতে বলবেন না। আমার জীবনে এই তিনজন ছাড়া আর কাউকে চাই না। এদের মধ্য থেকে একজনকে ছেড়ে অন্যজনকে বেছে নেওয়ার সাহস আমার নেই।”
বর্ণ অনিমেষ তাকিয়ে থাকে।খেলা অসম্পন্ন রেখে ফুলকে আজ ছাড়বে না। সুখের হঠাৎ চোখ যায় বর্ণ’র লেখাগুলোতে।একটা নামের সূচনা করতে চেয়েও স্থগিত রেখে দিয়েছে সবার শেষে। হ্রস্ব-ই দিয়েছে কেবল।সুখ কলমটা সেদিকে চালাল কী ভেবে।নামটা সম্পন্ন করে লিখে দিল– গিটার।
এরপর এগিয়ে দিল বর্ণ’কে।বুঝায়,” বোবাফুল অথবা গিটার একটিকে কাটুন!”
বর্ণ’র চোয়াল আচানক কঠোর হয়ে গেল হুটহাট।তাতে বিন্দুমাত্র দুষ্টুমি কিংবা হেঁয়ালিপনার আভা দেখতে পেলো না সুখ।এতে সুখ আরো দৃঢ় হলো।ফের বুঝাল,-” কী হলো?হাত থমকে গেল?”
তখনই ফোন এলো।বর্ণ রিসিভার তুলে কানে ধরে লম্বা কদমে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় কক্ষ ছেড়ে ।সুখ তার যাত্রা পথে তাকিয়ে রইলো বিমূর্ত চোখে।সে স্পষ্ট দেখল আসফিয়ান বর্ণ ফোনের বাহানায় এক প্রকার এই পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে গেল যেনো।এতোই আপন ওই গিটার?যেই পুরুষ পরিবার, আপনজন এমনকি পুরো পৃথিবীর নিয়ম ভেঙে শুধু তাকে চাইতে এক মূহুর্ত নিল না,সেই পুরুষ গিটার ছাড়তে পারবে না!কী আছেন এমন ওতে?সুখ আশেপাশে নজর বুলায়। এখানে গিটার নেই। অভ্র’র হাত ফস্কে পড়ে যাওয়ার পর নিবাসেও দেখা যায়নি সেটা। নিশ্চয়ই এই “ক্যাসেল”-এ থাকবে!
•
রুম থেকে বেরিয়ে এলো সুখ। আস্তে ধীরে চতুর্দিকে নজর হাঁটায়।রুমের পাশ ঘেঁষে,ডান দিকে উপরে যাওয়ার সিঁড়ি। বাঁ দিকে খানিক গেলেই ডাইনিং স্পেস। তারপর কিচেন।রুমের মুখোমুখি আরও একটা রুম।সুখ সেদিকে পা বাড়াতে গিয়ে কদম তিনেক বাড়িয়ে থেমে গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে এলো।উপরে কেবল দুটো রুম। মধ্যে বিরাট ফাঁকা জায়গা।সুখ একটা রুমে প্রবেশ করল।বুক টিপটিপ করছে একা চলতে।বর্ণ কোথায় কে জানে!
অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সুখ স্তম্ভিত হলো, অল্পবিস্তর নয় বরং অনেকখানি। কক্ষ আলোকিত নয়; তবু অদৃশ্য এক আলোক রশ্মি রুমকে আঁধারে তলিয়ে যেতে দেয়নি। পুরো রুমের দেয়ালজুড়ে কেবল তারই ছবি। হাজার খানেক তো হবেই।সেই ছোট্ট বেলা থেকে শুরু করে বিয়ের ,বিয়ের পরের এমনকি বর্ণ’র এ্যাক্সিডেন্টের দিন হসপিটালে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে হাহাকার করার দৃশ্যের আংশিক ছবিতে স্থান পেয়েছে। প্রতিটি ছবির নিচে কিছু না কিছু লেখা।
অদ্ভুত এক আবেশে শরীর শিরশির করে উঠল সুখের।বাকহারা চোখে প্রতিটি ছবিতে হাত বুলিয়ে দিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। কান্না পাচ্ছে কেনো? একটা ছবিতে বর্ণ সুখের দুহাত পিছমোড়া করে পড়নের শাড়ির আঁচল দিয়ে গিঁট বেঁধে একহাতে সুখের হাত দুটো ধরে রেখে,অপর হাতের তর্জনীতে সুখের থুতনি তুলে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। সম্ভবত বিয়ের চতুর্থ দিনের দৃশ্যপট এটি। সেদিন সদ্য গোসল সেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল শুকাচ্ছিল সে।তার ঠিক পিছু, দরজায় হেলান দিয়ে নিষ্পলক চেয়েছিল বর্ণ। চোখের দৃষ্টিতে যেনো সুখকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে চায়। আয়নায় দৃশ্যটি অবলোকন করে সুখ ভেতরে ভেতরে জড়তায় কুঁকড়ে গেলেও, ক্ষিপ্র মুখে পিছু ঘুরে জানতে চাইল ইশারায়,” এভাবে অসভ্যের মতো যখন তখন চেয়ে থাকতে ইগো হার্ট হয়না এখন? লজ্জা করে না?”
