#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১০]
জোৎস্না রাত। হলুদ আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ধরণীসহ মাস্টার বাড়ির উঠোনটা। হাতে তৈরি খেজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে সেখানে বসে আছে বাড়ির সমবয়সী মেয়ে, বউরা। তাদের আসরের মধ্যমণি আজ ফাহমিদা। তার দুই হাত ভরে মেহেদী পরাচ্ছে পলি আর মিছরি। পায়ের দিকটা দখল করে আছে বড়ো বোন রেশমা। তাদের থেকে কিছুটা দূরে আড্ডা দিয়ে বসেছে পুরুষেরা। কেউ কেরাম খেলছে, কেউ গল্প করছে, আর ছোটোরা করছে ছোটাছুটি। কাজলের মেয়ে শিখা দুই হাত মেলে হাঁটু গেড়ে বসে আছে মাটিতে। সুজাতা, সিফাত, রেশমার দুই মেয়ে রত্না, লামিয়া, আর ছেলে রানা, মূসা এবং পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর কয়েকজন ছেলে-মেয়ে সেই হাতের উপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে কাটছে ছড়া—
‘টুনটুনি গো পাখি, নাচো তো দেখি
না বাবা নাচবো না, পড়ে গেলে বাঁচবো না
বড়ো আপার বিয়ে কসকো সাবান দিয়ে
কসকো সাবান ভালো না, বড়ো আপার বিয়ে
হলো না।’
মাসুম দূর থেকে সশব্দে ধমকালো ওদের,“এই বড়ো আফা কীয়ের? ক, সেজো ফুফু।”
রত্না তার স্বরেই বললো,“না, বড়ো আপাই। তুমি ভুল, মামা।”
“মাথায় তুইল্যা আছাড় দিলে মামার ভুল ধরা বাহির হইয়া যাইবো। এইহানে তোর আফার বিয়া হইতাছে, নাকি খালার? ফাহমিদা কী লাগে?”
“খালা।”
“তাইলে কী হইবো?”
“খালার বিয়া।”
“এইবার ঠিক কইরা ক। ওই প্রথম থাইক্যা শুরু কর।”
ভোঁতা মুখে আবারো প্রথম থেকে শুরু করল ওরা। তবে এবার আর ভুল করল না—
‘টুনটুনি গো পাখি, নাচো তো দেখি
না বাবা নাচবো না, পড়ে গেলে বাঁচবো না
সেজো খালার বিয়ে কসকো সাবান দিয়ে
কসকো সাবান ভালো না, সেজো খালার বিয়ে
হলো না।’
সুজাতা হাঁক ছেড়ে বললো,“তাহলে আমি কী বলবো, চাচা? আমার তো ফুফু হয়।”
“তুই ফুফুই কইবি।”
তালেব ছোটো ভাইয়ের মাথায় চাটি মারলো। অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বললো,“ছুডো ছুডো পোলাপাইনের পিছনেও তোর লাগতে হইবো, তাই না? সময় থাকতে থাকতে ভালা হইয়া যা।”
“কেমনে হমু? আমার তো আর বউ নাই।”
“বড়ো ভাইয়ের লগে বেয়াদবি?”
দাঁত বের করে হাসলো মাসুম। রুহুল কাঁধে হাত রেখে মুখ ভার করে বললো,“ছুডো বোনটারও বিয়া হইয়া যাইতাছে, অথচ আমরা বড়োরা এহনো আবিয়াইত্তা। আর তুমি মিয়া কও বেয়াদবি করি? ছ্যাহ!”
“চাচার লগে কথা কমু, রুহুল?”
“কও, তবে তোমার তরফ থাইক্যা কইয়ো।”
“ফাজিল একটা।”
ফাহমিদা মনমরা হয়ে হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে। তার উদাস দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আকাশের পূর্ণ চাঁদে। দুদিন আগেই বিয়ের পাকা কথা চূড়ান্ত হয়েছে।দিন তারিখও ঠিক করে ফেলেছে বাবা। যেন বাড়ি থেকে তাকে তাড়াতে পারলেই সবাই বাঁচে। বাম হাতের মেহেদী দেওয়া শেষে নিজের দুই হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙলো মিছরি। তখনি সুজনের বউ জেসমিন কোথা থেকে এসে যেন হাত পেতে দিলো তার সামনে। হালকা হেসে আবদার জুড়লো,“দারুণ মেন্দি দেওয়া শিখছোস তো, মিছরি! আমারেও লাগাইয়া দে একটু।”
রেশমা মুখ বাঁকালো। বাড়ির বউয়ের এত রঙ তামাশা তার সহ্য হয় না। বিদ্রুপ করেই বললো,“আমনে আবার মেন্দি দিয়া কী করবেন, ভাবি? বিয়া বাড়িত কী বইয়া থাকার সময় আছে? কত কাম!”
