আকাশপ্রিয়া #পর্ব_২৮

0
43

#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব_২৮ (এট্টু এট্টু রোমান্টিক)
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা

[🚫কপি করা নিষেধ, সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক দের জন্য উন্মুক্ত ]

ঝড়জল থেমে গেছে অনেকক্ষণ। কেটেজ থেকে আনুমানিক বিশ মিনিট দূরে রয়েছে অয়ন আর শিয়া।গাড়ি চলছে আঁকাবাকা রাস্তার মধ্যে দিয়ে। ফুল স্পিডে চলছে।মাঝ রাত, শুনশান রাস্তা।অয়ন বেশ ক্লান্ত। সারাদিন এর পরিশ্রম শেষে আবার সারারাত ধরে ড্রাইভ করছে।খাবার খেয়েছে সেই সকালে।শিয়া নিশ্চুপ বসে আছে।ঘুমিয়েছিলো বিধায় এখন আর চোখে ঘুম নেই।তাছাড়া অয়ন কে পাশে রেখে সজ্ঞানে তার ঘুমানোর চেষ্টা করা বৃথা,ধরবেই না।তখন কিভাবে ধরেছিলো খোদা জানে।আশ্চর্যজনক ভাবে সারাটা রাস্তা পাশাপাশি এক গাড়িতে বসেও দুজনের মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হয়নি। অয়ন আজ নির্বিকার।শিয়া অবাক হওয়ার চূড়ান্তে।হঠাৎই কি খেয়াল হলো শিয়ার।ডেকে বসলো অয়নকে।
“অয়ন।”
ডাক দিয়ে নিজেই ব্যাক্কেল হয়ে গেলো।কেনো ডাক দিলো সে।অয়নও অবাক হয়েছে বইকি।এমন আকুল কন্ঠস্বর শোনেনি কতদিন!নাহ কত বছর বলা যায়।ড্রাইভিং করতে থাকা হাত কেঁপে উঠলো।ফট করে তাকালো শিয়ার দিকে।গাড়ির গতি কমে এলো বেশ খানিকটা।
শিয়া কি বলবে ভেবে পেলো না।আমতা আমতা করলো খানিকক্ষণ। তারপর স্বাভাবিক করলো নিজেকে।নরম গলায় বললো
,”শুনেছিলাম অ্যাবরোড সেটেল হবে।হওনি?”

সারারাত পর প্রথম কথা এটা হতে পারে আশা করেনি অয়ন।দৃষ্টি রাস্তায় রেখে বললো,”সেরকম কিছু ভাবিনি তো।”
শিয়া অবাক হলো।কারণ তার স্পষ্ট মনে আছে তাকে জানানো হয়েছিলো অয়ন লন্ডন সিফট হয়েছে। ওখানে সেটেল হবে।তবে মুখে সেসব বললো না।অস্ফুটস্বরে বললো,”ওহ্”

অয়ন একনজর দেখলো শিয়াকে।
“তুমি তো ল এর স্টুডেন্ট। অ্যাডভোকেট হতে চাইতে।প্র্যাকটিস করলে না কেনো!এই জবে ঢুকলে কেনো?

“করা হয়ে ওঠেনি।”

