পর্ব ৪৫🌼

0
33

[পর্ব ৪৫🌼]

_____” চা খাবেন রাতুল ভাই?”

রাতুল সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই এসেছে ছাদে। ওয়ার্ক আউট করতে। আকাশের সাথে জগিং এ যাওয়ার কথা থাকলেও তার ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় আকাশ রেখেই চলে গেছে। এরিন এসে দাড়িয়েছে পিছনেই। মেয়েটার প্রশ্নে সৌজন্য বজায় রেখে না করলো রাতুল।
_____”সকাল সকাল খালি পেটে চা কফি খাওয়ার অভ্যাস নেই এরিন।”

এরিন বোধহয় একটু মনঃক্ষুণ্নই হলো। সে নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়াবে বলে জিজ্ঞেস করতে এসেছিলো। তবে রাতুল মানা করে দেওয়ায় মন খারাপ হলো বেশ। রাতুল রেলিঙের ওপর থেকে তোয়ালে টা নিয়ে গলায় পেচালো।
_____”হাটাহাটি করতে এসেছো? করো করো।”

এরিন কিছু বলার আগেই রাতুল নেমে গেলো ছাদ থেকে। এরিন ও পিছু পিছু নেমে এলো। রাতুল রাত্তিরে ছিলো আকাশের ঘরে। অফিসের কিছু কাজ করছিলো রাত জেগে। এখন নিজের ঘরে আসতেই এরিন কে পিছনে দেখে খানিক থমকালো।
____”কিছু বলবে এরিন?”

____”না মানে তেমন কিছু না।”

____”ওহ্।”

রাতুল নিজের ঘরে চলে যেতেই গাল ফোলালো এরিন। লোকটা বোকা নাকি! যতবার তাদের বাড়িতে আসে ততবার সে পিছু পিছু ঘোরে। তাও টের পায় না! বোকা একটা মানুষ।

*
নতুন সকালের সূচনা হয়েছে ধরনীর বুকে। আজকে শিয়ার বউভাত। চৌধুরী বাড়িতে আলিশান আয়োজন করা হচ্ছে। শিয়ার পরিবার থেকে কম লোকজন আসলেও চৌধুরী দের আত্মীয়, সজন, কলিগ দের মহা সমারোহ লাগবো বোঝাই যাচ্ছে। ভোর ভোর উঠে বাকি সব আয়োজন সম্পন্ন করতে মহা ব্যাস্ত সকলেই। আকাশ জগিং থেকে এসে বসেছে বাবা চাচার সাথে এইসব নিয়ে কথাবার্তা বলতে।

রোদের ঝলমলে আলোয় আজকের দিনটা একদম ঝকঝকে। যথাসম্ভব প্রচন্ড গরম পরবে সারাটাদিন। সকাল সকালই রোদের যা তীব্রতা। ঘড়ির কাটায় সকাল সাড়ে সাতটা। শিয়ার যখন ঘুম ভাঙ্গলো ততক্ষণে অয়ন উঠে পরেছে। ফ্রেশ হয়ে জামাকাপড় পরছে একটুপর নিচে যাওয়ার জন্য। ব্য্যাথায় জর্জরিত শরীর নিয়ে উঠে বসলো শিয়া। এলোমেলো ভাবে একটা সুতির শাড়ি জড়ানো গায়ে। শাড়িটা রাত্রে অয়নই পরিয়ে দিয়েছিলো কাচা হাতে। আচল টেনেটুনে ঠিক করে উঠে বসতেই অয়ন এগিয়ে এলো। আলতো চুমু আকলো স্ত্রীর ললাটে।
_____”গুড মর্নিং মিসেস অয়ন মেহনাজ।”

হাসলো শিয়া। দু হাতে অয়নের গলা জড়িয়ে মিষ্টি চুমু আকলো অয়নের গালে।
_____”গুডমর্নিং হাসবেন্ড। “

অয়ন সটানে শুয়ে পরলো শিয়ার কোলের ওপর। শিয়া চুলে হাত গলিয়ে দিলো। অয়ন চোখবুঁজে নরম গলায় বললো,
____”ঘুম হয়েছে জান? এত জলদি উঠলে কেনো!”

