#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৪
লেখনীতে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিউলি থরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। স্বপ্ন দেখেই তার ঘুম ভেঙে গেছে। সে বিছানায় বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। রুমের সব আলো বন্ধ।
হাত দিয়ে খুঁজে সে বাটন মোবাইলটি বের করল। মোবাইলটি তার মায়ের, মাঝে মাঝে রাতে কাছে নিয়ে ঘুমায়।শিউলি স্বপ্ন দেখেছে সে শিমুল ভাইয়ের বউ হয়ে তাদের ঘরে ঢুকছে। স্বপ্নটা মনে পড়তেই শিউলির মুখে হাসি ফুটে উঠল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত তিনটা বেজে চল্লিশ মিনিট। ফজরের আজান দিতে আরও অনেকক্ষণ বাকি।
তার ভীষণ মন চাইছে শিমুল ভাইকে এক নজর দেখে আসতে। আবার মনে মনে ভাবছে, এখন যাওয়া ঠিক হবে কি না। তবে সে তার মনের কথাকেই প্রশ্রয় দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওড়নাটা মাথায় সুন্দর করে জড়িয়ে নিল। তারপর টেবিলের ওপর থেকে হারিকেনে আগুন ধরাল। এই হারিকেনটি অনেক পুরোনো যুগের, জং ধরা। মাঝে মাঝে এটি ব্যবহার করা হয়।
শিউলি খুবই শান্ত পায়ে ঘর থেকে বের হতে লাগল। পাশের রুমেই তার আব্বা-আম্মা থাকেন। ফুলঝুরি মাঝে মাঝে তার আব্বা-আম্মার সাথে, আবার মাঝে মাঝে শিউলির সাথে ঘুমায়। কিন্তু আজ সে তার আব্বা-আম্মার সাথেই ঘুমিয়েছে।
শিউলি বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে তখন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। অন্য সময় হলে শিউলি হয়তো ভয় পেত, তবে এখন তার মনে কোনো ভয় কাজ করছে না। শিমুল ভাইকে এক ঝলক দেখার ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে মেয়েটার। এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা কোনো ভয়কে কাবু করতে পারবে না।
সাবধানতার সাথে শিউলি পৌঁছে গেল শিমুলদের বাড়িতে। এখান থেকে শিমুলদের বাড়ি যেতে তার মাত্র দুই মিনিট সময় লাগে।
টিনের তৈরি ঘরটায় কাঠের তৈরি জানালা। শিউলি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। টুক টুক করে শব্দ করল সেখানে। কিন্তু শিমুল ভাইয়ের কোনো সাড়া শব্দ নেই। শিউলি এবার মৃদু স্বরে ডাকল,
“শিমুল ভাই, ও শিমুল ভাই!”
সাথে সাথেই জানালা খোলার আওয়াজ হলো। জানালা দিয়ে শিমুল ভাই উঁকি দিলেন। শিউলির হাতে ধরা হারিকেনের আলোয় শিমুল ভাইয়ের হালকা কুচকুচে দাঁড়িওয়ালা মুখটি দেখা গেল। একবার ডাকতেই শিমুল ভাই জানালা খুললেন, তার মানে হয়তো শিমুল জাগ্রতই ছিলেন।
শিমুল অবাক কণ্ঠে বলল,
“শিউলি! তুই এইহানে কী করস?”
“তুমি আগে বাইরে আসো, তারপর বলছি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিমুল বাইরে বেরিয়ে এলো। শিমুল এসেই জিজ্ঞেস করল,
“এত রাতে কী করস এইহানে? আমারে ডাকস ক্যান?”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের হাত ধরে কিছুটা দূরে পুকুরের সামনে রাখা একটা বড় গাছের গুঁড়ির ওপরে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ এভাবেই বসে রইল। ঠাণ্ডা হাওয়া এসে তাদের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে।পাশে রাখা হারিকেন।
শিমুল শিউলির দিকে তাকাল। ওড়নার আড়াল থেকে তার চুলগুলো বাতাসে এসে কপালে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ শিমুল শিউলির দিকে তাকিয়ে থেকেই বোকার মতো হেসে দিল। শিমুলের হাসি টের পেয়ে শিউলিও শিমুলের দিকে তাকাল। লোকটাকে হাসতে দেখে ভীষণ সুন্দর লাগে। শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“শিমুল ভাই, হাসছো কেন?”
