#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৫]
ঘড়ির কাঁটা দেড়টায় এসে থেমেছে। বটতলার ভিড় আগের তুলনায় অনেকটা কমে এসেছে। অনেকেই প্রস্থান করেছে, আবার অনেকে এসে নতুন করে যোগ দিয়েছে সমাপ্তির মজাটা উপভোগ করতে। কাশেম আলীর শেষ অনুরোধটাও গ্ৰহণযোগ্য হলো না। মকবুল এগিয়ে এসে মেম্বারের কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বললো। একে অপরের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ চললো গম্ভীর আলোচনা। নাজির বিরক্ত হয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো বাড়ির দিকে। গোসল সেরে বাজারে কিটনাশক কিনতে যেতে হবে। গতকাল জমিতে দিতে গিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে পুরোটা। মিল্টন তাকে ডাকলো,“কই যান, ভাইজান? শেষটা দেখবেন না? মজা তো এহনি শুরু হইবো।”
“না, তুই দেখ। ভাল্লাগে না আর।”
দু কদম সামনে এগোতেই কানে আসে মেম্বারের গম্ভীর স্বর,“আপাতত সব কথাবার্তা এইখানেই শেষ। গ্ৰামের সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হইছে যে, কাশেম আলীর চরিত্রহীন মাইয়ার মুখে চুনকালি মাইখা তারে সারা গেরাম ঘুরানো হইবো। তাইলে এর থাইক্যা গেরামের বাকি মাইয়ারাও শিক্ষা পাইবো। তারপর আমনেগো মাইয়া গেরামে রাখবেন নাকি রাখবেন না হেইডা আমনেগো ব্যাপার। এতে চেয়ারম্যান সাহেবেরও মত আছে আশা করি। কেউ সিদ্ধান্ত না মানলে তারেও এক ঘরে কইরা দেওয়া হইবো। এক ঘরে মানে বুঝেন তো? রাস্তাঘাট, মসজিদ কিছুই ব্যবহার করতে পারবেন না। এক কথায় সমাজ ছাড়া। এহন আমনেরা কী করবেন তাড়াতাড়ি কন। আজকেই মতামত জানাইতে হইবো।”
জোয়ান মর্দরা রাগে ফুঁসলেও প্রবীণরা নীরব। সব দিক দিয়ে আটকে ফেলা হয়েছে তাদের। বুদ্ধিমান আকবর মিয়াও ভাবতে বসলেন। কী করবেন? এর থেকে মেয়েটাকে নানার সাথে পাঠিয়ে দিলেই হতো। আজ তাহলে এইদিন দেখতে হতো না। কিছু একটা করে ঠিক পরিস্থিতি সামলে নিতেন। কিন্তু এখন তা সম্ভব নয়। পুত্রের উপরে এই মুহূর্তে ভীষণ রাগ হচ্ছে বুড়োর। ভাবনার মধ্যেই আচমকা শোনা গেলো এক পুরুষালি কণ্ঠস্বর,“গেরামের সবার মতামত মানে? কই, আমার মতামত তো নেওয়া হইলো না। তাই এই বিচার আমি মানি না।”
সকলের হাস্যোজ্জ্বল মুখে বিস্ময় ভর করল। দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসা নাজিরের দিকে। নাজির ভেবেছিল মাস্টার বাড়ির পুরুষেরাই হয়তো উপস্থিত ঘটনাটি কোনোভাবে সামলে নিতে পারবে। কিন্তু না তারা তো একেকটা অকর্মার ঢেকি। বরং পারে শুধু শাহদের সঙ্গেই। হাতের ইশারায় মিল্টনকেও সে ডাকলো। মিল্টন আসতেই ঘাড়ে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,“কেউ তোর মতামত নিছে রে, বল্টু? তুই হেগো লগে একমত?”
মিল্টন আমতা আমতা করল। তার আবার মতামত কীসের? নাজির ভাইজান যেদিকে সেও সেদিকেই। তাই মাথা নাড়িয়ে বললো,“একদম না।”
নাজির হাসলো,“দেখছেন? ওয় ও একমত না। ওই নাজমুল, তুই একমত?”
