যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:০৮]

0
28

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:০৮]

ভোরের আলো যতটা না নিঃশব্দে ধরণীকে গ্ৰাস করল, তার চেয়েও দ্রুত শহর থেকে নওশাদ বিয়ে করে বউ এনেছে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল গোটা গ্রামে। চায়ের দোকানে এখন তা নিয়েই কানাঘুষা, মন্তব্য আর মৃদু কৌতুকের ঝড় উঠেছে। শাহ বাড়ির উঠোন ভরে উঠেছে কৌতূহলী নারীদের ভিড়ে, এক ঝলক নতুন বউ দেখার আশায়। কেউ কেউ বা হায়হুতাশ করে বলছে,“বড়ো ভাইডা এতকাল গাধার মতোন খাটলো, আর ছুডো ভাই কিনা তার আগেই বিয়া কইরা বউ আনলো বাড়িত? নাজির এ কার পিছনে এত ট্যাহা ঢাললো?”

লিলি যেই ঘরে রয়েছে, ফরিদা কাউকেই সেখানে যেতে দিচ্ছেন না। এই বিষয়ে নাজিরের কড়া নিষেধাজ্ঞা। গত রাতেই সে টের পেয়েছিল সকাল হলেই অপ্রত্যাশিত কিছু যে ঘটতে চলেছে। সেই ফাঁকে নওশাদ এসে বসেছে লিলির পাশে। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর নম্র কণ্ঠে বললো,“কারো কথায় কান দিও না। গ্ৰামের মানুষ এমনই। নিজের সংসার রেখে পরের সংসারে নাক গলাতে পছন্দ করে। আর হ্যাঁ, বড়ো চাচা সকালে নাজমুলের সঙ্গে বাড়ির চাকর আব্বাসকে তোমার বাবার কাছে পাঠিয়েছেন। যতই রাগারাগী করুক, ওরা ঠিক সামলে নেবে।”

বাবার কাছে যে সংবাদ গিয়েছে এ বিষয়ে লিলির কোনো ভাবাবেগ হলো না। বাবাকে ভয় পেলেও এখন সে নিশ্চিন্ত। সে জানে, এখানে এসে বাবা তার এবং নওশাদের কিছুই করতে পারবে না। তার ভাবনা অন্য কোথাও। সেই ভাবনা থেকেই বিরক্তি নিয়ে বললো, “কারো কথায় কিছু মনে করবো না মানে? তোমার বড়ো ভাই নিজে ভালো সাজার জন্য সবার সামনে তোমায় কতটা নিচু করে রেখেছে ভাবতে পারছো? সবাই শুধু আফসোস করছে তার জন্য, আর কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে তোমাকে। বিয়েই তো করেছো, কী হয়েছে তাতে? আর সে-ই বা কী এমন শুদ্ধ করে ফেলেছে? বড়ো ভাই হিসেবে ছোটো ভাইয়ের খরচ চালানো কী তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? নাম কামানোর ধান্দা শুধু।”

নওশাদ কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। হা করে তাকিয়ে রইলো তার আহ্লাদী, অবুঝ লিলির পানে। হঠাৎ করেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো সে। বাহুতে শক্ত করে চেপে ধরে বললো,“বলেছি না, যা জানো না তা নিয়ে কথা বলবে না। এটা তোমাদের শহর না, গ্ৰাম। তোমার নিজের বাপই তো মাধ্যমিক শেষ করতে না করতেই তোমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল। কেন দিচ্ছিল? খরচ চালাতে পারছিল না বলে? নাকি ছেলের অর্থ সম্পদ দেখে? সেখানে আমার ভাই নিজের লেখাপড়া, শখ-আহ্লাদ সব মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে দিন-রাত ক্ষেতে খামারে কাজ করে আজ আমায় এতদূর এনে দাঁড় করিয়েছে।
আমার আব্বা ওই যে ওই মাটির ঘরে গত একুশ বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে। শত্রুরা তার এই অবস্থা করেছে। মা ছোটবেলায় আমাদের ফেলে চলে গেছে। আমার বয়স তখন সবে দুই, আর আমার ভাইয়ের পাঁচ। সেই ভাই বারো বছর বয়স থেকে কাজ করছে। দুদিনের মেয়ে এসে ভাইদের মধ্যে হিংসা ঢুকাতে চাইছো? আরেকবার এমন কথা বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে দেবো তোমার। আজকের এই অবস্থা তোমার জন্য। তুমি ফাঁসিয়েছো আমায়।”

