বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৩৫] |২য় খণ্ড| লাবিবা ওয়াহিদ

0
41

#বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৩৫]
|২য় খণ্ড|
লাবিবা ওয়াহিদ
#বেলতুলি

⚠️প্রাপ্তমনস্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]

চট্টগ্রামে মৌনোর পরিবার সপ্তাহখানেক থাকল। এরপরই ইয়ামিন তাদের ঠেলে ঢাকায় পাঠিয়ে দিল। এশার স্কুল আছে, রিমঝিমেরও চাকরি আছে। এছাড়া রিয়াজ সাহেব এবং জুনায়েদও ঢাকায় একা। সবকিছু মিলিয়ে পরিবারের উপরও কম ঝড় যায়নি। বড়োসড়ো দূর্ঘটনায় রোগীর পাশাপাশি তার পরিবারের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেখানে মৌনো এক বখাটের দ্বারা এত বড়ো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ নিয়ে রাজিয়া শেখ এবং রিয়াজ সাহেব দুজনই নিজেদের দোষারোপ করছেন। রাজিয়া শেখও বেফাঁস বারবার মৌনোর কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন, নিজেদের গাফিলতি নিয়ে লজ্জা প্রকাশ করছেন। এতে মৌনোর মানসিক অবস্থা আরও নাজুক হয়। এজন্য সবকিছু থেকে সবাইকে মুক্তি দিতেই ইয়ামিনের এই কাজ। এতদিন মৌনোকে ওরা দেখে রেখেছে, এবার তার মামাদের পালা। শিহাব, বুশরাও এসেছে মৌনোর খবর পেয়েই। কিন্তু মৌনো বারবার ঘরবন্দী থাকতে চাচ্ছে, যা বেশ ভয়েরও বটে।

জাবির এবং তার চ্যালাদের এখনো পাওয়া যায়নি। ওরা গা ঢাকা দিয়েছে। পুলিশ খুঁজছে তাকে, সাথে জাবিরের যে নেতা ছিল তাকেও বেশ চাপে রাখা হয়েছে। এই খবর মিডিয়া অবধি পৌঁছে গেছে। নেতা চাইলেও এসব ধামাচাপা দিতে পারছে না। এমপিকে তো জানানোই যাবে না জাবির নেতার লোক। নয়তো এমপি বলবে জাবিরকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু নেতার পক্ষে জাবিরকে ছাড়া সম্ভব নয়। লাখ লাখ টাকার লেনদেনের মূল চাবিকাঠিই জাবির। এজন্য তার সমস্ত অকাজকে সে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সঙ্গ দেয়। তবে এবার কিছুতেই ব্যাপারটা ধামাচাপা দেয়া যাচ্ছে না এমপির সাহায্য ছাড়া।

মৌনোর দিনগুলো হয়তো চট্টগ্রামে ভালো কাটার কথা। কিন্তু তার তা হচ্ছে না। তার ঘুম হয় না, হাত এখনো জ্বালা-পোড়া করে। হাতের চাইতেও বেশি তার বুকের ভেতরটা ঝলসে গেছে। সেই ঝলসে যাওয়া কেউ দেখতে পায় না। সম্ভবও না। সে নিজের হাতের দিকে নিজে তাকাতে পারে না। বারবার দুঃস্বপ্ন দেখে, আর হঠাৎ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে। মৌনো ক’বার তো আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মামাদের বাড়িতে কাজ করা বৃদ্ধা তাকে দু’বেলা করে কুরআন পড়ে শোনান। আল্লাহ কত মহান, তার সৃষ্টি কত সুন্দর সেসব বর্ণনা করেন৷ সেসব শুনে মৌনো কিছুক্ষণের জন্য আত্মহত্যার কথা ভুলে থাকে। কিন্তু তার এই ক্ষত সে কিছুতেই সারাতে পারে না। দম বন্ধ হয়ে যায় হাতের দিকে তাকালে। এজন্য প্রায়ই সে হাত কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখবে। সালমাও দ্রুত বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসে। মৌনোর সাথে একবার সেও অন্যায় করেছে, অথচ মেয়েটা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। এমনকি ইয়ামিনকেও জানতে দেয়নি। এত সুন্দর মনের মেয়েটার এত বড়ো বিপদে সে পাশে না থাকার মতো অকৃতজ্ঞ নয়। যখন মৌনোর পাশে কেউ থাকে না তখন সালমা থাকে। সালমা মোটেও মৌনোর হাতের দিকে ঘৃণ্য চোখে তাকায় না। অবশ্য, সার্জারির কারণে হাত অনেকটাই সেরে গিয়েছে, দাগগুলো খুব বেশি পরিমাণে নেই। তবুও যতটুকু আছে, প্রথম দেখায় যে কারোই গা ঘিনঘিন করবে।

