আকাশপ্রিয়া #পর্ব ৩

0
43

#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব ৩
#Dure_Dilshad_Dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা

[🚫কপি করা নিষেধ]

জানালার ধারে বসে আছে প্রিয়া
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে নরম, নিরব ছন্দে — যেন কেউ ফিসফিসিয়ে পুরনো কোনো দুঃখের গল্প বলছে।
জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ে, গড়িয়ে যায় নিচে;
প্রিয়া তাকিয়ে থাকে সেদিকে…

ঘরের ভেতর হালকা আলো।
টেবিলের ওপর খোলা বই, পাশে এক কাপ ঠান্ডা চা ,বাতাসে আছে ভেজা মাটির গন্ধ,আর মনের ভেতর এক অজানা ফাঁকা ভাব।

বাবা মা চলে গেলে এই ছোট্ট পাহাড়ি বাড়িটা তখন শুধু ও আর শিয়া থাকবে —শান্ত, নির্জন…

প্রিয়া জানে,শিয়া অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকবে,
আর পাহাড়ের এই নিঃশব্দতা তাকে কেমন গিলে ফেলবে ধীরে ধীরে।বাইরে তাকিয়ে থাকে সে —
দূরের অন্ধকার পাহাড়ের কোলে,যেন কারও ছায়া নড়ছে বৃষ্টির ভেতর।

একটা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে প্রিয়া।
বোঝার বয়স হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছে তারা এখানে থাকে।শুনেছে তার জন্মের অনেক আগেই,শিয়া যখন ছোট তখন বাবার পোস্টিং হয় এখানে,ঢাকা থেকে চলে আসতে হয় তাদের এখানে।।শিয়ার যখন ৮ বছর বয়স তখন প্রিয়ার জন্ম হয়।মা কেও তখন চাকরি ছাড়তে হয়।মেয়েদের এই পাহাড়ি, দূর্গম এলাকায় একা রেখে চাকরি করতে যেতে বড্ড ভয় পেতেন তিনি।দু বোনই পড়াশোনায় দারুণ ভালো।শিয়ার বরাবরই বিসনেজ করারই শখ ছিলো।বাবা মা তাদের কোনো ইচ্ছাতেই বাধা দেয়নি কখনো।শিয়া মাস্টার্স কমপ্লিট করলো এ বছরই।আরও দুই বছর আগে একটা বড় কোম্পানি তে চাকরিও পেয়েছে। বাবা মা খুব চেয়েছিলো দেশের বাইরে যাওয়ার আগে শিয়ার বিয়ে টা দিয়ে যাবে।২৬ বছর হয়ে গেলো,মেয়ের বিয়ে টা তো দেওয়া উচিত। তারা ফিরবে ২ বছর পর…অথচ শিয়া এখন কিছুতেই রাজি নয়…তার কথা বাবা মা বাইরে যাচ্ছে,বোনটা এখনো ছোট,ইমম্যচুয়র,তাছাড়া তার নিজেরও ক্যারিয়ার সবে শুরু এখনো গোছানো হয়নি কিছু,বাবা মা ফিরে আসুক।তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়া নিবে।
আর প্রিয়া? সে সবদিক থেকে বোনের উল্টো।বোন যতটা ধীরস্থির, চুপচাপ, ম্যাচুয়র।তিনি ঠিল ততটাই উড়নচণ্ডী, চঞ্চল আর ইমম্যাচুয়র..সারাক্ষণ হৈ হৈ এর ওপরে তার জীবন।।তাকে নিয়ে পরিবারের সবারই টেনশন সবসময়।অষ্টাদশীর রুপের দিকে তাকালে আশপাশ ঝলসে যেতে চায়,এ চোখের দিকে তাকালে মায়া কাটানো দায়।

জানালার পাশে বসে থাকা অবস্থায় মনে হয়,
এই পাহাড়, এই বৃষ্টি, এই নিঃসঙ্গ রাত —সবাই যেন আজ তাকে বিদায় জানাচ্ছে নরমভাবে,
তার বাবা-মায়ের মতোই।
ভেবেই প্রিয়া মন খারাপ হয়ে আসলো নিমিষে…তার এখানে কেনো জেনো ভালো লাগে না।সে মানুষ জন দারুণ ভালোবাসে।আত্মীয় সজন,গোরা গুষ্টি সব থাকবে,তবেই না পরিবার। অথচ জন্ম থেকে দেখে আসছে তাদের পরিবার এই ৪ জন মানুষ। না আছে দাদা বাড়ি৷ না আছে নানা বাড়ি।এটা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেও তারা বাবা মা রনমূর্তি ধারণ করে।প্রিয়া বিরক্ত হয় খুব।বোন টাও তখন গুম ধরে থাকে।আশ্চর্য.!প্রিয়া ভেবে পায়না একটা মানুষ কিভাবে এতটা আত্মীয় সজনহীন জীবন হতে পারে।কেউ নেই,ধুর, মানা যায়!
বাবা মা না থাকলেও শিয়া তাকে কখনো কোনো কষ্টই পেতে দেবে না।সে এটা খুব ভালো করেই জানে।