ননদের অপমানসূচক বাক্যে অধরে প্রতিফলিত হাসি মিইয়ে গেলো জেসমিনের। উঠে যেতে চাইলো, কিন্তু হাত ধরে তাকে আটকে দিলো মেজো ননদ কাজল। যদিও ভাই বউকে সেও তেমন একটা পছন্দ করে না তবুও বড়ো বোনের সাথে দীর্ঘদিনের শত্রুতার জেরেই তার পক্ষ নিলো,“কী হইলো! যান কই? বিয়া বাড়িত যে কেউরই মেন্দি দেওয়ার অধিকার আছে। এই মিছরি, ভাবিরে মেন্দি দিয়া দে। দুই হাত ভইরা দিবি।”
রেশমা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠে গেলো,“যত্তসব ঢং।”
_______
বিয়ে বাড়িতে সারারাত কারোরই তেমন ঘুম হলো না। সকাল থেকে বাড়িতে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সূচনা হলো। দূরদূরান্ত থেকে এসে উপস্থিত হতে লাগলো সকল আত্মীয়-স্বজনেরা। আকবর মিয়ার স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি দিয়ে ভরা বাড়িটা যেন আরো ভরে উঠতে লাগলো। বিশাল উঠোনের এক পাশে করা হচ্ছে হলুদের মঞ্চ। ফটকের বাইরে বড়ো করে লেখা হয়েছে ‘আজ ফাহমিদার গায়ে হলুদ’।
গৃহবধূরা ফল কাটছে, সাজাচ্ছে, তৈরি করছে মিষ্টি জাতীয় মুখরোচক সব খাবার। ফাহমিদা বিমূঢ় হয়ে বসে আছে নিজের বিছানায়। মুখে রা নেই। তাকে ঘিরে আছে মেজো বোন কাজল আর চাচাতো বোন মিছরি। দিলারা বেগম কিছুক্ষণ আগেই হলুদের শাড়ি দিয়ে গিয়েছেন। সেটাই পরানো শেষে এবার সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে। ভাই রুহুল কোত্থেকে যেন বেশ কতক গাঁদা ফুল এনে দিয়েছে। লাল গোলাপ তো ফুটে আছে তাদের বাড়ির আঙিনাতেই। গত রাতের মেহেদী পরানো হাত দুটোতে গাঢ় খয়েরী রঙ হয়েছে। পলি সেই রাঙা হাত দুটো দেখে ননদের বাহুতে খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বললো,“তুমি তো স্বামী সোহাগা হইবা গো, বুবু!”
প্রত্যুত্তরের জন্য ফাহমিদার ঠোঁট দুটো নড়লো,“বুঝলি কেমনে?”
“হাতের মেন্দিতে ভালা রঙ হইছে। বিয়ার সময় আমার দাদীও এই কথাডা কইছিলো।”
বিষণ্ণ হাসলো ফাহমিদা,“ফলছে?”
