#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৭]
গোয়াল ঘরের সামনে বাঁধা ডাকাত দলের দুই সদস্য। একটাকে মেরে আধমরা করে ফেলা হয়েছে। অপর জনের হাত থেকে রামদায়ের ভয়ানক আঘাতে ঝরছে রক্ত। সেই রক্তে পরনের লুঙ্গি ভিজে লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে। নাজিরের দয়ার শরীর। তাই রক্ত বন্ধ করতে জাহিদের হাত দিয়ে দুর্বা আনিয়ে লাগিয়ে দিয়েছে ক্ষত স্থানে।
মুমিনুল শাহ দুই হাত পেছনে রেখে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন নাজিরের কান্ড। তাদের পেট থেকে সর্দারের নাম বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে সে। খানিক বাদে বাদে ধৈর্য হারিয়ে তেড়ে যাচ্ছে মারতে। শাহরিয়ার বারবার তাকে আটকাচ্ছে। একপর্যায়ে মুমিনুল শাহ বলে উঠলেন,“আহা! এইবার ছাড় তো, নাজির। কাউরে দিয়া চেয়ারম্যানের আফিসে পাঠাইয়া দে। ওরা বুইঝা নিবো বাকিডা।”
“ওরা কী বুঝবো? পাঁচটা মাস ধইরা ডাকাতি হইতাছে। কিন্তু এহনো পর্যন্ত একটারে ধরতে পারছে? আমি ধরছি। তাই পরেরবার চেয়ারম্যান আমারে বানানো উচিত।”
“হ যা, চেয়ারম্যানের সামনে গিয়া কথাডা ক। ব্যাডায় হাছা ভাইবা মুইত্তা দিবো।”
“থাক তাইলে, দরকার নাই। এহন কন, সদর দরজা খোলা আছিলো ক্যান? যদি আমার একটা গরুও চুরি হইতো তাইলে খবর আছিলো আমনেগো।”
“আমরা কী করছি?”
“দরজা খুইল্যা রাখছেন।”
“সামিউল করছে এইসব।”
“একেবারে বাপের লাহান ধান্দাবাজ হইছে।”
“নাজির!” সামিউল কঠোর স্বরে ডেকে উঠলো।
না শোনার ভান ধরে আশেপাশে তাকালো নাজির। যেন সামিউল নামের কাউকেই সে চেনে না। গ্ৰামের অনেক মানুষ ডাকাত দেখতে শাহ বাড়িতে ভিড় জমিয়েছে। এতদিনকার মনের ক্ষোভ ঝাড়ছে গালি আর থুথুর মাধ্যমে। সব রাগ ভুলে দেলোয়ার এসেও হাজির হয়েছেন সেখানে। কয় মাস আগে এদের হামলার শিকার তাঁর মেয়ে জামাইও হয়েছিল! এসেই গালি দিতে দিতে জুতা খুলে দুই ঘা লাগিয়েছেন গালে। নাজিরের উদ্দেশ্যে কঠোর স্বরে বলেন, “একটারেও ছাড়বি না। এনে বইয়াই মরুক হারামজাদারা। অনেক অত্যাচার করছে, আমার গহনাগুলা লুটপাট করছে।”
“নেন, লগে কইরা বাড়িত লইয়া যান।”
“দে, ডাকাতির শখ ঘুচাইয়া দিমু।”
“না থাক, পরে খুনখারাবি কইরা দোষ দিবেন নাজিরের। এহনো বিয়া শাদি করি নাই।”
সারা পাড়া দৌড়ে লঞ্চে ওঠার অভিমুখে ছুকরাকে ধরে বেঁধেছে নাজির। বাকি যেটা ভেতরে আটকা পড়েছিল সেটা আবার ধরা খেয়েছে সামিউল আর পারভেজের হাতে। বাকি দায়িত্ব চাচাতো ভাইদের হাতে দিয়ে সে বের হলো বাড়ি থেকে। মাথাটা ধরে গেছে একদম।
________
ক’দিন ধরে মাস্টার বাড়িতে ঘটকের আনাগোনা বেড়েছে। নিত্যনতুন পাত্রের বহর বসছে বসার ঘরে।বেশ কয়েকজনকে বাপ, চাচাদের মনে ধরলেও বিয়ের কথা যেন কিছুতেই এগোচ্ছে না। গ্ৰাম পর্যন্ত পাত্রপক্ষ এলেই কারো কানপড়ায় পথ থেকেই ফিরে যাচ্ছে। আবার কেউ বা বাড়ি পর্যন্ত এসে মেয়ে দেখে গেলেও ভেঙে যাচ্ছে বিয়ে। কাশেম আলী এতে বিরক্ত। দিনরাত গালি দিয়ে যাচ্ছেন অসভ্যগুলোকে। তবে তাঁর সেই রাগ, বিরক্তি গিয়ে শান্ত হলো দুপুরের খানিকটা পর।
ডাক পিয়নের মারফত চিঠি এসেছে দুটি। একটি তাঁর নামে, অপরটি স্ত্রীর নামে। প্রেরকের স্থানে লেখা সম্বন্ধি জসিমের নাম। স্ত্রীর চিঠি বিছানায় রেখে নিজের চিঠি পড়ে সন্তুষ্ট হলেন বলেই মনে হলো। তা নিয়েই সোজা হাঁটা ধরলেন পিতার ঘরে। সেই রাতের ঘটনার পর থেকে পিতার সাথে মুখোমুখি কথা হয় না ভদ্রলোকের। নিজের প্রতি লজ্জায়। ওই প্রথম তাঁর মুখের উপর কথা বলেছে সে। এরপরেও কীভাবে? ক্ষমা চাওয়ার জন্য ঘরের সামনে গিয়েও ফিরে এসেছে বারবার। তবে সাহস করে আজ গেলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলো,“আব্বা, আইমু?”
“আয়।”
গম্ভীর কণ্ঠের অনুমতি পেতেই ভেতরে প্রবেশ করলেন কাশেম আলী। আকবর মিয়া আরাম কেদারায় অর্ধ শোয়া। কাশেম আলী এসেই সোজা বসলেন পিতার পায়ের ধারে। চললো দুজনার মধ্যে তুমুল নীরবতা। আকবর মিয়া সায় দিলেন সেই নীরবতায়। নড়লেন না, তাকিয়ে দেখলেনও না। হঠাৎ করেই কাশেমের অস্বস্তি বাড়লো। দরদর করে ঘামতে লাগলেন। অপরাধবোধ কাজ করছে বোধহয়। সেই অপরাধবোধ থেকেই হয়তো মাথা রাখলেন পিতার হাঁটুতে।
আকবর মিয়া এবার চোখ খুলে মাথা নামিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। স্মিত হেসে স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,“কী হইছে?”
“মাথা ঠিক আছিলো না, আব্বা। রাগের মাথায় মুখের উপর কথা কইয়া দিছি। পরের ঘটনা তো আমনে সবই জানেন। মাফ চাইতে পারি নাই। আমারে মাফ কইরা দেন, আব্বা। আর কহনো এমন হইবো না।”
“বহুদিন পার হইয়া গেছে। পুরানা কথা। ভুইল্যা যা।”
“না, আগে কন মাফ করছেন?”
“তুই তোর জায়গায় ঠিক আছিলি, বাপ। আর আমি আমার জায়গায়। তহন আমার মাথায় আছিলো মাইয়াডার সম্মান রক্ষা করা। তাই ঠান্ডা মাথায় কথা কইতে চাইছিলাম। কিন্তু পরে আমি বুঝলাম,মাইয়াগো ভোগ্য সামগ্রী মনে করা অমানুষের লগে কীসের ঠান্ডা মাথায় কথা? তাই আমি রাগ করি নাই। সন্তানের উপর বাপ-মা কহনো রাগ করতে পারে না। তাই মাফ করার কিছু নাই।”
“আব্বা!”
লোকটার কণ্ঠ ভার। আকবর মিয়ার আঁখি ঘোলাটে হয়। অশ্রু জমেছে বোধহয়। ভরা সংসার তাঁর। সবাই সম্মান করে চলে। পুত্র পর্যন্ত কবে কী রাগের মাথায় বলে ফেলেছে তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে পিতার কোলে মাথা রেখে এখন মাফ চাইছে। আর কী চাই বুড়োর? তাঁর তো সুখ আর সুখ! চামড়া কুঁচকানো হাতটা ছেলের মাথায় রাখলেন। বললেন,“কী জানি কইতে আইছিলি?”
কাশেম আলী মাথা তুললেন। মূল কথাটা বলতেই ভুলে গিয়েছেন। চিঠিটা পিতার হাতে তুলে দিয়ে বললেন,“তালেবের বড়ো মামায় নিজের পোলার লগে আমগো মিছরির সম্বন্ধ করতে চায়। আমরা রাজি থাকলে এই মাসেই শুভ কাজ সাইরা ওরে উঠাইয়া লইয়া যাইবো।”
আকবর মিয়া চিঠিটা দেখলেন, পড়লেন। তবে ছেলের মতো আনন্দ তাঁর মুখমন্ডলে দেখা গেলো না। বরং হলেন গম্ভীর। জিজ্ঞেস করলেন,“আরিফের লাইগা?”
“হ।”
“কী জানি করে পোলায়? লেখাপড়া?”
“হ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।”
“তুই রাজি?”
“কম পাত্র তো দেখি নাই, আব্বা। যারা ওই বদনামডা হুনে তারাই মুখ ফিরাইয়া নেয়। আবার কেউ রাজি হইলেও চায় যৌতুক। মাইয়া বিয়া দিলে তো আর খালি হাতে পাঠামু না। কিছু না কিছু লগে দিমুই। তবুও যারা নিজ থাইক্যা চাইয়া নেয় তাগো কাছে কী আর মাইয়া ভালা থাকবো? তাই এই সম্বন্ধটা এহন মেঘ না চাইতেও পানি। আরিফও খারাপ না। পোলা ভালা।”
আকবর মিয়া মাথা নাড়ালেন। কাশেম আলী জিজ্ঞেস করলেন,“আমনের মত কী, আব্বা?”
“মাইয়াডারে কয়েক বছর নিজের থাইক্যা দূরে সরাইয়া রাখছোস। এহন আবার সারাজীবনের লাইগা পাঠাইতে চাস? তাও সরাসরি সেইখানে যাওয়া যায় না। পানি পথে যাতায়াত করতে হয়। বছরে একবার দেখা হইবো কিনা সন্দেহ। থাকতে পারবি মাইয়া ছাড়া? ভালা কইরা ভাব, কাশেম।”
কাশেম আলী এবার মিইয়ে গেলেন। চুপচাপ বসে রইলেন কিছুক্ষণ। মেয়েকে ছাড়া থাকার কথা ভাবনায় আসতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এতদিন বহু কষ্টে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু এবার তো সারা জীবনের ব্যাপার! আকবর মিয়া বললেন, “মিছরি আমার নাতনি। আমিও ওরে ভালোবাসি, বাপ। হয়তো তোর সমান না। কারণ বাপের ভালোবাসার লগে কারো ভালোবাসার তুলনা হয় না। তবে আমি অনেক ভাইবা চিন্তা একটা সিদ্ধান্ত নিছি।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
কীভাবে বলবেন ভেবেই হয়তো পাচ্ছেন না বৃদ্ধ। একটু সময় নিয়ে কথা গোছালেন,“যদি তোর মাইয়ার ভালা ঘরে বিয়াও হয়, আর যহন ইচ্ছা তুই গিয়া তারে মন ভইরা দেইখা আইতে পারোস কিংবা বাড়িত লইয়াও আইতে পারোস তাইলে কেমন হইবো?”
“কন কী, আব্বা? কেমনে? আমনে কী এই গেরামের কোনো পোলার কথা কইতাছেন?” আবাক হলেন তিনি।
“হ।”
“এই গেরামে এমন পোলা কই? তার উপর আমগো মাইয়ার যোগ্য পোলা আছে?”
“আমার মন কয় আছে।”
“কেডায়?”
আবারো কথার মধ্যে বিরতি টেনে থামলেন আকবর মিয়া। সময় নিয়ে বললেন,“সুবহান আলী শাহ’র বড়ো পোলা নাজির শাহ।”
“কিহ!”
হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কাশেম আলী। মাথা ভনভন করছে। নামটা বার দুয়েক আওড়িয়ে আঁতকে উঠলেন।
“এইসব কী কন, আব্বা? রসিকতা করেন? এইডা রসিকতার সময় না। শাহ গো লগে আমগো বহু বছরের শত্রুতা। আমনের লগে কী করছে ভুইল্যা গেছেন? আর ওই নাজির! বেয়াদব পোলা। কেমনে কী?”
“আমি অনেক ভাবছি, কাশেম। বহু বছর ধইরা শুধু ভাইবাই আইতাছি। কিন্তু কোনো কূল কিনারা পাই নাই। আমি বহুরাত শান্তিতে ঘুমাইয়া না, বাপ। সেই ঘটনা স্বপ্নে ভাইসা বেড়ায়। কিন্তু হেইদিন হঠাৎ নাজির আমার ধ্যান কাইড়া নিলো। আমি বাড়িত আইয়া আবারো ভাবলাম। হঠাৎ কইরাই কূল খুঁইজা পাইলাম। আমগো মিছরি সুখী হইবো।”
“হইবো না, আব্বা। অভিশপ্ত বংশ। সবকয়টা খারাপ, জানোয়ার। স্বার্থের লাইগা সব করতে পারে।”
“আমরাও কী কম?”
“আব্বা!”
“তুই কী চাস তোর বাপ আফসোস নিয়া মরুক?”
“না, আব্বা।”
“চাস না প্রতিশোধ নিতে?”
“চাই, আব্বা। শুধু সুযোগের অপেক্ষা।”
“সেই সুযোগই এই বিয়া।”
“কিন্তু আমার মাইয়াডার জীবন যে নষ্ট হইয়া যাইবো।”
“কিচ্ছু হইবো না। আমারে বিশ্বাস করোস না?”
“করি।”
“আমি কহনো তগো খারাপ চাইছি?”
“না।”
“তাইলে এই শেষবার বিশ্বাস কর। বলতে পারোস তোর কাছে এইডা আমার আবদার। কিচ্ছু হইবো না। ওরে আগলাইয়া রাখার লাইগা আমরা সবাই আছি। এক গেরামে বাস। কার কলিজা আছে আমগো মাইয়ার অনিষ্ট করার? একটা ভুল হইয়া গেছে। ওইডা থাইকাই শিক্ষা পাইছি। আর কোনো ভুল হইবো না। ওগো দিয়াই সব কলঙ্ক দূর কইরা প্রতিশোধ নিমু।”
কাশেম আলী ভাবতে বসলেন। পিতার কোনো আদেশ আজ পর্যন্ত ভাইয়েরা অমান্য করেননি। প্রাইমারির গণ্ডি পেরোতেই মা হারিয়েছিলেন। বয়স চৌদ্দ হতেই পিতা বিয়ে করে ঘরে তুলেন সৎ মা।সৈয়দুন নেছার হাতে পাঁচ ভাই-বোনের হাত সঁপে দিয়ে বলেছিলেন, “আইজ থাইক্যা ইনি হইলো তগো মা। কহনো মায়ের অসম্মান করিস না।”
বিনা বাক্য ব্যয়ে তা মেনে নিয়েছিলেন সব ভাই- বোনেরা। বিনিময়ে পেয়েছেন মাতৃস্নেহ। তারপর তাঁর বিয়ে দিলেন পারুলের সঙ্গে। যতই রাগ করুক না কেন, এটা অবশ্য মানতেই হবে যে পারুল নারীটি স্ত্রী হিসেবে অসম্ভব ভালো। সাথে ভালো শ্বশুরবাড়িও। পিতার কথা মেনে নিয়ে কখনো অসুখী হননি তারা। সেখানে মেয়েও হবে না নিশ্চয়ই। বললেন,“শাহরা রাজি হইবো বইল্যা আমনের মনে হয়, আব্বা? খাল কাইট্টা কেউ কুমির ঘরে তোলে?”
“শাহ গো মতামতে কিছু আইয়ে যায় না। কিছু আইলে গেলে লোক সমাগমে কোন ভাতিজায় চাচাগো অমান্য করে?” অদ্ভুতভাবে হাসলেন আকবর মিয়া।
সেই হাসি দেখে কিছু একটা আঁচ করলেন কাশেম আলী। ঘন ঘন মাথা নাড়ালেন। বৃদ্ধ বসা থেকে উঠে গায়ে ফতুয়া জড়ালেন। লাঠিটা হাতে তুলে নিয়ে বললেন,“আমগো লক্ষ্য নাজির শাহরে রাজি করানো। তুই চিন্তা করিস না। কাউরে বলারও দরকার নাই। এই দিক আমি আগে সামলাইয়া নেই, তারপর সবাইরে জানামু।”
কাশেম আলী আচমকাই বলে উঠলেন,“সরলার কথা কী ভাবলেন, আব্বা? ত্যাজ্য যে কইরা দিছেন, এইডা তো সম্ভব না। ধর্মীয় নিয়মের বাহিরে।”
থমকালেন বোধহয় বৃদ্ধ,“রাগের মাথায় মুখে যা আইছে কইয়া দিছি।”
“এইবার?”
“কিছুই না।”
“হাছাই আর সম্পর্ক রাখবেন না?”
এই বিষয়ে কোনোরূপ উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
নাজির ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে। সেই যে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে তারপর আর ওই মুখো হয়নি। মিল্টন আপাতত এখানে নেই। তাকে সে পাঠিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে। ক্ষেতে ধানের চারা লাগানো শেষ। কাঁদা মাড়িয়ে লতিফ আইলের আগাছা পরিষ্কার করছে। ওখানে এবার কচুর লতি চাষ করবে নাজির। ক’দিন আগে কৃষি কর্মকর্তার থেকে পরামর্শ নিয়ে এসেছে।
“নাজির!”
কারো ডাকে পিছু ফিরে তাকালো নাজির।ভ্রু জোড়ার মাঝখানে বেশ কতক ভাঁজ পড়ল। আমন ধানের জমি হয় সমতল ভূমিতে। এই জমিটাও সমতল। দক্ষিণ পাড়ার সরু রাস্তার পাশ ঘেঁষে একেবারে। তবে এটা তার নয়। এলাকারই একজনের থেকে চাষের জন্য বর্গা নেওয়া।
নাজির নিজের স্থানেই বসা। দৃষ্টি এখনো পেছনেই স্থির। আকবর মিয়া এগিয়ে এলেন। ছেলেটার দৃষ্টি অবজ্ঞা করে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে লতিফের ব্যস্ত হাতের দিকে তাকালেন। বললেন,“আমন ধান চাষ করবি এইবার?”
নাজির উত্তর দিলো না। ভেতরে বিস্ময় চাপিয়ে রেখে দৃষ্টি সরালো। ছোটবেলায় মাঠে খেলতে গেলে বহুবার নাম ধরে, হাতের ইশারায় লোকটা তাকে ডাকতো। কিন্তু নাজির কাছে যেতো না। বড়ো চাচা বারণ করে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন,“ওই যে ওই মাস্টর বাড়ির কেউ ডাকলে যাবি না, কিছু দিলে খাবি না। ওরা আমগো শত্রু। তোর আব্বার এই অবস্থা ওরাই করছে। তোরেও মাইরা ফেলবো।”
সেই ভয়ে নাজির যেতো না। দূরে দূরে থাকতো। লুকিয়ে পড়তো ছেলেদের ভিড়ে। কিন্তু নওশাদ একবার তার অগোচরে গিয়েছিল। খেয়েছিল বুড়োর দেওয়া আট আনার বনরুটি। নাজির শুনে তো ভয়ে শেষ! গলায় আঙুল চেপে বমি করিয়েছিল ভাইকে। তারপর বড়ো হতে হতে ভয় রূপান্তরিত হলো ঘৃণায়। বুড়োও গুরুত্ব না পেয়ে ডাকাডাকি বন্ধ করে দিলো। মাঝেমধ্যে তাকিয়ে দেখতো শুধু। একসময় সেটাও বন্ধ হয়ে গেলো।
তাহলে এই বুড়ো হঠাৎ এখানে কেন? আগ বাড়িয়েই বা কথা বলতে এসেছে কেন? সেদিন বাড়ির মেয়েকে ওই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে দেওয়ায়? হতে পারে। আকবর মিয়া বললেন,“আমরা এইবার আর এই ধান লাগামু না। বছরের ধান করা শেষ। তা তোর বছরের ধান হইছে?”
“হ।” মুখ খুললো সে।
আকবর মিয়া নীরব। কীভাবে কথাটা বলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তবুও বললেন,“ডাকাত ধরছোস হুনলাম?”
“হ।”
“গরু চুরি করতে আইছিল?”
“হ।”
“নওশাদ নাকি বিয়া করছে?”
“হ, বহুদিন হইছে।”
“মাইয়া কেমন?”
“দেখতে, শুনতে ভালাই। মনে কী আছে আল্লাহ জানে।”
“তোর বাপে কেমন আছে?”
“যেই অবস্থা করছেন তারপরেও কেমন থাকার কথা?”
ফের নিশ্চুপ আকবর মিয়া। নাজির শব্দ করে শ্বাস ফেলে লতিফকে ধমকালো,“দিলি তো একটা চারা নষ্ট কইরা? যত চারা নষ্ট হইবো সব তোর মজুরি থাইক্যা কাটমু।”
লতিফ তটস্থ হলো। মনোযোগী হয়ে উঠলো কাজে। আকবর মিয়ার উদ্দেশ্যে নাজির বললো,“মাথার ভিতরে যা চলতাছে তা কইয়া বিদায় হন তো। ভাল্লাগতাছে না। মেজাজ এমনিতেই খারাপ।”
আকবর মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,“খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। উইঠা আয়।”
“শত্রু গো লগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকতে পারে না।”
“আয় তো।”
আকবর মিয়া ধীর পায়ে আগে আগে হাঁটতে লাগলেন। উপায়ান্তর না পেয়ে বাধ্য হয়েই লতিফকে তাগাদা দিয়ে নাজিরও পিছুপিছু হাঁটছে। কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে নির্জনে দাঁড়ালেন তিনি। কথা না টেনে বলে উঠলেন মূল কথা,“বিয়া শাদির ব্যাপারে কী ভাবছোস?”
“আমনেরে কমু ক্যা?”
“ছুডো ভাই বিয়া করছে, তুই করবি না? ঘর সংসার সামলানোর লাইগাও তো কাউরে লাগে।”
“ক্যান, মাইয়া দিবেন নাকি?”
উত্তরটা যেন মেঘ না চাইতেই জল। গম্ভীর মুখেই সামান্য হাসলেন,“যদি দেই?”
“আমনের লগে আমার মশকরার সম্পর্ক না। কাম আছে অনেক। আজাইরা না আমি।”
“কী কাম করোস? দাদার ব্যবসায় জড়াইছোস?”
“না।”
“ক্যান?”
“ভাগে পাই নাই।”
“কস কী! ক্যান পাস নাই?” কণ্ঠে বিস্ময়। শাহ বাড়ির ভেতরকার বিষয়ে বাইরের মানুষেরা বরাবরই অজ্ঞ।
নাজির উত্তর দিলো না। চুলগুলো পেছনে নিতে নিতে বললো,“গেলাম।”
“দুপুরের খাওন না খাইয়া তোরে খুঁজতে খুঁজতে এনে আইছি। কী মনে হয়, মশকরা করি?”
নাজির সটান দাঁড়ালো। পেছনে দুই হাত রেখে গম্ভীর হলো নিজেও। আকবর মিয়া বললেন,“আমগো বাড়ির মাইয়ার লাইগা প্রস্তাব আনছি। চিন্তা করিস না, সব থাইক্যা দামি রত্নই পাইবি। তোর মতামত জানতে চাই না। তোর বাপের কানে কথাডা শুধু পৌঁছাইয়া দিবি।”
“কোনডা? হেইদিন শালিস হইলো যার? তাল মিছরি?”
“শুধু মিছরি।”
“ওই একই হইলো।” থেমে ফের বললো,“মতলব তো ভালাই আঁটছেন! বুইড়া হওয়ার পরেও শয়তানি কমে নাই? মরণের ভয় নাই? এত ক্ষতি করার পরেও এহন নাতনি দিয়া শাহ গো ধ্বংস করতে চান? এত সহজ? নাজির অত বলদা না যে খাল কাইট্টা ঘরে কুমির পুষবো।”
“তো কী চালাক? চালাকরা কহনো ঢাকঢোল পিডাইয়া নিজেরে চালাক কয় না। অন্যের কথায় ফাল পারে না। চোখ বন্ধ কইরাও কাউরে বিশ্বাস করে না। চালাকরা যাচাই-বাছাই কইরা নিজে যা দেখে তাই বিশ্বাস করে। ভাইবা চিন্তা সিদ্ধান্ত নেয়। নিজের নাতনি দিতে চাইতাছি। চাচাগো কথায় না লাফাইয়া বাপের লগে পরামর্শ কইরা জানাইস। মাস্টর বাড়ির দরজা তোর লাইগা খোলা।”
নিজের কথা শেষ করে অপরজনকে মতামত পেশের সুযোগ না দিয়েই বড়ো বড়ো কদম ফেলে চলে গেলেন বৃদ্ধ। নাজির ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইলো তাঁর যাওয়ার পথে। সব যেন মাথার উপর দিয়ে গেলো। হঠাৎ এমন প্রস্তাবের কারণ কী? বুড়োর মাথায় চলছে কী? আসলেই কী ব্যাটা খারাপ নাকি ভালো? নাকি মুখোশ পরা ভদ্রলোক?
চলবে _________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

