#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৭
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিউলি কলেজ ছুটির পরই বৃষ্টিদের বাড়ির রাস্তা ধরল। শিউলিদের বাড়ি থেকে বৃষ্টিদের বাড়ি তেমন দূরে নয়। বৃষ্টিদের ঘরটা হাফ বিল্ডিং। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো বৃষ্টির মায়ের সাথে। শিউলি সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আন্টি, বৃষ্টি কোথায়? কয়েক দিন ধরে কলেজ যাচ্ছে না।”
তিনি বললেন, “বৃষ্টি বলল, তার কলেজে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না, আর শরীরটাও নাকি ভালো না।”
শিউলি বৃষ্টির মায়ের সাথে কথা বলে বৃষ্টিদের ঘরে ঢুকল। গিয়ে দেখল বৃষ্টির রুমের দরজা বন্ধ। শিউলি দরজায় টুকটুক করে আওয়াজ করল। ভেতর থেকে বৃষ্টি বলে উঠল,
“আম্মা, তুমি এখন যাও। আর বারবার এভাবে ডাকছো কেন?”
“আমি শিউলি। দরজা খোল,” শিউলি শান্ত কণ্ঠে বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। ভেতরে ঢুকে শিউলি অবাক হয়ে সব কিছু দেখতে লাগল। কী জীর্ণশীর্ণ অবস্থা বৃষ্টির! মাথার চুল বোধহয় দুই দিন ধরে আঁচড়ানো হয়নি। চোখের নিচে কালি পড়েছে। অযত্নের কারণে মুখে ব্রন দেখা দিয়েছে।
শিউলি অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“এ কী অবস্থা তোর? কী হয়েছে?”
বৃষ্টি মাথা নাড়ল, মানে ‘কিছু না’।
শিউলি এগিয়ে গিয়ে বৃষ্টির হাত ধরল। নরম সুরে জিজ্ঞেস করল,
“আমার সাথে বলবি না? শফিকের সাথে ঝামেলা?”
এবার বৃষ্টির বাঁধ ভাঙল। মেয়েটা শিউলিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। শিউলি তাকে কিছুক্ষণ সময় দিল নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য।
কান্না থামলে শিউলি বলল, “এবার বল দেখি, কী হয়েছে?”
বৃষ্টি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, “শিউলি, আমি ঠকে গেছি। খুব খারাপ ভাবে ঠকেছি।”
বলেই সে আবারও কেঁদে উঠল।
“বল, কী হয়েছে!” শিউলি জোর দিল।
বৃষ্টি বলতে শুরু করল: “ওই দিন যখন কলেজে গেলাম… গিয়ে দেখি তুই আসিসনি। ওই দিন গিয়ে দেখলাম শফিক আমাদের জুনিয়র একটা মেয়ের সাথে বসে গল্প করছে। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, এটা কে? তখন শফিক কিছু বলল না। কিন্তু মেয়েটা বলল শফিকের সাথে সে রিলেশনে আছে। শফিক আমাকে ঠকিয়েছে।”
বৃষ্টি আবারও কেঁদে উঠল।
তবে শিউলির মুখটা শক্ত হয়ে উঠল। এতক্ষণ বৃষ্টির কান্নার জন্য তার কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু এখন নিজেরই রাগ হচ্ছে বৃষ্টির জন্য। শফিক ছেলেটা যে ভালো না, সেটা আগেও সে বলেছিল, কিন্তু বৃষ্টি মানেনি। যাকে বলে, একদম জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল। চোখে কালো কাপড় বেঁধেছিল, এখন কী হলো!
শিউলি বিরক্তি নিয়ে বলল,
“মনটা চাচ্ছে তোকে ঠাস করে একটা বসিয়ে দিই! এই খারাপ একটা ছেলের জন্য তোর এই অবস্থা?” শিউলি নিজের গলা নরম করে আবারও বলল, “শোন বৃষ্টি, ভালো যদি বাসতেই হয়, তাহলে এমন কাউকে বাসিস যে তোকে কখনো ঠকাবে না।”
বৃষ্টি এবার চোখ মুছল। “সত্যিই তো! আমি এই শফিকের জন্য কেন কান্না করব?”
বৃষ্টির চোখ গেল শিউলির শরীরের দিকে। সে অবাক কণ্ঠে বলল, “শিউলি, তোর শরীরে এসব কিসের দাগ? তোকে কে মারল এভাবে?”
