আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_২৯

0
42

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_২৯
(শব্দসংখ্যা ১৫৫০ )

সাদাত রিফাতকে কাল রাত থেকেই টর্চার করে যাচ্ছে। কিন্তু কোন মতে রিফাতের মুখ খোলাতে পারছে না। সাদাত নিজেও অধৈর্য হয়ে পড়েছে। সে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

” তোকে দিয়ে এইটা যে করিয়েছে তার নাম যে তুই স্বীকার করছিস না, তোর কি ধারণা আছে যে তোকে যদি এই কেসে আমরা কোর্টে তুলি তাহলে আদৌ তোর কি পরিমাণে সাজা হতে পারে? ”

” বললাম তো আমি নিজের ইচ্ছায় গুলি করেছি। ”

সাদাত এবার রিফাতকে আবার চড় দিয়ে বলল,

” তোর মোটিভ কি সেটা বল তাহলে? অন্যের দোষ শুধু শুধু নিজের ঘাড়ের উপর কেন নিচ্ছিস? একজন ডিফেন্সের ব্যক্তিকে হত্যা চেষ্টা করার জন্য তোর কিন্তু মৃত্যু সাজা পর্যন্ত হতে পারে। সোজাসুজি বলে দে যে তোকে কে বলেছে এই কাজটা করতে? ”

সাদাত রিফাতকে আরো কয়েকটা চড় দিল কিন্তু কোন মতেই তার মুখ থেকে এই ঘটনার পিছনে মাস্টারমাইন্ডের নাম বের করতে পারল না।

সাদাত টর্চার সেল থেকে বের হয়ে অনন্যা কে জিজ্ঞেস করল,

” আরশাদ স্যার এখন কেমন আছে? ”

” স্যার একটু আগেই ওনার জ্ঞান ফিরেছে। এখন ওনার অবস্থা বেশ স্ট্যাবল। ”

” আলহামদুলিল্লাহ। ”

তারপর সাদাত টর্চার সেলে থাকা রিফাতের দিকে আঙ্গুল ইশারা করে বলল,

” এ তো কোনমতেই মুখ খুলছে না,সব দোষ নিজের উপর নিয়ে নিচ্ছে । ”

” কিন্তু স্যার এটা তো সম্ভবই না। ও কেন শুধু শুধু স্যারকে গুলি করবে। ওর তো কোন মোটিভ নেই। ”

” সেটাই তো। এক কাজ করো,এর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক কর।দেখো ফ্যামিলিতে কেউ আছে কিনা? থাকলে তাকে এখানে নিয়ে আসো। ওকে ব্ল্যাকমেইল করে কনফেশন নেওয়া ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন উপায় নেই। ”

” ওকে স্যার আমি এখনই ওর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার ব্যবস্থা করছি। ”

—————–

মেঘলা আরশাদের শরীর স্পঞ্জ করে দিচ্ছিল। আরশাদ তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। মেঘলা তার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,

” কি হয়েছে আপনার? এভাবে হাসছেন কেন? ”

” আসলে আমার না কালকে অজ্ঞান হওয়ার আগে তোমার বলা কথাগুলো মনে পড়ে গিয়েছে। ইশ তুমি কি কান্নাটাই না করছিলে। কালকে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছিল তোমার মুখ থেকে এরকম ভালোবাসাপূর্ণ কথা শোনার জন্য হলেও মাসে একবার গুলি খাওয়াই যায়। ”

মেঘলা এবার আরশাদের দিকে চোখে বিরক্তি নিয়ে তাকালো।

” বাহ আপনার গুলি খেতে এত বেশি ইচ্ছে করে? এবার সুস্থ হয়ে আমাকে একটা রিভালবার আর লাইসেন্স এনে দিয়েন। আমি প্রতিমাসে আপনাকে একটা করে গুলি করবো। ”

মেঘলার কথা শুনে আরশাদ কিছুটা থতমত খেয়ে বললো,

” আরে না না বউ তোমার লাইসেন্সের দরকার নেই। এভাবেই তুমি যা ক্যালাতে পারো, কবে জানি আমি তোমার হাতেই ক্যালানি খেয়ে বসে থাকি। ”

————-

ইরিনা আজকের আদিবের সাথে তার চেম্বারে এসেছে । ইরিনা হসপিটালে সামনে লাইব্রেরীতে কিছু কাজ ছিল। কিন্তু আদিবের দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে সে আগে চেম্বারে এসে পড়লো। আদিব নিজের চেম্বারে ঢুকতেই তার পিছন পিছন রুবাব ও তার চেম্বারে এসে ঢুকলো। হুট করে অনুমতি ছাড়াই রুবাবকে এভাবে চেম্বারে ঢুকতে দেখে আদিব বেশ বিরক্ত হলো।

” আর ইউ ম্যাড রুবাব? তোমার কি কোন ম্যানার্স নেই? আমি তোমাকে অলরেডি বলেছি যে আমার চেম্বারে ঢুকবে না, তাহলে কেন ঢুকেছো?”