পলি ভারি লজ্জা পেলো। মেয়েটা চঞ্চল হলেও লাজুক প্রকৃতির। শাড়ির আঁচল কামড়ে উপরনিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালো। ফাহমিদার সেই হাসি সময়ের তোড়ে মিলিয়ে গেলো কোথাও। বেরিয়ে এলো চাপা দীর্ঘশ্বাস। তার মন যে আজ কী চাইছে তা সে নিজেই বোধহয় জানে না।
সারাবাড়ি রঙিন কাগজ আর ফুলে ফুলে সজ্জিত হলো। গ্ৰামে বিয়ে মানেই নতুন এক উৎসবের সূচনা। যেই উৎসবের আমেজ বয়ে চলে আশেপাশের সমস্ত বাড়িতে।
শাহ বাড়িতেও বিয়ের কার্ড পৌঁছে গিয়েছে সকাল সকাল। সম্মুখ শত্রুতা থাকলেও বাড়িতে মুসলমানি, বিয়ের মতো অনুষ্ঠান হলে ঠিকই একে অন্যকে নামমাত্র দাওয়াত করে তারা। যদিও সেই দাওয়াত রক্ষা করতে কেউই আসে না। বহু বছর আগে থেকেই একে অন্যের বাড়ির চৌকাঠ মারানো বন্ধ।
শাহ বাড়ির পুরুষদের ব্যস্ততার অন্ত নেই। পিতা ফতেহ আলী শাহর ছিল আড়তের আর পাটের ব্যবসা। সেই মাঝরাতে বড়ো বড়ো ট্রলার, লঞ্চ গিয়ে দূর দূরান্ত থেকে কম দামে নিয়ে আসে ব্যবসায়ের প্রয়োজনীয় পণ্য। ভোরবেলা ঘাটে এসে থামে। পিতার অবর্তমানে আমিরুল শাহ আর মুমিনুল শাহ সেই ব্যবসাই সামলে চলেছেন আপাতত। সাথে কৃষিকাজ তো আছেই। ঘরের জন্য বছরের ধান নিজেরাই ফলান। সামিউলও সেই ব্যবসাতেই অন্তর্ভুক্ত। বাবার হয়ে সে তত্ত্বাবধানে থাকে মাঝরাতে। পারভেজকে এখনো জড়ানো হয়নি এসবে। ছেলেটা ভীষণ অনভিজ্ঞ। তবে জড়াবেন শীঘ্রই। আর মুমিনুল শাহ তো মাস দুয়েক আগেই বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের মেঝো পুত্র শাহরিয়ারকেও এ পথে নামিয়ে দিয়েছেন। তবে বাকি দুটোর এদিকে মন নেই। তাই তারা ধান আর পাটের জমি সামলায়।
বাবার ব্যবসা বাণিজ্যের হিস্যা সুবহান আলী শাহ’র ভাগে পড়েনি। ভাগ বাটোয়ারার আগেই তাঁর জীবনে দুর্বিষহ নেমে এসে তাকে করে দিয়ে গিয়েছে অকেজো। মা হারা ছেলেরা তখন ছিল ছোটো। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরেও সেই ভাগ তাদের কপালে জোটেনি। বরং বর্তমানে নাজিরের এই অবস্থান, উন্নতি হয়েছে তার নিজ চেষ্টা এবং পরিশ্রমের ফলেই। অবশ্য এই ছেলেটাই একসময় অন্যের জমিতে আর খামারে কাজ করে ভাইয়ের ভর্তির ফি জোগাড় করেছিল। বেশিদিন আগের ঘটনা নয়, তবুও সেসব অতীত। এখন তার চাষাবাদ চলে নিজের জমিতে লোক দিয়ে। রয়েছে খামার ভর্তি গরু। ক’দিন আগে অবশ্য মিলও দিয়েছে। যার চর্চাই আপাতত গ্ৰামে হচ্ছে।
গতকাল রাতে বড়ো চাচা তাকে কাচারি ঘরে ডেকে পাঠালেন। রাশভারী কণ্ঠে বললেন,“হুনলাম তুই নাকি মিল দিছোস? একবারও তো কইলি না। জানতে হইলো মাইনষের কাছ থাইক্যা। বাজারে হেই মিল দেইখা তো আমি প্রথমে ভাবছিলাম হয়তো সামাদ বা ঝন্টুর।”
বোঝ হওয়ার পর থেকে চাচাদের তেমন একটা গুরুত্ব নাজির দেয় না। দুঃখে যে থাকে না, সুখেও তার থাকার কোনো অধিকার নেই। কথাটা নাজির বিশ্বাস করে। জীবনের বেশিরভাগ সময় তার কেটেছে সামাদ মিয়ার মাছ ধরার ট্রলারে। এসব কথা ওই লোকটার থেকেই সে শিখেছে। তাই কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল, উদাস কণ্ঠেই উত্তর দিলো,“আমিও তো অনেককিছুই মাইনষের কাছ থাইক্যা হুনি। তা লইয়া অভিযোগ করছি কহনো? আর কইলেই বা কী? ট্যাহা পয়সা দিয়া তো আর কোনো সাহায্য করতে পারতেন না।”
“তুই বাড়িত থাকোস কতক্ষণ? সকালের নাস্তায় পাই না, দুপুরের সময় পাই না। অবেলায় খাওন খাস। রাইতে পাইলেও তাড়াহুড়া কইরা খাইয়া দৌড় মারোস। এর লাইগা চাচীর কম ঝাড়ি খাস?”
