বসন্তের_ঝরা_ফুল #পর্ব_৯

0
24

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৯
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে শিউলি নিজের রুমে আসলো। সারাটা দিন ভীষণ ভালো কেটেছে। তবে কিছুটা অস্বস্তির মাঝে ছিল সোহাগকে নিয়ে।
​সোহাগ ছেলেটা বারবার অন্য ভাবে তাকিয়ে ছিল শিউলির দিকে। মেয়েদের আলাদা একটা ক্ষমতা রয়েছে তারা ছেলেদের নজর ধরতে পারে। কোন ছেলেটা কীভাবে তাকাচ্ছে, সেটা মেয়েরা বুঝতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে সোহাগ অনেক ভালো ছেলে, এটা অস্বীকার করা যায় না।
​পরমুহূর্তেই শিউলি নিজেকে বোঝ দিল হয়তো অনেক দিন পর দেখেছে, তাই হয়তো মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছিল।

তা না হলে তো ছোটবেলায় সোহাগের সাথে অনেক খেলা করেছে। শিউলির থেকে সোহাগ কয়েক বছরের বড়।
​শিউলি নিজের টেবিলে বসেই এসব ভাবছিল। হঠাৎ মিলি দৌড়ে এসে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল। এমন ভাবে বসল, যেন বিছানাটাই ভেঙে দেবে। হঠাৎ এমন আকস্মিকতায় শিউলি মিলির দিকে তাকাল।
​পরমুহূর্তেই মিলি এসে শিউলিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে আমি পুরো বাড়ি খুঁজে নিলাম, আর তুমি এখানে?”

“একটু পড়তে বসছিলাম তাই…”

​“আমরা এসেছি, আর তুমি পড়ছো? এটা ঠিক না আপু। এখন শুধু তুমি আমার সাথে গল্প করবে। অন্য কিছুই না।”

বলেই মিলি শিউলির সামনে থেকে বই কেড়ে নিল।
​শিউলি মিষ্টি হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, পড়ব না।”

​মিলি আবারও বলল,
“আপু, এবার বলো না, তুমি মুখে কী প্রোডাক্টস ইউজ করো। প্লিজ বলো।”

​তখনি দরজা থেকে সোহাগ বলে উঠল,
“শিউলি কী ইউজ করে আর না করে, এসব বাদ দে। গ্রামে অনেক গোবর পাওয়া যায়। তুই বললে সেসব গোবর এনে দিই, কী বলিস?”

​এহেন কথায় শিউলি ও মিলি দুজনেই সেই দিকে তাকাল। শিউলি নিজের মুখ চেপে হাসছে। মিলি রাগে মুখ ফুলিয়ে সোহাগের দিকে বালিশ ছুঁড়ে মারল। সোহাগ বালিশটা ক্যাচ ধরে এসে বিছানায় বসল। মিলির ফোলা ফোলা গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,
“হয়েছে, আর রাগ করতে হবে না।”

​মিলির মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে গেল। সে হঠাৎ বলে উঠল,
“ভাইয়া, তোমার মাথার ওপর তেলাপোকা!”

সাথে সাথেই সোহাগ জোরে ‘আহ…’ বলে চিৎকার করে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই বুঝতে পারল মাথায় কিছু নেই, মিলি তাকে ভয় দেখানোর জন্যই বলেছে। সোহাগ তেলাপোকা ভয় পায়, সেটারই সদ্ব্যবহার করল মিলি।
সোহাগ দম নিয়ে বলল,
“তুই আমার বোন নাকি শত্রু?”

সোহাগের কথার পরিপ্রেক্ষিতে মিলি মুখ ভেঙাল।শিউলি সেই হেসেই যাচ্ছে। শিউলির একবার হাসি শুরু হলে আর থামার নাম থাকে না।
​এবার সোহাগের নজর গেল শিউলির দিকে। ছেলেটা এক নজরে তাকিয়ে রইল। কী সেই স্নিগ্ধ হাসি! সোহাগের মনে হলো, এই হাসির দিকে তাকিয়ে থেকে সারাজীবন অচিরেই কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব। সোহাগ পলকহীন চেয়ে রইল।
​শিউলি সোহাগকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজের হাসি থামিয়ে দিল। শিউলি অস্বস্তিতে পড়ল।
​শিউলি এবার বলল,
“অনেকটা রাত হয়ে গেছে, এবার ঘুমানো উচিত।”

​সোহাগ নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“মাত্র দশটা বাজে, এখনি ঘুম…?”

