#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিমুলদের ঘরটি চারদিকে টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা এবং মেঝেটি ইটের তৈরি। এই বাড়িতে শিমুল আর তার মা ছাড়া কেউ থাকে না। শিমুলের বাবা মারা গেছেন অনেক বছর আগেই।
তাদের কিছুটা জমিজমা থাকায় তেমন কষ্ট করতে হয়নি। শিমুল বাড়িতে ঢুকেই জোরে হাঁক দিয়ে ডাকতে লাগল,
“আম্মা! ও আম্মা! কই তুমি?”
শিমুলের মা আছিয়া খাতুন তখন গরুকে ঘাস দিচ্ছিলেন। ছেলের ডাক শুনে তিনি ছেলের দিকে আসলেন। শিমুল হাতে থাকা বাক্সটি মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“দেখো আম্মা, তোমার লাইগা পিঠা আনছি।”
আছিয়া খাতুন পিঠার বাক্সটি হাতে নিয়ে বললেন, “কোত্থেকে আনলি? কে দিল?”
শিমুল হাতের গামছাটা বারান্দায় বাঁধা দড়িতে রাখতে রাখতে সংক্ষেপে উত্তর দিল,
“শিউলি দিছে।”
আছিয়া খাতুন দেখলেন শিউলি বাড়ির ভেতরেই ঢুকছে। শিউলিকে দেখেই আছিয়ার খাতুনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। শিউলি শিমুলকে দেখে বলল,
“শুনবা চাচি, তোমার ছেলের কীর্তি শুনবা?”
আছিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“কেন, আবার কী করল?”
“তোমার বোকা ছেলে নিজের জমি ফেলে রেখে অন্য মানুষের কাজ করে দিচ্ছিল।”
আছিয়া বেগম হতাশার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কী আর কই বল! গ্রামের মানুষ গুলো আমার পোলাটারে সরল-সোজা পাইয়া কেবল খাটিয়ে মারতে চায়। পোলাটারে কত করে বোঝাই, কিন্তু বোঝে না।”
আছিয়া খাতুন এবার শিমুলের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললেন,
“দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা গিয়ে গোসল করে আয়। ভাত দিচ্ছি।”
শিমুল ‘আচ্ছা’ বলে পুকুরে গোসল করতে চলে গেল।
আছিয়া শিউলিকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আজ কি কলেজে যাসনি?”
“হ, চাচি, গেছিলাম তো। টিফিনের সময় ছুটি নিয়ে চলে এসেছি। ভালো লাগছিল না তাই।”
“তাহলে তো মনে হয় এখনো কিছু খাসনি? তুইও শিমুলের সাথেই ভাত খেয়ে নে। শুঁটকি রান্না করছি, তোর প্রিয় তো!”
শিউলি হেসে বলল, “আচ্ছা চাচি। তুমি ভাত বাড়ো, শিমুল ভাই এলে তখন খাবো।”
এই বলে শিউলি বাড়ির পাশের পুকুরে গেল, যেখানে শিমুল গোসল করতে নেমেছে।
শিউলি পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখল, শিমুল ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে পানিতে ফুটবল ছুঁড়াছুঁড়ি খেলছে। শিউলি গিয়ে ঘাটে বসল এবং এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শিমুল ভাইয়ের ভেজা চুলগুলো কপালে মিশে আছে। মনে হয় অনেকদিন ধরে চুলগুলো কাটা হয়নি, তাই বেশ লম্বা লাগছে।
শিমুল সারাক্ষণ হাসে। হয়তো এই কারণেই তাকে একটু বোকা বোকা লাগে। তবে যখন মুখটা বন্ধ করে রাখে, তখন তাকে কোনো সিনেমার নায়কের চেয়েও কম লাগে না।
হঠাৎ করেই শিউলি সাত বছর আগের এক ঘটনার কথা ভাবল।
সেদিন ছিল মেঘলা দিন। বাচ্চাদের সাথে খেলা করতে করতে শিউলি পুকুরঘাটে এসেছিল নিজের পা ধুতে। কিন্তু পিছলে খেয়ে সে সোজা পানিতে পড়ে যায়। বর্ষার কারণে পুকুর পানিতে কানায় কানায় ভরা ছিল। শিউলি একবার পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, তো পরক্ষণেই ভেসে উঠছে। এই বুঝি তার প্রাণ যায় অবস্থা! ঠিক সেই সময় শিমুল যমদূতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে শিউলিকে তুলে এনেছিল।
কিন্তু এই মহৎ কাজের জন্য শিমুল ভাইয়ের কপালে পুরস্কার জোটেনি, জুটেছিল লাঠির আঘাত।
শিউলির বাবা ইদ্রিস খন্দকার ভুল বুঝেছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন শিমুলই হয়তো শিউলিকে পানিতে ধাক্কা দিয়েছে। সেই ভুল ধারণায় সেদিন এই পুকুরঘাটেই মাটিতে ফেলে শিমুলকে মেরেছিলেন তিনি। শিউলি সেদিন শুধু বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। সে তখন কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিল না। আজও তার কানে বাজে সেদিনের সেই চিৎকার,তার শিমুল ভাইয়ের চিৎকার।
শিমুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকেই শিউলি সেই পুরনো ঘটনা ভাবতে থাকে।যখন থেকে শিউলি বুঝতে শিখেছে ভালোবাসা কী, সেই দিন থেকেই শিমুল তার ভালোবাসার মানুষে পরিণত হয়েছে।
পানির ছিটায় শিউলির ধ্যান ভাঙল। শিমুল তখনো ছোটদের সাথে খেলা করে যাচ্ছে। শিউলি এবার ডাকল,
“শিমুল ভাই, এবার উঠে আসো। চাচি তোমাকে ডাকছেন।”
শিমুল এবার পানিতে ডুব দিয়ে উঠে এলো। শিউলিকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শিমুল কিছুটা লজ্জায় পড়ে গেল। সে গামছা শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছস কেন, আমার শরম লাগে।”
শিউলি মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে নিল।
বাড়িতে গিয়ে শিউলি আর শিমুলকে একসাথে খেতে দিলেন আছিয়া বেগম। শিউলি ভাত মুখে নিয়েই বলল,
“উফফ, চাচি! তোমার হাতের রান্না এত মজা! বিশেষ করে এই শুঁটকি মাছ।”
আছিয়া বেগম হেসে বললেন, “হইছে এবার খা। এত প্রশংসা করতে হইব না।”
আরেকটা লোকমা মুখে দিতে দিতে শিউলি প্রশ্ন করল, “আচ্ছা চাচি, শিমুল ভাইকে বিয়ে করাবে না?”
আছিয়া বেগমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। হতাশার শ্বাস নিয়ে বললেন,
“ইচ্ছে তো হয় ছেলেটাকে বিয়ে করাতে, কিন্তু গ্রামের কেউ তো বিয়ে দিতেই চায় না। সবাই শুধু কয় ছেলেটা বোকা। যদি একটা মেয়ে পেতাম, তাহলে বিয়েটা করিয়ে ফেলতাম।”
শিউলি মুচকি হেসে বলল,
“আশেপাশে কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে। তাদের সাথে শিমুল ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেই তো পারো।”
শিউলির কথার আসল অর্থ হয়তো বুঝতে পারলেন না আছিয়া খাতুন। তিনি বললেন,
“কার কথা কইতাছোস? পাশের বাড়ির কুলসুমের কথা কইতাছোস? ওই মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়া দিয়া আমি কালসাপ ঘরে আনতে পারতাম না। যেভাবে ঝগড়া করে ওই মেয়ে! আর চরিত্রও তো ভালা না।”
শিউলির খাওয়া এতক্ষণে শেষ। থালায় পানি ঢালতে ঢালতে সে বলল,
“আমি কুলসুমের কথা বলিনি। ভালো করে আশপাশে নজর দাও, অনেক ভালো মেয়ে পেয়ে যাবে।”
বলেই শিউলি উঠে দাঁড়াল। নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। শিমুলদের বাড়ি থেকেই শিউলিদের বাড়ি দেখা যায়। সামান্য রাস্তাটা পার হলেই তাদের বাড়ি। শিউলিদের বাড়িটি ভীষণ বড় করে এবং খুব সুন্দর নকশা করে তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি বিশাল ইটের তৈরি ঘর।
শিউলিদের দুই বোন। শিউলি সবার বড় ছোট বোনটির বয়স আট। শিউলির মা হলেন জাবেদা এবং বাবা হলেন ইদ্রিস খন্দকার।
শিউলিদের পরিবারটি খুবই সুখী এবং সচ্ছল। ছোটবেলা থেকে এই পর্যন্ত তাদের জীবনে কোনো কিছুর অভাব হয়নি, কখনো কোনো কষ্ট করতে হয়নি। তারা গ্রামের সবচেয়ে সচ্ছল পরিবার। বাবা মেম্বার হওয়ায় টাকার অভাব নেই। তবে অভাব শুধু বাবার সততার।
শিউলি বুঝতে পারে, দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারিভাবে যত সহযোগিতা আসে, তার বেশিরভাগ অর্থই তার বাবার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। কিন্তু হাজার হলেও তো তিনি পিতা। তাই সব কিছু দেখে শুনেও চোখ বন্ধ করে থাকা ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকে না।
তখন বিকেল গড়িয়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণ পরই রান্না শুরু হবে। শিউলির অবশ্য কোনো কাজই করতে হয় না। বাড়িতে দুজন গৃহকর্মী লোক আছে, আর তার মা তারা মিলেই সব সামলে নেন।
শিউলি তার ছোট বোন ফুলঝুরিকে পড়াচ্ছে। বাচ্চা মেয়েটা এবার নার্সারিতে উঠেছে। ছোট মানুষ, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যায়। সেই কারণেই শিউলি বিকেলে জোর করে তাকে পড়তে বসায়। তার সাথে শিউলি নিজেও একটু-আধটু পড়ে নেয়।
শিউলি পড়াশোনায় ভীষণ ভালো, ক্লাসের টপার।
ঠিক তখন সেখানে শিউলির মা জাবেদা বেগম এলেন। তিনি এসে বললেন,
“শিউলি, তোর আব্বা কইছিল শাপলার লতি দিয়া চিংড়ি খাইবো। কাজের ছেলেটাও বাজারে গেছে। তুই গিয়া নিয়া আয়।”
শিউলি বলল, “আমি একা যাব?”
