যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:১৩]

0
27

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৩]

পূর্বাকাশে সূর্যের আভা ছড়াতেই ধীরে ধীরে সজাগ হয়ে উঠেছে গ্ৰামীণ জনজীবন। গাছের পাতার নড়চড় নেই। সকাল হলেও কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে উঠোনের মাঝখানে একঝাঁক হাঁসদের খাবার দিচ্ছেন মর্জিনা। হাঁসগুলো প্যাক প্যাক শব্দ তুলে ছুটছে তাঁর পায়ের ধারে। নাজির বারান্দায় বসে কলা রুটি খাচ্ছে। মাঝেমধ্যে গরমের থেকে বাঁচতে নিজের শরীরে বাতাস করছে হাতপাখা দিয়ে। চাচীর কর্মকান্ড দেখে নাক সিঁটকে বললো,“হাঁস পালে গিদরে। আমনে একটা গিদর।”

“তুই গিদর, তোর চৌদ্দ গুষ্টি গিদর।”

“তাইলে তো ছুডো চাচায়ও গিদর! একলগে ঘুমান কেমনে?”

“সকাল সকাল মাথা খাবি না, শান্তি দে।”

“আমনের মুরগি আমার বারান্দায় আইয়া লেদাইয়া দেয়, তবুও কিছু কই না। কিন্তু হাঁস জিনিসটা মাইন্যা নিতে পারতাছি না। গন্ধে টিকা যায় না। ভালায় ভালায় এসব দূর করেন, না হইলে কিন্তু মাইনষে গো মাঝখানে বিলাইয়া দিমু।”

“আমার হাঁসের মিহি হাত লাগাইয়া খালি দেহিস। তোর হাত গলায় ঝুলাইয়া দিমু।”

“ছুডো নাজির শাহ পাইছেন নাকি? এহন বড়ো হইছি। গায়ে হাত তোলা অত সহজ না।”

“তোমার মতো নাজির শাহরে এই মর্জিনা গুনায় ধরে না।”

“ফহিন্নির ঝি এর ভাব কি!”

হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালেন মর্জিনা। যেকোনো মুহূর্তে যেন নাজিরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। নাজির বসা থেকে উঠে সরে গেলো নিরাপদ দূরত্বে। এই মহিলাকে বিশ্বাস নেই। মুখের সাথে সাথে হাতটাও চলে বেশি। প্রতিবেশী নারীরা তাই তাকে এড়িয়েই চলে। অদূরে রান্নাঘরের মাটির চুলায় আগুন জ্বলে উঠেছে। ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। ফরিদা রান্না করছেন। চুলায় ভাত বসিয়ে বেগুনে তেল মাখাচ্ছেন পোড়ানোর জন্য।

চাচী-ভাতিজার জমজমাট ঝগড়ার মাঝখানে বাগড়া দিতে কোথা থেকে যেন ছুটে এলো কলিমের মা। বাড়ি বেশি একটা দূরে নয়। প্রায় কাছাকাছি বললেই চলে। চোখেমুখে তার উপচে পড়া আনন্দ। কলিমটা সকাল হলেই এর ওর বাড়ি গিয়ে ফরমায়েশ খাটে। মহিলার স্বামী নেই। কয়েক বছর আগেই স্বামী পরকীয়া করতে গিয়ে ধরা খাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করিয়ে দেয় গ্ৰামের মানুষেরা। সেই বউয়ের কানপড়াতেই স্বামী তাকে তাড়িয়ে দেয়। ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে আসেন বনখড়িয়া গ্ৰামে এক আত্মীয়ার কাছে। তারপর থেকে এখানেই তার বাস। চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে এক টুকরো জমিতে তুলেছে ছনের ঘর। শাহ বাড়িসহ আরো বেশ কয়েকটা বাড়িতে সারাদিন কাজকর্ম করে যা পায় তাই দিয়েই মা-ছেলের দিব্যি চলে যায়।

তার চকচকে চাহনি দেখে নাজির কিছু একটা আঁচ করেছে বোধহয়। কান্দার শেষ কলাটা ছিঁলতে ছিঁলতে জিজ্ঞেস করল,“এত্ত খুশি ক্যান, চোগলখোর চাচী? কার বাড়িত আবার আগুন লাগছে?”