​“হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। শহরে হয়তো এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না। তবে তাড়াতাড়ি ঘুমানো আর সকালে ঘুম থেকে ওঠা ভালো। গিয়ে দেখুন, এখন গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ ঘুমে আছে,” শিউলি হেসে বলল।

​সোহাগ মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। কাল সকাল সকাল উঠে না হয় গ্রাম ঘুরতে বের হবো। গুড নাইট।”

​শিউলি মাথা নেড়ে বলল, “শুভ রাত্রি।”

ঘরের মৃদু আলোয় শিউলি ও মিলি পাশাপাশি শুয়ে আছে। শিউলি সাধারণত পুরো ঘর অন্ধকার করেই ঘুমায়, কিন্তু মিলি অন্ধকারে ভয় পায় বলেই আলোটা আজ বন্ধ হয়নি।
​মিলি পাশ ফিরে শিউলির দিকে তাকাল। কিছুটা কৌতূহলী কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল,
“আপু, তুমি কি কারো সাথে প্রেম করো?”

​শিউলি উত্তরে ‘প্রেম…!’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

মিলি আবার বলল, “হুম, কাউকে কি তোমার সত্যি খুব ভালো লাগে?”

​শিউলি চোখ বুজল। সে ডুবে গেল তার শিমুল ভাইয়ের কল্পনায়। লোকটা কি তাকে ভালোবাসে? তার মতো কি শিমুল ভাইয়েরও হৃদয় পোড়ে? শিউলি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ফিসফিস করে বলল,
“প্রেম কিনা জানি না। তবে ভালোবাসি একজনকে। যে রয়েছে আমার কল্পনার ঘরে, যাকে আমি চাই আমার প্রত্যেকটা মুহূর্তে। সে যেন আমার নিঃশ্বাসেরও অংশ।”

​মিলি মুগ্ধ হয়ে শুনল শিউলির কথা। তার চোখে রাজ্যের কৌতূহল। সে আরও ইচ্ছুক হয়ে বলল,
“সে কে আপু? সেও বোধহয় অনেক সুন্দর, অনেক হ্যান্ডসাম?”

​শিউলি ধীর শব্দে হাসল। হাসিটা করুণ হলেও তাতে ছিল এক অনাবিল তৃপ্তি। ছাদের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“সে আমার চোখে রাজপুত্র। তাকে পেয়ে গেলে আমার দুনিয়ায় আর কিছু চাওয়ার থাকবে না।”

​মিলি শিউলির দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তার চোখে তখন স্বপ্নীল ঘোর। ধীরে ধীরে সে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল। শিউলির কথাগুলো যেন তার হৃদয়ে নতুন করে ঢেউ তুলল।
​মিলি মনে মনে একান্তে বলল,
“আমিও প্রেমে পড়েছি আপু। ভীষণভাবে পড়েছি। এক দিনে একজনকে এত ভালো লাগা যায়!”​

★★★

শিমুল খাটে শুয়ে একবার এদিক আরেকবার ওদিক করছে। আজ ছেলেটার ঘুম আসছে না। কিন্তু কেন ঘুম আসছে না? বারবার তৃষ্ণা পাচ্ছে। এর মাঝে পানিও খেয়েছে পিপাসা মেটানোর জন্য, কিন্তু মিটছেই না। তাহলে কিসের তৃষ্ণা পেল? গলার নাকি মনের?

​এমনিতেই শিমুল সন্ধ্যা নয়টা নাগাদই ঘুমিয়ে পড়ে, অথচ এখন রাত এগারোটা পার হয়ে গেছে, তবুও ঘুম আসছে না। আজ কি ঘুমেরা অভিমান করল? শিমুল চোখ বন্ধ করে ঘুমাতে চাইলে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটা মেয়ের কাজল কালো চোখ দুটো। সেই সরু নাক, বাঁকা ভ্রু, গোলাপি ঠোঁট। এত কেন আজ মনে পড়ছে মেয়েটাকে? এর আগেও তো অনেকবার দেখেছে, তবে আজকের মতো মনে পড়ছে না।

​শিমুল উঠে বসল। সে মনে মনে ভাবল,
‘আইচ্ছা, শিউলি কি ওই পোলাটার লগে এভাবেই হাইসা হাইসা কতা কইতাছে?’
এটা ভাবতেই তার মনের ভেতর উতালপাতাল ঝড় বইতে শুরু করল। এক তীব্র অস্থিরতা তাকে গ্রাস করল।
​শিমুল চৌকি থেকে নেমে মাটিতে পা রাখল। সে ধীর হাতে কাঠের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

