#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব_৩০
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
[🚫কপি করা নিষেধ, সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক দের জন্য উন্মুক্ত]
বিকেলের মিষ্টি রোদ নেমে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।বাইরে পাখির কলকাকলি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।প্রিয়া জানালার পাশে বসে সূর্য ডোবা দেখছে।পশ্চিমের আকাশ গাড় লাল বর্ণ ধারন করেছে।একে বোধহয় টুয়াইলাইট বলে!দৃশ্য টা মনোমুগ্ধকর। আকাশের প্রতি প্রিয়ার ছোট্টবেলা থেকে টান।মন খারাপের সময় সে অপলক আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে পারে।এখন তার জীবনে সৃষ্টিকর্তা আরেক আকাশ কে পাঠিয়েছেন।দু দুটো আকাশের প্রতি আজ তার এক আকাশ সমান ভালোবাসা।ঠান্ডা বাতাস বইছে।শরীর শিরশির করছে তার।গায়ের ওড়নাটা ভালেমতো গায়ে জড়িয়ে নিলে।দু পা ভাজ করে হাটুতে মুখ গুজলো।কালো স্কার্ট খানা পায়ের নিচে গুজলো খানিকটা।
শিয়া ঘুমাচ্ছে,অয়ন ভাই বেরিয়েছে অফিসের কি এক দরকারে।রাতুল ভাই নিশ্চিত মুভি দেখছে রুমে বসে।তবে আকাশ কি করছে এখন একমাত্র তারই কেনো ধারনা নেই প্রিয়ার কাছে।তার সবসময় জানতে ইচ্ছে করে আকাশের সকাল থেকে ঘুমের আগ পর্যন্ত করা সব কাজের হিসেব।কি ভালো লাগে, কি অপছন্দ সব।
শিয়া আর অয়ন ভাইয়ের কথা মনে পরতেই মুচকি হাসলো সে।শিয়া যে হয়তো কাউকে পছন্দ করে বা করতো এমন আন্দাজ সে বহু আগে করছিলো।বেশ কয়েকবার অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ্য করে শিয়াকে কাঁদতে দেখতো সে।কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি।তবে আজ সে খুব খুশি,খুব।আজ বহুদিন পর শিয়াকে এতোটা হাসিখুশি লাগছে তার।তবে সামনের সবটা এতে সহজ হবে না।বাবা মা বিষয়টা কিভাবে নেবেন।তাছাড়া নিলয় ভাই…প্রিয়ার মুখটা চুপসে এলো।নিলয় ভাইয়ের সাথে শিয়ার বিয়ের কথা চলছে অনেক বছর।নেহাৎ শিয়া সবসময় পড়াশোনা, চাকরি নানা অযুহাত দিয়ে পিছিয়ে রাখতো।এখন অবশ্য পিছিয়ে আছে বাবা মা দেশের বাইরে যাওয়ায়।তারা দেশে ফেরা মাত্র শিয়ার বিয়ের জন্য চাপ দেবে।দেবেই।এখন শিয়ার ছাব্বিশ চলে।বাবা মা ফিরতে ফিরতে আটাশ পার হয়ে যাবে।তখন আর কি অযুহাত দেবে সে।বাবা কি তখন শুনবে শিয়ার কথা!নাকি আবার কোনো অশান্তি হবে!প্রিয়ার দারুণ মন খারাপ হলো এবার।অয়ন ভাই আপুকে পাগলের মতো ভালোবাসে।তার আপু যথেষ্ট শক্ত মনের মানুষ।তার পরেও এবার বিচ্ছেদ হলে সেও মানতে পারবে না,আর সব দেখেশুনে যা বুঝেছে অয়ন ভাইও পারবে না শিয়া কে ছাড়া থাকতে।মাঝখান থেকে নিলয় ভাইয়ের কি হবে!নিলয় ভাই কে তার আপু অবশ্য কখনো পছন্দ করতো না।যতবার ফ্যামিলি গেট টুগেদার হতো শিয়া সবসময় প্রিয়াকেও নিলয়ের থেকে দূরে দূরে রাখতো।সে প্রথমে বুঝতো না এমন করার কারণ।বারবার জিজ্ঞেস করতো।শিয়া কখনো বলতো না কিছু।তবে একদিন তো মুখ ফুটে বলেই ফেলেছিলো নিলয় ভাইয়ের নজর নাকি শিয়ার ভালো লাগে না।প্রিয়া অবশ্য আর কোনো প্রশ্ন করেনি।আপু কি বোঝাতে চেয়েছিলো সেটা না বোঝার মতো বাচ্চা সে ছিলো না তখন।কিন্তু বাবা মা কে সেটা বলা হয়নি।নিলয় ভাইয়ের বাবা আজগর আংকেল তাদের বাবা বেস্ট ফ্রেন্ড সাথে কলিগও।বাবা বিশ্বাস করতেন কি না জানেনা তারা তবে বলা হয়নি।
প্রিয়া গল্পের বইটা হাতে নিয়ে খুললো।ভয়াবহ রিডিং ব্লকে পরেছে সে। যখন থেকে আকাশের প্রেমে পরেছে তারপর থেকে কিচ্ছু তে মন বসে না।যেদিকেই তাকায় চোখপর সামনে আকাশ কে দেখে।এখন এতো সে কি করতে পারে!