লিলির চোখে অশ্রু জমেছে। ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে দিলো সে। নাক টেনে বললো,“এত বড়ো একটা কথা তুমি আমায় বলতে পারলে? আমি তোমায় ফাঁসিয়েছি? বাবা আসুক। চলে যাবো আমি।”

লিলি মেয়েটা আশ্চর্যজনক সুন্দর। ধবধবে ফর্সা না হলেও শরীরের গড়ন লাস্যময়ী। কথা বলার ঢং দেখে যে কেউ গলে যেতে বাধ্য। নওশাদও গলে গেলো। বুকে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। নিজের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। বড়ো ভাই তার উপর নারাজ। পরিবার থেকে শুরু করে গ্ৰামবাসী পর্যন্ত তাকে স্বার্থপর উপাধি দিচ্ছে। তারচেয়ে বড়ো বিষয় এখনো সে বেকার, লেখাপড়া শেষ হয়নি, চলতে হচ্ছে ভাইয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে। এখন কী করবে নওশাদ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড়ো ভাইয়ের মাধ্যমে লিলিকে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল নওশাদ। মেয়েটা চঞ্চল, চপলা কিশোরী। মাস দেড়েকের মধ্যেই নওশাদকে মন দিয়ে বসলো। নওশাদদের বংশীয় পুরুষদের চেহারায় ইরানি জৌলুস বিদ্যমান। চাচার থেকে শুনেছিল, তার কোনো এক পূর্ব পুরুষদের বাস ছিল সিলেটে। তাদের মধ্যেই কেউ একজন বাণিজ্য করতে ইরান গিয়ে বিয়ে করে এনেছিল অত্যন্ত রূপবতী ইরানি এক নারীকে। যা ধারা মোতাবেক প্রত্যেকের চেহারাতেই ছাপ ফেলে গিয়েছে। তবে তার দাদা কোনো এক দ্বন্দ্বের হাত থেকে বাঁচতে রক্তের মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে এসেছিলেন এতদূরে। সেই সৌন্দর্য আর ছেলেটার নম্র আচরণে মুগ্ধ হয়েছিল লিলি। নিজের সৌন্দর্য আর চঞ্চলতায় ফাঁসিয়েছিল নওশাদ নামক অল্প বয়সী যুবকটিকে।

এই যে বাবা তার বিয়ে ঠিক করেছিল নিজের এক ব্যারিস্টার বন্ধুর ছেলের সাথে। যে কিনা এখন কর্মরত বিদেশের কোনো এক কোম্পানিতে। বিয়ের পর লিলিকে সেখানেই নিয়ে যাওয়া হতো। অথচ বোকা মেয়ে প্রেমের টানে নয় বরং আবেগের ফাঁদে পড়ে কনের সাজেই পালিয়ে চলে এলো নওশাদের হলের সামনে। নাকের পানি, চোখের পানি এক করে কাজী অফিসে গিয়ে করে ফেলল বিয়ে। পছন্দ করলেও প্রেমের সম্পর্ক তাদের দুজনার মধ্যে কখনোই ছিল না। তবু শেষ মুহূর্তে নওশাদের উত্তর না হলেও লিলি ভয় দেখিয়ে বললো,“বিয়ে না করলে গলায় দড়ি দেবো আমি। চিঠিতে লিখে যাবো তোমার নাম। বাবা তোমায় ছাড়বে না, নওশাদ।”

নওশাদ ভয় পেলো। মেয়েদের ছলচাতুরীতে সে ভয় পায়। এবারেও পেলো। অচেনা শহরে এমন ঝামেলায় পড়লে কে বাঁচাবে তাকে? স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলে ভাই যে ভীষণ কষ্ট পাবে! তাই হাবাগোবা নওশাদ কিছু চিন্তা না করেই দিয়ে দিলো সেই ফাঁদে পা। মেয়েটাকে যে তার ভালো লাগে না এমন তো নয়। বেশ কয়েকবার প্রেমপত্রও বিনিময় হয়েছিল।

