বসন্তের_ঝরা_ফুল #পর্ব-৩

0
32

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব-৩
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
ঋতুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর হলো বসন্তকাল। কিন্তু মানুষ শীতকালকে কেন পছন্দের ঋতু বলে, কে জানে! বসন্তকালে হালকা ঠান্ডা ভাব থাকে, আবার হালকা গরমও লাগে সব মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশ তৈরি হয়। চারদিক ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করে। তবুও মানুষ বলবে তাদের শীতকাল পছন্দ, অথচ শীতকালে তারাই থরথর করে কাঁপে আর বলে, শীত কবে যাবে।

​শিউলি সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ হাতে নিয়ে বাড়ির পেছনে এসে সুপারি গাছে বাঁধা দড়ির দোলনায় বসে এইসব ভাবছিল।
​তার থেকে একটু দূরেই একটি শিউলি গাছ। সেই ফুলের তীব্র গন্ধ তার নাকে এসে পৌঁছাচ্ছে। শিউলি যেদিন জন্মেছিল, সেদিন নাকি গাছটিতে প্রথম ফুল ফুটেছিল। সেই দেখে তার মা মেয়ের নাম রেখেছিলেন শিউলি।

​দোলনায় বসা অবস্থায় শিউলি শিমুলদের বাড়ির দিকে নজর দিল। এখান থেকে বেশ কিছুটা দূরেই শিমুলদের ঘর। মাঝখানে অনেকগুলো গাছ রয়েছে,বিভিন্ন রকম ফলের গাছ এবং মেহগনি গাছ বেশি। এরপরই একটা হাঁটাচলার রাস্তা, আর রাস্তার ওপারেই শিমুলদের ঘর। বসা জায়গা থেকেই শিমুলদের ঘরের জানালা দেখা যায়, তবে ভেতরের কিছু দেখা যায় না।

শিউলির মা জাবেদা বেগমের ডাকে শিউলি বাড়ির ভেতর ঢুকল। উঠোনের একদিকে বড় করে টিনের তৈরি রান্নাঘর, আর তার থেকে খানিকটা দূরেই গোয়াল ঘর।
​জাবেদা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে রাগী কণ্ঠে বললেন,
“কয়টা বাজে দেখেছিস? কোচিং-এ যেতে হবে না!”

​মায়ের কথায় শিউলির মনে পড়ল যে তার কোচিং আছে। ঘরে দৌড়ে গিয়ে দেখল সাতটা ত্রিশ বেজে গেছে। কোচিং শুরু হবে ঠিক আটটার সময়। বাড়ি থেকে কোচিং পর্যন্ত যেতে প্রায় বিশ-পঁচিশ মিনিট লেগে যায়।
​শিউলি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। ভাত খেতে তার মন চাইছিল না, কিন্তু জাবেদা বেগম জোর করে কয়েক লোকমা মুখে দিয়ে তাকে খাইয়ে দিলেন।
★★★
বৃষ্টি কলেজের ক্লাসরুমে ঢুকেই দেখল পুরো ঘরটা খালি। শুধু মাত্র পেছনের একটা টেবিলের উপর মাথা রেখে বসে আছে শিউলি। কলেজে এখনো কোনো ছাত্র-ছাত্রী আসেনি। ক্লাস শুরু হয় সকাল সাড়ে দশটার দিকে, আর এখন বাজে মাত্র সাড়ে আটটা।
​বৃষ্টি কৌতূহলবশত শিউলির কাছে গেল। শিউলিকে ডাকল, কিন্তু সে মাথা তুলল না। শুধু অস্পষ্টভাবে বলল, “হুঁ, বল।”
​বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল,
“আজ কোচিং-এ আসিসনি কেন? আজ স্যার পরীক্ষার জন্য সাজেশন দিয়ে দিয়েছিলেন।”

​তবুও শিউলি মাথা তুলল না। বৃষ্টি এবার বলল,
“কী হয়েছেটা কী তোর? মাথা তোল!”

​শিউলি এবার মাথা তুলল। বৃষ্টি শিউলির মুখের দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল। সে জিজ্ঞেস করল,
“এসব কী, শিউলি? তুই কাঁদছিস?”

​শিউলি নিজের মুখ দুই হাতের তালু দিয়ে মুছে নিল। “কই, না তো।”
​বৃষ্টি এবার জোর দিয়ে বলল,
“কী হয়েছে শিউলি? তুই তো কোচিং বন্ধ দেওয়ার মেয়ে নোস। আর আজ এত তাড়াতাড়ি চলে এলি কলেজে?”