***
রাকিব, রেদোয়ান সেই সকালে গেছিলো তুষি আর রাকা কে এয়ারপোর্ট থেকে পিক করতে।দুজনের ফ্লাইট ছিলো মূলত দুপুর দুটোয়।অথচ দু বান্ধবী রাকিব আর রেদোয়ান কে জব্দ করতে সকালের কথা জানায়।দু বন্ধু সকাল সকাল গিয়ে হাজির।অথচ পরে জানতে পারে তারা পৌছুবে বিকেল চারটায়।যতক্ষণে জানতে পেরেছে ততক্ষণে অবশ্য বিকেল হয়েই গেছে।দু বন্ধু মহা বিরক্ত। তবে সে বিরক্ত প্রেয়সীদের সামনে থোরাই দেখানো সম্ভব! সে সাহস থাকলে তবে তো।একটু এদিক সেদিক রাগ দেখানোর উপায় তাদের পুরুষ জাতিকে তো দেওয়ায়ই হয়নি।তাছাড়া এ কয়মাস একবারও দেখা হয়নি,ঠিকঠাক সময় দিতে পারেনি সেসব অভিযোগ করে মেয়ে দুটোই এখনো যে বিয়েটা ভেঙে দেয়নি সেটাই শুকরিয়া।
তুষি আর রাকা কে নিয়ে তাদের গাড়ি কটেজে ঢুকলো সন্ধ্যায় সাড়ে ছ টায়।পুরো রাস্তা জুড়ে শিয়া আর অয়ন ভাই এবং সাথে তাদের মোস্ট এলিজেবল ব্যাচেলর দ্যা গ্রেট আকাশ এহনাজ চৌধুরীর প্রিয়ার প্রেমে পরার গল্প শোনাতেই গেছে।শিয়া আর অয়ন ভাইয়ের লাভ স্টোরি প্যাচ আপ হওয়ার খবরে ওরা যতটা না এক্সসাইটেড তার থেকে বেশি শকট আর এক্সসাইটেড তাদের দুজনেরই ছোট ভাইবোন দুটোর একে অপরের প্রেমে পড়ার খবরে।বেয়াই বেয়াইনের প্রেম টাইপের কাহিনি হয়ে গেছে বিষয়টা।
গাড়ি থেকে নামতেই চোখ চকচক করে উঠলো রাকার।এক হাতে তুষির হাত পেচিয়ে ধরলো,
“,আমি প্রিয়া কে দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছি ভাই বিশ্বাস কর।”
তুষিও সজোরে মাথা নাড়লো,”আমিও।মেয়ে টার মধ্যে কিছু একটা তো স্পেশাল আছেই।না হলে আকাশ পিছলাতো না।”
রাকিব রেদোয়ান তাদের লাগেজ নামিয়ে পাশে এসে দাড়ালো।রেদোয়ান মাথা ঝাকালো তুষির কথায়.”পুতুল একটা। দেখলেই বুঝবে।”
“দেখেছিলাম শিয়ার সাথে। তখন ও ছোট অনেক আট দশ বছর হয়তো।পুতুলই ছিলো।”
রাকিব হাসলো।হাঁটার ইশারা করলো।
“এখনো ওইরকমই।দারুণ আদুরে।বাচ্চা বাচ্চা মুখ।তাছাড়া খুব মিশুক। ভালো একটা মেয়ে গেলেই দেখবে।আমাদের সাথে খুব একটা দেখা হতো না।তবে যখনই হতো ভইয়া ভাইয়া করে অস্থির হয়ে যেতো।রাতুলের সাথে অবশ্য জমে ভালো ওর।”
চারজন কটেজের দিকে হাঁটছে।
” আকাশ এর জহুরির চোখ।এমনি এমনি প্রেমে পরেনি।শুধু রুপ দেখেও পরেনি।সব দিক দিয়ে পারফেক্ট জন্যই ভালোবেসেছে।তাছাড়া আমাদের শিয়ার ছোট বোন বলে কথা।হাজারে একটাই হবে।”
রাকার কথায় সম্মতি জানালো সবাই একসাথে।নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো ওদের নিয়ে। বাড়ির ভিতরে শুনশান।ড্রয়িং রুমে আলো জ্বালা হয়নি।রহিমা খালা তারমানে রাতের রান্নার জন্য এখনো আসেনি।বাকিরা নিশ্চয় যার যার রুমে।
এগিয়ে গিয়ে রুমে আলো জ্বাললো রাকিব।প্রিয়া তখন চা বানাতে নিচে নামছিলো।হঠাৎ করে এত মানুষ দেখে হতচকিত হয়ে গেলো একপ্রকার। তবে প্রায় সাথে সাথেই বুঝতে পারলো রাকিব আর রেদোয়ান ভাই যাদের আনতে গিয়েছিলো তারা এসে গেছে।সাবলীল ভাবে নিচে নেমে এলো।এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলো দুজনকে।
রাকিব তাকালো তুষি আর রাকার দিকে।প্রিয়াকে ইশারায় দেখালো।
“এটা প্রিয়া..”
রাকা আর তুষি একপ্রকার জাপটে ধরলো দুজন একসাথে প্রিয়াকে।প্রিয়া মেয়ে দুজোনকে চেনেনা।এতো উচ্ছাসের কারণ বুঝলো না।
“মাই গড।সত্যি পরী একটা।তোমার গল্পই সারা রাস্তা করছিলাম।”
তুষির কথা প্রিয়ার মাথায় ঢুকলো না কিছু।বুঝতে পারলো না।লাজুক হাসলো।
“আমার কথা..?”