প্রিয়া ভাবতে ভাবতে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।বাবা মার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।তারমানে বাইরে থেকে ফিরে এসেছে।কই শিয়া তো এখনো ফিরলো না।ঘড়ি দেখলো,প্রায় ২ ঘন্টা হয়ে গেছে।

মেয়েকে দেখেই আনিসুল সাহেব হেসে কাছে ডাকলেন।
-কিরে মা।আয়…
-বাবা কখন বের হচ্ছো তোমরা।আমরা এয়ারপোর্ট অবধি যাবো না.?
-না গেলে হয় না মা? বাইরে আবহাওয়া তো দেখছোই।ওখান থেকে ফিরতে ফিরতে তোমাদের দুবোনের তো রাত হয়ে যাবে।
-না বাবা আমরা যাবোই।আপু বলছে যাবে।

মেয়ের কথা শুনে আনিসুল সাহেব হাসলেন।তিনি ভালো করেই জানেন একবার তার ছোটমেয়ে বলেছে মানে সে যাবেই।
-বেশ তো।যাবে।শিয়া ফেরেনি?আমাকে কল দিয়ে বললো বের হচ্ছে কাজে,ঘন্টাখানেক এর মধ্যে ফিরবে।
– না বাবা আপুর ফোনটাও বন্ধ। বললো ঘন্টাখানেক লাগবে।অথচ দেখো ২ ঘন্টা হলো। এতোক্ষণ কেনো লাগছে।
-বৃষ্টি তে আটকা পরেছে হয়তো।এসে যাবে।

রেনুকা রহমান মেয়েদের আগামী কয়েকদিন এর দরকারি যাবতীয় জিনিস এনে গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। বড়টাকে নিয়ে টেনশন নেই,ওটা তো।লক্ষী।ছোট টাকে নিয়ে তার যত টেনশন,২ মাস পর মেয়েটার এক্সাম,অথচ এখন তাদের যেতে হচ্ছে। খোদা ভালো জানে এ মেয়ে নিজের যত্ম নেবে কীনা।দেখা গেলো এক্সাম এর মধ্যে ঠান্ডা,জ্বরের দক্ষযজ্ঞ বাঝিয়ে বসে আছে।

*****
শিয়া কাজ শেষ করে বেরিয়ে দেখে গাড়িটাএখনো আছে।তাকে দেখেই মানুষটা এগিয়ে আসলো।
-চলো।
-আমি এখন একা যেতে পারবো।
-পারবে। জানি সেটা।তবুও…
শিয়া ভ্রু কোচকায়।
-তবুও কি!
-কিছু কথা বলার ছিলো।
-আমার সময় হবেনা।বাবা মা অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। বৃষ্টির জন্য অনেকটা সময় হয়ে গেছে।ফোনের ব্যাটারিও শেষ।ফিরতে হবে আমার এখন
-আমিও ওদিকেই যাবো।সমস্যা হবে না।উঠে এসো।
শিয়া বোঝে এ ছেলে সহজে ছাড়বে না।সিনক্রিয়েট করতে চায় না সে।অগত্যা কথা বাড়িয়ে উঠে বসে গাড়িতে।কেউ কোনো কথা বলছে না।
-এর মধ্যে ফ্রি আছো?
-নাহ।
শিয়ার সোজাসাপটা জবাবে ছেলেটা আহত হলো কিনা বোঝা গেলো না।তবে হালকা হেসে আবার প্রশ্ন করলো।
-একটু সময় দেওয়া যাবে না?
-নাহ।
আবারও সেই কাটখোট্টা জবাব।
-খুবই ব্যাস্ত?
-হ্যা
-কেনো জানতে পারি।
শিয়া থমকায়।তাকায় আড়চোখে।
-আমার অফিসের একটা নতুন প্রোজেক্ট শুরু হয়েছে।বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্লায়েন্টরা আসছেন।ইভেন এসে পরেছে বেশিরভাগ।আমি ছুটিতে ছিলাম এ কয়দিন বাবা মা চলে যাবেন তাই।পরশু থেকে আমার ডিউটি শুরু।তাছাড়া প্রিয়া কে রেখে বাকি সময় টুকু কোথাও দেওয়ার মতো সময় হবে না।
ছেলেটি আর কথা বারায় না।সে জানে শিয়া এখন কোনো কথাই শুনবেনা।বাকিটুকু পথ আর কেউ কথা বলেনা…