​শিউলি প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও, বৃষ্টি তাকে জোর করতে লাগল।

‘শিউলি রাস্তা দিয়ে আসছিল। সকালের সময় হওয়ায় রাস্তায় তেমন মানুষের আনাগোনা নেই। হঠাৎ শিউলি পেছনে কারো পদশব্দ শুনতে পেল। শিউলি পেছনে ফিরল। দেখল তার ঠিক পেছনে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হেঁটে আসছে তামিম ইকবাল।
​শিউলি কিছুটা ঘাবড়ে গেল। তামিমের ঠোঁটে একটি সিগারেট, আর মুখে বিশ্রী হাসি। শিউলি দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। এবার তামিম একদম শিউলির পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
​এতটুকু পর্যন্ত শিউলি সহ্য করেছিল, কিন্তু পরক্ষণেই তামিম নিজের সীমা পেরিয়ে শিউলির হাত চেপে ধরল।
​শিউলি এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সজোরে তামিমের গালে চড় মেরে বসল। শিউলির রাগে শরীর কাঁপছিল।
“প্রতিদিন বিরক্ত করিস, সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু শরীরে স্পর্শ করলে ছেড়ে দেব না!”

​তামিমের চোখ দুটো থেকে যেন আগুন বের হচ্ছিল। তামিম মুখ দিয়ে বিশ্রী গালি দিয়ে একটি ছোট চাকু বের করে শিউলির গলায় ধরল। শিউলি ভয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
​তামিম দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই আমার গালে হাত দিয়েছিস! আমার গালে? তুই তামিম ইকবালের গালে হাত দিয়ে খুব বড় ভুল করেছিস, খুব বড়!”

ছেলেটা এই বলে আবারও ছুরি নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। শিউলি হাফ ছেড়ে বাঁচল। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছিল।
​তামিম শিউলির একদম কাছে এসে দাঁড়াল। শিউলি ভয়ে দু’কদম পিছিয়ে গেল। হঠাৎ তামিম অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তারপর নিজের হাসি থামিয়ে আবারও চোখ-মুখ রাগে লাল করে বলল,
“কী ভেবেছো, সুইটহার্ট? তোমাকে মেরে দেব? না, না! তোমাকে এভাবে মারলে তো হবে না। তোমাকে তিলে তিলে মারব। হাজার হোক, ভালোবাসি তো নাকি!”

​কথাটা বলেই সে আবারও অট্টহাসিতে মেতে উঠল। শিউলির কাছে মনে হলো, এই লোকটা হয়তো একটা মানসিক রোগী। শিউলি একপ্রকার দৌড়েই সেখান থেকে চলে এলো। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।

​ঘটনাটা বলেই শিউলি কেঁদে উঠল। বৃষ্টি বেশ অবাক হলো, কারণ জীবনে যত ঝড়ই আসুক না কেন, শিউলি এভাবে ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। প্রাইমারি স্কুল থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করছে বিধায় শিউলির ব্যাপারে সব জানে বৃষ্টি। বৃষ্টি কৌতূহল চেপে না রেখে বলল,
​“তুই এই সামান্য ঘটনার জন্য ভয়ে কাঁদছিস?”

​“না…”

​বৃষ্টি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “তাহলে কেন?”

​“সেই দৃশ্যটা আরেকজন মানুষ দেখছিল। সে হলো শিমুল ভাই। কিন্তু শিমুল ভাই আমাকে এই অবস্থায় দেখেও চলে গেল, কিছুই বলল না। লোকটা হাসতে হাসতে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলল ‘শিউলি, তুইও প্রেম করিস!’-”
​এই কথা বলেই শিউলি আবারও কেঁদে উঠল।

বৃষ্টি এবার রাগী কণ্ঠে বলল,
“চলে যাবে না তো কী করবে তোর শিমুল ভাই? তুই কি শিমুলকে সিনেমার হিরো মনে করিস? যে তোকে ভিলেনের থেকে বাঁচাবে? তোকে আগেই বলেছিলাম, এমন একটা ছেলের প্রতি নিজের আবেগ দিস না যে ছেলেটা একটা বোকার হদ্দ। যে ছেলে ভালো-মন্দ কিছু বোঝে না।”

​শিউলিও তো জানে যে তার শিমুল ভাই এসব কিছু বোঝে না। তবুও মেয়েটা চরম অভিমান করেছে। শিউলি বলল,
“তখন শিমুল ভাইকে দেখে আমি ভেবেছিলাম হয়তো সে এসে তামিমের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করবে, কিন্তু…”

​পরের কথাগুলো কান্নার জন্য আর বোঝা গেল না। বৃষ্টি এবার রেগে টেবিল থেকে উঠে গেল। সে বলল,
“তুই থাক তোর শিমুল ভাইকে নিয়ে। শিমুলের জন্য কেঁদে নিজেকে উজাড় করে দে। আমি যাই, আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করি। আর হ্যাঁ, আমার বয়ফ্রেন্ড তোর শিমুল ভাইয়ের মতো হাঁদারাম না। সে ভালোবাসা বোঝে।”
​শেষের কথাগুলো বৃষ্টি ইচ্ছে করেই শিউলিকে খোঁচা দেওয়ার জন্য বলল।