আবার নিরবতা গাড়ির ভিতর।দু’জনেই কিছু বলতে চাইছে হয়তো।শিয়াই আবার মুখ খুললো,
“সরি।”
“কেনো?”
“সেদিন তোমার সাথে বাজে বিহেব করে ফেলেছিলাম।মাথা ঠিক ছিলো না।গায়ে হাত…
অয়ন থামিয়ে দিলো।”ওসব মনে রাখতে নেই।দোষ টা আমার ছিলো।”
“অয়ন…”
এ আকুল ডাকে বারবার বুক কেঁপে উঠছে অয়নের।ইচ্ছে করছে বুকের ভিতর জাপটে ধরতে।
আর একবার মেয়েটা এভাবে ডাক দিলে সে সত্যি সেটাই করবে।তাই তাড়াহুড়ো করে নিজেই কথা তুললো।
“রাতুলরা কক্সবাজার পিকনিক এর আয়োজন করছে
প্রিয়া কে জানিয়েছো?”
থমকে রইলো শিয়া।সে অন্য কিছু বলতে যাচ্ছিলো।তবে মাঝখানে এই কথায় অপ্রস্তুত হয়ে গেছে সে।ধীর গলায় বললো,”সময় পেলাম কই।বাসায় গিয়ে কাল সকালে বলবো।”
“খুশি হবে খুব তাইনা?”
“হ্যা খুব।।”
“ওর তো পাহাড়,সমুদ্র দুটেই ভালো লাগে।শুধু সমুদ্র তো তুমি পছন্দ করো।”
শিয়া চমকে তাকালো।অয়নের মনে আছে সেটা।কত প্ল্যান করতো একসাথে সমুদ্র দেখতে যাওয়ার।
“তোমারও তো পছন্দ। “
“ওই আরকি।”
“এখন নেই?”
অয়ন নিঃশব্দ হাসলো।
“হাসছো যে?”
“এমনি।আমার পছন্দ এতো দ্রুত পরিবর্তন হয়না।তাই
সমুদ্র টা এখনো পছন্দের তালিকায় রয়েই গেছে।দূর্ভাগ্যবশত আর অনেক কিছুই”
শিয়া কেঁপে উঠলো।বুকের ভিতরটায় হাহাকার করে উঠলো।
“তোমার বিয়ের কথা বলেছিলে। কবে করছো বিয়ে?”
শিয়া অয়নের প্রতিটা কথায় চমকে চমকে উঠছে।এমন এমন প্রসঙ্গ তুলছে বারবার।বিয়ের কথাটা শুনতেই মুখটা ভিষন মলিন হয়ে উঠলো।
“মা বাবা ফিরলেই। “
“কবে ফিরবেন?”
“সবে পাঁচ মাস হলো।আরও আড়াই বছর।”
“এতো দেরি!বুড়ো হয়ে যাবে তো।”

অয়নের বলার ভঙ্গিতে শিয়া হেসে ফেললো শব্দ করে।অয়ন মুগ্ধ চোখে দেখলো সে হাসি।ইশশশ কতদিন পর দেখলো এই হাসিটা।হাসতে ভুলে যাওয়া এই মেয়েটি কি জানে তার ওই হাসিতে কারোর বুকের ভিতর এক সমুদ্র ঢেউ উথাল-পাতাল শুরু করে দেয়!জানেনা।জানলে হয়তো ওই মুখের হাসি কখনো মলিন হতো না।

একটা সময় ঘন্টার পর ঘন্টা কেটেছে ওই মুখের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থেকে।শিয়া রাজ্যের গল্প করতো,আর সে মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনতো সব।সে যেনো এক বাধ্য স্রোতা।কেনো হারিয়ে গেলো সেসব,কেনো যন্ত্রণার স্মৃতিতে মলিন হলো সে সুখস্মৃতি। কেনো!

“শিয়া…
“হুম”.”
“আমি কিন্তু আজও তোমাকে ভালোবাসি।”
বিষ্ফরিত চোখে তাকালো শিয়া।এই কথাটা এই মূহুর্তে সে কল্পনা করতে পারেনি।একদমই করেনি।হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে গেলো। শিরদাঁড়া বেশে শীতল অনূভুতি নেমে গেলো।
অয়ন বুজলো শিয়ার আশ্চর্যতা।হঠাৎই গাড়ি থামালো।সিট বেল্ট খুলে কাত হয়ে ঘুরে বসলো শিয়ার দিকে।শিয়া অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তখনো।

অয়নের চোখে ততক্ষণে পানি জমে এসেছে।লাল হয়ে এসেছে চোখজোড়া। অসহায় গলায় বললো,”খুুউউব ভালোবাসি “
কি সহজ শিকারোক্তি।শিয়ার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যাচ্ছে।কান্না আটকে রাখা দায় হয়ে যাচ্ছে।কথা আটকে আছে যেনো মুখে, কি বলবে বুঝতে পারছে না।
অয়ন ইতস্তত করে হাত বাড়িয়ে পায়ের ওপর রাখা শিয়ার হাত টেনে নিজের হাতের মুঠোয় নিলো।অয়নের ঠান্ডা হাতের স্পর্শে মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো তার।নিচু করা মাথা তুললো অয়নের দিকে।দুজনের চোখই আর বাধ মানতে চাচ্ছে না।আজ কেনো যেনো সব সত্যি জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। সব রাগ অভিমান ভুলে সামনের মানুষ টার শেষ কৈফিয়ত টা শুনতে ইচ্ছে করছে।

“শিয়া…আমাকে ছেড়ে চলে গেলে কেনো?আমি পাগল হয়ে গেছিলাম জানো?তোমাকে কোথায় না কোথায় খুজেছি।পাইনি।আমার কথা, আমাদের ভালোবাসার কথা কেনো একবারও ভাবলে না।কেনো বলে গেলে না। আমি কি এমন করেছিলাম যার জন্য এতো বড় শাস্তি দিয়ে গেলে আমায়?”