প্রশ্নটায় কলিমের মা অত্যধিক খুশি হলেন বলেই মনে হলো। তবে চুগলখোর শব্দটায় বিশেষ পাত্তা দিলেন না। নাজিরের স্বভাবই তো অন্যকে খোঁচা মেরে কথা বলা। তাই আর হেঁয়ালি করলেন না। পাল্লায় হেলান দিয়ে বসলেন। কালো মাটির প্রলেপ দিয়ে বাড়িটা লেপা হয়েছে এইতো সপ্তাহ খানেক আগে। তিনিই লেপেছিলেন। তার জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে নাজিরের থেকে পঞ্চাশ টাকার চকচকে একটা নোটও পেয়েছিলেন। শাড়ির আঁচলে ঘর্মাক্ত মুখ মুছতে মুছতে বললেন,“এক্কেবারে টাটকা খবর। শাহ বাড়ির মাইনষে গো কইলজা ঠান্ডা কইরা দেওয়ার মতোন খবর।”

“কন কী! একেবারে কইলজা ঠান্ডা কইরা দিবো? কন দেহি তাড়াতাড়ি।”

চুলার মুখে খড়ি ঠেলতে ঠেলতে উৎসুক দৃষ্টিতে ফরিদা তাকিয়ে রইলেন কলিমের মায়ের দিকে। চোখেমুখে তাঁর আগ্ৰহ। মর্জিনা ভ্রু জোড়া কুঁচকে বিরক্তির সহিত বললেন,“মহিলা মাইনষের ভিতরে তোর কী কাম? যা এইহান থাইক্যা, কথা হুনতে দে।”

“কেডা মহিলা? আমনে? আয়হায় কন কী! আমনে তো একটা ব্যাডা। আমার প্রিয় বন্ধু। আইয়েন বিড়ি খাইয়া আহি।”

“গোলামের পুত!”

“ছিঃ, ভাসুররে গোলাম কয় বেয়াদব মহিলায়! আসুক চাচা। কানপড়া দিয়া বাপের বাড়ি পাঠাইয়া দিমু।”

ফরিদাও এবার বিরক্ত হলেন। চুপ থাকার নির্দেশ দিলেন,“কাইজ্জা পরে করিস, আগে ঘটনা হুনতে দে। তুই ক তো কলিমের মা, কী হইছে?”

কলিমের মা আশেপাশে তাকালেন।‌ সতর্কতা অবলম্বন করে বললেন,“মারাত্মক ঘটনা ঘটছে গো, ভাবি। পরশু মাস্টর বাড়িত নজরুল চাচার মাইয়ার বিয়া হইলো না?”

“হ।”

“ওইদিন হেগো বাড়ির কোন মাইয়া জামাইয়ের লগে জানি আরেক মাইয়া এক ঘরে ধরা খাইছে। সে কী কান্ড গো, ভাবি! এই কথা এহন গরম খবরের লাহান গেরামে ভাইসা বেড়াইতাছে।”

“নাউযুবিল্লাহ, কি নষ্টামি!”

“তাইলে আরকি! আমার তো হুইনাই বমি আইতাছে। রাস্তা দিয়া আইতে আইতে কয়বার যে থুথু ফেলাইছি! মাইয়ারাই মাইয়াগো শত্রু। বোন হইয়া কেমনে আরেক বোইনের জামাইয়ের লগে? ছিঃ!”

নাজির ভ্রু কুঁচকালো। কলার খোসা একটা ডেকচিতে জমা করল। গরুকে ভুসির সাথে খেতে দেবে। জিজ্ঞেস করল,“কোন মাইয়া করছে? হেগো বাড়িত তো অনেক মাইয়া।”

“বুঝতে পারতাছি না, আমি হুনছি জায়েদার মায়ের কাছ থাইক্যা। হেয় নাকি হেগো বাড়িত কাম করছে হেইদিন।পাশের বাড়ির মানিকের মায়ের লগে হাইনজা পর্যন্ত গল্প কইরা রাইতে ফিরার সময় দেখে কানতে কানতে আকবর দাদার মাইয়া আর নাতনি সদরে যাইতাছে। হেগো থাইকাই যতটুকু হুনছে। আমি আবার ভেইন্নাবেলা বুইড়া জিন্নত আলীরে জিগাইলাম, কিন্তু কিছু কয় না। এরপর চাইপা ধরতেই যা বুঝলাম, বাড়ির ছুডো মাইয়া।”

“ছুডো মাইয়া ফাহমিদায় না? ওরই তো বিয়া হইলো।” মর্জিনা বললেন।

“আরো একটা আছে। তয় ওইডা এনে থাহে না। কই থাহে জানি না।”

“আরো একটা আছে?”