রুবাব এবার দৌড়ে গিয়ে আদিবের পা জড়িয়ে ধরে বলল,

” আদিব প্লিজ আমাকে বাঁচাও, আমি প্রেগন্যান্ট। ”

” রুবাব তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছ তোমার বর্তমান পার্টনার আমি না। তাই তুমি সাহায্য পেতে হলে রাজীবের কাছে গিয়ে চাও। ”

” আদিব প্লিজ আমাকে একটু দয়া করো। এই বাচ্চাটা রাজীবের, কিন্তু আমি জানি রাজীব কোনমতেই এই বাচ্চার দায়িত্ব নেবে না। ”

” রাজিব দায়িত্ব না নিলে সেখানে আমার কি করার আছে? ”

” আদিব আমি জানি তুমি আমাকে এখনো ভালবাসো। প্লিজ অন্তত এই বাচ্চাটাকে তোমার নাম দাও। আমি তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে থাকবো কখনো কোনো কিছুর অধিকার চাইবো না। এমনকি তোমার ফ্যামিলির সম্পদেও কোন হস্তক্ষেপ করবো না। শুধু এই বাচ্চাটাকে তোমার নাম দাও। ”

” তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? তোমার মত একটা চিপ থার্ড ক্লাস মেয়ের জন্য আমি আমার নামে স্ক্যান্ডাল ছড়াবো। অলরেডি তোমার জন্য আমার ওয়াইফ লাস্ট বার রাগ করে বাসা থেকে চলে গিয়েছে। ”

” তোমার ওয়াইফের মধ্যে এমন কি আছে? আমি তোমার প্রথম ভালোবাসা আদিব। প্লিজ আমাকে আর একটা সুযোগ দাও। ”

তাদের দুজনের কথোপকথনের মাঝেই পেছন থেকে আরেকটি নারী কন্ঠ পাওয়া গেল।

” বাহ, বেশ ভালো চরিত্রের মেয়ে দেখছি তুমি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে প্রেগন্যান্ট হযয়ে এখন তা আমার স্বামীর ঘাড়ে চাপাতে চাচ্ছো? ”

আদিব আর রুবাব দুইজনেই পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখল ইরিনা দাঁড়িয়ে আছে। তারা দুইজন কিছু বলার আগেই ইরিনা রুবাবের কাছে এগিয়ে আসলো। রুবাবের চুলের মুঠি ধরে আদিবেরর কেবিনের বাহিরে নিয়ে ছুড়ে ফেলল। রুবাবকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলার দৃশ্য দেখে আশেপাশের সবারই মনোযোগ তার দিকে গেল। ইরিনার এমন ব্যবহারে রুবাব ও বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে বললো,

” এই মেয়ে তুমি আমার চুল ধরার সাহস কিভাবে পেলে? হ্যাঁ আমি মানছি আমি রাজীবের বাচ্চা ক্যারি করছি।আমিও তো একটা একলা মেয়ে, রাজীব যদি এখন এই বাচ্চাটাকে না মানে তাহলে আমার দোষ কি? তাইতো আমি আদিবকে জাস্ট বলেছি এই বাচ্চাটাকে ওর নাম দিতে। এখানে তোমার মত বিধবা মেয়ে ইন্টারফেয়ার কেন করছে?

