#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:০৭]
টানা সপ্তাহ খানেকের ঝড় বৃষ্টির পর ধরণীর বুকে দেখা মিলেছে উজ্জ্বল রোদের। কালো মেঘের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে নিজের আলো নিয়ে বেরিয়ে এসেছে তেজী সূর্য। প্রলয়কারী ঝড়ের দাপটে এই কয়েক দিনে তছনছ হয়ে গিয়েছে প্রাকৃতিক আর অপ্রাকৃতিক বিভিন্ন সম্পদ। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে বন্যা। ডুবে গিয়েছে বসতভিটা, ফসলি জমি, আর সোনালী ধানের ক্ষেত।
কেউ কেউ সমস্ত কিছু হারিয়ে ফেলছে চোখের পানি, আবার কারো বা ঘরে ঘরে খুশির জোয়ার। বহুদিন পর গোয়াল থেকে গরু, ছাগল বের করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ ঘাসে ভরা মাঠে। খোপ থেকে ছুটে বের হয়ে ভরা পুকুরে ডুব দিয়েছে হাঁসের দল। গোলা থেকে নামানো হয়েছে সেদ্ধ করা ভেজা ধান।
সামিউলের বউ বিথী আর মা ফরিদা সেই কাক ডাকা ভোরে উঠে পুরো উঠোন পরিষ্কার করে মেলে দিয়েছে ধান। বাড়ির পেছনের খলায় নাজিরের দ্বিতীয় দফায় কাটা ধানগুলো আপাতত সেদ্ধ করছে কলিমের মা। সাথে একজন মহিলাও আছে। নাজির তাদের থেকে কিছুটা দূরে বসা। বার্মিজ খেতে খেতে তদারকি করছে তাদের কাজ। কলিমের মাকে মোটেও বিশ্বাস করে না সে। হাত সাফাইয়ের স্বভাব আছে মহিলার। গত বছরও ধান সেদ্ধ করার সময় দশ কেজি মেরে দিয়েছিল। যা নাজির টের পেয়েছিল অনেক পরে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তখন কিছু বলতে পারেনি। তবে এবার সেই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে সে দেবে না। তাই এখানেই আসন পেতে বসেছে।
কলিমের মা চোরা দৃষ্টিতে কখন ধরে দেখছে তাকে। দানবের মতো বড়ো চুলার মুখে শুকনো পাতা গুঁজে দিয়ে বললেন,“তুই আবার এনে বইয়া রইছোস ক্যান? ভিতরে যা।”
“উঁহু, এনেই ভাল্লাগতাছে।”
“ক্যান?”
“মনের সুখে।”
“ঘাউড়া ব্যাডা মানুষ।”
নাজির শুনেও বিশেষ পাত্তা দিলো না। হাতের প্যাকেট কাঁচা মাটির রাস্তায় ফেলে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে আনলো গাছের নিচু ডাল থেকে একটি আধ পাকা আম। খেতে খেতে আবার বসে পড়ল। ধান সেদ্ধ শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। তার এই ক্ষেতেও গত বছরের তুলনায় চাষ এবার বেশি, ফলনও হয়েছে বেশি।
বিকেলের রোদে তেমন তেজ নেই। তাই নাজমুল আর মিল্টনকে নিয়ে পুরোনো ভিটের একটি ঘরের মধ্যেই ধানগুলো উঠিয়ে রাখলো নাজির। মাস দুয়েক আগেই মেঝে পাকা করেছে সে। নইলে গেছো ইঁদুরে গর্ত করে ধান নিয়ে যায় মাটির ভেতরে। মাটির বাড়িতে অবশ্য এই এক সমস্যা। ইঁদুরের উৎপাত থাকে একটু বেশি।
নিজের কাজকর্ম শেষ করে নাজির বারান্দায় বসে এক বাটি দুধের ভেতর বিস্কুটের মতো করে আনারস চুবিয়ে চুবিয়ে খাচ্ছে। ফরিদা তা দেখে ওখান থেকেই চেঁচালেন,“এই পোলাডারে লইয়া আমার যত জ্বালা। এই তুই দুধের লগে আনারস খাস ক্যান? মরার শখ জাগছে?”
“অনেক স্বাদ! খাইবেন?”