একে-অপরকে দেখলো রাকা রা।তারপর দ্রুত শুধরে নিলো।
“তোমার কথা শিয়ার কথা…আমরা শিয়ার ছোট্টবেলার ফ্রেন্ড। বেস্ট ফ্রেন্ড। তোমার আপু তোমার দুলাভাই এর ওপর রাগ করে নিখোঁজ হয়।আমাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।কত খুজেছি জানো?আজ প্রায় ছয় বছর পর দেখা হবে।তা কোথায় সেই বেইমান।”
প্রিয়ার বোধগম্য হলো এবার সবটা।এবং প্রায় সাথে সাথেই চিনতেও পারলো দুজনকে।এদের ছবি সে আপুর ফটো অ্যালবামে দেখেছে।অনেক দেখেছে।স্কুল,কলেজ, ভার্সিটির সব গল্পে এদের কথা সবসময় বলতে শিয়া।
প্রিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো।অবাক হয়ে মুখে একরাশ হাসি এনে জিজ্ঞেস করলো,”তোমরা তুষি আর রাকা আপু? “
দুজনেই হাসলো।আলতো হাতে গাল চেপে ধরলে তুষি,”আমাদের চেনো?”
প্রিয়া দ্রুত মাথা নাড়লো।বোঝালো খুব চেনে সে।
“চিনবো না মানে।আপু সবসময় তোমাদের গল্প করতো।কেঁদে ফেলতো গল্প করতে গেলেই।”
দুজনের চোখ ছলছল করে উঠলো।
“আপু ঘুমাচ্ছে।চলো ওপরে চলো।ডাকবো?”
রাকিব এগিয়ে এলো।মাথায় হাত রাখলো প্রিয়ার।
“থাক।শিয়ার ঘুম থেকে ডাকলে মাথা যন্ত্রণা করে।ওরা বরং রুমে গিয়ে ফ্রেশ হোক।শিয়া ততক্ষণে উঠে পরবে।”
মাথা নাড়লো প্রিয়া।দরজায় চোখ পরলো।রহিমা খালাও চলে এসেছে।রাকা আর তুষি হেসে প্রিয়া গাল টিপে।যার যার রুমে গেলো।
***
রাত্রির সাড়ে দশটা।রেদোয়ান আর তুষির রুমে জম্পেশ আড্ডা চলছে।এতবছর পর সবাই একসাথে। শুরুতে রাকা আর তুষির সাথে শিয়ার দেখা হওয়ার পর প্রায় ঘন্টাখানেক কান্নাকাটি, ইমোশনাল পার্ট চলেছে।তারপর একে একে সবার সাথে দেখা করে রাতের খাবার শেষে বেসেছে সবাই একসাথে। যদিও অয়ন এখনো ফেরেনি বাড়িতে।
তবে বাকিরা সবাই উপস্থিত এখানে।রাকা,তুষি,শিয়া একসাথে বিছানায় এলেমেলো ভাবে বাবু দিয়ে বসেছে।আকাশ আর রাতুল সোফায় বসা।রিয়ান, রাকিব,রেদোয়ান, মাঝাখানে চেয়ার টেনে বসা।সেই কলেজ জীবনের গল্প থেকে শুরু করে একসাথে কাটানো তাদের প্রতিটি সুন্দর মূহুর্তের স্মৃতিচারন করে হাসাহাসি হচ্ছে।
প্রিয়া অবশ্য এখানে অনুপস্থিত। রাতুল এর বিশেষ অনুরোধে সে গিয়েছে সবার জন্য তার হাতের নুডলস বানাতে।।শিয়ার সাথে অয়ন ভাইয়ের ঘটনার পোস্টমর্টেম করে এবার রাকা গলা পরিষ্কার করে তাকলো আকাশের দিকে।
“কি রে আকাশ।তোর কথা বল এবার।”
আকাশের হাতে ফোন ছিলো।কিছু ফাইলপত্র ঘাটছিলো ফোন স্ক্রিনে।রাকার গলা পেয়ে ফোন সাইটে রাখলো।সে কিছু বলার আগেই রাতুল পাশ থেকে ফোড়ন কেটে উঠলো,”ওর কথা কি কি শুনবি।আমাকে জিজ্ঞাসা কর ভাই।বহুত কাহিনি। “
আকাশ চোখ রাঙালো।রাতুল সরে গিয়ে বিছানার কিনারে বসলো।এখন সে নানা কথা মুখ খুলবে।লাত্থি খাওয়ার তার মোটেই ইচ্ছে নেই।বত্রিশ টা দাঁত বের করে হেসে বললো,
“আমাদের আকাশ ব্যাটা কট খাইছে। “
সবাই সাথে সাথে হৈ হৈ করে উঠলো।এর মধ্যে অবাক হলো দুজন।রিয়ান এবং শিয়া।এরাই একমাত্র জানেনা।রিয়ান চুপ করে রইলো।তার মনের মধ্যে অন্য সন্দেহ ঘুরছে।তবে শিয়া অবাক হওয়া আটকে রাখতে পারলো না।
“বলিস কি।কবে!কার?কে সে ভাগ্যবতি।”
রাকা তুষি কপাল চাপড়ালো।হতাশ গলায় বললো,”এই বাড়িতে থেকে তুই এখনো জানিস না?”
