#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:০৯]
উঠোনের মাঝখানে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা লিচু গাছের উঁচু ডালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে মিছরি। মনের আনন্দে লিচু খেতে খেতে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সুজাতার দিকে ছুঁড়ে মারছে লিচুর বিচি। সুজাতার চোখেমুখে জমে আছে অভিমান, ফর্সা নাকটা ধারণ করেছে রক্তিম বর্ণ, এই যেন কেঁদে দেবে সে। নাক টেনে হুমকি দিয়ে বললো,“ফুফু, এখনই লিচু দাও বলছি। না দিলে কিন্তু দাদীর কাছে বিচার দেবো!”
মিছরি শব্দ করে হেসে ওঠে। ডাল ধরে এক থোকা লিচু ছিঁড়ে এনে ছিঁলতে ছিঁলতে মুখে পুরে চোখ বুজে তৃপ্তির শব্দ তুলে,“উমম কি স্বাদ! তোর দাদীরে আমি ভয় পাই?”
এবার আর ধৈর্য ধরতে না পেরে কেঁদেই দিলো সুজাতা। চোখে জমলো টলটলে অশ্রুজল। ঠোঁট উল্টে দালানের দিকে ফিরে চিৎকার ছুঁড়লো,“অ্যা অ্যা, ছুটো দাদী! দেখো ছুটো ফুফু আমাকে লিচু দেয় না।”
মিছরির কোনো ভাবান্তর হলো না। এখন প্রায় বিকেল। উঠোনের অর্ধেক জুড়ে খেলা করছে হলদে রোদ। বাকি অর্ধেক জুড়ে গাছপালার ছায়ায় ঘেরা।সকালে মাসুমের সঙ্গে বাড়ি ফিরে গোসল করে খেয়েদেয়ে এক দুপুর ঘুমিয়েছে মিছরি। স্কুল থেকে ফিরে এসে তার সেই ঘুম ভাঙিয়েছে সুজাতা। ফাহমিদা সুজাতার নিজের ফুফু হলেও গলায় গলায় ভাব তার চাচাতো ফুফু মিছরির সঙ্গে। এই দুজন চুলাচুলি করে, তো এই আবার কেউ কাউকে ছাড়া থাকতেই পারে না।
মিছরি নানাবাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করে। গ্ৰামের পরিবেশ ভালো না হওয়ায় বয়স ছয় পেরোতেই বাবা তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল নানাবাড়ি বরিশাল। তবে তার নানা বাড়ি গ্ৰামে নয়, বরং জেলা শহরেই পড়েছে। বছরজুড়ে মিছরি সেখানেই থাকে, পড়াশোনা করে। বছরে মাত্র তিনবার আসে দাদাবাড়িতে। জ্যৈষ্ঠ মাসে, কোরবানির ঈদে আর শীতে। বেড়ানো শেষে যখন ফিরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসে তখন সুজাতা কেঁদেকেটে ভাসায়। তার সেই কান্না আর দুঃখ দূর করতে বাপ-চাচাদের খেতে হয় নাকানিচুবানি। তবে এবার একেবারে ফাহমিদার বিয়ে খেয়েই বোধহয় মিছরি ফিরবে। গতকাল পাত্রপক্ষ এসে দেখে গিয়েছে ফাহমিদাকে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, দুই পক্ষই একে অপরকে পছন্দ করেছে। এখন শুধু পাকা কথা বলা বাকি। দাদা-চাচারা চাইছেন, দ্রুতই যেন বিয়েটা সম্পন্ন হয়ে যায়।
মা পারুল ভেতর থেকে ঝাঁটা হাতে বেরিয়ে এলেন। আশেপাশে তাকিয়ে এরপর তাকালেন উপরে, গাছের ডালে। চোয়াল শক্ত করে ধমকের সুরে বললেন, “গাইচ্ছা বান্দর নাম গাছ থাইক্যা! মাইয়া মানুষ হইয়া গাছের আগায় বইয়া রইছে, নাম নিচে।”
মিছরি নামলো না নিচে। মাকে সে একদম ভয় পায় না। তাতে আরো রেগে গেলেন পারুল। চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ বাড়লো। সেই শব্দে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন সৈয়দুন নেছা। কোমরে তাঁর বাতের ব্যথা। হাত দিয়ে গ্ৰীল চেপে ধরে দাঁড়িয়ে পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে কড়া গলায় বললেন,“বাড়ির বউয়ের গলার তেজ বাইরে যাইবো ক্যান? মাইয়ারে শিক্ষা দিতে গিয়া নিজের সব শিক্ষা পানিতে ভাসাইয়া দিছো?”