“বুঝবেন না আমনে।”
“বুঝাইলে ঠিকই বুঝমু। কইলে সাহায্যও করতে পারতাম।”
“হেই কথা আর তুইলেন না, চাচা। নাজির শাহ অতীত ভুলে না। দাদার অঢেল সম্পত্তি থাকার পরেও ভাগে পাইছি মাত্র দুই বিঘা। তার মাঝে এক বিঘা আবার নওশাদের পাওনা। নিজেগো ব্যবসা থাকার পরেও ভাই এর ফি দেওয়ার লাইগা ঝন্টু মিয়ার ক্ষেতের আইল পরিষ্কার করছি; সেই কড়া শীতে। ট্যাহা চাইছিলাম কিন্তু দেন নাই। কইছিলেন, আধমরা বাপের পোলায় এত শিককিত হইয়া করবো কী? ক্ষেতে কাম করতে পাঠা। তাতে কী নাজিরের ভাই অশিক্ষিত রইছে? নাকি ফি এর অভাবে লেখাপড়া বন্ধ কইরা দিছে? এহন সে শহরে পড়ে, বিয়াও করছে শহরের মাইয়া। আর নাজিরও গেরামের ভিতরে মাথা তুইল্যা দাঁড়াইছে।”
কপাল কুঁচকে নিলেন আমিরুল শাহ,“পুরাইন্না কতা ধইরা রাখতে নাই, নাজির। তগো ভালার লাইগাই করছি। কষ্ট না দিলে আজ এমনে দাঁড়াইতে পারতি?”
“আমনের পোলাগো দেন নাই ক্যান?”
“আবার তুলনা! তোরা সবাই আমার কাছে এক। এহন বুঝবি না। চলোস তো আচোদা মাইনষের লগে। হেরাই রক্তের দুর্নাম কইরা কানে বিষ ঢালতাছে। যেদিন গুয়া মারা দিবো হেইদিন বুঝবি। এসব সঙ্গ বাদ দিয়া কামের কতা হুন।”
“কন।”
“বংশের একটা মান সম্মান আছে। শত্রুরা যদি জানে সম্পর্কে ফাঁকফোকর আছে তাইলে সুযোগ খুঁজবো।”
“তো? পারবো আমগোর লগে?”
“শত্রুগো দুর্বল ভাবতে নাই। আমার বাপ আর তোর বাপ এইডাই ভাবছিলো। তার পরিণতি তো আজ ভোগ করতাছি আমরা।”
“আসল কথা কন, কাম আছে।”
“মিল আর খামারের ব্যবসা আমগো বাকি ব্যবসার লগে জুইড়া দে। সামিউলের লগে মিলমিশ কইরা চালা।”
“তারপর?”
অধরে হাসি ফুটে উঠলো লোকটার। বুড়ো আঙুলের সাহায্যে জিভে খয়ের লাগিয়ে গদগদ সুরে বললেন, “ব্যবসায় বেশি লাভ হইবো। পুরা জেলায় শাহ বাড়ি হইবো আরো নামকরা, ধনী।”
“ইচ্ছা নাই।”
“ক্যান?”
“রক্ত ঘাম জড়াইয়া যহন এতদূর আইছি তহন কেউ পাশে আছিলো না। তাইলে এহন ক্যান আইতে দিমু? আমারটা আমারই থাউক।”
হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা মুহূর্তেই পাঁশুটে বর্ণ ধারণ করল আমিরুল শাহ’র। না শব্দটা তাঁর ভালো লাগে না। মুখ কালো করে ফের খয়ের ঘষলেন। নাজির উনাকে আগা গোড়া দেখে চাপা হাসলো। বললো,“আমগোডা কবে দিবেন, চাচা?”
“কী?”
“ভাগের জমিজমা, ব্যবসা?”
দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে ভাঁজ পড়ল তাঁর। জিজ্ঞেস করলেন,“তগো কীসের ভাগ?”
