#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_২০
(শব্দসংখ্যা ১৫০০)
ডিউটি শেষে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেই সিনথিয়া জামান কেমন একটা উদ্ভট গন্ধ পেল। প্রথমে বুঝতে পারল না যে গন্ধটা কিসের? হঠাৎ কিছু খেয়াল হতেই মোতালেব সর্দারকে রাখা রুমে প্রবেশ করল। সে যা ভেবেছিল তাই ঠিক মোতালেব সর্দার আত্মহত্যা করেছে। কালকে রাতে সে ব্লেড সরাতে ভুলে গিয়েছিলো। আর সেই ব্লেড দিয়ে মোতালেব সর্দার নিজের হাতের শিরা কেটেছে। হয়তো সকালেই সে এরকম কিছু ঘটিয়েছে তার জন্যই লাশ অলরেডি পচা শুরু করে দিয়েছে । কিছুক্ষণ সিনথিয়া জামান বুঝতে পারল না যে সে এখন কি করবে? তাই তড়িঘড়ি করে নিজের মোবাইলের ডায়াল লিস্ট থেকে প্রথম নাম্বারটিতে কল করলো। কল রিসিভ হতেই সে তাড়াহুড়া করে বলল,
” সর্বনাশ হয়ে গেছে ও আত্মহত্যা করেছে। ”
” কি বলছে এসব? তোমার সামনে এসব কিভাবে করলো ?”
” কালকে রাতে ওকে টর্চার করার পর ব্লেডটা ভুলে ওর কাছেই রেখে এসেছিলাম। হয়তো সকালের দিকে করেছে। লাশ ও অলরেডি পচা শুরু করে দিয়েছে। ফ্ল্যাটের ভিতর উদ্ভট গন্ধ ছড়াচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে গন্ধটা হয়তো ফ্ল্যাটের বাহিরেও চলে যাবে। আমি বুঝতে পারছি না যে আমি এখন কি করবো?”
ওপাশের ব্যক্তি মৃদু কণ্ঠে বললো,
” প্যানিক করো না যা হওয়ার হয়ে গেছে। ওর লাশটাকে ব্ল্যাক পলিথিনে ভরো প্রথমে। তারপর ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখো। আর বাসায় ফিনাইল আছে তো? ”
“জি আছে।”
” সম্পূর্ণ ফ্ল্যাট ফিনাইল দিয়ে ক্লিন করে ফেলো, তাহলে আর গন্ধ বাহিরে ছড়াবে না। ”
” ঠিক আছে আমি কাজ শেষ করে তোমাকে ফোন দিচ্ছি।”
——————–
রাতটা আদিবার আর আরশাদের রাস্তায়ই কাটল। যদিও সকাল হতেই তড়িঘড়ি করে তারা নিজেদের বাড়ির দিকে ছুটলো। সকাল আটটা বাজে দুই ছেলেকে একসাথে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে মিতা ফরাজী বলে উঠলেন,
” তোরা দুইজন এত সকালে বাসায়? তাও একসাথে?”
আদিব কিছু বলার আগেই আরশাদ তার মাকে বলল,
” আসলে মা কাল রাতে আমি আদিবের বাসায় ছিলাম। আমরা চিন্তা করলাম বাসায় হয়তো আজকে কাজ আছে তাই তো সকাল সকাল এসে পড়লাম।”
” ভালো করেছিস কিন্তু ইরিনা কই? ”
এবার আদিব নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে উত্তর দিল,
” আসলে মা ও কালকে ওর বাবার বাসায় গিয়েছে। ও একবারে উনাদের সাথেই রিসিপশনে আসবে। ”
” ও আচ্ছা। তোরা তাহলে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে আয় নাস্তা দিচ্ছি। ”
————————