শিয়ার চোখ দিয়ে টপটপ পানি পরলো অয়নের হাতেও ওপর।ফুপিয়ে উঠলো কান্নায়। অয়ন আবার বাচ্চাদের মতো হাত ঝাঁকালো।
“আজও বলবে না?”

শিয়া এবার মাথা তুললো।আলগোছে হাত ছাড়িয়ে নিলো নিজের।যন্ত্রণারময় অতীত ভেসে উঠলো চোখের সামনে।যে অতীতের ট্রমা এতটাই যেখানে আর কিছুর কৈফিয়ত সেসময় নেওয়ার রুচিই হয়নি।
“আজ কেনো জানতে চাইছেন?ছয় বছর আগে আপনাকে পাইনি কেনো?”
“আমাকে পাওনি??আমাকে?আমি তোমাকে পাইনি শিয়া।”
শিয়া বিদ্রুপ এর হাসি হাসলো,”আজও আপনি মাথা নোয়াবেন না চৌধুরী সাহেব…”

“তুমি কারণ বলো?আমি দোষি হলে মাথা নোয়াবো। অবশ্যই নেয়াবো।আজ অবধি কারণটাই কেনো বলছো না?কেনো চলে গেছিলে সেদিন?আমার ফিরে আসা অবধি কেনো ধৈর্য হলো না তোমার?”

“ফিরে আসা?আসতেন ফিরে?যেমন এখন এসেছেন?ছয় বছর পর?যা ক্ষতি হওয়ার সেটা তো সেদিনই হয়ে যেতো।তারপর আপনার ফেরায় কি আসে যায় আমার।”

“একতরফা দোষ আজও দিয়ে যাচ্ছো?আমার দিকটা তখন আমি বলতে পারি যখন আমি জানবো তোমার অভিযোগ টা ঠিক কোন জায়গায়।”

এবার আত্মসম্মান এ চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো শিয়ার।মুখে কাঠিন্য ফুটে উঠলো,”
“সেদিন আমার, আমার বোনের শরীর যখন পিশাচ এর নোংরা হাতের স্পর্শ পরেছিলো।কোথায় ছিলেন আপনি?কোথায় ছিলো আপনার ভালোবাসা?”
অয়ন চুপ করে রইলো খানিকক্ষণ। এটা ওর অভিযোগ? এটা?
“কারণটা আমি বলি।সেদিন যা হয়েছিলো আপনার সম্মতিতে হয়েছিলো।আপনি সামনে আসবেন কি করে।তাহলে ভুল ভেঙে যেতো তো আমার”

অয়ন স্তম্ভিত হয়ে গেলো।তার নির্দেশে?শিয়া এটা বিশ্বাস করেছিলো?তাহলে রকি যে সেদিন বলেছিলো সেটা মিথ্যা ছিলো না!শিয়া এ কথা বিশ্বাস করে তার থেকে এতদূরে সরে গেছিলো?অসহায় হাসি হাসলো অয়ন।
“সেদিন একবার যদি পিছন ফিরে দেখতে পারতে,হয়তো আমার রক্তাক্ত দেহটা দেখতে পারতে।কোথায় ছিলাম আমি জানতে পারতে।ট্রাকের ধাক্কায় গুড়িয়ে যাওয়া বুক পাজর চোখে পরতো তোমার।”

শিয়া অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।অয়ন আচমকা একটানে ছিড়ে ফেললো নিজের শার্টের বোতাম গুলো।হেচকা টানে চার চারটে বোতাম ছিড়ে পরে গেলো নিচে।দৃশ্যমান হলো সুঠাম বক্ষ।কিন্তু একি এ হাল কেনো।শিয়া হতভম্ব হয়ে গেলো।বিশাল বিশাল দাগ।সেলাই এর দাগ।পুরো বুকটা ক্ষতবিক্ষত। ডানে বায়ে,আড়াআড়ি শুধু দাগ আর দাগ।
ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো সে।নিয়ন্ত্রণহীন এর মতো ডান হাত ছোয়ালো বুকটায়।অয়ন চোখ বন্ধ করে নিলো।বুকের ওপর রাখা শিয়ার হাত টা চেপে ধরলো। ছাড়িয়ে আনলো সেখান থেকে।শার্টের অংশ দু হাতে দু পাশে সরিয়ে দিলো আরও।
“বুকের এই কাটা দাগটা দেখছোগোনো..গোনো..দেখছো?”