নাজির বলে উঠলো,“হ আছে, কাশেমের মাইয়া। এনে থাহে না। নানার বাড়ি থাহে। ওইডা নাকি, চাচী?”

কলিমের মা ভাবলেন কিছুক্ষণ। সন্দেহ নিয়ে বললেন, “বুঝতাছি না, নাম কয় নাই। তবে হামলাইয়া রাখবো কয়দিন? গর্ত থাইক্যা হাপ টাইনা ঠিকই বাহির করমু। মাত্র তো সকাল হইলো।”

“মনে হয় না ওই মাইয়ায় করবো।”

“তুই নিশ্চিত কেমনে?” মর্জিনার চোখেমুখে সন্দেহ।

“কইলাম না, মাইয়ারে আমি দেখছি। কথাও কইছি।ডাঙর হইলেও বয়সে আর হাবভাবে পোলাপাইন মানু। ব্যাডা লইয়া আকাম কুকাম কী করবো?”

“ওইডা সময় হইলেই টের পাওন যাইবো। হেগো বাড়ির সব কয়ডার মধ্যেই বিষ। দেখলি না কয়দিন আগে কেমনে আমগো পারভেজরে ফাঁসাইলো?” মর্জিনা বললেন।

তাদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে আর গেলো না নাজির। তার মতে, মহিলা মানুষদের সঙ্গে তর্ক যত কম করা যায় ততই ভালো। তাই ওখানে আর দাঁড়ালো না। ডেকচি আর কাঁচি নিয়ে চলে গেলো নামার ক্ষেতের দিকে। প্রথমে ঘাস কাটবে ছাগলের জন্য। তারপর গরুর চারিতে ভুসি গুলিয়ে বের হবে ধানের জন্য ক্ষেত তৈরি করতে। আমন ধানের চাষ করবে এবার।
_________

বাজারের ব্যাগ হাতে কিছুটা বেলা করেই আজ বাড়ি ফিরছিলেন কাশেম আলী। গতকাল পরিবারসমেত ভাতিজির বউ ভাতের অনুষ্ঠানে তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ায়, আজ ভোরবেলায় বাজারে যেতে হয়েছে। চায়ের দোকানে তখন উপচে পড়া ভিড়। এই চায়ের দোকানটা দক্ষিণ পাড়ার সিদ্দিকের। সারাদিন লোক সমাগম লেগেই থাকে। তবে এখানে অত্যন্ত ভিড় হয় সকাল, সন্ধ্যা আর রাতে। মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে দোকান থাকায় যেকোনো পাড়ায় যেতে হলে এটাই পার করতে হয় সর্বপ্রথম।

দোকানের ভেতর থেকে বেশ কয়েকটা কণ্ঠ হতে ডাক পড়ল,“কাশেম ভাই! ও কাশেম ভাই! যাওগা ক্যান?”

গ্ৰামের মানুষজনের সাথে সর্বদা হেসেই কথা বলেন কাশেম আলী। কিন্তু আজ তিনি হাসলেন না। মুখে গাম্ভীর্য এঁটে মিহি স্বরে বললেন,“বাজারের ব্যাগটা দিয়া আসি বাড়িত।”

গ্ৰামের প্রবীণ মিন্নত ব্যাপারি হাঁক ছেড়ে ডাকলেন নিজের নাতিকে,“সুরুজ! ওই সুরুজ! তোর কাশেম চাচার সদাইয়ের ব্যাগটা সাবধানে বাড়িত দিয়া আয়। চাচীর হাতে দিবি কিন্তু।”

ওপাশের ফাঁকা স্থানে ডাঙ্গুলী খেলছিল সুরুজ। দাদার নির্দেশে চোখেমুখে ফুটে উঠলো বিরক্তি। খেলা ছেড়েই চলে এলো সে। কাশেমের হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে করল প্রস্থান। কাশেম আলী কিছু একটা আঁচ করলেন। হুট করে এত খাতিরদারি করার মানুষ তো এরা নয়। তবে? নিজেকে ভেতরে ভেতরে তৈরি করে রাখলেন আগে থেকেই। সর্বপ্রথম প্রসঙ্গ তুললো মতিন। যার কাজ হচ্ছে দোকানে বেকার বসে থেকে সবার বাড়ির গোপন খবর বের করা। হালকা কেশে বললেন, “গেরামে গুঞ্জন উঠছে তুমগো বাড়ির কোন মাইয়া নাকি ফুফাতো বোইনের জামাই লইয়া এক ঘরে ধরা খাইছে? দরজা ভাইঙা হাতে-নাতে নাকি ধরছো?”