ফরাজী পরিবারের মোটামুটি সব আত্মীয়-স্বজনেরাই আজকের রিসিপশন পার্টিতে এসেছে। চট্টগ্রাম থেকে আরশাদের দাদি মনোয়ারা বেগম এসেছে। তার সাথে হেনা খাতুন আর কেয়া ও এসেছে। যদিও হেনা খাতুনের আচরণ বেশি সুবিধার মনে হচ্ছে না। তার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে যে সে আজকেও কোনো গন্ডগোল পাকাবে। সে অলরেডি কৌশলে রিসিপশনে আসা মহিলাদেরকে আরশাদ আর মেঘলার বিয়ে কিভাবে হয়েছে তা বলা শুরু করে দিয়েছে।সে তার সমস্তটা দিয়ে এটা প্রমান করতে চাইলো যে মেঘলা একটা ক্যারেক্টারলেস মেয়ে তাই তো সে আরশাদকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করেছে।তবে তার এই কান্ড কেয়ার চোখে ধরা পড়ে গেলো। তাই সে তার মাকে দোতলার একটা ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে কর্কশ স্বরে বললো,
” মা তোমার কি এখনো শিক্ষা হয়নি? তুমি আবার এইখানে এসে শুরু করেছো। মেঘলা মেয়েটা কি দোষ করেছে যে সবাইকে ওর চরিত্র নিয়ে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছো? ”
” সব দোষ ওর।ও যদি সেদিন ওই ঘরে না যেত তাহলে কি সেদিন আরশাদ বাবার সাথে ওর বিয়েটা হতো। তোর তো তাহলে এই বাড়ির বউ হবার সুযোগটা থাকতো। ”
” মা সেদিনের সম্পূর্ণ ঝামেলাটা তুমি করেছো । সেদিন রাতে খুবই নিকৃষ্ট ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছো তুমি।তুমি সেদিন আরশাদ ভাইয়ের রুমে আমাকে পাঠাতে চেয়েছিলো। কিন্তু যেটা ভাগ্যে ছিল সেটা হয়ে গিয়েছে। তাহলে এখন শুধু শুধু এই মেয়েটার নামে সবার সামনে বদনাম কেন করছো? ”
” শোন তোকে একটা কথা বলি। এই বাড়ির এক কাজের লোকের কাছ থেকে শুনলাম ওই মেঘলা মেয়েটা এখনো এই বাড়িতে আসেনি। মানে এখনো ও আরশাদের সাথে সংসার শুরু করেনি। তাই এখনো সুযোগ আছে। কোনমতে যদি আরশাদকে তুই তোর জালে ফাসিয়ে নিতে পারিস তাহলে দেখবি তুই ওকে বিয়ে করতে পারবি। ”
” মা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? আরশাদ ভাই বিবাহিত এখন। ”
” বিবাহিত হয়েছে তো কি হয়েছে? পুরুষ মানুষ কি দুই বিয়ে করে না? আর ওই বুড়ি মেয়ের প্রতি আরশাদের মনে হয় না কোনো আকর্ষণ আছে। তাই সুযোগটাকে কাজে লাগা। এখন তাড়াতাড়ি তোর মিতু মামির কাছে চল। এখানে এসেছিস বেশি বেশি ওনার আশেপাশে থাকবি। কারণ এই সংসারের উনিই মেইন। উনি যদি তোকে ছেলের বউ হিসেবে একবার পছন্দ করে ফেলে তাহলে তোকে আর কেউ এই বাড়ি থেকে বের করতে পারবে না। ”
কথাগুলো বলেই হেনা খাতুন এক মুহূর্ত দেরি না করে কেয়াকে নিয়ে মিতু ফরাজীর রুমের দিকে গেল। হেনা খাতুন তাড়াহুড়ায় খেয়ালই করলো না যে তার এই গোপন ষড়যন্ত্র অলরেডি দুইজন মানুষের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে। পিকু আর মিকু এই রুমের বারান্দায় বসে ছিলো। বারান্দার ফ্লোরে বসে থাকার কারণে হেনা খাতুন বা কেয়া কেউই তাদের খেয়াল করেনি। হেনা খাতুনের বলা কথাগুলো শুনে মিকু আর পিকু একে অপরের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো।