এবার ইরিনা আবার দৌড়ে গিয়ে রুবাবের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরল।

” তুই যার ঘাড়ে এই জারজ বাচ্চাটাকে চাপাতে চাচ্ছিস সে আমার স্বামী। আর কি বললি আমি বিধবা মেয়ে, আমি ইন্টারফেয়ার কেন করছি?তাহলে শোন আমি বিধবা হলেও না তোর থেকে হাজার হাজার গুন ভালো। বিধবা হওয়ার পরেও ৭-৮ বছর পরিশ্রম করে আমি নিজের যোগ্যতায় টপ একটা সরকারি একটা কলেজের প্রফেসর হয়েছি। আর তোর তো নিজের দেহ বিলানো ছাড়া আর কোন যোগ্যতাই নেই। তোর বাবা শুনেছি সাধারণত মুদি দোকানদার , কিন্তু তুই থাকিস গুলশানের দেড় লক্ষ টাকা ভাড়া দেওয়া ফ্লাটে। সব তো নিজের দেহ ভাড়া দিয়েই করেছিস। এমনকি এই যে এই হসপিটালের চাকরিটা সেটাও তো তোর এই রাজীব নামক ভাতারের সুপারিশে পেয়েছিস। ”

নিজের ব্যাপারে ইরিনার মুখ থেকে এত কিছু শুনতে পেয়ে রুবাব আর কিছু বলার সাহস পেল না। ইরিনার চিৎকার শুনে হসপিটালের ডিরেক্টর ও এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। ইরিনা তার দিকে তাকিয়ে বেশ শান্ত মেজাজে বলল,

” এই যে আপনার হসপিটাল একজন ফিমেল ডাক্তার অন্য একজনের অবৈধ সন্তান ক্যারি করে সেই দায়ভার আমার স্বামীর নামে চাপাতে চাচ্ছে। একে ইমিডিয়েটলি হসপিটাল থেকে বের করে দিন। বাই দ্যা ওয়ে আমি মিসেস ইরিনা ফরাজী। আপনাদের হসপিটালের শেয়ার হোল্ডার আদনান ফারাজীর পুত্রবধূ। আপনি যদি এই স্ল্যাট টাইপের মেয়েটাকে এখনি না বের করেন হসপিটাল থেকে তাহলে আমি আমার শ্বশুরকে এই ঝামেলায় টেনে আনতে বাধ্য হব। ”

ডিরেক্টর ইরিনার কথায় বাধা দিয়ে বলল,

” নো নো ম্যাম। ফরাজী সাহেবকে কিছু জানানোর প্রয়োজন নেই। আমি এখনি এই মেয়েটার সব ডকুমেন্টস রেডি করে একে টার্মিনেশন লেটার দিয়ে দিচ্ছি। ”

——————

মনোয়ারা বেগম নিজের নাতিকে দেখতে হসপিটালে এলেন। তিনি সাথে করে হেনা খাতুন আর কেয়াকে নিয়ে এসেছে। নিয়ে এসেছে বললে ভুল হবে তারা দুজন জোরাজুরি করে তার সাথে এসেছে। মনোয়ারা বেগম আরশাদের কেবিনে ঢুকেই দেখতে পেল মেঘলা আরশাদকে সুপ খাইয়ে দিচ্ছে। মনোয়ারা বেগমকে দেখে মেঘলা মাথার কাপড়টা টেনে বলল,

” আসসালামু আলাইকুম দাদি,ভালো আছেন? ”

” ভালো কিভাবে থাকব। নাতিটা যদি এভাবে মৃত্যুর মুখে চইলা যায়। আমার বংশের দুইটাই পোলা, একটা যদি নাই হইয়া যায় তখন আমার কি হইবো? ”

কথাগুলো বলতে বলতে মনোয়ারা বেগমের চোখ দিয়ে পানি চলে আসলো। মেঘলা তাকে সান্তনা দিয়ে বলল,

” আহাদ দাদি কান্না করবেন না। উনি এখন সুস্থ আছেন। ”

মনোয়ারা বেগম এবার নিজের নাতবউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

” তোমার অবস্থা কি এখন? আমার নাতির লগে মন টিকতাছে তো?”

মেঘলা কিছুটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল,

“জী।”

এবার মনোয়ারা বেগম আবার বলতে শুরু করলেন।

” শুনো বউ, এই ব্যাডা মানুষেরা না জনম আকারে বলদ। এরা আসলে কোন কাজেরই না। টাকা পয়সা কামানো ছাড়া এগো মাথায় আর কোন বুদ্ধি নাই। এই যে আমারজন সারা জীবন টাকার পিছনে ছুটলো, যেইনা রিটায়ার্ড কইরা আমারে একটু সময় দেওয়ার অবসর হইল হুট্ কইরা সে কবরে সেই চইলা গেলো। আমার নাতিটাও কিন্তু একদম ওর দাদার মত হইছে। খালি কাজ আর কাজ। তাই তোমারে আগে দিয়াই কই এর লাগাম শক্ত কইরা টাইনা ধরবা। তিন চার মাস পর পর ঘুরতে লইয়া যাইতে কবা। নইলে এই ব্যাডা তোমার দাদা শশুরের মতই করব। ”

