#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৪]
২৮ জৈষ্ঠ্য, ১৪০৩ বঙ্গাব্দ।
মধ্যাহ্নে রোদের তীব্রতা কম, শাখা-প্রশাখা উন্মুক্ত করে সর্বদা ছায়া দিয়ে ভরিয়ে রাখা বটতলায় আজ বহুদিন পর নেমেছে মানুষের ঢল। গ্ৰামের কারো নামে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, বসেছে পল্লির অঘোষিত আদালত। তবে আজকের শালিসে চেয়ারম্যান অনুপস্থিত। রাজধানীতে দলীয় মিটিং থাকায় তিনি না এলেও তাঁর জায়গায় এসে উপস্থিত হয়েছে মেম্বার হেলাল, অনুচর মকবুল আর গ্ৰামের বয়োজ্যেষ্ঠ লোকেরা। সামনের কেদারায় দুই পুত্রকে পাশে নিয়ে নীরবে বসে আছেন মাস্টার বাড়ির কর্তা আকবর মিয়া। তাঁর ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে মাসুম বাদে বাড়ির বাদবাকি ছেলেরা।
অপরপাশে বসা গ্ৰামের অধিক প্রৌঢ় লোক মাতব্বর আফাজ উদ্দিন, মেম্বার হেলাল, দেলোয়ার আর শাহ বাড়ির দুই কর্তা আমিরুল শাহ এবং মুমিনুল শাহ। পেছনে বসা সামিউল শাহ, সাথে রয়েছে আরো কিছু মানুষ। অন্যান্য বিচারাদি পুরো গ্ৰাম জানিয়ে করা হলেও মাস্টার বাড়ি বলেই হয়তো লোকসংখ্যা আজ কিছুটা কম। শুধুমাত্র গন্যমান্য ব্যক্তি আর এলাকার মানুষেরাই উপস্থিত হয়েছে সেখানে।
আকবর মিয়া স্বভাবসুলভ গম্ভীর। চারপাশের চাপা গুঞ্জন ভেদ করে বললেন,“আর কতক্ষণ বসাইয়া রাখবা? যেই উদ্দেশ্যে বিচারসভা ডাকছো হেইডা লইয়া কথা কও।”
“আমরাও বইয়া থাকতে আসি নাই। আমগোও কাম কাইজ আর সময়ের দাম আছে।” কথাটা আমিরুল শাহ বেশ বিদ্রুপের সুরেই বললেন।
তাকে গোনায় ধরলেন না যেন আকবর মিয়া। আফাজ উদ্দিন নড়েচড়ে বসলেন। বহু বছর আগে এই গ্ৰামের মাতব্বর ছিলেন তাঁর পিতা। তারপর দেশে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে দ্বন্দ্ব বাঁধার পর সব ছেড়েছুড়ে বাপ, ছেলেতে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। বাবা যুদ্ধেই ধরা খেয়ে শত্রু পক্ষের গুলিতে নিহত হন, আর তিনি হন জয়ী। তবুও ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। সহকর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে পায়ে খেয়েছিলেন গুলি। তাই হাঁটেন এখন খুঁড়িয়ে। তিনিই বললেন,“তোমার বাড়ির মাইয়ার নামে চেয়ারম্যানের কাছে বিচার আইছে। গতকাল হের লাইগা চেয়ারম্যান আমগো লইয়া মিটিং করছে। এই শালিস ডাকার কারণও এইডাই। গেরামের মানুষ ব্যাপারটা ভালাভাবে নিতাছে না। যদিও ব্যাপারটা ভালা না। খুবই জঘন্য। এইডা লইয়াই সব জায়গায় কানাঘুষা চলে। তোমরা এলাকার গন্যমান্য মানুষ বইল্যা কথাডা আমগো অনেকেরই বিশ্বাস হয় নাই। তাই আলাপচারিতার মাধ্যমে আজ এই শালিসের আয়োজন। ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাই কইরা সবার মতামত লইয়া বিচার শুরু হইবো।”
পরের কথা শুরু করলেন দেলোয়ার,“কয়দিন আগে আমনের বড়ো পোলা নজরুলের মাইয়ার বিয়া গেছে না, আকবর চাচা?”