এমন ভয়ই পাচ্ছিলেন কাশেম আলী। তবে ঘটনাটিকে বিকৃত করায় ক্ষোভ বাড়লো, কিন্তু উত্তেজিত হলেন না। সব জায়গায় উত্তেজিত হওয়া মানায় না।যথাসম্ভব শান্ত মস্তিষ্কে বললেন,“কে কইছে তোমারে?”

“হুনছি আরকি। সরলারেও দেখলাম কানতে কানতে কই যাইতাছে। বিয়া বাড়িত কানবো ক্যান?”

“বিয়া বাড়িতেই তো কান্দে। একটা মাইয়ারে ছুডো থাইক্যা পাইলা পুইষা বড়ো করার পর আরেক বাড়ির পোলার লগে বিয়া দিয়া বিদায় দেওন কী কম কষ্টের কাম? মাইয়া তো তুমগো বাড়িতও আছে, নাকি?”

মাথা নাড়ালেন লোকটা। মিন্নত বললেন,“তাইলে যেই গুঞ্জন উঠছে হেইডার কী হইবো?”

“উঠতে দেন, চাচা। হাওয়ায় ফালাইয়া দেন। উড়তে উড়তে যাইবো গা। এইগুলা শত্রুপক্ষ গো কাম। কয়দিন আগে দেখলেন না, হেগো বাড়িত একের পর এক কী ঘটলো? তাই ধামাচাপা দেওয়ার লাইগা আমগো বাড়ির মাইয়ার গায়ে কালি লাগাইতে চায়। সুখ সহ্য হয় না।”

কেউ কেউ তাঁর কথায় বিশ্বাস করল, আবার কেউ বা করল না। বিশেষ করে মতিন আর দোকানদার সিদ্দিক। শাহদের সঙ্গে তাদের বিশেষ সখ্যতা রয়েছে। তাই এই ঘটনার গভীরে তারা যাবে। মতিন সন্দেহ নিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,“ছুডো মাইয়াডা তোর না? সেই কোলে থাকতে দেখছিলাম। এহন কই থাহে?”

“নানার বাড়ি।”

“উনে থাহে ক্যান? পালক দিয়া দিছোস?”

“এইসব কী কথা? নিজের মাইয়া পালক দিমু ক্যান? ওর নানায় ইশকুলের হ্যাডমাস্টর, বড়ো মামা আর্মি, ছুডো মামায় কলেজে পড়ায়। শিককিত পরিবার। তাই হেগো কাছে রাইখা দিছি মানুষ হওয়ার লাইগা। গেরামে থাইক্যা মাইনষের মাইয়ার মতো পাড়াবেড়ানি কুটনি বানামু নাকি?” ক্ষিপ্ত শোনালো কাশেম আলীর কণ্ঠস্বর।

সিদ্দিক চায়ে চিনি মেশাতে মেশাতে বিদ্রুপ করে বললো,“মাস্টর বাড়ির বাকি মাইয়ারাও তো গেরামেই বড়ো হইছে, চাচা। পড়ছেও গেরামের ইশকুলে। হেরাও কী পাড়াবেড়ানি হইছে?”

নিজেকে সংযত করলেন কাশেম আলী। রাগ জিনিসটা মারাত্মক। মুখ দিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বের করে দেয়। ধৈর্য ধরে বললেন,“আমগো বাড়ির মাইয়াগো কহনো বাড়ির বাহিরে অকারণে দেখছোস, সিদ্দিক? তাগো কোনো খারাপ দিক দেখছোস কহনো?”

“না, তা দেহি নাই।”

“তাইলে? ইশকুল বন্ধ দিলেই আমার মাইয়া চইল্যা আসে। তার উপর জেলা শহরে থাহে হেরা। তাই সব সুযোগ-সুবিধা থাকায় দিয়া দিছি। তালেবরেও ম্যাট্রিক পাস করাইছি ওইখান থাইক্যা। এরপর আর পড়লো না। মাসুমডারে তো পারলামই না। ডান পিঠে পোলা। এইহানেই পড়ছে। পোলা মানুষ বইল্যা জোর দেই নাই। মাইয়াডাও ম্যাট্রিক পাস করুক। তারপর একেবারে‌ নিজের কাছে আইনা রাখমু।”

কথাটিকে খুব সুক্ষ্মভাবে সেই মুহূর্তে ধামাচাপা দিলেন কাশেম আলী। কিন্তু গ্ৰামের মানুষ তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। তাদের কাছে নিজের পরিবারের চেয়েও অন্যের পরিবারে কী হচ্ছে বা হয়েছে সেসব নিয়ে চলে কৌতূহল।

