যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:১২]

0
29

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১২]

নিঝুম রাত্রি। চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। খাল-বিলের উপচে পড়া থৈ থৈ পানির স্রোতে হঠাৎ কিছু একটা লাফিয়ে উঠলো বোধহয়। কয়েক মুহূর্ত পেরোতেই চারপাশটাকে আবারো গ্ৰাস করল নিস্তব্ধতা। আচমকাই পারভেজের পিঠে ধুম করে কিল বসলো। ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে নিলো সে। পেছন থেকে ভেসে এলো নাজিরের রাগান্বিত স্বর,“খাড়াইয়া খাড়াইয়া কী করোস, মফিজ? জাল উডা।”

মিল্টন নৌকার বৈঠা বাইছে। সাহায্যের জন্য পারভেজ হাতের ইশারায় তাকে ডাকতেই ফের পিঠে আরেকটা কিল পড়ল। এবারেরটা আগেরটার তুলনায় জোরে। নাজির বললো,“ওরে ডাকোস ক্যান, গোলামের পুত? ওয় তোর কাছে আইলে বৈঠা বাইবো কেডায়? তোর বাপে?”

“একলা একলা কেমনে তুলমু? অনেক ভারী।”

“গায়ে গতরে জোর নাই? খাস না? মাইজ্ঞা একটা।”

পারভেজ ভোঁতা মুখে ঘোলাটে পানির দিকে তাকালো। আকাশে ক্ষয়ে যাওয়া পূর্ণিমার চাঁদ, ধরণী তাই ঘুটঘুটে অন্ধকার। পালতোলা নৌকায় দু দুটো হারিকেন জ্বলজ্বল করায় সবটা পরিষ্কার। নাজির বিরক্ত হয়ে হাত লাগালো তার সাথে। পানি থেকে জাল তুলতে বেশ ঝক্কি পোহাতে হলো দুজনকেই। নৌকায় ভর দিয়ে কোনোমতে জালটা তুলতেই পারভেজের অধরে ফুটে উঠলো এক দম্ভভরা হাসি। জাল ভর্তি ছোটো-বড়ো মাছ মৌমাছির মতো কিলবিল করছে। মিল্টন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো, “আরেব্বাস! এইগুলা কী, ভাইজান!”

“আলহামদুলিল্লাহ ক ব্যাটা। এইগুলারে কয় রিজিক।”

বড়ো মাছগুলো বাঁশের তৈরি মাছ ধরার চাইয়ে বন্দি করে ছোটো মাছগুলো রাখলো বিশাল এক ঝুড়িতে।

“চল এইবার বাড়ি যাইগা।”

পারভেজের কথায় চোখ রাঙিয়ে তাকালো নাজির। ছ্যাঁত করে ওঠে বললো,“একেবারে বাপের মতন হইছে। ক্যান, আমার ভালা সহ্য হয় না?”

“তুই রাগ করা ছাড়া আর কিছু পারোস না?”

“না পারি না। আরো দুইডা খেউ দিমু, পরের খেউতে যা উঠবো হেগুলা তোর। নে এইবার ধর।”

এবার আর দ্বিমত করল না পারভেজ। হাত তার খালি। মাস্টার বাড়ির সাথে ওই দুর্ঘটনার পর থেকে হাত খরচা বন্ধ। বাপ, ভাই কিছুতেই টাকা দিচ্ছে না। যার কারণে ঘুরতে হচ্ছে নাজিরের পিছুপিছু। মিল্টন বৈঠা চালাতে চালাতে বললো,“আইজ হাইনজা (সন্ধ্যা) বেলা ফাহমিদারে শ্বশুরবাড়ি চইল্যা যাইতে দেখলাম। বিয়া কিন্তু ভালা ঘরেই হইছে, পোলাও নাকি মাস্টর। তোর কষ্ট লাগে না, পারভেজ?”

নাজির ফিক করে হেসে দিলো। কটাক্ষ করে বললো, “কষ্ট! তাও আবার আমিরুল শাহ’র পোলার? এতদিন শাহ গো লগে থাইক্যাও রক্ত চিনলি না, বল্টু?”