নাজমুল ভড়কে গেলো। প্রথমেই চোখ গেলো বাপ, চাচার দিকে। নাজিরের সাথে সাথে তাদের দৃষ্টিও ঘুরে এসে তার দিকেই পড়েছে। তাই কী বলবে বুঝতে পারলো না সে। উত্তর ‘না’ হলে তার বাপ পেটাবে, আবার ‘হ্যাঁ’ হলে নাজির পেটাবে। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। অনেক ভেবেচিন্তে দেখলো, দুইদিন পালিয়ে থাকলে বাপ কিছু করতে পারবে না। পরে সব ভুলে যাবে। কিন্তু নাজির ভুলবে না, ঠিক খুঁজে বের করে ঠেঙাবে। তাই বিচক্ষণের মতো বললো, “কেউ তো মতামতই নেয় নাই। কেমনে একমত হমু?”
নাজির সন্তুষ্ট হলো। নিজের মতো পাকা স্থানে গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসলো। আকবর মিয়াসহ কেউই বুঝতে পারছে না এই ছেলের মতলব কী? চায় কী সে? তার তো খুশি হওয়া উচিত। আমিরুল শাহ চাপা স্বরে বললেন,“মাঝখানে বাম হাত ঢুকানো তোর স্বভাব? বাড়িত যা। এনে কোনো কাম নাই।”
“বাম হাত? আমি তো পুরা শরীর ঢুকাইয়া দিছি।” থেমে ফের বললো,“যেহেতু আমার আব্বা ঘর থাইক্যা বাহির হইতে পারে না, আর আমিও প্রাপ্ত বয়স্ক তাই গেরামের সবকিছুতে থাকার অধিকার আমার আছে।”
মতিন কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বললেন,“আমগো মেলা কাম পইড়া আছে। শালিস শেষ। এইবার শাস্তি হইবো। তুই কথা বাড়াইস না তো।”
“মুসলমান হইয়া হিন্দুপাড়ায় গিয়া নেশা করা পোলার বাপের কাছ থাইক্যা এহন নাজির শাহরে শিক্ষা নিতে হইবো, সে চুপ থাকবো নাকি কথা কইবো? আমনের কাম মানেই তো দোকানপাড় বইয়া অন্যের বাড়ির মাইয়া, বউ লইয়া চোগলখুরি করা।”
মতিন হতভম্ব। নাজির ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। এতক্ষণ অতিরিক্ত উড়তে থাকা সিদ্দিকের দিকে তাকিয়ে বললো,“ঘরে বউ রাইখা ভাইয়ের অবর্তমানে ভাবির যৌবন জ্বালা মেটানো সিদ্দিক চাচায় কবে থাইক্যা ন্যায় অন্যায় বুঝতে শিখছেন? পরকীয়ার শাস্তি তো পাথর নিক্ষেপ কইরা মাইরা ফেলা। আমনে বাঁইচা আছেন কেমনে? আবার বুক ফুলাইয়া শালিসে আইয়া নিজের মত দেন? এই ব্যাডার মতের লগে কেডায় একমত? মুখ দেহি।”
উপস্থিত স্থানটি কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে উঠলো। সিদ্দিক গর্জে উঠলো,“তুই দেখছোস? মিথ্যা অপবাদ দিলে কিন্তু ভালা হইবো না, নাজির।”
“আমনে দেখছেন ওই মাইয়ারে নষ্টামি করতে?”
“লোকে কইছে।”
“আমারেও লোকেই কইছে, আমনের প্রতিবেশীরা কইছে। হেরা মিছা কইবো ক্যান?”
“ডাক তাগো, আইজ শেষ দেইখা ছাড়মু।”
“হাছাই ডাকমু? চেতাইয়েন না, চাচা। বড়ো বড়ো চোপা আমার সহ্য হয় না। আমি প্রমাণ দিতে গেলে ঝামেলা হইয়া যাইবো। গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবো না।”
বুক ফুলিয়ে এতক্ষণ কথা বলা সিদ্দিক চুপসে গেলো আচমকাই। হারিয়ে গেলো ভিড়ে। মিন্নত কোমল স্বরে বললেন,“প্রসঙ্গ বদলাস ক্যান, নাজির?”
“আমনের নাতনির নাম কুলসুম না? কয়দিন আগে খাঁ বাড়ির ব্রীজ পার হওয়ার সময় বাজারের দিকে বাড়ি হযরতের পোলায় যে ওড়না ধইরা টান মারলো, কই তহন তো কইলেন না যে মাইয়া চরিত্রহীন?”
“এহন আবার আমার নাতনির পিছনে লাগছোত? কবে হইছে? কইলেই হইবো?”