মেঘলা মনোয়ারা বেগমের কথার কোন উত্তর না দিয়ে আরশাদের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে লাগলো। এবার হেনা খাতুন বললো,

” তা আরশাদ বাবার কাছে হসপিটালে থাকতেছে কে? ”

” আমি। ”

” তা তুমি শুধু শুধু কষ্ট কইরা হসপিটালে থাকবা কেন? তোমার তো শুনলাম অনেক কাজকর্ম থাকে। কেয়া তো আছেই, ও আরশাদ বাবার তোমার চাইতেও ভালোমতো খেয়াল রাখতে পারব। আর তুমি তো মনে হয় এসব যত্ন আত্তি বেশি ভালো কইরা করতেও পারো না। যারা সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুইরা বেড়ায় হ্যাঁগো দিয়া কি আর এই কাম হয়। ”

আরশাদ এবার হেনা খাতুন এর কথায় বাধ সেধে বলল,

” আহা ফুফু তুমি তো এখনো আমার বউয়ের আসল রুপ দেখনি। কালকে যারা হসপিটালে ছিল না তারা দেখেছে আমার বউ ঠিক কি কি করতে পারে। আসলে আমার এই বুকে গুলি দুইটা যে চালিয়েছে, তাকে আমার বউ ধরে এমন পিটানি দিয়েছে যে বেচারার এখন মরা মরা অবস্থা। তাই আমার বউয়ের ব্যাপারে তুমি ইন্টারফেয়ার না করলেই ভালো হয়। ”

মনোয়ারা বেগম এবার কিছুটা রেগেই হেনা খাতুনকে বললেন,

” তোমাকে কিছু না বলতে বলতে তুমি বেশি লাগাম ছাড়া হয়ে উঠেছো। একজন স্ত্রীর থেকে তার স্বামীর যত্ন আর কোন মানুষ ভালো নিতে পারে না। আর সেখানে তুমি তোমার মেয়ের সাথে আমার নাতবউয়ের কম্পেয়ার করছো? শোনো আমার নাতবউয়ের যদি কোন যোগ্যতাও না থাকে তারপরেও সে ফরাজী পরিবারের বউ। সেটাই তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। আর তার যোগ্যতার যদি হিসাব করতে যাই তাহলে হয়তো আমাদের পুরো বংশে ওর থেকে যোগ্যতা সম্পন্ন বউ আর পাওয়া যাবে না। ”

কেয়া এবার তার মায়ের কথায় সায় দিয়ে বলে উঠলো,

” নানি মা ভুল কি বলেছে? আমারও তো মনে হয় মেঘলা ভাবী তেমন ঘরের কাজ করতে পারেনা। তার জন্যই তো আমাকে রেখে যেতে চাচ্ছিল আরশাদ ভাইয়ের দেখাশুনা করতে। ”

মনোয়ারা বেগম এবার হেনা খাতুন আর তার মেয়ের দিকে কটমট করে তাকালেন। মনোয়ারা বেগম আর কিছু না বলেই হেনা খাতুন আর কেয়াকে নিয়ে হসপিটালের কেবিন থেকে বের হয়ে গেলেন। তারা চলে যেতেই মেঘলা আরশাদকে জিজ্ঞেস করল,

” এই যে তোমার ফুপু উনার ব্যবহার তোমার কাছে কিছুটা সন্দেহজনক লাগে না? ”

” কেমন সন্দেহ? ”

” না কিছু না। ”

মেঘলার কাছে অলরেডি হেনা খাতুনের হাবভাব বেশ সন্দেহজনক লাগছে। কিন্তু সে শিওর না হয়ে কারো নামে খারাপ কিছু বলতে চাচ্ছে না।তাই সে আরশাদের সাথেও আর কথা বাড়ালো না।

চলবে……….

গল্প কিন্তু প্রায় শেষ পর্যায়ে। আর হয়তো ৮-১০ টা পর্ব আসবে। পরবর্তীতে কোন থিমের গল্প পড়তে চান কমেন্টে জানিয়ে যাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here