” তার মানে সেদিন রাতের ঘটনাটা এই শয়তান মহিলা ঘটিয়েছে। ”
” হ্যাঁ রে পিকু এই মহিলাকে আমার প্রথম থেকেই কেমন জানি সুবিধা লাগতো না। আমাদের বাড়িতে আসলে কেমন যেন লোভাতুর দৃষ্টিতে সবকিছুর দিকে তাকিয়ে থাকতো।”
” কি পরিমাণ ডেঞ্জারাস মহিলা এখন আবার আরশাদ ভাই বিবাহিত হওয়ার পরেও তার মেয়েকে আরশাদ ভাইয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী বানাতে চাচ্ছে। ”
” মনে হচ্ছে এই মহিলা আজকে রিসিপশনেও কোন ঝামেলা করবে। দাদিকে জানাবি নাকি এর কীর্তি সম্পর্কে? ”
” দাদিকে জানালে কি করবে?একে আর এর মেয়েকে বের করে দিবে। এই মহিলা সেদিন রাতে পুরো পরিবারের মান সম্মান নিয়ে খেলেছে। আর পুরো দোষ চাপিয়ে দিয়েছে আরশাদ ভাই আর মেঘলা ভাবীর উপর। একে তো আমাদের স্টাইলেই প্রথমে শিক্ষা দিতে হবে। ”
” ঠিক বলেEছিস। আজকের অনুষ্ঠানেই একে একটা শিক্ষা দেবো আমরা। ”
—————–
সন্ধ্যা সাতটার দিকে ইরিনা আর মেঘলা রিসিপশন পার্টিতে উপস্থিত হল। কালকের ঘটনা সম্পর্কে নাজমা বেগম কিছু জানে না। মেঘলা আর ইরিনা ইচ্ছা করে তাকে কিছু জানায়নি। এসব জানলে সেটা নিয়ে আবার টেনশন শুরু করবে। ইরিনা আজকে সী গ্রীন কালারের সিকুয়েন্সের একটা লেহেঙ্গা পড়েছে। আর মেঘলা আজ একটা হোয়াইট কালারের আনারকলি পড়েছে। আরশাদ দূর থেকেই মেঘলাকে দেখতে পেল। মেঘলাকে দেখতে পেয়ে তার পা যেন হঠাৎ করে থমকে গেল। আশেপাশের সকল কোলাহল কে উপেক্ষা করে সে একনাগাড়ে মেঘলাকেই দেখতে লাগলো। মিতু ফরাজী তার কিছু বান্ধবীদের সাথে মেঘলা কে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলো।
” এই হচ্ছে আমার বড় ছেলের বউ মেঘলা। ”
মিতু ফরাজী আর কিছু বলার আগেই আদনান ফরাজী তাকে ছবি তোলার জন্য স্টেজে নিয়ে গেলো। মিতু ফরাজী চলে যেতেই তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী তুবা হক কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
” ওহ তুমিই মেঘলা। তোমার জন্যই তাহলে আরশাদ আমার মেয়েকে ছাড়লো। ”
“মানে আন্টি?”
” আরে না বোঝার ভান করো না। আমার মেয়ে নুহা। একদম পরীর মতো দেখতে। আরশাদকে এতো পছন্দ করে মেয়েটা।আমার মেয়েটা তো সুইসাইড পর্যন্ত করতে গিয়েছিলো ওর জন্য।শেষমেশ কি না তোমাকে বিয়ে করল।মেয়ে মানুষের কিছু না থাকলেও সাদা চামড়া থাকতে হয় তা না হলে স্বামীকে বশে রাখা যায় না।”
মেঘলা এবার ভালোভাবে তুবা হকের কথার মানে বুঝতে পারলো। সে যে তাকে অপমান করার জন্যই এভাবে কথাগুলো বলেছে খুব সহজেই সেটা তার বোধগম্য হয়ে গেল। তবে মেয়েটা আরশাদের জন্য সুইসাইড করতে গিয়েছিলো এটা মেঘলাকে নতুন ভাবনায় নিয়ে গেলো। মেয়েটার সাথে কি আরশাদের কোনো গভীর সম্পর্ক ছিলো?
“আরেহ তুবা আন্টি যে?”
