#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব২
#লেখনী #dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
[🚫কপি করা নিষিদ্ধ, সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়ষ্ক এবং মুক্তমনাদের জন্য ]
বৃষ্টি পরছে ঝিরিঝিরি। আকাশের সাদা শার্ট ভিজে গেছে অনেকটাই। সে ঠায় দাড়িয়ে আছে এখনো।মেয়েটা এখনো চোখের আড়াল হয়নি।মেয়েটার আকাশরঙা শাড়ি ভিজে দেহের সাথে লেপটে গেছে ।
আকাশ নিজেকে কয়েক দফা নির্লজ্জ বলে ধমক দিয়ে ফেলেছে,বেহায়া মন কিছুতেই মানছে না,বেহায়া চোখটাও তার সাথে সঙ্গ দিয়েছে বইকি।
মেয়েটা আচমকা ঘাড় কাত করে পিছন ফিরলো। তারপর হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাল।চোখে চোখ পরতেই আকাশ চমকালো বইকি।।দারুন চেনা চেনা লাগছে তার মেয়েটাকে…
-কি রে আকাশ!দাড়িয়ে আছিস ক্যান।চলে আয়,বৃষ্টি নামছে তো!
দূর থেকে রাতুল এর ডাকে ঘোর কাটলো আকাশের।মেয়েটা ততক্ষণে হাটার গতি বাড়িয়েছে।
আকাশ কপাল কুচকে ধীর পায়ে হাঁটা দিলো কটেজের দিকে।
***
-আমাকে রেখে কই যাওয়া হয়েছিলো শুনি!হুম?
প্রিয়াকে ঘরে ঢুকতে দেখেই শিয়া ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলো।
-তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে।ভালো লাগছিলো না।তাই বাইরে একটু হাটতে বেরিয়েছিলাম।
-শাড়িটাতে তো তোকে দারুন মানিয়েছে।আমার পছন্দ আছে বল!
প্রিয়া এসে শিয়াকে জড়িয়ে ধরলো।আমার আপু সবসময়ই বেস্ট…
-হয়েছে হয়েছে।ঢং না করো শাড়িটা পালটে ফেল তো তাড়াতাড়ি। এই ঠান্ডায় গায়ে কিছু না দিয়ে বৃষ্টি মাথায় বেরিয়েছিলি কোন হুশে!
বোনের ধমক শেষ হতে না হতেই হাঁচি দিয়ে বসলো প্রিয়া।বোকার মতো আজ না বের হলেই হতো।সত্যি তো।
সকাল থেকে বেয়াদব নাক টা এমনিতেই পিটপিট করছে এখন তার অত্যাচার সামলাও সাপ্তাহ ভর।
শিয়া শুকনা জামাকাপড় এনে হাতে দিতোই প্রিয়া ভেজা শাড়ি পালটাতে চলে গেলো।এরই মধ্যে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করা শুরু করে দিয়েছে।
***
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। দমকা বাতাস।
শরীর হীম করা ঠান্ডা বাতাস।হাতে ব্ল্যাক কফি নিয়ে বারান্দার দরজার কাছে দাড়িয়ে আছে আকাশ।
মা ফোন করেছিলো।কান্নাকাটি করছিলো।মনটা সকাল সকাল খারাপ হয়ে গেলো।মা টা তার তাকে ছাড়া একদম থাকতে পারেনা।ভাইবোন গুলোকেও মিস করছে।এখানে সবে গতকাল আসলো।কতদিন এর জন্য ফেসে গেলো খোদা জানে।যত দ্রুত সম্ভব এখান কার ঝামেলা শেষ করে ফিরতে হবে।
-আকাশ?
ভাইয়ের গলা আকাশ পিছন ফিরে তাকায়।অয়ন দাড়িয়ে…
অয়ন মেহনাজ চৌধুরী। আকাশের বড় ভাই।
বড় ভাইয়া ঠিক আকাশ এর মতো এতোটা গম্ভীর নয়।সদা হাসিখুশি, মিশুক। ভাইয়ের থেকে ৪ বছরের বড়,কিন্তু ভাইয়েের সাথে সম্পর্ক পুরো বন্ধুর মতো।ভাইয়ের বন্ধুগুলোর সাথেও তাই।
-ভাইয়া,এসো। ভিতরে এসো। বলবে কিছু?