বর্ণ ফিচেল হেসে এগিয়ে এলো। ফাঁকে বলল,” করে তো!ভীষণ লজ্জা করে সুইটহার্ট!কিন্তু কী করবো বল?তুই সামনে এসে দাঁড়ালে লাজ-লজ্জা সব ফারার হয়ে যায়!”
এরপর সুখ রেগে আঙ্গুল তুলে কিছু বলতেই বর্ণ তার হাত মুচড়ে পিছু চেপে ধরে নিকটে চলে এলো। অতঃপর দেয়ালে বন্দী ছবির মতো একটি দৃশ্যের সৃষ্টি হয়ে গেল মূহুর্তেই। সেদিনের ঘটনাটি মনস্পটে কল্পনা করে প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়ে সুখ।ছবিটির পাশে ছোট অক্ষরে কিছু লেখা–
” যখন আমি শিকারি, তো তুই আমার শিকার।নো সেক্রিফাইস, নো গিভিং আপ।ইয়্যু আর অনলি মাইন, সুইটহার্ট। ”
আরেকটি ছবি সেদিন ভ্যালেন্টাইন ডে’তে দুজন পানিতে ভাসমান ভেলায়। সুখের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বর্ণ গোলাপ গুচ্ছ এগিয়ে দিচ্ছে।তার পাশে লেখা আছে,” তোর চোখের সকল মায়া, ভালোবাসা,তোর হৃদয়, দেহ-মন সবকিছুর হক শুধুমাত্র এই আসফিয়ান বর্ণ’র। নো ওয়ান ইজ অলাউড টু বি এ পার্ট অফ ইট!”
একটি ছবিতে গিয়ে নজর স্থির হলো সুখের। লম্বায়- চওড়ায় ছবিটি বেশ বড়। সুখের গা কেঁপে উঠল থরথর। শ্বাস প্রশ্বাস বৃদ্ধি পায়।এটা তার ছবি।সে তখন হসপিটালের বেডে শুয়ে আছে নিস্তেজ, কোমায়। চোখের কৌটা ভরে উঠে পূর্বের মতো।হাতে হাত ঘঁষে মাথা চুলকায় সে, অস্থির গতিতে।এসব মনে করতে চায়না সে।ওই নিকৃষ্ট লোকগুলোর, ঘৃণায় গা গুলিয়ে আসা নিকৃষ্ট ছোঁয়া ছিঃ কী জঘন্য।ব্যস, আরেকটুর জন্য তার গায়ে সেই তকমাটা লেগে যায়নি।সমাজে যেটাকে বলে—ধ-র্ষি-তা! ছবিটায় র!ক্ত দিয়ে কৈফিয়ত দেয়া কিছু লেখা-
” আ’ম স্যরি ফুল,আ’ম ফেইল্ড। তোকে প্রোটেক্ট করে রাখতে পারিনি। বুঝতে পারিনি কখনো আমার দায়ে তোকে সাফার করতে হবে। কিন্তু আমার কষ্ট হচ্ছে না বরং আনন্দ ধরেছে।আ’ম ফীলিং রিলিফ!তোকে হারাতে না বসলে হয়তো কখনো জানতেই পারতাম না আমার জন্য তুই কী!এই বুকের বাঁ পাশে কতোটা জায়গা তুই ছিনিয়ে নিয়েছিস আমার পার্মিশন ছাড়াই! অতঃপর তোর ভালোবাসা’র কাছে আমি সজ্ঞানে হার মেনে নিলাম। তোকে করে নিলাম আসফিয়ান বর্ণ’র পুষ্পরাণী!”