শিয়া মাথা নাড়লো দুদিকে।জানবে কিভাবে।আকাশ দের সাথে সে দুরত্ব বাড়িয়েই তো রেখেছিলো এতদিন।
দুজনেই তাকালো বাকি বন্ধুদের দিকে।রাকিব রাও মাথা নাড়লো দুদিকে।বোঝালো শিয়া সত্যিই জানেনা।
“অ্যাই আকাশ বলবি কি তুই।নাকি আমরা বলবো।”
আকাশ বিরক্ত সূচক শব্দ করলো।গম্ভীর গলায় বললো,”রাকিব রা যা উল্টাপাল্টা বুঝিয়েছে সেগুলোই বিশ্বাস করে বসে আছিস।।বাদ দে না।ওদের যত এলোমেলো কথা।”
আকাশের কথায় প্রতিবাদ করে উঠলো রাকিব, রেদোয়ান, রাতুল।রাতুল একপ্রকার চিৎকার করে উঠলো।
“বুড়ো তো হলি।আর কতদিন লুকিয়ে রাখবি।দাত পরে যাওয়ার পর বলবি?”
আকাশ তপ্ত চোখ রাঙায়।চুপ করতে বলে রাতুলকে।রাতুল শুনলো না।বরং সরে গিয়ে বসলো শিয়ার পাশে।
“”শোন।যা বলবো।স্বাভাবিক ভাবে নিবি।তোরা সবকটা একেকটা পাক্কা খেলোয়াড়। তুই অয়ন ভাইশের প্রেমে পরেছিলি কিভাবে মনে আছে?”
রাকা লাফিয়ে উঠলো। “সেটা তোরা ভুললেও আমি ভুলবো না।শালা, বলে যে ফিজিক্স পারিনা।আমি ভাবলাম আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড এর সম্মানিত বড় ভাই ঢাবির ফিজিক্স এর স্টুডেন্ট। তার কাছে টিউশন নিয়ে দেই।মহিলা দু মাস পড়ে স্যার কে ছাইয়া বানিয়ে বসে আছে।আমরা জেনেছিলাম কতদিন পর মনে আছে?”
শিয়া লজ্জা পেলো। লাজুক হাসলো খানিকটা।বাকিরা অট্টহাসিতে ফেটে পরলো।আকাশ অবশ্য গম্ভীর হয়ে বসে আছে।উঠে যেতে পারছে না।এর জন্য বরাবর চেষ্টা করতো কেউ জেনো টের না পায়।সারাক্ষণ তাহলে এটাই হট টপিক বানিয়ে বসে থাকবে এরা।এটা সে জানতো।হয়েছেও তাই।যেদিন থেকে রাতুলটা জানিয়েছে সবাই এটা নিয়েই মেতে থাকে।
ধমকে উঠলো এবার।”আহ্ তোরা থামবি।উল্টাপাল্টা না বকলে পেটের ভাত হজম হয়না তোদের? পরশু এক জায়গায় যাবি সবাই মিলে সেসবের কথা বল।আমাকে নিয়ে অযথা কথা পেচাচ্ছিস।”
রাতুল কুশন ছুড়ে মারলো আকাশের দিকে।
“মেয়ে মানুষ এর মতো কথা লুকাতে চাইছিস কেনো।ছিহ আকাশ ছিহ্।
আকাশ হতাশায় মাথা নাড়ে দুদিকে।এদের না করে।লাভ হবে না।
“ শিয়া আকাশ পাত্র হিসেবে কেমন বল তো?তোর দেবোর তুই সার্টিফিকেট দে।”
শিয়া হাসলো আকাশের দিকে তাকিয়ে।
“দেবোর হওয়ার আগে ও তো আমার ভাই।আর আমার ভাই মানুষ, পাত্র সব দিক থেকে একশ এ একশ।”
পুরো রুমের সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো।
“তোর এই ভাই যে তোর একমাত্র বোনের প্রেমে দেওয়ানা সেটা কি তোর জানা ছিলো?”
শিয়া এবার আকাশ থেকে মাটিতে পড়লো।চোখ দুটো বড় বড় করে ফেললো।আজ সকালে যেমন অয়ন আর শিয়ার কথা জানার পর প্রিয়া অবাক হয়েছিলো।তার থেকে দ্বিগুণ এবার শিয়া অবাক হলো।হা হয়ে গেছে মুখখানা।কথা হারিয়ে ফেলেছে।
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।দরজার দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিলো প্রিয়া আসছে কিনা।আসেনি।যাক বাচা গেলো।সে এখব মোটেই প্রিয়াকে ঢাকঢোল পিটিয়ে জানাতে চাইছে না।অ্যাডমিশন পিরিয়ড চলছে।এখন এসব বলে মাথা এলোমেলো করে দেওয়ার মানেই হয়না।
শিয়া দীর্ঘক্ষণ পর তুষির ঝাঁকিতে নড়েচড়ে ওঠে।আকাশের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়।
“প্রিয়াও?”
