যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:১১]

0
27

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১১]

চারিদিকে আবছায়া অন্ধকার। মৃদু বাতাসে ভ্যাপসা গরম দূর হয়ে শীতল হয়ে উঠেছে পরিবেশ। হলুদ রাঙা বধূ সেজে চুপচাপ বসে আছে ফাহমিদা। তাকে দেখতেই গ্ৰামের নারীরা ভিড় জমিয়েছে হলুদের মঞ্চের সামনে। উঠোনে একদল কিশোরী আর যুবতী গায়ে হলদে শাড়ি জড়িয়ে গানের তালে তাল মিলিয়ে নাচছে। রেশমার ননদ ময়নার গানের গলা ভালো। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে বহুবার পুরষ্কারও জিতেছে! তাই সে-ই মঞ্চের সামনে বসে হাত তালি দিতে দিতে গাইছে,

‘দাও গায়ে হলুদ, পায়ে আলতা
হাতে মেহেন্দি,
বিয়ার সাজে কন্যারে সাজাও জলদি
যার রুপ দেখে যায় ভুলে শাশুড়ী ননদী।

আজ ফাহমিদার গায়ে হলুদ
পায়ে আলতা হাতে মেহেন্দি
বিয়ার সাজে ফাহমিদারে সাজাও জলদি
যার রুপ দেখে যায় ভুলে মজে শাশুড়ী ননদী।

দাও গায়ে হলুদ, পায়ে আলতা
হাতে মেহেন্দি
বিয়ার সাজে কন্যারে সাজাও জলদি।’

প্যান্ডেলের অপরপাশে দাঁড়িয়ে ছেলেরা হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। হাত নাড়িয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তারাও নাচার চেষ্টা চালাচ্ছে।নাচ, গান শেষ হতেই পাত্রের বাড়ি থেকে হলুদ নিয়ে হাজির হলো একঝাঁক তরুণ-তরুণীর দল। তাদের হইহুল্লোড় রবে পরিবেশটা মুহূর্তেই আরো মেতে উঠলো যেন।

পরনের শাড়ি দুই হাতে উঁচু করে ধরে চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে মিছরি। দাদার বাড়িতে বরাবরের মতো আজও তার সঙ্গী হয়েছে সুজাতা। পাকা বুড়িটাও আজ ফুপুদের মতো শাড়ি পরেছে। বাবা নিজে গঞ্জ থেকে তার মাপমতো শাড়ি কিনে এনে দিয়েছে। কিন্তু মিছরিই যেন পড়েছে দোটানায়। সদ্য কৈশোরে পা রাখা মেয়েটা শাড়ি পরতেই শেখেনি এখনো। পলি ভাবি ধরে বেঁধে পরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তবুও সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। একটু পরপর পেট, বুক থেকে সরে যাচ্ছে আঁচল, কুচিও বোধহয় দুয়েকটা খুলে গিয়েছে। তবুও দৌড় ঝাঁপ মেয়ের কমে না। আনাড়ি হাতে বারবার তা ঠিক করেই সে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর ফাহমিদার সামনে রাখা খাবারগুলো মুঠো ভর্তি করে খাচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে গেলো গায়ে হলুদের মূল অনুষ্ঠান। ফাহমিদাকে হলুদ মাখানো শেষ হতেই যে যেভাবে পারছে, একে অপরকে মাখানোর জন্য শুরু করে দিলো ছুটোছুটি। সেসব দেখে একপাশে বসে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে মিছরি। অবিবাহিত ভাই আর তাদের বন্ধুরা মিলে বেয়াইনদের সঙ্গে রসিকতা করছে। বোনেরা করছে বেয়াইদের সঙ্গে ঝগড়া। সুজাতার অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়।বড়োদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে তাকেও বানিয়ে দেওয়া হয়েছে হলুদ ভূত।

মা কঠোর বাক্যে ওদের মধ্যে গিয়ে দাপাদাপি করতে নিষেধ করে দেওয়ায় ওদিকে আর মিছরি গেলো না। বসে রইলো সবার চোখের আড়ালে, কিছুটা দূরে।

“ওই মিছরি!”

