#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১৯
(শব্দসংখ্যা ১২৩০)
“আমি বুঝিনা এই পুরুষ মানুষ গুলোর এত সমস্যা কিসের? একটা মেয়ে মানুষ নিয়ে জীবন কাটাতে গিয়ে তাদের এতটাই কষ্ট হয় যে নতুন নতুন মেয়ে মানুষ খুঁজতে থাকে।”
ইরিনা মেঘলার কথার কোন উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সে সোজা এই বাসায় এসেছে। বাসায় শুধুমাত্র মেঘলা ছিল। নাজমা বেগম মিহির আর মাহিরাকে নিয়ে তার বাপের বাড়ি গিয়েছে। কাল সকালে তারা বাসায় ফিরবে। তাই ইরিনা মেঘলাকে একে একে হসপিটালে ঘটে যাওয়া সব কিছু খুলে বলল। ইরানের বলা কথাগুলো শুনে মেঘলার মাথায় নতুন করে নাবিল আর তানিয়ার করা কান্ডগুলো ভেসে উঠলো।
“আমার মনে হয় আদিব এখানে অবশ্যই আসবে। কালকে তোদের রিসিপশন তাই না? আপাতত তোমার ওই ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়ার দরকার নেই। কালকে আমরা দুইজন একসাথে রিসিপশনে যাব। সেখানে গিয়ে মিতু আন্টিকে সব জানাবো বাকিটা তিনি বুঝে নিবেন।”
তাদের কথার মাঝেই বাসার বেল বেজে উঠলো। মেঘলা অবাক হয়ে বলল,
“এই রাত ১০ টা বাজে আবার কে আসলো?”
মেঘলা দরজা খুলতে গেলে ইরিনা ও তার পিছে পিছে গেল। দরজার লুকিং গ্লাস দেখে মেঘলা আরো একবার অবাক হয়ে বলল,
“তোর ভাসুর এই সময় এখানে কি করছে?”
কথাটা বলেই মেঘলা দরজা খুলতে নিলে ইরিনা তাকে বাধা দিয়ে বলল,
“আপু খুলো না। নির্ঘাত ওনার ওই ছোট বান্দর ভাইটাকে ও সাথে নিয়ে এসেছে।”
ইরিনা বেশ উচ্চস্বরে কথাগুলো বলায় দরজার বাহির থেকে আদিব আর আরশাদ ও কথাগুলো শুনতে পেল। আরশাদ আদিবের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে বলল,
“তোর বউ তোকে বান্দর বলেছে। তাও আবার ছোট বান্দর। ”
দরজার ওপাশ থেকে মেঘলা ইরিনার কথায় সায় দিয়ে বলল,
” তা ঠিক বলেছিস তবে তোর ভাসুরটাও বেশি সুবিধার না। একদিন একটু পাত্তা দিয়েছি। তারপর থেকে শুধু বউ বউ বলে জ্বালাচ্ছে । আদিব ছোট বান্দর হলে ঐটা হচ্ছে বড় বান্দর। ”
এবার আদিব আরশাদের দিকে ঘুরে গা জ্বলানো হাসি দিয়ে বলল,
” ভাইয়া তোর বউ ও তোকে বান্দর বলেছে। ”
মেঘলা দরজাটা অল্প একটু খুলে রুক্ষ কণ্ঠে আরশাদকে জিজ্ঞেস করল
“কি চাই?”
