যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:১৮]

0
32

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৮]

অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি রাত। চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে কুনোব্যাঙের কর্কশ ধ্বনি। আজ রাতে খেতে বসে অদ্ভুতভাবে বড়ো চাচার সাক্ষাৎ পেয়ে গেলো নাজির। নাহলে রোজ তাকে আর পারভেজকে রাতের খাবারটা একাই খেয়ে উঠতে হয়‌। চাচী ফরিদা বরাবরের মতো স্বামী ফিরলে তাঁর সঙ্গেই খেতে বসেন।

হাত ধুয়ে এসে সোজা মাদুরে বসে পড়লেন আমিরুল শাহ। পারভেজ সবে ভাত মাখাতে শুরু করেছে। নাজিরের খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,“রান্ধা কেমন হইছে?”

“ভালাই। ক্যান, আমনে রানছেন?”

সর্বদা ত্যাড়ামি করা এই ছেলের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমিরুল শাহ আজ আর তাতে বিরক্ত হলেন না। স্ত্রী ভাত বেড়ে দিতেই শিম ভর্তা দিয়ে মাখাতে লাগলেন। খেতে খেতে খোশমেজাজে স্ত্রীর প্রশংসা করলেন,“মজাই হইছে। তবে ঝাল একটু বেশি। বেশি ঝাল আমার আবার সহ্য হয় না।”

লোকটার ভালো আচরণে স্ত্রীসহ উপস্থিত সকলেই অবাক হলো। নাজির আড়চোখে একপলক দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। আমিরুল শাহ আঙুল চেটে পাতে তুলে নিলেন এবার মাছের মাথা। বললেন,“আকবর মিয়ার লগে দেখা কইরা কী কথা কইছোস রে, নাজির?”

“আমনে জানলেন কেমনে?”

“হুনলাম আরকি।”

“পিছে লোক লাগাইছেন নাকি? কয়দিন ধইরা কই যাই, কী করি সব খবর কেমনে পান?”

হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা মলিন হলো তাঁর। নিজের ছেলে থেকে শুরু করে ছোটো ভাই এবং তাঁর ঘরের ছেলেরা পর্যন্ত লোকটাকে ভয় করে, সমিহ করে চলে। শুধু এই নাজিরটাই ভয় পায় না। উল্টে তাঁকেই মাঝেমধ্যে ভয় পাইয়ে দেয়। সাথে মুখের উপর বলে দেওয়া কড়া কথা তো আছেই। পাঁশুটে মুখে বললেন,“লোক লাগানের মতো অত সময় আমার নাই। কথাডা হুনছি কালা মিয়ার কাছে। হেয়ই দোকান পাড় যাওয়ার সময় তগো দুইজনরে এক লগে দাঁড়াইয়া থাকতে দেখছে। কথাডা আমার কানে আইতেই আমি অবাক হইলাম। নাজির তো শত্রু গো লগে কথা কওনের মানুষ না।”

“ওহ।”

“কী কইছে বুইড়া?”

“একটা প্রস্তাব দিছে।”

খাওয়া থামিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালেন আমিরুল শাহ। মুখমন্ডলে বিস্ময়। নাজির বললো,“জিগাইবেন না, কী প্রস্তাব?”

“কী প্রস্তাব?”

“বিয়ার প্রস্তাব।”

“কিহ! কার লগে?”

“হের নাতনির লগে। বুইড়া আমারে নাতজামাই বানাইতে চায়।”

কাশি উঠলো আমিরুল শাহর। মুখের ভাত সম্ভবত গলায় আটকে গিয়েছে। ফরিদা দ্রুত স্বামীর মুখের সামনে পানি ধরলেন। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে সবটুকু পানি শেষ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি। কাশি কিছুটা কমেছে এবার। থম মেরে বসে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। কথাটা কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না তাঁর। এত বছর পর কী চাই ওদের? কী চলছে বুড়োর মাথায়? খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে বাবার খাবার নিয়ে উঠতে যাচ্ছিল নাজির। তাকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বলে উঠলেন,“কোন মাইয়া? হেইদিন বিচার হইলো যে?”

“হ।”

“তুই কী কইছোস?”