“আমি যাব আপা,” ফুলঝুরি উত্তেজিত গলায় বলে উঠল।
শিউলি তার বোনের মাথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“তোকে নিয়ে গিয়ে আমার লাভ কী? তোকে নিলে উল্টে আমার চিন্তা বাড়বে।”
বোনের কথায় ছোট মেয়েটি মুখ ফুলিয়ে অভিমান করল।
এবার জাবেদা বেগম বললেন,
“তাহলে তুই শিমুলকে বলবি এনে দিতে।”
শিউলি তার মায়ের কথায় খুশি হয়ে হাসল। এই সুযোগে শিমুল ভাইয়ের সাথে আলাদা সময় কাটাতে পারবে ভেবেই তার ভালো লাগল। শিউলি দ্রুত বেরিয়ে গেল। ফুলঝুরিও তার সাথে যাওয়ার জন্য কাঁদতে শুরু করল, কিন্তু জাবেদা বেগম তাকে ধরে রাখলেন।
শিউলি বিলের পাশের মাঠের কাছে গেল। কারণ সে জানত, শিমুলকে এই বিকেলে সেখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে।
মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। আর শিমুল একপাশে বসে বসে তাদের খেলা দেখছে আর বারবার হাততালি দিচ্ছে। ছেলেটা ফুটবল খেলতে ভয় পায়। একবার খেলতে গিয়ে পায়ে ভীষণ ব্যথা পেয়েছিল, সেই থেকে আর ফুটবল খেলে না।
শিউলি শিমুলকে ডেকে এনে বলল যে তাকে নিয়ে বিলে যেতে হবে শাপলা তোলার জন্য। শিমুল এক কথায় রাজি হয়ে গেল।
শিমুল তার নিজের ছোট ডিঙিতে বসল, শিউলিও বসল তার সাথে। এই নৌকাটি মূলত গরুর জন্য ঘাস কাটার কাজে ব্যবহার করা হয়।
শিমুল নৌকার সামনের দিকে বসে নৌকা চালাচ্ছে, আর শিউলি নৌকার মাঝে বসে এক দৃষ্টিতে শিমুলের দিকে তাকিয়ে আছে।
শিউলি বলল,
“শিমুল ভাই, তোমার সাথে এভাবে সারাজীবন নৌকায় ঘুরতে চাই।”
শিউলির কথায় শিমুল শুধু হাসল, আর কোনো কথা বলল না। শিউলি আবারও আবদার করল,
“বলো না, এভাবে নৌকায় ঘুরাবে তো?”
“তোর বিয়া হইয়া গেলে তো জামাই বাড়ি চইলা যাইবি, তখন কেমনে ঘুরাব? তোর জামাই তোরে ঘুরতে নিয়া যাইবে,” শিমুল সরল-সহজ গলায় বলল।
শিউলি আবারও হাসল, তবে এই হাসিতে ছিল চাপা গভীরতা। সে বলল,
“আমার জীবনে স্বামী হিসেবে শুধু তোমার নামই লেখা হোক। অন্য কারো হওয়ার আগে আমার মৃত্যু কবুল হোক।”
শিউলির কথাটা আবেগপূর্ণ সহজ সরল ভাষায় হলেও, শিমুলের পক্ষে তার অর্থ বোঝা কঠিন। শিমুল শিউলির কথা বুঝল কিনা, তা বোঝা গেল না। ছেলেটা শুধু তার চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী হেসে দিল।
শিউলির মাঝে মাঝে ভীষণ মন খারাপ হয়। কেন তার প্রিয় শিমুল ভাই অন্য সব প্রেমিকদের মতো তার মনের কথা বুঝতে পারে না? কেন সে অন্য সব প্রেমিকের মতো প্রেমিকার মন জয় করতে চায় না?
শিউলি নিজেও জানে, তার মনের আশা এত সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তার মনের মানুষটি যে অন্য সবার মতো নয়। সে তো অনেকবারই স্পষ্ট ভাবেই ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছে, কিন্তু শিমুল বরাবরই তা বুঝতে অক্ষম।
#চলবে