পারভেজ নীরব রইলো বিপরীতে। পায়ের ক্ষত স্থান এখনো ঠিকমতো শুকায়নি। হাঁটতে হয় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। মুখ ভার করে দ্বিতীয়বারের মতো পানিতে জাল ফেলে আগ্ৰহভরা লোচনে তাকিয়ে বসে রইলো সে অপেক্ষায়।

নওশাদ আর লিলি বাড়িতে নেই। গতকাল শহর থেকে শ্বশুরমশাই চিঠি পাঠিয়েছিল তাদের। চিঠিতে কী লেখা ছিল তা নাজিরের জানা নেই। জিজ্ঞেসও অবশ্য করেনি। ভাইয়ের ব্যাপারে সমস্ত আগ্ৰহ সে হারিয়েছে। যেই আঘাত তাকে করেছে ছেলেটা! এরপরেও আগ্ৰহ কীভাবে দেখাবে? নাজির সেদিনই বুঝে গিয়েছে, পৃথিবীটা বড়োই স্বার্থপর। তার জীবনে তার ভাই সব হলেও ভাইয়ের জীবনে সে কিচ্ছু না। এরপর কী হলো কে জানে? আজ সকালের ট্রেনে চেপেই স্বামী-স্ত্রীতে মিলে বিদায় নিয়ে রওনা দিয়েছে শহরের উদ্দেশ্যে।

ঝন্টু মিয়ার নৌকাতে যেন আস্ত এক সংসার। মাটির ছোট্ট চুলা, লাকড়ি, কড়াই, মশলা, পানিসহ সব রয়েছে সেখানে। নাজির প্রথমে চুলা জ্বালালো। বঁটি দিয়ে বড়সড় একটা তেলাপিয়া মাছের আঁশ ছাড়িয়ে, নাড়িভুঁড়ি ফেলে ভালো করে ধুয়ে নিলো। তারপর একে একে মশলা মাখিয়ে চাপালো তেল ভর্তি কড়াইয়ে। বললো,“এইবার একটা নৌকা কিনতে হইবো। এক সপ্তাহ আগে বাজারে দেইখা আইছি। কাল ট্যাহা নিয়া যাইস তো, বল্টু। পাল তোলা নৌকা আনবি, বৃষ্টি আইলেও যাতে ভিতরে গিয়া বওন যায়।”

হাস্যোজ্জ্বল মুখে মিল্টন মাথা নাড়ালো। বহুদিন ধরেই একটা নৌকা কেনার জন্য নাজিরকে উষ্কানি দিচ্ছিলো সে। নাজিরের নৌকা মানেই তো আংশিক মালিকানা তার। যখন ইচ্ছে মাছ ধরতে বেরোতে পারবে।

________

সদ্য বাড়ির এক মেয়েকে বিদায় জানিয়ে মাস্টার বাড়িতে যেই নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, সেই নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে আরেক মেয়ের করুণ কান্নার শব্দ। বসার ঘরে পুরুষ বলতে এই মুহূর্তে বসে আছে মিছরির দাদা, নানা, বড়ো চাচা, মামাতো ভাই আরিফ আর দুই মামা।

ছোটো মামীর বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছে মিছরি। পরনের এলোমেলো শাড়িটা কোনোমতে জড়িয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে সুন্দর দেহটা। বসার ঘরের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে জামিল। মুখে কিছুটা ভয়ের ছাপ দেখা গেলেও অপরাধবোধ বা অনুশোচনা নেই একটুও।

ঠিক তখনি হুড়মুড় করে ভেতরে প্রবেশ করল কাশেম আর তালেব। দাদার আদেশে সুজন গিয়েছিল তাদেরকেই ডেকে আনতে। ফেরার পথে সমস্ত কথাই তারা সুজনের মুখে শুনেছে। বড়ো চাচীর হুঁশ ফেরার পর ঠান্ডা পানি খেতে চেয়েছিলেন। সেই জন্য শাশুড়ির কথায় গ্লাস হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে কলপাড় যাচ্ছিল পলি। তাই ননদের চিৎকার তার শ্রবণালীতেই সর্বপ্রথম পৌঁছায়। তারপর ছুটে এসে দরজা ধাক্কায় সে। তাতেও কাজ না হওয়ায় দৌড়ে যায় পেছনের জানালার ধারে। ভাগ্যিস জানালা খোলা ছিল! তৎক্ষণাৎ উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে শাশুড়ির কাছে যাওয়ার পথে দেখা পেয়ে যায় আরিফের। হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেটাকে টেনে এনে দাঁড় করায় ননদের ঘরের বদ্ধ দরজার সামনে। আর কিছু বলতে হয় না মুখে। আরিফ দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে একের পর এক লাথি মারে দরজায়। বাড়ির নারীরা ছুটে আসে সেখানে। তখন সবে বাড়ি ফিরেছিল সুজন। পরিস্থিতি কিছুটা আঁচ করে সেও আরিফের সাথ দেয়। অগণিত লাথি, ধাক্কা দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করতেই ভয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে জামিল। যদিও এখনো পর্যন্ত কিছুই স্বীকার করেনি সে, মার খেয়েও বলে গিয়েছে মিথ্যা। সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়েছে নিরপরাধ মেয়েটির ওপর।