শিউলি হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ভালোবাসার শাস্তির দাগ। আব্বা শাস্তিস্বরূপ দিয়েছে।”
বৃষ্টি শুধু অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বলল, “শিউলি, তুই আমাকে বললি, বোঝালি, আমি বুঝলাম। কিন্তু আমি আগের মতোই তোকে বলছি, শিমুলের সাথে তোর কখনো ভবিষ্যতে হতে পারে না। ছেলেটা তোর ভালোবাসা বুঝবে না।”
“না, শিমুল ভাই অবশ্যই আমার ভালোবাসা বুঝবে। পৃথিবীর সব জিনিসের মাঝেও ভালোবাসা বিদ্যমান থাকে। পশুপাখিরাও তো ভালোবাসা বোঝে। পাগলরাও ভালোবাসা বোঝে। তাহলে আমার শিমুল ভাই কেন বুঝবে না?” শিউলির কণ্ঠে ছিল দৃঢ় বিশ্বাস।
বৃষ্টি প্রশ্ন করল,
“যদি না বোঝে, আর যদি বুঝেও তোর বাপ জীবনেও মেনে না নেয়, তখন কী করবি?”
শিউলি হাসি মুখে দৃঢ়তার সাথে বলল,
“পালিয়ে যাব। অনেক দূরে পালিয়ে যাব। যেখানে গেলে সমাজের বেড়া থাকবে না, লোকলজ্জার ভয় থাকবে না।”
★★★
শিমুল পুকুর ঘাটে বসে আছে। পানিতে বাচ্চারা সাঁতার কাটছে। তবে আজ শিমুল নামল না পানিতে। সে ডুবে আছে অন্য কোথাও।
‘শিউলি সবসময় এসব ক্যান কয়? শিউলি আমারে ভালা পায়? কিন্তু ক্যান ভালা পায়?’ নিজের মনে প্রশ্নগুলো বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে।
হঠাৎ পেছনে কারো হাতের স্পর্শ নিজের কাঁধে পেল। শিমুল থমকে পেছনে ফিরল। ছেলেটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। দেখল পাশের বাড়ির এনামুল, শিমুলের ছোটবেলার বন্ধু। শিমুল দাঁত বের করে হাসল। এনামুল শিমুলের পাশে বসল।
এনামুলই ছিল শিমুলের একমাত্র ছোটবেলার বন্ধু। বোকা-সোকা হওয়ার জন্য শিমুলের সাথে বেশি কেউ মিশত না। তবে এনামুল শিমুলকে সবসময় আশ্রয় দিত।
শিমুল হাই স্কুলের পড়া শেষ করেনি। সব পোলাপান তাকে নিয়ে মজা করত, তাই শিমুল নিজেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। তবে শিমুল পড়াশোনায় খারাপ ছিল না।
শিমুল জিজ্ঞেস করল,
“কোন দিন আইলি ঢাকা থাইকা?”
“এই তো গতকালই আসলাম। ঢাকায় একটা চাকরিও পাইছি।”
“বাহ্, ভালাই হইছে।”
এভাবেই তাদের অনেকক্ষণ কথা হলো। শিমুল এক পর্যায়ে বলল,
“আইচ্ছা এনামুল, ভালোবাসা, প্রেম কারে কয়?”
বন্ধুর মুখে এমন কথা শুনে এনামুল অবাক হলো। সে বলল,
“বাহ্ রে! শিমুল সাহেব প্রেমে পড়ল কার?”
শিমুল তাকে উপেক্ষা করে জানতে চাইল,
“বল না, ভালোবাসা কীভাবে হয়? কারো কথা বারবার মনে পড়লে কি তারে ভালোবাসা কয়? কাউরে প্রতিদিন না দেখলে যে বুকে ব্যথা হয়, তারে ভালোবাসা কয়? বল না, ভালোবাসা কারে কয়?”
এনামুল অবাক হয়ে তাকিয়েই রইল শুধু। ছেলেটার আগের থেকে এখনকার কথাবার্তার অনেক তফাত রয়েছে।
“আমি কী আর বলব! তুই নিজেই তো সব বলে দিয়েছিস। তুই যা বলেছিস, সেটাকেই ভালোবাসা বলে।”
শিমুল চোখ বন্ধ করে অনুভব করল। তার চোখের সামনে সবসময় শিউলির মুখটাই ভাসে। একদিন মেয়েটাকে না দেখলে বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব হয়। কিন্তু সেটা কীভাবে ভালোবাসা হতে পারে? শিমুল মুচকি হাসল। পরপরই আবারও হাসিটা মিলিয়ে গেল। ওই দিন ফুলঝুরি বলেছিল, তার সাথে দেখা করার জন্যই শিউলি অনেক মার খেয়েছে। শিমুল নিজে নিজেকে আবার বলল,
‘না, না! শিউলিকে আমার পাওয়া হবে না। এটা অসম্ভব একটা বিষয়। কাকু তাইলে মাইরা ফেলব আমারারে।’
এনামুল জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে শিমুল? এভাবে বিড়বিড় করছিস কেন?”