“দেখ নাজির, মেজাজ গরম করবি না কইয়া দিলাম।”
“আইচ্ছা।”
“যেকোনো একটা খা।”
“না, একলগেই খামু।”
“ঝাড়ু দিয়া বাড়ি দিমু দুইডা?”
“আমনের মির জাফর জামাইরে দেন।”
মর্জিনা ঘরের চৌকাঠে বসে মচকার সাহায্যে উকুন আনছেন মাথা থেকে। মুখ বাঁকিয়ে বললেন,“এই শাসন যদি ছুডো থাকতে করতা, বুবু! তাইলে আইজ এই দিন দেখা লাগতো না। যত রকমের ঘাউড়ামি আছে সব ওয় করবো। বামে যাইতে কইলে ডানে যাইবো। এক নম্বরের শয়তান।”
“আর আমনে এক নম্বরের ডাইনি।”
মুখে আনারসের বড়ো টুকরো নিয়েই বললো নাজির। সবসময়কার মতো এবারও মর্জিনা রেগে গেলেন। দূর থেকেই সর্বশক্তি দিয়ে চিরুনি ছুঁড়লেন। কিন্তু তা গায়ে লাগলো না নাজিরের। উঠোনের মাঝখানে এসে পড়ে গেলো। নাজির খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। এঁটো বাটি ধুয়ে ঘরে গিয়ে লুঙ্গি ছেড়ে পরিধান করল বাংলা প্যান্ট আর একটা ছাপা শার্ট। বোতাম লাগাতে লাগাতে বললো,“গত দশ বছর ধইরা দুধে আনারস চুবাইয়া খাই। কিছু হইছে? হয় নাই। শরীরের শক্তি আরো বাড়ছে। আমনেরও খাওয়া উচিত, মাজেদা চাচী। আমনের শরীরে শক্তি নাই। দেহেন না, একটা চিরুনিও নিশানা বরাবর লাগাইতে পারলেন না।”
মর্জিনা চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে রইলেন ভাসুরের ছেলের দিকে। যেন ভস্ম করে দেবেন মুহূর্তেই। নাজমুল বসে বসে মা আর চাচাতো ভাইয়ের ঝগড়া দেখছে। এদের ঝগড়া দেখতে তার ভালোই লাগে।
নাজিরের চিন্তা ছিল বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাজারের দিকে যাওয়া। এরপর ওখান থেকে বরশি আর জাল কিনে যাবে মাছ ধরতে। ঝড়ে বোধহয় বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মাছ এসেছে নদীতে। কিন্তু তার সেসব পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হলো না। হঠাৎ বাড়িতে প্রবেশ করল পরিচিত এক যুবক। নাজমুলের চোখেই পড়ল প্রথম। চমকিত স্বরে বললো,“নওশাদ না!”
তার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত বাক্যে সকলে ফিরে তাকালো সেদিকে। নাজিরও কৌতূহল নিয়ে তাকালো। প্রথমেই দৃষ্টিগোচর হলো ছোটো ভাইয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লাল শাড়ি পরিহিত এক রমণীকে। দৃষ্টি তার নত। হাতে কালো রঙের একটি ব্যাগ। নাজির জিজ্ঞেস করল,“কী রে, তুই? হঠাৎ? তোর না পরীক্ষা?”
মেয়েটির হাত ধরে বারান্দায় উঠে এলো নওশাদ। মুখশ্রীতে জমে আছে ঘাম। বড়ো ভাইয়ের দিকে সরাসরি চোখ তুলে তাকালো না সে। মিনমিনে স্বরে উত্তর দিলো,“শেষ।”
“লগে ওই মাইয়া কে?”
এবার আর তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো না ছেলেটা। হাত ছেড়ে দূরত্ব তৈরি করল মাঝখানে। হাতের উল্টো পিঠে ঘাম মুছে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো। বড়ো, ছোটো দুই চাচীই এখানে উপস্থিত। উপস্থিত বড়ো ভাবি, নাজমুল আর কলিমের মা। নাজমুল নওশাদের থেকে বয়সে মাস সাতেকের বড়ো। আর কলিমের মা! সে তো এই গ্ৰামের বিখ্যাত টেপ রেকর্ডার। এই বাড়ির খবর ওই বাড়ি পৌঁছে দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। এলাকার সব খবরাখবর তার কাছেই থাকে। ফরিদা এগিয়ে এসে নিকটে দাঁড়ালেন। তিনিও জিজ্ঞেস করলেন,“কেডা এই মাইয়া? চিনা চিনা তো লাগে না। কথা কস না ক্যান?”