হিংস্র রাগে বাপ-ছেলের শরীর কাঁপছে। মেয়েটা তাদের বড়োই আদরের। তালেব দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এগিয়ে গিয়েই শক্ত হাতে ঘুষি লাগালো জামিলের নাক, মুখ বরাবর। সেই ঘুষি সহ্য করতে না পেরে লোকটা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। রুবি দৌড়ে এসে স্বামীর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালো। ধমক দিয়ে বললো, “আমার জামাইয়ের গায়ে হাত তুলবি না কইয়া দিলাম।”

আজ অনুমতি না নিয়েই অন্যের ঘরে প্রবেশ করলেন কাশেম আলী। ঘরটি তাঁর পিতার। বসার ঘরের সাথেই লাগোয়া। তাকে আচমকা প্রবেশ করতে দেখে নারীরা সজাগ হয়ে গেলো। নারী বলতে তাঁর মা, স্ত্রী, শাশুড়ি স্ত্রীর দুই ভাবি, নিজ পুত্রবধূ আর ভাগ্নি ফিরোজা। বাবাকে দেখে কান্নার বেগ বাড়লো মিছরির। মামীর বুক থেকে মুখ তুলে দৌড়ে এসে ঠাঁই নিলো তাঁর বুকে। ক্রন্দনরত কণ্ঠে আকুতি নিয়ে ডাকলো,“আব্বা!”

কাশেমের ভারিক্কি দেহটা কেঁপে উঠলো। আগলে নিলো নিজের আদরের মানিককে। ভারী কণ্ঠে বললেন,“কান্দে না, আম্মা। আব্বা আইয়া পড়ছে। আর কোনো ডর নাই। আমারে তুমি কও, কী হইছে? কেডায় ছুঁইছে? তার হাত আমি কাইট্টা ফেলমু।”

মিছরি উত্তর দিলো। কাঁদতে কাঁদতে তার গলা ভেঙে গিয়েছে। ফুঁপাচ্ছে, হাঁপাচ্ছে। পারুল স্বামীকে ভয় পায় ভীষণ। কাঁচুমাচু হয়ে এককোণে বসে রইলেন তিনি। মা সৈয়দুন নেছা ধমকালেন না আজ। নরম স্বরে বললেন,“মাইয়াডার উপর দিয়া ঝড় গেছে। এত প্রশ্ন করিস না, বাপ।”

সেকথা শুনলেন না কাশেম। মেয়েকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে ভালো করে তাকালেন। ডান গালে আর গলায় গভীর কামড়ের দাগ, বাম গালে জ্বলজ্বল করছে পাঁচ আঙুলের ছাপ। বুকটা ধক করে উঠলো তাঁর। চৌদ্দ বছরের মেয়েটির গায়ে আজ পর্যন্ত ফুলের টোকাও লাগতে দেননি তিনি। একবার দুষ্টুমি করার অপরাধে স্ত্রী গাল চেপে ধরেছিল, সেটা দেখে ফেলেন তখনি।ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে হাত মুচড়ে ধরেছিলেন ওই মহিলার। স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন,“আমার মাইয়ার গায়ে আর কহনো হাত দিলে তোরে এই বাড়ি থাইক্যা বাহির কইরা দিমু।”

পারুল জানেন, স্বামী তাঁর এক কথার মানুষ। তাই যা শাসন করার এরপর থেকে মুখেই করেছেন। গায়ে হাত আর কখনো তোলেননি। মেয়েটা যে কাশেমের ভীষণ সাধনার। পরপর ছয় সন্তানের পর এই মেয়েটিকে ঘর আলো করে সৃষ্টিকর্তা তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন। যদিও মাসুমের পর জন্মানো চারটা ছেলেই মারা গিয়েছিল আতরঘরে। তবুও শেষজন তো জীবিত ছিল! কাশেম মেয়ের মাথায় একবার হাত বুলান, তো আরেকবার চুমু খান আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে। জিজ্ঞেস করেন,“জামিল করছে? ওই জামিল শুয়োরের বাচ্চা করছে এই অবস্থা?”

