বসন্তের_ঝরা_ফুল #পর্ব_৮

0
25

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৮
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
বাড়িতে আজ ছোটখাটো আয়োজন চলছে বলা চলে। রান্নাঘরে সকাল থেকে চলছে রান্নাবান্না। রান্নার সুস্বাদু গন্ধে পুরো বাড়ি মৌ মৌ করছে। শিউলির আবার রান্নার ঘ্রাণ পেলেই খিদে পেয়ে যায়। সে বারবার রান্নাঘরে যাচ্ছে আর এটা-সেটা খেয়ে আসছে।এটা খুবই বদ অভ্যাস।
​জাবেদা খাতুন কিছুক্ষণ বকা দিয়েও বললেন,
“এভাবে ছুঁচোর মতো খাচ্ছিস কেন? প্লেট নিয়ে বসে খা।”

​শিউলির এক উত্তর
“এভাবে খাওয়ার মজাই আলাদা।”

​জাবেদা বেগম বললেন,
“আমি না হয় এসব মেনে নিব। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এসব করলে মানুষ ভালো বলবে না।”

​শিউলির বলতে ইচ্ছে হলো, ‘বাড়ির পাশেই তো বিয়ে করব! সেখানে থেকেই রান্নার ঘ্রাণ পেয়ে দৌড়ে এসে এভাবেই খেয়ে যাব।’ কিন্তু মনের কথা মনেই রয়ে গেল।
জাবেদা বেগম এসব বিষয় নিয়ে কখনোই খারাপ কথা বলেন না।কারণ মেয়েদের শখ শুধু এই বাপের বাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকে,অন্যের বাড়ির মানুষের মন জয় করতে করতে নিজের সকল শখ বিসর্জন দিতে হয়।

​জাবেদা বেগম আবারও বললেন,
“দুপুর তো হয়ে এলো। বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখ তো,তোর খালা আসছে কি না।”

​আজ জাবেদা বেগমের বোন, মানে শিউলির খালা, শহর থেকে আসবেন। ওনারা সপরিবারে আসবেন এবং অনেকদিন থেকে যাবেন। তাদের ইচ্ছে অনেক দিন ধরে পুরো গ্রাম ঘুরে দেখবেন। সেই কারণেই বাড়িতে এত আয়োজন।

ইদ্রিস খন্দকার দরজার সামনে বানানো ইটের তৈরি বসার জায়গাটায় বসে হাতের নখ খুঁটছিলেন। হঠাৎ তিনি শিউলিকে ডাকলেন।
​শিউলি বাবার দিকে তাকিয়ে সামান্য ভয় পেল। যদি কিছু জিজ্ঞেস করে শিমুল ভাইয়ের সম্পর্কে, তাহলে কী হবে! সেই ভেবেই ভীত হলো। সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“জ্বি আব্বা।”

​তিনি নখ খুঁটতে খুঁটতেই বললেন, “বোস।”

​শিউলির ভয় আরও বাড়ল। সে বুঝল, তার বাবা কিছু জিজ্ঞেস করবেনই। শিউলি বসে গেল। সে মনে মনে কয়েকবার দোয়া-দুরুদ পড়ে নিল। ‘আল্লাহ, এইবার বাঁচিয়ে দিও।’
​ইদ্রিস খন্দকার মেয়ের দিকে তাকিয়েই বললেন,
“ওইদিন রাইতে কেন গেছিলি শিমুলের লগে দেখা করবার?”

​শিউলি মনে মনে এটাই ভাবছিল। কথায় আছে না, যেখানে ভাগের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়। শিউলির সাথে এটাই হলো। শিউলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তোতলিয়ে বলল,
“আ… আসলে আব্বা, আমি ওইদিন টয়লেটে যেতে নিচ্ছিলাম, কিন্তু বাইরে তাকিয়ে দেখি শিমুল ভাই বসা। আমি ভাবলাম লোকটা এভাবে বসে আছে কেন? তুমি তো জানোই, লোকটা বোকা তাই জিজ্ঞেস করতে গেছিলাম।”
কথাটা বলেই শিউলি চোখ বন্ধ করে দম নিল। মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস যে নেই!