আকবর মিয়া মাথা নাড়ালেন,“হ, তোমরা সবাই তো সেইখানে উপস্থিত আছিলা।”
“আছিলাম, কিন্তু দাওয়াত খাইয়া দুপুরেই বাড়ি চইল্যা গেছিলাম। মূল ঘটনা ঘটছে হেরপরে।”
“কী ঘটনা?”
“আড়াল কইরেন না, চাচা। গেরামের সবাই জানে। এই কথা আর চাপা নাই।”
“তোমরা কও হুনি।”
“আমনের নাতনি অর্থাৎ কাশেম ভাইয়ের মাইয়া নাকি সরলার মাইয়া জামাই লইয়া নষ্টামি করতে গিয়া ধরা খাইছে?”
কাশেম আলী চোয়াল শক্ত করে বসে আছেন। নজরুল আলম ধরে রেখেছেন ভাইয়ের হাত। যাতে রাগটাকে প্রকাশ না করে ফেলে। গতকাল দুপুর পর্যন্তও সব ঠিকঠাক ছিল। অথচ রাত হতেই বেশ কয়েকজন বাড়িতে গিয়ে সবটা তাদের জানিয়ে বলে এলো, সকাল হলেই মেয়ে নিয়ে যাতে হাজির হয় বটতলায়। নজরুল ভেবে পাচ্ছেন না, ঘরের খবর বাইরে গেলো কীভাবে? তখন তো বাইরের কেউ উপস্থিত ছিল না সেখানে। তবে? এটা কী সরলার কাজ? নজরুল আলমের রাগ বাড়লো বৈ কমলো না। যদি সরলা হয়ে থাকে তাহলে তিনি কিছুতেই বোনকে ছাড়বেন না।
তালেব এমনিতে ভদ্র ছেলে, সহজে রাগে না। তবে এই মুহূর্তে রেগে গেলো। পেছন থেকে গর্জে উঠলো, “কেডা কইছে এই কথা? যে কইছে হেয় কী নিজ চোখে ঘটনা দেখছে?”
মেম্বার হেলাল ভ্রু কুঁচকে নিলেন,“বড়ো গো মাঝখানে তুই কথা কস ক্যান? আকবর মিয়ার নাতির লগে বেয়াদবি মানায় না।”
আকবর মিয়া ঠান্ডা মাথায় বললেন,“বড়োরা মুখ সামলাইয়া কথা কইতে না পারলে ছুডোরা তো একটু আধটু বেয়াদবি করবোই। কেমনে আটকাইবো নিজের রাগ? তার উপর তার বোইন লইয়া কথা কইতাছো।”
বুড়োর সামনে মেম্বারের কথা খাটলো না। মুমিনুল শাহ বললেন,“যে দেখছে হেয়ই কইছে। সরলার মাইয়া জামাইয়ের কব্জিতে গুলি লাগছে। জয়নালের টেম্পুতে কইরা সদরে লইয়া যাওয়ার সময় অনেকেই দেখছে। কারো তো আর অজানা না যে মাস্টর বাড়ির কর্তার কাছেই শুধু শিকারের বন্দুক আছে। কী এমন হইলো যে নাতিন জামাইরে সে গুলি মারছে?”
“ঘরের কথা লইয়া পর মাইনষেরে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য না। যদি ভুল কিছু কইরা থাকি তাইলে পুলিশে নালিশ করল না ক্যান? পুলিশ তো আর আমার কথায় চলে না।”
কথায় যুক্তি আছে। তাই সকলে মাথা নাড়ালো। গুলি খেয়ে সেই যে জামিল গেলো তারপর সব ঠান্ডা। থানায় কোনো ধরণের অভিযোগ দায়ের করেনি। কে চায় ঝামেলা বাড়িয়ে নিজে ফাঁসতে? আমিরুল শাহ’র তা পছন্দ হলো না একদম। এদের মানসম্মান ডুবানোই তাঁর ইচ্ছে। চেয়ারম্যানকে ভালো করেই পূর্বে তা বলে রেখেছিলেন। শালা কী বুঝায়নি মেম্বারকে? সরু দৃষ্টিতে হেলালের দিকে তাকাতেই হেলাল ইশারায় আশ্বস্ত করল। ফের বললেন,“সরলায় নিজ মুখে সিদ্দিকরে ঘটনাডা কইছে। কাশেম ভাইয়ের মাইয়া হের মাইয়া জামাইরে ফাঁসাইছে, মাইয়ার নাকি চরিত্রের দোষও আছে? এর লাইগাই কী দাদার বাড়ি রাইখা নানার বাড়ি থাহে?”
