যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:১৬]

0
31

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৬]

জৈষ্ঠ্য শেষে আগমন ঘটেছে আষাঢ়ের। আষাঢ়িয়া বর্ষনে গ্ৰামবাংলার প্রকৃতি বদলেছে নিজস্ব রূপ। সবুজে রাঙা হয়ে উঠেছে দিগ্বিদিক। মেঠোপথের ধূলো রূপান্তরিত হয়েছে কর্দমাক্ত মাটিতে। হাঁটলেই নষ্ট হচ্ছে পোশাক। আবার কেউ বা পা হড়কে পড়ে গিয়ে খাচ্ছে আছাড়। চারিদিকে থৈ থৈ করা জল। বিলের পানিতে জন্মাচ্ছে শালুক, শাপলা আর পদ্ম। গৃহস্থ বাড়ি জুড়ে কাটছে এখন অলস সময়। তিনবেলার রান্নার নিয়ম যেন সীমাবদ্ধ হয়েছে দু’বেলার মধ্যে। বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে কে যায় অতদূরের রান্নাঘরে রাঁধতে?

দুই হাড়ি রসগোল্লা আর বড়ো সাইজের কাতলা মাছ হাতে স্ত্রীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি নাইওর এসেছে মাহবুব। বৃষ্টির দিনে আগে ভাগেই বাড়িতে দুপুরের রান্না শেষ। গোসলের কাজ শেষ করে যে যার ঘরে ব্যস্ত। ফাহমিদা এসেই প্রথমে দাদীকে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরলো মাকে। দিলারা বেগম শব্দহীন হাসলেন। ঘোমটা ঠিক করে জামাইকে বসতে দিলেন কেদারায়। হাঁক ছেড়ে ডাকলেন,“সুজাতার মা! ও সুজাতার মা!”

শাশুড়ির ডাকে দৌড়ে এলো জেসমিন। নন্দাইকে দেখে সালাম দিলো। মাহবুব সালামের জবাব নিলো। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এটাই তার প্রথম বেড়াতে আসা। বউ ভাতের পর যদিও ফিরানিতে আসার কথা ছিল কিন্তু পারেনি। স্কুলে পরীক্ষা ছিল। গণিতের শিক্ষক সে। সেই পরীক্ষায় উপস্থিত না থাকলে কী আর চলে? দিলারা নির্দেশ দিলেন,“জামাই বাবা মাছ আর মিষ্টি আনছে। এইগুলা লইয়া যাও ভিতরে। মাছটা এহনি কাইট্টা ফেলো। তার আগে তোমার শ্বশুর আর দাদা শ্বশুররে খবর দাও, বাড়িত নতুন জামাই আইছে।”

জেসমিন মাথা নাড়িয়ে মাছটা হাতে তুলে নিলো। ভাবিকে সাহায্যের উদ্দেশ্যে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে ফাহমিদা এগিয়ে গেলো সামনে। নাতজামাই আসার সংবাদে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন আকবর মিয়া। দিনকাল এখন তাঁর বাড়িতেই কাটে।‌ জমিজমা, ব্যবসা সবই পুত্র, নাতিদের হাতে সঁপে দিয়ে তিনি চিন্তামুক্ত। শেষ বয়সে এমন ভরা সংসার প্রাপ্তির পর একটা মানুষের জীবনে আর কীইবা চাই?

কাশেম আলী বাড়িতে নেই। তাদের পরিবারটি বহু প্রজন্ম ধরেই কৃষিকাজে নিয়োজিত। এটি আকবর মিয়ার বংশীয় পরম্পরা। পাশাপাশি রয়েছে জেলা শহরে কাপড়ের বিশাল ব্যবসা। যার কৃতিত্ব শুধুই তাঁর নিজের। পিতা ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তার হাত ধরেই এই গ্ৰাম দেখেছিল শিক্ষার আলো। পেয়েছিল প্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই ধারা বজায় রেখে নিজ উদ্যোগে তিনি হাত দিয়েছিলেন উচ্চ বিদ্যালয় তৈরির কাজে। সাথে অবশ্য তাঁর প্রিয় বন্ধুও ছিল। যে এখন আর পৃথিবীতে নেই। অথচ গ্ৰামের বর্তমান প্রভাবশালী মানুষগুলো কত সহজেই না ভুলে গেলো সেসব!আকবর মিয়া সেই ঘটনা ভুলতে পারেন না। এত সহজ তাকে সমাজ ছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়া! নিজেরা টিকতে পারবে তো?