“কিছু কওনের সুযোগ পাই নাই। বুইড়া আমারে ভাউ দিলো না। শুধু কইলো ভাব, সময় নে।”

“রহস্যের গন্ধ পাইতাছি। হঠাৎ কইরা নাতিন দিতে চায় ক্যান? বাপ, দাদার মতো ভুল করিস না, নাজির। খাল কাইট্টা বাড়িত কুমির ঢুকাইস না।”

“বলদ মনে হয় আমারে?”

“আরেকবার কইলে মুখের উপর না কইরা দিবি। আমি নিজে তোর বিয়া দিমু। উচ্চ বংশীয় সুন্দরী মাইয়া আইন্না দিমু। তুই চিন্তা করিস না, বাপ। ওরা ভাবছে, বাপ ছাড়া নাজির শাহ একলা। কিন্তু তোর পাশে তোর চাচারা আছে।”

“কত যে আছে তা দেখা শেষ। নিজের পোলার কথা ভাবেন। বড়ো পোলা বিয়া দিলেন, মাইয়া বিয়া দিলেন কিন্তু ছুডো পোলাডারে এমনে বিয়া না দিয়া বেকার বসাইয়া রাখছেন ক্যান? সামিউল ভাইয়ের লগে কামে পাডান। পরে দেহা যাইবো আমনের মতো আমনের বড়ো পোলায়ও ছুডো ভাইরে ঠকাইয়া একলা সব ভোগ করতাছে। যতই হোক, রক্ত তো!” বিদ্রুপপূর্ণ শোনালো নাজিরের বাক্যগুলো।

আমিরুল শাহর চোয়াল শক্ত হলো। কড়া স্বরে বলে উঠলেন,“তুই কার লাহান হইছোস? বাপের লাহান?”

“একদম না। একেবারে বড়ো চাচা আমিরুল শাহর বান পাইছি।”

খাবারের থালা আর জগ ভর্তি পানি নিয়ে বাবার ঘরের দিকে চলে গেলো নাজির। আমিরুল শাহ চমকায়, থমকায়। গলা দিয়ে খাবার আর নামতে চায় না। নাজির সত্যিই যেন তাঁর প্রতিচ্ছবি। যুবক বয়সে তিনিও তো এমন ছন্নছাড়াই ছিলেন! কারো কথা শুনতেন না, পিতার মুখে মুখে তর্ক করতেন। তাহলে কী! তাহলে কী এই ছেলেও তাঁর পথেই হাঁটছে? তবে তো ঘোর বিপদ নাচছে শাহ বংশের ওপর! খাওয়া ছেড়ে হাত ধুয়ে উঠে কাচারি ঘরে চলে গেলেন তিনি। ধরালেন একটা চুরুট। চিন্তায় মাথা ভার হয়ে আসছে। এই ছেলেটা কী শান্তি দেবে না একটুও?

সবকিছু গোছগাছ করে ফরিদাও ঘরে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন,“খাওন ফালাইয়া চইল্যা আইছেন ক্যান? কী হইছে?”

“কিছু হয় নাই, তবে হইতে কতক্ষণ।”

“কী?”

“তোমার ভাই কই? বহুদিন তারে দেখি না। আব্বাসরে দিয়া খবর পাঠাও। আমি নাজিরের বিয়া দিমু।”

ফরিদা মাথা নাড়িয়ে ঘরে চলে গেলেন। সুবহান আলী শাহকে বসিয়ে ভাত মাখালো নাজির। রাতের আর সকালের খাবারটা সে-ই খাইয়ে দেয় বাবাকে। দুপুরেরটা খাওয়ায় কলিমের মা, নইলে বিথী। গোসলটাও মাঝেমধ্যে নাজির করায়। ছেলের হাতে তৃপ্তি করে খান লোকটা। যেন সদ্য জন্মানো এক বাচ্চা ছেলে। বাবাকে খাওয়াতে খাওয়াতে একপর্যায়ে নাজির বললো,“কথা আছিলো, আব্বা।”

“অ্যা?”

“কেমনে যে কই?”