“আব্বা!”ফের কেঁদে ওঠে মিছরি। কাশেম দাঁতে দাঁত চাপেন। নজর যায় বসে থাকা স্ত্রীর দিকে। তৎক্ষণাৎ তিনি দৌড়ে যান তাঁর কাছে। চুলের মুঠি ধরে দেয়ালে ঠেসে ধরে গর্জে ওঠেন,“তুই কই আছিলি, বান্দী? তুই থাকতে আমার মাইয়ার এই অবস্থা হয় কেমনে? গায়ে হাওয়া লাগাইয়া ঘুরোস? একটা মাইয়ার খেয়াল রাখতে পারোস না?”

ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠেন পারুল। সেই মুহূর্তে আগুনে ঘি ঢালার মতো করে মুখ বাঁকিয়ে ফিরোজা বলে উঠলো,“মিছরি তো কাইল রাইতে আইয়াই বিচার দিছিলো। কিন্তু ছুডো মামী তো তহন মাইয়াডারে উল্টা গালমন্দ কইরা তাড়াইয়া দিলো। আইজ তার ফল পাইছে না হাতে নাতে? এই যে নানী এইহানে বসা, হেরে জিগান।”

সৈয়দুন নেছা নাতনিকে কনুই দিয়ে গুঁতা মেরে চোখ রাঙালেন। শাশুড়ি সেলিনা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,“এহন নিজেগো মধ্যে ঝামেলা করার সময়, আব্বা? ছাড়েন ওরে।”

কাশেম ছেড়ে দিলেন স্ত্রীকে। কন্যাকে পূর্বের স্থানে বসিয়ে দিয়ে বললেন,“আম্মা বসেন এনে, আব্বা আইতাছে। একদম কানবেন না।” আর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে শাসানোর ভঙিতে বললেন,“ওই শুয়োরের বাচ্চারে আগে দেইখা আসি। তারপর তোর পালা।”

তালেবকে আটকে রেখেছে আরিফ আর সুজন। দুই মামারাও রেগে আছেন ভীষণ। সকলের মাথায় খুন চেপে বসেছে। তাদের সকলের চোখের মণি ওই ছোট্ট মেয়েটি। অথচ তার সঙ্গেই কিনা নোংরামি? শুধু পিতার জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। সরলা জামাতার কোনো দোষ দেখছেন না। তাঁর কাছে তার জামাতা নিষ্পাপ। সবার উদ্দেশ্যে গলা চড়িয়ে বললেন,“ট্যাহা দেখছে আমার মাইয়া জামাইয়ের, এর লাইগা ওই শয়তান মাইয়া ভোলাভালা পোলাডারে একলা ঘরে ডাইকা নিয়া ফাঁসাইতে চাইছে। বুঝি না কিছু? চরিত্রহীন মাইয়া মানুষ!”

“আমার মাইয়ার নামে মিছা অপবাদ দিলে তোরে বোইন হিসাবে মানমু না কইয়া দিলাম। জিহ্বা ছিঁইড়া কুত্তা দিয়া খাওয়ামু।”

ঘর থেকে বেরোতেই বোনের কথাগুলো শুনেছেন কাশেম আলী। তাই বিপরীতে গর্জে উঠে হুমকি দিলেন। সরলা ভাইকে দেখে আঁতকে উঠলেন। পিতার উদ্দেশ্যে অভিযোগ করে বললেন,“দেহেন আব্বা, আমনের সামনে ভাইজান আমারে মারার হুমকি দেয়। আমার থাইক্যা হের চরিত্রহীন মাইয়া এহন আপন?”

তালেবও বাপের মতোই গর্জে উঠলো,“এমনিতেই কিন্তু মাথা গরম, ফুফু। বেশি কিছু কইলে পরে ফুফু টুফু আর মানমু না। চরিত্রহীন এক ব্যাডার পক্ষে কথা কন? যে কিনা দুইদিন পরপর এর ওর মাইয়া, বউয়ের লগে ধরা খায়?”