নীরবতা ভাঙল নওশাদ। বড়ো ভাইকে সে ভীষণ ভয় পায়। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে তেমন করে কাছে পায়নি। বাবা তো বিছানাতেই পঙ্গু হয়ে পড়ে আছেন বহুদিন। তাই তার সেই শূন্যতা পূরণ করেছে বড়ো ভাই। সংসারের দায়িত্ব এবং নওশাদের পড়াশোনার যাবতীয় খরচও সে-ই বহন করেছে। তাই জীবনের সবচেয়ে বড়ো সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। নিচু স্বরে বলল,“ওর নাম লিলি। আমার স্ত্রী। গতকাল রাতেই কাজী অফিসে বিয়ে করেছি আমরা।”
মুহূর্তেই উপস্থিত মানুষগুলোর মুখভঙ্গি বদলে গেলো। মর্জিনা হায় হায় করে উঠলেন। শুধু চুপ রইলো নাজির। তার মুখখানায় স্পষ্ট অবিশ্বাস। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,“এই করতে শহরে পাঠাইছি?”
নওশাদ নিশ্চুপ। নাজির ফের বললো,“চেনা নাই জানা নাই, মাইয়ার বাপেও দিয়া দিলো বিয়া?”
“আমরা পালিয়ে বিয়ে করেছি। তাই তারা জানেন না।এছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না। ওর বাবা অন্য জায়গায় ওর বিয়ে ঠিক করে রেখেছিল।”
মর্জিনা রাগত স্বরে বললেন,“বেলাজ পোলা! বড়ো ভাই এহনো বিয়া শাদি না কইরা সংসারের ঘানি টানতাছে, আর হেয় বিয়া কইরা বউ আনছে বাড়িত। আবার তা সামনে দাঁড়াইয়া বড়াই কইরা কইতাছে!”
নাজির বিরক্ত হলো। বড়ো চাচীর উদ্দেশ্যে বললো, “বাপ, অভিভাবক ছাড়া যে কেমনে বিয়া হয় আমার জানা নাই। হেগো নিয়া ঘরে বসান। আমার মেলা কাম আছে, গেলাম।”
“এই অবস্থায় তুই আবার কই যাস? এত্ত বড়ো ঘটনার দফারফা করবি না?”
ফরিদা বললেন। মর্জিনা কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, “কীয়ের দফারফা? ঘাড় ধইরা বাহির কইরা দে এমন পোলা। নিজের নাই কিছু হেয় আবার বিয়া কইরা বউ আনছে।”
নাজির গুরুত্ব দিলো না এবারেও। বললো,“আমি বাহির করার কেডা? বাপের ভিটা, তাই তার অধিকার আছে। থাকুক। বিয়া যহন আমারে ছাড়াই করতে পারছে পরেরগুলাও আমারে ছাড়াই সামলাইতে পারবো। চাচারা আইলে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিতে কইয়েন।”
করুণ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে নওশাদ। যা ভেবেছিল তার কিছুই হলো না। ভাইয়ের এই শান্ত রূপে অবাকই হলো বলা যায়। কিন্তু নাজির সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে। যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব। অথচ তার বিস্ময় এখনো কাটেনি। যেই ভাইয়ের জন্য তার এতকিছু সেই ভাই কিনা বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাকে না জানিয়ে সেরে ফেলল? মানসম্মান ধূলোয় মিশিয়ে দেওয়ার মতো একটা কাজ করল? একুশ বছর আগের ঘটনাই এখনো গ্ৰামবাসী ভোলেনি। তার মধ্যে কিনা আবার আরেকটা! ছিঃ ছিঃ পড়ে যাবে সবাই জানলে।
ফরিদা নতুন বউকে নিয়ে পারভেজের ঘরে বসালেন। তাদের দালানে ঘর সংখ্যা মোট পাঁচটা। নওশাদ বসে রইলো বারান্দাতেই। তার ঘরটা বন্ধ পড়ে আছে। যখন সে আসে তখনই তালা খুলে কলিমের মাকে দিয়ে পরিষ্কার করানো হয়। ফরিদার থেকে চাবি পেয়ে নিজ কাজে লেগে পড়লেন কলিমের মা। দ্রুত কাজ শেষ করে গরম গরম খবরটা তো সবাইকে দিতে হবে নাকি!