মাস্টার বাড়ির আবহাওয়া আগের রূপে ফিরে এসেছে। অতিরিক্ত মানুষ এখন আর নেই। কাশেম আলীর শ্বশুর বাড়ির মানুষেরাও ফিরে গিয়েছে রাতের ট্রেনে। সোজা সদরঘাট গিয়ে লঞ্চে উঠবে তারা। মিছরিকে কাশেম আলী তাদের সাথে দেননি। বলেছেন, আপাতত এখানে সবার মধ্যে থেকে সুস্থ হোক, তারপর না হয় মাসুম বা তালেব গিয়ে দিয়ে আসবে।

জানালার পাশে উদাস হয়ে আকাশপানে ফ্যালফ্যাল নয়নে চেয়ে বসে আছে মিছরি। চঞ্চল মেয়েটা দুদিন ধরে হাসে না, ফল গাছে ঢিল ছোঁড়ে না, কাউকে বিরক্তও করে না, করে না সুজাতার সাথে খেলা। সুজাতা দিনে বারবার ঘুরে যায়। ফুফু ফুফু করে কান ঝালাপালা করে দেয়। তবুও ধমক বা চিমটি খায় না। এই নিয়ে মা, চাচী, ভাবি বেশ কয়েকবার সকালের নাস্তা নিয়ে তার পাশ দিয়ে ঘুরে গিয়েছে অথচ সাড়া পায়নি। এত ছোটো মেয়েটার সাথে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত, নোংরা ঘটনা ঘটার পর সে কী আর ঠিক থাকতে পারে? তদুপরি তার জন্যই তো বাবা-মায়ের বিছানা হয়েছে আলাদা।

তার ভাবনার মধ্যেই ঘরে এলো মাসুম। সেই সকালে গিয়ে বাজারের ভাতের হোটেল থেকে কিনে এনেছে সবজি, পরোটা। সাথে মায়ের হাতের ভাজা ডিম। এই খাবার বোনের ভীষণ প্রিয়। বিছানায় উঠে সে বসলো প্রথমে। রুটি ছিঁড়ে সবজি মাখিয়ে টানলো বোনের চুল। খোঁচা দিয়ে বললো,“কী রে ডাইনি, কী ভাবোস? খাস নাই ক্যান? বিরহ লাগছে?”

আজ আর ঝগড়া করল না মিছরি। ভাইদের মধ্যে তার ভাব মাসুমের সাথেই বেশি। দুজনার বয়সের পার্থক্য দশ। তবুও দুটোতে মিলে এমন করে যেন পিঠাপিঠি। বোনটা মাসুমেরও প্রাণ। এই যে গতকাল যখন সে বউ ভাতের অনুষ্ঠানে বোনকে দেখতে পেলো না তখন কত প্রশ্ন মা, চাচীকে করল! তারপর বাড়ি ফিরে সব ঘটনা শোনার পর হয়ে উঠেছিল ভয়ংকর। খুন চেপে বসেছিল মাথায়। শেষমেশ চাচা, দাদা তাকে বুঝিয়ে থামিয়েছে। তালেবের সাথে আবার মিছরির বয়সের পার্থক্য পনেরো। বড়ো ভাই তাকে ভালোবাসলেও কোনো অজানা কারণে মিছরি তাকে ভয় পায়। চলেও মান্য করে। যত আবদার সব তার বাবা আর ছোটো ভাইয়ের কাছে।

ভাইয়ের হাত থেকে নিজের চুল ছাড়িয়ে বসে রইলো মেয়েটি। মাসুম বাম হাত দিয়ে গাল দুটো চেপে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে মুখের ভেতর খাবার ঠুসে দিয়ে বললো,“ওইসব আর ভাবিস না তো, ভুইল্যা যা। যত ভাববি তত স্বাভাবিক হইতে পারবি না। আমগো মিছরি কী এত দুর্বল? এই শিক্ষা দিছি তোরে?”

এই পর্যায়ে এসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মিছরি। মাথা ঠেকালো ভাইয়ের বাহুতে। নাক টেনে বললো,“ওই, ওই লোকটা! আমার সাথে….