সরলা নাটুকে কান্না জুড়ে দিলেন। জামিল সাহস পেয়ে স্ত্রীর পেছন থেকেই বলে উঠলো,“বিশ্বাস করেন আম্মা, আমি কিচ্ছু করি নাই।ওই পাকনা মাইয়া কাইল থাইক্যা আমার পিছন পিছন ঘুরতাছে। বিহালে একটু ঘুমাইয়া গেছিলাম। ঘুম থাইক্যা উইঠা কাউরে না পাইয়া হাঁটতে হাঁটতে গিয়া ওরে জিগাইলাম, তোর রুবি আপা কই? ওই মাইয়া কইলো, আমার ঘরে। আমিও গেলাম। হেরপর দরজা লাগাইয়া চিল্লাফাল্লা।”

নজরুল চোয়াল শক্ত করে বসা থেকেই বললেন, “তাইলে মুখে দাগ ক্যান মাইয়ার?”

“এইগুলা ওরই কারসাজি, আমারে ফাঁসাইতাছে।”

কাশেম মারমুখো হয়ে দৌড়ে যায়। বসায় চোখ বরাবর ঘুষি। আকবর মিয়া এতক্ষণ যাবত চুপ করে বসে ছিলেন। রাগে কাঁপতে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে মুখ খুললেন,“হাত চালাইস না, কাশেম। বইয়া কথা ক।”

“আমনে বইয়া থাকেন, আব্বা। মাইয়া তো আমার, তাই কষ্টও আমারই বেশি। আমার জায়গায় আমনে থাকলে বইয়া থাকতে পারতেন না। খুন করতেন, খুন।”

হতভম্ব হয়ে গেলেন আকবর মিয়া। পুত্ররা কখনো চোখ তুলে কথা বলে না তাঁর সঙ্গে। সেখানে মুখের উপর এত বড়ো জবাব! রাগ কী তাঁর হচ্ছে না? মিছরিকে কী তিনি ভালোবাসেন না? শরীরে তীরের ফলার মতো বিঁধলো সেইকথা। বসা থেকে উঠে বড়ো বড়ো কদম ফেলে চলে গেলেন ঘরে। ফিরে এলেন খানিক পর। তবে একা নয়, সঙ্গে নিজের গুলি ভর্তি এয়ারগান। কোনো কিছু না ভেবেই একেবারে বুক বরাবর চালিয়ে দিলেন গুলি। রুবি তা দেখে ফেলেছিল, তাই স্বামীকে ধাক্কা দিলো। নিশানা ছুটে গুলি গিয়ে লাগলো বাহুতে। আর্তনাদ করে উঠলো জামিল। উপস্থিত সকলের চোখেমুখে বিস্ময়। এমন কিছু হবে যেন কস্মিনকালেও ভাবতে পারেনি কেউ।

কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী শান্ত আকবর মিয়া শান্ত স্বরেই বললেন,“বইয়া কথা কইতে কইছি বইল্যা এই না যে নাতনির প্রতি আমার ভালোবাসা নাই। ঘরের খবর বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা কইরা ঠান্ডা মাথায় সমস্যার সমাধান করতে চাইছিলাম। কিন্তু তা আর সম্ভব না।”

থেমে দম ছেড়ে বললেন,“আইজ থাইক্যা আকবর মিয়ার দুই পুত্র, দুই কন্যা। সরলার কথায় আমি ভীষণ আঘাত পাইছি। আমার বংশের মাইয়ার চরিত্র লইয়া অভিযোগ তুলছে হেয়। তাই তারে আমি সবার সামনে ত্যাজ্য করলাম আইজ। আইজকার পর থাইক্যা এই গেরামের ত্রিসীমানা মারানো তার লাইগা নিষিদ্ধ। যদি মারায় তাইলে তোমরা ওরে যা ইচ্ছা করতে পারো। বিয়ার সময় সব পাওনা মিটাইয়া দেওয়া হইছে, তাই সরলা এহন যাইতে পারো।”

সরলার তেজদীপ্ত কণ্ঠস্বর নিভে গেলো। লুটিয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিয়ে করুণ স্বরে ডাকলেন,“আব্বা!”