দিনের আলো আজ কেমন মলিন।পাহাড়ের ঢালে কুয়াশা ঝুলে আছে পর্দার মতো,
তার ভেতরেই ছোট্ট উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়া আর শিয়া—
তাদের বাবা মা বের হচ্ছে,গাড়ি এসে গেছে।গাড়িটা নিচে দাঁড়িয়ে আছে,বাবা-মায়ের ট্রাঙ্ক আর ব্যাগগুলো গুছানো,সবকিছু যেন প্রস্তুত, শুধু মনটাই প্রস্তুত নয়।

মা বারবার ফিরে তাকাচ্ছে দুই মেয়ের দিকে।ছোট মেয়েটা সেই থেকে ফুপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে।তাদের আছে বলতে ওই মেয়ে দুটোই।এক মূহুর্ত কখনো চোখের আড়াল করেনি।পরিবার, নিজের বাড়ি ছেড়ে আসার পর থেকে স্বামী, স্ত্রী এই মেয়ে দুটোকে আগলেই বেচে আছেন।মেয়েদুটো আজ যথেষ্ট বড় হয়েছে।একজন আরেকজনকে দেখে, আগলে রাখার মতো বয়সও হয়েছে।ছোট মেয়েটা তার ছেলেমানুষ এখনো।তারপরেও ক্ষেত্রবিশেষে যে সেও বড় বোনটার যত্নে মায়ের মতো দায়িত্বশীল হবে এটা তিনি খুব ভালো করে জানেন।আর বড় মেয়েটা তো তার বরাবরই বুঝদার,সংসারি,দায়িত্বশীল। তারপরেও মায়ের মন কোনো যুক্তিতে কি মানতে চায়!

> “শিয়া, প্রিয়ার খেয়াল রাখবি, মা। ওর ক্লাস, ওর খাওয়া-দাওয়া… সময়মতো যেন সব হয়।”
“হবে মা, তুমি চিন্তা করো না।” —

দুমেয়েই এবার মাকে জড়িয়ে কেঁদে উঠলো।বাবা এগিয়ে এসে মেয়েদের মাথায় হাত রাখলেন,
> “তুই তো ছোট, কিন্তু তোর হাসিটা ঘরের আলো।
সবসময় হাসবি, শুনলি?বললাম না,দেখতে দেখতে সময় কেটে যাবে,তাছাড়া তোর মাও ফিরবে,তোর এক্সাম শেষ হলে,শিয়ার অফিস ছুটি নিয়ে দুইবোন যাওয়া আসা তো করবিই।আমার মায়েদের মন খারাপ হলে আমার কি ভালো লাগবে গিয়ে!
দু মেশেই বাবা মাকে আশ্বাস দিলো।মন খারাপ করবেনা,দেখে শুনে থাকবে।আগলে রাখবে একে অপরকে…

গাড়ির দরজা বন্ধ হলো।
ইঞ্জিনের শব্দ উঠল পাহাড়ের নিস্তব্ধতা চিরে।বাবা-মা হাত নেড়ে বিদায় জানালেন,
আর দুই বোন দাঁড়িয়ে রইল রাস্তার ধারে—যতক্ষণ না গাড়িটার পিছনের আলো কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেল।
বৃষ্টি তখনও পড়ছে হালকা হালকা।
শিয়া ধীরে ধীরে প্রিয়ার কাঁধে হাত রাখল।

> “চল, ঘরে যাই।”
প্রিয়া কিছু বলল না।তার চোখে তখন পাহাড়ের মেঘেরা নেমে এসেছে,
মনের ভেতর ভারী হয়ে আছে একটাই ভাবনা—
এতো নিস্তব্ধতা তারা আগে কখনো অনুভব করেনি।
দূরে বজ্রপাতের ক্ষীণ গর্জন,আকাশ একটু কেঁপে উঠল,আর সেই শব্দের ভেতরেই শুরু হলো তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়—যেখানে বাবা-মায়ের আশ্রয়ের জায়গায় থাকবে
কেবল একে অপরের মায়া, আর পাহাড়ের নীরব ছায়া।

চলবে…

[বেশি বেশি রিঅ্যাক্ট না করলে পরের পর্ব দেবো না প্রিয়তমারা🥹]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here