পুরুষালি কণ্ঠের ডাকে চমকে গেলো মিছরি। ফিরে তাকাতেই দৃষ্টিগোচর হলো দালানের খোলা ফটকের পাশে চকিতে হাতপাখা নিয়ে বসে থাকা এক মধ্যবয়স্ক লোককে। লোকটা হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলো। মিছরি একপলক আশেপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে শাড়ি ধরে দৌড়ে এলো। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,“কী?”

জামিল হলুদ দাঁতগুলো বের করে হাসলো। সম্পর্কে মিছরির ফুফাতো দুলাভাই হয়। আকবর মিয়ার ছোটো কন্যা সরলার জামাতা। বললো,“একটু পানি আইনা দে, গলাডা শুকাইয়া গেছে।”

বিরক্ত হলো মিছরি। এই সামান্য বিষয়ে অযথা তাকে ডেকে আনার কী প্রয়োজন ছিল? জিভের ডগায় উচিত জবাব চলে এলেও কিছু না বলে নিজেকে সংযত করে পানি আনতে গেলো সে।
দুলাভাই সমাজের মধ্যে এই লোকটাই শালীদের একটু বেশি জ্বালাতন করে। বিশেষ করে মিছরিকে। আগে করতো ফাহমিদাকে। বিশেষ গুরুত্ব না পেয়ে তারপর লাগলো মিছরির পেছনে। এই যে গতকাল এসে থেকেই গাধার মতো খাটাচ্ছে, একটার পর একটা হুকুম জারি করছে মেয়েটার উপর। না শোনার ভান করে থাকলেও সমস্যা, মা বকে।

টিউবওয়েল থেকে গ্লাস ভর্তি ঠান্ডা পানি এনে বাড়িয়ে দিলো মিছরি। জামিল ডান হাতে গ্লাসটা নিলো, বাম হাত বাড়িয়ে আচমকাই খপ করে চেপে ধরলো মিছরির নরম হাতটি। প্রথমে ছোঁয়ালো নিজ কপালে, তারপর গলায়। দেহখানা শিউরে উঠলো মিছরির। এক লাফে সরে গিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। জামিল আগের মতো করেই হাসলো। অদ্ভুত, ধূর্ত সেই হাসি। পানিতে চুমুক দিয়ে গলা ভিজিয়ে বললো, “শরীরডা গরম না? জ্বর আইতাছে মনে হয়।”

“রুবি আপারে ডাকবো?”

“ওই মহিলারে ডাইকা কী করবি? পাড়া বেড়াইনা মাগী মানু। জামাইয়ের খেয়াল আছে হের?”

“পাড়া বেড়ায় কোথায়? আপা তো ফাহমিদা আপার কাছেই বসা। ওই যে!” হাতের ইশারায় দেখালো।

স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে জামিল চোখমুখ কুঁচকে নিলো। মনে মনে গালমন্দও করল বেশ কিছুক্ষণ। হেসে হেসে পরপুরুষের গায়ে ঢলে পড়ছে। অসভ্য মহিলা! চোখ সরিয়ে নিচু গলায় বললো,“মাথাডা একটু টিপা দে। ভাল্লাগতাছে না।”

“পারবো না।”

মুখের উপর স্পষ্ট জবাব দিয়ে যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই চলে গেলো মিছরি। জামিলের চোখেমুখে জ্বলজ্বলে বিরক্তি ফুটে উঠেছে। শ্বশুরবাড়ির গোষ্ঠীর সবকয়টাই একরকম। অসহ্যকর, বেয়াদব!

“আসসালামু আলাইকুম, বেয়াইন সাহেবা!”

হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়ায় মিছরি।আচমকা এত কাছ থেকে ডাকায় ভয়ে বুকে একদলা থুতু ছিটালো। উঠোন জুড়ে আলো থাকলেও বাড়ির বা পাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো অল্প বয়সী এক ছেলে। মিছরি তাকে চিনতে পারলো না। তবে বরপক্ষের কেউই যে হবে তা নিশ্চিত। সামনে পা বাড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে সালামের জবাব দিলো,“ওয়া আলাইকুমুসসালাম।”

“কেমন আছেন, বেয়াইন সাহেবা?”

“আলহামদুলিল্লাহ।”

“আপনি কী কথা কম বলেন?”

“না, তো। কেন মনে হলো?”

“এসে থেকেই দেখছি চুপচাপ। হলুদ নিয়ে মজা করার সময়ও গেলেন না।”

উত্তর দিলো না মিছরি। ছেলেটা আগ বাড়িয়েই বললো,“আমার নাম রাসেল।”

“আচ্ছা।”

“আপনার নাম?”

“মিছরি।”

“মাশাআল্লাহ, এই জন্যই তো বলি বেয়াইন সাহেবা এত মিষ্টি ক্যান?”

সন্দেহ নিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালো মিছরি। তার চাহনিতে ছেলেটার অধরের হাসি বিস্তৃত হলো। দুই হাত বুকে চেপে ধরে বললো,“আজ রাতে মনে হয় আমার ঘুম হবে না, বেয়াইন সাহেবা! বুকে ভীষণ জ্বালা করছে। বেঁচে থাকলে আবার কাল দেখা হবে। গেইট ধরার জন্য আপনি থাকবেন তো?”

ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে থেকে উপরনিচ মাথা নাড়ায় মিছরি। ছেলেটা দাঁত কেলিয়ে হাসে। বিদায় নিয়ে চলে যায় নিজেদের দলে। এরপর রাতের খাবার খেয়ে ফিরে যায় নিজেদের গন্তব্যে। কালই তো বিয়ে! শরীরে হলুদ নিয়েই ঘরে ফিরে এলো ফাহমিদা।উদ্ভ্রান্তের মতো শরীর থেকে নেতিয়ে পড়া ফুলগুলো ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে।

মিছরির ঘরে আজ দাদার দিকের আত্মীয়দের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভাইয়েরা থাকবে মাসুমের ঘরে। তাই ননদ, ভাবিতে আজ রাতটা ফাহমিদার ঘরেই পার করে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছে। নানা বাড়ি থেকে এখনো কেউ আসেনি। যদিও আজকেই আসার কথা ছিল কিন্তু না আসায় সবাই ধরেই নিয়েছে, পথে হয়তো তারা কোনো সমস্যায় পড়েছে। তাই আসতে আসতে রাত বা ভোর হতে পারে।

বিবাহিত বোন,ভাবিদের গল্পের আসর বসেছে সুজনের ঘরে। মা, চাচীরা ঘুমানোর আগে হেঁশেলে সবকিছু গোছগাছ করছে আগামীকালের জন্য। যদিও পাড়াগাঁ থেকে নামকরা এক রাঁধুনি আসার কথা, তবুও মশলা বেটে রাখছে। ঘরে যাওয়ার পথে ফের জামিলের ডাক এলো। মিছরি ভেতরে ঢুকলো না। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,“আবার কী?”

“গরম লাগে! হাতপাখা আইন্যা বাতাস কর, শালী।”

“নিজের বউরে ডাকেন।”

“শালী কী বউয়ের থাইক্যা কোনো অংশে কম? কাছে আয়।”

মিছরি গেলো না। স্বাস্থ্যবান আর ফর্সা হওয়ায় প্রথম দর্শনেই অনেকের নজর তার দিকে পড়ে। তার উপর আবার সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছে। দেহের গঠন, উচ্চতা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। তাই মামী বহুবার তাকে সাবধান করে বলে দিয়েছে,‘নিজের বাপ, ভাই বাদে আর কোনো ব্যাটা ছেলের ধারের কাছেও ঘেঁষবি না। হাতটা পর্যন্ত ছুঁতে দিবি না।’

