যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:০৬]

0
31

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:০৬]

আকাশটা মেঘলা। বাতাসের তান্ডবে উঁচু উঁচু গাছগুলো এদিক সেদিক দোল খাচ্ছে। চাঁদ, তারার অস্তিত্ব নেই আজ কোথাও। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, তবে বৃষ্টির থেকেও ক্ষণে ক্ষণে বাজ পড়ার শব্দটাই যেন বেশ তুখোড়।
শাহ বাড়ির রান্নাঘর আলাদা, তবে খাবার খাওয়ার জন্য আছে একটি নির্দিষ্ট ঘর। দিনের বেলায় বারান্দায় বসে খেলেও রাতে খাওয়া হয় সেখানেই। মর্জিনার ঘরে আজ আর রান্না হয়নি। বিকেলের সেই সাপের ভয়ে তার জ্বর হয়েছে। তাই ফরিদা আর বিথী মিলেই বাড়ির সবার জন্য রান্না করেছে। অনেকদিন পর আজ সবাই আবার একসঙ্গে খেতে বসার দৃশ্যটা দেখে ফরিদার চোখ দুটো যেন জুড়িয়ে গেলো।

শেষবার যখন সকলে একসঙ্গে খেতে বসেছিল তখন এই বাড়িতে মানুষে গিজগিজ করতো না। শ্বশুরমশাই তখনও বেঁচে ছিলেন। সুবহান আলী শাহ ছিলেন সুস্থ, সবল এক ব্যক্তি। সারাদিন কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। বাবার ব্যবসার দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধেই।আমিরুল শাহ আর মুমিনুল শাহ ছিলেন ভবঘুরে স্বভাবের। কীভাবে বাবার উপার্জিত অর্থ উড়িয়ে ফুর্তি করা যায়, সেটাই যেন ছিল তাদের প্রধান ভাবনা।

নাজিরের মা নাসরিন ছিলেন পাক্কা এক গৃহিণী। কার কখন কী লাগবে, কার কী প্রয়োজন সবই ছিল তাঁর নখদর্পণে। এসবের জন্যই শ্বশুর ফতেহ আলী শাহ মেজো ছেলের পাশাপাশি মেজো পুত্রবধূ নাসরিনকেও ভীষণ পছন্দ করতেন। যেন দু চোখের মণি সে। তবে জায়েদের মধ্যে অবশ্য এ নিয়ে হিংসার অন্ত ছিল না। কীভাবে তাকে অপদস্থ করা যায় সেই চক্রান্তে মশগুল থাকতো সারাক্ষণ।

মাস্টার বাড়ির সঙ্গেও তখন ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আকবর মিয়া তো প্রায় প্রতিদিন দুপুরের ভাতটাও শাহ বাড়িতেই খেতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই কী যে হয়ে গেলো! আচমকাই এক ঝড় এসে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিলো। নিস্তব্ধ দুপুরবেলায় ধানক্ষেতে খুন হলেন ফতেহ আলী শাহ। বিকেলের দিকে এক লোক মারফত বাড়িতে খবর এলো, ধানক্ষেতে পড়ে আছে তাঁর রক্তাক্ত দেহ। তার প্রায় মাস ছয়েক পর, এক রাতের আঁধারে নিখোঁজ হয়ে গেলেন নাসরিন। কেউ কিছু আঁচ পর্যন্ত করতে পারলো না। এই হাসিখুশি নারীটিই যে পালিয়ে গিয়েছে তা কী মোটেও বিশ্বাসযোগ্য? আর সেই ভোরবেলাতেই বিলের ধারে পাওয়া গেলো সুবহান আলী শাহর ক্ষতবিক্ষত, আহত দেহখানা। এবারো গ্রামের লোকজনই বড়ো, ছোটো দুই ভাইকে খবর দিয়ে সুবহানকে নিয়ে ভর্তি করালো জেলা শহরের হাসপাতালে। দুদিন পর সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যালে।

সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লেই ফরিদার শরীর কেঁপে ওঠে, লোমকূপ খাঁড়া হয়ে ওঠে। কতকিছু ঘটে গিয়েছে এই কয়েক বছরে! অথচ কী সুন্দর ছিল সেসব দিন! এখনকার মতো শাহ বাড়িতে এমন ইটের দালান ছিল না তখন। ছিল শুধু চারিদিকে মাটি আর ছনের ঘর।

“রান্না কিন্তু সেই স্বাদ হইছে, ভাবি। একেবারে পুরানা দিনের কথা মনে পইড়া গেলো।”

আঙুল চাটতে চাটতে বললেন মুমিনুল শাহ। ফরিদা লাজুক হাসলেন। আমিরুল শাহ সায় দিয়ে বললেন, “ঠিকই কইছোস। তা নদীর মাছ নাকি রে, নাজির?”

নাজির মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। সন্ধ্যায় ছাতা মাথায় দিয়ে চত্বর বাজারে দোকান খুলে বসা ডাক্তারের কাছ থেকে জ্বরের ওষুধ কিনে নিয়ে এসেছিল। শরীরে কাঁদা লেগে যাওয়ায় গোসল করে তারপর খেতে বসেছে সে। চুল থেকে এখনো এক দুই ফোঁটা পানি টুপটাপ গড়িয়ে পড়ছে। মাথা নাড়িয়ে বললো,“না, বেলাইয়ের ক্ষেতে পানি উঠছে। ওইখান থাইক্যা ধইরা আনছি।”

“এক পাতিল ভরছে?”

“শুধু কী এক পাতিল? মতিন চাচার ইয়া বড়ো টিনের বালতি পর্যন্ত পুরা ভইরা গেছে।”

“মাশাআল্লাহ!”

মুমিনুল শাহ বললেন,“তুই তোর চাচীরে হাপের ভয় দেখাইছোস? হাপটা নাকি বিশাল বড়ো আছিলো?”

“হাপ না, আমনের শ্বশুর আছিলো ওইডা। সাপের রূপ ধইরা পানিতে ভাসতাছিল, তাই লগে কইরা ধইরা আনছিলাম‌। কিন্তু আমনের বউ সবার সামনে বাপরে অস্বীকার করছে।”

“হতচ্ছাড়া, এই বুইড়া বয়সে আমারে বউ ছাড়া করতে চাস? ক্যান আমার বউডার পিছনে লাগোস, বাপ? বউ মরলে আমি আর বউ পামু কই?”

“দুনিয়াত কী বউয়ের অভাব? এই ডাইনি মরলে কচি একটা মাইয়ার লগে আমনের বিয়া পড়াইয়া দিমু। বুইড়া বয়সে শান্তি পাইবেন। কী রে শাহরিয়ার, নতুন মা চলবো না?”

শাহরিয়ার চুপচাপ খাচ্ছিলো। নাজিরের কথায় হেসে উঠলো শব্দহীন। বললো,“আমি আমার মা লইয়াই খুশি আছি। আব্বায় চাইলে আরেকটা বিয়া করতে পারে। আমগো অনুমতি আছে।”

মর্জিনা ছেলের পিঠে কিল বসিয়ে গর্জে উঠলেন,“দুই দুইটা হারামজাদা পালি বাড়িত। একটায় আমার জীবন ত্যানা ত্যানা কইরা আমার জামাইরে বিয়ার লোভ দেহায়, আর আরেকটা হইলো আমার পেডের। ওইডা আবার সহমত পোষণ করে। তিনবেলা থাপড়ান ছাড়া তোরা ভালা হইতি না, হারামজাদা।”

মুমিনুল শাহ নরম গলায় বললেন,“আহা, তুমি এমনে উত্তেজিত হইয়ো না তো। গলা ভাইঙা যাইবো। নেও, ভাত খাও।”

বিথী ভাত বেড়ে দিলো চাচী শাশুড়িকে। খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে নিলো নাজির। লুঙ্গির ভাঁজ থেকে ওষুধের পাতা বের করে চাচীর কোলে রেখে বললো, “নেন আমনের জ্বরের ওষুধ। ভাত খাওয়ার পর খাইবেন একটা, সকালে খাইবেন একটা। আল্লাহ চাইলে ঠিক হইয়া যাইবো।”