“না, কিছু না। এমনেই।” বলেই শিমুল উঠে গেল।
★★★
গোধূলির আকাশ তখন শেষ লগ্নে। অস্তগামী সূর্যের নরম আলোয় গ্রামের সৌন্দর্য যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
শিমুল বসে আছে নিজের ডিঙিটার (ছোট নৌকা) মাঝে। বিলটা বিশাল বড়, থৈ-থৈ করা জল। হাঁসগুলো পানিতে খেলা করছে। জলের সঙ্গে মিশে আসছে কমলি পাতার ঘ্রাণ সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। শিমুল চুপচাপ পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ ডিঙিটা নড়েচড়ে উঠল পেছনে কেউ ওঠার কারণে।
শিমুল পেছনে ফিরে দেখল শিউলি। তাকে দেখামাত্র শিমুলের মুখে তৎক্ষণাৎ হাসি ফুটে উঠল। শিমুল বলল,
“আইয়া পড়ছস কলেজ থাইকা?”
“হ, শিমুল ভাই, ডিঙি বাই দাও।”
“কই যাইবি?” শিমুল সরলভাবে প্রশ্ন করল।
শিমুলের বোকা কথায় শিউলি হাসল। এই বিল ছাড়া আর কোথায় যাওয়া সম্ভব! শিউলি মজার ছলে বলল,
“রঙিন এক দুনিয়ায় যাব। যেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব।”
“এসব কী কস?” শিমুল বিভ্রান্ত হয়ে বলল।
“তোমাকে বুঝতে হবে না। তুমি ডিঙি চালাও।”
শিমুল আর কিছু না বলে ডিঙি বাইতে শুরু করল। তারা এখন বিলের একদম মাঝখানে এসে পৌঁছেছে। চারপাশে অসংখ্য পদ্মফুল ফুটে আছে। বিকেলের দিকে ফুলগুলো আধো-ফোটা অবস্থায়।
শিউলি শিমুলকে এখানে নৌকা থামাতে বলল। ডিঙি স্থির হলে, শিউলি তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল।
“আচ্ছা শিমুল ভাই, আমি যদি কখনো হারিয়ে যাই, তাহলে কি আমার জন্য তুমি কাঁদবে?”
শিউলির কণ্ঠে কোনো চপলতা ছিল না, ছিল এক গভীর জিজ্ঞাসা। শিমুল বৈঠা থামিয়ে স্থির হয়ে গেল। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। শিমুল সামান্য অস্থির হয়ে বলল,
“আরে না, কাঁদব ক্যান? আর তুই হারাইবি কই? এই ছোট্ট গ্রাম থাইকা তুই হারাইয়া কোথায় যাইবি?” শিমুল সহজভাবে উত্তর দিল।
শিউলি এবার বলল,
“যদি মইরা যাই তখন?”
শিমুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। শিমুল ঠোঁট ফুলালো বাচ্চাদের মতো। ছেলেটার মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। শিমুল বলল,
“তোর কিছু হইলে আমার বুকডা যে ফাইট্যা যাইব রে শিউলি। আমি কাঁন্দনের কী বুঝুম, তয় বুক ফাটলে তো বাঁচন যায় না।”
শিউলি মূলত শিমুল ভাইয়ের মধ্যে এরকম পরিবর্তনই লক্ষ্য করতে চেয়েছিল, এবং সে সফলও হলো। শিউলি বলল,
“আচ্ছা, এসব বাদ দাও। তুমি ওই দিন কইছিলা একটা গান শোনাইবা। এখন শুনাও।”
শিমুল মুখে লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বলল,
“না না, আমার শরম করে।”
শিউলি বায়না করল,
“না করলে হবে না। তোমাকে বলতেই হবে। না বললে কিন্তু আমি তোমার সাথে আর কথা বলব না।”
শিউলি মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে ফিরল।
শিমুল কিছুক্ষণ শিউলির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার কোমর পর্যন্ত চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে। ‘মেয়েটা এত রূপবতী কেন?’ নিজেকে প্রশ্ন করল শিমুল।
শিমুল শেষমেশ হাসিমুখে সম্মতি জানাল। তারপর দ্বিধা ছেড়ে তার অপরূপ কণ্ঠে গান গাইতে শুরু করল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো জড়তা ছিল না, ছিল এক স্নিগ্ধ, গ্রাম্য সুর,
“কন্যার চিরল বিরল চুল,তাহার কেশে জবা ফুল…
কন্যার চিরল বিরল চুল,তাহার কেশে জবা ফুল।
সেই ফুল পানিতে ফেইলা কন্যা করল ভুল।
কন্যা ভুল করিস না, ও কন্যা ভুল করিস না।
আমি ভুল করা কন্যার লগে কথা বলবো না।”
শিমুলের কণ্ঠস্বর পেয়ে শিউলি সেই দিকে তাকাল। দু’জন দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল নীরবে। শিমুল আবারও নিজের সুরেলা কণ্ঠে সুর ধরল,
“এক যে ছিল সোনার কন্যা, মেঘবরন কেশ
ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ।
দুই চোখে তার আহারে কী মায়া…
নদীর জলে পড়লো কন্যার ছায়া
আমি তাহার কথা বলি, তাহার কথা বলতে বলতে
নাও দৌড়াইয়া চলি।”
#চলবে