“আমার বাপ কী দাদার পোলা না? আমনে আর ছুডো চাচা পাইছেন চৌদ্দ বিঘা কইরা মোট আটাইশ বিঘা। আর আমরা মোটে দুই বিঘা, তাও নামে। ব্যবসার হিসাব করতে বইলে তো মাথায় হাত। তা দিবেন কবে?”
তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে পারলেন না আমিরুল শাহ। হতভম্ব হয়ে গেলেন। বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলেন অনেক সময় ধরে। এমন কথা যেন আশা করেননি কখনো। তাঁর নীরবতা দেখে নাজির মজা পেলো। অলস ভঙিতে বললো,“দ্যান না, চাচা! ভাল্লাগে না আর। বিয়া করমু। একলা একলা আর কয়দিন? পুরাইন্না ঘরে গর্ত করছে ইঁন্দুরে। দুইদিন পরপর ফাডল ধরে। নতুন বাড়িত মাত্র দুইডা ঘর। লেপালেপি কী আমার কাম? কলিমের মা দিয়া আর কয়দিন চলবো? জমি, ট্যাহা পয়সা ফেরত দিলে আমনেগো মতো একটা ঘর তুইল্যা বিয়া কইরা বউ আনমু।”
তার কৌতুকে হতভম্বতা সরে গিয়ে ভয় ফুটে উঠলো আমিরুল শাহ’র মুখমন্ডলে। নাজিরের কী আনন্দ যে লেগেছিল তখন! ইচ্ছে করছিল শরীর দুলিয়ে শব্দ করে হাসতে। কিন্তু পারলো না। শেষমেশ হাসি চেপে রাখতে না পেরে বেরিয়েই এলো কাচারি ঘর থেকে। ছোটো চাচা সকালে এসে জিজ্ঞেস করলেন,“তুই আবার কী কইছোস, ভাইজানরে? শান্তি ভাল্লাগে না?”
নাজির সেকথার কোনোরূপ উত্তর না দিয়ে বসেছিল এক থালা ভাত নিয়ে। আপাতত বাড়িতে কর্তারা নেই। খাবার খেয়ে খামারের গরুগুলোর পানি বদলে ঘাস কেটে আনলো নাজির। সকালে উঠেই সবকয়টাকে ভুসি খাইয়েছে। গোয়ালে তার গরুর সংখ্যা সাতটা, গাভী চারটা, আর বাছুর আট-নয়টা হবে। তাদের নতুন বাড়ির অপরপাশে এই বিশাল গোয়াল। গোয়ালে কাজ শেষ করে বেরিয়ে এলো সে।
পারভেজ উদাস হয়ে বসে আছে মাটির বারান্দার এক কোণে। নাজির লুঙ্গি ঝেড়ে ঠিকমতো পরে চালে কাস্তে গুঁজে রাখতে রাখতে বললো,“এমনে বইয়া আছোস ক্যান, আকাইম্মা? কুড়াল লইয়া আমার পিছে পিছে আয়। পুবের জমিতে তালগাছটা ভাইঙা পড়ছে। কাটতে হইবো।”
পারভেজ অনুভূতিশূন্য। কাঠের পুতুলের মতো উঠে ঘর থেকে নিয়ে এলো কুড়াল। হাঁটা ধরলো নাজিরের পিছু পিছু। তাদের জমিগুলো এলোমেলো। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। দাদা এই জমিগুলো কিনেছিলেন যুদ্ধের সময়, হিন্দুদের থেকে স্বল্প দামে। আগে এই এলাকায় হিন্দুদেরই বাস ছিল বেশি। তবে যুদ্ধের সময় ঘর ছেড়ে ভারত পালিয়ে যাওয়ার সময় আশেপাশের মানুষদের কাছেই তা বেচে দিয়েছিল তারা। যার অধিকাংশ কিনে নিয়েছিল তাদের দাদাসহ গ্ৰামের আরো কিছু বয়োজ্যেষ্ঠরা। পুবপাড়ার জমিতে সারি সারি তাল, আম, জাম, কাঁঠাল আর একটা শিমুল তুলার গাছ আছে। বৈশাখী বাতাসে গাছের তুলা সব ঝরে পড়েছে মাটিতে, কিছু বা মেঘের মতো উড়ে গিয়েছে উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যে।
গাছ থেকে আম ছিঁড়ে হেলে পড়া নিম গাছের কান্ডে বসলো নাজির। খেতে খেতে আদেশের সুরে বললো, “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। কাম কর, মন ভালা থাকবো। গাছটা সাইজ কইরা কাট। এইডা দিয়া একটা চৌকি বানামু।”
“তাল গাছ দিয়া?”