“কলিমের মা সাক্ষী। আমি হেই পোলারে থাপড়াইছি দেইখা এহন আর কুলসুমরে বিরক্ত করে না। এর লাইগা আমনে উপহার হিসেবে আমগো বাড়ি ঝিমাইন্না মুরগি দিয়া গেছিলেন। ডাকমু কলিমের মায়রে?”
বুড়োর মুখও বন্ধ হয়ে গেলো। তালেব বিড়বিড় করল, “এর মতলব কী? মাঝখানে বাঁধা দিতাছে ক্যান? উপকার করার মানুষ তো শাহ বাড়ির পুরুষেরা না।”
সুজন তেমন করেই বললো,“বুঝতাছি না। খারাপ কোনো মতলব যে নাই বুঝাই যাইতাছে। থাকলে আওয়ার কথা না।”
আকবর মিয়াও অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন। মেম্বার বললেন,“তুই ক্যান মাঝখানে আইতাছোস, নাজির? আমগো কাম আমগোই করতে দে।”
“দিমু না, আমনেরা আমারে গুরুত্ব দেন নাই। তাই আমি এহন অন্যায়ের প্রতিবাদ করমু।”
মুমিনুল শাহ দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,“নাজির বাপ আমার! আয় আমার কাছে।”
“এহন না, বাড়িত গিয়া কোলে উইঠা বইয়া থাকমু।”
হতাশ হলেন লোকটা। আমিরুল শাহ ফিসফিস করে বললেন,“সব পরিকল্পনা ডুবাইবো নাকি? সমস্যা কী ওর?”
“জানি না, ভাইজান।”
মকবুল বললো,“হেগো সঙ্গ দিলে তোরেও এক ঘরে কইরা দেওয়া হইবো।”
“তোর চামচামি আর ক্ষমতা সব চেয়ারম্যানের সামনে দেখাইস, নাজিরের সামনে না। গেরামে ঢোকা বন্ধ কইরা দিমু একেবারে। কারে এক ঘরে করার ভয় দেহাস? শাহ গো? এত্ত বড়ো কইলজা?”
শেষ কথায় তির্যক দৃষ্টিতে মকবুলের দিকে তাকালেন আমিরুল শাহ। সত্যিই তো, কত বড়ো সাহস! তাদের এক ঘরে করতে চায়? একবার শালিস শেষ হোক তারপর দেখে নেবেন ব্যাটাকে। আপাতত ভাতিজাকে সামলাতে হবে। বললেন,“কী চাস তুই? ওরা আমগো শত্রু।”
“শত্রু পুরুষরা, মাইয়ারা না।”
এবার সব ঠাট্টা ছেড়ে সে গম্ভীর হলো। বললো,“ভালা কইরা দেখতে গেলে এইখানে উপস্থিত কারো ঘরের অবস্থাই সুবিধার না। কারো নিজের চরিত্রে দোষ আবার কারো বা ঘরের মাইয়া, বোইনের চরিত্রে। তাই বুক উঁচাইয়া কথা কইবেন অন্য জায়গায়, অর্থাৎ অপরিচিত মাইনষের সামনে। নিজে যেইখানে ভালা না সেইখানে অন্যের বিচার কেমনে করতে আইয়েন? পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বইল্যা সব দোষ তো আর মাইয়া মাইনষের উপর চাপাইয়া দিলে হইবো না।”
দেলোয়ার বললেন,“রমিজার লগেও কিন্তু এই একই কাম করা হইছিল। ভুইল্যা যাইস না।”
“রমিজার বাপ নাই, ভাই নাই, মা বিধবা। তার জামাই যৌতুকের লাইগ্যা তারে মাইরধর করতো বইল্যা আইয়া পড়ছিল। মাইয়াডারে একলা পাইয়া অনেকে কু প্রস্তাব দিছিলেন। কেডা কেডা দিছিলেন কারো অজানা না। আমি মুখ খোলা শুরু করলে লুঙ্গিত মুইত্তা দিবেন। তাই চুপ থাকেন। তহন আমি গেরামে থাকলে অবস্থা খারাপ কইরা দিতাম।”
নাজির পুনরায় বললো,“মনমতো, স্বার্থসিদ্ধির বিচার গেরামে চলবো না। দেখা যাইবো কাইল কোনো পোলায় একটা মাইয়ার দিকে তাকাইলেও সব দোষ হইবো সেই মাইয়ার। তার চেয়েও বড়ো কথা, এইটুকু মাইয়া ব্যাডা ফাঁসানোর কী বুঝে? পেট বান্ধায় কেমনে এইডা জানে তো? জিগান দেহি।”
কারো মুখে রা নেই। নাজির বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো এবার,“ব্যক্তিগত ঝামেলা থাকতেই পারে, তাই বইল্যা সেই ঝামেলার শোধ তোলার লাইগা তাগো বাড়ির মাইয়া মাইনষের চরিত্রে দাগ লাগানো কাপুরুষতার লক্ষণ। সোজা বাংলায় হিজড়া কয়। তাই আমনেগো বিচার আমি মানি না। অকারণে কাউরে সমাজ ছাড়াও করা যায় না। কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীর অসম্মতিতে তার গায়ে হাত দেয় তাইলে দোষ পুরুষের। বিচার হইবো পুরুষের। মুখে চুলকালি মাইখা সমাজ ছাড়া করা হইবো ওই পুরুষরে। আমনেগো উচিত আছিলো জামিল না কামলা কী জানি নাম? হেরে ঘেডি ধইরা আইন্না বিচার করা। কিন্তু না, আমনেরা তো আর তা করবেন না। কারণ আমনেরা নিজেগো নিষ্পাপ মনে করেন। মনে করেন, দুনিয়াত সব দোষ শুধু মাইয়া মাইনষের।”
আফাজ উদ্দিন বললেন,“যুক্তি আছে নাজিরের কথায়। এহন কী চাস তুই?”