” বউ চাই।আছে তোমার বাসায়? ”
“রাত দশটা বাজে ফাজলামি করছেন।কিসের জন্য এসেছেন? ”
” ভিতরে ঢুকতে দাও কথা আছে। আমি ইরিনার সাথে কথা বলবো। ”
” কোন কথা হবে না যা কথা হবে কালকে রিসিপশনে হবে। কালকে আমরা মিতু আন্টিকে আপনার ভাইয়ের কীর্তি সম্পর্কে সব বলে দেব।”
” না না মেঘলা, প্লিজ শোনো। ”
আরশাদের কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই মেঘলা তার মুখের উপর শব্দ করে দরজা বন্ধ করে দিলো। আরশাদ আর কিছু না বলে বিল্ডিং এর বাহিরে বের হয়ে আসলো। আদিব ও মুখ গোমড়া করে তাকে অনুসরণ করল। আরশাদ বিল্ডিং এর বাইরে এসে রুক্ষ কণ্ঠে আদিবকে বললো,
” আরো যা এক্স গার্লফ্রেন্ডের সাথে গল্প করতে, সহানুভূতি দেখাতে। তোর সাথে সাথে এখন আমার বউও চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ”
আদিব নিজের ভাইয়ের কথা শুনে মনে মনে বলল,
” ভাইয়া নিজের বউ নিয়ে এতো সিরিয়াস কেনো হচ্ছে?মানুষ সত্যিই বলে বিয়ে হলে বাঘ ও বিড়াল হয়ে যায়। ধ্যাত আমার নিজের অবস্থাও তো সেইম। ”
তবে নিজের মনের কথা মনে রেখেই আদিব আরশাদকে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া এখন কি বাসায় চলে যাবো? মেঘলা আপু যেভাবে রেগে আছে মনে হয় না আজ আমাদের আর বাসায় ঢুকতে দিবে।”
আরশাদ আদিবের মাথায় চাটি মেরে বলল,
” ঠিক এই জন্যই তোর বউ বাসায় ছেড়ে চলে এসেছে। তোর মাথায় ঘিলু বলতে কিছু নেই। এখন যদি তুই এখান থেকে চলে যাস তাহলে তোর বউ মনে করবে তুই তাকে প্রায়োরিটি দিস না। আর মেঘলাকে আপু ডাকছিস কেনো ওকে এখন থেকে ভাবী ডাকবি।”
” তা ঠিক বলেছ ভাইয়া কিন্তু তুমি কবে থেকে নিজের বিয়ে নিয়ে এত সিরিয়াস হলে? আবার দেখি আজকাল রিলেশনশিপ নিয়ে ও অ্যাডভাইস দিচ্ছো।”
“তুই আসলেই বকবক বেশ করিস। তুই কি চাস আমার ডিভোর্স হয়ে যাক। ভাই ৩০ বছর বয়সে এসে বউ জুটেছে,এই বউ চলে গেলে আমার কপালে আর বউ জুটবে না। ”
” তাও ঠিক বলেছো। কিন্তু এখন আমরা এখানে করবোটা কি? ”
” কি করবি মানে? ওই দেখ ওদের বাসা। সারারাত আমরা দুজনে ওদের বাসার সামনের বসে থাকবো। সারারাত বসে থাকলে হয়তো তোর আর আমার বউয়ের মন কিছুটা হলেও গলতে পারে। ”
” কিন্তু ভাইয়া সারারাত কিভাবে বসে থাকবো?এভাবে রাস্তায় বসে থাকা যায় নাকি?”
” তুই রাতে পিকনিকে যাস না? মনে কর এটা আমাদের আজকের পিকনিক স্পট।পিকনিক করতে এসেছিস তাই সারারাত এখানে থাকবি। ”
আদিব বিরস মনে নিজের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করল। সিগারেট মুখে ধরে যেইনা লাইটার জ্বালাতে যাবে আরশাদ তাকে বলল,
” রাত দুপুরে এভাবে শ্বশুরবাড়ির সামনে বসে সিগারেট টানতে লজ্জা করছে না? ”
” ভাইয়া তুমিই তো বললে এটা আজকে আমাদের পিকনিক স্পট। পিকনিক স্পটে তো সিগারেট খাওয়াই যায় । ”
” তাও ঠিক বলেছিস। দে আমাকেও একটা দে। ”
“ভাইয়া তুই ও সিগারেট খাস? ”
” তুই যা করেছিস তোর বউয়ের সাথে সাথে এখন আমার বউ ও আমার উপরে ক্ষেপে আছে। আমার বউ আমাকে ডিভোর্স দিলে তখন তো বিরহে ম*দ গা*জা ও খাওয়া লাগবে। তাই আগে থেকেই সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস করি। ”
দুই ভাই পায়ের উপর পা তুলে ফুটপাতের উপরে বসে সিগারেট টানতে লাগলো। আরশাদ বুদ্ধি করে মেঘনাদের বাসা থেকে দুই বিল্ডিং পরের রাস্তায় এসে বসেছে যেন সিগারেট খাওয়া অবস্থায় বউদের সামনে তারা না পরে।
মেঘলা শুতে যাওয়ার আগে ইরিনাকে জিজ্ঞেস করল,