​সে সোজা চলে গেল শিউলিদের বাড়ির পেছনে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে শিউলির রুমের জানালার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। কিসের তাড়নায় এখানে আসা, শিমুলের জানা নেই। সে শুধু জানে এখানে না আসলে সে যেন দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে।
​হঠাৎ জানালাটা খুলে গেল। জানালার ওপারে দেখা গেল লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে থাকা শিউলি বাইরে দৃষ্টি রাখল। হঠাৎ শিমুল ভাইকে দেখে শিউলির মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। ‘এই লোক এখন কী করে এখানে?’ প্রশ্নটা উঁকি দিল তার মনে।

​শিমুল এক ধ্যানে তাকিয়েই রইল।
​শিউলি জলদি নিজের মাথায় ওড়না টেনে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। শিউলির মনে তখন তার বাবার মারের জন্য কোনো ভয় কাজ করছে না এক অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শিউলি দরজাটা ধীরে খুলে বেরিয়ে আসলো। পায়ে জুতো নেই। সে দৌড়ে গেল বাড়ির পেছনে।
​সেখানে শিউলি ফুল গাছটার নিচে শিমুল ভাই দাঁড়িয়ে। লোকটার পরনে লুঙ্গি আর ছাইরঙা শার্ট। শিউলি একদম শিমুল ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শিউলির হৃৎস্পন্দন দ্রুতলয়ে উঠানামা করছে। কিন্তু তার চোখ সরাতে পারছে না শিমুল ভাইয়ের মুখ থেকে।

শিমুলের এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে তার তৃষ্ণা মিটে গেছে। এতক্ষণ ধরে তার মানে শিউলিকে দেখারই তৃষ্ণা পেয়েছিল। শিমুল কোনো দিন এতক্ষণ একই ভাবে পলকহীন শিউলির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেনি, কিন্তু আজ ছেলেটা পলকহীন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের দু’জনেরই চোখ এক বিন্দুতে সীমাবদ্ধ।
​অনেকক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর শিউলি ধীর কণ্ঠে বলল,
“শিমুল ভাই… এত রাতে এখানে কেন আসলে?”

​শিমুল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই বলল,
“জানি না, শুধু জানি ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল। তোকে দেখবার তৃষ্ণা।”

​শিউলির মনে হচ্ছে সে যেন স্বপ্নে দেখছে। সে মনে মনে দোয়া করছে, ‘আল্লাহ, এটা স্বপ্নও যদি হয়, তাহলে এই জনমে যেন এই স্বপ্ন না ভাঙে।’ কিন্তু এটা সত্যিই বাস্তব। শিমুল ভাইয়ের মনও শিউলির ভালোবাসায় রঙিন হচ্ছে।
​বসন্তকালে যেমন ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি, আজ এই মধ্যরাতে রঙিন হয়ে উঠল দুজন মানব-মানবীর মন। জোৎস্নার আলোকছটায় তাদের মুখে যেন এক মুগ্ধতা খেলা করছে।
​শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে, এখন যদি একবার শিমুল ভাই ভালোবাসার কথা বলত!
​শিমুল বসহজ সরল কন্ঠে বলল,
“শিউলি, আমার এহন রাইতে ঘুম আইয়ে না। খালি দেখবার মন চায় তোরে। আমার কোন অসুখ হইলো?”

​শিউলি শিমুল ভাইয়ের সাগরের মতো গভীর চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“একই রোগের রোগী তো আমি নিজেই শিমুল ভাই। কী করে তোমার প্রশ্নের জবাব দিই?”

তখনি হঠাৎ কিছু একটার শব্দ শুনে শিমুল ও শিউলি দুজনেই থমকে তাকাল। দেখল, একটি বিড়াল দ্রুত দৌড়ে চলে গেল। এই সামান্য শব্দেই তাদের স্বপ্নের ঘোর কাটল।
​শিমুল এবার বলল,
“শিউলি, ঘরে যা। তোর আব্বা দেখে নিলে তোরে আবারও মারব।”

​শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে না যাওয়ার জন্য, তবুও না গিয়ে উপায় নেই। এমন একটি দিনের অপেক্ষা শিউলি কত রাত করেছে! একবার যদি শিমুল ভাই নিজ থেকে আসত! একবার যদি শিমুল ভাইকে দেখত! সেই ইচ্ছে পূরণ হলো আজ। এর চেয়ে সুখের আর কী হতে পারে! এই হৃদয়ে এত সুখও কি সইবে?
​তাদের মন ভরা এই ভালোবাসার পরশ কি সফল হবে? দুটি নিষ্পাপ ফুলের কি মিলন ঘটবে…?

#চলবে…

(কেমন হলে জানাবে।আর আগাীকাল শুক্রবার গল্প আসবে না।এমনকি কোনো শুক্রবারেই গল্প আসবে না।শুক্রবার গল্প লিখতে ভীষণ আলসামি লাগে।তাই কেউ অপেক্ষা করো না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here