“আমার আবার কী চাওয়া? বিচার করতে হইলে এক চোখা নীতি বাদ দিতে হইবো। এই মাইয়ার মুখে চুনকালি মাখাইলে গেরামের বাকি নষ্টাগুলার মুখেও মাখাইতে হইবো, নেশা করা পোলাগো সমাজ ছাড়া করতে হইবো, এর ওর মধুতে জিহ্বা লাগানো হিজড়াগুলারে ন্যাড়া কইরা গেরাম ছাড়া করতে হইবো। রাজি? তা না হইলে কিন্তু আমার খারাপ লাগবো। আমার খারাপ লাগলে আমি কাউরে শান্তিতে থাকতে দিমু না। যতই হোক সবার কাহিনীই তো জানা আছে।”
কথা শেষ করে একপলক সবার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি স্থির করল মিছরির দিকে। উঁকি মেরে এতক্ষণ ধরে তাকেই মেয়েটি দেখছিল। দৃষ্টি বিনিময় হলো দুজনার। তবুও কেউই নামালো না চোখ। নাজির স্বাভাবিক হাসলো। চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কেউ কী আমার কথার বিরুদ্ধে আছেন? থাকলে হাত তুলেন।”
কেউ হাত তুললো না। ফাটা বাঁশের মতো ঠোঁট ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রইলো। কারো সাহস আছে নাজিরের সাথে লাগার? নাজিরের সাথে লাগা মানা শাহদের সঙ্গে লাগা। শাহদের সঙ্গে লেগে শান্তিতে থাকতে পারবে কেউ? মান সম্মান ডুবিয়ে দেবে। যেই উচ্ছৃঙ্খল তারা! নাজির এবার মেম্বারের উদ্দেশ্যে বললো,“কত মানুষ কত কথাই কয়, মাইনষের কামই কওয়া। কান লইয়া গেছে চিলে কইলেই তো আর কানে হাত দিয়া পরীক্ষা না কইরা চিলের পিছনে দৌড়াইলে হইবো না। তাই আইজকার শালিস এইখানেই শেষ। সবার উপস্থিতিতে প্রমাণিত, মাইয়া নির্দোষ। চরিত্রও ভালা। এখন হেগো মাইয়া কই থাকবো, কী করবো তা হেগো ব্যাপার। নিজের বাড়ির মাইয়াগো দিকে নজর দেন। ভবিষ্যতে এমন ঝামেলা আরো হইলে একলগে দুই দিকের ন্যায্য বিচার করবেন। পুরুষরে কহনো কিছুতে জোর করা যায় না। বাকিটা আফাজ দাদার উপরে ছাইড়া দিয়া গেলাম। আমগো প্রাণপ্রিয় মুক্তিযোদ্ধা বইল্যা কথা!”
মিল্টনের কাঁধে পূর্বের মতো হাত রেখে ভিড় থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে নাজির ব্যস্ত স্বরে বললো, “আমার কত কাম! এইসব আজাইরা জিনিস দেহার সময় আছে?”