নাজির বহুদিন পর আজ সবজি ক্ষেতে এসেছে। ঝড়, বৃষ্টি আর ধানের কাজের চাপে এদিকে আসা হয়নি অনেকদিন। তার চাষাবাদ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজের সঙ্গী হচ্ছে মিল্টন। ছেলেটা সেই হাফ প্যান্ট পরার বয়স থেকে তার ন্যাওটা। এরপর সংসারের অভাবে বাবা ঘর থেকে বের করে দিয়ে বললো,“কাজ করে খা।”

ছেলেটাও চলে এলো শাহ বাড়িতে। তার বাবাও জীবিত থাকাকালীন এ বাড়িতেই রাখালের কাজ করেছেন। তখন নাজিরের ধান আর ফসলাদির জমি বেড়েছে। মাছ ধরতে গিয়েও বিশ্বস্ত একজন সঙ্গী লাগে। তাই মিল্টনকেই নিয়ে নিলো কাজে। সেই থেকেই মিল্টন কাজ করে তার অধীনে।

বেগুন গাছে পোকা ধরেছে। ঢেঁড়স, ডাটা গাছগুলো হেলে পড়েছে কিছুটা। মিল্টন গিয়েছে পোকার ওষুধ আনতে। নাজির বাঁশের ঝাড় থেকে বাঁশের কঞ্চি কেটে এনে এদিক ওদিক তাকাতেই দৃষ্টিগোচর হলো মেয়েলি অবয়‌ব। ফ্যালফ্যাল নয়নে ওপাশের জমিতে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নাজির কঞ্চিগুলো ঠিক মতো কাটতে কাটতে উঁচু স্বরে বললো,“কয়দিন ধইরা আশেপাশে তোরে একটু বেশিই দেখতাছি। ব্যাপার কী? এতদিন দেখি নাই ক্যান? বাপ কাশেম কই লুকাইয়া রাখছিল তোরে?”

মিছরি শান্ত মুখে উত্তর দিলো,“আমি বরিশাল থাকি।”

“ক্যান? বরিশালে কী?”

“আমার নানার বাড়ি।”

“কস কী! গোড়াতেই খেতার গাট্টি তোরা? এর লাইগাই কই তোর ভাইয়েরা এমন খারাপ ক্যান।”

চোখ ফিরিয়ে নিলো মিছরি। ইচ্ছে করল লোকটার চুল টেনে ছিঁড়ে দিতে কিন্তু বাবা যেখানে সেখানে বেশি কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন। মিছরি বাবার বাধ্যগত মেয়ে। নাজির তার রাগত মুখখানা দেখে চাপা হাসলো। রাগলে গোলগাল মুখখানা সুন্দর লাগে। ফের জিজ্ঞেস করল,“লেখাপড়া করোস?”

“হ্যাঁ।”

“কোন কেলাশ?”

“অষ্টম শ্রেণী।”

অবাক হলো নাজির। তা প্রকাশ করেই পাল্টা প্রশ্ন করল,“এক কেলাশে কয় বছর ধইরা পইড়া আছোস?”

মিছরি বুঝতে পারলো না প্রশ্নটা। তাকিয়ে রইলো অবুঝ দৃষ্টিতে। নাজির তা বুঝতে পারলো। তাই বললো,“জিগাইলাম কয়বার ফেইল মারছোস?”

“একবারও না। আমি খুব ভালো ছাত্রী। একবার বৃত্তিও পেয়েছিলাম। জেলা শহর থেকে পুরষ্কারও দিয়েছিল।”

“বাবাগো, তুই তো দেহি ল্যাদা পোলাপাইন! তবে দেখলে বুঝা যায় না। বয়সের তুলনায় বেশি লম্বা। তোর মায়ও লম্বা নাকি? বহু বছর দেহি না।”

মিছরি উপর নিচ মাথা নাড়ালো। তার নানা, মামারা অনেক লম্বা। মামা বর্তমানে জেনারেল আর্মি। মাও লম্বা। সেই বান পেয়েছে মিছরি আর তালেব। তবে মাসুম আবার পেয়েছে বাপ-চাচাদের বান। অতিরিক্ত লম্বা না। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই।