” ওরা কি চলে গিয়েছে? ”
” মনে হয় চলে গিয়েছে। সাড়াশব্দ তো পাচ্ছি না। ”
কথাটা বলে ইরিনা বারান্দায় গিয়ে আবার মেঘলাকে ডেকে বলল,
” আপু ওনারা মনে হয় যায়নি। ”
” তুই না কেবল বললি চলে গিয়েছে? ”
” মানুষ দেখতে পাচ্ছি না তবে আদিবের গাড়ি এখনো আমাদের বাসার সামনে পার্ক করা। হয়তো আশেপাশেই আছে।”
” ভালো হয়েছে রাস্তায় বসে বসে মশার কামড় খাক।”
এবার ইরিনা কন্ঠস্বর কিছুটা নিচু করে মেঘলা কে বলল,
“আপু এতো রাতে ওনাদের দুই ভাইকে এরকম শশুড়বাড়ির সামনে বসিয়ে রাখাটা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না।”
“আরেহ ধ্যাত, ১ ঘন্টা রাস্তায় বসে থাকুক দেখবি নিজেরাই অসহ্য হয়ে চলে যাবে। পুরুষ মানুষ এরা লাই দিলে আরো মাথায় উঠবে।”
————-
অফিস থেকে ফিরতে সাদাতের আজ বেশ লেট হয়েছে। বাসার সামনে দেখতে পেল রাস্তার ফুটপাতে অন্ধকারে দুইজন পুরুষ বসে সিগারেট টানছে। হয়তো বখাটে ছেলেগুলো আবার এখানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। তাই তাঁদের দিকে এগিয়ে গিয়ে উচ্চস্বরে বললো,
” কতবার তোমাদের বলা হয়েছে যে এটা ভদ্র মানুষের এলাকা। এখানে বসে এসব লাফাঙ্গা গিরি করবে না। ”
কথাগুলো বলেই সে ফোনের ফ্লাশ লাইট অন করে দুইজনের মুখের দিকে তাক করলো। তাদের ফেইসের দিকে ভালোমতো লক্ষ্য করতেই সে একশো ভোল্টেজের ঝটকা খেয়ে লাফিয়ে উঠলো।তোতলাতে তোতলাতে বলল,
” স্যার আপনি এখানে?এই সময়? আসলে আমি বুঝতে পারিনি মনে করেছিলাম বাজে ছেলেরা মনে হয় আবার এখানে আড্ডা দিচ্ছে। সরি স্যার। ”
” ইটস ওকে।বাই দ্যা ওয়ে তুমি এখানে কেন?”
” স্যার সামনের এই বিল্ডিং এ থাকি আমি। কিন্তু স্যার আপনি এখানে? ”
এবার আরশাদ কিছুটা অসহায় কন্ঠে বলল,
” আর বলো না।ও আমার ছোট ভাই আদিব। দুই বিল্ডিং পরেই আমাদের শশুর বাড়ি। দুজনের বউ রাগ করে আছে, তাই শ্বশুরবাড়ি প্রবেশ করতে পারছি না। ”
” আপনি বিয়ে করে ফেলেছেন?কবে?দাওয়াত দিলেন না তো? ”
” তোমাকে কিভাবে দাওয়াত দিব আমার নিজের বিয়েতে আমি নিজেই দাওয়াত পাইনি। ”
” স্যার আপনার ওয়াইফের নাম কি? ”
” মেঘলা। দুই বিল্ডিং পরেই ওদের বাসা। ”
” ওহহ স্যার আপনি তাহলে সেই সোনার টুকরো ছেলে।”
সাদাতের কথা শুনে আদিব আর আরশাদ দুইজনেই তার দিকে চোখ কুঁচকে তাকালো। আরশাদ কৌতূহলের সাথে জিজ্ঞেস করল,
“মানে?”
” স্যার মাইন্ডে নিবেন না। কিন্তু এলাকার আন্টি সমাজের কথা তো জানেন। হয়তো রিসেন্টলি কোন অনুষ্ঠানে আপনাকে দেখেছে। তারপর থেকে তাদের মুখে একটাই কথা যে মেঘলা সোনার টুকরা ছেলেকে জামাই হিসেবে পেয়েছে। ”
সাদাতের কথা শুনে আদিব হো হো করে হেসে দিল। আরশাদ তার দিকে চোখ গরম করে তাকাতেই সে হাসি থামিয়ে দিয়ে বললো,
” সোনার টুকরো ছেলে। ভাইয়া সেই হয়েছে নামটা। ”
সাদাত এবার বিনয়ের সাথে আরশাদ কে বলল,
” স্যার আমার বাসায় চলুন। রাতের ডিনারটা ওখানে করে নিবেন। ”
” থ্যাংকস বাট আমরা অলরেডি ডিনার করেই এসেছি। ”
” ঠিক আছে স্যার আমি তাহলে ফ্রেশ হয়ে আবার আসছি। ”
” না না তার প্রয়োজন নেই।তুমি অফিস করে এসেছো রেস্ট নাও। ”
” ইটস ওকে স্যার। মনে হয় না আজ রাতে আপনারা বাসায় ঢুকতে পারবেন। তাই আপনাদেরকে একটু না হয় সঙ্গ দিলাম।”
” মনে হচ্ছে তোমার এই ব্যাপারে বেশ ভালোই অভিজ্ঞতা আছে সাদাত। ”
” একদম ঠিক বলেছেন স্যার আসলে প্রতিটা বিবাহিত পুরুষের জীবনেই এরকম রাত মাঝে মাঝেই আসে। ”
চলবে…….