শিয়া অপলক তাকিয়েই রইলো।কান্না থামছেই না তার।

“অবাক হচ্ছো?তেত্রিশ টা সেলাই এখানে।পাঁচ পাঁচটা পাজর ভাঙা।কবে হয়েছিলো জানো?তোমাকে আর প্রিয়ুকে যখন ওরা চোখ বেধে গাড়িতে তুলছিলো।আমি অসহায় এর মতো চোখ বুজেছিলাম।যাদের হাতে পরেছিলে,জানতাম তোমাদের নিস্তার নেই।গাড়ির ধাক্কায় রক্তাক্ত হয়ে জ্ঞান হারানোর আগে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলাম আমি তখন রাস্তায়।যতটা না ব্যাথায়,তার থেকেও দশগুণ তোমাদের বাচাতে না পারার আক্ষেপ এ।ওঠার অবস্থা ছিলো না আমার তখন।আল্লাহর কাছে কি চেয়েছিলাম জানো?তোমাদের সুরক্ষা করার ভাগ্য যদি আল্লাহ আমার কপালে লিখে না রাখেন,ওদের হাত থেকে তোমাদের সম্মান, ইজ্জত সহ বাচিয়ে আনার ভাগ্য যদি আমার না থাকে।এ চোখ বোজাই যেনো আমার শেষ চোখ বোজা হয়।আমি বেঁচে ফিরে যদি জানতে পারি আমার বউ আমার বোন এর ইজ্জত নেই।নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো মহাপাপ করতেও আমি দুবার ভাববো না।খোদা আমার কথা রেখেছেন। তোমাদের সম্মান আল্লাহ হেফাজত করেছেন।আর তাই আমি হয়তো বেচে আছি।আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিলো না শিয়া।আর না তো তোমার প্রতি আমার সম্মান। চোখের সমানে যা হয় তা সবসময় সত্যি হয়না তাইনা?”

অয়ন তীব্র আক্ষেপ এর কন্ঠে কথাগুলে বলে থামলো।শিয়া হেচকি তুলে কাঁদছে। চোখ ফুলে গেছে এরিমধ্যে।বিস্ময় মাখা চোখে শুনছে সবটা।আজ কেনো প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।বলুক লোকটা।সবটা বলুক।তার মনের সব দ্বিধা দূর করুক।এ জাহান্নামের মতো যন্ত্রনা মনে রেখে বাচা যায়না।তার থেকে সব পরিষ্কার হোক।সবটা।

অয়ন দু হাতে মুখ ডললো।চুল গুলো খামচে ধরে পিছন দিকে ঠেলে দিলো।
“আর বাকিটা শোনো তাহলে।সেদিন কে বাঁচিয়েছিলো তোমাদের? কে?তোমার বাবা?তোমার বাবার বন্ধু? তারা ওখানে কোত্থেকে আসলো।জানতে চাওনা?আমি ওখানে কেনো ছিলাম সেটা জানতে চাও না?”

শিয়া হালকা মাথা নাড়লো।চায় সে জানতে।
অয়ন দু বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে উঠলো।কঠিন গলায় প্রায় চিৎকার করে উঠলো,
“এতে এতো জানতে চাওয়া,এতো এতো প্রশ্ন মনের মধ্যে কবর দিয়ে,আমার মনের মধ্যে এতো প্রশ্নের জন্ম দিয়ে সবকটার উত্তর খুজে,আমাকে খুঁজে না দিয়ে কেনো হারিয়ে গেছিলে ড্যামেড…এতোগুলো বছর নষ্ট করলে ওই অন্যের কথায়?আমার ওপর এতটুকু বিশ্বাস ছিলো না তোমার?”