শাশুড়ির কণ্ঠস্বর শুনে থেমে গেলেন পারুল। মেয়ের দিকে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঘোমটা টানলেন কপাল পর্যন্ত। নতজানু কণ্ঠে বললেন,“কী করমু, আম্মা? কথা হুনে না আমার। আমনেই আমনের নাতনিরে বুঝান।”
সৈয়দুন নেছা মিছরির দিকে তাকালেন। বেহায়ার মতো এখনো গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে লিচু খেয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। তার স্থানে অন্য কেউ থাকলে হয়তো বৃদ্ধা দুয়েকটা গালি ছুঁড়তেন এতক্ষণে। কিন্তু মিছরি বলেই তা করলেন না। নাতনিটা আসেই তো কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে। কতবার ছেলেটাকে তিনি বলেছিলেন,“বাড়ির মাইয়া বাড়িত থাক। ওরে গেরামের ইশকুলেই ভর্তি করাইয়া দে। মানুষ কী আর পড়তাছে না?”
ছেলে সেকথা শুনলে তো! নাতনির উদ্দেশ্যে স্নেহ ভরা কণ্ঠে বললেন,“হাত পা ভাঙবো, বুবু। ডালাসহ লিচু ছিঁইড়া নিচে নাইম্মা আয়। বাড়িত এত জোয়ান মর্দ থাকতে তোর ক্যান গাছে উঠতে হইবো?”
মিষ্টি কথার বিপরীতে আর ত্যাড়ামি করতে পারে না মিছরি। কথামতো কয়েক থোকা লিচু ওড়নার ভাজে নিয়ে লাফিয়ে নেমে পড়ে জমিনে। এমনিতে মেয়েটা ভীষণ ডানপিঠে। আদর, আহ্লাদ ছাড়া তাকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। তবে বাইরের লোকের সামনে ততটাই শান্ত। যেন ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানে না। ওড়না থেকে লিচুগুলো সুজাতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বললো,“নেহাৎ আমি দয়াশীল মানুষ, তাই দিলাম।”
সুজাতা হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে ছিঁড়ে খাওয়া ধরলো লিচু। পারুল গিয়ে মুছে দিলেন তার নাক। সঙ্গে সঙ্গে সে দৌড়ালো ভেতরে। মিছরিও তার পিছু নিলো। ফটক দিয়ে ঢোকার অভিমুখে তার চুল টেনে ধরলেন সৈয়দুন নেছা। কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুটা কঠোর স্বরে বললেন,“চুল ধুইয়া তেল লাগাস না কয়দিন ধইরা? সব চুল তো পইড়া গিয়া মাথায় টাক হইয়া যাইবো। কেডায় বিয়া করবো তহন?”
“কাউকে করতে হবে না।” ধুপধাপ পা ফেলে ভেতরে চলে গেলো সে। বাবার ঘর পার হতেই ডাক পড়ল, “আম্মা! ও আমার আম্মা! এইদিকে আইয়ো দেহি, হুইন্না যাও।”
বাবার ডাকে মৃদু হাসলো মিছরি। সাড়া দিয়ে ছুটে গেলো,“আসি।”
__________
দেখতে দেখতে দিন তিনেক পেরোলো। শাহ বাড়ির পরিবেশ আপাতত ঠান্ডা। খবর পাঠানোর পরেরদিনই এসে হাজির হয়েছিল লিলির বাবা-মা। বেশভূষা তাদের সাহেবী। প্রথমে নাকরা করলেও শেষমেশ ছেলেদের বিত্ত, অবস্থা দেখে রাজি হয়ে একেবারে তখনি কাজী ডেকে নতুন করে মেয়ের বিয়ে পড়িয়ে দিয়ে গিয়েছেন তারা।
নওশাদ, লিলি এখন বাড়িতেই আছে। এই সপ্তাহ থেকে পরের সপ্তাহে চলে যাবে শহরে। লেখাপড়া তো শেষ করতে হবে নাকি? নাজির বিয়ে বিষয়ক কিছু না বললেও সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে,“লেখাপড়া ছাড়া এই বাড়িত কোনো খাওন নাই। হয় লেখাপড়া কইরা চাকরি খোঁজ, না হইলে ক্ষেতে খামারে গিয়া কামলা দে। সারাজীবন কারো দায়িত্ব নেওয়ার শপথ আমি করি নাই।”
সবসময়কার মতো এবারো নওশাদ ভাইয়ের কথা মেনে নিয়ে চুপ রইলো শুধু। কিন্তু লিলির কিছুই ভালো লাগছে না। এই বাড়ি, বাড়ির মানুষজন, বিশেষ করে নওশাদের বড়ো ভাইকে। এসে থেকেই স্বামীর সাথে লোকটার তুলনা দেখতে দেখতে সে বিরক্ত।
রাতের খাবার খেয়ে যে যার ঘরে গিয়ে খিল দিয়েছে। গ্ৰামে সন্ধ্যা মানেই অনেক রাত। নাজির বারান্দায় বসে জাল ঠিক করছে। কিছু কিছু জায়গায় ছিঁড়ে গিয়েছে। সেটাই সুঁই আর বিশেষ সুতা দিয়ে সেলাই করছে।
পারভেজ কোথা থেকে যেন এসে বসলো পাশে। উদাস দৃষ্টিতে হাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মাছ ধরতে যাইবি?”