“হ, আব্বার চৌকির পায়া ফাইট্টা গেছে দেখলাম।”
“বাড়ির পিছনের মেহগনি গাছটা ভালাই মোডা হইছে। ওইডা কাটি?”
“তোর বাপের গাছ ওইডা? কি সুন্দর আবদার! চুপ কইরা কাট।”
“এইডা তো আমার বাপেরই।”
“তোর মীর জাফর বাপ আমার বাপের ভাগের সম্পত্তি, ট্যাহা পয়সা এতোগুলা বছর ধইরা ভোগ কইরা খাইতাছে। আর তুই তালগাছের খোডা দেস, গোলামের পুত? গাছ কাট।”
লুঙ্গিটা কোমরে বেঁধে পরনের শার্ট খুলে জাম গাছের নিচু ডালে ঝুলিয়ে রেখে গাছ কাটায় মনোযোগ দিলো পারভেজ। নাজির বললো,“বাপ আর সমাজের ডর থাকা মাইনষে গো লাইগা প্রেম, ভালোবাসা না। প্রেম, ভালোবাসা করতে হইলে বুকে দম থাকতে হয়। সবার বিরুদ্ধে গিয়া লড়াই করার মতোন সাহস থাকতে হয়। যেইডা তোর নাই। তুই বাপের পোষা কুত্তা, হাত নাড়াইলে মাইরের ভয় পাস, খাওন দিলে জিহ্বা বাহির করোস। নীতি-নৈতিকতা বোধ তগো দুই ভাইয়ের মধ্যে নাই। তাই এসব প্রেম, ভালোবাসা তগো মতো মাইনষের লাইগা না। ফটকামি ছাইড়া সামিউল ভাইয়ের লগে ব্যবসা বাণিজ্যে হাত দে। নইলে পরে আমগো মতোন অবস্থা হইবো তোর ভবিষ্যৎ অজাতগুলার। ব্যবসায় মন দিলে এমনিতেই তোর বাপে ভালা মাইয়া দেইখা তোর বিয়া দিয়া দিবো।”
করুণ দৃষ্টিতে মাথা তুলে তাকায় পারভেজ। সেই দৃষ্টি অবজ্ঞা করে নাজির বললো,“ফাহমিদা তোর জন্য না। ওর বাপ-দাদায় আমগো দাদারে ধানক্ষেতে ফালাইয়া মারছে, আমার বাপের এমন অবস্থা করছে। যদি বিয়া কইরাও ফালাস তবুও সংসার করতে কহনো পারবি না। কেউ মাইনা নিবো না। শত্রুর মাইয়া ঘরে তোলা অত সহজ না রে, পারভেজ। আর তুললেও ঢাল হইয়া তার পাশে কহনো দাঁড়াইতে পারবি না। কারণ তোর সাহস নাই।”
“তুই এই কথা কস? কয়দিন আগেই না তুই আমার পক্ষ নিছিলি?”
“তোরে বাঁচানোর লাইগা নিছিলাম। তার লাইগা সব সময় নিমু নাকি? আমগো শত্রুতা হেগো বাড়ির ব্যাডা মাইনষের লগে, মাইয়া মাইনষের লগে না।”
বেখেয়ালে ধারালো কুড়ালের একটা কোপ বুড়ো আঙুলে লেগে গেলো। ক্ষত স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগলো তরল, তাজা রক্ত। অথচ পারভেজ আর্তনাদ করল না একটুও। যেন এসবে ভীষণ অভ্যস্ত সে!
নাজিরের চোখে তা ভালোভাবেই পড়ল। অশ্লীল এক গালি দিয়ে এগিয়ে এলো সে। মাটি থেকে দূর্বা ঘাস তুলে হাতের মধ্যে ঘষে রস নির্গত করে তা লেপ্টে দিলো ক্ষত স্থানে। হাত থেকে কুড়ালটা কেড়ে নিয়ে বললো,“কোনো কামের না, সর হারামজাদা।”
চলবে_________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