মেঘলার ভাবনার মধ্যেই পেছন থেকে আরশাদের কণ্ঠ শোনা গেলো। আরশাদ তাদের কাছে এগিয়ে এসে মেঘলার হাতটাকে নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। তুবা হক এখানে হঠাৎ করে আরশাদকে দেখে কিছুটা থতমত খেয়ে গেলো। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরশাদ আবার তাকে জিজ্ঞেস করল,
” তা আন্টি কি বলছিলেন আমার বউকে? ”
” না তেমন কিছু না। ”
” না শুনলাম তো সাদা চামড়া কালো চামড়া নিয়ে ডিফারেন্স শেখাচ্ছিলেন আমার বউকে। ”
” আরে আরশাদ তুমি ভুল বুঝছো। মা একটু সুন্দর হলে ছেলে মেয়ে গুলোও একটু সুন্দর হয় তাই বলছিলাম। ”
” আন্টি কথা ঘুরানোর চেষ্টা কেন করছেন? শুনলাম আপনার মেয়ের সৌন্দর্য নিয়ে বেশ গর্ব করছিলেন। আন্টি আসলে কি বর্তমান যুগের ছেলেরা না একটু আলাদা। আপনার মেয়ের তোর যতদূর জানি সাদা চামড়া বাদে আর কিছুই নেই। আজকালের ছেলেদের শুধু সাদা চামড়া দিয়ে বশে রাখা যায় না। আমার বউয়ের মতো একটু ব্রেইন ও থাকতে হয়। বাই দ্যা ওয়ে কাল আপনার মেয়েকে ধানমন্ডি থানায় আটকে রেখেছিলো শুনলাম। খুব ড্রিংক করে নাকি ড্রাইভ করছিলো তার জন্য। ”
তুবা হক বুঝতে পারলেন এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে আরশাদ তার মানসম্মান শেষ করে দেবে। তাই সে তাড়াহুড়ো করে সেখান থেকে কেটে পড়লো। এবার মেঘলা থমথমে মুখে আরশাদকে জিজ্ঞেস করল,
“নুহা কে? আপনার জন্য নাকি সুইসাইড ও করতে গিয়েছিলো?”
“মানে?”
“আর মানে মানে করবেন না, আমার সব বোঝা হয়ে গিয়েছে ?”
উঁচু হিল পড়ার কারণে মেঘলার পা বেশ কিছুক্ষন ধরেই ব্যথা করছিলো। তার উপর ওই নুহা মেয়েটার নাম শুনে তার মেজাজটা আরো বিগড়ে গিয়েছে। তাই সে নিজের হিল খুলে রেখে খালি পায়েই বাড়ির বাহিরে বের হয়ে গেলো। আরশাদ প্রথমে বিষয়টা বুঝতে পারলো না কিন্তু সাথে সাথেই তার মনে হলো মেঘলা হয়তো নুহাকে নিয়ে জেলাস ফিল করছে। তাই মেঘলার হিল জুতো হাতে নিয়েই সে মেঘলার পিছন পিছন ছুটলো।
“চুমকি চলেছে একা পথে
সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে
রাগ করোনা সুন্দরী গো
রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো……..”
মেঘলা একা একা রাস্তায় হাটছিলো হঠাৎ করে গানের সুর শুনে পিছনে তাকিয়ে আরশাদকে এভাবে গান গাইতে দেখে বেশ হতভম্ব হয়ে গেলো। এই লোকটা এতো সুন্দর গান ও গাইতে পারে। নিজের রাগটাকে সে সাইডে রেখে আরশাদকে জিজ্ঞেস করলো,
“বাহ্ বেশ সুন্দর কণ্ঠ তো আপনার?”
“বউউউ তোমার পছন্দ হয়েছে? তাহলে আমি তোমার জন্য প্রতিদিন গাইতে রাজি।”
এভাবে আরশাদকে টান লম্বা করে বউ ডাকতে শুনে মেঘলার কিছুটা লজ্জা লাগলো। হঠাৎ করে মেঘলার নজর গেলো আরশাদের হাতের দিকে। আরশাদকে তার জুতা নিয়ে ঘুরতে দেখে মেঘলা অবাক হয়ে বললো,
“আমার জুতা এভাবে হাতে নিয়ে ঘুরছেন কেনো? মানুষ দেখলে কি বলবে? ”
“মানুষ কথায় কি যায় আসে। আমার কাছে তুমি ম্যাটার করো। পৃথিবীর বাকি সবকিছু উচ্ছন্নে যাক।”
আরশাদের কথা শুনে মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে রইলো। কেনো যেনো আজকাল মেঘলার এই মানুষটাকে ভালো লাগতে শুরু করেছে। এই লোকটা যখন তাকে বউ বলে ডাক দেয় তখন তার নিজেকে খুব স্পেশাল মনে হয়।
চলবে………
কেমন লাগছে গল্পটা?যারা গল্পটা পড়বেন তারা কষ্ট করে রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন। রিয়েক্ট যত বেশি হবে পরবর্তী পর্ব ততো তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবেন।