“ঘটনা বেশিদূর আগায় নাই। ঠিক সময়ে নাতিন বউ দেইখা ফেলায় দুর্নাম হওয়ার আগেই বাঁচানো গেছে। তাই এই ঘটনা এইহানেই শেষ। ঘরের খবর ভুলেও বাহিরে গেলে এই আকবর মিয়ার হাতে আবার রক্ত উঠবো কইয়া দিলাম, খুনাখুনিও হইতে পারে। অপবাদের ভয় আমার নাই।”

মানুষ মরলে যেভাবে কান্নাকাটি করা হয়? সরলাও ঠিক সেভাবেই কাঁদলেন। রক্তাক্ত জামিলকে কেউ ধরলো না। এসব নিকৃষ্ট, নারীদেহ লোভী কাপুরুষদের প্রতি সহানুভূতি কখনো আসে না। এদের বেঁচে থাকাটাই অপরাধ। রুবির কান্নাকাটিতে তার বড়ো ভাই কোনোমতে ক্ষতস্থানে রুমাল চেপে ধরে নিয়ে গেলো সদরের উদ্দেশ্যে। বাহুতে আঘাত পেলে বা এমন দুর্বল গুলি বিঁধলে মানুষ মরে না। তবুও রক্তক্ষরণ তো হচ্ছে। বাকি দুলাভাইরা আর বাড়িতে আসেনি। পথেই নিয়েছে বিদায়। রাত বাড়তেই সরলাও চলে গেলো মেয়ের পিছুপিছু।

রাত গভীর হলেও কারো চোখে ঘুম নেই। সুজন গিয়ে কোত্থেকে যেন ওষুধ নিয়ে এসেছে। সেগুলোই মিছরির ক্ষত স্থানে লেপ্টে দেওয়া হলো। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানো হয়েছে পিতার ঘরে। গম্ভীর পরিবেশের নীরবতা ভেঙে নানা কায়সার রহমান বললেন,“কাইল আমরা বরিশাল ফিইরা যামু। মিছরিরেও লগে লইয়া যামু। এইটুকুন মাইয়ার লগে যা হইছে! আল্লাহ জানেন, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবো কিনা। এনে থাকার দরকার নাই।”

বাকিরা সম্মতি পোষণ করলেও কাশেম তা করলেন না। মেঝের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই কঠিন স্বরে বললেন,“আমার মাইয়া আমার কাছেই থাকবো। আর কোত্থাও ওরে যাইতে দিমু না। নিতে হইলে নিজের মাইয়া লইয়া যান। হের লাইগাই আজ আমার মিছরির এই অবস্থা। মা নামে কলঙ্ক হারামজাদি। ওরে আমি তালা…..

কথাটা সমাপ্ত করতে দেওয়া হলো না তাকে। নজরুল ধমক দিয়ে উঠলেন মাঝখানে,“এইসব কী কতাবার্তা? যা হওয়ার হইয়া গেছে। ভাগ্য কহনো বদলান যায় না। মাথা ঠান্ডা কর, ঘরে যা। আর কহনো এইসব কথা হুনলে মুখ ভাইঙা দিমু।”

বড়ো ভাইকে মান্য করে চলেন ভদ্রলোক। তাই বিপরীতে চুপ রইলেন। আকবর মিয়া এখানে নেই। নিজের কথা শেষ করেই ঘরে গিয়ে খিল দিয়েছিলেন, তারপর আর বের হননি। কাশেম আলী উঠে গেলেন। নজরুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,“আব্বার কতা যাতে সবার মনে থাকে। এই কতা এইহানেই শেষ, পাঁচ কান যাতে না হয়।”

সবাই সম্মতি জানালো। রাত বাড়তেই যে যার ঘরে চলে গেলো। কিন্তু মেয়েদের দুর্নাম কী আর কখনো চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থাকে? তা হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। এক কান থেকে দুই কানে গিয়ে ছড়িয়ে যায় পৃথিবী জুড়ে, কলঙ্ক লাগে চরিত্রে। এটাই তো নিয়ম। নারীদের ভালো মানুষি গোপন হয়ে থাকলেও দোষ, খুঁত কখনো গোপন থাকে না। কেউ গোপন রাখতে পারে না। যেমন গোপন রাখা গেলো না মিছরির কাহিনী।

চলবে _________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here