আগে এসব কথায় তেমন একটা গুরুত্ব না দিলেও এখন সে দেয়। দিতে শিখেছে। এর পেছনে অবশ্য একটা কারণ রয়েছে, গুরুত্ব না দেওয়ার ফল একবার খুব বাজেভাবে সে পেয়েছিল। ছোটো মামীর ভাইয়ের লোলুপ দৃষ্টি আর নোংরা ছোঁয়ায় লাল হয়ে গিয়েছিল তার কোমল পিঠ। তখন মিছরির বয়স কত হবে? আট কিংবা নয়। সেদিনের কথা ভাবলেই তার গা এখনো শিউরে ওঠে। যদিও ওই ঘটনা সম্পর্কে ছোটো মামা- মামী ব্যতীত আর কোনো মানুষই অবগত নয়। তবুও স্মৃতি তো আর মুছে ফেলা যায় না! তারপর থেকেই বাড়িতে ছোটো মামীর ভাইয়ের আসা বন্ধ হয়ে গেলো। এমনকি মামীও নীরবে সমস্ত সম্পর্ক শেষ করে দিলেন। মামীর সন্তান বলতে ওই একটামাত্র ছেলে, তাও সে মিছরির ছোটো। তাই হয়তো স্বামীর ভাগ্নির প্রতি ভদ্রমহিলার এত টান!

হেঁশেলের দরজায় কোমরে দুই হাত গুঁজে দাঁড়ালো সে। পাঁশুটে মুখে বললো,“আমি কী বাড়ির কাজের মহিলা, মা? রুবি আপার জামাই সারাক্ষণ আমায় ডাকে কেন?”

সৈয়দুন নেছা কেদারায় বসে পুত্রবধূদের কাজ তদারকি করছেন। পারুল আদা রসুন বাটতে বাটতে জিজ্ঞেস করলেন,“কী কইছে?”

“একবার ডেকে বলে, পানি দিয়ে যা। একবার বলে, মাথা টিপে দিয়ে যা। একবার বলে, পান খাবে। একটু আগে ডেকে বলে, পাখা নিয়ে বাতাস করতে।”

সৈয়দুন নেছা বললেন,“রুবি কই? ওরে ডাইকা দে। জামাইরে রাইখা কোন চুলায় আগুন ধরাইছে?”

“আমি বলেছি ডেকে দেই কিন্তু দুলাভাই নিষেধ করে বলে, তুই করে দে। শালী নাকি বউয়ের মতো।”

পারুল মেয়েকে কর্কশ কণ্ঠে ধমকালেন,“এক চটকানা দিয়া চাপা ভাইঙা দিমু। মুখে কিছু আটকায় না? ডাক দিছে তো কী হইছে? কোন জায়গায় উষ্ট লাগছে? বিয়া বাড়িত কী কামের অভাব আছে? দুলাভাইরা শালীর লগে একটু মশকরা করেই। তার লাইগা বিচার দিতে হইবো?”

সৈয়দুন নেছা মা-মেয়ের মাঝখানে কথা বললেন না। ছেলের বউ ভুল কিছু বলেনি। জেসমিন ভোঁতা মুখে বললো,“বইকেন না, চাচী। পোলাপাইন মানুষ তাই না বুইঝা কইয়া দিছে।”

“কীয়ের পোলাপাইন? আইজ বিয়া দিলে কাইল দুই তিনডা পোলাপাইনের মা হইয়া যাইবো। মাইয়া মাইনষেগো জন্মের পর থাইকাই সব বুইঝা চলতে হয়। বিয়াডা শুধু দিতাম পারতাছি না ওর বাপ, ভাইয়ের লাইগা। সাথে এহন আবার আমার বাপ, ভাইও জুটছে। কোন বাংলাদেশ পাস করাইবো আল্লাহ জানে আর হেরা জানে।”

পাশ থেকে ফিক করে হেসে দিলো তমিজার ছোটো কন্যা ফিরোজা।
“আইজ বিয়া দিলে কাইল দুই তিনডা পোলাপাইন কেমনে হয়, ছুডো মামী?”