শিয়া প্রশ্নের মানে বুঝতে পেরে দুদিকে নাথা নাড়ে আকাশ।
“নাহ।ওকে বলিনি এখনো।”
রাতুল দু হাতে মাছি তাড়ানোর মতো করে ওঠে।
“তবে তোর বোনও ফসকেছে।আই মিন দুজনে একসাথেই দুজনের ওপর পিছলেছে।কিন্তু দুজনেই এখনো চুপ।”
শিয়া অবাক হচ্ছে। প্রিয়া যে আজকাল অন্য রকম করছে সেটা সে টের পেয়েছে।এখানে আসার পর কয়েকমাস যাবৎই দেখছে সেটা।এবং আকাশের প্রতি ওর আলাদা খেয়ালও চোখে পরেছে।সে প্রিয়ার দিক থেকে সন্দেহ করেনি তা নয়।তবে এটা নিয়ে খোচায় নি তার অন্যতম কারণ আকাশ। আকাশ সেরকম ছেলে নয়।তাদের পরিচয় বহুবছরের।আকাশকে কখনো কোনো মেয়ের সাথে জড়াতে দেখা যায়নি।পিওর জেনট্যালম্যান সে।তাই বোনকে অযথা আশকারা দিয়ে কষ্ট পেতে দেখার মানেই হয়না।তবে আকাশ যে প্রিয়ার আগে থেকে প্রিয়াকে পছন্দ করে এটা শুনে সে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে কিছু বলার।
শিয়ার আশ্চর্যতা টের পেলো আকাশ।
“এসব নিয়ে ভেবো না।প্রিয়া কে আমি আমার ফিলিংস জানাইনি।এখন জানাবোও না।ওর ক্যারিয়ার,জীবনে ক্ষতি হয় এমন কিছু আমি করবো না।ওর বয়স কম। এখন এসবে জড়ানোর সময় না ওর।তাছাড়া ওর মনে আমার জন্য কিছু আছে এটা জাস্ট আন্দাজ আমার।আমিও জানাইনি,ও নিজেও জানায়নি।”
শিয়া কিছু বলছে না।কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে শুনছে আকাশের কথা।সে কল্পনাও করেনি আকাশের মতো ছেলে কখনো প্রেমে পরবে তাও আবার তারই ছোট বোনটার।মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে সব।
আকাশ দম নিলো খানিকটা।শিয়ার মুখের দিকে তাকালো।
“শিয়া।তুমি প্রিয়ার বোন।আমি জানাতাম তোমাকেও সময় মতো।অয়ন ভাইয়ের সাথে তোমার ঝামেলা টাও না জানানোর একটা কারণ ছিলো এতদিন।আমার ফ্রেন্ড হও যাই হও।এই ক্ষেত্রে তোমার সাথে আলাদা করে আমার কথা বলতেই হতো।তুমি ওর গার্ডিয়ান এখন। তবে ওরা যখন বলেই ফেলেছে আমি লুকাতে চাইনা।এড়িয়ে যেতেও চাইনা।আমি শুরুতে এটাকে জাস্ট অ্যাট্রাকশন ভাবলেও ধীরে ধীরে রিয়ালাইজ করেছি আই কান্ট লিভ উইদাউট হার।আই ম্যাডলি ইন লাভ।ওর বয়স কম।ইমম্যাচুয়র।লাইফের যেকোনো ডিসিশন নেওয়ার জন্য রিস্কি একটা সময়।এখন আমি ওকে আবেগে বাধবো না।সময় দেবো।তবে এ জীবনে ওকে আমি ছাড়তে পারতে না।ইমপসিবল।আমাকে ভরসা আছে তো নাকি?”
কি বলবে শিয়া।চোখে পানি চলে এসেছে তার।শুধু শিয়া নয়।ঘরের মধ্যে উপস্থিত সবার চোয়াল ঝুলে পরেছে একপ্রকার। হতবিহ্বল হয়ে শুনছে আকাশের কথা।বলা বাহুল্য সবার চোখে পানি চিকচিক করছে
আকাশ কি সুন্দর সাবলীল ভাবে বললো কথাগুলো।আকাশ এহনাজ চৌধুরীর এ স্বীকারোক্তি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের একটি।তারা সবাই জানতো আকাশ ডিপলি ভালোবাসে প্রিয়াকে।না হলে আকাশ যা যা করে আজকাল এগুলে তার চরিত্রের সাথে যায়না,কক্ষনো না।তবে মনের কথা আকাশ গোপনই রাখবে এটাও জানতো।আজকে এমন হুট করেই গুছিয়ে স্বীকার করবে সবটা কল্পনাার বাইরে এটা সবার।
শিয়া চোখ মুছে মাথা নাড়লে সবেগে।
“আছে।ভরসা আছে।তুমি আমার বোনটাকে খুব ভালোবাসো।আর ভবিষ্যতেও ভালো রাখবে।আমি জানি সেটা।”
আকাশ মৃদু হাসলো।রাতুল লাফিয়ে এসে পরলো আকাশের গায়ে।
“সাবাশ ব্যাটা।মুখ ফুটেছে তাহলে।আমি তো ভাবতাম শালা নাতি নাতনি হয়ে যাবে তোর।তাও বলবি আমি তোমাদের দাদি কে ভালোটালো বাসিনা।তোমাদের রাতুল দাদুরা মিথ্যা বলছে।”
আকাশ কুনুই দিয়ে গুতো দিলো রাতুল এর পেটে।ব্যাথায় কাত হয়ে গেলো রাতুল।
তবে রাতুল এর কথায় হো হো করে হেসে উঠলো সবাই।কারণ তাদেরও এটাই ধারনা ছিলো।
এসবের মধ্যে কারোর নজরে পরলো না হাতের মুঠে শক্ত হয়ে কপট হাসি দিয়ে নিজের রাগ আড়াল করা একজন পুরুষকে।হৈ হুল্লোড় আড্ডায় নজর এড়ালো সবার এই বিষয়টা।রিয়ানের মাথা দপদপ করছে।এতকিছু ঘটে গেছে সে জানেনা মানে!সবাই জানে সবটা।সে কিভাবে জানলো না।আকাশের দিকে তাকালো একবার।সবাইকে পরখ করলো।আড্ডায় ব্যাস্ত সব্বাই মনে পরে গেলো প্রথম দিন রাস্তায় প্রিয়াকে দেখার সময়টার কথা।প্রথম দিন থেকে সে পছন্দ করে প্রিয়াকে।সেদিন তো আকাশ প্রিয়াকে দেখেওনি।এখানে এসেছে তারা পাঁচ মাস।একদিন ও আকাশকে প্রিয়ার কথা বলতে শোনেনি তারা।অথচ..অথচ রাকিব,রেদোয়ান, রাতুল সবাই সবটা জানে!এমনকি তুষি আর রাকাও।মাথা শূন্য হয়ে আসছে তার।অসম্ভব। প্রিয়া তার।শুধু তার।সবসময় সবকিছু আকাশই জিতবে এটা কিভাবে হয়!নাকি হতে দেওয়া যায়।যায়না।একদম যায়না।