সকালে বুশরা তাকে বাগানে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে বুশরার বিয়ের কথা বলল। তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, এইতো.. সামনের মাসেই তার বিয়ে। সে নিয়ে কতশত আলাপ। এসব আলাপের মূল কারণ মৌনোকে স্বাভাবিক রাখা। দশটায় আজ সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়া বাধ্যতামূলক। কিছুদূর আসতেই বাড়ির বাচ্চারা মৌনোর মুখে পড়ে। মৌনোর হাত দেখে সবাই ভয়ে ছুটে ছুটে পালায়। দূর থেকে বড়ো মামি আর মেঝ মামু বাচ্চাদের ডেকে মৌনোর থেকে সরিয়ে নেয়। ওরা যে মৌনোর এখানে থাকাটা বিশেষ পছন্দ করছেন না এটা মৌনো একটু হলেও টের পেয়েছে। কিন্তু সে এতে কিছুই করতে পারে না। প্রথম যে’বার বুঝেছিল, সেবার ইয়াসীন মামা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাড়ির সবাইকে সাবধান করেছিলেন,
–“আমাদের ভাইয়েদের পাশাপাশি আমাদের বোনের সম্পত্তিও এই বাড়িতে উপস্থিত। আমার বোনের ভিটেতে মৌনো থাকছে। আশা রাখছি কেউ কখনো ওকে নিয়ে নাক কুঁচকাবে না৷ কিংবা এও ভাববে না আমার ভাগনি এখানে ফ্রিতে থাকছে। ওর বাপ ওর প্রতি মাসের খরচ পাঠায়, আর এটা ওর মায়েরও বাড়ি।”

সেই থেকে বড়ো মামি আর মেঝো মামী দূরে দূরে থাকেন। তাদের বাচ্চাদেরও মৌনোর কাছ ঘেঁষতে দেয় না। মৌনোর হাত থেকে নাকি দুর্গন্ধ বেরোয়, এতে নাকি বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ে।

মৌনো এখন আর কাঁদে না। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানি সব খরচ করে ফেলেছে। সে এখন পাথরের মতো হয়ে গেছে। হ্যাঁ, হাইপার হয়ে যায় কালে-ভদ্রে। হঠাৎ হঠাৎ প্যানিক অ্যাটাক উঠে, বুক খিঁচে ধরে তবুও কান্নাটা আসে না। কাঁদার কথা ভাবলেও আজকাল ক্লান্ত লাগে। বুকের ভার যে সামান্য কান্নার পানিতে মিটবে না।

বুশরা এই কাণ্ড দেখে দ্রুত মৌনোকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে চাইল। তবে মৌনো মিনমিন করে বলল,
–“ক্লান্ত লাগছে। আমি রুমে যাই। ডাক্তারের কাছেও তো যেতে হবে।”

মৌনোর অস্বাভাবিক ভাবে ভালো আচরণ ঠিক বুশরার হজম হলো না। বুশরার ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ শুনল না সে। বুশরাকে ফেলেই বাড়ির ভেতরে চলে গেল। অদূরে বড়ো মামীকে দেখল সে। মৌনোকে দেখতেই কেমন মুখটা বিকৃত করে অন্যদিকে ফিরে গেল। অথচ একসময় মৌনোকে দেখলেই কাছে টেনে নিতেন। মা, মা বলে আদর দিতেন। মৌনো অন্য কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা রুমে চলে গেল। সালমা দেখল মৌনোকে যেতে। এজন্য সেও মৌনোর পিছু নিল। উপরে আসতেই কেমন ধাম করে শব্দ হলো। যেন ভারী কিছু পড়েছে। শব্দটা মৌনোর ঘর থেকেই আসল। সালমার পেছনে থাকা বুশরাও এই শব্দটা শুনল। দুজন একে অপরের দিকে চেয়ে ছুটে গেল মৌনোর ঘরে। গিয়ে দেখল মৌনো মেঝেতে পড়ে আছে।

মৌনোর জ্ঞান ফিরল হাসপাতালে। তার সামনে হাসি-মুখে তার সাইকোলজিস্ট বসা। মৌনো উঠতেই রোকসানা আলী মুচকি হেসে মৌনোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মৌনো আশপাশ তাকিয়ে বলল,
–“কোথায় আমি?”