রাগ কিছুটা কমলো মর্জিনার। মনটা নরম হলো। কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ না করে ধমকালেন,“তুই এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজছোস আবার? তোর কাছে আমি ওষুধ চাইছি? ওষুধ ছাড়াই আমগো রোগ ভালা হয়।”

“একটু শোকরিয়া আদায় করেন। পরে মইরা গেলে তো আমনের বউ পাগলা জামাই কইবো, নাজির আমার বউডারে মাইরা ফেলাইছে। আমারে বিধবা বানাইছে। তহন কী হইবো আমার? পুলিশে তো কোমরে দড়ি বাইন্ধা জেলে লইয়া যাইবো। এইদিকে বিয়া শাদিও এহনো করি নাই।”

নিজের কথা শেষ করে নাজির উঠে চলে গেলো সেখান থেকে। মুমিনুল শাহ চেঁচালেন,“এই নাজির! চাচারে বউ পাগলা কইয়া গেলি তুই? বেয়াদব পোলা!”

নাজির শুনলো বোধহয় কিন্তু গুরুত্ব দিলো না। মর্জিনা ওষুধের পাতা হাতের মুঠোয় নিয়ে মুচকি হাসলেন। সামনাসামনি ঝগড়াঝাঁটি করলেও আড়ালে ঠিকই মা-ছেলের মতো মায়া মহব্বত আছে দুটোর।
_________

ঘটক লাল মিয়া ব্যস্ত মানুষ। ইউনিয়নের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ঘটক হিসেবেই তিনি পরিচিত। যেকোনো বাড়িতে বিয়ের বয়সী ছেলে-মেয়ে থাকলেই তার ডাক পড়ে সবার আগে। পাত্র-পাত্রী খুঁজে আনার কাজে তিনি এতই দক্ষ যে, চাহিদা মতো জোড়া মেলাতে পারেন চোখ বুজেই। এই যেমন, গতকাল মাস্টার বাড়িতে পাত্রদের তালিকা দেখিয়ে আজই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তাদের মধ্য থেকে একজনের পরিবার।

বাড়ির গৃহিণীরা অতিথি আপ্যায়নের আয়োজনে রান্নাঘরে ব্যস্ত। নজরুল আলম পাত্রপক্ষকে বসার ঘরে বসালেন। একটু পরে কাশেম আলী, আকবর মিয়া আর সৈয়দুন নেছা এসেও উপস্থিত হলেন সেখানে। বাড়ির সকল পুরুষ সদস্যকে একসঙ্গে পাওয়া যায় না বললেই চলে, আগেভাগেই কাজ ভাগ করে দেওয়া থাকে তাদের মধ্যে। যেমন, আজ নজরুল আলম আর কাশেম আলী দুই ভাই বাড়িতে থাকায় তাদের ছেলেরাই বাইরের কাজ সামলাচ্ছে।

পাত্রপক্ষ থেকে এসেছে মোট দশজন—ছেলে নিজে, তার মা, দুই ভাই, ভাবি, মামা-মামী, বড়ো চাচা ও চাচী। পাত্রের নাম বকুল। তার জীবনবৃত্তান্তসহ যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য ইতোমধ্যেই ঘটক লাল মিয়ার মাধ্যমে পেয়ে যাওয়ায় সে বিষয়ে আর কারো মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহ দেখা গেলো না।

সৌজন্য সাক্ষাৎ ও কিছু প্রাথমিক আলাপচারিতা শেষে ঘটক লাল মিয়া পাত্রপক্ষের উদ্দেশ্যে বললেন, “যা কইছিলাম, সব ঠিকঠাক মিললো তো?কইছিলাম না, মাইয়া একেবারে খানদানি বংশের। জমিজমা, ট্যাহা পয়সা, মানইজ্জত কোনো কিছুরই কমতি নাই। গেরামের যারে জিগাইবেন সে-ই কইবো, মাস্টার বাড়ির মাইয়া মানেই লাখে একটা।”