ফরিদার ছেলে-মেয়ে তিনজন। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, আর ছেলেদের মধ্যে শুধু পারভেজই এখনো অবিবাহিত। মর্জিনার কোনো মেয়ে নেই। তাঁর তিনটা ছেলে। সবার বড়ো নাজমুল। তার জন্য আপাতত মেয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু কাউকেই মনে ধরে না মর্জিনার। শাহরিয়ারের বয়স বিশ, আর ছোটো ছেলে জাহিদের বয়স ষোলো। এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।
বিথী বিদ্রুপ করেই বললো,“কী সাহস গো মাইয়া তোমার! একেবারে বাড়ি থাইক্যা পলাইয়া অপরিচিত এক পোলারে বিয়া কইরা শহর ছাইড়া গেরামে আইয়া পড়ছো?”
লিলি চপল কণ্ঠে প্রতিবাদ করে বললো,“অপরিচিত নয়। নওশাদ আমার গৃহশিক্ষক ছিল। অংক পড়াতো।বাবা মেনে নিলে এভাবে পালাতে হতো না। ঝামেলা মিটলে আমরা আবার ঢাকায় ফিরে যাবো।”
কথাটা শুনে বিথী মুখে হাত চাপলো। নাটকীয় ভঙিতে বললো,“মাইয়া দেহি মুখে মুখে আবার চোপা করে গো, চাচী! লজিন মাস্টরের লগে শেষমেশ পলাইছো? ক্যান, বাপ-মায়ে শিখায় নাই, মাস্টর বাপের লাহান?”
লিলি এবার চোখ রাঙিয়ে তাকালো। মর্জিনা তার কথা আর চাহনি দেখে বুঝে গেলো, এই মেয়ে সহজ নয়। যে মেয়ে বাড়ি থেকে পালাতে পারে সে মেয়ে কখনোই সহজ হতে পারে না। ভালোই বিষ দাঁতওয়ালা মেয়ে শহর থেকে ধরে এনেছে নওশাদ।
________
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো। নাজির আর মাছ ধরতে গেলো না। জোরাজুরি করায় মিল্টনকে পাঠিয়ে দিলো। সাথে ঠেলে দিলো পারভেজকেও। সেদিন মাস্টার বাড়িতে ধরা পড়ার সেই ঘটনার পর থেকে বাপ, চাচার মুখোমুখি ছেলেটা হচ্ছে না। হাসপাতাল থেকে ফিরেই লুকিয়ে বাঁচছে। বাবার সামনে পড়লেই বাবা তাকে চ্যালা কাঠ দিয়ে যে পেটাবে তা সে জানে। তাই আজকে নাজির বলতেই সে চলে গেলো। রাতটা তো কাটিয়ে দেওয়ার মতো সুযোগ পেয়েছে!
নাজির হাটে গিয়েছিল। টর্চ জ্বালিয়ে হেঁটে আসার পথে সঙ্গি হলো প্রতিবেশী দাদার কুকুর বুস। নাজির জিজ্ঞেস করল,“এই রাইতের বেলা তুই আবার কই থাইক্যা ফিরতাছোস?”
বুস লেজ নাড়াতে নাড়াতে ঘ্যাউ ঘ্যাউ করে উঠলো। নাজির বিরক্তি প্রকাশ করে বললো,“তোর কথা আমি বুঝি না। ক্ষিরাই খাবি?”