–“হসপিটালে। দূর্বলতার জন্য মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেছিলে।”

–“নাহ, দূর্বলতার জন্য নয়। সত্যিটা বলুন। জীবনের এত বড়ো সত্যি ঘাড়ে চাপিয়ে ঘুরছি, এই সামান্য সত্যতে কী আসে যায়?”

ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“আজকাল সম্ভবত খুব স্ট্রেস নিচ্ছ? এত স্ট্রেস এই ছোটো মাথায় নিয়ে থাকলে হবে কী করে?”

মৌনো উত্তর দিল না।
–“আমাকে বলবে না কী হয়েছে? আমি তো তোমার বন্ধুই এখন।”

–“আপনি আমার বন্ধু নন।”

রোকসানা হাসলেন। মৌনোর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
–“তাহলে মা? তোমার বয়সের কাছাকাছিই যে আমার একটা মেয়ে আছে। আমার জানতে হবে না আমার আরেক মেয়ের মনে কী সংশয় চলছে? হ্যাঁ, হয়তোবা তোমার যা ক্ষতি হয়েছে তা ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু তোমার জীবনটাও তো থামিয়ে রাখতে পারবে না তাই না? এ সব ভুলে আগাতে হবে তো। নয়তো এইযে এতগুলা মানুষ তোমাকে ভালোবাসে। দিন-রাত চেষ্টা করছে তোমাকে সুস্থ করে তোলার জন্য, তার এতসব পরিশ্রম যে বৃথা যাবে।”

মৌনো চুপ করে শুনল। আজ তার রোকসানার সাথে কততম থেরাপি, তার নিজেরও মনে হয়। তবে এই দু’মাসে মোটামুটি ভালোই সময় দিয়েছেন ভদ্রমহিলা। বেশিরভাগ সময়ই বাড়ি আসতেন তিনি, কারণ মৌনো ঘর থেকে বের চাইতো না। তার মনে হতো বের হলেই আবারও এরকম কিছু হবে। সবাই তার মুখের দিকে তাকাবে। আবারও কোনো বখাটে তার কাছে এসে তাকে কুপ্রস্তাব দিবে। না করলে আবারও.. গায়ে হঠাৎ কম্পন খেলে গেল তার।

মৌনো তোতলানো গলায় বলল,
–“বা-বাকিরা.. কো-কোথ-থায়?”

রোকসানা বুঝলেন আবারও মৌনোর মনে আগের খেয়াল আসছে। এগুলা তিনি ভুলাতে অনেক চেষ্টা করেছেন। তবে এখনো তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন। এই ধরণের পেশেন্ট তিনি আগেও একজন সামলিয়েছেন, তাই ধৈর্যহারা হলেন না। মুখের হাসি আগের মতো রেখেই বললেন,
–“বাকিরা বাইরে অপেক্ষা করছে। ডেকে দেব?”

–“ন..না থাক। শুধু জানিয়ে দিন আমি ঠিক আছি।”

রোকসানা তাই করলেন। পরপর আবারও মৌনোর পাশে বসে অনাকাঙ্ক্ষিত এক প্রস্তাব দিলেন।
–“চলো আজ তুমি আমি মিলে দূরে কোথাও যাওয়া যাক?”