____”আমার এতো বেলা অবধি ঘুমানোর অভ্যেস নেই। “

____”পেইন আছে?”

____”হালকা।”

____”ব্রেকফাস্ট করে আরেকটা পেইন কিলার নিয়ে নিয়ো কিন্তু। “

শিয়া অয়নের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
____”আমরা নিচে যাবো এখনি?”

____”সমস্যা নেই কোনো। আমাদের বাড়িতে ঘুম থেকে ওঠা নিয়ে কোনো প্রেশার নেই। সবে সাত টা সাড়ে সাতটা। ধীরেসুস্থেই বের হওয়া যাবে। তাছাড়া..।

শিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো অয়ন। ফিচেল গলায় বললো,
____”তোমার আমার জন্য আরও একটু ছাড় আছেই।”

লাজুক হাসলো শিয়া। এ অয়নকে ঠেলে সরিয়ে উঠতে চাইলো। অয়ন বাধ সাজলো। দু দিকে মাথা নেড়ে পরে রইলো কোলের ওপর।
____ “একটু পর জান। আর একটু থাকি।”

শিয়া মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। অয়ন শুয়ে আছে তার কোলে মাথা রেখে। এ রকম একটা সকালের স্বপ্ন সে আজীবন দেখিয়েছে। আজ সেটা বাস্তবে রুপ নিলো। কত বাঁধাই না আসলো তাদের জীবনে। সবকিছু পর এক হলো দুজনে।

____”অয়ন।”

____”হুম।”

____”আমার তোমার জীবনে আর কোনো অশুভ কিছু ঘটবে না বলো?”

____”খোদা এতকিছুর পরও যখন আলাদা করলেন না আমাদের। ভরসা রাখো তার ওপর।”

____”প্রিয়া আকাশ কে নিয়ে আমার অনেক ভয় হয়।”

____”আকাশ সবটা সামলে নেবে। ভয় পাচ্ছো কেনো! তাছাড়া আমাদের জীবনে যে ঝড় এসেছে আমাদের ভাই বোনের জীবনে সেসব কখনো না আসুক। খোদা রহম করুক সবসময় ওদের।”

*
আনিসুল সাহেব বেয়াই বাড়ি যাওয়ার জন্য উপহার সাজাতে ব্যাস্ত। এদিক থেকে যাবেই হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। তারা তিনজন, ওদিকে রিমির বাবা মা আর রিমি, তাছাড়া তার আর দুজন কলিগ। আত্মীয় সজন বলতে আপাতত তাদের এ কয়জনই।

প্রিয়া কাল থেকে ছটফট করছে আকাশের সাথে সামনাসামনি কথা বলার। মনটা অস্থির হয়ে আছে। সে অন্য জনের মুখের কথায় নিজের ভালোবাসার ওপর আঙুল তুলবে তা হয়না। শিয়া অয়নকে দেখেছে। ছোট্ট একটা ভুলবোঝাবুঝির জের থেকে বছরের পর বছর এর বিচ্ছেদ। কতগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেলো জীবন থেকে। একটাই জীবন। ভুলবোঝাবুঝি গুলোকে জিয়িয়ে রেখে সুন্দর মূহুর্ত গুলো নষ্ট করে ফেলার মতো বোকামি করার মানেই হয়না। তবুও। তবুও একবার নিজ মুখে সবটা শুনতে চায় সে আকাশের থেকে।

বাবা মা চলে যাবেন আর ছয় দিন পরই। সামনে মাস থেকে তার ইউনিভার্সিটির ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। আবার ফিরতে হবে কটেজে। বাবা মা চলে যাবে মনে করলেই মন খারাপ হয়ে আসে প্রিয়ার। এবার গেলে নিশ্চিত ভাবে সামনের দুই বছরের ফিরতে পারবে না।