শিয়া কি বলবে।কি বলার আছে তার।সত্যি তো।রকির মতো বাজে ছেলে বললো তারা অয়নের কথায় এসব করেছে,আর সে মানলো?মানতো না কিভাবে। সেসময় নিলয়, নিলয়ের বাবা আজগর আংকেল ই তো তার বাবাকে খবর দিয়েছিলো তাদের ওভাবে যখন তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো।আজগর আংকেল বলেছিলেন অয়ন সেখানে ছিলো রকিদের সাথে। আর সেই ভয়েজ রেকর্ড? অয়নের কন্ঠ!কেনো বিশ্বাস করতো না সে।আর তারপর তো কতগুলো দিন সেই পুরানো সিমটাই ব্যবহার করতো।কই একবারও তো অয়ন কল করেনি।টানা দু মাস সব প্রমান অয়নের বিরুদ্ধে দেখার পরও শেষ একবার জানতে চেয়েছিলো অয়নের মুখে সবটা।অয়ন কেনো যোগাযোগ করেনি তখন।কেনো করেনি!

“সেদিন তোমার বাড়ি যাচ্ছিলাম আমি।তেমার বাাবর কাছ থেকে সসম্মানে এ তোমাকে নিয়ে আসতে।তোমার আমার বিয়ের প্রস্তাব দিতে।ভেবেছিলাম আমাদের অ্যানিভারসারির দিন এমন একটা সারপ্রাইজ পেয়ে তুমি খুশি হবে।মাঝরাস্তায় হঠাৎ আমার কাছে একটা কল আসে।কার কল জানো?রকি?চেনো তো? আমি রাস্তায় গাড়ি সাইট করে ওর বাজে বকা শুনতে থাকি।তুমি যেগুলো বিশ্বাস করেছো আমাকে সেগুলো আগে থেকে জানিয়ে দিচ্ছিলো।অথচ আমি জোর গলায় বলেছিলাম সেদিন, আমার শিয়া আমাকে কখনো ভুল বুঝবে না।হঠাৎ বেশ খানিকটা দূরে চিৎকার চেচামেচির আওয়াজ পাই।চমকে যাই সেদিকে তাকিয়ে।তোমাকে আর প্রিয়ুকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ওরা।গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগেই একটা ট্রাক এসে ধাক্কা দেয় আমার গাড়িটা।আমি নিশ্চিত ছিলাম সেদিন আমার মৃত্যু। কয়েক মিনির জ্ঞান ছিলো বোধহয়। ওঠার সামর্থ্য ছিলো না।খোদার রহমতে জাস্ট তোমার বাবাকে একটা কল দিতে পেরেছিলাম।তবে সে তোমার বাবা ছিলো না।তোমার সেই আজগর আংকেল ছিলো।তোমার বাবা তখন ছিলেন না সেখানে। আমি তোমাদের লোকেশন জানিয়ে জ্ঞান হারাই।লন্ডন আমি যাই,তবে সজ্ঞান না।ট্রিটমেন্ট এর জন্য। দের মাস কোমায় ছিলাম আমি।যখন জ্ঞান ফেরে পাগলের মতো খোঁজ করি তোমাদের। আকাশ জানায় তুমি ঠিক আছো,চলে গেছো।তারপর থেকে পাগলের মতো খুঁজে গেছি।পাগলের মতো।দাড়াও তোমার তো আবার আমার কথা বিশ্বাস হয়না।প্রমান দেই।”
অয়ন যটপট নিজের ফোন বের করে রকির সাথে তার কল রেকর্ড, তার বাবার নাম্বার এ আজগর আংকেল এর কথা,এমনকি রকির পুলিশ এর কাছে স্বিকারোক্তি সবটা দেখায়। শিয়া বিষ্ফরিত নয়নে দেখলো একেরপর এক সব প্রমান।চমকানোর ওপর চমকাচ্ছে সে।অথচ আজগর আংকেল তাদের জানিয়েছিলো অয়নই….
শিয়া দু হাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো।অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে। কি করেছে সে।পাগলের মতো।যা চোখে দেখা সবটা সত্যি হয় না।সেদিন আকাশের বলা কথাগুলো মাথায় ঘুরতে লাগলো তার।অপরাধবোধে মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আজকে তার চোখের সমানে সব অন্ধকার লাগলো তার।কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারালো সে।
অয়ন চমকে দু হাতে জড়িয়ে নিলো শিয়াকে।
“জান,অ্যাই জান..শিয়া..