শ্বশুর, দাদাশ্বশুরের সঙ্গে কুশল বিনিময় সারতেই শালারা ধরে নিয়ে গেলো মাহবুবকে। শাশুড়ি আর চাচী শাশুড়ি এলাহী আয়োজন করেছেন। দুপুরের ভোজন শেষে বিশ্রামের চিন্তা বাদ দিয়ে তারা বের হলো মাছ ধরতে।

মিছরি আর সুজাতা পাশাপাশি শুয়ে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছে। ফাহমিদা পোশাক বদলে তাদের ঘরে এলো। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো চাচাতো বোন আর নিজ ভাতিজির ঘুমন্ত মুখপানে। আঙুল দিয়ে খোঁচাখুঁচি করল বেশ কিছুক্ষণ। তাতেও কাজ না হওয়ায় এবার চিৎকার করে ডাকলো,“হায় আল্লাহ! সব মিছরি তো বিষ পিঁপড়ায় খাইয়া ফেলাইতাছে! কী হইবো এহন?”

ঘুম ভেঙে গেলো মিছরির। হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলো।
“কই? কই?”

ফিক করে হেসে দিলো ফাহমিদা। মিছরি অবাক হলো। ঘুমের রেশ কাটেনি এখনো।চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো একপলক। বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললো,“আপা, তুমি! সত্যিই?”

“না, মিথ্যা।”

“কখন এলে?”

“অনেকক্ষণ আগে। খাইছোস? নাকি না খাইয়াই ঘুম?”

“খেয়েছি।”

“আমি তো ভাবছি তুই মনে হয় চইল্যা গেছোস। এহন দেহি বাড়িতই। যাস নাই যে? অসুখ ভালা হয় নাই?”

“অসুখ?”

“হ, সেজো ভাই বললো তোর নাকি অনেক অসুখ। এই জন্যই তো বউ ভাতে আসোস নাই।”

তার মানে ফাহমিদা আসল ঘটনা জানে না।কেউ তাকে জানায়নি হয়তো। তাই মিছরিও জানানোর প্রয়োজন মনে করল না। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললো, “দাদাজান যেতে নিষেধ করে দিয়েছে। তাই কয়েকদিন এখানেই থাকবো। পরীক্ষা এলে তারপর যাবো।”

“ভালাই করছে। এইখানেই থাক আপাতত।”

“তুমি কেমন আছো?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালা, তুই?”

ফাহমিদার চোখেমুখে চাপা আনন্দের ছাপ। অথচ মেয়েটা বিদায়বেলা কি কান্নাটাই না করেছিল! কিন্তু মিছরি! সে কী আদৌ ভালো আছে? অনাকাঙ্খিত সেসব ঘটনা পেরেছে কী ভুলতে? সবাই হয়তো ভুলে গেছে, ভুলে যেতে চায়ও। কিন্তু মিছরিই যেন ভুলতে পারে না। হয়তো সারাজীবনই তাকে বয়ে বেড়াতে হবে সেসব। মিথ্যা বলার অভ্যাস না থাকায় উত্তর আর দিলো না। শুধু জিজ্ঞেস করল,“তোমার স্বামী আসেনি সঙ্গে?”

“তোমার স্বামী আবার কী? বল দুলাভাই। তোর ছুডো দুলাভাই হয় সে। চল দেখা কইরা আইবি। তগো তো আলাপই তেমন হইলো না।”

বলেই তার হাত টানলো ফাহমিদা। মিছরি ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। মুহূর্তেই ভয়ে কেঁপে উঠলো অন্তরাত্মা। সেদিনের সেই ভয়ংকর ঘটনার পর থেকে ‘দুলাভাই’ শব্দটাকে সে ভীষণ ভয় পায়। তাই কিছুতেই সে আর যাবে না, দেখা করবে না কারো সাথে। হঠাৎ তার অহেতুক ভয় বোধগম্য হলো না ফাহমিদা। দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। কোনোরূপ প্রশ্ন করার আগেই ঘরে ঢুকলো পলি। মেয়েটা ভারি দুষ্টু। এসেই নিজ বাহুর সাহায্যে সেজো ননদের বাহুতে ঠুকে দিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,“কী গো ননদিনী! নতুন স্বামী, সংসার লইয়া কেমন কাটতাছে দিনকাল?”