দরজার আড়ালে ফুপিয়ে উঠলো প্রিয়া।হাতের ট্রে খানা কেপে কেঁপে উঠছে।চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।খাবার নিয়ে একটু আগেই ঢুকতে যাচ্ছিলো ঘরের ভিতর।তার নাম শুনে না চাইতেও পা থমকায়।দাড়িয়ে পরে সে।আর তারপর…তারপর বাকিটা তো তার নিজের কানে শোনা।আকাশ এর কথা…কান্না পাচ্ছে তার।ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে আকাশকে।এত খুশি জীবনে হয়নি সে।নিজেকে স্বাভাবিক করলো সময় নিয়ে।ট্রে টা পাশের টেবিলে রেখে সুন্দর করে ওড়নায় চোখমুখ মুছে নিলো।
ট্রে ভর্তি নুডলস্ এর বাটি নিয়ে এসে রুমে ঢুকলো প্রিয়া।রাকা উঠে হাতে নিলো ট্রে টা।সবার হাতে হাতে দিলো বাটি।আকাশও হাতে নিলো।
রাতুল উঠে গেলো আকাশের পাশ থেকে।প্রিয়াকে ইশারা করলে বসার।
“এখানে বসো প্রিয়া। “
প্রিয়া তাকালো আকাশের দিকে। আকাশ নির্বিকার ভাবে নুডলস এর বাটি হাতে বসে আছে।ফোনের দিকে নজর।একবারও প্রিয়ার দিকে তাকাচ্ছে না।বাকিরা মিটিমিটি হাসছে।রাকিব ধীর গলায় বলেই ফেললো,”শালার নাটক দেখেছিস?এমন ভাব করছে যেনো মেয়েটাকে সহ্যই করতে পারেনা।”
প্রিয়া ইতস্তত করে দুরত্ব রেখে বসলো। শিয়াও হাসছে সবার সাথে। মুগ্ধ হয়ে দেখলো আকাশের পাশে বসা তার বোনটিকে।কি সুন্দর লাগছে দুজনকে।প্রিয়াকে আকাশ ভালো রাখবে।খুব ভালোবাসবে।এটা সে জানে।
রিয়ান ফোন হাতে সবাইকে ইশারা করে বেড়িয়ে এলো ঘর থেকে।নিজের ঘরে এসে সজোরে আঘাত করলো দেয়ালে।মাথা রাগে ফেটে যাচ্ছে তার।প্রিয়াকে আকাশের পাশে দেখে দুনিয়া তছনছ করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।মনে পরে গেলো কয়েকবছর আগের কথা।পাগলের মতো ভালোবাসতো সে একজনকে।কিন্তু সে বোধহয় শুরু থেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে আকাশকে চেয়েছিলো।তাদের সবকিছুতে আকাশকে টেনে নিয়ে আসতে।রিয়ান ত্যাক্ত বিরক্ত থাকতো।সে পারফেক্ট নয়, পারফেক্ট বয়ফ্রেন্ড বা হাসবেন্ড ম্যাটারিয়াল নয়।পুরুষ হতে হয় আকাশ এহনাজ এর মতো।রেসপনসিবল,সাকেসেস,ব্লা ব্লা ব্লা।অবশ্য সময়ের সাথে সাথে তার যে আকাশের প্রতি উইকনেস আছে সেটা রিয়ান বুঝতে পারে।তবে তার পরেও ভালোবাসতো সে মেয়েটাকে।সবরকম ভাবে চেষ্টা করেছিলো ধরে রাখার।তবে সম্ভব হয়নি।একটা সময় সে সম্পর্ক ভাঙ্গে।মেয়েটিই তাকে ছেড়ে বিয়ে করে নেয় অন্য একজনকে।শুরুতে খুব করে মনে হতে আকাশ তার বন্ধু না হলে সম্পর্কটা টিকে থাকতো।সময়ের সাথে সব ভোলার চেষ্টা করেছে সে।আজ কে আবার সেই পুরানো ক্ষত মাথা চারা দিয়ে উঠলো।এতবছর পর সে আবার ভালোবেসেছিলো একজনকে।সেখানেও আকাশ!আবার আকাশ!টেবিল এর ওপর থাকা জিনিসপত্র উল্টিয়ে দিলো রিয়ান।
হঠাৎ দরজা সটানে খুলে গেলো।ঘরের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো রাতুল।রিয়ান চমকে পিছন ফিরলো।অপ্রস্তুত হয়ে গেলো তাকে দেখে।রাতুল ও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ঘরের দিকেে।ঘরের মধ্যে একপ্রকার ঝড় বয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
মা ফোন দেওয়ায় আড্ডা ছেড়ে করিডরে এসেছিলো সে।মায়ের সাথে কথার বলার মাঝখানে জিনিসপত্র পরার শব্দ পায়। একপ্রকার ছুটেই এসেছে সে।দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো রিয়ান এর দিকে।
“এ অবস্থা কেনো।অ্যাই রিয়ান…”
রিয়ান কঠিন চোখে তাকালো রাতুল এর দিকে।দু বাহুতে ধরা রাতুল এর দু হাত সরিয়ে দিলো।দু হাতে মুখ ডললো।চোখদুটো লাল দেখাচ্ছে।
রাতুল অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সেদিকে।হলো টা কি হঠাৎ ছেলেটার।এতক্ষণ ও তো ঠিকই ছিলো।আবার এগিয়ে এলো রিয়ান এর দিকে।
“বাসায় সব ঠিক আছে?আন্টি?তোর দাদি?”