বাড়িয়ে দেওয়া লোকমা মুখে তুললেন না সুবহান আলী শাহ। ভ্রু কুঁচকে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কাঁধে স্নেহভরা হাত রেখে মুখ দিয়ে শব্দ করলেন। মুখ দিয়ে শব্দ করলেই লালা বের হয়। নাজির তা মুছে মুখে জোরপূর্বক খাবার ঢুকিয়ে দিলো,“চিন্তার কিছু না। খাও তো।”

থেমে বললো,“আকবর মিয়া আছে না? ওই যে মাস্টর বাড়ির বুইড়া? হঠাৎ কইরাই হের নাতনির লাইগা বিয়ার প্রস্তাব দিছে। দেওয়ার পর কইলো তোমারে জানাইতে। তুমি যা সিদ্ধান্ত নিবা তাই মাইনা নিতে।”

লোকটা থম মেরে রইলেন। মাথার চুলে বহু আগেই পাক ধরেছে। থুতনির নিচে অল্প একটু দাড়ি। নাজির ছেঁটে দেয় প্রতি সপ্তাহে। এবার সে চুপচাপ খাওয়াতে লাগলো। সময় দিলো ভাবার। যদিও সে জানে, উত্তরটা বড়ো চাচার মতোই না হবে। তবুও ইশারা দেখতে চায়। খাওয়া শেষে মুখ মুছিয়ে এঁটো থালা-বাসন রেখে এলো নাজির।

সুবহান আলী শাহ হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন তাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। ছেলেটার জন্য বুক ফেটে যায় তাঁর। বাবা হিসেবে নিজেকে ভীষণ অকৃতজ্ঞ লাগে। আজ সুস্থ থাকলে কী আর ছেলেটাকে কেউ ঠকাতে পারতো? নাকি এত কষ্ট করতে হতো তাকে? সেই অল্প বয়স থেকে পরিশ্রম করছে ছেলেটা। বাপ, ভাইয়ের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। এদিক দিয়ে একেবারে বাপের মতোন হয়েছে। তিনিও জোয়ান বয়সে নিজের বাপের কথা মেনে চলেছেন, সেবাযত্ন করেছেন। এই পর্যায়ে এসেই আবার আঁতকে ওঠেন সুবহান আলী শাহ। ছেলে পুরোপুরি বাপের মতো হলে তো সমস্যা! নরম মানুষদের এই বিষাক্ত নগরীর অমানুষেরা শকুনের মতো খুবলে খায়। যেভাবে তাকে খেয়েছিল? চোখ ঘোলাটে হয়ে ওঠে লোকটার। হয়ে যান অস্থির। অস্থির চিত্তে হাত নাড়িয়ে মুখ দিয়ে শব্দ করেন।

নাজির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখে। বুঝতে বেশি একটা সময় লাগে না। আশ্বস্ত করে বলে,“কোনো চিন্তা নাই। এই নাজির শাহরে ভাঙবো এমন কোনো মানুষ এহনো পয়দা হয় নাই, আব্বা। তোমার এই অবস্থা যারা করছে তাগো সবকয়টার অবস্থাও এমনই হইবো। শুধু আরেকটু সময় দেও। পায়ের তলার মাটিডা আরেকটু শক্ত করি। তারপর শুরু হইবো প্রতিশোধের খেলা। ভয়ানক প্রতিশোধ। যা এই গেরামবাসী দেখবো।”

সুবহান আলী শাহ আশ্বস্ত হন। ছটফটানি, চিন্তা কমে। নিষেধ করেন, কখনো যাতে কারো কোনো ক্ষতি না করে। নাজির মাথা নাড়িয়ে মেনে নেয়‌ তা। জিজ্ঞেস করে,“ওই বিষয়ে তো কিছু কইলা না, আব্বা?”

লোকটা পুনরায় মুখে শব্দ করে ইশারায় কথা বলে। চোখ জ্বলজ্বল করছে তাঁর। অবাক হয় নাজির। বিশ্বাস করতে চায় না কিছুতেই। আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে,“হাছাই?”

মাথা নাড়ান তিনি। ছেলের হাত শক্ত করে ধরে ফের বলেন একই কথা। এই প্রথম বাবার মতের সঙ্গে অমিল হয় তার। বিস্ময় কিছুতেই যেন কাটছে না। সেই ভাবনা আর চিন্তায় সারারাত ঘুম হয় না আর। এপাশ ওপাশ করেই ফজরের আজানের শব্দে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে অযু করে যায় মসজিদে।

