আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_২

0
39

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_২
(শব্দসংখ্যা ১৫০০+)

মেঘলার সকাল বেলা ঘুম ভাঙলো নাজমা বেগমের চিৎকারে। এতো সকালে এমন চিৎকার শুনে সে ধড়পড় করে উঠে গায়ে কোনো মতে শাল চাপিয়ে দৌড়ে বাসার বাহিরে গেলো। নাজমা বেগম গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের বাসার হেল্পিং হ্যান্ড চুমকির সাথে ইচ্ছামতো চিৎকার করে যাচ্ছে। বাসার বাকি সবাই তার পাশে দাঁড়িয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছে। মেঘলা তার মাকে থামাতে গেলে ইরিনা তাকে আটকে ধরলো,

” যেও না। মা আরেকটু কথা শোনাক। ”

“ধ্যাত, কী বলো ভাবী? মা এরকম চিৎকার করছে কেনো?”

“কালকে গিয়ে যে তোমরা টাকা ফেরত নিয়ে এসেছো সেই ক্ষোভ থেকে নাবিলের মা পুরো এলাকায় তোমার নামে বাজে কথা রটিয়েছে।”

“কী কথা রটিয়েছে?”

“তুমি নাকি বাজা। তোমার নাকি কখনো বাচ্চা হবে না। তাই নাকি নাবিল তোমার সাথে সম্পর্ক শেষ করেছে।”

“কিহহ!!”

“হ্যা, ফাজিল মহিলা। তোমার যেনো ভালো কোথাও বিয়ে না হয় তাই এই গুজব ছড়িয়েছে। চুমকি এসে যেই না মাকে সকাল বেলা এসব কথা জিজ্ঞেস করেছে যে এসব সত্যি কিনা? তারপর মা উল্টো এখন চুমকির উপরেই চিৎকার শুরু করেছে।”

” তাহলে ওর কী দোষ?মায়ের চিৎকার শুনে বেচারার মুখ টুকু ছোট হয়ে গেছে। মাকে থামাও। ”

এবার মাহিরা তার কাছে এগিয়ে এসে বললো,

“আরেহ আপা। চুমকি জাস্ট একটা বাহানা, মা তো আসলে ঐ লাজু খাতুনকে ধুয়ে দিচ্ছে। দাড়াও একটু মজা নেই। ঐ মহিলা এভাবেও বেশি সুবিধার না।”

মেঘলা একে একে সবার মুখের দিকে তাকালো। সবাই এতো উদগ্রীব হয়ে দেখছে মনে হচ্ছে যেনো পাকিস্তান ইন্ডিয়ার ফাইনাল ম্যাচ চলছে। সে গিয়ে নাজমা বেগমকে থামিয়ে বাসার ভিতর নিয়ে এলো।

“মা, তুমি কী পাগল হয়ে গেছো? রাস্তায় দাঁড়িয়ে এরকম চিৎকার কেনো করছিলে?”

“ওরা আমার মেয়ের নামে উল্টাপাল্টা কথা ছড়াবে আর আমি ওদের ছেড়ে দেবো নাকি?

” মা ওদের মানসম্মান নাই, কিন্তু আমাদের তো আছে। যা ইচ্ছা করুক। ”

“অনেক শুনেছি তোর কথা এবার তোর জন্য আমি নিজে পাত্র দেখবো। আর সেই পাত্রকেই তোর বিয়ে করতে হবে। এবার আমি আর কোনো না শুনবো না।”

” কিন্তু মা….. ”

“কোনো কিন্তু না। এবার না হয় মায়ের কথা শুনে দেখ। তোর এই মা সব ঠিক করে দেবে।”

মেঘলা বুঝতে পারলো যে এখন কোনোমতেই আর তার মাকে থামানো যাবে না। তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। আজ রেস্টুরেন্টে একটা এনগেজমেন্ট পার্টির বড়ো অর্ডার আছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে সবকিছু চেক করতে হবে।

————————

“একের পর এক খুন, তাও একই স্টাইলে।২ মাসে টোটাল ১৬ টা খুন। সবগুলো লাশের পাশেই চিরকুট। এতো ক্লু থাকতেও আপনারা কোনো কুল কিনারা করতে পারছেন না। মিডিয়া ভাবছে পুরো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট চুরি পড়ে বসে আছে।”