​ইদ্রিস খন্দকার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
“আমিও বিশ্বাস করি, আমার মেয়ের ওরকম একটা বোকা বলদের সাথে কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। ওই গাঞ্জাখুর স্বপন যেমনে এসে বলল, তাতে আমার মাথাটা গরম হয়ে গেছিল। তাই ওই দিন এভাবে…”

​শিউলি তার বাবাকে থামিয়ে দিল। বলল,
“আব্বা, থাক। আপনি আপনার পিতার দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা দোষের না। আমি কিছুই মনে করিনি আব্বা।” শিউলি মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলল।
​এরপর তার বাবার সাথে আরও অনেক কথা হলো পড়াশোনার বিষয়ে। এই পর্যায়ে এসে বাবার কাছ থেকে এত সুন্দর সুন্দর কথা শুনে তার ইচ্ছে হচ্ছিল, আব্বাকে জড়িয়ে ধরে বলুক ‘ভালোবাসি আব্বা, তোমাকে ভালোবাসি।’
​কিন্তু শিউলির দ্বারা এটা সম্ভব হলো না। প্রিয় মানুষগুলোর ক্ষেত্রে আমরা বোবা হয়ে যাই। ভালোবাসার কথাগুলো ঠিক করে বলতে পারি না।
★★★
দুপুরের তখন আযান দিচ্ছে। বাড়ির বাইরে থেকে কিছু মানুষের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। শিউলি বুঝল, হয়তো তার খালারা এসে গেছেন।
​শিউলি বাড়ি থেকে বের হতেই টপস পরা একটি মেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। শিউলিও মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিল। মেয়েটা মিলি, শিউলির খালাতো বোন।ছোট বেলা থেকে বেশ ভালো সম্পর্ক।এর মাঝে অনেকবার এই বাড়িতে এসেছে।
​মিলি শিউলির মুখে হাত বুলিয়ে বলল,
“আপু, তুমি আরে দিনকে দিন সুন্দর হয়ে যাচ্ছো! এত সুন্দর কীভাবে হচ্ছো? কী প্রোডাক্টস ইউজ করো?”

মিলির কথা শুনে শিউলি ফিক করে হেঁসে দিল।প্রত্যেকবার মেয়েটা এসেই এই একই কথা বলবে।অথচ মিলিও কম সুন্দর না।
​পেছন থেকে মিলির মা জুলেখা বেগম এসে মিলির কান মলে দিয়ে বললেন,
“আসতে না আসতেই কী প্রোডাক্টস ইউজ করে, তা নিয়ে পড়ে আছিস? আপুকে জিজ্ঞেস করেছিস, আপু কেমন আছে?”

​মিলি লাজুক লাজুক হেসে বলল,
“সরি আম্মু।”

​শিউলি বলল, “থাক খালা, সমস্যা নাই। তুমি ভালো আছো?”
​জুলেখা বেগম শিউলির গালে হাত ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,
“হুম, ভালো আছি। মাসাআল্লাহ! তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস।”

​শিউলি হেসে বলল,
“খালু আসে নাই?”

​“না, অফিস নিয়ে ব্যস্ত, তাই আসতে পারেনি। সোহাগকে নিয়ে আসছি।”
​শিউলি পেছনে তাকাল। দেখল শার্ট-প্যান্ট পরা একটি ছেলে হেঁটে আসছে, চোখে সানগ্লাস।​সোহাগকে অনেক বছর আগে দেখেছিল।তখন হয়তো শিউলি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।

জুলেখা বেগম আর জাবেদা বেগম অনেক দিন পর বোনের দেখা পেয়ে নিজেদের কথাবার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

​সোহাগের পাশে শিমুল ভাইও আছেন। শিমুল ভাইয়ের হাতেও একটা ব্যাগ। হয়তো এতগুলো ব্যাগ সোহাগ একা নিয়ে আসতে পারছিল না বলেই শিমুল সাহায্য করছেন।
​মিলি এসে শিউলির পাশে দাঁড়াল। আঙুলে ইশারা করে ফিসফিস করে বলল,
“আপু, ওই ছেলেটা কে? অনেক সুন্দর, তাই না?”

​মিলির কথা শুনে শিউলি মিলির দিকে তাকাল। মিলির চোখ শিমুল ভাইয়ের ওপরে, মেয়েটার মুখে অমায়িক হাসি লাগানো। শিউলির ঠিক ভালো লাগল না। তার সামনে অন্য একটা মেয়ে তার শিমুল ভাইয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকবে, এটা তার সহ্য হওয়ার মতো নয়। পরক্ষণেই মনে পড়ল, মিলি মেয়েটার বয়স মাত্র পনেরো হবে হয়তো।এতটুক বয়সে কিই বা বুঝবে!

​শিউলি এবার হেসে বলল,
“উনি শিমুল ভাই। ওই যে বাড়িটা দেখছিস, ওইটাই শিমুল ভাইদের ঘর।”
শিউলি আঙুল দিয়ে ইশারা করে শিমুলদের বাড়ি দেখাল।
​সোহাগ শিউলিদের কাছে এসেই বলল,
“তুমি শিউলি,রাইট?