“কই সরলা? ডাকেন তারে। যা কওয়ার সামনে আইয়া কউক। মাইয়া যেইখানে ইচ্ছা থাকুক তাতে কার বাপের কী?” কাশেম আলী তেজীয়ান কণ্ঠে বললেন।
“বিচারে রাগলে কিন্তু চলবো না, ভাই। অপরাধী এহন আমনের মাইয়া। সবাই ছিঃ, ছিঃ করতাছে। রাস্তায় বাহির হইতে পারবো?”
নজরুল আলম ফের ইশারা করলেন ভাইকে। চুপ থাকার নির্দেশ দিলেন। তিনি আর বাবা যে আছেন তা বুঝালেন। দেলোয়ার বললেন,“সেই মাইয়াডা কই, আকবর চাচা? মকবুল কয় নাই মাইয়ারে উপস্থিত রাখতে?”
“মাইয়া ছুডো মানু, এত মাইনষের সামনে ওরে আনা উচিত হইবো? যা কওয়ার আমগো কও। আমরা ওর অভিভাবক। সমস্যার সমাধানে আর প্রমাণের লাইগা আমরা আছি।”
সকলের মধ্যেই অসন্তোষ ভাব ফুটে উঠলো। আমিরুল শাহ বললেন,“গেরামের নিয়ম এমনে বদলাইতে পারে না। যার নামে বিচার হইবো তারেও উপস্থিত থাকতে হইবো। এর আগে বহু মাইয়ার বিচার হইছে। তারা কী উপস্থিত আছিলো না? ঘরে ব্যাডা ঢুকানোর লাইগা, নষ্টামি করতে গিয়া তালাক খাওয়ার লাইগা ন্যাড়া কইরা মুখে চুনকালি মাইখা গেরাম ছাড়াও করা হইছে।তাইলে এই বেলা নিয়ম বদলাইবো ক্যান? সবার লাইগা নিয়ম এক হইতে হইবো।”
বুঝতে আর বাকি নেই মূল কলকাঠি যে আমিরুল শাহ নিজেই নেড়েছেন। ছেলের হয়ে কী তবে প্রতিশোধ নিচ্ছেন? মাস্টার বাড়ির পুরুষদের কোনো যুক্তি তর্ক আর ধপে টিকলো না। আফাজ উদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“কিছু করার নাই, আকবর। এইডাই নিয়ম। আইজ তুমি না মানলে কাইল অন্য কেউ মানবো না। গেরামের শৃঙ্খলা নষ্ট হইবো। যতক্ষণ প্রমাণ দিতে না পারবা ততক্ষণ সবার চোখে তুমগো মাইয়া অপরাধী। মাইয়ারে লইয়া আইতে কও তাড়াতাড়ি।”
“ওইটুকু মাইয়ার মনে কী প্রভাব পড়বো ভাবতাছেন না ক্যান?”
মতিন চট করে বলে উঠলেন,“এইসব ভাবনা আমগো না। মাইয়া ছুডো হইলে আমনেগো উচিত আছিলো তারে দেইখা রাখা। না দেইখা রাখতে পারলে বিয়া দিয়া দিতেন। এহন আর কিছু করার নাই। নিয়ম না মাইনা সময় নষ্ট করলে এক ঘরে কইরা দেওয়া হইবো।”
“আমগো এক ঘরে করবেন? এত সহজ?”