ডিএমপির যুগ্ন কমিশনার মাজহারুল হক প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বললো। তার সামনে ডিএমপির সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তরা বসে আছে। কারো মুখেই কোনো উত্তরে নেই। উত্তর কিভাবে দেবে লাস্ট ২ মাসে যাবত ঢাকার বিভিন্ন স্পটে একের পর এক পুরুষ মানুষের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। যারা খুন হচ্ছে তারাও খুব সাধারণ মানুষ। এদের খুন করে কারোই কোনো লাভ হবে না। প্ৰত্যেকটা লাশের একদম বীভৎস অবস্থা করে ফেলে। চোখগুলো উঠানো থাকবে, লাশের প্রাইভেট পার্ট থেতলানো থাকবে আর গলাও কাটা থাকবে। লাশ দেখেই বোঝা যায় যে কেউ কোনো ক্ষোভ নিয়ে এই খুন গুলো করে। আর সবচেয়ে ধাঁধানো বিষয় থাকে চিরকুটে। প্রতিটা চিরকুটেই লেখা থাকবে-

“যে পাপ লুকিয়ে ছিল,
তারই আজ বিচার হলো।
পাপিকে তোমরা চিনবে না,
কিন্তু সে নিজেকে চিনবে।”

“অনেক হয়েছে লুকোচুরি খেলা, এই কেস আমি পিবিআই তে ট্রান্সফার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কালকে পিবিআই থেকে এএসপি আরশাদ ফরাজী আসবে। তাকে কেসের সব ফাইল হ্যান্ডওভার করে দেবে।”

আরশাদ ফরাজীর নাম শুনে কনফারেন্স রুমের সবাই একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো। বর্তমানে পিবিআই এর সবচেয়ে বিচক্ষন তরুণ কর্মকর্তা আরশাদ ফরাজী। তার ৫ বছরের ক্যারিয়ারে এমন কোনো কেস নেই যা সে সলভ করেনি। এই কেসে আরশাদ ফরাজীর হস্তক্ষেপ মানে হচ্ছে খুনি খুব দ্রুতই ধরা পড়বে।

—————-

লিফট থেকে নামতেই মেঘলা তানিয়ার মুখোমুখি হলো। মেঘলা তানিয়াকে ইগনোর করতে চাইলেও তানিয়া নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে বললো, ” কেমন আছো, মেঘলা আপু?

” ভালো। ”

উত্তর দিয়ে মেঘলা সামনে এগোতে নিলেই তানিয়া আবার তাকে বাধা দিয়ে বললো,”আপু তুমি কী আমাকে ইগনোর করছো? ”

“ইগনোর কেনো করবো?.”

“এই যে আমি নাবিল ভাইয়াকে বিয়ে করছি।”

“না।”

“দেখো আপু রাগ করো না। মানুষের মন তো আর সবসময় একজনের উপর থাকবে না। মানুষের পছন্দ বদলাতেই পারে।”

“হ্যা বদলাতেই পারে। খেয়াল রাখিস বিয়ের পর তোর নাবিল ভাইয়ার মন আবার না বদলে যায়।”

” এই তোমার এরকম চটাং চটাং কথার জন্যই নাবিল ভাইয়া তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে। দেখবো আনে এবার কে তোমাকে বিয়ে করে? ”

” আমার বোনকে কেউ বিয়ে না করলেও সমস্যা নেই। আমার বোন মাসে যা আয় করে তা দিয়ে সে ৪ টা সংসারের খরচ চালাতে পারে। আমার বোন কষ্ট করে সৎপথে উপার্জন করতে জানে।তাই আমার বোনের বিয়ে নিয়ে তাড়া নেই।আমার বোন তো আর তোর মতো না যে রাস্তায় রাস্তায় পুরুষ মানুষ সিডিউস করে বেড়াবে। ”

পিছন থেকে উচ্চস্বরে মাহিরা তানিয়ার কথার জবাব দিলো। তানিয়া এবার খেপে গিয়ে বললো,

” কী বললে তুমি? ”