বিছানায় গা এলিয়ে দিলো প্রিয়া। ঘুম ভাঙ্গার পর এখনো বিছানা ছাড়া হয়নি। এখনো গড়াগড়ি করছে বিছানায়। আপু ছাড়া ঘরটা ফাঁকা ফাকা লাগছে। মেয়েদের জীবন বোধহয় এরকমই। ছেড়ে যাওয়ায়ই নিয়তি। আজ বা কাল বাবার বাড়িঘর ছেড়ে যেতেই হয়।
রিমিদের চলে আসার কথা এতক্ষণে। আসেনি বোধহয়। অবশ্য এতো সকালে তো আর রওনা দেওয়া হচ্ছে না।

*

রিয়ান নিজের স্যুটকেস গুছিয়ে ফেলছে দেখে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো সৌমি। কাল শিয়ার বিয়ে থেকে আসার পর থেকেই কথাবার্তা তেমন একটা বলছে না রিয়ান। রাতে আলাদা রুমে গিয়ে শুয়েছে। এখনও সৌমির কোনো কথারই জবাব দিচ্ছে না। গায়ের নাইট ড্রেস এর সমানের ফিতে আলগা করে কোমড়ে হাত গুজে রিয়ান এর সামনে এসে দাড়ালো সৌমি। রিয়ান বিরক্ত মুখে তাকালো এক নজর।
____”আমাকে ইগনোর করছো! তাও তুমি!”

রিয়ান জবাব না দিয়ে স্যুটকেস টেনে দরজার সমানে রাখলো।। চেয়ার এর ওপরে রাখা শার্ট টা গায়ে জড়াতে জড়াতে বললো,
____”আমরা ঢাকা ব্যাক করছি আজকে। তৈরি হয়ে নাও।”

____”কি আশ্চর্য। এসেছি কয়েকটা দিন হলিডে স্পেন্ড করতে। একদিনেই ফিরে যাবো মানে!”

____”ফিরতে হবে। বোকার মতো এখানে পরে থেকে কাজ কি! “

____”ওখানে গিয়েই বা কাজ কি?”

____”কাজ অনেক। সারাদিন পুরুষ মানুষ বিছানায় তোলার চিন্তাভাবনা নিয়ে জীবন চলবে না। অবশ্য তোমার চললেও আমার চলবে না। আমার বাপের ক্ষমতায় আমি চলি না।আমার বাপের নেইই কিছু। নিজেকে দেখতে হয় নিজের সবকিছু। সুতরাং শুধু শুধু চব্বিশ ঘন্টা বেডে পরে থাকলে চলবে কেনো!”

সৌমি খিলখিল করে হেসে উঠলো। নাইট ড্রেসের এক পাশের কাধের ওপর থেকে নামিয়ে দিলো কিছুটা অংশ। দু হাতে রিয়ানের দু বাহুতে ধাক্কা দিয়ে ঠেকালো টিভি কেবিনেট টার সাথে। খোলা শার্টের অংশ সরিয়ে দিলো দুদিকে। নরম চুমু খেলো বুকের ওপর। আঙুল ছোয়ালো পুরুষালি চিবুকে।
____”চলবে না? আর একটু ডোজ বাড়ালে সব ভুলে যাবেন মিস্টার।”

দু হাতে সরিয়ে দিলো রিয়ান সৌমিকে। মেজাজ খারাপ হয় আজকাল মেয়েটা সামনে আসলে। এতদিন বুদ্ধিমতী ভাবলেও এখন স্পষ্ট টের পেয়েছে মেয়েটার মাথায় গোবর ছাড়া আর কিচ্ছু নেই

না হলে কোনো নারীই অন্য কাউকে ভালোবেসে অবলীলায় অন্য পুরুষের সাথে রাত কাটাতে পারে না। সে যতই তার কালচার হোক। পুরুষ মানুষ এর হিসেব করলে সেটা নরমাল লাগলেও, কোনো নারীর সাথে সেটা মোটেই যায়না। অবশ্য পুরুষ মানুষ এর সাথেও বিষয়টি যাবে কেনো!