শিমুল বলল,
“তোরে ভীষণ সুন্দর লাগতাছে। ওই যে দেখ, আকাশের চাঁদটার চাইতেও তোরে সুন্দর দেহা যায়।”
শিউলি শিমুলের আঙুল অনুসরণ করে চাঁদের দিকে তাকাল। এই প্রথম শিমুল ভাই নিজ থেকে তার প্রশংসা করলেন। শিউলির হাসি-খুশি মনটা আরও আনন্দপূর্ণ হয়ে উঠল। এর চাইতে সুখ যে আর কিছু নেই।
শিউলি এবার আবদার করে বসল,
“শিমুল ভাই, একটা গান শোনাবে?”
“এই রাইতে! না না, আরেকদিন,” শিমুল না করে দিল।
শিউলি বলল, “আচ্ছা, তাহলে আমি শোনাই। শুনবা?”
শিমুল বলল,
“হ, ক্যান শুনতাম না?”
শিউলি নিজের গলা খাঁকারি দিয়ে গান ধরল শিমুলের দিকে তাকিয়ে,
“ইসস,খোঁপা কইরা চুল,কানে পইরা ফুল
সাজবো আমি বউ গো,সাজবো আমি বউ
গোমটা দিয়া লাল শাড়িতে
এক বিছানায় এক বাড়িতে
থাকবো হইয়া বউ গো থাকবো হইয়া বউ..
শিউলির কথা শুনে শিমুল হু হু করে হেসে উঠল। শিউলি মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কী হলো? এভাবে হাসছো কেন? আমার গানটা কি ভালো লাগেনি?”
শিমুল হাসতে হাসতে বলল,
“তোর গানের গলা ভালা, কিন্তু তুই তো দেহি বিয়ার লাইগা পাগল হইয়া গেছস!”
শিউলি শিমুলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
‘হ্যাঁ, আমি তো পাগলই তোমাকে বিয়ে করার জন্য। তোমার বউ হওয়ার জন্য।’
শিমুল আবারও বলল,
“কাকু রে কমু তোরে বিয়া দিয়া দিতে। তোর কপালে সুন্দর একটা জামাই জুটব।”
“তোমার মতো স্বামী চাই, শিমুল ভাই। কোথায় পাব তোমার মতো একজন পুরুষকে?”
শিউলি গভীর দৃষ্টিতে শিমুলের দিকে তাকিয়ে বলল।
শিমুল বলল,
“আমার মতো পোলা ক্যান চাস? আমি তো সবার চোখেই বোকা।”
শিউলি পুকুরের শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে নিজের মনের কথা প্রকাশ করল,
“ভালোবাসা কি ওসব দেখে হয়, শিমুল ভাই? ভালোবাসি যে তোমাকে। তোমাকে যে আমার জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে চাই, তুমি বোঝো না?”
শিমুলের কোনো উত্তর বা সাড়াশব্দ না পেয়ে শিউলি তার পাশে তাকাল। দেখল, সেখানে শিমুল ভাই নেই। সে একটু দূরে নজর দিতে দেখল শিমুল ভাই কিছু ঝিঁ ঝিঁ পোকা ধরাতে ব্যস্ত। শিউলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে এতক্ষণ একা একা নিজের মনের কথা বলছিল, কিন্তু শিমুল সেটা না শুনে পোকা ধরাতেই ব্যস্ত!
শিউলির মনে আবারও অভিমান জমল। ছলছল নয়নে তাকিয়ে রইল সেই প্রাপ্তবয়স্ক বাইশ বছর বয়সী পুরুষটার দিকে। শারীরিক গঠন দেখে কি কেউ বলবে ছেলেটা বোকা?
পরক্ষণেই মনে হলো, তার অভিমান ভাঙানোর জন্য শিমুল ভাই আসবে না। হয়তো লোকটা বুঝবেই না যে সামনে থাকা মেয়েটা অভিমান করেছে। শিউলি নিজের চোখে হাত রেখে জল মুছে চোখ পরিষ্কার করে নিল। মৃদু হাসল। তারপর উঠে দাঁড়াল।
শিমুল ভাইয়ের ঠিক পেছনেই সে গিয়ে দাঁড়াল। শিমুল ভাই এক মুঠো হলুদ আলো জ্বলতে থাকা ঝিঁ ঝিঁ পোকা শিউলির সামনে ধরলেন। শিউলির সামনে ধরতেই ঝিঁ ঝিঁ পোকাগুলো উড়ে চলে গেল।
শিউলির মুখে আবারও হাসি ফুটল।সে নিজের মনকে বোঝাল,
’যতকিছুই হয়ে যাক না কেন, শিমুল ভাই আমার কথা বুঝুক আর নাই বুঝুক তবুও এরকম সময় সবসময় চাই আমি। যতদিন এই দেহে প্রাণ আছে, ততদিন।’
শিউলি এবার আবারও বলল,
“আচ্ছা শিমুল ভাই আমারে কি তোমার পছন্দ না?যদি বলি আমি তোমাকে বিয়া করতে চাই তাহলে কি আমারে বিয়া করবা?”
শিমুল শিউলির দিকে তাকাল, এবার তার হাসিটা একটু বেশি বোকাটে ঠেকল। সে সরলভাবে বলল,
“তুই কী কস রে শিউলি? তুই তো ভালা মাইয়া। আর আমি তো হইলাম বোকাসোকা একটা পোলা। আমার লগে বিয়া অইলে তোর জীবনডা তো নষ্ট হইয়া যাইব। তুই এমন কথা কস ক্যান?”
শিউলি ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল।
শিমুল এবার সরে দাঁড়াল, পুকুরের ঠাণ্ডা পানির দিকে ইশারা কইরা কইল,
“শোন, আমারে খালি ভালা বন্ধু হিসাবে দেখ। ওই যে দেখ, শাপলা ফুলগুলা খালি রাইত হইলেই ফোটে, দিনের বেলা চুপ কইরা থাহে। তোর প্রেমটাও ওরকম ক্ষণিকের না হোক। তোর লাইগা ভালো কিছু হইব, দেইখা নিস।”
তারপর শিমুল শিউলির দিকে ফিরল। তার চোখে কোনো চালাকি নাই, খালি সরলতা। সে বলল,
“আর এই রাইতে তোর আমার লগে থাকা ঠিক না। সবাই জানলে অনেক খারাপ কথা কইব। তুই যা, ঘুমাইতে যা। আমারে আর ডাকিস না।”
শিউলি নিজের চোখের জল লুকার ব্যার্থ চেষ্টা করল না। কাঁপা কন্ঠে বলল,
“বাহ্ রে শিমুল ভাই!সবই তো বুঝো,মানুষ খারাপ কথা কইব এটা বুঝো।কিন্তু বুঝো না শুধু আমারে।ক্যান বুঝো না আমারে?আমি কি তোমার যোগ্য না?তোমারে ভালোবাসা বুঝতে হইবো না,আমি তোমারে ভালোবেসে যাব।তুমি শুধু সারাজীবন আমার সাথে থাকবা তাইলেই হইবো।”
শিমুল আবারও একই সুরে বলল,
“চইলা যা শিউলি।তোর লগে আমারে দেখলে তোর বাপে আমারে মারব।”
শিউলির বুক ফেটে কান্না আসতে চাইল কিন্তু কাঁদল না।দৌড়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিল।
ঘরে ঢুকতেই চাইলেই দেখল সামনে তার আব্বা দাঁড়াইয়া আছে।পরনে লুঙ্গি আর হাফহাতা গেঞ্জি পরনে।হয়তো নামাজ পড়তেই উঠেছে।
সামনে তার আব্বারে দেখে মেয়েটার বুক কেঁপে উঠল।উনি কি দেখে নিয়েছে শিমুল ভাইয়ের সাথে? প্রশ্নটা মনে উঁকি দিতেই শিউলির ভয় হতে শুরু করল।এসব জানলে তার উপর তো তান্ডব যাবেই সেই দিকে শিমুলেরও রক্ষে থাকবে না।
ইদ্রিস খন্দকার মেয়েকে ভালো করে পরখ করে বলল,
“কই গেছিলি?”
শিউলি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“আসলে আব্বা টয়লেটে গেছিলাম।”
তাদের টয়লেট ঘরের বাহিরে উঠানের এক পাশে।
“প্রত্যেকদিন তোর মা’রে নিয়া যাস আ্যইজ একলা ক্যান গেলি?”
“আম্মা ঘুমাইতাছিল তাই।আর এখন তো সকাল হয়ে যাইতাছে।”
ইদ্রিস খন্দকার মেয়ের কথা বিস্বাসযোগ্য মনে হলো।তাই আর কোনো প্রশ্ন করেনি।শিউলি নিজের রুমে ঢুকে গেল।
এখন আর ঘুম হবে না।সূর্য উঠার সূচনা মেয়েটার কান্না দিয়েই হবে।
#চলবে…
(গল্পটা কেমন হচ্ছে?তোমরা নিজেদের মতামত না দিলে আমি কীভাবে বুঝবো তোমাদের ভালো লাগে কিনা!তোমাদর একটা মন্তব্য আমাকে লেখায় উৎসাহ দেয়।)