“হ।”
“সামাদ ভাইয়ের লগে?”
“না, ঝন্টু মিয়ার কোষা দিয়া। পাড়ে বাইন্ধা রাইখা আইছি।”
বিপরীতে আর কিছু বলে না সে। নাজির তার হাবভাব আড়চোখে লক্ষ্য করে। নীরবতা ভেঙে কিছুক্ষণ পর বলে,“কয়দিন ধইরা তোরে বেশি একটা দেহি না। সেই শালিসের পর থাইক্যা লুকাইয়া থাকোস ক্যান?”
“আব্বার ভয়ে। হেইদিন হাসপাতালে ডাক্তারের সামনে থাপ্পড় মারছিল। বাড়িত আইছি পরে জুতা হাতে নুরু চাচার বাড়ি পর্যন্ত দৌড়াইছে।”
পারভেজের মুখে মলিনতা। কথা শুনে নাজির হাসে। আচমকাই বলে ওঠে,“ফাহমিদার বিয়া ঠিক হইছে হুনলাম। পরশু গায়ে হলুদ।”
পারভেজ বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকালো একপলক। আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে আহত কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করল, “আমিও হুনছি।”
“কী করবি এহন? প্রেম করছিলি ক্যান, গোলামের পুত?”
“শাহরিয়ারের লগে মশকরা কইরা পিছে লাগছিলাম, কিন্তু সত্যি সত্যিই যে পিছলা খাইয়া যামু বুঝি নাই।” বলে থামলো সে। কিছুটা সময় নিলো। পুনরায় জিজ্ঞেস করল,“এহন কী করা উচিত, ভাই?”
“দাওয়াত তো মনে হয় না দিবো। থাক, হেইদিন না হয় আমরা জোঁভাতি করমু।”
“মশকরা করিস না তো।”
“আমার কাছে না জিগাইয়া, নওশাদরে গিয়া জিগা। এসবে ওর অভিজ্ঞতা বেশি।”
নাজিরের দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছু ফিরতেই নওশাদকে দেখতে পেলো পারভেজ। সবে এসে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা, বড়ো ভাইয়ের খোঁচা খেয়ে চুপসে গেলো। আসার পর থেকেই তেমন একটা কথা হচ্ছে না দুজনার। অথচ আগে বাড়ি ফিরলেই দুই ভাই একে অন্যের সাথে আঠার মতো লেগে থাকতো। বড়ো ভাই যেখানে যেতো নওশাদও পিছুপিছু সেখানেই যেতো। অথচ এবারের আবহাওয়া ভিন্ন।
নাজিরের খোঁচা পারভেজ বুঝলো না। সত্যি সত্যিই সে বসা থেকে উঠে চলে গেলো নওশাদের কাছে। উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“ভাই ঠিক কইছে। তুই বল, কী করমু আমি? পরশু ফাহমিদার গায়ে হলুদ, পরেরদিন বিয়া।”
নওশাদ ভারি অবাক হলো। এ বিষয়ে সে কিছুই জানে না। কণ্ঠস্বরে বিস্ময় প্রকাশ করেই বললো,“কোন ফাহমিদা? মাস্টার বাড়ির মাইয়া?”