“যা বলেছি সত্যি বলেছি। চুপচাপ এখানে থেকে চলে যা নইলে আরো চিৎকার করে বলবো যে তুই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পুরুষ মানুষ সিডিউস করিস।”

মাহিরার কথা শুনে তানিয়া তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে চলে গেলো। মাহিরা যেমন ঠোঁট পাতলা শেষে যদি সত্যি সত্যি চিৎকার করে বলা শুরু করে।

——————

নাবিল সকাল সকালই নাফিজাকে খবর দিয়ে বাসায় এনেছে।সামনের মাসের মধ্যে টাকার যোগাড় করতে হবে তা না হলে বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে সমস্যা হয়ে যাবে। নাবিল কিছুটা জড়তা নিয়ে নাফিজাকে সবকিছু খুলে বললো। কিন্তু নাফিজা খুব দায়সারা ভাব নিয়ে বললো,

“তো আমাকে এসব ঘটনা বলছো কেনো ?আমি কী করবো?”

“দেখ তোকে বিয়ের সময় যে ৩ লাখ টাকার গহনা দিয়েছিলাম। ঐ গহনাগুলো এখন আমার কাছে দে। আমি ঐগুলো বন্দক দিয়ে কিছু টাকা ধার করি। বুঝতেই তো পারছিস সামনের মাসে আমার বিয়ে। আর এখন আমার হাতে তো তেমন কোনো টাকা নেই। তোর গহনাগুলোই এখন আমার শেষ ভরসা।”

“কিহহ বলছো এসব? আমার গহনা আমি দেবো না।”

” আহা, আমি তো আবার টাকা যোগাড় করে তোর গহনা তোকে ফিরিয়ে দেবো। ”

“দরকার নেই। ঐ গহনা আমার শাশুড়ির কাছে, ঐসব গহনা আবার ফেরত আনলে আমার শশুড়বাড়ির লোকেরা আমাকে ছোটোলোক ভাববে।”

নাবিল আর কিছুই বলতে পারলো না। নাফিজাও আর কথা না বাড়িয়ে সাথে সাথেই শশুরবাড়িতে চলে গেলো। চিন্তায় নাবিলের মাথা হ্যাং হয়ে আছে।বিয়ের বিশাল খরচ,তার উপর এই বাসাটাও চেঞ্জ করতে হবে। এখন নিজেদের গ্রামের বাড়ির ভিটা বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় তার কাছে নেই।কিন্তু সেখানেও তো নাফিজার ভাগ রয়েছে। তাই লাজু বেগম আর সে বুদ্ধি করে গ্রামের বাড়ি বিক্রি করার ব্যাপারে নাফিজাকে কিছু জানালো না । জানালে ও যদি আবার অমত করে বসে।

——————–

আরশাদ ঢাকা ফিরলো দীর্ঘ ৬ মাস পর। এতদিন একটা কেসের তদন্ত নিয়ে চট্টগ্রামে ব্যস্ত ছিলো। হঠাৎই ডিএমপির একটা কেসের তদন্তের জন্য তাকে জরুরি তলব করা হয়েছে। যদিও কাল রাতেই সে কেসটির ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য জমাট করে ফেলেছে। ঢাকা এসেই ডিএমপির বেশ কিছু সৎ কর্মকর্তা নিয়ে সে একটা টিম গঠন করেছে।

“যারা খুন হয়েছে তাদের মধ্যে কী কোনো কানেকশন আছে।”

“স্যার বয়সের মিল বাদে আর কোনো মিল নেই। আমরা তাদের সব ডিটেইলস ঘাঁটাঘাঁটি করেছি।”

“কত বছর আগের ডিটেইলস বের করেছো? ”

“স্যার এইতো ১০-১৫ বছর।”

“২০-৩০ বছর আগের ডিটেইলস বের করো ”

ইন্সপেক্টর সাদাতকে ডিটেইলস বের করার দায়িত্ব দিয়ে আরশাদ সাব ইন্সপেক্টর আরিফেকে বললো,

” আর তুমি ওনাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করো। ফ্যামিলির আগে কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিলো কিনা চেক করো। ”