সৌমি বেশ অপমানিত বোধ করলো এ যাত্রায়। তবে কিচ্ছু বললো না। রিয়ান শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে সেও এগিয়ে গেলো। তার সবকিছু গেছানোই রয়েছে। আসার পর কোথাও বের হওয়া হয়নি। বিধায় জামাকাপড় খুব একটা বের করেনি। ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে দুজন এসে বসলো গাড়িতে। সৌমি বাঁকা হেসে সানগ্লাস লাগালো চোখে।
____”এতো জীবনমুখি বাণি শুনিয়ে কি হলো বলোতো! সেই তো অন্যের গাড়িতেই চলাচল করতে হয়। এতদিনে সামান্য একটা গাড়ি কেনার যোগ্যতা টুকু হলো না কেনো বলোতো!”

রিয়ান কটমট করে তাকালো সৌমির দিকে। সৌমি হাসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। দুজনই কথা বলছে না সৌমি গাড়ির স্পিড বাড়ালো। রিয়ান তবুও ভাবলেশহীন।
____”রিয়ান। একটা কথা ভাবছিলাম জানোতো।”

রিয়ান জবাব দিলো না তার জবাব এর অপেক্ষায়ও নেই অবশ্য সৌমি। কন্ঠ বেশ নরম করে বললো,
_____”আই থিংক আকাশের চিন্তা আমার ছেড়ে দেওয়া উচিত। “

এবারে বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকালো রিয়ান সৌমির দিকে। সৌমির দৃষ্টি রাস্তায়।
____”হঠাৎ? “

সৌমির মুখে এক চিলতে বাঁকা হাসি দেখা গেলো
হেয়ালির সুরে বললো
____”তালে প্রিয়া আর আকাশ আলাদা হবে না।”

রিয়ানও বাঁকা হাসলো। ব্যাঙ্গ করে বললো,
____”আকাশ যে তোমার মতো মেয়ে বেডে নেবে না তা নিশ্চিত কবে হলে!”

সৌমি আশ্চর্যজনক ভাবে রাগলো না রিয়ান এর এ কথাতেও। শান্ত হলো বরং আরও। গাড়ির স্পিড নেমে এলো স্বাভাবিক এ।
____”নিজেকে আজ অবধি কখনো আর দশটা সংসারি নারীর জায়গায় কল্পনা করে দেখা হয়নি। স্বামী, সন্তান হাবিজাবি। এসব টিপিকাল মেয়েদের চিন্তাভাবনা মনে করতাম। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো টিপিকাল ওই জীবনই আদতে জীবন। খারাপ নয় অনূভুতি গুলো।”

রিয়ান এহেন হেয়ালি কথা ধরতে পারলো না। আর না তো কথা বারানোর রুচি হলো। আজকাল বড্ড অপরাধী ালগে নিজেকে। এক জনকে ভালোবেসে অন্য নারীদের স্পর্শ করছে প্রতিনিয়ত। তার প্রিয়া জানলে নিশ্চয়ই রাগ করবে তার ওপর!