বোতল থেকে পানি নিয়ে ছেটালো চোখেমুখে। বেশ কিছুক্ষন পর জ্ঞান ফিরলো তার।চোখ মেলা মাত্র হু হু করে কেদে উঠলো সে।অয়ন এর থেকে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে।
“আমাকে ধরবে না।আমার যোগ্যতা নেই তোমার ভালোবাসা পাওয়ার।আমি কিভাবে পারলাম আমাদের ভালোবাসা কে অবিশ্বাস করতে।ছিহ্”

“কে বলেছে যোগ্যতা নেই।না থাকলে অয়ন মেহনাজ চৌধুরী এখনো তার শিয়াকে ভালোবাসে?পাগলের মতো ছয় বছর ধরে খুজে বের করে?আমার জান টা পবিত্র। ফুলের থেকে পবিত্র, আমাদের ভালোবাসাটাও পবিত্র। না হলে খুজে পেতাম আমার জান কে?”

“আমার দোষ।আমার..”

অয়নের মুখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো।দু হাতে জাপটে বুকের মধ্যে আগলে নিলো তাকে।মাথা চেপে ধরে রাখলো বুকের ওপর।শিয়া সরে যেতে ছটফট করলো কিছুক্ষণ। শিয়াকে ছাড়লো না।অয়ন চুলে বিলি কেটে চুমু খেলো সিথির ওপর।কান্নায় ভিজে যাচ্ছে অয়নের উন্মুক্ত বুকটা।শিয়া বৃথা ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা ফেলে ছড়িয়ে ধরলো অয়নকে।ছয় বছরের মান অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি ধুয়ে মুছে যেতে দিচ্ছে দুজন।অয়নের চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পরলো শিয়ার সিথিতে।শিয়া মুখ তুললো।অয়ন কাঁদছে।দু হাতের আজলায় ধরলো অয়নের মুখটা।কান্না থামিয়ে বলার চেষ্টা করলো,”অ্যাম সরি জান।সরি..”

কান্নার তোরে কথা গুলো আটকে আটকে আসছে।শিয়া একনজর তাকালো অয়নের ক্ষতবিক্ষত বুকটায়।হাত বুলালো,উন্মাদ এর মতো চুমু খেলো সেখানটায়।অয়ন তার জানের পাগলামি দেখে হাসলো।দু হাতে মুখটা তুললো।কপালে দীর্ঘ চুপু খেলো।
“কান্না থামাও জান।হয়েছে এবার।”

“আ..আমি..নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে..”

“উশশশশ্ চুপ।কিসের ক্ষমা?কার কাছে ক্ষমা?আমি তুমি আলাদা?কেনো ক্ষমা চাইছো?আমি চেয়েছি তোমার ক্ষমা?তুমি আমার, পুরোটা আমার,তোমার ভালো,মন্দ,ভুলচুক সবটা আমার।সবটা।আমি তোমাকে কখনো ভুল বুঝিইনি।বুঝলে খুজে বের করতাম?পাগলের মতো ছুটতাম পিছু পিছু?”

শিয়া আবার জাপটে ধরলো অয়নের গলায় মুখ লুকালো।অয়ন যতই বলুক।সে নিজেকে এতো সহজে ক্ষমা করতে পারবে না কিছুতেই না।অয়ন হঠাৎ ঝট করে সামনে দিকে টেনে সোজা করলো শিয়াকে।ডান হাত গলিয়ে দিলো শিয়ার ঘাড়ে।বা হাতে চেপে ধরলো কোমড়।শক্ত করে ঘাড়টা ধরে হেঁচকা টানে কাছে এনে ঠোঁট ডুবালো শিয়ার ঠোঁটে।
আচমকা আক্রমণ শিয়া আশা করেনি।অয়নের ঠান্ডা হাতের স্পর্শ ঘাড়ের শিরশির করে উঠলো।বড় বড় চোখ তাকালো। অয়ন মৃদু আদর অবধি সীমাবদ্ধ থাকলো না।ধীরে ধীরে গভীর হলো ঠোঁটের স্পর্শ। উন্মাদ এর মতো শুষে নিতে থাকলো তার জানটার অধরসুধা। অবাকের পাঠ চুকিয়ে নিজের অজান্তেই অয়নের সাথে সায় দিলো শিয়া।এত বছরের জমানো আদর কি আর এত অল্পতে ফুরায়।মিনিট পাচেক পর যন্ত্রনায় ছটফট করে উঠলো শিয়া।অয়ন রীতিমতো কামড়ে ধরছে শিয়া ঠোঁট জোড়া।শিয়ার মোচড়ামুচড়ি তে ছেড়ে দিলো এবার।চোখবুজে কপালে কপাল ঠেকালে।দুজনেই হাপাচ্ছে।ঠোঁট জ্বলছে তার।অয়ন তাকালো।শিয়া লজ্জায় নুয়িয়ে পরতে চাচ্ছে।বাঁকা হেসে জড়িয়ে নিলো বুকের মধ্যে। এতে বছরের বুকের ভিতর জলন্ত আগুন আজ নিভলো অবশেষে।