মৌনো আঁতকে উঠল। রোকসানা এতে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
–“দূরে কোথাও বলতে, সমুদ্রে। পতেঙ্গা। যাবে? আমার গাড়ি আছে, আমি নিজে তোমাকে ড্রাইভ করে নিয়ে যাব।”

রোকসানা বুঝেছেন মৌনোকে আর চার দেয়ালের মাঝে বসিয়ে চিকিৎসা আগানো সম্ভব না। মৌনোর ভয়কে জয় করতে হবে, সূর্যের আলোর নিচে নিজেকে মেলে দিতে হবে। রোকসানা এক ব্যাগ থেকে কালো বোরকা বের করলেন।
–“তোমার ইয়ামিন মামা বলল তুমি নাকি বোরকা কিনে দিতে বলেভহ, বোরকা পরবে। এইযে, এখানে দুটো আছে। নিজে পছন্দ করে নাও।”

মৌনো দ্বিধায় পড়ল, অস্বস্তি হলো তার। কিন্তু তবুও রোকসানা তার সিদ্ধান্তে অটল। আজ তিনি যে করেই হোক মৌনোকে নিয়ে বের হবেন। অনেক অপেক্ষা করেছেন, আর নয়।

মৌনোর এক ঘণ্টা লাগল সিদ্ধান্তে আসতে। রোকসানারও এতে বেশ খাঁটুনি হয়েছে মৌনোকে রাজি করাতে। আমাদের ভয়ের সম্মুখীন হয়েই ভয়ের জয় করতে হয়। এই কথাটা রোকসানা খুব মানেন। নিজের এই ডাক্তারি ক্যারিয়ারে অসংখ্য লোকের মানসিক রোগ সারিয়েছেন এই একটি বাক্যকে কেন্দ্র করে। এটি ওনার চেম্বারের দেয়ালেও বড়ো অক্ষরে লিখা।

মৌনো অবশেষে রাজি হলো। রোকসানাই তাকে বোরকা পরাতে সাহায্য করল। মৌনো যেন এও ভুলে গেছে বোরকা কীভাবে পরতে হয়। রোকসানা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,
–“আজকে পরিয়ে দিচ্ছি। পরেরবার থেকে তুমি নিজে নিজে পরবে। আমি শিওর আজকের ঘুরাঘুরির পর তুমি নিজেই বায়না করবে সেখানে যাওয়ার জন্য।”

মৌনোর ভেতর থেকে একটা আলোর প্রদীপ জ্বলল। ভদ্রমহিলার কথাকে সে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিল। অর্থাৎ মৌনো ভদ্রমহিলাকে মনে-প্রাণে ভুল প্রমাণিত করতে চায়। সে দেখাতে চায় মৌনোর সমুদ্রে গিয়েও বুকের বোঝা কমবে না।

রোকসানা পরম যত্নে মৌনোর মুখ ঢেকে দিল নিকাবে। মৌনোর মাথায় মমতার হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
–“এবার আর ভয় নেই। তোমাকে কেউ দেখবে না, তুমি আল্লাহর সুরক্ষাকবজে আছ।”

শেষ কথাতে মৌনো জানে না কী জাদু ছিল। তবে তার অন্তরের কিছুটা ভয় দূর হয়ে গেল। আল্লাহ’র রক্ষা-কবজ? তাই তো। আল্লাহ রক্ষা না করলে তো আরেকটুর জন্যে এ সি ড তার মুখে এসে ঝলসে দিত। তখন মৌনো নিজেকে কী করে সামলাত? এই ভাবনাও মৌনোর মাথায় আসতে চাইল না। উলটো সে নিজের ওজন সামলালো রোকসানার হাতে ভর দিয়ে। আবারও মাথা চক্কর দিয়ে উঠছিল। এজন্য রোকসানা মৌনোকে কিছু চকোলেট আর চুইঙ্গাম ধরিয়ে দিলেন। ইয়ামিনের থেকে মৌনোকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতিও চাইলেন। ইয়ামিন বাঁধা দিল না। বাকি মামারা নিজেদের কাজে বিধায় হাসপাতালে ইয়ামিন আর শিহাবই ছিল।

ইয়ামিন মামা মৌনোর যাওয়ার পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আহত স্বরে বলল,
–“আমার চিরচেনা ভাগনিটা কবে স্বাভাবিক হবে রে শিহাব? আর কত মাস অপেক্ষা করতে হবে?”