*

রিসেপশনের জন্য শিয়াকে তৈরি করে নিয়ে এসে বসানো হয়েছে প্যান্ডেলে। ইনভাইটেট গেস্ট রা একে একে চলে আসছে প্রায় সকলে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। শিয়া বেশ উশখুশ করছে। বাবা মা এখনো এসে পৌছায়নি। তাদের দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। অয়ন আকাশ সকলে গেটের কাছে। অতিথি দের আপ্যায়নে ব্যাস্ত। পাশেই অয়নের বসার আসন করা হয়েছে। সেখানে অবশ্য এই মূহুর্তে আরশি বসে চকলেট খাচ্ছে। বাড়ির সকলে ছোটাছুটি করছে ব্যাস্ততায়।

কিছুক্ষণ এর মধ্যেই গেটের সামনে চোখে পরলো কাঙ্ক্ষিত মানুষ গুলোর মুখ। চকচক করে উঠলো শিয়ার চোখজোড়া। আরশিও দেখেছে।
____”বড়মউমনি। দেখো তোমার বাবা মা।”

শিয়া হাসলো আরশির কথায়। তাদের সাদরে ভিতরে নিয়ে এলেন আকাশের বাবা।

প্রিয়ার সাথে চোখাচোখি হলো গেটের সামনেই আকাশের। আকাশ নির্বিকার। কোনোরকমের উচ্ছাস দেখতে পাওয়া গেলো না। সবাই একেএকে গেলো শিয়ার কাছে।

রিমি আর প্রিয়া একসাথে। আরশি, এরিন আয়াত ও এসে যোগ দিয়েছে। আরাফ আজ আর ছোট মানুষ টি নেই। সে মহা ব্যাস্ততার সাথে কাজকর্মে সাহায্য করছে বাপ ভাইদের। প্রিয়ার চোখ আকাশকে খুজতে ব্যাস্ত। ফরমাল গেট আপে কি সুন্দরই না লাগছে লোকটাকে। ভাবতে ভাবতেই দেখা গেলো আকাশকে। হাতে একটা ট্যাব। কানে ব্লুটুথ স্পিকার গোজা। হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। পিছন পিছন অন্য একটা ট্যাব হাতে রাকিব ছুটছে তার পিছু পিছু। সম্ভবত আজকের দিনেও অফিসের কোনো ক্লায়েন্ট এর সাথে কথা বলতে হচ্ছে। সবাই গল্প গুজব করছে এই ফাঁকে চুপিচুপি উঠে গেলো পিছন দিয়ে প্রিয়া।

আকাশ আর রাকিব গার্ডেন এর এই পাশটার একটু ফাঁকা জায়গায় দাড়ানো। আকাশের পিছনে এসে প্রিয়া দাড়াতেই মৃদু হাসলো রাকিব। আকাশকে ইশারা করলো পিছনে দেখতে। আকাশ তাকালো বড্ড বিরক্তির সাথে। প্রিয়াকে দেখলো। মুখের ভঙ্গি খানিকটা স্বাভাবিক হলেও আবারও ব্যাস্ত হলো কথা বলায়। প্রিয়া হতভম্ব। আকাশ তাকে যেনো।দেখেও দেখলো না! এমনি তাকে আরেকদফা অবাক করে দিয়ে আর পিছন না ফিরেই প্রস্থান করলো। রাকিব নিজেও চমকেছে। হা করে একবার আকাশ আরেকবার প্রিয়ার দিকো তাকালো। প্রিয়া হা করে তাকিয়ে আছে। চোখেমুখে রাজ্যের বিষ্ময় যেনো। রাকিব নিজ থেকেই এগিয়ে এলো।
____”কিছু হয়েছে তোমাদের প্রিয়া?”

মাথা নাড়লো প্রিয়া। কি হবে তাদের! কাল তো ভালোমানুষ বিদায় নিয়ে আসলো। মন খারাপ তো তার ছিলো। আকাশকে দেখে তো সেরকম কিচ্ছু মনে হলো না কাল। অথচ আজ আসার পর থেকে ফিরেও দেখছে না তাকে। রাকিব বুঝলো প্রিয়ার মন খারাপ টা। নরম গলায় বললো,
____”আমাদের লন্ডন এর অফিসে কিছু ঝামেলা চলছে প্রিয়া। আকাশ খুবই ডিসটার্ব। হয়তো এ কারনেই কথা বললো না। রেগে আছে তো।”