“হ।”
“ওর সাথে তুই! কেমনে কী?”
কথার মাঝখানেই নাজির ধমকালো,“ঘরে যা। বেশি বিরহ জাগলে কইস, বিয়ার রাইতে মাইয়া তুইল্যা আনমু না হয়। মাস্টর বাড়ির মাইয়া শাহ বাড়ির বউ হইয়া ঘুইরা বেড়াইবো, কাম করবো ব্যাপারটা ভাবলেই তো কেমন কেমন লাগে।”
“আব্বায় মাইরা ফেলাইবো।”
“তাইলে নাটক মারাও ক্যান? মাইজ্ঞা একটা। ঘরে যা।”
ধমক খেয়ে মুখ ভার করে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় পারভেজ। শাহ বংশের সব পুরুষই নাকের ডগায় রাগ, আর জিভের ডগায় মশকরা নিয়ে ঘুরে। যখন তখন গায়ে হাত তুলে দেওয়ার স্বভাবও রয়েছে এদের। তাই বয়সে বড়োদেরকে ছোটোরা ভীষণ ভয় পায়। মাছের জাল সেলাই করা শেষ। একটা কাঠের বাক্সে হাতের সুই সুতা রেখে জাল নিয়ে উঠে দাঁড়ালো নাজির। পারভেজকে থামিয়ে দিয়ে বললো,“ওই দাঁড়া, এই বাক্সডা আব্বার ঘরের খাডের তলায় রাইখা দরজায় তালা দিয়া চাবি নিজের লগে লইয়া যা।”
আদেশ মেনে নিলো পারভেজ। নওশাদ বললো,“ভাই, আমিও আসি?”
“কই?”
“মাছ ধরতে, বহুদিন ধরি না।”
“না।”
“ক্যান? আগেও তো যাইতাম।”
“আগে আর এহন এক না। বউরে ঘরে একলা রাইখা রাইতবিরাইতে মাছ ধরবি ক্যান?”
“এখনো রাগ কইরা আছো?”
“না, রাগ করমু ক্যান?”
“মনে হইলো।”
“সকালে বাজারে গেছিলি?”
“হ, লিলির কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার ছিল।”
“মতিনের লগে দেখা হইছিল?”
“হ, চায়ের দোকানে ডাক দিছে চা খাওয়ার লাইগা।”
“কী কইছে?”
“তেমন কিছু না।”
নাজির ডান হাতটা সোজা করে সামনে ধরে বললো, “এইডা কিন্তু কলম ধরা হাত না। এইডা কাঁদা, মাটি ধইরা ফসল ফলানোর হাত। কাস্তে, কোদাল, লাঙ্গল, কুড়াল ধরার হাত। এই হাতের থাপ্পড় গালে পড়লে আব্বা আব্বা ছাড়া মুখ দিয়া আর কোনো শব্দ বাহির হইবো না।”
“কইছে, নিজেরটা নিজে বুইঝা নিতে। বউ নিয়া গ্ৰামে একেবারে ফিরা আসতে।”
“তুই কী কইছোস?”
“আমগোডা আমরাই বুইঝা নিমু।”
উত্তরটা পছন্দ হলো না নাজিরের। মুখ দেখেই তা বুঝা যাচ্ছে। বললো,“ওই অজাতগুলানের লাইগা শহরে পাঠাইছিলাম উচ্চ শিক্ষিত হইয়া যাতে চাকরি করতে পারো, রোদে-শীতে আমার মতো কষ্ট না কইরা যেন সাহেব সাইজা ফ্যানের নিচে বড়ো চেয়ারে বইসা ভালো বেতনে কাম করতে পারো। কিন্তু তোমার তো তা ভালো লাগে নাই। এহন গুয়া মারা দেও গিয়া। নিজের আপন ভাই বইল্যা মুখ খারাপও করতে পারি না।”
মুখ দিয়ে শ্বাস ফেলল নাজির। যেতে যেতে বললো, “দরজা লাগাইয়া ঘুমাইস। রাইতবিরাইতে কেউ দরজা ধাক্কা দিলেও খুলিস না। ডাকাইতের উৎপাত গেরামে বাড়ছে।”
নওশাদ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে অন্ধকারে ভাইয়ের মিলিয়ে যাওয়া দেখে। বুক চিরে বেরিয়ে আসে চাপা দীর্ঘশ্বাস। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ফিরে আসে ঘরে।
ঘরের ভেতর ভ্যাপসা গরম। বাড়ি পুরোনো হওয়ায় এবং নওশাদ বাড়িতে না থাকায় বিদ্যুৎ এর মিটার নামানো হয়নি এখনো। ছোটো চাচার মিটার থেকে তার টেনে এনে বাবার ঘরে একটা বাল্ব আর ফ্যান দেওয়া হয়েছে শুধু।
দূরের টেবিলে হারিকেন জ্বলছে। কাঠের জানালা খুলে দাঁড়িয়ে আছে লিলি। একটু পরপর নড়াচড়া করলেই ঝনঝন শব্দে বেজে উঠছে হাতের চুড়ি আর পায়ের নূপুর। দরজায় খিল দেওয়ার শব্দে পিছু ফিরে তাকায় সে। নওশাদকে দেখতে পেয়ে মুচকি হেসে এগিয়ে এসে বিছানায় বসে। পা ঝোলাতে ঝোলাতে প্রশ্ন ছোঁড়ে,“কোথায় গিয়েছিলে?”