“তোরে যার তার লগে কথা কইতে নিষেধ করছিলাম না, মিছরি? এইদিকে আয়।”

মাসুমের হাতে কোদাল। ঝড়ে তাদের জমিতেও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষয়ক্ষতি গতকালই ঠিক করে ফেলেছে রুহুল আর সে। আজ এসেছে সম্ভবত কোনো সবজির বীজ বপন করতে। ভাইয়ের ডাকে মিছরি দৌড়ে গেলো তার কাছে। মাসুম প্রশ্ন ছুঁড়লো, “কী কয় ওই শয়তানের ভাইস্তা?”

“বরিশাইল্লা খেতার গাট্টি।”

মাসুম চোখমুখ কুঁচকে ব্যস্ত নাজিরের দিকে তাকালো। কঞ্চিগুলো গাছের সাথে বাঁধছে। ব্যঙ্গ করে চড়া গলায় বললো,“এইসব কামলার কথায় মন খারাপ করিস না রে, মিছরি। কামলারা কেমনে বুঝবো বরিশালের মজা?”

নাজির শব্দহীন হাসলো। নিজের কাজ জারি রেখেই বললো,“তাল মিছরির ভাই বুঝি ক্ষেতে মাটি খাইতে আইছে? নাকি মাইনষের ক্ষেতের সবজি চুরি করতে আইছে?”

খোঁচা দিতে গিয়ে নিজেই খোঁচা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাসুম। কিন্তু এভাবে তো আর শাহদের ছেলের কাছে হেরে চুপ থাকতে পারে না সে। তাই ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করল,“হুনলাম নওশাদ নাকি শহর থাইক্যা মাইয়া ভাগাইয়া আনছে?”

“ভাগাইয়া আনে আবার কেমনে? মাইয়া তো নিজে নিজেই আইয়া পড়ছে। যেই সুন্দর আমার ভাই! একদম আমার লাহান।”

শব্দ করে মাটিতে একদলা থুথু ফেলল মাসুম। হাসলো,“তুই সুন্দর, কালাচাঁন?”

নাজির ওর দিকে একপলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে স্থির করল মিছরির দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনার। জিজ্ঞেস করল,“তোর ভাই পাডার মতন হাসে ক্যান? আমি সুন্দর না? কালা মানুষ কী সুন্দর হইতে পারে না?”

ভড়কে গেলো মিছরি। অবুঝের মতো উপরনিচ মাথা নাড়াতেই তার সেই মাথায় চাটি মারলো মাসুম। ব্যথায় স্থানটি ঘষতে লাগলো মিছরি। নাজির এবার শব্দ করে হাসলো,“অজাতের বংশে বুদ্ধিমতী নারী কেমনে জন্মাইলো? তুই সৌন্দর্যের কদর করতে জানোস রে, তালমিছরি। তোর ভাইরে কইস এই রং রে কালা কয় না, এই রং রোদে খাইট্টা হইছে। পায়ের উপর পা তুইল্যা বাপের ঘাড়ে বইসা থাইক্যা না। আর তোর লাইগা আমগো গাছের তালের শাঁস ফিরি। যহন মন চাইবো লইয়া যাইস।”

মাসুম চোখ রাঙালো,“একদম যাবি না। কিছু দিলেও খাবি না। ওর স্বভাব ভালা না। শুধু ওর ক্যান? শাহ বংশের কোনো ব্যাডার স্বভাব ভালা না। তোর মিহি নজর পড়ছে ওর।”

“এই ল্যাদা মাইয়ার মিহি নাজির শাহর নজর পড়বো? দুনিয়াত কী মাইয়ার অভাব পড়ছে?”

“তো যাস না ক্যান? আনোস না ক্যান একটা মাইয়া? তোর আদরের ভাই তো তোর আগেই বিয়া কইরা ফেলাইছে। পুরা গেরামে এহন এই নিয়াই চর্চা চলতাছে।”

“ভাইয়ের বউ লাগবো তাই আনছে। একলা বিছানায় ঘুমাইতে পারে না। তোর বাপের কী? তোর আগেও তো তোর ছুডো ছুডো চাচতো বোইনের বিয়া হইছে, পোলাপাইন হইছে। তোর শরম লাগে না?”