লাল মিয়ার কথায় আকবর মিয়া আর তার ছেলেরা সন্তুষ্ট হলেন। তাদের মুখের সেই সন্তুষ্টির আভাস দেখে ঘটকও মন থেকে খুশি হলেন। পাত্র-পাত্রীর বাড়ির লোকেরা যত সন্তুষ্ট ততই পারিশ্রমিক পাওয়া যায় বেশি। বকুলের বাবা না থাকায় তার মা-ই এবার মুখ খুললেন,“তা মাইয়া কই? নিয়া আসেন। একটু দেখি তারে।”

নজরুল আলম হাঁক ছাড়লেন,“মাইয়ারে নিয়া আসো, সুজনের মা।”

স্বামীর আদেশের অপেক্ষাতেই যেন এতক্ষণ ধরে বসে ছিলেন দিলারা বেগম। ফাহমিদার পরনে মায়ের কালো পাড়ের সবুজ একটি শাড়ি। চিন্তায় হাত-পায়ের তালু ঘেমে উঠেছে তার। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন পূর্বে কখনো হয়নি বলেই হয়তো এত জড়তা কাজ করছে। দিলারা বেগম মেয়ের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললেন,“হেরা যা জিজ্ঞাসা করবো তার সঠিক উত্তর দিবি, ঠিক আছে? বাপ, দাদার মানসম্মান যাতে একটুও নষ্ট না হয়। তোর দাদী ওইহানেই বইয়া আছে, তাই চিন্তা আর ভয়ের কোনো কারণ নাই।”

ফাহমিদা প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়ালো শুধু। কিন্তু চিন্তা বা ভয় কিছুতেই তাকে ছেড়ে গেলো না। মাথায় ঘোমটা টেনে হাতে চা, বিস্কুট, শরবতসহ পিঠার ট্রে ধরিয়ে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসার ঘরে হাজির হলেন দিলারা বেগম। বিনীত ভঙ্গিতে সবাইকে সালাম দিলো ফাহমিদা। যা শেখানো হয়েছে তাই করল। সামনের কাঠের টেবিলটায় রাখলো হাতে ধরে রাখা সেই ট্রে। শাশুড়ির ইশারায় দিলারা বেগম চলে এলেন ভেতরে। সৈয়দুন নেছা নাতনির উদ্দেশ্যে বললেন,“এইহানে আইয়া বস।”

ফাহমিদা নীরবে গিয়ে বসলো দাদীর পাশের ফাঁকা স্থানটিতে। বকুলের মা রোমেছা মেয়ের মুখপানে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন, “মাশাআল্লাহ! লাল মিয়া ভাইয়ের কাছে যতটা হুনছি তার থাইক্যাও সুন্দর আছে মাইয়া। তয় লেকাপড়া কতদূর? প্রাইমারির গন্ডি পারোইছে?”

আকবর মিয়া উত্তর দিলেন,“সামনের বছর ম্যাট্রিক দিবো।”

“মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ। আমার পোলায় সরকারি চাকরি করে। বড়ো আফিসার। বেতন ভালাই পায়। দুইজনরে মানাইবো ভালা।”

নজরুল আলম বললেন,“হ, লাল মিয়া কইছে।”

বকুলের মামী বললেন,“তা মা একটু হাঁইটা দেখাও দেহি। পা সোজা না ব্যাহা তা তো একটু দেইখা নিতে হয়।”

ফাহমিদা একবার বাবা তো আরেকবার দাদার দিকে তাকালো। দাদা, বাবার যদিও কথাটা পছন্দ হলো না তবুও চুপ রইলেন দুজনেই। এটাই সামাজিক নিয়ম। এভাবেই সব জায়গায় মেয়ে দেখা হয়। তাদের জন্য তো আর সেই নিয়ম কেউ ভাঙবে না, বরং ভাঙবে বিয়ে। তাদের বিয়ের সময়ও এমনই করেছে তাদের মা, চাচীরা। সৈয়দুন নেছা ফিসফিস করে বললেন, “যা হাঁইটা দেহা, বুবু। সোজা হাঁইটা একবার ওই দরজা পর্যন্ত যাবি, হেরপর আবার এইহানে আইয়া বইবি।”