শুধু লেজ নাড়ালো বুস। বাজার থেকে ফেরার পথে কিছু বাজার করেছে নাজির। যেমন: শসা, লতি, চাকা সাবান, আর তিন কেজি গরুর গোশত। বড়ো চাচীর ঘরে খেলেও নিজেদের বাজারটা সেই করে। বহু বছর আগেই চাচারা তাদের আলাদা করে দিয়েছেন। শুধু নিজেদের ভাগে নারী নেই বলে ফরিদা চাচীই দয়া করে এখনো রান্না করে খাওয়াচ্ছেন। পলিথিন থেকে একটা শসা বের করে বুসের মুখের সামনে ধরতেই বড়ো একটা কামড় দিয়ে তৃপ্তি সহকারে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে লাগলো বুস। ছোটো থেকে গৃহস্থ বাড়ি থাকার সুবাদে মানুষের মতোই সে সব কিছু খেয়ে অভ্যস্ত।
আরেকটু সামনে এগোতেই চায়ের দোকান থেকে ডাক পড়ল তার,“নাজির!”
নাজির থেমে দাঁড়ালো। তাকে থামতে দেখে বুসও থামলো। দোকান থেকে বেরিয়ে এলো এলাকার মতিন মিয়া। পরনে ছাপা লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবিতে পানের দাগ। বুক অবধি কাচা পাকা দাড়ি। বুড়ো আঙুল থেকে চুনটুকু জিভে লাগিয়ে নাজিরের পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন। জিজ্ঞেস করলেন,“বাজারে গেছিলি?”
“হ।”
“ক্ষিরাই কত কইরা নিছে?”
“পাঁচ ট্যাহা কেজি।”
“এইবার খেতে ক্ষিরাই চাষ করোস নাই?”
“না, গত বছর লস খাইছি। তাই এই বছর আর করি নাই। এহন দেহি ভালাই দাম উঠছে বাজারে।”
“গরুর গোশত কত কইরা কেজি?”
“মনে হয় আশি।”
নাজির তেমন আগ্ৰহ দেখালো না। কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বললো,“গলা ঝাইড়া কাশেন। কী কইবেন কন।”
“নওশাদ আইছে দেখলাম।”
“আমিও দেখছি।”
“লগে একটা মাইয়াও দেখছি।”
“ভালা করছেন।”
“কেডা ওই মাইয়া?”
“আত্মীয়।” মিথ্যে বললো নাজির। গ্ৰামের বেশিরভাগ বয়স্ক লোকই সুবিধার নয়। মতিন তো আরো নয়। যৌবনে এর চরিত্র বিশেষ ভালো ছিল না। নেশা পানি করতো। পুলিশেও নাকি একবার ধরেছিল। রাজাকার বংশের ছেলে। বয়স বাড়তেই টুপি, পাঞ্জাবি পরে ভালো সাজার ভং ধরেছে।
“কেমন আত্মীয় রে, নাজির?”
“আমনের জাইন্না কাম কী?”
“না, এমনি। জোয়ান একটা পোলায় গেরামে জোয়ান মাইয়া লইয়া ঢুকছে তাই জিগাইলাম।”
“আমনের থাইক্যাও বিচক্ষণ মুরুব্বি শাহ বংশে আছে। আমনের ভাবতে হইবো না। আমনের পোলারে নাকি কয়দিন আগে হিন্দুপাড়া থাইক্যা ধইরা পিডাইছিল?”
থতমত খেয়ে গেলেন লোকটা। আমতা আমতা করে বললেন,“মিছা কথা এইসব।”
“রাত হইছে, বাড়িত যাই। কাইল কথা হইবো।”
লোকটাকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বুসকে নিয়ে হেঁটে অন্ধকার পথে হারিয়ে গেলো নাজির। মতিন ভোঁতা মুখে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। বিড়বিড় করে কিছু হয়তো বললেনও। তারপর পুনরায় ফিরে গেলেন চায়ের দোকানের ভেতরে।
ছোটো ছেলে যে বউ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে সে কথা কান পর্যন্ত পৌঁছালো না সুবহান আলী শাহর। অকেজো হওয়ার পর থেকেই সংসারে, সমাজে তাঁর গুরুত্ব কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় নেমে গিয়েছে। এখন আর তাঁর উপস্থিতি কাউকে ভাবায় না। বরং মৃত্যুর দিন গুনে ভাইয়েরা। নওশাদও একবারের জন্যও বাবার ঘরে উঁকি দেয়নি। বাবার জন্য বরাবরই মায়া তার কম।
আমিরুল শাহ, মুমিনুল শাহ বাড়ি ফিরে সমস্ত ঘটনা শুনে নারাজ হয়েছেন ভীষণ। উঠোনে চেয়ার পেতে ছোটখাটো একটা পারিবারিক বৈঠক বসিয়েছেন। সেই বৈঠকে উপস্থিত হয়েছে নওশাদসহ তার সদ্য বিয়ে করে আনা বধূও। নাজির সদাই হাতে মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই গোল বৈঠক দৃষ্টিগোচর হলো। শুনতে পেলো আমিরুল শাহর রূষ্ট কণ্ঠ,“তোর থাইক্যা এমন কিছু আশা করি নাই, নওশাদ। কাউরে কিছু না জানাইয়া বিয়া কইরা বউ সমেত আইয়া পড়ছোস? এইডা শহর না, গেরাম। আমগো মান সম্মানের কথা ভাবলি না?”