“হাসিস না। তোর ছুডো খালার কানে কথাডা গেলে কী হইবো ভাবতে পারতাছোস? কুরুক্ষেত্র বাঁধাইয়া দিবো। এমনিতেই তো আমগো দোষের অভাব নাই।”

সৈয়দুন নেছা এবারো পুত্রবধূকে কিছু বললেন না। শুধু ছোটো নাতনির উদ্দেশ্যে বললেন,“যা ঘুমা গিয়া, দাদী। দরজায় ভালা কইরা খিল দেইস। বিয়া বাড়িত মাইনষের অভাব নাই। ভেইন্নাবেলা উঠতে হইবো।”

মলিন মুখে ফাহমিদার ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো মিছরি। মায়ের উপর জমা হলো তার তীব্র অভিমান। সেই রাতটা কোনোমতে কাটলো। বিয়ে বাড়ির রাত বলেই হয়তো। ফাহমিদা সারারাত ঘুমালো না। জানালা আগলে বসে রইল কারো অপেক্ষায়। অথচ তার সেই অপেক্ষা হলো বৃথা। কেউ এলো না, কেউ না।
_________

কাক ডাকা ভোরে বাড়িতে এসে হাজির হলো মিছরির নানা বাড়ির সকলে। নানার কণ্ঠ পেয়ে চোখমুখ না ধুয়েই কেবল মাথায় ওড়না জড়িয়ে ঘর থেকে বাইরে ছুটে এলো মিছরি। নানা-নানী, দুই মামা, মামী আর মামাতো ভাই-বোনেরা সবাই এসেছে। তাকে দেখে বড়ো মামার ছেলে আরিফ নাক ছিটকে বললো,“কী রে তুলসি পাতা? চোখেমুখে পানি না দিয়েই দৌড়ে চলে এসেছিস? ছিঃ, কি দুর্গন্ধ!”

মিছরি তাকে ভেংচি কাটলো। ছুটে গিয়ে নানার হাত ধরে দাঁড়ালো। অভিযোগের সুরে বললো,“কাল না এসে আজ এসেছো কেন?”

তার অভিমানের অতলে তলিয়ে যাওয়া মুখখানা দেখে হাসলেন নানা। হেসেই উত্তর দিলেন,“দুপুরে যেই ফেরি আওয়ার কথা আছিলো হেইডা ধরতে পারি নাই। তোর নানীর বুকের ব্যথাডা বাড়ছে, তাই রাইতেই রওয়ানা দিতে হইলো।”

তাদের অনুপস্থিতিতে এমন কিছুই ভেবে নিয়েছিল সকলে। সেই ভাবনাটাই সঠিক হলো তবে। পারুল তাড়া দিলেন,“কথা পরে হইবো। আগে আমনেরা হাত-মুখ ধুইয়া আইয়েন, আব্বা। আমি ভাত বাড়ি।”

পলি তাদেরকে নিয়ে গেলো তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে। যেতে যেতে মিছরির বেনুনী টেনে ধরে আরিফ। ফিসফিস করে বলে,“পাত্তা দিচ্ছিস না, ব্যাপার কী? বাপের বাড়ি এসে দেমাগ বেড়েছে মুটকির?”

“আমি মুটকি হলে তুই শুঁটকি।”

আরিফ অসন্তুষ্ট হলো। বেনুনী ছেড়ে দিয়ে শাসিয়ে বললো,“যত দেমাগ দেখানোর দেখা। আমার বাপের বাড়ি যেদিন ফিরবি, সেদিন বোঝাবো কত ধানে কত চাল।”

বাড়ির সামনে বিশাল এক ফাঁকা জমি। জমিটা আকবর মিয়ার। বেলা বাড়তেই সেখানে রাঁধুনির রান্না শুরু হলো। অতিথিদের জন্য ভোজনের আয়োজনও সেখানেই করা হলো। বাড়ির ভেতরে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো। কাজী আসবে বরপক্ষের সাথে। বাড়ির মেয়েরাই দক্ষ হাতে লাল টুকটুকে বধূ সাজালো ফাহমিদাকে। দিলারা বেগম ঘরে এলেন নিঃশব্দে। মন ভরে কন্যাকে দেখে বিড়বিড় করে বললেন,“মাশাআল্লাহ!”