মেয়েটার মতলব সহসা বুঝে গেলো ফাহমিদা। খাটের এক কোণায় গিয়ে বসে লজ্জায় নুইয়ে নিলো মাথা। শাড়ির আঁচল আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বললো, “ভালা।”

“তা আমগো দুলাভাই কেমন?”

“সেও ভালা।”

“আদর সোহাগ কেমন করে?”

“ধুর, যাও তো!”

দুই হাতের আঁজলায় মুখ ঢাকলো সে। তা দেখে পলি হাসলো। চোখ মারলো ছোটো ননদিনীকে। ফিসফিস করে বললো,“বিয়া করমু না, করমু না কইরা ঠমক মাইরা তোমার বোইনে এহন শরম পায়। দেখলা মিছরি, দেখলা? বিয়া হইলে মাইয়া মানুষ আসলেই বদলাইয়া যায়।”

ভাবির কথায় বড়ো বোনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ভারি অবাক হয় মিছরি। ব্যাপারটা তার হজম হচ্ছে না। আসলেই কী বিয়ের পর মেয়েরা বদলে যায়?

গ্ৰামের পশ্চিমের শেষ মাথায় বিশাল এক ঘাট। নদীটি গিয়ে মিশেছে একেবারে চিলাই নদীর সাথে। এখানেই রোজ অজস্র ট্রলার আর নৌকা এসে থামে। মাছ ধরার ট্রলার, পণ্য সরবরাহের ট্রলার। বিশেষ করে, বর্ষার দিনে জলপথের বাণিজ্য যেন চলে রমরমা।

বাড়ির ছেলেদের মধ্যে রুহুল আর মাসুমের উপরেই কাজের চাপ কম। দূরের কাজগুলো বাপ, চাচা আর বড়ো দুই ভাই সুজন, তালেব সামলায়। ভেতরের দিকের কাজের দায়িত্ব আবার তাদের দুই ভাইয়ের। সবকিছুই ভাগ করা। সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন হলেও তাদের মিলমেশ দেখে তা বোঝার উপায়টুকু নেই। নতুন দুলাভাইকে নিয়ে তারা আর ঘাটে গেলো না। বরং গেলো দক্ষিণের বেলাইয়ে। এখানে ভালোই পানি উঠেছে। দেখে বুঝাই যায় না এটা যে বেলাই। বরং মনে হচ্ছে উত্তাল সমুদ্র। গাজীপুরে অবশ্য এমন বেলাই বিলের অভাব নেই। শীতে হয় ধানক্ষেত আর বর্ষায় এটাই আবার হয়ে ওঠে পানিতে থৈ থৈ সমুদ্র। মহান আল্লাহ তায়ালার কি অপরূপ সৃষ্টি!

রুহুলের হাতে তিনটা বরশি। একটা মাহবুবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,“মাছ ধরতে পারেন তো, নতুন বোন জামাই?”

মাহবুব হাসে। বরশি হাতে নিয়ে আধার লাগায় ফাঁদে। বলে,“গ্ৰামের ছেলে। ছোটো থেকে গ্ৰামে বড়ো হয়েছি। আর মাছ ধরতে পারবো না? দেখো শুধু।”

“বয়সে আপনে আমগো থাইক্যা বড়ো হইলেও সম্পর্কে কিন্তু আমরা আপনের থাইক্যা বড়ো। আমগো ছুডো বোইন বিয়া করছেন।” মাসুম কথাটা বললো। কণ্ঠে প্রকাশ পেলো রসিকতা।