-হ্যা।শোন কাল সকাল ১০ টায় ওনারা মিটিং টাইম ফিক্সড করেছে।রাতুল,রায়ান দের বলে দিস।প্রেজেন্টেশন এর যতটা বাদ আছে গুছিয়ে নেয় জেনো রাতের মধ্যে। কালকে যেনো কোনো বাহানা না দেয়।আমিই বলতাম।একটা একটাকেও তো রুমে দেখলাম না।
-ওরা ব্রেকফাস্ট করতে গেছে।আমি বলে দেবো।
-আর আমি একটু বের হবো।একটা ইমপরট্যান্ট কাজ সারতে হবে।ফিরতে রাত হবে হয়তো।
-এই আবহাওয়ায়?আরজেন্ট দরকার?
সাথে যাবো?দূর্গম এলাকা…আশেপাশে চেনো কিছু তেমন?
অয়ন ভাইয়ের টেনশন দেখে হাসে।
-নাহ। প্রবলেম হবে না।আমি ম্যানেজ করে নিবো।
-ওকে।
অয়ন বেরিয়ে যায়।আকাশ ওখানেই ঠায় দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মানিব্যাগ, আর গাড়ির চাবি হাতে নিজেও বেরিয়ে গেলো।
***
-বনু,শোন না।
আমার একটা ইমেইল সেন্ট করা আরজেন্ট। আমার কিছুতেই নেটওয়ার্ক পাচ্ছেনা।আমাকে একটু বের হতে হবে।
-একা যাবে?বৃষ্টি তো হচ্ছেই।
-সমস্যা হবে না।ছাতা নিয়ে যাচ্ছি। আরজেন্ট না হলে বের হতাম না।আমি ঘন্টাখানেক এর মধ্যে ফিরবো।
শিয়া বেরিয়ে গেলে প্রিয়া আবার লেপ কাথা মুড়ি দিয়ে আধসোয়া হয়।ঘড়িতে সময় সকাল ১০ টা।বাবা মাও বেরিয়েছে হালকা কিছু কেনাকাটা করতে।আজ রাত ১১ টায় বাবা মার ফ্লাইট।ভাবতেই মনটা দারুণ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
******
পাহাড়ের গায়ে মেঘ নেমে এসেছে নরম পর্দার মতো। হালকা বৃষ্টি থেমে থেমে পড়ছে, ভিজে মাটির ঘ্রাণ।
শিয়া গন্তব্যের দিকেই হাঁটা দেয়—চোখে দারুন ক্লান্তি,অফিসের নতুন প্রজেক্ট শুরু হবে,কাজের শেষ নেই,রাতদিন সব ছুটি হারাম করে কাজ করতে হচ্ছে, তার মধ্যে বাবা মা চলে যাবে সেই চিন্তা তো মাথায় আছেই।ছোট বোনটা তার বড্ড উড়নচণ্ডী, এটাকে নিয়ে তার টেনশনের শেষ নেই।
পাহাড়ের বুকে কাজ করা, শহরের কংক্রিটের চেয়ে অনেক শান্তিপূর্ণ তার কাছে।
ঠিক তখনই দূরে একটা কালো গাড়ি এসে থামল। চকচকে টায়ারগুলো কাদামাটিতে হালকা ছাপ ফেলল।গাড়িটা একদম তাকে ঘেষে থামাতে চমকে থেমে যায় সেও।ইতিমধ্যে বৃষ্টির তোড়ও বেড়েছে।ছাতার মধ্যে থেকেও জামাকাপড় ভিজিয়ে দিচ্ছে।হাঁটা দেবে নাকি বুঝতে না পেরে ঠায় দাড়িয়ে রইলো।
গাড়ির কাচ নেমে গেলো। শিয়া বুঝতে পারলো লোকটা কিছু বলতে চায়।
-এক্সকিউজ মি! একটু শুনবেন?
শিয়া ছাতাটা একপাশে কাত করে গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলতে যায় —
-জ্বী,বলু……
কথাটা শেষ করতে পারে না সে।চমকে উঠলো সে।।গাড়ির মালিকও চমকেছে বইকি।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো।শেষে শিয়াই নিরবতা ভেঙে বললো—
-কিছু বলবেন?