দাদীর কথামতো তাই করল সে। বসা থেকে উঠে সোজা হেঁটে গেলো সদর দরজা পর্যন্ত। তারপর পুনরায় হেঁটে এসে পূর্বের স্থানে বসলো। মামী ফিসফিস করে কিছু বললেন হয়তো ননদকে। যা বাকিরা শুনতে পেলো না। বকুলের ছোটো ভাবি সাহেরা মুখ খুললেন এবার,“চুল কেমন লম্বা? ঘোমটা সরাও দেহি, বইন।”

বলে তিনি নিজেই হাত বাড়ালেন খোলার জন্য। এবার সৈয়দুন নেছা বাঁধা দিলেন। ভদ্র ভাষায় বললেন,“পর পুরুষের সামনে মাইয়া ঘোমটা খুলবো না। আমগো বাড়ির অনেক নিয়ম-কানুন আছে। তাছাড়া আমগো ধর্মেও চুল দেহানো জায়েজ না। মা, চাচীর থাইক্যা তো এইসব শিক্ষাই পাইয়া আইছি।”

“পরপুরুষ কেডা, চাচী? আমার ভাই, ভাসুর আর পোলারাই তো আছে। বিয়ার পর তো হেরাই মাইয়ার চাচা শ্বশুর, মামা শ্বশুর, দেওরা, ভাসুর হইবো।” মা রোমেছা বললেন কথাটা।

“আমগো সময় চাচা শ্বশুর, মামা শ্বশুরগো ভাইগনা বউয়ের মুখ দেহানই নিষেধ আছিলো। হেরা বাড়িত আইলে ঘরের এক কোণায় শাশুড়ির আদেশে পলাইয়া থাকতাম। হেরা গেলে হেরপর বাহির হইতাম। আর দেওর তো মরণের সমান।”

সাহেরা মুখ কালো করে বললেন,“তো মাইয়ার চুল দেখমু না? যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিয়া ঠিক করমু?”

“আমি কী নিষেধ করছি? দেখবা না ক্যান? অবশ্যই দেখবা। এইডা তুমগো অধিকার। তবে এনে না। দেখতে হইলে ভিতরের ঘরে আইয়ো।”

মহিলারা এবার যেন কিছুটা সন্তুষ্ট হলো। দিলারা এসে তাদেরকে নিয়ে গেলেন ফাহমিদার ঘরে। বাড়ির পুরুষেরা পাত্রপক্ষের পুরুষদের সাথেই বসে গল্প, আলোচনায় মেতে উঠলেন।

মিছরি আর পলি ওখানেই বিছানায় বসে ছিল। অপরিচিত রমণীদের দেখে চট করে উঠে দাঁড়ালো তারা। ঘর থেকে বের হতে যাবে তখনি খপ করে পলির হাতটা ধরে ফেললেন পাত্রের মামী। জিজ্ঞেস করলেন,“তুমার নাম কী?”

আচমকা হাত ধরায় অপ্রস্তুত হলো পলি। আমতা আমতা করে বললো,“পলি খাতুন।”

উত্তর পেয়ে হাসি চওড়া হলো মহিলার। দিলারার উদ্দেশ্যে বললেন,“আমনেগো বাড়িত তো দেহি অনেক সুন্দর সুন্দর মাইয়া আছে! আমার পোলার লাইগাও মাইয়া দেখতাছি। নিজেগো ক্ষেত, খামার আছে। বছরের ধান নিজেরাই কইরা খাই। পোলা আমার ভালা রোজগার করে।”

মিছরি মুখ টিপে হাসলো। পলি চোখ রাঙালো ননদকে। দিলারা থতমত খেলেন ঠিকই তবে নিজেকে মুহূর্তেই সামলে নিয়ে বললেন,“ওয় আমার দেওরার বড়ো পোলার বউ।”

হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা মলিন হয়ে গেলো মহিলার। হাতটা ছেড়ে দিয়ে জোরপূর্বক হেসে বললেন,“দেইখা বুঝাই যায় না মাইয়া যে বিয়াইত্তা।”

“আমগো বাড়ির বউগো বাড়ির মাইয়ার মতোই আদর যত্ন কইরা রাখা হয়। তার উপর বিয়ার মাত্র এক বছর হইছে, তাই বুঝা যায় না।”

তার নজর এবার গিয়ে স্থির হলো মিছরির দিকে। আঙুল তাক করে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“এইডাও কী বাড়ির বউ?”

“না, ওয় মাইয়া। দেওরার মাইয়া। বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে ছুডো মাইয়া।”

আরো কিছু হয়তো বলতে চাইলেন তিনি, কিন্তু তার আগেই দিলারা ইশারায় দুজনকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। চাচী শাশুড়ির ইশারা বুঝতে পেরে ননদকে নিয়ে বেরিয়ে এলো পলি। ফিসফিস করে বললো,“চলো পিছনের জানালার কাছে যাই।”

মিছরি না বুঝে প্রশ্ন করল,“কেন?”

“দেখবা না, কেমনে খুঁটাইয়া খুঁটাইয়া মাইয়া দেখে? চলো তাড়াতাড়ি।”

মিছরির অবশ্য নিজ থেকে যেতে হলো না। পলিই তাকে টেনে হেঁচড়ে নিজের সঙ্গে করে দাদার ঘরের পেছনের ফটক দিয়ে নিয়ে গেলো বাড়ির পেছনে ফাহমিদার ঘরের জানালায়।

ঘরের ভেতর ফাহমিদাকে পেয়ে নারীগুলো যেন হঠাৎই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠলো। শুধু উচ্ছৃঙ্খল নয়, বরং একে অভদ্রতাই বলা যায়। নারী হয়েও যারা অন্য নারীদের মানুষ না ভেবে পণ্যের চেয়েও নিচে নামিয়ে আনে, তাদের জন্য অভদ্র শব্দটাই যথার্থ। দোষ, গুণ, চরিত্র রেখে কেন একজন নারীর বুক, মুখ, চুল, হাঁটা-চলা যাচাই করতে হবে? এসবেরই বা প্রয়োজন কী? আর সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, তাদের মতো অমানুষদের কে দিলো একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের জন্য জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার? না, কেউ দেয়নি। বাঙালিদের এসব দেওয়ার দরকারও পড়ে না। তারা নিজেরাই অধিকার ছিনিয়ে নিতে ওস্তাদ। যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, হয়তো চলতেই থাকবে। তাই তো নারীর সংসার জীবন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুখকর হয় না।

সাহেরা সর্বপ্রথম পাত্রীর মাথা থেকে ঘোমটা সরিয়ে খোঁপা করা চুলগুলো এলোমেলো করে নেড়ে-চেড়ে দেখলো। সুযোগ পেয়ে অবশ্য হালকা টেনেও দিলো। যদি পরচুলা হয়ে থাকে? তবে তার সন্দেহ ভুল প্রমাণিত হলো। মেয়েটির চুল ঘন কালো, কোমর পর্যন্ত লম্বা। এতে সন্তুষ্ট হলেন তিনি। রোমেছা জিজ্ঞেস করলেন,“সংসারের কাম সব পারো তো নাকি? আমার বকুলের আবার রান্ধা ভালা হওয়া চাই। নুন, ঝাল কম বেশি হইলেই পোলার রাগ মাথায় উইডা যায়। একেবারে বাপের লাহান বদরাগী হইছে।”

বলেই হাসলেন তিনি। তার সাথে সায় দিলো জা আর দুই পুত্রবধূও। সৈয়দুন নেছা উঠে এসেছেন এক ফাঁকে। মহিলার কথা শুনে তিনিই উত্তর দিলেন, “টুকটাক পারে। আমগো আবার ভরা সংসার। সবাই এক লগে খায়। যতদিন বুড়া-বুড়ি বাইচ্চা আছি ততদিন এমনেই চলবো। পরে হেগো যা ইচ্ছা। তাই মাইয়ারা তেমন একটা পাকঘরে যায় না। দরকারও পড়ে না।”