​শিউলি সোহাগের কথায় উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে মিলি বলে উঠল,
“ইয়েস ভাইয়া ইউ আর রাইট।”
মিলি মেয়েটা ভীষণ চঞ্চল। শহুরে হওয়ার করনেই হয়তো।তবে ভীষণ মিষ্টি মেয়ে।দেখতেও সুন্দরী।

সোহাগ শিউলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো শিউলি?”
“হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?” শিউলি হেসে উত্তর দিল।
এভাবেই হাতে গোনা কয়েকটি কথা হলো সোহাগ আর শিউলির মাঝে।

মিলি এগিয়ে গেল শিমুলের কাছে।বলল,
“আপনার নাম কি?”

শিউলি ব্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।মাত্রই নামটা শুনেছে তারপরও আবারও জিজ্ঞেস করছে।
শিমুল ধীর কন্ঠে বলল, “আমি শিমুল।”

মিলি মিষ্টি হেঁসে বলল,
“আপনার কন্ঠ ভীষণ সুন্দর…
আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই শিউলি থামিয়ে দিল।
​শিউলি সোহাগ আর মিলিকে বলল,
“তোমরা বাড়ির ভেতর যাও। আমি শিমুল ভাইয়ের থেকে ব্যাগ নিয়ে আসছি।”

শিউলির কথা অনুযায়ী তারা বাড়ির ভেতর চলে গেল।এবার সেখানে শুধু শিমুল আর শিউলি। শিমুল জিজ্ঞেস করল,
“ওরা কী অয় তোদের?”

​“ওনারা আমার খালা আর দুজন খালার ছেলে-মেয়ে।”

​“ও,” শিমুল ধীর গলায় বলল। শিউলির কাছে শিমুল ভাইয়ের কণ্ঠটা অন্য রকম শোনাল।
​শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“শিমুল ভাই, তোমার কি শরীর ভালো নাই? অসুস্থ তুমি?” শিউলির কণ্ঠে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

​শিমুল মাথা নেড়ে বলল,
“আরে না না, তেমন কিছু না।”

​“তাহলে?” শিউলি আবারও জিজ্ঞেস করল।

​শিমুল পায়ের বুড়ো আঙুল বালুতে ঘষতে ঘষতে বলল,
“ওই পোলাডা তোর দিকে খুব সুন্দর কইরা তাকাইয়া কথা কইছিল। তুইও তো খুব সুন্দর কইরা হাইসা হাইসা কথা কস।”

​শিউলি শিমুল ভাইয়ের কথায় বাক্যহীন তাকিয়ে রইল। লোকটা কি ঈর্ষা (Jealous) করছে? শিউলি হেসে বলল,
“তুমি কি জেলাসি করছো?”

​শিমুল হয়তো শিউলির কথাটা বুঝতে পারল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল।
​শিমুল শিউলির হাতে ব্যাগটা দিয়ে বলল,
“আইচ্ছা যাই এহন আমি।”

​বলেই সে পিছু ফিরল। শিউলি তখনও একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। শিমুল কয়েক কদম সামনে এগিয়ে আবারও পেছনে ফিরল। শিউলির পরনে সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ। ওড়নাটা মাথায় সুন্দর করে দেওয়া। গোসল করে হয়তো ভেজা থাকার কারণে চুল বাঁধেনি। অনেকগুলো চুল সামনে এসে পড়েছে, চোখের ওপর।

​শিমুল ভাই হেসে বলল,
“শিউলি… তোরে সাদা পোশাকে বেশ মানায়। একদম পরীগোর মতোন লাগে।”

​শিউলির মুখে চটজলদি হাসি ফুটে উঠল। শিমুল পেছন ফিরে চলে গেল। শিউলির খুশির যেন অন্ত নেই। শিমুল ভাইয়ের সামান্য একটা কথার কারণে যদি এতটা খুশি হতে পারে, তাহলে যদি কখনো শিমুল ভাইয়ের মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শোনে, তাহলে কী হবে!শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে খুশিতে আকাশে উড়তে।

সত্যিই তাই যারা কিছু চেয়েও না পায়, তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকে।কিন্তু তাদের কপালে সেই অল্পও জুটে না।

#চলবে

(গল্প যে পড়ো তোমরা সেটা আমি কি করে বুঝবো?অন্ততপক্ষে একটা রিয়েক্ট দিও যাতে বুঝতে পারি আমার গল্প কোনো মানুষে পড়ে।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here