উপস্থিত মেয়েরা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। খালি করে দিয়ে গেলো ঘর। দিলারা বেগম এসে বসলেন বিছানায়। পরম স্নেহে নিজ কন্যার মাথায় হাত রেখে বললেন,“আমার মাইয়া কত্ত বড়ো হইয়া গেছে! আইজ নাকি তার বিয়া। ভাবা যায়? আমারে রাইখা সে চইল্যা যাইবো শ্বশুরবাড়ি।”

বলতে বলতে কেঁদে দিলেন ভদ্রমহিলা। বিয়ের কথা পাকা হওয়ার পর থেকে অনুভূতিশূন্য মন নিয়ে থমকে থাকা কিশোরী মেয়েটি মায়ের চোখের অশ্রু দেখে নিজেও শব্দ করে কেঁদে উঠলো। দিলারা মেয়েকে টেনে নিলেন নিজের বুকে। পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললেন,“কান্দে না, আম্মা। সাজ নষ্ট হইয়া যাইবো। দোয়া করি, আমার মাইয়া যাতে অনেক সুখী হয়, স্বামী নিয়া তার সুন্দর একটা সংসার হোক। সবার কথা হুইন্না চলবা, স্বামীর মন জুগাইয়া চলবা। শাশুড়ির মুখে মুখে তর্ক করবা না, সম্মান দিবা। মনে থাকবো তো?”

“হ, থাকবো।”

আচমকাই বাইরে মেয়েদের চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। ‘বর এসেছে! বর এসেছে!’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো চারিপাশ। মেয়েরা আগে থেকেই ফটকে লাল ফিতে বেঁধে টেবিল পেতে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই টেবিলের উপর পিরিচ ভর্তি মিষ্টান্ন আর কয়েক পদের শরবত। সঙ্গে আসা মুরুব্বিরা ত্যাছড়া স্বরে বললেন,“তোমরা পথ ছাড়ো তাড়াতাড়ি। গরমে এইসব আদিখ্যেতা ভাল্লাগে না।”

মেয়েপক্ষ থেকে মেয়ের বড়ো ফুফা বিপরীতে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“পোলাপাইন মানুষ হবু দুলাভাইয়ের লগে একটু আধটু রসিকতা করেই। আমনেরা মুরুব্বিরা ভিতরে আহেন।”

ছেলে-মেয়েরা খুশিতে চিৎকার দিলো। মিছরি বড়োদের মাঝখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দাদার দিকের ভাই- বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো হচ্ছে সে। তাই এই আনন্দঘন মুহূর্তে তার কথা বলা বা রসিকতা করার সুযোগটুকু নেই। ওপাশে বরের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা রাসেল বহুক্ষণ ধরে তার দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করছে। মিছরি তা দেখেও না দেখার ভান ধরে রয়েছে। মস্তিষ্ক সতর্ক বার্তা দিয়ে বলছে, “নির্ঘাত ছেলেটার মাথায় ব্যামো আছে।”

একসময় শুরু হলো বরপক্ষের অল্পবয়সী ছেলে- মেয়েদের সঙ্গে হাস্যরসপূর্ণ ঝগড়া। একপর্যায়ে বর হার মেনে নিয়ে তাদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দিয়ে ফিতা কেটে ভেতরে প্রবেশ করল। সঙ্গে অবশ্য মরিচ দেওয়া শরবত আর নুনে পোড়া মিষ্টান্নও জিভে ও গলায় পড়ে গেলো।