শিউলি নিজের চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
​বাইরে বের হতেই দেখল, বারান্দার এক কোণায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি আর তার বয়ফ্রেন্ড শফিক কথা বলছে।
​শফিককে কোনো কালেই পছন্দ নয় শিউলির। শফিকের চেহারা সুন্দর, কিন্তু তার চরিত্র যে এতটা ভালো নয়, তা শিউলি জানে। বৃষ্টির সাথে সম্পর্কে জড়ানোর আগেও সে শিউলিকে প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু শিউলি তা গ্রহণ করেনি। এমনকি বৃষ্টির সাথে প্রেম চলাকালীনও সে আবারও শিউলিকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু শিউলি সেই কথা বৃষ্টিকে বলেনি, বললে হয়তো বৃষ্টি তাকে ভুল ভাববে।
​এইসব মনে মনে ভাবতে ভাবতে শিউলি পথ চলতে শুরু করল।
​“রূপ-গুণ দেখেই কি শুধু ভালোবাসা হয়?” নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল শিউলি। “তাহলে আমি কেন শিমুল ভাইকে ভালোবাসলাম? কোনো গুণ তো শিমুল ভাইয়ের মাঝে নেই।”
​এরপর নিজেই তার উত্তর দিল,
“না, ভালোবাসা কখনো রূপ দেখে হয় না। ভালোবাসা হয় অন্তর দিয়ে। এটাই শিমুলের জন্য কাজ করে।”

শিমুল একটা আম গাছের তলায় বসে আছে। এখানে বাঁশের তৈরি একটা বসার জায়গা রয়েছে, সেখানেই সে বসে ছিল। তখন তার নজর গেল শিউলির দিকে। শিউলি তাকে অতিক্রম করে সোজা চলে গেল।
​শিমুল ঠোঁট উল্টিয়ে তাকিয়ে রইল। তার অবুঝ হৃদয়ে প্রশ্ন উঁকি দিল শিউলি চলে গেল কেন? শিউলি তাকে দেখে তো কথা না বলে যেত না, তাহলে আজ কী হলো?
​শিমুল উঠে দাঁড়াল। লুঙ্গির নিচের অংশটা এক হাতে ধরে দৌড়ে গেল। কিন্তু তবুও শিউলি দাঁড়াল না। শিমুল প্রশ্ন করল,
​“শিউলি, আমারে তুই দেখছ নাই?”

​শিউলি কথা বলল না। শিমুল আবারও প্রশ্ন করল,
“তুই আমার লগে কথা বলবি না? রাগ করছোস?”

​শিউলি অবাক হয়ে আড়চোখে তাকাল শিমুলের দিকে। ছেলেটার মধ্যে এই প্রথম হালকা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল। শিউলি রাগী কণ্ঠে বলল,
“তুমি আমার সাথে আর কখনো কথা বলবে না। আমিও তোমার সাথে আর কথা বলব না।”

​শিমুল কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কেন? আমি কী করছি? আমি ভুল করছি কোনো? তোর লগে কথা না বললে যে আমার দুক্ক লাগে।”

এবার শিমুলের মধ্যে সর্বোচ্চ অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেল। শিউলির মনে আশার আলো জাগল তার মানে কি শিমুল ভাইও তাকে নিয়ে ভাবে? তার উপস্থিতি কামনা করে?
​এই ভেবেই শিউলির মনে হাসি ফুটল। জীবনে অনেক কিছু আছে, যেগুলো আমরা মনে মনে কল্পনা করেই সুখী থাকি। শিউলির ক্ষেত্রেও তাই হলো।

​শিউলি এবার অভিমানের সুরে বলল,
“সকালে তুমি দেখলে তামিম নামের ছেলেটা আমার রাস্তা আটকে আমাকে বিরক্ত করছে, তুমি তবুও কিছু কেন বললে না শিমুল ভাই?”

​শিমুল নিজের মাথায় চুলকিয়ে কিছু মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“কই! আমি তো বুঝি নাই তোরে ওই ছেলে বিরক্ত করতাছে?”

এতটুকু সময়ে যতটুকু আশা জেগেছিল শিউলির মনে তা ততক্ষণাত নিবে গেল।কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল তার প্রিয় শিমুল ভাইয়ের দিকে।শিউলি এবার কাঁপা কন্ঠে বলল,
“হ্যা তোমাকে বুঝতে হবে না।আর আমিই বা কি করে আশা করি তুমি বুঝবে!?যে লোকটা সাতটা বছরে কিছু বুঝতে পারলো না,সে আজ সব বুঝে যাবে সেটা আশা করাও বোকামো।”

শিউলি দ্রুত হাঁটা শুরু করল।শিমুল একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।শুধু তাকিয়ে রইল শিউলির যাওয়ার দিকে।এবারও হয়তো কিছু বোঝতে পারল না।

#চলবে…
(আমি আশাহত হয় গল্পের রিয়েক্ট দেখে।আমি কি এতটাই খারপ লিখি?হয়তো তাই!এই গল্প জগৎ অনেক আগেই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু সবার জীবনে এক জন শুভাকাঙ্ক্ষী থাকে আমার জীবনেও আছে তাই হয়তো চাইলেই গল্প জগৎ ছাড়তে পারি না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here