রিয়ান এবারও কিচ্ছু বললো না।চোখে আক্রোশ জমে উঠেছে।
হুংকার দিয়ে উঠলো,”আকায় প্রিয়াকে ভালোবাসে তোরা জানতিস?”
এখন এই প্রশ্ন করার কারণ বুঝলো না রাতুল।চোখমুখে চিন্তার ভাজ তার।মাথা ঝাকালো।
“হ্যা জানতাম তো।”
“আমাকে জানাস নি কেনো।”
“কি আশ্চর্য তুই ও তো জানতিস।”
রিয়ান এর কঠিন চোখ কঠিনতর হলো।”আমি জানতাম!”
“আমি বলিনি?আকাশ এক মেয়ের বাড়ির সমানে মাঝরাতে আমাকে নিয়ে যেতো।পরে…
রিয়ান হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাকে।
“মেয়েটা যে প্রিয়া সেটা বলিস নি কেনো?”
রাতুল থমকালো।রিয়ান জানতো না মেয়েটা প্রিয়া?পরমুহূর্তেই মনে পরলো মাঝখানে আকাশ আর প্রিয়া কে নিয়ে যখন তাদের বন্ধু মহলে জোর আলোচনা সেসময় বেশির ভাগই রিয়ান তার মা বা দাদির অসুস্থতার জন্য বাড়িতে যেতো।তাই যখনই ফিরতো সেই চিন্তারত মানুষের সাথে ফাইজলামি, আড্ডা করা হতো না।বিগত কয়েকমাস এভানেই চলছিলো।তারপরেও রিয়ান যে একেবারের জানেনা সেটা আন্দাজেও ছিলো না তার।
“আমি,রাকিব,রেদোয়ান সবাই জানি।আলোচনা করতাম।ইভেন আমাদের কটেজে থাকার ব্যাবস্থা করার পিছনে অয়ন ভাই যে শিয়া র কথা ভেবেছিলো আর আকাশ যে প্রিয়ার কথা ভেবেই রাজি হয়েছিলো এটা তো আমরা পরে সবাই জানতাম।”
রিয়ান দু হাতে নিজের চুল খামচে ধরলে।সজোরে লাথি মারলো কাঠের চেয়ার টায়।শব্দ করে উল্টে পরলো সেটা।রাতুল এখনো কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।সামান্য বিষয় নিয়ে মান অভিমান করার বয়স এখন মোটেই তাদের নেই।ছোটবেলার মতো তোরা জানতিস আমাকে জানাসনি কেনো,আমি এতো পরে জানলাম কেনো এগুলো বলে ঝগড়া, মারামারির দিন তাদের আছে নাকি।রাতুল কিছু বলার আগেই রিয়ান ঘুরে তাকালো তার দিকে।চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল।মাথার চুলগুলো এলোমেলো।
ষ্থির দৃষ্টি রেখেই বলে উঠলো।,”আমি প্রিয়াকে ভালোবাসি।”
বাজ পরলো রাতুল এর মাথা ওপর। চিৎকার করে উঠলো,”হোয়াট?”
রিয়ান ও একই তপ্ত গলায় বললো,”আই সে আমি প্রিয়াকে ভালোবাসি।”
রাতুল ফট করে ঘুরে তাকালো দরজার দিকে।প্রায় দৌড়ে গেলো সেদিকে।দ্রুত হাতে দরজা আটকে দিলো।রিয়ান এর সামনে এসে দাড়ালো। কঠিন গলায় বললো,”আর ইউ ম্যাড।কি বলছিস বুঝতে পারছিস?”
রিয়ানের মধ্যে ভাবান্তর দেখা গেলো না কোনো।পাশের সোফাতে পায়ের ওপর পা তুলো বসলো।
“জানি কি বলছি।জেনেই বলছি।”
রাতুল ঘামতে শুরু করেছে।এক হাত কোমড়ে রেখে অন্য হাতে খমচে ধরলো নিজের চুল।
“ভুলে যা। “
“এ জীবনে সম্ভব না।”
“আকাশ ভালোবাসে প্রিয়াকে।শুনতে পাসনি তখন?”