কাজী সাহেব বরের সঙ্গেই এসেছেন। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে সকলের উপস্থিতিতে শুরু হলো বিয়ে পড়ানোর কাজ। বর-কনের কবুল বলার সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশের সকল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরা একসঙ্গে আলহামদুলিল্লাহ বলে মোনাজাতে মুখর হয়ে উঠলেন।

ফাহমিদা বিছানায় লজ্জাবতী টুকটুকে বউয়ের মতো নত মস্তকে বসে আছে। বিয়ে পড়ানো শেষ হতেই বরের পাশে বসানো হয়েছে তাকে। মুরুব্বিরা এসে বর বধূকে দেখে দোয়া করলেন, গুঁজে দিলেন হাতে খুচরো টাকা। পান সুপারি খেতে খেতে করলেন খোশ গল্প। ছেলের নাম মাহমুদ। পাশের গ্রামেই বাস। পেশায় একজন শিক্ষক। তাই নজরুল আলম আর দ্বিমত করলেন না। মেয়ে কাছাকাছি থাকবে এতেই তিনি খুশি। বাকিগুলো তো থাকে বহুদূরে। অনুষ্ঠান ছাড়া টিকিটিও দেখা যায় না তাদের।
.
.
সন্ধ্যার আগেই বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হলো। উঠোনে থেমে থেমে নারীদের কান্নার শব্দ। কেউ চোখ মুছছে আঁচলে, কেউ চুপচাপ বসে আছে দূরে। দিলারা বেগম একপর্যায়ে জ্ঞান হারালেন। জা আর বড়ো কন্যা তাকে ধরে নিয়ে শোয়ালো ঘরে। মায়ের অবস্থা দেখে কাঁদতে কাঁদতে ফাহমিদার অবস্থা নাজেহাল। ছুটে আসতে চাইলো মায়ের কাছে, অথচ পারলো না। জোরপূর্বক তাকে উঠানো হলো গরুর গাড়িতে, স্বামীর পাশে। সবাইকে বিদায় জানিয়ে তাকে নিয়েই একসময় গ্ৰামের কাঁচা রাস্তার ধূলো উড়িয়ে ছুটলো সেই গাড়ি। পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো শুধু পিতার অশ্রু ভেজা চোখ আর হতাশ চাহনি।
_________

বাড়ি এখন প্রায় ফাঁকা বললেই চলে। কাছেপিঠে থেকে আসা আত্মীয়রা বিয়ে শেষে চলে গিয়েছে। বাপ, দাদারা গিয়েছে রাঁধুনি, ক্যাটারিংদের অর্থ পরিশোধ করতে। আর বড়ো চাচা! সে তো মেয়ে বিদায়ের শোকে কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে? রুহুল, মাসুম, সুজাতাসহ আরও বেশ কয়েকজন মিলে ফাহমিদার সাথে গিয়েছে তার শ্বশুরবাড়ি। নতুন বউয়ের সাথে তার বাড়ির কাউকে না কাউকে যেতে হয়। পরদিন বউ ভাত শেষে আবার ফিরে আসতে হয়। এটা নাকি প্রচলিত একটি নিয়ম। মিছরিও অবশ্য তাদের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল কিন্তু বাবা তাকে যেতে দেয়নি।

চাচীর জ্ঞান এখনো ফিরেনি। বাকি নারীরা শেষ মাথার ঘরে উনার সেবা শুশ্রূষা করছে। কেউ হাতে-পায়ে তেল মাখছে, তো আবার কেউ পাখা দিয়ে বাতাস করছে। এই মুহূর্তে বড্ড একা লাগছে মিছরির। সারা বাড়ি একবার টো টো করে ঘুরে বেড়িয়ে ক্লান্ত দেহখানা নিয়ে ভেতরে, নিজের ঘরে চলে এলো সে। ঘরটি এই মুহূর্তে ফাঁকা। দুই রাত একদিন পর অবশেষে নিজের ঘরের দখলদারিত্ব সে পেয়েছে।
শরীরটা ভীষণ চুলকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ বিচুটি পাতা ঘষে দিয়েছে যেন। শাড়ি পরতে অনভ্যস্ত মেয়েটি দুদিন ধরে শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই সব সেফটিপিন একে একে খুলে একপাশে রেখে আঁচল নামাতেই দরজায় টোকা পড়ল। মিছরি জিজ্ঞেস করল,“কে?”