একে একে সবাইকে যার যার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আরশাদ নিজেও প্ৰত্যেক ভিক্টিমের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট চেক করতে লাগলো।

—————-

মেঘলার বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ৮ টা বেজে গেলো। বাসায় ঢুকতেই বাসার সবার মুখ থমথমে দেখতে পেলো। ড্রয়িং রুমের সোফায় ইরিনার খালা খালু বসে আছে। নাজমা বেগম বললেন,

“আমার বড়ো মেয়ে এসে পড়েছে। যা কথা বলার ওর সাথে বলুন।”

ইরিনার খালু তোষামোদে ভঙ্গিতে বললো, “অনেকদিন তো ইরিনা এখানে ছিলো, আমরা এখন ওকে ফিরিয়ে নিতে চাই। আশা করি তোমাদের কোনো আপত্তি হবে না। ”

“আশ্চর্য হঠাৎ করে ওকে ফেরত নিতে এসেছেন কেনো? ৭ বছর আগে যখন আমার ভাই মারা যায় তখন তো বলেছিলেন এমন বিধবা অপয়া মেয়ে আপনারা ফিরিয়ে নেবেন না।”

ইরিনার খালা এখন মুখ খুললো।

“আমাদের মেয়ে আমরা কখন নিয়ে যাবো এটা আমাদের সিদ্ধান্ত। না এখন ইরিনার ভালো চাকরি হয়েছে দেখে ওকে তোমরা হাতছাড়া করতে চাচ্ছো না।আর তুই ও ইরিনা এখনো কেনো শুধু শুধু এই সৎ শাশুড়ি আর অবিবাহিত ননদদের ঝামেলা পোহাবি?”

এবার মেঘলা কিছু বলার আগে ইরিনা বলে উঠলো,

“খালা,আমার ননদকে অপমান করার সাহস আপনি কোথায় পেলেন? চাকরি তো হলো ২ দিনে আগে। গত সাত বছর ধরে এই মানুষটাই আমাকে ঠাই দিয়েছে। এই পরিবারটা ছায়ার মতো আমার পাশে থেকেছে। আজকে পর্যন্ত কোনোদিন ওরা আমার আর মাহিরার মধ্যে পার্থক্য করেনি। আর যে মানুষটাকে বললেন সৎ শাশুড়ি, জীবনে মায়ের মমতা কেমন হয় তা আমি প্রথম ওনার কাছ থেকেই জানতে পারছি। আর আমি ভালো করেই জানি তোমার ২ ছেলে তোমাদের ছুড়ে ফেলেছে তাই এখন চাচ্ছো আমি যেনো তোমাদের দায়িত্ব নেই।”

“তুই এভাবে বলছিস কেনো ইরিনা। তোকে ১৮ বছর ধরে লালন পালন করার এই প্রতিদান দিচ্ছিস?”

“প্রতিদান চাচ্ছো। বোঝার পর থেকে তোমার ঘরের সব কাজ করে দিয়েছি। ফ্রিতে লালন পালন করো নি আমাকে। বিয়ের পর যখন সদ্য বিধবা হলাম তোমরা বলেছিলে আমাকে অপয়া। যারা আমার দুঃখের দিনে আমার পাশে ছিলো, আমার সুখের দিনে আমি শুধু তাঁদের আমার পাশে রাখবো। লজ্জা থাকলে আর এ বাড়িতে এসো না।”

ইরিনা ক্ষেপে গিয়েছে দেখে তার খালা খালু বুঝতে পারলো তারা এখানে বেশি সুবিধা করতে পারবে না। তাই তাড়াতাড়ি চুপচাপ বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।নাজমা বেগম চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন,

“কী যে হচ্ছে এসব বাসায়। একের পর এক ঝামেলা লেগে আছে।”

“আহা মা। টেনশন করো না, আবার তোমার প্রেসার বের যাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। চুমকিকে টেবিলে খাবার দিতে বলো। দুপুরে ব্যস্ত ছিলাম কিছু খেতে পারিনি। বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে।”

চলবে……

কেমন লাগছে মেঘলাকে?গল্পের টুইস্ট গুলো ইন্টারেষ্টিং লাগছে তো? কমেন্টে জানাবেন কিন্তু..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here