“তো?আই অলসো লাভ হার।”
রাতুল এগিয়ে গিয়ে কলার ধরলো রিয়ানের।ছেলেটার নির্বিকার ভাবে মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার।
“আকাশ তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। হুশে ফের।প্রিয়াকে ও ভালোবাসে।শুরুর দিন থেকে।”
রিয়ান বাকা হাসলো।হেঁচকা টানে রাতুল হাতটা ছাড়িয়ে নিলো কলার থেকে।ময়লা পরিষ্কার করার মতো করে ঝাড়লো সেখানটা।মাথা উঁচিয়ে তাকালো রাতুলের দিকে।
“আমিও শুরুর দিন থেকে ভালোবাসি প্রিয়াকে। “
রাতুল মাথার চুল টেনে ছিড়তে মন চাচ্ছে।রিয়ান বুঝতে চাইছে না।ধপ করে বসলো বিছানার কোনায়।অসহায় চোখে তাকালো রিয়ান এর দিকে।
“একরোখার মতো কথা বলিস না রিয়ান।তাছাড়া প্রিয়াও রিয়ান কে ভালোবাসে।”
শব্দ করে হাসলো রিয়ান।পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো।ভ্রু জোড়া তুলে ব্যাঙ্গ করলো রাতুল কে।
“প্রিয়া বলেছে সে কথা।”
রাতুল দাতে দাত পিষলো।এতক্ষণ আড্ডার সময় টের পায়নি ও!
“মুখে বলতে হয় সেটা?বোঝা যায়না?তুই খেয়াল করিসনি,তাই দেখতে পাসনি।”
রিয়ান সিগারেট এ টান দিলো।ওপর দিকে ধোয়ার কুন্ডলি ওড়ালো।একই একরোখা গলায় বললো,”
i can’t let her go.আমি কারোর জন্য ওকে ছাড়তে রাজি নই।”
রাতুলের নিজেকে অসহায় লাগছে।বারবার তাকাচ্ছে দরজার দিকে।এ কথা ঘুনাক্ষরেও আকাশের কানে গেলে একটা কুরুক্ষেত্র বাঝবে।আকাশকে সে চেনে।প্রিয়ার প্রতি ওর অবসেসন টা বোঝে রাতুল।সেই ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসার অধিকার ভাগ ও কাউকে দিতে রাজি নয়। একদম নয়।
“কেনো অশান্তি বাড়াচ্ছিস ভাই?আকাশ এর আগে কখনো কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে? তাকায়নি।প্রিয়ার ওপর ও অবসেসড।পাগলের মতো ভালোবাসে ও মেয়েটাকে।আমি সাক্ষী তার।তোর কথা জানতে পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
রিয়ান সিগারেটে টান দিয়ে হাটুতে দু হাত ভর দিয়ে ঝুকলো রাতুলের দিকে।
“আকাশ এহনাজ এর দালালি তুই করতে পারিস আমি করবো না। আজীবন ওর বাপের পয়সা বেশি জন্য ওই সব পাবে,আমরা ছেড়ে দেবো। আর হচ্ছে না সেটা।”
রিয়ান সহজে মানবে না।স্পষ্ট বুঝলো রাতুল।তারপরেও রাগ কন্টোল এ রেখে বোঝানোর চেষ্টা করলো তাকে,”আমাকে যা ইচ্ছে বল।আমি কিচ্ছু বলবো না।কিন্তু একটা মেয়ের জন্য বন্ধুর সাথে লড়বি?একজনকে নিয়ে টানাটানি করবি? Isn’t it so lame? ”
রিয়ান শব্দ করে হেসে উঠলো।ভয়ংকর সে হাসি।
“i want her any cost.!”
রাতুল উঠে দাড়ালো।জানালার কাছে চলে গেলো।চেপে ধরলো জানালার পাল্লা।মাথা ভনভন করছে।বন্ধুদের মধ্যে এসব নিয়ে ঝামেলা দুনিয়ার সবথেকে ছোটলোকি কারবার।আকাশ এ জীবনে কখনো প্রেমে পরেনি,কাউকে ভালোবাসেনি।হারাম নারী সঙ্গ ওর চরিত্রের সাথে যায়না।প্রিয়াকে সে প্রথম ভালোবেসেছে।সে জানে দুনিয়ার সবকিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও প্রিয়াকে সে অন্য কারোর হতে দেবে না।এখন যদি জানতে পারে শক্রু তারই বেস্ট ফ্রেন্ড তখন এ লড়াই টা কেমন হবে!
রিয়ান ভালোবাসে হয়তে প্রিয়াকে।কিন্তু প্রিয়ার মতো মেয়ের জন্য রিয়ান নয়।তার মতো একটা মেয়ে নিশ্চয়ই প্রথমবার প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে হাজার মেয়ের সাথে রাত কাটানো ছেলে আশা করে না।রিয়ান তার বন্ধু। প্রিয়াও তার ছোট বোনের সম্পর্কে। সে চায় রিয়ান ভালোবাসুক আবার,ভালো থাকুক।তবে যেখানে আকাশ চায় প্রিয়াকে।সেখানে সে কখনো ভাই হিসেবে কখনো আকাশকে রেখে রিয়ানের কথা প্রিয়ার জন্য ভাবতেও পারেনা।আকাশের কানে গেলে সব সম্পর্কগুলো তছনছ হয়ে যাবে।
“আমার কথা আমি বলে দিয়েছি।তোর বোঝানো হলে তুই আসতে পারিস।”
রিয়ানের কথায় পিছুন ফিরলো রাতুল।এগিয়ে এসে দাড়ালো রিয়ান এর সামনে।
“ঝামেলা করিস না রিয়ান।শুনতে খারাপ লাগলেও প্রিয়া তোর জন্য নয়।আকাশ জানলে খুন করে ফেলবে।খুনাখুনি না চাইলে যেটা বললাম মান।”
রাতুল দাড়ালো না আর।বেড়িয়ে এলো ঘর থেকে।রিয়ান কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো।আরেকটা সিগারেট ধরালো সে।প্রিয়াকে ছাড়া অসম্ভব। একদম অসম্ভব…
চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼🍂

