বসন্তের_ঝরা_ফুল #পর্ব_৬

0
19

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৬
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
মধ্যরাতে ঘুম ভাঙল শিউলির। চোখ খুলে দেখল রুমে মিটমিট করে আলো জ্বলছে। চোখের পাতা দুটো জ্বালা করছিল ভীষণভাবে, তবুও সে কষ্ট করে চোখ কুঁচকে তাকাল। চারপাশের সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা মনে হচ্ছিল। সে নিজের হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ ঘষল। অনুভব করল, কপালে ভিজে থাকা এক টুকরো কাপড়ের স্নিগ্ধ স্পর্শ। তখনই তার মনে পড়ল, বাবার প্রহারে জ্ঞান হারানোর পর কখন যেন তার জ্ঞান ফিরেছিল, আর সেই মুহূর্ত থেকেই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসতে শুরু করেছিল।
​সে তার বাঁ দিকে তাকাল। সেখানে তার ছোট বোন ফুলঝুরি বাঁকা হয়ে শুয়ে আছে। ছোট্ট মেয়েটার সাথে শিউলির গলায় গলায় ভাব থাকলেও, তারা সারাক্ষণ ঝগড়া করে। ঘরের দুই বোনের সম্পর্ক যেমন হয় এই ঝগড়া, এই ভালোবাসা। ফুলঝুরি হয়তো অনেক কেঁদেছে। তার চোখের পাশে কান্নার ফলে শুকনো দাগ এখনো লেগে আছে।
​ঠিক পাশেই, একটি চেয়ারে বসে আছেন জাবেদা বেগম। শিউলির কপালে জলপট্টি দিতে দিতে কখন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন, তা খেয়াল নেই। মায়ের ক্লান্ত মুখটা দেখে শিউলির বুকটা ব্যথায় ভরে উঠল। এত কষ্ট সত্ত্বেও মা তাকে আগলে রেখেছেন।

শিউলি বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। শরীরে ভীষণ ব্যথা অনুভব হচ্ছে। সন্ধ্যার সময়ের ভয়াবহ মারধরের কথা মনে পড়তেই তার শরীর কেঁপে উঠল।
​তখনই একটি প্রশ্ন তার মনের মাঝে উঁকি দিল “কিন্তু আব্বা জানল কেমনে যে আমি শিমুল ভাইয়ের সাথে রাতে দেখা করেছিলাম?”

​কিন্তু এর সঠিক ব্যাখ্যা শিউলি পেল না। তার আফসোস হচ্ছে তখন যদি আব্বার সাথে তর্ক না করত, তাহলে হয়তো এভাবে মার খেতে হতো না।
​শিউলি খুব কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। নিজের শরীরে ওড়না নেই। আলনা থেকে একটা ওড়না নিল। তারপর টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি পান করল। জ্বর নেই, তবে সবকিছু বিস্বাদ মনে হচ্ছে। নিজের মায়ের দিকে তাকাল। ‘আমার জন্য আম্মাও মার খেল!’ ভীষণ অনুশোচনা হলো তার।

​সে গ্রিল দেওয়া জানালাটা খুলল। বাইরে তখন গভীর অন্ধকার। শিমুলদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে না, শুধু উঠোনে পঁচিশ পাওয়ারের একটা হলুদ বাতি জ্বলতে দেখা যাচ্ছে।
​“শিমুল ভাইয়ের কী অবস্থা এখন? শরীরের ব্যথা কমেছে তো! নাকি লোকটা এখনো ব্যথায় কাতরাচ্ছে।”
​শিমুল ভাইয়ের কথা মনে পড়তেই শিউলি নিজের শরীরের আঘাতের কথা ভুলে গেল।
ইচ্ছে হচ্ছে একটাবার শিমুল ভাইকে দেখে আসতে।কিন্তু তার শরীরে হেঁটে যাবার শক্তি নেই।
শিউলি মনে মনে দোয়া করছে যেন এই রাতের মাঝেই সুস্থ হয়ে যায়।আর তামিমের সাথে মুখামুখি কথা বলতে পারে।তামিম ছেলেটা বখাটে তবে এতটা খারাপ তা জানা ছিল না।
শিউলি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা।জালানার গ্রিল ধরে মাথা ঠেকালে।
“তুমি কবে বুঝবে শিমুল ভাই?কবে তুমি আমাকে ভালোবাসবে?নাকি তোমার ভালোবাসা বিহীনই আমাকে থাকতে হবে?”
★★★
দুই দিন কেটে গেল। শিউলির জ্বর এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি। তবে শরীরের আঘাতগুলো অনেকটাই সেরে উঠেছে। এই দুই দিনে সে অনেক চেষ্টা করেছে কলেজে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পারেনি। এতটা অসুস্থ শিউলি মনে হয় এই প্রথম হয়েছিল, তাও কিনা নিজের পিতার জন্য।
​তবে নিজের আঘাতগুলো যেমন মিলিয়ে যাচ্ছিল, তেমনি তার বাবার ওপর থেকে রাগও উঠে যাচ্ছিল। কারণ, কোন বাবা এটা মেনে নিবে যে মেয়ে রাতের বেলা একটা ছেলের সাথে দেখা করবে! হয়তো অন্য বাবারা মেয়েদের বুঝিয়ে বলেন, কিন্তু ইদ্রিস খন্দকার তো তেমন নন। তিনি গ্রামের মেম্বার, গ্রামে তাঁর একটা সম্মান আছে। তাই হয়তো নিজের রাগ সামলিয়ে উঠতে পারেননি। শিউলি নিজেকে নিজেই এই বলে বোঝ দিল।