প্রিয়ার সেটা মনে হলো না। অন্যের রাগ আকাশ কখনো তার ওপর দেখাবে না। এটা তার দৃঢ় বিশ্বাস। তবে রাকিব এর কথায় মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। রাকিব চলে যেতেই দেখতে পেলো রিমিকে। রিমি প্রিয়াকে এদিকে আসতে দেখেছিলো। অতিথি বাড়ি টা তো আদতে প্রিয়ার। সে খুব অকওয়ার্ড ফিল করছিলো ওদিকটায় প্রিয়াকে ছাড়া। প্রিয়া কে এভাবে পাথরের মতো দাড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলো।
____”কি রে! এখানে কি করিস! শিয়া আপু খুজছে তোকে।”

প্রিয়ার ধ্যান ভাঙ্গলো রিমির ধাক্কায়।
____”উনি আমার সাথে কথা বলছে না রিমি।”

____”আকাশ ভাইয়া?”

____”হু।”

____”কথা বলছে না কেনো! আমার সাথে তো খানিক আগেই কথা হলো। হেসে হেসেই তো কথা বললেন।”

____”আমার সাথে আসার পর থেকে একটা কথাও হয়নি।”

____”হয়তো সময় হয়ে ওঠেনি। মন খারাপ করিস না তো অযথা চল।”

*

প্রিয়া রা সকলে চৌধুরী বাড়ির ভিতরে এসেছে। রিমি একপ্রকার হা হয়ে আছে। এতো বড় বাড়ি এ জীবনে দেখেনি সে। একই ঘটনা অবশ্য প্রিয়ার সাথেও প্রযোজ্য। তবে সেসবে মন মন নেই তার। আচ্ছা ওই অপু নামের মেয়েটাকেও তো দেখতে পাচ্ছে না। রিমি উচ্ছাসে আকড়ে ধরলো প্রিয়ার হাতে।
____”দোস্ত এটা তোর শশুর বাড়ি হবে!ভাবা যায়। বাড়ি তো নয়। রাজপ্রাসাদ। “

প্রিয়া এসব কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। ব্যাস্ত চোখ চাতক পাখির মতো আকাশকে খুঁজে যাচ্ছে। প্রিয়া আর রিমিকে নিয়ে আরশি, আয়াত রা ছুটলো পুরো বাড়ি ঘুরে দেখাতে। দোতলায় বিশাল করিডর। নিচে তাকালে মনে হয় কোনো রাজপ্রাসাদ এর বৈঠক খানা ওটা। রিমি এবসর থাকতে না পেরে বলেই ফেললো,
____”তোমরা কি আগে জমিদার টমিদার ছিলে নাকি?

হেসে ফেললো আরশি। মাথা নাড়লো দুদিকে।
____”নাহতো।”

এরিন হাত ধরলো প্রিয়ার। টেনে নিয়ে গেলো একটা রুমের দিকে।
____”এসো তোমাকে ছোটদাদাভাই এর রুম দেখাই। যদিও কাউকে হুটহাট এলাও করেনা। তবে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি কিচ্ছু বলবে না।””

প্রিয়া মানা করলো না। সবাই মিলে আকাশের রুমে ঢুকলো। তবে ঢুকেই থমকে গেলো। অপু বিছানাপত্র গোছাচ্ছে। মেয়েটাকে এই ঘরে দেখেই ধক করে উঠলো প্রিয়ার বুক।
আরশি রাও ভ্রু কুচকে ফেললো। এরিন এগিয়ে গেলো সবার আগে।
____”তুমি এখানে কি করছো আপু।”

অপু একগাল হেসে নিজের কাজে মন দিলো। বালিশ গুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললো,
_____”রুমটা এলোমেলো হয়ে ছিলো। গোছাচ্ছিলাম।

আরশি বিরক্ত হলো খানিকটা। তার মামাতো বোন হলেও, আকাশের পিছু পিছু ঘুরঘুরটা বেশ খেয়াল করেছে।
____”ছোটদাদাভাই এই ঘরে কাউকে এলাও করেনা আপু। রেগে যায়।”