সকলের দৃষ্টি বৃদ্ধার উপর গিয়ে স্থির হলো। বৃদ্ধা এসে পড়ার টেবিলের পাশের চেয়ারটিতে বসলেন। পুনরায় বললেন,“তোমরা শিখাইয়া পড়াইয়া না হয় নিবা।”

রোমেছা মাথা নাড়ালেন। তবে মুখ দেখে বুঝা গেলো, কথাটা হয়তো তেমন পছন্দ হয়নি তার। মেয়ে দেখা পর্ব শেষ করে ফাহমিদাকে ঘরে রেখেই বাইরে এলো সকলে।

মিছরি ভাবির উদ্দেশ্যে বললো,“মহিলাগুলো খুব বাজে। এভাবে কেউ মেয়ে দেখে?”

“এমনেই দেখে। আমারে যহন তোমার মা, চাচীরা দেখতে গেছিলো তহন হেরাও আমার হাঁটা দেখছে, চুল দেখছে। হুনছিলাম প্রথম দেহায় নাকি পছন্দ হয় নাই। বিয়া যে হইবো সেই আশাও আমার বাপে করে নাই। কিন্তু পরে নাকি তোমার ভাইয়ের জোরাজুরিতে বিয়াডা হইছে। প্রথম দেহায়ই রাক্ষসটা উষ্টা খাইয়া পড়ছে।”

“বলো কী? কথা সত্য?”

“তো কী মিছা? আমি তুমারে কহনো মিছা কইছি?”

“একদম না।” দুদিকে মাথা নাড়ালো মিছরি। ভাবির কথাই বিশ্বাস করে নিলো।

সমস্ত কথা শেষে বকুলের চাচা এবার তুললেন দেনা পাওনার কথা,“ভাইসাব, মাইয়ারে কিন্তু মাথা থাইক্যা পা পর্যন্ত সাজাইয়া গুছাইয়া দিতে হইবো কইলাম। পোলা আমগো লাখে একটা। কামাই ভালা। কত বড়ো বড়ো ঘর থাইক্যা যে প্রস্তাব আইতাছে! ঘর সাজানিও কিন্তু দিতে হইবো।”

কাশেম আলী প্রত্যুত্তরে বললেন,“এইডা আমনেরা না কইলেও আমরা ঠিকই দিতাম।”

ভাইয়ের সাথে সহমত পোষণ করলেন নজরুল আলম। লোকগুলো সরাসরি যে যৌতুক চাইছে তা সকলের কাছেই পরিষ্কার। যদিও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক তবুও সরাসরি চাওয়ায় আকবর মিয়া অসন্তুষ্ট হলেন। কথাবার্তা শেষ করে বিদায় জানালেন তাদের। পাকা কথা হলো না। ঘটককে দিয়ে পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে বলেছেন। তারা যেতেই আকবর মিয়া পুত্রদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন,“এই পোলা বাতিল। পরিবারে কোনো শৃঙ্খলা নাই। যেই সংসারের কর্তৃত্ব মাইয়া মাইনষের হাতে থাকে সেই সংসারে কহনো সুখ শান্তি থাহে না। তার উপরে আবার সরাসরি যৌতুক চায়। আমরা কী খালি হাতে মাইয়া পাঠামু?”

দুই পুত্রই বাবার কথায় একমত। নজরুল আলম জিজ্ঞেস করলেন,“তাইলে আব্বা, ঘটকরে কী কইয়া দিমু পরেরজনরে ডাকতো?”

“হ কইয়া দে।”

তারপর যে যার মতো চলে গেলো নিজ নিজ কাজে। ফাহমিদা মুখ ভার করে শাড়ি, চুড়ি খুলে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে শুয়ে পড়ল বিছানায়।

চলবে __________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here