#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১০
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
সকাল অনেকটা হয়েছে। বারান্দার গ্রিল গলে মিষ্টি রোদ উঁকি দিয়েছে ঘরের ভেতরে। নরম উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে বিছানার চাদরে।
ঠিক তখনই মিলির ডাকে শিউলি থরফরিয়ে উঠে বসল। হাতের তালু দিয়ে চোখ ঘষে মিলির দিকে তাকাল। মেয়েটি তখন হাসছে।মিলি বলল,
“কী আপু! তুমি রাতে আমাদের তাড়াতাড়ি শুয়ে তাড়াতাড়ি ওঠার জন্য বললে। আর তুমি এখন এতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছো?”
শিউলি ঘোর কাটাতে পারছিল না। সে জিজ্ঞেস করল,
“কয়টা বাজে?”
“দশটা।”
শিউলি চোখ বড় বড় করে তাকাল। দশটা বেজে গেছে! অথচ রাতেই সোহাগ আর মিলিকে সে সকাল সকাল ওঠার কথা বলেছিল। আর নিজেই কিনা এতক্ষণ ঘুমাল! না ঘুমিয়েই বা কী করবে! এত রাতে ঘুমাতে গেছে, তার ওপর আজকের ঘুমটা হয়েছে অনেক ভালো গভীর ও তৃপ্তিদায়ক।
রাতের স্মৃতি মনে পড়তেই শিউলির মুখে এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। মধ্যরাতের সেই গোপন সাক্ষাৎ, শিমুল ভাইয়ের সহজ স্বীকারোক্তি, আর তার পলকহীন মুগ্ধ চাহনি সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।
শিউলির মুখে হাসি দেখে মিলি জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো আপু, হাসছো কেন? আর শোনো, ব্রেকফাস্ট আমরা সেই কখনোই করে নিয়েছি। তুমিও এবার উঠে খেয়ে নাও। তারপর আমরা গ্রাম ঘুরতে যাব।”
শিউলি বালিশের পাশ থেকে ওড়না জড়িয়ে উঠে দাঁড়াল।
রুম থেকেই সবার প্রথম মুখামুখি হলো সোহাগের। ছেলেটা টি-শার্ট পরে আছে। শিউলি পাশ কাটিয়ে চলে গেল কলের পাড়ে।
সোহাগ তাকিয়ে রইল শিউলির দিকে। মেয়েটার ভ্রুর পাশেই একটা ব্রণ হয়েছে। যার কারণে গতরাতের চেয়ে আরও বেশি সুন্দর লাগছিল। মেয়েটার মুখে আলাদা একটা মায়া আছে বলেই সোহাগের মনে হয়। মনে হয়, মেয়েটাকে সৃষ্টিকর্তা কোনো দিক থেকেই কমতি রাখেননি।
সোহাগ নিজের মাথায় আলতো করে একটা চড় দিয়ে মনে মনে বলল, ‘উফফ, এভাবে তাকিয়ে থাকিস না। নজর লেগে যাবে।’
হঠাৎ পেছন থেকে মিলি বলে উঠল,
“কী হয়েছে ভাইয়া? কুচ তো ডাল মে কালা হ্যায়।”
এরকম কথায় সোহাগ চমকে পেছন ফিরল। মিলি দাঁড়িয়ে হাসছে। মিলি’কে দেখে রেগে বলল,
“চুপ থাক তুই! বেশি বুঝিস।”
★★★
শিউলি, সোহাগ, আর মিলি তিনজন বাড়ি থেকে বের হলো। মিলি বায়না ধরল, সে প্রথম শিমুলদের বাড়ি যাবে। তাই সবার প্রথমে শিমুলদের বাড়িতেই ঢুকল তারা।
আছিয়া খাতুন তখন উঠোনে বসে নকশি কাঁথা সেলাই করছিলেন। তিন জনকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“শিউলি, তোর লগে ওরা কারা?”
“চাচি, ওরা আমার খালাতো ভাই আর খালাতো বোন। শহর থেকে এসেছে।”
মিলি গিয়ে শিমুলের মায়ের পা ছুঁয়ে অতি-নম্রভাবে সালাম করল। শিউলি, সোহাগ দুজনেই অবাক। সাথে আছিয়া বেগমও অবাক হয়ে পা পেছনে সরিয়ে নিলেন।
শিউলি মনে মনে ভাবছিল, ‘এসব কী! এই মেয়ে কি পাগল হলো! মিলি তো এমন মেয়ে নয়!’
আছিয়া বেগম বাঁধা দিয়ে বললেন,
“এসব করছোটা কী মা? আমাকে সালাম করছো কেন?”
মিলি মিষ্টি করে হেসে বলল,
“এমনি আন্টি।”
শিউলি মিলিকে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী সমস্যা তোর? এরকম এত ভালো সাজছিস কেন? আর তুই তো সালাম করার মতো মেয়ে না!”
মিলি হাসি দিয়ে বলল,
“আপু, পরে তোমাকে একসময় বলব।”
শিউলি হয়তো কিছুটা হলেও বুঝতে পারছিল মিলির আচরণে কী চলছে, কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করল না।
আছিয়া খাতুন বললেন,
“তোমরা বোসো। কিছু না খেয়ে যাবে না।”
শিউলি মিষ্টি হেসে বাঁধা দিল, “না চাচি, এখন যাই। পরে একসময় আসব।”
বলেই তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।।তারা তিনজন হাঁটছে। আর মিলি বারবার জিজ্ঞেস করছে, ‘এটা কী?’, ‘ওটা কী?’ এর মাঝে একবার জিজ্ঞেস করে বসল,
“শিমুল ভাই কোথায় আপু?”
হঠাৎ শিউলি রেগে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকাল। শিউলির এমন চাহনি দেখে মিলি ঘাবড়ে গেল। সে এমন কী করল, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। মিলি তোতলিয়ে বলল,
“ক… কী হয়েছে আপু?”
শিউলি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের রাগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“শিমুল ভাই বলে ডাকবি না। ডাকলে শুধু ভাইয়া ডাকবি।”
শিউলির রাগের কারণ মিলি বুঝতে পারল না। এতক্ষণ হাসি-খুশি থাকা মেয়েটা চুপ করে গেল। সে যে শিউলির কথায় কষ্ট পেয়েছে, তা শিউলি ঠিক বুঝতে পারছিল। মিলি একদম নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে।
শিউলি মনে মনে অনুতপ্ত হলো। এই পর্যন্ত এতটা কড়া ভাষায় সে কখনো মিলির সাথে কথা বলেনি। কিন্তু কী করবে! অন্য কেউ ‘শিমুল ভাই’ বলে ডাকলে তার হিংসা হয়। এতটাই হিংসা যে মনে চায় গলা চেপে ধরতে!
শিউলি মিলির দিকে তাকাল। শিউলি মিলির একদম কাছে ঘেঁষে জিজ্ঞেস করল,
“রাগ করেছিস?”
মিলি শুধু দুইদিকে মাথা নাড়াল। শিউলি আবারও বলল,
“বোকা! অভিমান করার কী আছে? শিমুল ভাই তো তোর থেকে অনেক অনেক বড়, তাই শুধু ভাইয়া বলে ডাকবি।”
সাথে সাথে মিলির মন ভালো হয়ে গেল। সে বলল,
“ও আচ্ছা, ঠিক আছে।”
সোহাগ নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছে। মিলি কিছুটা এগিয়ে এগিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মেয়েটা ভীষণ খুশি। অবশ্য খুশি হওয়ারই কথা। এরকম সুন্দর প্রকৃতিতে কে খুশি না হয়েই বা পারে! আর যদি সেটা হয় বসন্তকাল, তাহলে তো কথাই নেই।
সোহাগ শিউলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“Your village is very very beautiful.”
শিউলি হেসে বলল, “হুম।”
সোহাগ আবারও শিউলির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“সাথে তুমিও অনেক সুন্দর। গ্রামের মেয়েরাও যে এতটা সুন্দর হতে পারে, তা তোমাকে না দেখলে বুঝতামই না।”
শিউলি এবারের কথায় হাসল না। সোহাগের থেকে এরকম প্রশংসা শুনলে যে কেউ খুশি হতো। শিউলিও হয়তো খুশি হতো, তবে সেটা একমাত্র শিমুল ভাইয়ের মুখ থেকেই। শিউলি বলল,
“আপনি জানেন না বা দেখেননি, সেটা আপনার ব্যর্থতা। তবে আমার থেকেও অনেক সুন্দর সুন্দর মেয়ে পল্লীর আনাচে-কানাচে পড়ে থাকে। কিন্তু তাদের রূপের প্রশংসা করার মতো কেউ নেই।”
★★★
শিউলিরা গ্রাম হেঁটে চলছে, আর তার চোখ খুঁজে ফিরছে শিমুল ভাইকে। কিছুটা দূরে যেতেই দেখল লোকটা শিমুল ফুল গাছটার নিচে বসা।
শিমুল ভাইকে দেখেই মেয়েটার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
তাদেরকে দেখে শিমুল উঠে দাঁড়াল। সোহাগের সাথে গতকালই শিমুলের কথা হয়েছে।
সোহাগ শিমুলের হাতে হাত রেখে বলল,
“কী অবস্থা? কেমন আছেন?”
“হুম, ভালা। আপনে কেমন আছেন?” শিমুল তার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষ্যমতে বলল।
দুজন এক সাথে গল্প শুরু করল। সোহাগ ছেলেটা ভীষণ মিশুক, আর শিমুল ভাইও মিশুক অনেক। শিউলি তাকিয়ে রইল শিমুল ভাইয়ের মুখপানে। গতকাল রাতের স্মৃতি মনে পড়তেই তার মন চাচ্ছে যেন এখনি নেচে ওঠে।
বেশ কিছুক্ষণ শিমুল ফুল গাছের তলায় বসে রইল তারা।
মিলি আবার বলল,
“চলো, এবার যাই। দুপুর হয়ে আসছে তো!”
এবার তারা উঠে দাঁড়াল।
সোহাগ আর শিউলি এক সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তাদের থেকে কিছুটা পেছনেই শিমুল ও শিউলি হাঁটছে।আজ শিমুল ভাইয়ের মুখে হাসি দেখা যাচ্ছে, তবে সেটা আড়ালেই।
শিউলি বলল,
“শিমুল ভাই, এভাবে হাসছো কেন?”
শিমুল সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল,
“কই না তো! কই হাসছি?”
“আজও কি যাবে আমাদের বাড়ির পেছনে?”
শিমুল শিউলির দিকে তাকাল, আবারও মুখ ফিরিয়ে নিল। কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“আমি তোরে দেখবার লাইগা তোগোর বাড়ির পেছনে যাই নাই?”
“তাইলে কেন গেছিলা?”
“তোগোর বাড়ির পেছনে একটা চোর দেখছিলাম, তাই গেছিলাম।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের কথার পরিপ্রেক্ষিতে হেসে উঠল। শিমুল শিউলির হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। শিমুল ভাই অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। ‘কী অদ্ভুত! আমার মনে তো এরকম ঝড় কখনোই উঠত না। তাহলে এখন কেন এমন হইতেছে?’ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল।
হঠাৎ শিমুল ভাই বলে উঠল,
“জানিস, তোর হাসিটা ভয়ংকর সুন্দর। মনে হয়, তোর হাসির দিকে তাকাইয়া একটা জনম পার করা যাইব।”
কথাটা বলেই শিমুল থমকে গেল। ‘আমি ক্যান এমন কইলাম? কী কারণে কইলাম?’
শিউলির হাসি থেমে গেল। সে ততক্ষণাৎ শিমুলের দিকে তাকাল। তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই কথাটা তার শিমুল ভাই বলছে তো! শিউলি বলল,
“তাহলে বিয়ে করে নাও। সবসময় আমার হাসি দেখতে পারবে।”
শিমুল যেতে যেতেই বলল,
“ক্যান তোরে আমি বিয়া করমু?”
শিউলির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তার কণ্ঠ থেকে বিস্ময় ঝরে পড়ল,
“ক্যান করবা মানে? তুমি আমারে ভালোবাসো না?”
শিমুলের পা থেমে গেল। সে ঘুরে দাঁড়াল।
“তোরে কহন কইলাম তোরে ভালোবাসি আমি?”
শিউলি কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“ক্যান ভালোবাসো না আমারে? আমার মাঝে কী নাই? কোন দিক দিয়ে কমতি আছি আমি?”
শিমুলের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। শিউলির ভীষণ কান্না পেল। এই দুই দিন যতটা আনন্দ পেয়েছে, এখন ঠিক ততটাই কষ্ট পাচ্ছে।
“আসলে তোমরা পুরুষ মানুষ মেয়ে মানুষের মন নিয়া খেলতে খুব ভালো পারো। যদি ভালো না বাসো, তাহলে এত দরদ দেখাও ক্যান? গতকাল ক্যান এত মিষ্টি মিষ্টি কথা কইলা? তুমি ভালোবাসা বোঝো না এই কথাটা মানতে আমার ভীষণ কষ্ট হইতাছে।” বলেই শিউলি দৌড়ে চলে গেল।
শিমুল পেছন থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তার মাঝে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। এতটাই যন্ত্রণা, মনে হচ্ছে মাথা ফেটে যাবে। তার মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরছে, ‘আমি ভালোবাসি শিউলিকে? গতকাল ক্যান শিউলিরে দেখবার লাইগা এত মন ছটফট করছিল?’ কিন্তু এখন আর ওইরকম অনুভব হচ্ছে না।
#চলবে…