“কঠিন কিছুও না, গেরামের মাইনষে সবই পারে।”
সকলেই একযোগে চেঁচিয়ে উঠলো কথাটায়। আকবর মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকালেন নাতিদের দিকে। তালেব মাথা নত করে প্রস্থান করল। বাড়ি বেশি দূরে নয়।
আকাশে মেঘ করেছে। মিছরি আগে আগেই গোসল করে ভেজা চুল ছেড়ে ফ্যানের নিচে বসেছে। গালের ক্ষতটা কালো বর্ণ ধারণ করেছে। এটা যে মানুষের কামড়ের দাগ তা আর বোঝার উপায়টুকু নেই। ওখানে লাগিয়ে রাখা হয়েছে ঘা সারানোর মলম। তালেব এসেই চেঁচিয়ে ডাকলো,“মা! ও মা!”
স্বামীর কণ্ঠস্বর পেয়ে পলি দৌড়ে এলো,“আম্মা ভাতের মাড় গালায়। কী দরকার?”
“মিছরি কই?”
“ঘরে।”
“ওরে তৈরি কইরা নিয়া আসো। বটতলায় লইয়া যাইতে হইবো।”
রান্নাঘর বাড়ির ডানপাশে।পারুল ভেতর থেকেই কথাটা শুনলেন। মাড় গেলে বাইরে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন,“ওরে ক্যান নিতে হইবো?”
মায়ের কাছে আংশিক ঘটনা খুলে বললো তালেব। পারুল দ্বিমত করলেন,“এতগুলা ব্যাডা মাইনষের সামনে আমি আমার মাইয়ারে যাইতে দিমু না। তোর দাদা আর আব্বায় কী করে?”
“কিছু করার নাই, মা। ওই জানোয়ার গুষ্টি পিছনে কলকাঠি নাড়ছে। না নিলে এক ঘরে কইরা দিবো, সমাজে আর কেউ মাথা তুইল্যা চলতে পারবো না।”
পারুল আঁতকে উঠলেন। চোখমুখ ছাপিয়ে গেলো বেদনায়। কী পাপ জীবনে করেছিলেন তিনি? কেন এই দুর্দিন দেখতে হচ্ছে তাদের? মনে মনে রবকে ডাকলেন,“আল্লাহ! সব ভুলের শাস্তি আমারে দেও, আল্লাহ। আমার মাইয়াডারে তুমি রক্ষা করো।”
মাসুম বাড়িতেই আছে। বেলা করে ঘুমিয়েছে। তাকে কেউ নিয়ে যায়নি বিচার সভায়। ছেলেটার মুখের সাথে হাত চলে বেশি। বোনের নামে একটা শব্দও কারো মুখে সহ্য করতে পারে না। ভাইয়ের কথা শুনে সেও এলো। নিম গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে বললো,“তুমি যাও, ওরে লইয়া আমি আইতাছি।”
“তোর আর যাওয়া লাগবো না। আমার লগেই যাইবো। তুই বাড়িত থাক। পলি ওরে নিয়া আসো।”
মাসুম প্রতিবাদ করল,“বোইন তোমার একলার না, যাও তুমি। আমার লগেই আইবো। আমিও দেখমু কে কতদূর ঘটনা লইয়া যাইতে পারে।”
“মাসুম!”
মাসুম লুঙ্গি কাঁধে নিয়ে চলে গেলো কলপাড়। তালেব বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। মাসুম বরাবরই তার অবাধ্য। বড়ো ভাই হিসেবে শুধু একটু সম্মানটাই যা করে তাও বাপ, দাদার ভয়ে। দ্রুত গোসল করে এলো সে। মাথা না মুছে গায়ে জড়ালো শার্ট। পলি মিছরিকে জোর করেই নিয়ে এসেছে বাইরে। পরনে তার সুতি সালোয়ার কামিজ, মাথায় কালো রঙের সুতি ওড়না মোড়ানো। ছলছল নয়নে একপলক বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মাসুম তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে বললো,“চল দেইখা আসি ওই খয়রাতের পোলারা কী কয়। ভয় পাইস না। আমি আছি তোর লগে।”
কিছুটা আশ্বস্ত হলো সে। অপর হাত দিয়ে শক্ত করে ধরলো ভাইয়ের হাত। তালেব নীরবে তাদের ভাই- বোনের বন্ধন দেখে, অথচ বোনটা আজ পর্যন্ত তার সঙ্গে এতটুকু স্বস্তিও পেলো না। তাই আগে আগে হাঁটা ধরলো। দাদী সৈয়দুন নেছা শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথায় ভালো করে ঘোমটা টানলেন। তারা বেরোতেই লাঠি হাতে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, “মাইয়াডা অতগুলা ব্যাডা মাইনষের মাঝখানে একলা! আমিও যাই, তোমরা থাহো।”
দিলারা বাঁধা দিলেন,“আব্বায় রাগ করবো, আম্মা।”
“রাখো হের রাগ। হের রাগের থাইক্যা আমার নাতনির ভালা-মন্দ আগে।”
বৃদ্ধার যাওয়া শূন্য চোখে চেয়ে চেয়ে দুই জা দেখলো শুধু।
___________
আকবর মিয়া আর তাঁর পুত্র, নাতিদের নত মস্তক দেখে শাহদের অধরে আনন্দ উল্লাস। নাজির ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখছে সেইসকল তর্ক-বিতর্ক।আজ আর ভেতরে গিয়ে কারো চোখে ধরা দেয়নি সে। মিল্টন তার পাশেই দাঁড়ানো। নাজিরের হাতটা মিল্টনের কাঁধে। অপরপাশে দাঁড়ানো নাজমুল। নাজির হেসে বললো,“চলচ্চিত্র দেখতে কেমন লাগে রে, বল্টু?”
মিল্টনও ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো,“ভালাই লাগতাছে, ভাইজান। এমন চলচ্চিত্র যে এই জীবনে দেখতে পামু কহনো ভাবতে পারি নাই।”
“আমিও না। তোর কী মনে হয়? কেডায় ফুঁসলাইয়া এই শালিস ডাকাইছে?”
নাজমুল প্রশ্ন ছুঁড়লো,“কেডায়?”
“কেডায় আবার? আমগো বড়ো চাচায়। দেহোস না, মুখে কী বিশ্ব জয়ের হাসি?”
“একটা কামের কাম করছে এতদিনে। পারভেজরে কোঁচ দিয়া পাড় মাইরা এনেই বাইন্ধা রাখছিল। ভুলি নাই কিছু।”
“ওই যে দেহেন কেডায় আইছে, ভাইজান! মাস্টার বাড়ির মাইয়া শেষমেশ শালিস সভায়!”
নাজির তাকালো সেদিকে। তালেব এসে দাঁড়িয়েছে বাবার পেছনে। মিছরিকে নিয়ে মাসুম এসে ঠিক তার পাশেই থামলো। তারা আসতেই মেম্বার শুরু করলেন কথা,“মাইয়ারে ওই জায়গায় বইতে কও।”
বটগাছের নিচে বসার জায়গা দেখিয়ে বললেন। মাসুম দ্বিমত পোষণ করে ত্যাছড়া স্বরে বললো,“এনেই ওয় ঠিক আছে। আমনেগো কী কওয়ার কন তাড়াতাড়ি।”
“এইডা নিয়ম না।”
“আমারে নিয়ম শিখাইয়েন না। ছুডো থাইক্যা নিয়ম- কানুন, শালিস দেইখাই বড়ো হইছি। কী জিগাইবেন জিগান। এমন পরিবেশে ওয় অভ্যস্ত না।”
দেলোয়ার বললেন,“গেরামের মানুষ কইতাছে তোর বোইন ঘরে পোলা লইয়া ধরা খাইছে।”
“আমিও হুনছি কিন্তু দেখি নাই। তারপর?”
আকবর মিয়া কড়া দৃষ্টিতে নাতির দিকে তাকালেন, “স্বর নরম কর। আমরা এই গেরামের মানুষের থাইক্যা আলাদা ক্যান জানোস? কারণ আমরা ভদ্র। হুটহাট খারাপ আচরণ কিংবা কারো নামে দুর্নাম ছড়ানো আমগো স্বভাবের বাহিরে।”
নিজেকে সংযত করল মাসুম। কথাটা যে উপস্থিত কিছু ব্যক্তিদের খোঁচা মেরে বলা হয়েছে তা খুব ভালো করেই তারা বুঝলো। সিদ্দিক বললো,“এত ভালা কইরা কথা কওয়ার তো কিছু দেখি না। তাড়াতাড়ি বিচার শেষ করেন। রাইতে জায়েদার মা হেগো বাড়ির সামনে দিয়া আওনের সময় নিজ চোখে দেখছে দরজা ভাঙতে। সরলা চাচীর মুখ থাইক্যা আমি সব হুনছি। জামিলরে কাইল আমিরুল চাচার লগে গিয়া দেইখাও আইছি। সব প্রমাণ আছে আমগো কাছে। আমনেগো কাছে কী আছে?”
স্থানটিতে মুহূর্তেই যেন বিস্ফোরণ ঘটলো। এতদূর চলে গিয়েছে ঘটনা! এবার পুরোপুরি নিশ্চিত এটা শাহদের কাজ। ওরাই আসল ঘটনা বের করে তা বিকৃত করেছে মানুষের সামনে। আকবর মিয়া বললেন, “জামিল হইলো সরলার বড়ো মাইয়ার জামাই। আগে থাইক্যাই তার চরিত্র খারাপ। হের গেরামে গিয়া খোঁজ করলেই আসল ঘটনা পাইয়া যাইবেন সবাই।”
মতিন বললেন,“আমরা আমনেগো বাড়ির মাইয়ার বিচার করতে আইছি। প্রমাণ দেখান আমনেগো মাইয়া যে শুদ্ধ।”
“একলা পাইয়া মাইয়াডার সুযোগ লইতে চাইছিল ওই জামিল। আমার নাতিন বউ নিজ চোখে দেখছে। হের পর দেখছে আমগো কাশেমের সম্বন্ধির পোলা, আর সুজনে। খারাপ কিছু ঘটার আগেই আল্লাহ রক্ষা করছে। আর কী প্রমাণ চাস তুই? কে না কে কী কইলো তাতেই এক মাইয়ার বিচার করতে আইয়া পড়ছোস?”
“কেমনে বিশ্বাস করি? নাতিন বউ, সুজন আর শালার পোলা সবই তো আমনেগো নিজের লোক। তাগো যে নিজেরা শিখাইয়া পড়াইয়া লন নাই তার কী নিশ্চয়তা আছে?” সিদ্দিক বললো।
“তাইলে জায়েদার মায় আর জামিলেও যে মিছা কথা কয় নাই তারই বা কী নিশ্চয়তা?” সুজন বললো।
“বাহিরের মানুষ ক্যান তগো নামে মিছা কথা কইবো? লাভ কী হেগো? আর সরলা তো নিজে গো ফুফু। তাইলে?”
অসংখ্য যুক্তি তর্ক চললো। কিন্তু আকবর মিয়া বা তাঁর ছেলে, নাতি কারো কোনো কথাই এতগুলো মানুষের সামনে খাটলো না। সবকিছু যেন আগে থেকেই পরিকল্পনা করা। প্রভাবশালী সবাই তাদের বিরুদ্ধে। আর যারা পক্ষে তারা গ্ৰামের সাধারণ মানুষ। এদের সামনে কথা বলার মতো সাহস তাদের নেই। তাই শুরু থেকেই নীরব। মেম্বার হেলাল বললেন, “আমনেরা সঠিক কোনো প্রমাণ দিতে পারেন নাই। মুখের কথায় হয় না কিছু। ভরসাযোগ্য সাক্ষী লাগে। তাই আমগো আর কিছু করার নাই। গেরামের মানুষ যা চাইবো তাই বিচার হইবো।”
আমিরুল শাহ ইশারা করলেন দেলোয়ারকে। এদের কাজই এর ওর বাড়ির গীবত করা। সুযোগ পেলে শাহদেরও ছাড়ে না। তিনি বলে উঠলেন,“সবসময় যা বিচার হয় এইবারও হেইডাই হইবো। ন্যাড়া কইরা মুখে চুনকালি মাখাইয়া পুরা গেরাম ঘুরাইতে হইবো। আইজ ওয় করছে, কাইল ওর দেখাদেখি আরেকজন করার দুঃসাহস পাইবো।”
দেলোয়ারের কথায় ঘন ঘন মাথা নাড়ালো সিদ্দিক, মতিন, মেম্বারসহ আরো অনেকে। মাসুম চেঁচিয়ে উঠলো,“অসম্ভব, আমনেরা কইলেই মাইনা নিতে হইবো?”
মেম্বার বললেন,“না মানলে এক ঘরে কইরা দিমু।”
আফাজ উদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ইশারায় আকবর মিয়ার কাছে প্রকাশ করলেন অপারগতা। তাদের পক্ষ নিতে অনেক চেষ্টা তিনি করেছেন কিন্তু তাকে যেন আনা হয়েছে শুধুই লোক দেখানোর জন্য। তালেব, সুজন, মাসুম মেনে নিলো। প্রয়োজন হলে হয়ে যাবে এক ঘরে। কাশেম আলী শেষমেশ নরম হয়ে বললেন, “আমার একটামাত্র মাইয়া। এইসব আমনেরা করবেন না। ওরে আমি আবার বরিশাল পাঠাইয়া দিমু।”
নজরুলও দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নাজিরের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো মাসুমের পেছনে লুকিয়ে থাকা মেয়েটির দিকে। যে এই বিচার সভার অপরাধী আজ। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকাচ্ছে মেয়েটি। শক্ত করে ধরে আছে ভাইয়ের পরিহিত শার্টের একটি অংশ। ধীরে ধীরে নাজিরের অধরের হাসি বিলীন হয়ে এলো। সব আনন্দ মিলিয়ে গেলো কোথাও। আর ভালো লাগছে না। ছেলেবেলায় তার মা তাদের দুই ভাই আর অসুস্থ বাবাকে ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল অন্য পুরুষের সাথে। তা শুনেই নাজির বড়ো হয়েছে। অথচ নারী জাতির প্রতি কোনো ঘৃণা তার আসে না। আজ সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাজির সে হতে পেরেছে নারীদের কারণেই। চাচারা বেঈমানি করলেও চাচীরা তো করেনি। বড়ো চাচী তাকে মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছেন। দুই ভাইকে রেঁধে খাইয়েছেন, এখনো খাওয়ান। আর ছোটো চাচী!
তাঁর সঙ্গে সাপে নেউলে সম্পর্ক হলেও এই মহিলা ছোটবেলায় বহুবার মেরে, ধরে, মাঠ দিয়ে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে তার পিছুপিছু ছুটে খারাপ পথে যাওয়ার আগেই সেখান থেকে সরিয়ে এনেছিল। নইলে সেও তো আজ পড়ে থাকতো কোনো অলিতে গলিতে নেশারি বা জুয়াড়ি হয়ে। এই মেয়েটার জন্যও আচমকাই নাজিরের খারাপ লাগা কাজ করছে। ভেতরের ভালো আত্মাটা জেগে উঠছে বোধহয়। যে কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে তাতে মেয়েটিকে সরল বলেই মনে হয়েছে। নাজির তো খুব ভালো করেই মানুষ চেনে। সে বুঝতে পারছে, শত্রুতার জেরে এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে ফাঁসাতে চাইছে সকলে।
নাজির একবার এগিয়ে যেতে চাইলো। পরক্ষণেই নিজ মন বদলে বিড়বিড় করল,“ভালা হইছে। আমি যামু ক্যান? হের পুরা গুষ্টি এনে আছে। হেডাম দেখাইয়া বাঁচাক মাইয়ারে। আমারে কী কেউ কোনোদিন সাহায্য করছে? করে নাই।”
চলবে ________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