“কার লগে কার তুলনা? মাইয়াগো বিয়া ডাঙর হইলেই হইয়া যায়। তোর ভাই একলা বিছানায় ঘুমাইতে পারে না, তুই পারোস?”

“হ, পারমু না ক্যান?”

“ক্যান, তোর সিস্টেমে গন্ডগোল আছে নাকি?” বলেই হাসলো মাসুম।

নাজির চোখমুখ কুঁচকে নিলো। বললো,“তোর বইন বিয়া দে। সামনের বছর তোর কোলে আমার লাহান সুন্দর একটা ভাইগ্না ধরাইয়া দিয়া না হয় বুঝাইয়া দিমু।”

“দ্যাখ মিছরি, দ্যাখ। কইছি না তোর মিহি নজর পড়ছে? আয় থুথু দিয়া দেই। বাড়িত গিয়া না হয় কালা ফোঁটা লাগাইয়া দিমু।”

“ভাব কী! এত সুন্দর জামাই পাইবো তোর বোইন?”

“অভাব পড়বো না। আর পড়লেও তোর মতো বয়স্ক ব্যাডার কাছে দিমু না। তোর পাশে কেমন লাগবো এই ছুডো মাইয়ারে? বাপ, ঝি।”

বিজয়ের হাসি হাসলো মাসুম। মিছরি বিরক্ত হচ্ছে এদের ঝগড়া দেখে। নাজির দমার মতো ছেলে নয়। মুখ বাঁকিয়ে বললো,“বয়স্ক কারে কস? সাতাইশ বছরের এক জোয়ান পোলারে তোর কাছে বয়স্ক মনে হয়?”

“সাতাইশ না, ভাইজান। ছাব্বিশ হইবো ছাব্বিশ। গত মাসে ছাব্বিশে পড়ছে।” মিল্টন ভুলটা ধরিয়ে দিলো। ভোঁতা মুখে তার দিকে তাকালো নাজির। কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি।

মাসুমের হাসিটা চওড়া হলো। বিদ্রুপ করে বললো, “কেমন মাতাল দেখছোস? দিনদুপুরে গাঞ্জা খাওয়া শুরু করলি কবেত্তে? নিজের বয়সও জানোস না?”

“গাঞ্জা তোর অজাত বংশ খায়। বয়স বাড়াইছি, তগো মতন কমাই নাই। তোর বড়ো ভাই তালেব যে কয়দিন আগে বিয়া করল? ওর বউ তো ফাহমিদার বয়সী। আর তালেব তো আমারও বড়ো। তহন বাপ, ঝি মনে হয় না?”

“দাদা, নাতনি লাগে। আমি কয়দিন আগে দেখলাম বউ লইয়া শ্বশুরবাড়ি যায়। আমার যে কী হাসি পাইছিল!”

বলতে বলতে হাসলো মিল্টন। নাজির সগর্বে কাঁধ চাপলো তার। তার সাথে থেকে থেকে ছেলেটা ভীষণ চালাক হয়ে গিয়েছে। কখন, কোথায়, কী বলতে হয় সব জানে। মাসুম ধমকালো,“নাজির শাহর চামচা! লুচ্চা বংশ।”

“আমগো তো তাও একটা বংশ আছে রে, মাসুম। যে কেউ এক নামে চিনবো। পাশের গেরামে গিয়া কাউরে শাহ বংশের কথা জিগাইলেও কইয়া দিবো। কিন্তু তগো কে চিনবো? তগো কোনো বংশ আছে? কে না কে কোন জন্মে মাস্টর আছিলো তাই কয় মাস্টর বাড়ি। কিন্তু ওই খাঁ গো এলাকায় গিয়া জিগাইলেই পাল্টা জিগাইবো, কোন মাস্টর বাড়ি? নামেরও একেকটা বাহার। কারো নামের পিছে মিয়া, কারোডায় আবার আলমসহ আরো কত কী! অজাত বংশ।”

অধরের হাসি মিলিয়ে গেলো মাসুমের। কোদালটা তুলে তেড়ে যেতে যেতে বললো,“ক্ষেতে আইয়া মাইরা থুইয়া যামু, জানোয়ার। অজাত কেডা? তোরা অজাত, লুচ্চা।”

“আয়, আমি কী বইয়া থাকমু? কাঁচি দিয়া পাড়ামু। তগো বাড়ির কোন মাইয়ার লগে লুচ্চামি করছি? আমরা শাহরা যদি ধরি তাইলে পারবি? ওই তো মোটে চাইর ভাই। আর আমরা হইলাম সাতজন। তার উপরে একেকজনের গায়ে গতরে যেই শক্তি!”