মাহবুবকে প্রথম প্রথম গম্ভীর মনে হলেও এখন দেখে মনে হচ্ছে প্রাণখোলা, মিশুক প্রকৃতির মানুষ। বরশিতে হঠাৎ টান অনুভব করল। হাতে চাপ প্রয়োগ করতেই উঠে এলো একটি স্বরপুটি। প্রত্যুত্তরে বললো, “আচ্ছা, সম্বন্ধিরা। আপনাদের সম্মুখে অনেক অনেক সম্মান।”

শব্দ করে হেসে উঠলো দুই ভাই। এবারের দুলাভাইটা একেবারে তাদের মনের মতো হয়েছে। বড়ো দুটোর তো যেই ভাব! এসেই সারাক্ষণ খুঁজে বেড়ায় দোষ ত্রুটি। আর বাড়ি ফিরে তা ঝাড়ে বোনেদের উপর। শালাদের সঙ্গে কখনো হেসে দুটো কথা বলেছে নাকি তাও স্মৃতি হাতড়ালে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।
____________

শহর জুড়ে তুমুল বৃষ্টি পড়ছে। এখানে সেখানে জমেছে হাঁটু অবধি পানি। টানা তিনদিনের অতিবৃষ্টিতে চলার অনুপযোগী হয়ে উঠেছে রাস্তাঘাট। কাক ভেজা হয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলো নওশাদ। ছাত্র হিসেবে সে তুখোর মেধাবী। শিক্ষকদের অতীব পরিচিত। তাদের মধ্যেই একজনের সুপারিশে সন্ধান পেয়েছে একটি টিউশনির। সম্মানী ভালো। ছাত্রের পিতা এসপি। তবে অসুবিধে একটা আছে। বাবা-মা উভয়েই কর্মজীবী হওয়ায় বাড়িতে থাকেন কম। তাই ছেলের পেছনে সময় দেওয়া হয় না। এই সুযোগে অধিক বিলাসীতা আর খারাপ বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে ছেলেটা হয়েছে ডানপিঠে। দুদিন পড়িয়েই নওশাদ বুঝে গিয়েছে, একে ঠিক করার জন্য বহু কসরত তাকে করতে হবে। কিন্তু হাল ছাড়লে চলবে না।

কলিং বেলে চাপতেই দরজা খুলে দিলো কাজের মেয়ে সালমা। হাবভাবে বুঝা যায়, তাকে মোটেও পছন্দ করে না মেয়েটা। অথচ নওশাদের মনে পড়ে না মেয়েটার সাথে কখনো আগ বাড়িয়ে সে কথা বলেছে কিনা। বসার ঘরে প্রবেশ করতেই কারো হাসাহাসির শব্দ এলো কানে।‌ অথচ শ্বশুর-শাশুড়ি কেউই বাড়িতে নেই। কোনো এক আত্মীয়ার বাড়িতে দাওয়াত আছে তাদের।

ভেজা পোশাকেই পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলো নওশাদ। হাসির শব্দটা লিলির। হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে পাশ ঘেঁষে বসে থাকা যুবকের গায়ে। কিছুটা দূরে বসা এক অপরিচিত নারী আর পুরুষ। লিলি বাদে উপস্থিত কাউকেই সে চেনে না। তবুও স্ত্রীর শরীরের সাথে অন্য পুরুষের লেপ্টে থাকা সহ্য হলো না। ধুপধাপ পা ফেলে দুতলার দিকে হাঁটা ধরলো। সালমার উদ্দেশ্যে বললো,“তোমার আপামণিকে ঘরে আসতে বলো।”

মুখ বাঁকালো সালমা। অনেকক্ষণ আগেই চা, নাশতার আদেশ এসেছে। ট্রেতে করে তা নিয়ে বসার ঘরে প্রবেশ করল সে। বললো,“আপামণি, আপনের জামাই আইছে।”

“ফ্রেশ হয়ে এখানে আসতে বল।”

“আপনেরে ঘরে যাইতে কইছে।”

উপস্থিত পুরুষটি উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,“যা নিয়ে আয়। আমরাও দেখি কার জন্য লিলিফুল বিদেশ ফেরত বর আর ঘর ছেড়েছে।”

লিলি উঠে এলো। নওশাদ ততক্ষণে গোসল সেরে বেরিয়েছে। লিলিকে দেখেই প্রশ্ন ছুঁড়লো,“কে এসেছে বাড়িতে?”

“আমার চাচাতো বোন, বোনের জামাই আর দেবর।”

“তোমার পাশে যেই ছেলেটা বসা ছিল, সে কে?”

“আশা আপার দেবর।”

“আশা আপা?”

“চাচাতো বোন, যাকে তুমি দেখলে।”

“তার সাথে তুমি কেন গায়ে গা লাগিয়ে বসেছিলে? ভুলে যেও না লিলি, তুমি এখন বিবাহিতা। পরপুরুষের গায়ে ঢলে পড়া কী ভালো দেখায়?”

“এটা কেমন কথা? পরপুরুষ কেন বলছো? শরিফ ভাইয়ের সাথে আমাদের বহুদিনের পরিচয়। বহুবার এ বাড়িতে এসেছে, থেকেছে। তোমার মানসিকতা একটু বেশিই আধ্যাত্মিক নয় কী?”

“আমার মানসিকতা যথেষ্ট ঠিক আছে। ধরো, আমি যদি আমার কোনো বোনের ননদ বা ভাইয়ের শ্যালিকার উপর ঢলে পড়ি তাহলে তোমার কী ভালো লাগবে তা? মেনে নিতে পারবে? শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেও কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়, লিলি।”

লিলির চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। মা তাকে আগেই বলেছিল, এ ছেলে তার সব বিষয়ে নাক গলাবে। এখন তাই হচ্ছে। তবুও তা নিয়ে আপাতত কিছু বললো না।

“ওরা তোমার সাথে পরিচিত হতে এসেছে, দ্রুত চলো। ওখানে অন্তত নিজের আধ্যাত্মিক, গ্ৰাম্য মানসিকতার পরিচয় দিও না। আমার পরিবারের মানসম্মানটুকু রেখো। বিশেষ করে আমার। সব ছেড়েছুড়ে আমি তোমায় বেছে নিয়েছি।”

চুল আঁচড়ে স্ত্রীর পিছুপিছু গেলো নওশাদ। রাতে কাছে ডেকে ভালো করে বোঝালে মেয়েটা ঠিকই সব বোঝে। কিন্তু দিন হলেই হয়ে ওঠে অবাধ্য, অবুঝ। নিশ্চিত মা, ভাবিদের প্ররোচনায় গিরগিটির মতো রূপ বদলায় এর। তাই এখান থেকে যেতে পারলেই সে বাঁচে।

বসার ঘরে এসে সকলকে সালাম দিয়ে সোফায় বসলো নওশাদ।। লিলি পরিচয় করিয়ে দিলো তাদের। শরিফ ছেলেটা শুরু করল প্রশ্ন পর্ব,“তা কী করেন, আপনি?”

নওশাদের মনে হলো তার সম্বন্ধে ছেলেটা সবকিছুই জানে। টেলিফোনের মাধ্যমে সকল আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত নিজ দায়িত্বে তার জীবনবৃত্তান্ত এতদিনে পৌঁছে দিয়েছেন শাশুড়ি। তবুও যেন আলাপচারিতা শুরু করার উদ্দেশ্যেই প্রশ্নটি করা। ভদ্রতার খাতিরে উত্তর দিলো সে,“পড়াশোনা চলছে।”

“কী নিয়ে? কোন বিভাগ?”

“অর্থনীতি বিভাগ।”

“বাড়ি কোথায়?”

“গাজীপুর।”

“গাজীপুরের কোথায় জানতে পারি? আসলে আমার বাড়ির কেয়ারটেকারের দেশের বাড়িও ওই জেলাতেই।”

অপমান করার উদ্দেশ্যেই যে কথাটা শরিফ বলেছে তা বুঝতে আর বাকি নেই। নওশাদ চতুরতার সহিতই বললো,“বনখড়িয়া গ্ৰাম। আপনি না ও চিনতে পারেন। তবে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের জন্মস্থান থেকে বেশি একটা দূরে নয়। যদিও জেলা একই।”

কৃত্রিম হাসলো শরিফ। বললো,“শহরে তো মনে হয় না কেউ আছে। সবাই নিশ্চয়ই গ্ৰামেই থাকে?”

