#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৫
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
সকাল গড়িয়ে বিকেল হলো, কিন্তু শিমুল ভাইয়ের কোনো দেখা মিলল না। শিউলি না হয় অভিমান করেছে, তাই বলে কি শিমুলের কোনো হদিসই থাকবে না? শিউলি অনেকক্ষণ ধরে বাড়ির পেছনের দোলনায় বসে বসে শিমুলদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু শিমুলকে একবারও বাড়ি থেকে বের হতে দেখা গেল না।
শিউলির ভেতরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন কোনো দিন যায়নি, যেদিন শিমুলের সাথে কথা না বলে রয়েছে। এই কারণেই শিউলি কোথাও বেড়াতে গেলেও দিনে যায়, আবার দিনেই ফিরে আসে। কারণ, একদিনও সেই শিমুল ভাইয়ের মায়ায় ভরা চেহারা না দেখলে শিউলির ভেতরে কষ্ট শুরু হয়। কিন্তু আজ লোকটা কোথায়?
’না, আমাকে আর অভিমান করে থাকলে চলবে না। আমি নিজেই গিয়ে দেখা করব,’মনে মনে বলেই শিউলি শিমুলদের বাড়ির দিকে গেল। উঠানে গিয়ে ডাকল,
“শিমুল ভাই? কই তুমি?”
আছিয়া খাতুন শিউলির ডাক শুনে বেরিয়ে এলেন। আছিয়া খাতুনকে দেখে শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“চাচি, শিমুল ভাই কই?”
আছিয়া বেগম বললেন,
“সকালবেলা বের হইছে, এখনো ফেরে নাই। বল তো, ছেলেটা কই গেল! আমাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারছে পোলাডা।”
শিউলির মনে অদ্ভুত ভয় কাজ করল। ‘কোথায় গেল লোকটা! কোনো বিপদ হয়নি তো!’ শিউলি বলল,
“আচ্ছা চাচি, চিন্তা করো না। হয়তো বাচ্চাদের সাথে খেলছে, আমি খুঁজে আনছি।” শিউলি নিজের মনের ভয় প্রকাশ করল না।
শিউলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল, কিন্তু কোথাও পেল না। শিউলি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল। শিমুল ভাই তো কখনো দূরে কোথাও যায় না। আর শিমুল ভাই এতটা বোকাও না যে সে হারিয়ে যাবে। তাহলে গেল কোথায়?
ঠিক তখনই পাশের বাড়ির ছোট বল্টু নামের বাচ্চাটা দৌড়ে এসে বলল,
“শিউলি আপা, শিমুল ওই রাস্তার ধারে পইড়া আছে।”
শিউলি ভয়ে আরও কাবু হলো, “পইড়া আছে মানে? কী হইছে?”
“শরীরে অনেক রক্ত। চলো, তোমারে নিয়া যাই।”
শিউলি দৌড়ে গেল সেই নির্জন রাস্তার দিকে। সেই দিক দিয়ে মানুষের আনাগোনা কম। শুধুমাত্র এই চারপাশের কয়েকজন মানুষ ছাড়া কেউ যায় না। শিউলির কাছে মনে হচ্ছে রাস্তাটা যেন ফুরাচ্ছে না। শিউলি গিয়ে রাস্তার মাঝে দাঁড়াল। চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল। হঠাৎ চোখ গেল রাস্তার একদম পাশে, যেখানে শিমুল ভাই মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছেন।
শিউলি দৌড়ে গিয়ে শিমুলকে ধরল। মেয়েটা কেঁদে ফেলল তার শিমুল ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে।
শরীরে মারের দাগ স্পষ্ট। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। বাচ্চাটা যেভাবে বলেছিল, ঠিক ততটাও রক্ত বেরোচ্ছে না, তবে শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন হয়ে আছে। শিউলি ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,
“কী হয়েছে তোমার? কে মারছে তোমারে এমন কইরা?”
শিমুল শিউলির ক্রন্দনরত মুখটার দিকে তাকাল। মেয়েটার নাকের ডগা লাল হয়ে আছে।কান্নার কারণেই চোখগুলো লাল হয়েছে। শুধু নাক-চোখ নয়, ফর্সা চামড়ার কারণে তার পুরো মুখটাই লাল দেখাচ্ছে। শিমুল হাসার চেষ্টা করে বলল,
“কিছু অয় নাই। তুই কান্দস ক্যান? কাঁদিস না। দেখ, আমার কিছুই অয় নাই।”
শিউলি শিমুল ভাইকে ধরে দাঁড় করাল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু শিমুল যেতে চাইল না। ছেলেটা ডাক্তারকেও ভয় পায়। এই বাইশ বছরের সুপুরুষটি সবকিছুতেই ভয় পায়, এমনকি কিছু মানুষকে দেখেও ভয় পায়। তার কারণ হয়তো মানুষের অমানুষিক ব্যবহারের ফল।
শিমুল শিউলির কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। পায়েও হয়তো ভীষণ আঘাত করেছে কেউ। যারা শিমুলের এই অবস্থা করেছে, তাদের ছাড়বে না শিউলি মনে মনে সে শপথ করল।
হঠাৎ সামনে শিউলির বাবা ইদ্রিস খন্দকারের দেখা। তিনি হয়তো বাজারে যাচ্ছিলেন। শিউলির সাথে শিমুলকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। আগুন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন সেই দিকে।
শিউলি নিজের বাবাকে দেখে দৃষ্টি নত করল। ওনার চাহনি দেখেই মনে হচ্ছে, এখনি বুঝি শিউলির গায়ে হাত তুলবেন। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে এলাকার মেম্বার হয়ে মেয়ের গায়ে হাত তোলা লজ্জার বিষয়।
তিনি কয়েকজন লোককে ডেকে শিমুলকে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসতে বললেন। তিনি শিউলিকে বললেন,
“সোজা বাড়ি যাও।”
কিন্তু শিউলি ওনার কথা মানল না। সে তার শিমুল ভাইদের সঙ্গেই তাদের বাড়ি গেল। এতে যেন ইদ্রিস খন্দকার আরও ক্রুদ্ধ হলেন।
শিমুল ভাইকে বিছানায় শোয়ানো হলো। ছেলেটার মুখ ফুলে গেছে। হয়তো কেউ নিজের সর্বশক্তি ব্যবহার করে তার গালে পরপর থাপ্পড় দিয়েছে। বার বার শিউলির কান্না আসছে।
আছিয়া বেগম গরম পানি করার জন্য রান্নাঘরে গেলেন। এখন রুমে উপস্থিত শুধু শিউলি এবং শিমুল ভাই।
শিমুল ভাই চোখ বন্ধ করে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। শিউলি জিজ্ঞেস করল কাঁপা কণ্ঠে,
“শিমুল ভাই, কে মেরেছে তোমারে? জামিল চাচা আজ আবার মেরেছে তোমারে?” শিউলির কণ্ঠে রাগ স্পষ্ট ছিল।
শিমুল ধীরে ধীরে চোখ খুলল। শুধু মাথা নাড়াল, মানে ‘না’।
“তাহলে কে মেরেছে তোমারে?”
শিউলি যখন এই প্রশ্ন করল, তখন শিমুলের মনে কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলো ভেসে উঠল,
তখন শিমুল নিজেদের ক্ষেত থেকে ফিরছিল। তখনই হঠাৎ দেখল, রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে তামিম ইকবাল তার বন্ধুদের সাথে সিগারেট খাচ্ছে। তখন তার মনে পড়ল শিউলির সেই দিনের কথা, যেদিন শিউলি বলেছিল তামিম নামের ছেলেটা তাকে বিরক্ত করেছে।
শিমুল এগিয়ে গেল সেই হাফ প্যান্ট, টিশার্ট পরা ছেলেটার দিকে। তামিম গাড়ি থেকে উঠল না। বলল,
“কী রে চান্দু, এভাবে কী দেখিস? সিগারেট খাবি?”
শিমুল সোজাভাবে বলল,
“তুমি সেদিন শিউলিকে রাস্তায় বিরক্ত করছো ক্যান?”
তামিম নিজের সিগারেটটা মাটিতে পিষে দিল। সে বলল,
“তাতে তোর কী? প্রয়োজনে বাড়ি গিয়ে বিরক্ত করব।”
শিমুল রাগী কণ্ঠে আঙুল উঁচু করে বলল,
“তুমি একদম শিউলিকে বিরক্ত করবা না। তাহলে…”
“হুঁ, তাহলে… তাহলে কী করবি বল!” বলতে বলতে তামিম শিমুলের বুকে ধাক্কা দিল।
শিমুল বলল, “তাইলে তোমারে খুন কইরা দিমু। যদি শিউলি কষ্ট পায়।”
শিমুলের কথা শুনে তামিম সহ তার সাথে থাকা সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
“এই, তোরা শুনছিস? এই বলদের বাচ্চা কী বলে? ও নাকি খুন করে ফেলবে! শালা। এই শালারে ধর সবাই!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সবকটা ছেলে শিমুলকে ধরে মাটিতে ফেলে মারতে শুরু করল।
শিউলির ভীষণ রাগ হলো ওই তামিমের ওপর। এতদিন তাকে বিরক্ত করে গেছে, কিন্তু আজ তার প্রিয় মানুষটাকে এভাবে মেরেছে!
শিমুল বলল, “শিউলি, বাড়িত চইলা যা। দেখ, সন্ধ্যে হইয়া গেছে।”
শিউলি বাইরে তাকিয়ে দেখল সত্যিই সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শিউলি শিমুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল। এতক্ষণ মাথায় ছিল না তার আব্বার কথা। কিন্তু এখন বাড়িতে গেলে কী হবে, কে জানে। তবে এই সময় তার বাবা বাড়িতে থাকেন না। তাই ভয়টা কিছুটা কম লাগল। ‘আব্বা বাড়িতে আসার আগেই ঘুমিয়ে যাব, তাহলে আর কিছু বলতে পারবে না’ এই ভেবে শিউলি কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো।
বাড়িতে পা দিল। দেখল, উঠোনে কেউ নেই।
শিউলি ছোট সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠল। হঠাৎ এক শক্ত হাতের থাপ্পড় এসে পড়ল তার গালে। এমন আকস্মিক আক্রমণে শিউলি তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
শিউলি নিজের গালে হাত রেখে জন্মদাতা পিতার দিকে তাকাল। এই লোকটা এমনই কিছু এদিক থেকে সেদিক হলেই শিউলির গায়ে হাত তুলবে। এমনকি, শিউলির মাকেও ছাড় দেন না।
আজ শিউলির ভীষণ রাগ হলো তার বাবার আচরণে। এমন কিছু তো সে করেনি যে তার গালে হাত তুলতে হবে। শিউলিও উঠে দাঁড়াল। সে বলল,
“আব্বা, এভাবে চড় মারার কী হলো? আমি তো শুধু শিমুল ভাইকে ধরে বাড়িতেই নিয়ে যাচ্ছিলাম।”
কথাটা বলার সাথে সাথেই ইদ্রিস খন্দকারের চোখে-মুখে রাগ উপচে পড়ল। পাশেই একটা চিকন বাঁশের কঞ্চি ছিল। সেটা হাতে তুলেই শিউলিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পশুর মতো মারতে লাগলেন।
শিউলি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। এই বেতের আঘাত যে ভীষণ শক্ত। যেখানে বাড়ি পড়ছে, সেখানের মাংসই লাল বর্ণ ধারণ করছে। আর ইদ্রিস খন্দকার মারছেন আর রাগে চিৎকার করে বলছেন, “এত বড় সাহস! আমার সাথে তর্ক করিস? আমার থেকে জবান চালাস?”
ছোট্ট দেহের মেয়েটা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।শিউলির মা জাবেদা বেগম রুমে ছিলেন। তিনি দৌড়ে আসলেন। এসেই স্বামীর এরকম ভয়ানক রূপ দেখে তিনি থমকে গেলেন। তিনি মেয়েকে আগলে ধরলেন। যার প্রভাবে তার গায়েও বেশ কয়েকটি কঞ্চির আঘাত পড়ল।
ছোট্ট ফুলঝুরি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। বাবার সামনে আসার সাহস ছোট্ট মেয়েটার নেই।
শিউলির শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। শরীরে সব জায়গায় মারের আঘাত। ইদ্রিস খন্দকার কঞ্চি দিয়ে মারা তখনই থামালেন, যখন সেটা ভেঙে গেল। তিনি রাগে চিৎকার করে বললেন,
“ওই শিমুলের লগে তোরে যদি আবারও দেহি, তাইলে ওইদিনই হইব তোর শেষ দিন।”
আজ জাবেদা বেগম প্রতিবাদ করলেন,
“একটা সামান্য ব্যাপারে মাইয়াডারে এভাবে মারবেন আপনি? আপনার শরীরে কি দয়া-মায়া কিছু নাই?”
ইদ্রিস খন্দকার একটা নোংরা গালি দিয়ে বললেন,
“তোর মতো তোর মাইয়্যাডারে বানাইছোস? তোর মাইয়্যা গতকাল রাইতের বেলায় ওই শিমুলের লগে পুষ্টিনাস্টি করতে গেছিল, বুঝলি! তোর মাইয়্যারে সাবধান কইরা দে। মানুষে বদনাম করার আগে তোর মাইয়্যারে আমি জবাই কইরা গাঙ্গে ভাসাই দিমু।”
শিউলি কান্নাভেজা চোখে তার বাবা নামক পশুটার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের মেয়ের সম্পর্কে এমন খারাপ কথা পিতা হয়ে কীভাবে বলতে পারে? এরকম পিতাও কি পৃথিবীতে আছে? নেই বোধহয়।
শিউলির শরীর দুর্বলতায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল মেয়েটা।
#চলবে…
(আপনাদের মন্তব্য শুনতে আমি ইচ্ছুক।তবে দুঃখের বিষয় আমার গল্প পড়ার মতো তো মানুষই নেই মন্তব্যটা করবে কে!🥲)