​এর মাঝে ফুলঝুরিকে দিয়ে খবর এনেছে শিমুল এখন অনেকটাই ভালো আছে।
​শিউলি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেল। তার আব্বা উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েকে কলেজে যেতে দেখে তিনি বললেন,
“সাবধানে যাস। আর নে, ট্যাকাটা প্রয়োজন লাগবার পারে।”
​তিনি পঞ্চাশ টাকা শিউলির দিকে এগিয়ে দিলেন। শিউলি টাকাটা নিয়ে চলে গেল। বাবারা মেয়েদের নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসেন, কিন্তু কখনো তারা তাদের মেয়ে কোনটাতে ভালো থাকবে, সেটা বুঝতে অক্ষম, অথবা বুঝেও না বোঝার মতো থাকেন।

শিউলি আজ আগেই বের হলো। আজ সোমবার, তাই কোচিং বন্ধ এই দিন স্যার নিজের ইউনিভার্সিটিতে যান। শিউলি হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল শিমুলদের ক্ষেতের পাশে। তার মনে হলো, পাশের শিমুল ফুল গাছটার নিচে হয়তো শিমুল বসে আছে।
​শিউলি তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তাই শিমুল সেখানে বসা। লুঙ্গি পরা আর সাথে টি-শার্ট, ছাইরঙা। লোকটা ধুবরা ঘাস ছিঁড়ছে একটা একটা করে। ওপরের শিমুল ফুল গাছটায় লাল টকটকে ফুলগুলো ফুটে আছে।
​শিউলির মনে মনে ভাবল, লোকটার নামের সাথে নিজের চেহারার ভীষণ মিল একদম শিমুল ফুলের মতো। গাছটার নিচে অনেকগুলো বসন্তের ঝরা ফুল পড়ে আছে। কী সুন্দর সেই দৃশ্য! শিউলি ধীরে হেঁটে গেল।

​শিউলিকে দেখেই শিমুল অমায়িক হাসল। এই হাসিই যে সে অষ্টাদশী মেয়েটার ভেতরে ‘আগডুম বাগডুম’ খেলা করে, সেটা কি লোকটা জানে?
​শিউলি শিমুল ভাইয়ের পাশে বসে পড়ল। শিমুলের ঠোঁটের পাশে কালচে দাগ রয়েছে এখনো।
​শিউলি বলল,
“শিমুল ভাই, তোমার ব্যথা সেরেছে এখন?”

​“হ, এহন ভালা,” বলেই শিউলির দিকে তাকাল শিমুল। শিউলির কনুইয়ের নিচে বেতের দাগ কিছুটা দেখা যাচ্ছে। আর ফুলঝুরিও বলেছিল যে তার বাবা শিউলিকে মেরেছেন।
​শিমুল বলল,
“তোরে কাকু মারছে রে শিউলি?”

শিউলি কিছু বলল না, চোখ নামিয়ে নিল।
​হঠাৎ শিমুল শিউলির আঘাতের জায়গাটাতে আঙুল বুলিয়ে বলল,
“খুব ব্যথা লাগছে, তাই না?”

​শিউলি শিমুলের দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলল,
“না, শিমুল ভাই, মনের ব্যথার থাইকা বেশি না। ওই যে তুমি মাত্র ছুঁয়ে দিলে, আমার ব্যথা ভালো হইয়া গেছে। যেইদিন তুমি আমার মন ছুঁইতে পারবা, সেই দিন মনের অসুখও ভালো হইয়া যাইব।”

​‘আচ্ছা, শিমুল ভাই কি এতটাই বোকা যে একটা মেয়ের ভালোবাসা বোঝে না?’ শিউলি মনে মনে ভাবল। কিন্তু শিউলির বিশ্বাস, তার শিমুল ভাই তারই হবে। সেটা হোক বেঁচে থাকতে বা মৃত্যুর পর।
★★★
শিউলি তার ইচ্ছে মতো তামিমকে দেখতে পেল। ছেলেটা আজও একই ভাবে টংয়ের দোকানের সামনে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিনের মতো আজও তার সঙ্গপাঙ্গরা রয়েছে।
​শিউলির রাগ থরথরিয়ে বেড়ে গেল। শিউলি লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। শিউলিকে দেখে তামিম বাইক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। হাসি মুখে বলল,
“বাহ্! আজ ফুল যে ইচ্ছে করেই আমার নিকটে।”

​শিউলি রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। সে বলল,
“আপনি শিমুল ভাইকে এভাবে মারলেন কেন?”

​তামিম ভাবার মতো ভান করে বলল,
“শিমুল ভাই! মানে, ওই বলদ ছেলেটা?”

“একদম বলদ বলবেন না।”

​তামিম সামনে এগিয়ে এল। সে বলল,
“বাহ্ বাহ্! এত জেদ দেখাচ্ছো কেন?”

​“আজেবাজে কথা বন্ধ করুন! আর বলুন, শিমুল ভাইকে মারলেন কেন? সহজ-সরল পেয়ে ছেলেটাকে এভাবে মারবেন!”

তামিম ঔদ্ধত্যের সাথে বলল,
“না মেরে কী করব, সুইটহার্ট? ওই বলদ আমার কাছে এসে হিরো সাজতে চাইছিল। বলে কী তোমাকে বিরক্ত করলেই নাকি খুন করে ফেলবে! তুমিই বলো, মারব না তো কী করব? চুমু দেব?”
​সাথে থাকা ছেলেগুলো হেসে উঠল। মনে হয় এই ছেলেগুলোর কাজই শুধু একটা এই তামিমের কথায় তাল মিলিয়ে হাসা। শিউলির ইচ্ছে হচ্ছিল এখনি একটা ঠাস করে বসিয়ে দিতে।
​“আপনি আর কখনো শিমুল ভাইকে টুকা দেওয়ারও চেষ্টা করবেন না।”
​শিউলির কথা শেষ করতে দিল না। তামিম তার আগেই দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“যতদিন তুমি শিমুলের সাথে রাতে দেখা করবে, ততদিন মারব। এবার বলো, শিমুলের সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক যে রাতের বেলা দেখা করতে হবে?”

​শিউলি চমকে তাকাল। ‘এরা কী করে জানে! আর তার বাবাও জেনেছে কি এদের থেকেই?’ শিউলি জানে, যদি এরা জানতে পারে যে সে শিমুল ভাইকে ভালোবাসে, তাহলে এরা শিমুল ভাইকে আস্ত রাখবে না। শিউলি কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“শিমুল ভাইয়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনিই কি আমার আব্বাকে এই দেখা করার বিষয়ে বলছেন?”

​“আরে না, আমি কেন বলব! যে দেখেছিল, সেই বলেছে।”
​শিউলি জিজ্ঞেস করল, “কে?”

​“ওই যে তোমাদের পাশের বাড়ির গাঞ্জাখুর স্বপন আছে না, ওই বেটাই দেখেছিল। ওই বলল। আচ্ছা যাই হোক, আমিও বিশ্বাস করি, ওই বলদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। যাও যাও, কলেজে যাও।”
​শিউলি আর কথা বাড়াল না। সে জানে, এদের সাথে কথা বললে আরও বিপদ বাড়বে।
★★★
শিউলি কলেজে পৌঁছে গেল। গিয়ে দেখল, বৃষ্টি এখনো আসেনি। অন্যদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, বৃষ্টি নাকি দুই দিন ধরেই আসছে না।
​শিউলি অবাক হলো। এই মেয়ে তো কলেজ ফাঁকি দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু কী হয়েছে যে কলেজে আসে না! আজও না এলে তিন দিন হবে।
​শিউলির বৃষ্টিকে ছাড়া ক্লাস করতে ইচ্ছে হলো না। এই বৃষ্টি মেয়েটাই তার একমাত্র বেস্টফ্রেন্ড। শিউলি নিজেকে জোর করে ধরে টিফিন পর্যন্ত ক্লাস করল। টিফিনে প্রিন্সিপালের কাছে ছুটির আবেদন করতে গেলে তিনি তা নাকচ করে দিলেন। বললেন, “দুই দিন পর কলেজে এসেছো, এখন আবার ছুটির জন্য এসেছো!”
​শিউলি ছুটি না পেয়ে বেরিয়ে এলো। বেরোতেই দেখল শফিক, মানে বৃষ্টির বয়ফ্রেন্ড, দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি ডাকল, ছেলেটা এগিয়ে এলো। শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“বৃষ্টি আসে না কেন? আপনাকে কিছু বলেছে?”

​ছেলেটার চাহনি ঠিক নেই। এসব ছেলের সাথে কথা বলা একদম পছন্দ না, তবে কী আর করা বৃষ্টির খাতিরে বলতেই হচ্ছে। ছেলেটা ভীষণ তিক্ততার সাথে বলল,
“আমি জানি না। এইসব মেয়েদের খবর।”
বলেই হনহন করে চলে গেল শফিক।

​শিউলি বুঝতে পারল, কিছু তো একটা গন্ডগোল হয়েছে। বৃষ্টি মেয়েটা একদম সহজ-সরল, অন্যদের মনের কূটনৈতিক বুদ্ধি বুঝতে পারে না। যদি বুঝতেই পারত, তাহলে এই শফিক নামের ছেলেটার সাথে প্রেম করত না।

#চলবে…
(ভালো মন্তব্য না করলে প্রতিদিন গল্প দিমু না🫠ছোট বাচ্চাদের চকলেট না দিলে যেমন কান্না করে তেমন আমিও তোমরা মন্তব্য না করলে গল্প প্রতিদিন আসিবে না)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here