উত্তর এলো না, বরং শব্দ তীব্র হলো।বিরক্ত হয়ে আঁচল ঠিক করে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো মেয়েটা। নির্ঘাত ভাবি এসেছে। তার স্বভাবই দরজা ধাক্কা দিয়েও কথা না বলা। সেসব ভাবনা নিয়েই দরজা খুলে ললাটে ভাঁজ পড়ল তার।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রুবির স্বামী জামিল। দৃষ্টি অদ্ভুত, ঠোঁটের কোণে সূচালো হাসি। তার আগমনে অবাকই হলো মিছরি। এই অসময়ে এখানে কী করছে লোকটা? তার জানামতে, ভাই সুজন আর তালেবের সাথে বাকি দুলাভাইরা গিয়েছে বেলাইয়ের দিকে ঘুরতে। আবার কবে না কবে এইমুখো হবে! তাই একটু ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের। মিনমিনে স্বরে বললো,“আপনি এখানে?”

জামিল উশখুশ করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো। গলা চুলকাতে চুলকাতে বললো,“তোর বোইন কই? খুঁজলাম কিন্তু পাইলাম না।”

“উত্তর পাড়ার এক দাদীর সাথে তাদের বাড়ি গেছে। সন্ধ্যার পর ফিরে আসবে।”

“বাকি পুরুষ মানুষরা কই?”

“নেই, দুলাভাইদের নিয়ে ঘুরতে গেছে।”

“তাইলে তো আইতে দেরি হইবো।”

“হ্যাঁ।”

“মহিলারা কই?”

“ফুফুরা কোথায় জানি না। পরিচিতদের পেয়েই গল্প করতে করতে কোথায় গিয়েছে কে জানে? আর মা, দাদী, ভাবিরা বড়ো চাচীর ঘরে। বড়ো চাচী ভীষণ অসুস্থ তো, তাই।”

“তাইলে এইদিক এহন ফাঁকা!”

“কিছু লাগবে?”

“লাগবো তো অনেক কিছুই।”

“ঘরে যান, আমি মাকে পাঠাচ্ছি।”

“তোর মায়রে দিয়া কী করমু? তোরে লাগবো।”

বলেই তাকে ঠেলে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো জামিল। মিছরি পিছিয়ে গেলো ভয়ে। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো তার। ভয়ার্ত কণ্ঠে কিছুটা চেঁচিয়ে উঠলো, “দরজা লাগালেন কেন? বের হন ঘর থেকে।”

সেকথা গায়ে মাখলো না জামিল। শিকারির মতো থাবা দিয়ে ধরলো কিশোরী মেয়েটার মোলায়েম হাতটি। অপর হাতে কোমর চেপে ধরে বিদঘুটে হেসে বললো,“ক্যান লাগাইছি বুজোস না, শালী? চিল্লাইস না, কেউ জানবো না।”

অশনি সংকেতে চোখের কোণে অশ্রু জমলো মিছরির। চিৎকার করতে করতে বললো,“রুবি আপাকে বলে দেবো।”

“বাদ দে ওই হাঁপানি রোগীর কথা। চিল্লাইলে তোরই বদনাম হইবো।” বলে তার মুখটা শক্ত হাতে চেপে ধরলো। স্পর্শ ধীরে ধীরে গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগলো। গালে পড়ল কামড়ের দাগ। যার সঙ্গে পেরে ওঠা অসম্ভব!

চলবে_______

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গায়ে হলুদের গানটি বাংলা ছায়াছবি থেকে নেওয়া।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here