মসজিদ বলতে গেলে ফাঁকাই। মাত্র এক কাতারও ঠিক মতো মানুষ দিয়ে পরিপূর্ণ হয়নি। অথচ এই মসজিদেই জুমার দিন দাঁড়ানোর জায়গা হয় না।অনেককে পাশের মাঠে পর্যন্ত গিয়ে বসতে হয়। সাধারণত বেশিরভাগ সময় নিজ বাড়িতেই নামাজ পড়ে নাজির। তবে আজ সারারাত মনের ভেতরে চলমান ছটফটানিতে ঘুমাতে না পেরে চলে এসেছে মসজিদে।
নামাজ শেষে দোয়া পাঠ করছেন ইমাম সাহেব। সেই ফাঁকে চারিদিকে নজর বোলালো নাজির। ম্যানেজিং কমিটির একটা সদস্যও আসেনি। শালাদের মুখে ধর্মের বাণী অথচ কাজের বেলা বেরিয়ে আসে আসল রূপ। নামাজের কোনো খবর নেই কিন্তু কমিটিতে বসে আছে ঠিকই। সবকটাকে জনসম্মুখে লজ্জা দেওয়া উচিত।

বাইরে পুরোপুরি আলো ফোটেনি এখনো। মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো নাজির। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো। ভোরের বাতাস সবচেয়ে স্নিগ্ধ, শান্তিময়। মন খারাপ, রোগ, হতাশা ভালো করে দেওয়ার ওষুধ। বাবাকে বহু বছর ধরে বাইরে আনা হয় না, খোলা আকাশের নিচে বসানো হয় না। জীবনের ব্যস্ততায় সেকথা ভুলেই বসেছে ছেলেটা। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, কাল মিল্টনের সাহায্যে ঠিক বাইরে বের করে প্রকৃতিতে বসিয়ে রাখবে কিছুক্ষণ।

“নাজির! ওই নাজির!”

ডাকের উৎস খুঁজতে পেছন ফিরে তাকালো নাজির। চোখেমুখে উপচে পড়া হাসি নিয়ে আকবর মিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো। মাথায় টাক পড়েছে বুড়োর। বুক পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা দাড়িগুলো ধবধবে সাদা। পরনে সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি। দেখে যেন মনে হচ্ছে কোনো এক দরবেশ বাবা। নাজির দৃষ্টি সরিয়ে আরেক পা বাড়িয়ে সামনে হাঁটা ধরলো। এই বুড়োর মাথায় গন্ডগোল আছে। কে জানে, আবার কীসব বলে দেয়?

আকবর মিয়া হাতের মোটা লাঠিতে ভর করে ছেলেটার পিছু নিলেন। মনঃপুত জবাব না পেয়ে আজ কিছুতেই ছাড়বেন না। তালেব, রুহুল, মাসুমরাও দাদার সাথে রোজ মসজিদে আসে। আজও এসেছে। দাদার কান্ড দেখে দুই ভাই অবাক হলো। রুহুল বললো,“দাদাজানে হঠাৎ এই হারামজাদার পিছনে দৌড়ায় ক্যান?”

“বুঝতাছি না। এর লগে দাদাজানের কী?” তালেব বললো। একে অপরের মধ্যে চললো তা নিয়েই কথা। ধীর পায়ে হাঁটা ধরলো দাদার পিছুপিছু। তবে রাখলো দূরত্ব। শাহদের বিশ্বাস নেই। একা পেয়ে কী করে ফেলে কে জানে?

সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলে হয়তো বুড়ো থেমে যাবেন। কিন্তু নাজিরের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে তিনি ডেকেই চলেছেন। নাজিরের কদম ধীর হলো। বিরক্তি নিয়ে সাড়া দিলো,“সমস্যা কী? ভেইন্নাবেলা মেজাজ খারাপ করতে আইয়া পড়ছেন?”

“হুন আমার কথা। তোর আব্বারে কইছিলি?”

“কী?”

“নাটক করবি না।”

“কইছিলাম।”

“কী কইছে তোর আব্বায়?”

আমতা আমতা করল নাজির। তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে পারলো না। আশেপাশে তাকিয়ে শ্বাস নিলো‌। দূরের তালগাছে বাবুই পাখি বাসা বেঁধেছে। সেদিকেই স্থবির হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আকবর মিয়া উৎসুক দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছেন। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে বললেন,“কস না ক্যান, ব্যাটা? রাজি হইছে, তাই তো?”

“হইলেই কী? আব্বায় রাজি হইলেই বুঝি আমনে গো বাড়ির মাইয়ারে আমি বিয়া করমু?”

সন্তুষ্ট হলেন আকবর মিয়া। যেন তিনি আগে থেকেই জানতেন সব। বললেন,“তাইলে আর কী? আয়োজন শুরু করি? মাইয়া তো দেখছোসই। আলাদা কইরা আর দেখাদেখির দরকার নাই। দিনক্ষণ তোরা ঠিক করবি নাকি আমরা করমু? চাচাগো লইয়া কাল, পরশু তবে আয়। আমার বাড়ির দরজা তোর লাইগা সবসময় খোলা। শুভ কাজে দেরি করতে নাই।”

“আমি রাজি না। আমার চাচারা জীবনেও রাজি হইবো না।”

“তোর বাপ রাজি এইডাই গুরুত্বপূর্ণ। তোর চাচাগো আকবর মিয়ায় তোর মতোই গুনায় ধরে না।”

ভ্রু কুঁচকায় নাজির। বিরক্তি নিয়ে বলে,“অত ছোটো মাইয়া বিয়া করমু না। ওয় আমার সংসারের কী বুঝবো? আমার সংসারে অত রাজার হালে থাকতে পারবো না। কাম কইরা খাইতে হইবো।”

“কই ছুডো? কয়েক মাস পর পনেরো হইবো। তাছাড়া ছুডো মাইয়াই ভালা। নিজের মতো শিখাইয়া, পড়াইয়া বড়ো কইরা নিবি। স্বামী ভক্ত হইবো।”

“খাইয়া-দাইয়া তো আর কাম নাই। বিয়া কইরা সংসার বাদ দিয়া বউ পাইলা বড়ো করমু?”

“আমিও প্রথম বিয়া করছিলাম বারো বছরের মাইয়া। তোর দাদার বেলায়ও এমনই আছিলো।এমনকি বিয়ার কালে তোর মায়ের বয়স আছিলো বারো কি তেরো। আমি নিজে ঘটকালি কইরা তোর বাপের বিয়া দিছি। তো কার কী হইছে? এইডাই মাইয়া মাইনষের বিয়ার উপযুক্ত বয়স।”

“আমার আব্বার বিয়া আমনে দিছেন?”

“হ, তোর মায় তো আমার ব…..

বাকি কথাটা শেষ করতে দেওয়া হলো না বৃদ্ধকে। এই কথাটা নাজিরের অজানা ছিল। বড়ো চাচী বলেছেন, মায়ের পালানোতে এরাই নাকি সাহায্য করেছিল। তার মানে কথাটা শতভাগ সত্য। বাবার মতো তার জীবনের সমস্ত শান্তিও কেড়ে নিতে চাইছে বুড়ো। বাবার তো তবুও নাজির আর নওশাদ আছে। কিন্তু নাজিরের কে আছে? কে তাকে বয়ে নেবে মৃত্যু পর্যন্ত? নাজির দাঁতে দাঁত পিষলো। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়ে বললো,“ভালা করছেন কথাডা জানাইয়া। খারাপ বেডিরে পলাইতে আমনেরাই তবে সাহায্য করছেন? এহন তো আমি শতভাগ নিশ্চিত, এই বিয়া করমু না। আমনেগো বাড়ির মাইয়ারে তো একদমই না। শয়তান, ইতর বুইড়া। নামাজ, কালাম পড়ে অথচ শরীর ভর্তি বিষ আর শয়তানি।”

শেষ কথাটা বিড়বিড় করে বললো। আকবর মিয়া থেমে দাঁড়ালেন। এগোলেন না আর। বেয়াদবটা রেগে গেছে। পেছন থেকে চিৎকার করে বললেন,“তুই কী নিশ্চিত যে তোর মায় পলাইছে?”

অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েছিল নাজির। বুড়োর কণ্ঠ দৃঢ়। শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছাতেই আপনাআপনি থমকে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরলো সে। বুড়োর অধরে কুটিল হাসি। কুটিল নাকি রহস্যময়? রাগের মাথায় নাজিরের কাছে তা কুটিলই মনে হলো। আকবর মিয়া বললেন,“তুই কিচ্ছু জানোস না, নাজির। কিচ্ছু না। তোর চোখে কালা পর্দা বান্ধা। আলো দেখবি কেমনে? আলো পাইতে হইলে এই শত্রুর কাছেই ফিইরা আসতে হইবো। সুযোগ কহনো পায়ে মাড়াইতে নাই। আমি জানি, তুই চালাক পোলা‌। তুই ঠিক আইবি। আমি অপেক্ষায় থাকমু।”