গাড়ির মালিক ভিজে যাচ্ছে এরইমধ্যে। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা ভিজিয়ে দিচ্ছে চোখমুখ।ঠান্ডা চোখ,চুলগুলো গোছানো,ব্যাকব্রায় করা,নেভি রঙের টিশার্ট, ওপরে ব্ল্যাক জ্যাকেট।
লোকটাও চমক সামলে বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করলো,
-এখন এটা বলো না আমাকে চিনতে পারছো না।
-।কিছু না বললে আমি আসি।আমার তাড়া আছে…
-শিয়া?
শিয়া যেতেও নিয়েও যেনো যেতে পারছে না।থমকে দারায়।না তাকিয়েই বলে…
-বলুন।
-কেমন আছো…
শিয়া প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হাঁটা ধরে,এই বৃষ্টির মতো বোকার মতো দাড়িয়ে খেজুরে আলাপ করার মানেই হয়না।
ছেলেটা নেমে আসে গাড়ি থেকে,বৃষ্টিতে নিমিষেই ভিজতে থাকে শরীর।শিয়া না চাইতেও হুট করে নিজের মাথার ছাতা ধরে ছেলেটার মাথায়।
-কি আশ্চর্য! এই বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি থেকে নামলেন কেনো।
-আমাকে কি ক্ষমা করা যায়না?
শিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আগন্তুক প্রশ্ন টা করতেই শিয়ার চোখ আচমকা শান্ত হয়ে আসে।একই ছাতার নিচে এই মূহুর্তে তারা।বৃষ্টির ঝাপটায় মাথাটা বাদে দুজনের শরীরই ভিজে যাচ্ছে।শিয়া চোখ সরিয়ে দৃঢ়ভাবে জবাব দেয়,
-আপনি কি বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।ক্ষমা করার প্রশ্ন উঠছে কেনো।
-বৃষ্টি নামছে,ভিজে যাচ্ছো।গাড়িতে উঠে এসো।
শিয়া গাড়িতে ওঠে না।চোখমুখে কৃত্রিম বিরক্তির ছাপ আনে—
-আমি নিশ্চয়ই আপনার গাড়ির ভরসায় বাড়ি থেকে বের হইনি?
– তা হওনি।
-তাহলে আমি একাই যেতে পারবো।
-ঠিকাছে
ছেলেটা শিয়ার ছাতা থেকে সরে দাড়ায়।শিয়া হাটা দেয় তার গন্তব্যের দিকে।বেশ খানিকটা যাওয়ার পর খেয়াল হয় ছেলেটা ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে,এখনো গাড়িতে ওঠেনি।
বৃষ্টি, সাথে দমকা বাতাস। ছাতা ধরে রাখা যাচ্ছেনা কোনোমতেই।ছেলেটা শান্ত,ব্যাকুল চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে,গাড়িতে ওঠার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোঝা যাচ্ছেনা।
শিয়া এবার দারুন বিরক্ত হয়।মহা মুসিবত তো।সে রাগে গজগজ করতে করতে ফিরে আসে,ছেলেটার সমানে।ছাতা ধরে মাথা আবার।
-আজব তো।গাড়িতে উঠছেন না কেনো।ভেজার শখ হয়েছে বুঝি,
শিয়া বিরক্ত হয়েই প্রশ্ন করে…
-তুমি এসো আমার সাথে
-আমি বললাম তো যাবো না।।আপনি ভিজছেন কেনো?
ছেলেটা কোনো উত্তর দিলো না।শিয়া বোঝে এ ছেলে নড়বে না এখান থেকে।শিয়া এবার ছেলেটার গাড়িতে উঠে বসলো…ছেলেটা মুচকি হেসে এসে ড্রাইভিং সিটে বসলো।
-ম্যাডাম কোথায় যাবো বলুন…
শিয়া তার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলো
_রহমানিয়া মোড়ে চলুন।একটা ইমেইল সেন্ট করতে হবে…
ব্যাগ থেকে নিজের রুমালটা বের করে হাতে গুজে দিতে দিতে বলে
-মাথাটা মুছে নিন।
ছেলেটা হালকা হেসে রুমাল দিয়ে মাথা মুছে নেয়।কিছু একটা প্রশ্ন করতে গিয়েও করেনা।গাড়ি স্টার্ট দেয়….
চলবে…..