ইতোমধ্যেই সমস্ত ঘটনা আবারো চাচাদের কাছে খুলে বলেছে নওশাদ। তবুও তারা বিরুদ্ধাচরণ করছেন। করাটা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। মুমিনুল শাহ দাঁড়িয়ে থাকা নাজিরকে দেখতে পেলেন। বড়ো ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,“ওই তো নাজির! এইদিকে আয়। দ্যাখ তোর ভাইয়ের কাম।”
সদাইয়ের থলেটা বিথীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে এসে চাচার মুখোমুখি চেয়ারে বসলো নাজির। তার মুখভঙ্গি পূর্বের মতোই শান্ত। অথচ বড়ো ভাই হিসেবে উচিত ছিল রেগেমেগে দুই চারটা থাপ্পড় বসানো নওশাদের গালে। কিন্তু তা সে করল না। বরং সর্বপ্রথম বিথীর উদ্দেশ্যে বললো,“গোশ আছে এই ব্যাগে। এহনি রাইন্ধা ফেলেন, ভাবি। বাড়িত নতুন মেহমান আইছে বইল্যা কথা!”
বিথী ঘর থেকে কুপি নিয়ে চলে গেলো রান্নাঘরে। আমিরুল শাহ মাথা নাড়িয়ে, মলিন মুখে বললেন,“বহু আগেই আমি কইছিলাম, পোলায় ম্যাট্রিক পাস করছে এবার ওরেও তোর লগে ক্ষেতে লইয়া যা, নাজির। বাপের এই হাল, তুই একলা ছুডো মানুষ কেমনে এরে লেখাপড়া করাবি? শহরে পড়তে কম ট্যাহা লাগে? কিন্তু তুই তা হুনলি না। ভাই, ভাই কইরা অর্ধেক জীবন শেষ করলি। দ্যাখ এহন তোর ভাইয়ের কাম। সকাল হইলে রাস্তায় বাহির হইতে পারবি? তোর মায়ের কাহিনী কিন্তু গেরামের মুরুব্বিরা এহনো ভুলে নাই।”
নাজির চুপ রইলো বেশ কিছুক্ষণ। আড়চোখে তাকালো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা নওশাদের পানে। এরপর জিজ্ঞেস করল,“কী রে, দাঁড়াইয়া থাকলে হইবো? চাচা গো প্রশ্নের উত্তর দে। শহরে কী পাঠাইছিলাম অন্যের বাড়ির মাইয়া ভাগাইয়া আনতে?”
“ভাই!” নওশাদের করুণ স্বর।
নাজিরের শান্ত মুখখানায় আচমকা রাগ এসে ভর করল। বৃষ্টি আসার আগ মুহূর্তে যেমন প্রকৃতির এক ভয়ংকর রূপ দেখা যায়? ঠিক তেমনই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। গর্জে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, “এই নষ্ট গেরাম থাইক্যা তাড়ানোর লাইগা লেখাপড়া শিইখা মানুষের মতন মানুষ হইতে, বড়ো আফিসার হইতে শহরে পাঠাইছিলাম। আর তুই ভালোবাসা বাসি করতে গেছোস?”