অপু আরশিদের সবার দিকে চোখ বুললাো। সোজা হয়ে বললো,
____”তোমরাও তো ঢুকেছো না বলে।”

____”আমরা তো সাহস পেলাম প্রিয়া আপু আছে বলে।”

প্রিয়ার নাম শুনে মুখ তুললো অপু। প্রিয়া আর রিমি কে দেখলো দাড়ানো ওদের পিছনে। সৌজন্যেের হাসি দিলো।
____”কখন এসেছো তোমরা?”

____”ঘন্টাদুয়েক হলো।”

____”ওহ্, চলো বাইরে গিয়ে কথা বলি। আকাশ আসলেই পছন্দ করে না এ ঘরে কাউকে।”

বলাবাহুল্য সত্যি সত্যিি প্রিয়াই সবার আগে বের হয়ে এলো। মেয়েটাকে আচমকাই অসহ্য লাগলো তার। কথাবার্তায় কেমন তীব্র অধিকারবোধ নিয়ে কথা বলে। আরশি,এরিন রাও পিছু পিছু এলো। বড়দের কথাবার্তায় ছোটদের থাকা একদম নিষেধ চৌধুরী বাড়িতে। সুতরাং আকাশের সাথে অপুর বিয়ে বা এ জাতীয় কোনো কথায় জানা নেই আরশিদের।

রিমি প্রিয়ার হাত ধরেই আছে। করিডরে এসে দারাতেই গলা নামিয়ে বললো,
____”মেয়েটা অসহ্যকর। কালকে তোদের বাড়ি গিয়েও আকাশ ভাইয়ার পিছন পিছন ঘুরঘুর করেছে। অসহ্য।”

রিয়ান এর কথাগুলো কানে এসে বাজছে প্রিয়ার। না চাইতেও ঘুরছে কথাগুলো। অপু, আরশি রা বেড়িয়ে এলো খানিকবাদেই।

প্রিয়া, রিমি বসে আছে আরশির ঘরে। আয়াত শাওয়ার নিচ্ছে। আরশি, এরিন গেছে খাবার আনতে। এতো এতো ভিড়ভাট্টার মধ্যে শান্তিতে খেতেই পারেনি তখন। তাছাড়া নিজেদের মতো গল্প গুজব করতে করতে খাবে। বিকেল গড়িয়েছে।
গতকাল রিয়ান এর বলা সব কথা শুনে থ মেরে বসে আছে রিমি। রাগে গা রি রি করছে তার। প্রিয়া এর পর আরও দু বার আকাশের সমানে পরেছে। আকাশ সত্যিই কথা বাড়ায় নি তার সাথে। রিমি একবার তো ডেকেই বসেছিলো। শুধুমাত্র ছোট্ট করে “পরে কথা বলি” জানিয়ে ছুটেছে। প্রিয়া ছলছল চোখে বসা। দুনিয়ার সব যুক্তি বাদ। আকাশ কেনো এমন করছে। তার অস্থির লাগছে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো অপু। ঘেমে নেয়ে একাকার যেনো।
এসি বাড়িয়ে এসে বসলো প্রিয়াদের সাথে।
____”বাকিরা?”

____”স্ন্যাকস্ আনতে গেলো।”

____”ওহ তাইতো বলি।”

____”তোমার পড়াশোনা শেষ আপু?”

____”মাস্টার্স ভর্তি হবো।”

রিমি সরু চোখে তাকিয়ে আছে। মুখের ওপর মেয়েটাকে কতগুলো কথা শুনিয়ে দিতে পারেলে। তা তো করা যাচ্ছে না ।