“কোথাও না, বারান্দায় ছিলাম।”
“বাবা যে এত সহজে আমাদের মেনে নেবে, আমি তা ভাবতেও পারিনি।”
“তুমি খুশি?”
“হ্যাঁ, অনেক।”
“তোমার বাবাকে আমার ভাই বুঝিয়েছে।”
কথাটা গায়ে মাখলো না লিলি। হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখলো। ঠোঁট উল্টে বললো,“আমার আর এখানে ভালো লাগছে না। এখানে কোনো মানুষ থাকতে পারে? আমি কী এসবে অভ্যস্ত?”
“এখানে মানুষ থাকতে পারে না মানে? এখানকার নিবাসীরা কী মানুষ নয়?”
“আবার ভুল বুঝলে তো? বলতে চাইছি, আমি এসবে অভ্যস্ত নই। তোমাদের এখানে বিদ্যুৎ নেই, টেলিভিশন নেই, ফ্যান চলে না, শুধু গরম আর গরম। টিনের চালার মাটির ঘর, গোসল করতে হলে খোলা কলপাড় যেতে হয়, রাতবিরেতে পেটে চাপ পড়লেও ছুটতে হয় বাইরে। অথচ আমি বড়ো হয়েছি ভিন্নভাবে। শহরে এসবের ঝামেলা নেই। তুমি তো দেখেছো আমাদের বাড়ি। তাই না, বলো?”
“সবকিছু জেনে শুনেই তো বিয়ে করেছো। তখন বলেছিলে, আমার সঙ্গে গাছতলাতেও থাকতে রাজি। অথচ এটা কিন্তু গাছতলা নয়। তাহলে এখন কেন সমস্যা দেখাচ্ছো?”
“ফিরবো কবে?”
“সময় লাগবে কিছুটা। ফিরলেই বা থাকবে কোথায়? দুটো টিউশন পড়াতাম, তার মধ্যে তোমায় বিয়ে করে তো একটা হারালাম।”
“মা বলেছে বাবাকে বোঝাবে। আমরা আমাদের বাড়িতে গিয়েই থাকবো। কিছু হবে না।”
“মাথা খারাপ? শেষমেশ শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হয়ে থাকবো?”
“এত উত্তেজিত হয়ো না তো। সারাজীবন থাকবো নাকি? যতদিন না নিজে কিছু করতে পারছো ততদিন থাকবো। আমার বাবার বহু পরিচিত আছে। বাবার মন রক্ষা করে থাকতে পারলে তোমারই ভালো।”
“কিন্তু!”
কথাটা বলতে দেওয়া হলো না তাকে। ঠোঁটে আঙুল চাপলো লিলি। সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বললো,“উঁহু, আর কোনো তর্ক নয়। আমার অন্যকিছু চাই।”
“কী চাই?”
“পুরো নওশাদ।”
নারী স্পর্শে নওশাদের দেহ কেঁপে উঠলো খানিকটা। মৃদু হেসে পল্লব ঝাপটালো বেশ কয়েকবার। মেয়েলি মুখখানা বুক থেকে সরিয়ে চোখ দুটোতে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছুঁয়ে দিলো ওই লাল টকটকে লিপস্টিক মাখা ঠোঁট।
চলবে_________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