মিল্টন দাম্ভিক কণ্ঠে বলে উঠলো,“আমিও লগে আছি, ভাইজান।”

নাজিরের হাসি চওড়া হলো,“তাইলে মোট আটজন। আয় গোলামের পুত, আয়। দেই দুইডা। বহুদিন কাউরে পিডাই না।”

মাসুম সত্যি সত্যিই তেড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মিছরি তাকে টেনে ধরলো পেছন থেকে। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে ভীত হলো তার মেয়েলি মন। নাজিরের মতো মোটামুটি স্বাস্থ্যবান, উঁচা, লম্বা, ভারিক্কি পুরুষের সাথে পেরে ওঠার সম্ভাবনা হ্যাংলা পাতলা মাসুমের একার পক্ষে ক্ষীণ। তাই ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো,“তুমি ঝামেলা করলে কিন্তু আমি আব্বার কাছে বিচার দেবো, ছোটো ভাইজান। বাড়ি চলো।”

আদরের বোনের বাঁধায় থেমে গেলো মাসুম। শাসিয়ে বললো,“আমার বোইন না থাকলে আজ দুইডার অবস্থা খারাপ কইরা দিতাম। বাইচ্চা গেছোস।”

মিল্টন পেছন থেকে আগুনে ঘি ঢালার মতো করে বললো,“মুখেই শুধু ফটর ফটর।”

নাজির হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙিমা করে বললো,“বাদ দে, বল্টু। খুনির বংশধর।”

এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিল নাজিরের গায়ে আঘাত করার। কিন্তু মিছরির জন্য মাসুম তা পারলো না। দাঁতে দাঁত পিষে চোখের ইশারায় হুমকি দিয়ে স্থান ত্যাগ করল সে। এই কথা যে তালেব আর সুজনের কানেও যাবে তা নিশ্চিত। মিল্টনের হাত থেকে কিটনাশক নিয়ে গাছে ছিটাতে ছিটাতে প্রসঙ্গ বদলালো নাজির,“বাড়ির কী অবস্থা?”

“গেরামের মহিলা দিয়া ভইরা গেছে।”

“গোলামের ঝি গো কামই এইডা। ধর, প্রত্যেক গাছে ওষুধ মাইরা বাড়িত আয়। কঞ্চি আমি বাইন্ধা লাইছি।”

মিল্টনের হাতে কিটনাশকের বোতল দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো নাজির।

দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে বাড়িতে মহিলাদের আনাগোনাও বেড়েছে। সাথে আছে তাদের ছানাপোনারা। কিছু পুরুষও অবশ্য দেখা যাচ্ছে। ভেতরের দিকে উঁকিঝুঁকি মারছে। যেন এটা বাড়ি নয়, কোনো মাছের বাজার। লুঙ্গির এক পাশ উঁচু করে ধরে বাড়িতে প্রবেশ করল নাজির। ধমক দিয়ে বললো,“এইডা কী মাছের বাজার? নাকি সরকারি জায়গা? এত্ত ভিড় ক্যা?”

উঁকিঝুঁকি বন্ধ হয়ে গেলো পুরুষদের। মহিলারা ফিরে তাকালো। একজন বৃদ্ধা বলে উঠলেন,“তোর ভাই নাকি বউ আনছে?”

“আনলে আনছে, আমনের কী?”

“সমাজের ভালা পোলা জোয়ান মাইয়া লইয়া আইছে, দেখমু না?”

“আমনের পোলায় তো ঘরে বউ পোলাপাইন রাইখাই পরের বাড়ির মাইয়ার লগে পরকীয়া করতে গিয়া ধরা খাইছিলো। আমরা কোনোদিন দেখতে গেছিলাম?”