অপু একেরপর এক গল্প করেই যাচ্ছে। বেশরিভাগই এ বাড়ি, এ বাড়ির মানুষ জন এর সাথে তার স্মৃতি,। হাজার কথা। প্রিয়া বিরক্ত হচ্ছে। মেয়েটাকে যেখানে দেখতেই ইচ্ছে হচ্ছে না সেখানে এত বকবক সহ্য করা যায়। আকাশের সাথে কথা না বলা অবধি সব অসহ্যই লাগবে তার। এদিকে আরশি রাও আসছে না। ওরা আসলে তাও একটু ইজি লাগতো। অপু ক্রমাগত রঙচঙ মাখিয়ে গল্প শোনাতে ব্যাস্ত। আচমকা প্রিয়া বলে উঠলো,
____”আপনার সাথে আকাশ এর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে আপু?”

হুট করে এ কথায় চুপ হয়ে গেলো অপু। তবে খুশি হলো বেশ। তার মানে সবাই জানে এ কথা! একগাল হেসে বললো,
____”হ্যা। অনেক বছর…”

অপুর বাবার অনেক বছরের ইচ্ছে ছিলো এটা। চৌধুরী পরিবার থেকে কখনো সম্মতি পায়নি। তবে সেদিন আমিনা চৌধুরীর মুখে বিষয়টা শুনে অপু এই উত্তর দিলো প্রিয়াকে।

অপুর সহজ সরল স্বীকারোক্তি তে থমকালো প্রিয়া। পর মূহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
____”বিয়ে টা কবে হবে?”

অপু ঠোঁট উল্টালো। মুখটা খুশিতে চিকচিক করছে।
____”ছোট ফুপি বললো সেদিন, জলদিই কাবিন করে ফেলতে চায়। অয়ন ভাইয়ের বিয়ের সময়ই করার কথা ছিলো। বাবা জানে এখন।”

বুকের বা পাশে জ্বালা করছে প্রিয়ার। রিমি কটমট চোখে তাকিয়ে আছে অপুর দিকে। নেহাৎ প্রিয়ার চোখের ইশারায় চুপ করে আছে। না হলে…

প্রিয়া লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বললো,
___”আকাশ কি চায়?”

অপু যেনো অবাকই হলো প্রিয়ার এ কথায়৷ চায়না মানে কি! চায় বলেই নিশ্চয় হচ্ছে। তাছাড়া আকাশ যে জেদি প্রকৃতির। কেমন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো অপু।
____”তোমার মনে হয় আকাশ ভাইয়ার মতো মানুষ কে জোর করা যায়? রাজি না হলে সম্ভব ছিলো?”

____” আকাশ…”

প্রিয়া বারবার আকাশ কে নাম ধরে ডাকায় বিরক্তই হলো অপু। হাসি হাসি মুখে বিরক্তির ছায়া পরলো। প্রিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই কঠিন গলায় বলে উঠলো,
____” আকাশ ভাইয়া তোমার থেকে কমপক্ষে ১০ বছরের বড় প্রিয়া। নাম ধরে ডাকছো কেনো!”

প্রিয়ার কানে সেসব কথা বোধগম্য হলো কি না বোঝা গেলো না। মনে পরলো তখন সবার সমানে আকাশের ওকে এড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য। হু হু করে উঠলো বুক। অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,
___”ভুল হয়ে গেছে, বড্ড ভুল হয়ে গেছে…

.
.
চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼
.
.
#আকাশপ্রিয়া
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
.
.

[ আজকের পর্ব টা ছোট হলো তাইনা? সাথে এলোমেলোও।
গত রাতে লিখবো, একশবার কারেন্ট যায়। লিখতে পারিনা। তারপর ঘুম হয়নাই রাতে। দিনে মাথাব্যাথায় মরে যাচ্ছি। কি দিয়ে কি করলাম! বানান ভুল থাকতে পারে। মানিয়ে নেবেন। সামনের পর্বগুলো থেকে আর সমস্যা হবে না আশা করি। একদম গোছানো আর বড় পর্ব পাবেন ইনশাআল্লাহ ❤️🌷]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here