শিহাব বলল,
–“আল্লাহ আছেন মামা। তিনি কোনো জুলুম হতে দিবেন না। তুমি বরং ওর এখানে ভর্তির ব্যবস্থাটা আগে করো। পড়াশোনার মধ্যে আসলে আরও কিছুটা স্বাভাবিকের আশা করা যায়।”

–“হুঁ। আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করছি ওর ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করতে। সিজি যেহেতু ভালো এসেছে, সেহেতু বেশি ঝামেলা পোহাতে হবে না আশা রাখছি। দোয়া কর যাতে আমি যেই ভার্সিটি দেখেছি সেটাতে হয়ে যায়।”

মৌনোর কনফিডেন্টকে ভেঙে গুড়িয়ে দিলেন রোকসানা, যখন ওরা নিরিবিলি বিচে আসল। আজকে খুব একটা রোদ নেই। কেমন মেঘলা, বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। সমুদ্রের নিজস্ব গান, উত্তাল ঢেঊ সবই মৌনো মুগ্ধ চোখে দেখল। এদিকটায় সত্যিই কেউ নেই। এটা রোকসানার সিক্রেট প্লেস, এখানে সচরাচর মানুষ আসে না। রোকসানা মুচকি হেসে বললেন,
–“দেখেছ মৌনো, আল্লাহর সৃষ্টি কত সেরা? তেমনই তার সৃষ্টির আরেক সৌন্দর্য তুমি নিজে। যে তার এই সুন্দর সৃষ্টিকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে সে কী এত সহজে ছাড়া পাবে বলে মনে হয়? দুঃখ কে পাবে? সেই জুলুমকারী নাকি তুমি? সেখানে তুমি নিজের এতটা বাজে পরিস্থিতি করে রেখেছ। এটা যে একদমই উচিত নয়। দেখো, আল্লাহর সৃষ্টিকে মন ভরে দেখো। প্রতিটা ঢেঊকে মনোযোগ দিয়ে দেখো, পানির তরঙ্গ দেখো। আমরা এখন পাঁচ মিনিট নীরবতার গেম খেলব।”

কিন্তু দেখা গেল— পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট এমনকি পনেরো মিনিটও কেটে যায়, মৌনোর মনোযোগ স্থির সেই সমুদ্রের প্রতিটা ভাঁজে। সমুদ্রের শীতল বাতাস তাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার মন যেন জিকির করছে রোকসানার বলা একটি বাক্য, “আল্লাহর সৃষ্টি এত সুন্দর, এত?”

এর মাঝে অদূরে সে এক জাহাজ দেখল। হঠাৎ করে, অনেকদিন পর তার নিবিড়ের কথা মনে পড়ে গেল। মুহূর্তেই তার চোখ ভিজে উঠল, বুকে ক্ষত তৈরি হলো। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে জাহাজের দিকে তাকিয়ে আপনমনে ভাবল, সে কখনোই এই অবস্থা নিয়ে নিবিড়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। কখনোই সম্ভব না। নিবিড় এখন দূর আকাশের ওই মেঘের মতোই, তার এখন নিবিড়কে চাইতেও চরম লজ্জা হচ্ছে। নিজেকে খুব ছোটো অনুভব হচ্ছে। সে কথা রাখতে পারল না। সে নিবিড়ের যোগ্য কখনোই হতে পারবে না। আচ্ছা নিবিড় তার হাত দেখলে কী অন্য সবার মতো ছি ছি করবে? সে এই চরম লজ্জা কীভাবে মেনে নিবে? যেই মানুষটা তার অতি প্রিয় তার অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মেনে নেওয়ার মতো এত সাহস মৌনোর আজ অবধি হয়নি। এর মানে কী, সে নিজের অনুভূতিকে বিসর্জন করে দিবে? আবারও বুকটা মুঁচড়ে উঠল ব্যথায়। পরিস্থিতি নাকি অনুভূতি, কোনটা তাকে পোড়াচ্ছে এই মুহূর্তে?

®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~

[যাদের সামনে পর্বটি পৌঁছাবে সবাই সাড়া দিবেন যেন অন্যান্য পাঠকদের ফিডেও পর্বটা পৌঁছায়। কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন, আমি যাতে রিপ্লাই করতে করতে কমেন্ট ব্লক খাই। তাও থামবেন না বুঝলেন? পর্বগুলো কিন্তু ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে। আশা রাখছি আগামী পর্বে আপনাদের কাঙ্খিত নিবিড়কে পেতে যাচ্ছেন। যান, আপনাদের স্পয়লার দিয়ে দিলুম।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here