লিলি দ্রুত স্বামীর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালো।চোখেমুখে অসহ্য রকমের তেজ। দাঁতে দাঁত পিষে ক্ষুব্ধ স্বরে বললো,“একদম আমার স্বামীর দিকে তেড়ে আসবেন না। ফলাফল খুব খারাপ হবে।”
নারী হওয়ায় নাজির থেমে গেলো। পিছিয়ে গেলো দুই কদম। আশ্চর্য হলো ভীষণ। রাগ এখন তার তুঙ্গে। সেও ক্ষুব্ধ স্বরেই বললো,“স্বামী? দুইদিনের মাইয়া স্বামী মারাইতে আইছো? কত ট্যাহা পয়সা তোমার স্বামীর পিছনে খরচ করছি ধারণা আছে? সেই ট্যাহা পয়সা কই থাইক্যা আইছে, আছে কোনো ধারণা? জানো তোমার স্বামীর বংশ, বাপ-মা আর অতীতের খবর? দুর্দিনে পাশে না থাকা মাইনষেও সুখের দিনে আসে গলা বড়ো কইরা শিক্ষা দিতে।”
শেষ কথাটা যে চাচাদের উদ্দেশ্যেই খোঁচা মেরে নাজির বলেছে তা বুঝতে আর বাকি রইলো না উপস্থিত কারো। নওশাদ শক্ত হাতে লিলির বাহু চেপে সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে শাসালো,“বলেছি না পারিবারিক ব্যাপারে আসবে না? আমার বড়ো ভাই হয়, চাইলে আমার গায়ে হাত তুলে মেরেও ফেলতে পারে। সেখানে তোমার কথা বলার কোনো অধিকার নেই।”
লিলি আশ্চর্য হলো। বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রাগে ফুঁসলো। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ভীষণ অনুশোচনা হচ্ছে নওশাদের। কেন যে এমন একটি কাজ করার আগে ভাইকে একবার জানালো না? সে ফেঁসে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে লিলির চোখের পানিতে খুব বাজেভাবে ফেঁসে গিয়েছিল। কী করে তখন বাঁধা দিতো? মিনমিনে স্বরে বললো,“এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না, ভাই। চিঠি লিখতে বসলেও তোমার হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বহুদিন। তাই!”
নাজির আবার গিয়ে চেয়ারে বসলো। রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালালো। রাগলে ছেলেটার মাথা ঠিক থাকে না। সেই সম্পর্কে চাচারা অবগত। এই জন্যই ভাতিজার রাগকে ভয় পান তারা। তাই আর কথা না বাড়িয়ে মূল প্রসঙ্গে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “এইবার কী করবি, নাজির? আমরা এই বিয়া মানি না।”
“আমিও মানি না। মাইয়ার বাপ বাইচ্চা থাকতে তার অনুমতি ছাড়া বিয়া কেমনে হয়?”
“এহন উপায়?”
“আমনেরাই কন, বাড়ির কর্তা বইল্যা কথা।”
গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ালেন আমিরুল শাহ। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,“হুনো মাইয়া, তোমার বাপরে খবর দেও। না পারলে ঠিকানা লিইখ্যা দেও, আমরা লোক দিয়া খবর পাঠাই। আমগো বংশ খানদানি বংশ। দশ গেরামে বুক উঁচাইয়া চলি, এক নামে সবাই চিনে। তাই পলাইয়া করা বিয়া মানি না। আশা করি নওশাদও আমগো সিদ্ধান্ত মাইনা নিবো। যদি না বংশ থাইক্যা হেয় বাহির হইয়া যাইতে না চায়।”
নওশাদ একপলক বড়ো ভাইয়ের রাগী মুখখানা দেখে সায় জানালো,“আপত্তি নেই। আপনারা যা সিদ্ধান্ত নিবেন তাতেই আমি রাজি।”
লিলিকে তার মতামত জানানোর সুযোগ দেওয়া হলো না। বৈঠকের সমাপ্তিও সেখানেই ঘটলো। তারপর ওই রাতেই রান্নাবান্না হলো, খাওয়া-দাওয়া হলো, লিলিকে থাকতে দেওয়া হলো আমিরুল শাহর দালানের খালি পড়ে থাকা একটি ঘরে। ফরিদাও তার সাথেই রাতটা ওই ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর নওশাদ শুয়ে পড়ল নিজের ঘরে। বড়োরা বিয়েই যেখানে মানে না সেখানে বউ নিয়ে এক ঘরে থাকতে চাওয়া লজ্জার বিষয় বৈকি আরকিছু নয়।
চলবে_________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