***
রাতুল ঘুমিয়ে পরেছে অনেকক্ষণ। এই অবস্থায় আকাশের ঘুম ধরা সম্ভব! ইচ্ছে তো ছুটে গিয়ে তার বিছানা দখল করে থাকা ওই বোকা বেয়াদব অবুঝ মেয়েটাকে আচ্ছা একটা শিক্ষা দিতে।দুনিয়া ভোলানো আদর দিতে।কিন্তু সেটা পারলে তবে তো!হাত পা বাধা তার।খোদা জানে এমন নিজেকে আর কতদিন হাতকড়া দিয়ে বন্দি করে রাখতে হবে।
মেইন দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেলো।নিশ্চয়ই অয়ন ভাই এসেছে।রিয়ান,রাকিবদের গাড়ির ওপর ঝড়ের ডাল ভেঙে পরায়,স্থানীয় এক হোটেলে উঠেছে ওরা।সুতরাং আসার সম্ভাবনা ওদের নয়।আকাশ উঠে বসলো।রাতুল এর ঘুম বড্ড পাতলা।একটু শব্দ বা নড়াচড়া তেই ঘুম ভেঙে যাওয়ার স্বভাব তার।
“কেউ এসেছে না?”

আকাশ মাথা নাড়লো।”ভাইয়া আর শিয়া বোধহয়। থাক দেখে আসি।”.

“ভয় পাবি না তো আবার একা একা?”

“এই শালা আমাকে বাচ্চা মনে হয় তোর?”

রাতুল বাঁকা বাঁকা হাসলো।”আজকের জন্য বাচ্চাই ধরে নে।ভয় যে পেয়েছিস আজকে স্বীকার করতে দোষ কি মেরা জিগরি দোস্ত। হোক সে এক নারীকে দেখে।তবুও ভয় তো ভয়ই তাইনা?আকাশ এহনাজ চৌধুরী এক নারীর জন্য ভয়ে নাহিয়ান মির্জা রাতুল এর ঘরে আশ্রয় নিয়েছে।বড় হেডলাইন হবে কিন্তু। করতে বলবো নাকি?”

আকাশ দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো।”শাট আপ।যা তুই যা।দেখে আয় কে আসলো।”

রাতুল গা জ্বালানো হাসি দিয়ে উঠে দরজা খুলে বেড়িয়ে গেলো।আকাশ দু হাতে মুখ ডললো।ঘাড়ে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে তাকালো সিলিং ফ্যান এর দিকে।ভয় পেয়েছে আজকে সে!সত্যিই পেয়েছে।আজ নয় শুধু। এ মেয়ের প্রেমে পরার পর থেকেই প্রতি মূহুর্তে ভয়ে থাকে সে।নিজেকে তো হারিয়ে বসে আছেই,অন্তত যেটুকু বাদ আছে সেটুকু যেনো অন্তত হালাল সম্পর্ক অবধি বাচিয়ে রাখতে পারে।তার আগেই কোনো সর্বনাশ ঘটিয়ে না ফেলে।

হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে রাতুল ঢুকলো ভিতরে।বিছানার সামনে এসে কোমড়ে হাত দিয়ে হাঁপাচ্ছে। হাত দিয়ে ইশারা করছে বাইরে। হাঁপানির জন্য কথাই বলতে পারছে না বেচারা।আকাশ কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলো।দুই ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করলো।রাতুল একই ভাবে বারবার বাইরে দেখাচ্ছে।
আকাশ দ্রুতপায়ে উঠে করিডরে আসতেই হতভম্ব হয়ে গেলো।তাকালো রাতুল এর দিকে। রাতুল অসহায় চোখমুখে মাথা উপর নিচ করলো।

ড্রয়িং রুমে আধো আধো আলোয় স্পষ্ট দুজন মানব মানবি চুম্বনরতো অবস্থায়।বুঝতে অসুবিধা হলো না তারা আর কেউ নয়।সয়ং অয়ন মেহনাজ চৌধুরী এবং ইনশিয়া রহমান।রাতুল উঁকি দিলো। আকাশের বাহু ধরে ঝাকি দিলো।বিষ্ময়মাখা গলায় বোকার মতো বলে উঠলো, “অয়ন ভাই এটা কি করছে ভাই?”
“দেখতে পাচ্ছিস না?”