“চুপ! বলছি না, ওই প্রসঙ্গে আর কোনো কথা না। যা হওয়ার হইছে। এতে তোর কোনো দোষ আছিলো না। এর থাইক্যাও খারাপ বহু মাইনষের লগে হয়। তারা কী এমনভাবে মুখ কালা কইরা বইয়া থাহে? থাহে না। বরং জীবনে আগাইয়া যায়। না খাইয়া নিজেরে কষ্ট দেওয়ার মানে আছে? কোনো মানে নাই।
মুখেরটা শেষ হইছে? হা কর দেহি। থালার সব খাওন শেষ কইরা বাহিরে চল। তালের শাঁস খাবি? গাছে অনেকগুলা হইছে দেখলাম।”

“বাইরে যাবো না।”

“একটা দিমু। তাড়াতাড়ি খা, কাজ আছে আমার।”

বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে নিলো মিছরি। আরো বিভিন্ন কথা বলে মাসুম তাকে ভুলাতে লাগলো। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সেসব দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন কাশেম আলী।
_________

বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়েছুড়ে নওশাদের ঠাঁই হয়েছে স্ত্রীকে নিয়ে স্ত্রীর বাপের বাড়ি। নিজেকে এই মুহূর্তে ঘর জামাই মনে হচ্ছে তার। যদিও মনে হওয়ার কিছু নেই, বাস্তবেই এখন থেকে সে ঘরজামাই। লিলির বাপের বাড়ি হাতিরঝিলে, দুতলা বিশিষ্ট নতুন দালান। উপরের তলায় বাবা-মা, লিলিসহ তার মেজো ভাইয়ের বাস। আর নিচতলায় বাস স্ত্রী নিয়ে ছোটো ভাইয়ের। বড়ো ভাই স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকেন কানাডা।

ধনী শ্বশুরবাড়ির বিলাসিতা আর নিয়ম-কানুনের ভেতরে যেন কিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না নওশাদ। প্রতিটি মুহূর্তে এক অদৃশ্য লজ্জা তাকে ঘিরে ধরছে। নিজের অস্তিত্বটাই যেন কোথাও মলিন হয়ে গিয়েছে। এদের সামনে নিছক এক ঠুনকো মানুষ সে। ছোটো, তুচ্ছ, অপ্রয়োজনীয়। এই তো গতরাতেই বাড়ির কাজের মেয়েটি ফিসফিস করে কাউকে বলছিল,“কেমন শেয়ানা পোলা দ্যাখছেন, আম্মা? বড়লোকের মাইয়া পটাইয়া কেমনে শ্বশুরবাড়ি আস্তানা গাড়ছে, দ্যাখছেন?”

পানি খেতে গিয়ে কথাটা কানে আসে নওশাদের। শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে কথার বিষ। তার ধারণা, নির্ঘাত শাশুড়ির কাছেই এসব বলছিল মেয়েটি।তৎক্ষণাৎ বুকটা মুচড়ে উঠলো। অথচ তেইশ বছরের জীবনে ভাই তাকে কতই না আগলে রেখেছিল! কারো কোনো বিরক্তি বা কটুক্তির সম্মুখীন হতে দেয়নি। কিন্তু তার বিনিময়ে সে কী করল?
চুপচাপ ঘরে ফিরে এসে লিলিকে বললো,“আর এখানে থাকা যাবে না। চলো আমরা ভাড়া বাড়িতে গিয়ে উঠি। এভাবে আর কতদিন? কাল না হয় নতুন বাড়ির খোঁজ করবো।”

লিলি ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে চেয়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,“টাকা কোত্থেকে? চাকরি করো? সংসার খরচের টাকা কী তোমার ভাই দেবে? চুপচাপ এখানে পড়ে থাকো। ভাড়া বাড়িতে গিয়ে আমি থাকতে পারবো না।”

“বোঝার চেষ্টা করো, লিলি।”

“সুখ সহ্য হচ্ছে না?এত বড়ো বাড়িতে থাকতে পারতে কখনো? পড়াশোনা করো। মা বলেছে, পড়াশোনা শেষ হলে বাবার সাথে কথা বলে তোমার চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে। পাগলেও মনে হয় না এমন অফার পেয়ে পায়ে ঠেলে দেবে। ঘুমাও। জীবনে উন্নতি করতে চাইলে, সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে লজ্জা আর আত্মসম্মান থাকতে নেই।”

নওশাদ চুপ হয়ে গেলো। এই লিলিকে তার বড্ড অচেনা লাগছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে একটা মানুষ বদলাতে পারে কীভাবে? নাকি আগে থেকেই এমন ছিল? শুধু নওশাদই চিনতে পারেনি।

চলবে _________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here