#বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [২য় খণ্ড]
|পর্ব ৩৪|
#বেলতুলি
লাবিবা ওয়াহিদ
⚠️প্রাপ্তমনস্ক এবং মুক্তমনাদের জন্য উম্মুক্ত। অত্যন্ত সেন্সিটিভ পর্ব। নিজ দায়িত্বে পড়ার অনুরোধ থাকল।
–“তোর রূপের খুব দেমাগ তাই না? এবার থেইকা দেহিস এই চেহারাতেই মাইনষে থুঁথুঁ ফেলব!”
বলেই মৌনোর দিকে জাবির এসিড ছুঁড়ে মারল।
——————————-
সৌভাগ্য নাকি আল্লাহর অশেষ রহমত, এমন এক গুরুতর মুহূর্তে মঞ্জু একটা ভুল করে বসল। তাকে আদেশ করা হয়েছিল, জাবির এ(১)সিড ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মঞ্জু বাইক জোরে টান দিবে। যেন তাদের কেউ ছুঁতে অবধিও না পারে। মুহূর্তেই সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। কিন্তু মঞ্জুর টাইমিং খুবই বাজে ছিল। জাবির এসিড ঠিকমতো ছোঁড়ার আগেই বাইক টান দিল। যার জন্য মৌনোর চেহারা অবধি পৌঁছাতে পারে না। মৌনোও কি ভেবে যেন আতঙ্কে সরে গিয়েছিল, কিন্তু ঠিকঠাক নিস্তার সে পেল না। মুহূর্তেই ঝলসে ওঠে তার বাম-হাত। মুহূর্তেই মৌনো আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল। জাবির দূর থেকে সেই চিৎকার শুনে মঞ্জুকে বকার বদলে পৈশাচিক হাসি দিল। মঞ্জুকে তাড়া দিল,
–“আরও জোরে চালা হারামি।”
তীব্র ভাবে জ্বলছে মৌনোর হাত, যেন আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে। খুবই অল্প সময়ের মাঝে তার হাতের ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হলো, সময়ের সাথে সাথে আর্তনাদও বাড়ছে তার।
মৌনোর আর্তচিৎকারে আশেপাশের সবাই ছুটে আসে। মৌনো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে রাস্তায় পড়ে যায়।
–“আল্লাহ গো! মা গো! আব্বা! আমার হাত! আমার হাত! আমি মরে যাচ্ছি গো! আমার হাত!”
তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থল থেকে মৌনোকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হলো। যতটা দ্রুত সম্ভব। পুরো পথে মানুষ নিজেদের জ্ঞান অনুযায়ী যতটা পারল পানি ঢালল শুধু, আর যেহেতু মৌনোর কামিজের হাতা কনুইয়ের উপরে ছিল, সেক্ষেত্রে কাপড়ের কোনো সমস্যা পোহাতে হলো না। একজন মহিলা তাকে সাহায্য করেছে। মহিলা নিজ উদ্যোগেই হাত দিয়ে ঘষে ঘষে এসিড ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। সর্বপ্রথম এসিড ছাড়ানো জরুরি। ধোঁয়া সেরে যতদ্রুত সম্ভব মহিলা এক পরিষ্কার নরম কাপড় খুব হালকা করে জড়িয়ে দিল যাতে কোনো জীবাণু আক্রমণ না করে।
প্রণভরাও খবর পেতেই সবার আগে ছুটে যায় হাসপাতালে। রাজিয়া শেখ তো খবর পেয়ে বোরকা ফেলেই কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসেছেন মেয়ের চিন্তায়। রিয়াজ সাহেবও চেম্বার বন্ধের সুযোগ পাননি। কোনো রকমে আরেকজনের হাতে দায়িত্ব দিয়ে তিনি দ্রুত সিএনজিতে উঠে পড়েন। আল্লাহ জানেন, কী বিপদ যাচ্ছে এই পরিবারের ওপর দিয়ে। জুনায়েদ এখনো সুস্থ হয়নি, সে একই হাসপাতালে ভর্তি। প্বাশবর্তী হাসপাতালের ডাক্তাররা জানাল তাকে অন্য আরও হাসপাতালে নিয়ে যেতে। রিমঝিম চোখ-মুখ লাল করে মৌনোকে এক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেল। সময় যত যাচ্ছে মৌনোর জ্বালাপোড়া ততই বাড়ছে। সে চিৎকার করছে, ক্লান্ত হলেও তার আহাজারি, কান্না, আর্তনাদ থামছে না।
মৌনোর হাতের কনুইয়ের নিচ থেকে হাতের আঙুল অবধি এসিড বার্ন হয়েছে। খুবই দূর্বিষহ দেখাচ্ছে এই দৃশ্য। দেখলেই বোঝা যায় অনেকটা স্কিন ড্যামেজ হয়েছে। মৌনোর তুলতুলে, ফর্সা হাত এখন কেউ চোখেও দেখতে পারছে না। তাকে নেওয়ার সময় করিডোরের একজন তার হাত দেখে ফেলেছিল, নরম কাপড়টা কিছুটা সরে গিয়েছিল এই যা। কিন্তু সেই অপরিচিত মহিলা এই দূর্দশা সইতে না পেরে সেখানেই বমি করে ফেললেন। এই দৃশ্যে মৌনোর ভেতরটা আরও বেশি মুঁচড়ে উঠেছে। তার কান্নার বেগ আরও বেড়ে যায়।
মৌনোর চিকিৎসা চলল নিয়মমাফিক। জুনায়েদ জোরপূর্বক ডিসচার্জ নিয়ে মশিউর সাহেবের সাথে আসল। কামরুল তো এসেছে গত হাসপাতালেই। ইতিমধ্যেই বেলতুলিতে জাবিরকে তন্নতন্ন করে খোঁজা হচ্ছে। যখন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না তখন মসজিদে মসজিদে মাইকিং হলো, যেন অতি দ্রুতই জাবিরকে এবং ওর চ্যালাদের পাকড়াও করা হয়। শুধু তাই না, জাবিরের ঘৃণ্য কাজ সম্পর্কেও সবাইকে জানানো হয় এবং অন্যান্য বাড়ির মেয়েদের সাবধানে থাকতে বলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জুনায়েদ মৌনোর বেডের পাশে বসা। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
–“আব্বু বলেছে ভাইয়েরা সব বিপদ থেকে বোনদের বাঁচায়। আমি কেন পারলাম না আপু? আমি যে উলটো মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে ছিলাম। আমি তোমাদের ভাই হবার যোগ্য নই। আমি একজন ব্যর্থ ভাই।”
মৌনো তার ভাইকে কিছু বলার মতো অবস্থা নেই। তার তীব্র জ্বালা-পোড়ার পাশাপাশি প্রচুর হাত চুলকাচ্ছে। সে বদ্ধ পাগলের মতো আচরণ করছে। তার হাত চুলকাচ্ছে। নিজের কাছেই চরম ঘৃ(১)ণা লাগছে। সে বারবার নিজের ডান হাতটা দিয়ে চুলকাতে চাচ্ছে। কিন্তু তার ধরে বসা রিমঝিম, তার মা। মায়ের কান্না তো থামছেই না। রিমঝিম চোখ-মুখ লাল করে বারবার মাকে শক্ত হতে বলছে। কিন্তু সন্তানের এই দূর্দশায় কোন মা-ই বা মেনে নিতে পারে?
বাইরে সাংবাদিক কিছু এসেছে। তারা এই পারিবারিক ট্রমার মাঝেও পরিবারের কাছে আসার চেষ্টা করছে, মৌনোর সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে। তাদের তো রমরমা নিউজ করতে হবে। সে পরিবারের পরিস্থিতির অবস্থা যাই হোক। তাদের জিজ্ঞেস করা লাগবে, কী হয়েছে, কেন হয়েছে? তাদের অনুভূতি কি— এর মতো জঘন্য সব প্রশ্ন। কিন্তু পুলিশরা তাদের আটকে রেখেছে। পুলিশ কিছু এসেছে মৌনোর থেকে স্টেটমেন্ট নিতে, তার হালচাল বুঝতে। পুলিশরা ডাক্তারদের সাথে কথা বলে মৌনোর কাছ ঘেঁষার চেষ্টা করল। কিন্তু এখন মৌনোর ডান হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। সে পাগলের মতো আচরণ করছে চুলকাতে না পেরে।
রিমঝিম পুলিশদের দেখে মাকে বোনের কাছে রেখে উঠে দাঁড়াল।
–“আমি একজন ডক্টরের পাশাপাশি পেশেন্টের বড়ো বোন। যা জিজ্ঞেস করার আমাকে করুন, আমি আমার বোনকে এসব জিজ্ঞেস করতে দিতে মোটেও অনুমতি দেবো না। ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে আরও।”
পুলিশরা রিমঝিমের শক্ত গলার কথা মেনে নিল। অতঃপর তাকে বাদ-বাকি জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। রিমঝিমের সাথে মশিউর সাহেবও শক্ত মুখে দাঁড়িয়েছিল। তিনি রিয়াটারমেন্টে গেলেও এখনো তাকে জুনিয়ররা সালাম ঠুকে। মশিউর সাহেব চাকরিকালীন সময়ে আগেও এই ধরণের কেস হ্যান্ডেল করেছেন। আর আজকাল তো এই খবর রোজই পত্রিকায় পাওয়া যায়। আজ এই নির্মম ঘটনা ঘটে গেল তাদের সাধের বেলতুলিতে। মৌনো নিশ্চয়ই এতদিন অনেক ভয়ে ভয়ে থাকত। যদি টুশব্দ করে আর গুন্ডাটা তার ক্ষতি করে ফেলে? ওই একটুখানি প্রতিবাদের জন্যে আজ তাকে সেই জা(১)নোয়ারের শিকার হতে হলো।
পরেরদিন প্রথম আলোর প্রত্রিকার পাশাপাশি আরও কিছু পত্রিকায় শিরোনাম এলো,
“বখাটের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ঢাকার বেলতুলি’র এক তরুণীকে এসিড নিক্ষেপ।”
এই ঘটনা গতকাল শুনে মৌনোর মামা-চাচারা, যে যেখানে ছিল সবাই ছুটে এলো তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। এমন সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে মৌনো এবং তার পরিবারকে কেউই একা ছাড়তে চাইল না। বেশ কিছুদিন হাতের ড্রেসিংসহ অন্যান্য চিকিৎসা চলল। মাসখানেকের মাঝেই মৌনোর সার্জারিও হলো। তবে সেভাবে দাগ কাটাতে পারেনি ডাক্তাররা। চাঁদের গায়ে দাগ থেকে যাবে আজীবনের জন্য।
ডাক্তাররা সবাই বারবার করে পরিবারকে সাবধান করেছে, মৌনোর বিশেষ যত্নের পাশাপাশি ভালো সাইকোলজিস্টের প্রয়োজন৷ কিন্তু দেখা গেল মৌনোর হাতের চাইতে ভেতরটা ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বেশি। সে অনেকদিন হাসপাতালে কাটানোর পর এখন কিছুতেই বেলতুলি ফিরতে চায় না। তার পাগলামো আচরণ আরও জঘন্যভাবে বেড়েই চলেছে। তার ট্রমা, এনজাইটি, ডিপ্রেশন কোনো পরিবারের সদস্যই ঠিক করতে সক্ষম হচ্ছে না। এতে ডাক্তাররা কিছুটা চিন্তিত হয়ে জানায় এখন মৌনোকে বেলতুলি নিয়ে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। বরং আরও ক’টাদিন দেখুক। মৌনোর মানসিক অবস্থা অনুযায়ী একজন সাইকোলজিস্টও ঠিক করা হলো। কিন্তু তার উন্নতির কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না।
সোফিয়া খানম অর্থাৎ নিবিড়ের মা একবার এসে দেখে গেছেন মৌনোকে। হ্যাঁ, তিনি বদরাগী, জেদী, ইগোইস্টিক, একরোখা মানুষ। কিন্তু তিনি অমানুষ নন। রিমঝিমের ঘটনার পর থেকেই তিনি অনেকটা নরম হয়ে গিয়েছিলেন তার পরিবারের প্রতি। এখন মৌনোর এই বেহাল দশায় তিনি নিজেও বাড়িতে শান্তিতে দুদণ্ড বসতে পারছেন না। মৌনোকে এই নিয়ে কয়েকবার দেখে গেছেন। সব ভুলে এই কঠিন সময়ে রাজিয়া শেখকে সান্ত্বনাও দিয়েছেন। সোফিয়া খানম একটু হলেও আন্দাজ করতে পারেন এই যন্ত্রণা, কারণ তিনি নিজেও মেয়ের মা। আজকাল শাইনাকেও একলা ছাড়তে তার ভীষণ ভয় হয়।
নাহিয়ানও খবর পেয়ে চারদিনের ছুটিতে এসে মৌনোকে দেখে গেছে। নাহিয়ানের বুকেও ক্ষত হয়েছে এই খবর শোনার পর। তার প্রিয় বোনটার সাথে এত বড়ো কাণ্ড ঘটে গেল। অথচ নিবিড় এখনো কিছুই জানে না। সে নেটওয়ার্কের বাইরে। সমুদ্রে, জাহাজে নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। পাঁচ-ছয় মাস তার এই যাত্রার সময়। ইতিমধ্যেই তিন মাস কেটেছে, এখনো তিন মাসের মতো বাকি। তার সাথে যোগাযোগের কোনো পন্থাই নেই।
যখন দেখা গেল মৌনোকে কিছুতেই এই পরিবেশে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, তখন সাইকোলজিস্ট পরামর্শ দিল মৌনোকে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে। এই ট্রমা কাটানো এত সোজা নয়, তবে ট্রমার ঘটনাস্থল থেকে দূরে থাকলে পেশেন্টকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যেখানেই যাক, তাকে কিছুতেই একা রাখা যাবে না।
এজন্য মৌনোর চার মামা মিকে সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা মৌনোকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাবেন। আপাতত তাদের শেখ বাড়ির থেকে ভালো কোনো লোকেশন নেই মৌনোকে এই নরক থেকে উদ্ধার করতে। পরিবারের সদস্যরাও রাজি হলো। তাই হোক, চট্টগ্রামেই থাকুক সে। কয়েকদিনের মাঝেই মৌনোর পাশাপাশি রাজিয়া শেখ, এশা, রিমঝিমকে নিয়ে রওনা দিলেন মামারা। পুরো পথ মৌনোকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখতে হলো। বড়ো মামা তার পরিচিতদের দিয়ে চট্টগ্রামের ভালো মানের সাইকোলজিস্ট-এরও ব্যবস্থা করে ফেলল।
®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~
বিঃদ্রঃ চট্টগ্রামের ভূমিতে মৌনোর যাত্রা করুণ থেকে কিছুটা ভালো হোক। মেয়েটা তার সমস্ত ট্রমা কাটিয়ে উঠুক। গল্পটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনোপ্রকার মিল নেই। কেমন লেগেছে জানাবেন। দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম পর্ব বিধায় কিছুটা ছোটো করেই দিলাম। আশা রাখছি আমি সব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।