“পাচ্ছি তো।সেটাই তো সমস্যা। আমার চোখে তো ছানি পরেনি।ড্রিং ও করিনি।তাহলে ভুলভাল দেখছি কেনো। “

“ভুলভাল নয়।যা দেখছিস ঠিকই দেখছিস.”

“তার মানে তুই ও দেখছিস একই জিনিস।দুজন একসাথে পাগল হলাম কি করে বলতো।প্রিয়া তোর মাথা একেবারে খেয়েছে।”

আকাশ বিরক্তি তে চ সূচক শব্দ করলে।অবাক ও সেও হয়েছে।

“এই অয়ন ভাই কি জোর করে করছে ওটা?”

আকাশ ঘুরে দাড়ালো।রাতুল হা করে দেখছে এখনো।
“দেখে মনে হচ্ছে জোর করে করছে?”

“নাহ তো।আকাশ, অয়ন ভাই যে এতে রোমান্টিক বুঝিনি তো।”

“তুই বুঝবি কি করে!তোকে চুমু খাবে?চল ভিতরে চল।নির্লজ্জ এর মতো তাকিয়ে আছিস।”

“যাহ্ দুষ্টু।বড় ভাই এর এই সিন আর জীবনে দেখতে পাবো।দেখতে দে।এমন করিস না।”

রাতুলের পাগলামি তে আকাশ বিরক্ত হয়।ছেলেটা সবসময় ফাইজলামির মুডেই থাকে।একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে ভিতরে নিয়ে এলো রাতুল কে।

“যেভাবে দুজনই উহুম উহুম…বুঝলি আকাশ।আমি নিশ্চিত ওদের মিটমাট হয়ে গেছে।”
আকাশ কিছু বললো না।বুঝতে সেও পারছে।মনের ভিতর আলাদা শান্তি কাজ করলো।ভাইয়া টার পাগলপ্রায় ছিলো এতোগুলো বছর।সব ঠিক হবে এটা সে জানতো।সময় লাগবে এটাও জানতো।আজ একপ্রকার নিশ্চিন্ত হলো।

***

করিডরে পায়ের আওয়াজ পেতেই এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললো আকাশ।শিয়া আর অয়ন হেঁটে আসছে।আকাশকে দেখেই লাল মুখ আরও লাল হয়ে গেলো শিয়ার।আকাশ অবশ্য নির্বিকার রইলো।কিছুক্ষণ আগের হলিউড সিনেমার সাক্ষী যে সে সেটা মোটে বুঝতে দিলো না।স্বাভাবিক গলায় বললে,”প্রিয়া আমার রুমে।ঝড়ের সময় এসেছিলো।আমি রাতুল এর রুমে এসে পরেছি এ কারণে।ওকে ডাকার দরকার নেই।রুমে গিয়ে শুয়ে পরে।আমি এ রুমে শুয়ে পরছি।”
শিয়া হালকা মাথা নাড়লো।ঝটপট চলে গেলো নিজের রুমে।বাইয়ের দিকে তাকালো আকাশ।
“তুমিও গিয়ে শুয়ে পরো।কাল কথা হবে।”

বলেই রাতুল এর ঘরের ঢুকে গেলো।দরজা আটকাতে গিয়ে অয়ন এর দিকে তাকিয়ে বললো,”লিপস্টিক টা মুছে আসতে পারতে!প্রথমবার তো নয়।তাহলে এতে অসচেতন কেনো! পরের বার সতর্ক থেকো।অফিসে এমন হলে মানসম্মান এ টানাটানি না লাগে।”

মুচকি হেসে দরজা আটকে দিলো সে।অয়ন হতবিহ্বল হয়ে দাড়িয়ে আছে।ভাইযে বুঝে গেছে সবটা ধরতে পারলো।এক হাতে ঘাড় ডললো।হেসে ফেললো।শিয়ার দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, বাকা হেসে ঢুকে গেলো নিজের রুমে।

চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼🍂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here