বৃদ্ধার মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো। এক লোক বললো,“বড়ো ভাইয়ের আগে বিয়া কইরা লাইছে অথচ কামাই করে না। এহন কী করবি?”

“বড়ো ভাইয়ের আগে বিয়া করা যাইবো না এই নিয়ম কোন গোলামের পুতে বানাইছে? যা করার আমরা করমু, আমনের কী? নিজেগো বাড়িত সমস্যার অভাব নাই, আর হেয় আইছে অন্যের বাড়িত চোরের মতন উঁকি মারতো। এই আমনে সালমা চাচীর পোলা কুদ্দুস না? আমনের মায় যে খাইতে না পাইয়া মাইনষের বাড়িত গিয়া কান্দে সেই খেয়াল আছে? মা, বউয়ের ঝামেলা মিটাইতে পারে না আবার আমগো জ্ঞান দিতে আইয়ে।”

কুদ্দুসও নুইয়ে নিলো মাথা। চোরা চোখে আশেপাশে তাকিয়ে ত্যাগ করল স্থান। নাজিরের মুখে লাগাম নেই। গ্ৰামবাসী খুব ভালো করেই তা জানে। মুখের উপর অপমান করে দেওয়ার কাজে সে ওস্তাদ। কার চরিত্রে কী দোষ আছে, কার বাড়িতে কী সমস্যা সব তার জানা। কলিমের মায়ের মাধ্যমেই খবর কান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পুনরায় গলা চড়িয়ে বললো,“আর কার কার বউ দেখার ইচ্ছা আছে? আমার সামনে আইয়েন। ভালা কইরা আজ বউ দেখাইয়া দিমু। সাথে কার লগে কার পরকীয়া চলে, পিরিত, ফষ্টিনষ্টি আর সংসারে অশান্তি চলে তাও ফাঁস কইরা দিমু। নিজের পুটকিত নয় মণ গু আর অন্যেরে কয় পুটকি ধো। আমার ভাই যদি বউ আনেও তাইলে কী তোরা খাওয়াবি?”

উপস্থিত সকলেই যেন আতঙ্কে জর্জরিত হয়ে গেলো। মুহূর্তেই যে যেভাবে এসেছে সেভাবেই বিভিন্ন কাজের বাহানা দিয়ে ত্যাগ করল স্থান। তারা যেতেই বিথী হাফ ছেড়ে বললো,“এইগুলার লাইগা শান্তি পাইতাছিলাম না। খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন। আমনের ভাই তো বাড়িত নাই। জাহিদরে কয়বার কইসি আমনেরে ডাইকা আনতো। আমনে ছাড়া হেগোরে আর কেউ তাড়াইতে পারবো না।”

নাজির বারান্দায় পিঁড়ি টেনে বসলো। নওশাদ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে ততক্ষণে। মানুষের জন্য বের হতে পারছিল না। নাজির তাকে দেখেও না দেখার ভান করে রইল। বিথীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“হেয় আবার কই গেছে? রাইতেও তো দেখলাম না।”

“ফিরে নাই। কয়দিন ধইরা অনেক ব্যস্ত। বন্দরে নাকি কীয়ের কাম আছে।”

“কাম! কই, আমি দেহি জানি না?”

“কী জানি? আমারে তো কয় না কিছু। আমনে আমনের ভাইরে জিগাইয়েন।”

নাজির তার বিপরীতে আর কিছু বললো না। শুধু নওশাদের উদ্দেশ্যে সম্বোধনহীন বললো,“আব্বার লগে যে দেহা করতে হইবো সেই শিক্ষা-দিক্ষাও খুওয়াইয়া আইছে নাকি? আব্বার যে পোলার লাইগা চিন্তা হয় হেইডা কেউ বুঝে না?”

নওশাদ বুঝলো তাকে উদ্দেশ্য করেই যে বলেছে। তাই দৃষ্টি নত করে সে বাবার ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো। যদিও বাবার সাথে দূরত্ব তার আকাশসম। লোকটার স্নেহ, ভালোবাসা বুঝতে সে অপারগ তবুও ভাইয়ের কথাতেই যা একটু দেখা করে।

চলবে _________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here