মিল্টন তাল মেলালো,“আমারও বহুত কাম। চলেন, ভাইজান।”
তাদের পিছুপিছু গেলো নাজমুলও। বিচার সভার প্রাণ হারিয়ে গেলো। তীরে এসে তরী ডোবার মতো। আফাজ উদ্দিন বললেন,“শালিস তবে এইখানেই শেষ। একটা ভুল বোঝাবুঝি থাইক্যা বিশাল একটা গন্ডগোল হইয়া যাইতাছিল। কাশেম আলীর মাইয়া মিছরি নির্দোষ।”
তারপর ধীরে ধীরে সমাগম কমতে লাগলো। মাসুম বোনকে নিয়ে চলে গেলো বাড়িতে। বাকিরাও ধীর স্থির হয়ে চলে এলো। পথে স্ত্রীর দেখা পেয়ে থমকালেন আকবর মিয়া। পুনরায় পথ চলতে চলতে জিজ্ঞেস করলেন,“তুমি এইখানে?”
“মাইয়াডার লাইগ্যা চিন্তা হইতাছিল, তাই আইয়া পড়ছি।”
“বাড়িত চলো। কী হইছে তা তো দেখছোই?”
“হ, ওইডা কার পোলা আছিলো?”
“সুবহান আলী শাহ’র বড়ো পোলা।”
“ওহ।”
বাড়িতে ফিরতেই মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিলেন পারুল। কপালে, গালে অজস্র চুমু খেলেন। ছোটো ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“কী হইছে ওইখানে?”
মাসুম উত্তর না দিয়ে চলে গেলো ভেতরে। চেঁচিয়ে ডাকলো,“চাচী! খাওন দেন। সকালেও খাই নাই।”
উত্তর না পেয়ে বড়ো ছেলের দিকে তাকালেন তিনি। এবার আর হতাশ হলেন না। তালেব হাত-মুখ ধুয়ে পানি মুছতে মুছতে যতটুকু বলা যায় বললো মাকে। পারুল প্রশান্তির শ্বাস ফেললেন। যাক, আল্লাহ তায়ালা কারো উছিলায় এবারো রক্ষা করেছেন তাদের। ক্লান্ত মেয়েকে ঘরে নিয়ে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগলেন।
দুপুরের খাওয়া শেষে বড়োরা বসার ঘরে বসেছে। সুজন বললো,“নাজিরের কাম আমারে ভাবাইতাছে। যেই পোলায় চাচাগো লাহান আমগো অনিষ্ট চায়, দেখা হইলেই যার লগে ঝামেলা লাগে সেই পোলায় চাচাগো বিরুদ্ধে গিয়া আমগো বাড়ির মাইয়ার পক্ষ নিলো? ক্যান নিলো? এতে লাভ কী ওর?”
নজরুল আলম ছেলের সঙ্গে একমত পোষণ করে বললেন,“আমিও বুঝতাছি না। লাগলে আমগো বাড়ির মাইয়ার গায়ে আঁচড় লাগতো, আমরা সমাজ ছাড়া হইতাম। এতে তো ওগোই লাভ আছিলো। এইডাই তো এতকাল চাইছে।”
কাশেম চেয়ারে শরীর ছেড়ে বসে আছেন। সব কথা শুনে বললেন,“যা ইচ্ছা থাকুক মনে। ওর লগে কোনো কালেই আমগো শত্রুতা আছিলো না। শত্রু বাড়ির পোলা হইলেও ওর লাইগা আইজ আমার মাইয়া নোংরা গ্ৰামের নোংরা মাইনষের হাত থাইক্যা বাঁচছে। তা না হইলে কী যে হইতো! কাইলই আমি ওরে বরিশাল গিয়া দিয়া আইমু। প্রয়োজন নাই এইখানে থাকার।”
আকবর মিয়া নীরব। কিছু ভাবছেন তিনি। ছোটো পুত্রের কথা শ্রবণালীতে পৌঁছাতেই ধ্যান ভাঙলো। গলা ঝেড়ে বললেন,“এহন আর কোত্থাও যাইবো না আমার নাতনি। এনেই সবার মধ্যে থাকবো। বিপদ থাইক্যা অপবাদ লইয়া পলাইলে জয় তো সমালোচকগোই হয়।”
“কিন্তু আব্বা, ওর লেখাপড়া?”