“হ্যাঁ, গ্ৰামে বিঘার বিঘা নিজেদের জমি, প্রতিপত্তি রেখে কে এসে ভাড়া থাকে শহরে? মানুষ শহরে আসে জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে।”

“তা আপনি কেন এসেছেন?”

“এই যে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। যদিও ইচ্ছে ছিল না কিন্তু বড়ো ভাইয়ের স্বপ্ন। তাই পূরণের জন্য চলে এলাম।”

“কী করেন আপনার বড়ো ভাই? শুনেছি তো বেকার, অকর্মণ্য।”

“কে বলেছে? সে বেকার, অকর্মণ্য হলে কী আর এই হিংসা, ছলনার শহরে আমি মাথা উঁচু করে বেকার অবস্থায় টিকে থাকতে পারতাম?”

শরিফ মাথা নাড়ায়। বুঝতে পারে, এর সঙ্গে কথায় পেরে ওঠা সম্ভব নয়। বরং নিজেই অপমানিত হচ্ছে।
__________

গভীর, নিস্তব্ধ, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত। সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া শীতল। গ্ৰামের মানুষ গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। সেই ঘুমের মধ্যেই নাজিরের কানে এসে ধরা দিলো গোয়ালের গরুদের ডেকে ওঠার শব্দ। চোখ বুজেই ওপাশ ফিরল সে। আরো কয়েকবার ডেকে উঠলো গরু, বাছুর উভয়েই। তবে ডাকটা অস্বাভাবিক। উঠে বসলো নাজির। গোয়ালের দুটো গাভী গর্ভবতী। যেকোনো মুহূর্তে একটার বাচ্চা হতে পারে। দরজার দিকে কয়েক পা এগোতেই শুনতে পেলো খটখট শব্দ। শব্দটা বুট জুতার। ভেজা জুতোয় একটু বেশিই শব্দ হয়। অথচ বাড়ির কেউ এই জুতা পরে না। চাচা আর চাচাতো ভাইয়েরা পরে চামড়ার জুতা নয়তো স্যান্ডেল। তাহলে?

টনক নড়ে ওঠে নাজিরের। দাঁতে দাঁত চাপে। এ বছর ডাকাত একটু বেশিই পড়েছে। পালা করে কদিন শুধু পাহারা দেওয়া হয়েছিল। মাঝখানে উৎপাত কমে যাওয়ায় পাহারা থেমে গিয়েছে। সেই সুযোগে আবার এসেছে ওরা! তার উপর শাহ বাড়িতে! খাটের তলা থেকে শান দেওয়া বিশাল রামদা বের করল নাজির। লুঙ্গি কাছা দিয়ে পা সাবধানে ফেলে নিঃশব্দে দরজা খুললো। ধারণা সঠিক। গরুর দড়ি ধরে অন্ধকারে কেউ ফটকের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নাজির হাঁক ছাড়লো,“পারভেজ, নাজমুল! কই তোরা? বাহির হ তাড়াতাড়ি। আইজ ডাকাত ধরমু। শাহ বাড়িতে ঢোকার সাহস ঘুচাইয়া দিমু গোলামের পুতে গো।”

তার কণ্ঠে সতর্ক দৃষ্টিতে একপলক পিছু ফিরে তাকিয়ে গরু ছেড়েই জান নিয়ে দৌড়ালো লোকটা। নাজির টের পেলো, ভেতরে সম্ভবত দলের আরো আছে। খট করে দরজা খোলার শব্দ হলো। সামিউল কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। তাই ঘুমায়নি এখনো। চাচাতো ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে তৎপর হয়ে বেরিয়ে এসেছে সে।

নাজির ফের চেঁচিয়ে বললো,“ভিতরে আরো আছে। সবকয়ডারে ধরো, ভাই। একটা কু**র বাচ্চাও যাতে জীবিত বাহির হইতে না পারে।”

এরপর সে রামদা হাতেই ছুটলো ডাকাতের পেছনে। আজ যেন ওদের আর কিছুতেই রক্ষে নেই।

চলবে _________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here