বৃদ্ধ কথা শেষ করে পিছু ঘুরে হাঁটা ধরলেন বাড়ির দিকে। রেখে গেলেন যুবক ছেলেটির কৌতূহলী দৃষ্টি। চুল তো আর হাওয়ায় পাকেনি। এমন হাঁটুর বয়সী ছোকরাকে কথার জালে কীভাবে আটকাতে হয় তা তিনি ভালো করেই জানেন।

একটু সামনে এগোতেই নাতিদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসলেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন,“আয় বাড়িত যাই। ক্ষুধা লাগছে।”

তালেব দাদার পিছু হাঁটতে হাঁটতে বললো,“হঠাৎ নাজিরের লগে কী কথা কইলেন, দাদাজান? ওয় কী কোনো ঝামেলা করছে?”

“ওয় আর কী ঝামেলা করবো? ওর নিজের জীবনেই কম ঝামেলা আছে?”

দাদা যে সত্যটা বলতে চান না বুঝে গেলো সে। তাই আর প্রশ্ন করল না বিপরীতে। চুপ রইলো। ইশারায় বাকি ভাইদেরও চুপ থাকার নির্দেশ দিলো।
________

তখন বিকেল। বাড়ির পুরুষেরা আপাতত বাড়িতে নেই। চৌকিদার জিন্নত আলী ক’দিন ধরে অসুস্থ থাকায় ছেলে এসে তাকে নিয়ে গিয়েছে বাড়ি। মিছরি মেঝেতে বসে আছে। মা পেছনে বসে ঘরের তৈরি নারিকেল তেল লাগিয়ে দিচ্ছে চুলে। কিছুটা দূরে বসে দাদী, চাচীরা গল্প করছে প্রতিবেশী নারীদের সঙ্গে। কদিন আগে তার নামে রটা বদনাম নিয়ে সামনাসামনি কথা বলা আপাতত থেমেছে। যদিও পাছে লোকে কত কথাই বলে!

মিছরি আনারস খাচ্ছে।তালেব সকালে গিয়ে কোত্থেকে যেন নিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেই ভাবি পলি কেটে দিয়ে গেলো তাকে। খেতে খেতে মিনমিনে, অভিযোগের সুরে মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,“মা! এখন বিয়ে না করলে হয় না?”

মেয়ের চুল রুক্ষ। বহুদিন হয়তো তেল পড়েনি। তাই আজ তেল দেওয়ার জন্য চেপে ধরেছেন পারুল। অথচ এর মধ্যেই পেয়ে গেলেন তিন তিনটে বড়ো বড়ো উকুন। এখন সেগুলোই মারছেন। অন্য সময় হলে হয়তো এই কথার বিপরীতে ধমক দিতেন তিনি। তবে ওই ঘটনার পর থেকে উঁচু গলায় কথা বলেন না। কোমল স্বরে বললেন,“না, হয় না।”

“আব্বাকে নিষেধ করো না, মা। আমার ভালো লাগে না এতগুলো মানুষের সামনে গিয়ে বসে থাকতে।”

“আর বইতে হইবো না। ঘটকরে আইতে তোর দাদায় নিষেধ কইরা দিছে।”

“তাহলে বিয়ে হবে না?” খুশি হলো সে।

“ছিঃ, কী কয় এইগুলা! হইবো না ক্যান? অবশ্যই হইবো।”

নিভে গেলো সে। ঝট করে উদীয়মান হাসি মিলিয়ে গেলো আড়ালে। পারুল বললেন,“বিয়া প্রত্যেকেরই করতে হয়। এই যে আমার বাপে মাস্টর আছিলো তাও আমার বিয়া দিছে অনেক ছুডো থাকতে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে আমি তোর বাপের সংসারে আইছি। তো কী হইছে? বছরে একবারের বেশি বাপের বাড়ি যাইতে পারি না। তালেব যহন হইছে তহন বয়স পনেরোতে পড়ছে সবে। তার লাইগা কী মইরা গেছি?”

মুখ কালো করে বসে রইলো মেয়েটা। মিষ্টি আনারসও এখনো তেতো লাগছে তার কাছে। হাঁক ছেড়ে ডাকলো,“ভাবি, এটা নিয়ে যাও তো। ভাল্লাগে না আর।”

চলবে ________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here