“অনেক হইছে। অ, আ শিখছে না? পড়তে শিখছে না? এতেই হইবো। কয়ডা দিন যাক। তারপর ভালা ঘর আর বর দেইখা বিয়া দিয়া দিমু। পুরা বনখড়িয়া গেরামের মানুষ আকবর মিয়ার ছুডো নাতনির বিয়া দেখবো আর জ্বলবো। আইজকার এই অসম্মানের প্রতিশোধ আমি নিমু। ঠিক নিমু।”
কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বুড়ো চলে গেলেন ঘরে। বুকে তাঁর প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। এমন অসম্মানিত তিনি হয়েছিলেন বহু বছর আগে, একই ব্যক্তির হাতে। এবার সেই ঋণ শোধ করার সময় আর সুযোগ দুটোই দোরগোড়ায় এসেছে।
_______
শাহ বাড়ির পরিবেশ আজ গুমোট। নাজির ফিরলো বিকেলে। গোয়ালা এসেছে বাড়িতে। দুধের পরিমাণ মেপে গোসল সেরে এলো সে। উঠোনের দড়িতে ভেজা লুঙ্গি মেলে দিতেই ডাক পড়ল সামিউলের,“কাচারি ঘরে আয়, আব্বা ডাকে।”
“এই সময় বাড়িত কী করো?”
“কুতকুত খেলি, খেলবি?”
“না, এইসব মাইয়াগো খেলা। আমি পুরুষ মানুষ।”
চোখ রাঙিয়ে চলে গেলো সামিউল। নাজির ঘরে গিয়ে পোশাক পরে এলো। উঠোন পেরোতেই দেখা হলো সুমার সাথে। সুমা তাকে দেখে হেসে বললো,“কেমন আছো, চাচা?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালা। তুই কহন আইলি?”
“দুপুরে।”
“বেড়ানি শেষ?”
“হ।”
“কেডায় দিয়া গেলো?”
“খালু।”
“আচ্ছা, পরে কথা কই। তোর দাদা ডাকছে, হুইন্না আসি।”
সুমা সামিউলের বড়ো কন্যা। বয়স নয়। মায়ের ইচ্ছায় অল্প বয়সে বিয়ে করার ফল। কাচারি ঘরে আসতেই দেখা মিললো পাশাপাশি বসে থাকা দুই চাচার। আহা, কি মিল মোহাব্বত তাদের! নাজির এসে বসলো একটি চেয়ারে। কানে পানি ঢুকেছে। কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে চুলকাতে চুলকাতে বললো,“কন কী কইবেন, মানিক জোড়া।”
মুমিনুল শাহ ধমকালেন,“সারাক্ষণ বেয়াদবি। ঠিক হইয়া বস।”
আমিরুল শাহ বাঁধা দিলেন,“চুপ থাক। তোর উপর আমি নারাজ, নাজির।”
কারণ জেনেও নাজির প্রশ্ন ছুঁড়লো,“ক্যান, চাচাজান?”
“এই সুযোগ বারবার আইবো? কত কষ্ট কইরা ওই আকবর মিয়ার মাথা হেঁট করলাম। ওগো বাড়ির মাইয়ারে উচিত শিক্ষা দিতাছিলাম। কিন্তু তুই কিনা মাঝখানে আইয়া সব নষ্ট কইরা দিলি?”
“মাইয়া টানলেন ক্যান? ঝামেলা তো ব্যাডাগো লগে। আমগো লগে ঝামেলার জেরে যদি হেরা আমগো বাড়ির মাইয়া সুমারে কিংবা আমনের মাইয়া আয়েশা আফার চরিত্র ধইরা টান মারে তাইলে মানবেন?”
“আমগো বাড়ির মাইয়ার লগে হেগো বাড়ির মাইয়ার তুলনা?”
“ক্যান সমস্যা কী? আমগো বাড়ির মাইয়া আমগো কাছে যেমন দামি তেমন পরের বাড়ির মাইয়াও তাগো কাছে দামি। তাছাড়া আমরা উচ্চ বংশীয়। শত্রু পক্ষের দুর্বল জায়গায় হাত দিলে মানসম্মান যাইবো। অন্য চিন্তা করেন, তহন আমি নিজে পাশে থাকমু।”
অনেক কিছুই বলার ছিল আমিরুল শাহর। কিন্তু ছেলেটার এসব যুক্তি আর গাছাড়া হাবভাবের সামনে কিছু বললেন না আর। নতুন কোনো চিন্তায় মশগুল হলেন। নাজির উঠে গেলো। বাবার ঘরে গত রাত থেকে যাওয়া হয় না। কলিমের মা কতটুকু যত্নআত্তি করে কে জানে? মহিলা যেই ফাঁকিবাজ!
চলবে _________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