চোখের অশ্রু মুছে নেয় সুখ।আর কাঁদবে না সে।কারো অস্তিত্বের প্রবেশ ঘটেছে রুমে। চারপাশে চেনা পরিচিত পুরুষালী পারফিউমের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে।একটা শক্তপোক্ত প্রসস্থ বুক এসে সুখের পিছু অবস্থান ঘোষনা দিচ্ছে।সে পিছু ফিরল, চমকালও না। আস্তে করে মাথাটা এলিয়ে দিল সেই বুকে।এই বুকটা শুধু তার।আজ থেকে আর কাউকে ভাগ দেবে না।
•
অন্ধকার রজনী।সুশীতল কক্ষ। নিস্তব্ধ চারি পাশ।বেডের নিচে অবহেলায় পড়ে আছে কোলবালিশ।সিলিং ফ্যান-টা চলছে পুরোদমে।
গালার ভাঁজে তপ্ত শ্বাস সমেত ঠোঁটের পরশ পেয়ে ঘুম হালকা হয়ে গেল মেহরাবের।ঘুমের ঘোরে নিবিষ্ট আলস্য চোখ দুটো ধীরে খুলল পিটপিট।মুখটা এলোকেশে ডেকে আছে পুরো। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে একহাতে মুখ থেকে চুলগুলো সরিয়ে নড়তে গেলে অনুভূত হয় শরীরে উপর ভারী কিছুর।ঘুম উবে গেল মূহুর্তে।চমকে সম্পূর্ণ সজাগ হয় মেহরাব।
জেসি মেয়েটা উঠে এসেছে গায়ের উপর। দুহাতে জড়িয়ে গলায় মুখ গুঁজে, আরামে ঘুমিয়ে। ক্ষণে ক্ষণে ঘাড়ে নাক ঘষে উমঃ উমঃ শব্দ করছে।হাত মুঠোবন্দী করে সজোরে ঢোক গিলে মেহরাব।জেসিকে ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিতে মনস্থির করেও কেনো যেনো হাত থমকে গেল।পারল না মনকে সায় দিতে।দম আটকে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় সেও ঘুমিয়ে পড়ল।
সেদিন ভোরে ঘুম ভেঙ্গে মেহরাবের কাছে নিজেকে আবিষ্কার করে জেসি অবাকের শীর্ষে পৌঁছে বলল,” মিস্টার অ্যারোগেন্ট, আমাকে ছেড়ে দূরে দূরে থাকতে আপনার কষ্ট হয়।সেটা মুখে স্বীকার করলেই পারতেন।ঘুমের সুযোগে এভাবে কাছে আসার কী দরকার ছিল?দেখলেন তো, ঠিকই ধরা পড়ে গেলেন?”
মেহরাব ভ্রু গুটিয়ে খানিকটা সময় নীরবে তাকিয়ে থেকে বলল,” কোথায় আছো সেটা খেয়ালে রেখেছো মিস ইডিয়ট? নিজের মহামূল্যবান বাক্য প্রয়োগ করার আগে চারপাশে অন্তত একবার নজর বুলিয়ে দেখা উচিৎ ছিল?”
জেসি বেডের খালিপাশে চেয়ে বুঝল,সে-ই মেহরাবের সীমানায় চলে এসেছে কোল বালিশের দেয়াল ভিড়িয়ে।হাসার চেষ্টা করে বলল,” উপ্স স্যরি, এক্সুয়েলি…”
পূর্ণ বাক্য শেষ করার আগেই মেহরাব শরীর থেকে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলল তাকে।বেড থেকে নামতে নামতে বলে গেল,” পরের বার থেকে সাবধানে থাকবেন মিস ইডিয়ট!”
জেসি মুখ বাঁকিয়ে শুধরে দেয় তাকে,” মিস্টার অ্যারোগেন্ট মিস নয় ওটা মিসেস হবে মি—সেস!”
•
” বস একটা কথা বলতে চাই!”
” শুনছি।বলে যা!”
মাহির গলা খাঁকারি দেয়। শার্টের কলার ঠিক করে, শুরুর একটা বোতাম খুলে দেয়।তবু,যেন অক্সিজেনের অভাব বোধ করছে। বর্ণ’র নজর ল্যাপটপে।সে ফের বলল,” বস বলব?”
” এককথা দুবার বলতে বা শুনতে আমি পছন্দ করি না মাহির! জানিস নিশ্চয়ই?”
মাহির দ্রুত উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়।জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে ফের বলল,” তাহলে বলি!”
বর্ণ দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে তড়িৎ উঠে দাঁড়ায় হঠাৎ। শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে মাহিরের দিকে এগুতে এগুতে গম্ভীর গলায় বলল,” বল!”
ছেলেটা ভয় পেয়ে গেল এবার। চোখের তারায় তৎক্ষণাৎ ভেসে উঠে– লক্ষ্য করা লোকেদের এক ঘুষিতেই মুখ বিকৃত করে দেওয়ার দৃশ্য।ঢোক গিলে পেছাতে লাগল সে। ভয়ার্ত কন্ঠে ডাকে,” ব-বস?”
” হ্যাঁ, বল কী বলবি?”
মাহিরের জান উড়ে যাওয়ার জোগাড়।কী বলবে, দু’দিন ধরে গুছিয়ে রাখা কথা সব এলোমেলো হয়ে গেল মস্তিষ্কেই। মুখে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে যেন গলায় আটকে গেলো।ফের বলল,” ভ-ভাই?”
চোয়াল শক্ত করে দাঁত কিড়মিড় করল বর্ণ। ঘুষি পাকিয়ে ফের ছেড়ে দিয়ে মাহিরের বাহুর পিছু,দেয়ালে হাত রেখে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে শক্ত মুখে বলল,” বল নারে বেটা?”
মাহির আড়চোখে একঝলক দেয়ালে রাখা হাত এবং বর্ণ’র ঝুঁকে আসা প্রত্যক্ষ করে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা চালিয়ে বলল,” বস আমি কিন্তু সুখ নই! আপনার বোধহয় কিছুমিছুর ক্রেভিং উঠেছে!”
#চলবে🦋
_________

