যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:০৫]

0
30

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:০৫]

রাতের ঝড়ে কড়ই গাছের মোটা ডালটা ভেঙে পড়েছে নাজিরদের পুরোনো মাটির বাড়ির টিনের চালে। সাথে ভেঙেছে মর্জিনার মুরগির খোপটাও। বাইরে এখন বৃষ্টি না পড়লেও ঝড়ো হাওয়া থামেনি। সেই বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেই নতুন টিন কিনে এনে মিল্টনকে সঙ্গে নিয়ে চাল ঠিক করার কাজে নেমে পড়েছে নাজির। মুমিনুল শাহ দাওয়ায় বসে চা, মুড়ি খাচ্ছেন। খেতে খেতেই বললেন,“আর কয়দিন এই পুরান জিনিস মেরামত কইরা চলবি? নতুন ঘর তো দিছোতই।”

চালে কাঠ বাঁধছে নাজির, মিল্টন লাগাচ্ছে তারকাঁটা। কাজ করতে করতেই জবাব দিলো,“নতুর বাড়িত মাত্র দুইডা ঘর। নওশাদ আইলে থাকবো কই?”

“তাইলে আমগো মতো ইটের ঘর তোল।”

“ট্যাহা দেন।”

“তোর কী কম আছে?”

“আমনেগোও তো কম নাই। উল্টা আমার বাপের ভাগের জমিও নিছেন। দেন ট্যাহা। একেবারে ছাদ দিয়া বাড়ি করমু।”

“আমরা তোর বাপের ভাগের জমি নিছি?”

“তো কেডায় নিছে?”

“তোর বাপেরে গিয়া জিগা। তুই তো আবার সব কথাই বুঝোস।”

“আমি বুঝলেই হইবো কী? আইন আর চেয়ারম্যান তো বুঝবো না। বুঝতে পারলে এত খাটাখাটুনির দরকার পড়তো?”

কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে আর কেউটে বের করতে দিলেন না মুমিনুল শাহ। চায়ে শব্দ করে চুমুক দিয়ে বললেন, “কী আর কমু? শত্রুরা তো আর এমনি এমনি জিভ কাটে নাই। নিজে গো পাপ ঢাকার লাইগাই কাটছে।”

“হইছে, এক গান বারবার আর গাইতে হইবো না। দুই ভাই শাহ বংশের হইয়াও তো এত বছরে কোনো বাল ফালাইতে পারলেন না।”

বিপরীতে বলার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেলেন না লোকটা। থেমে গেলেন তাই। তারকাঁটা লাগাতে লাগাতে মিল্টন ফিসফিস করে বললো,“দেখছেন ভাইজান? উচিত কথা কইতেই থাইম্মা গেছে।”

নাজির হাসলো,“উচিত কথা বিষ রে বল্টু, বিষ। না কইলে মানুষ তোরে আধমরা গরু বানাইয়া শকুনের মতো খাবলাইয়া খাইবো। আর কইলে শত্রু বাড়বো।”

মিল্টন মাথা ঝাঁকালো। নাজিরের সমস্ত কথাই সে খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। নিজ জীবনে মেনে চলার চেষ্টা করে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চাল ঠিক করে নিচে নেমে এলো তারা। মর্জিনা দুপুরের ভাত রান্নার জন্য চাল ধুয়ে উনুন জ্বালাচ্ছেন। বৃষ্টিতে কিছুটা ভিজে যাওয়ায় জ্বালাতে বেগ পেতে হচ্ছে। দুই জায়ের রান্নাঘর আর ভাতের হাঁড়ি আবার আলাদা। তাই কাজ করতে করতেই তিনি বললেন,“আমার খোপটাও ঠিক কইরা দে, নাজির। রাইতে মুরগি রাখমু কই?”

“পারতাম না, নিজের পোলাগো কন গিয়া।”

“নিজের পোলা আর ভাসুরের পোলা আবার কী? তগো আলাদা দেখছি কহনো?”

“নাটক কম করেন, মাজেদা চাচী। সম্পত্তির বেলায় তো পেটের গুলানরেই ভাগ বাটোয়ারা কইরা দিবেন। ভাসুরের পোলার কথা তহন মনেও থাকবো না।”

মর্জিনা রাশভারী কণ্ঠে বললেন,“মাজেদা না, মর্জিনা আমার নাম। নিজের চাচীর নামডাই যেই পোলায় মনে রাখতে পারে না হেয় বাপ, চাচার বংশ আগাইয়া নিবো কেমনে?”

“যেমনে আমনের সোয়ামি নিতাছে।”

“দেখ নাজির কাইজ্জা করার ইচ্ছা নাই। খোপ ঠিক কইরা দে।”

“পারতাম না। শাহরিয়ার, নাজমুলরে কন গিয়া। এই সময়টুকু মিলে গিয়া বইয়া থাকলেও আমার লাভ। অনেক কাম পইড়া রইছে। যে কোনো সময় আবার বৃষ্টি নামবো।”

“কোনো কামের কথা কইলেই ঘাড়ত্যাড়ামি করে।”

“খোপ কিন্তু আমিই নিচা জমির মাটি আইন্না কইরা দিছিলাম, চাচী। হেডাম থাকলে এইবার পোলাগো দিয়া করাইয়া দেহান। পয়দা তো আর কম করেন নাই। একেবারে আট বছরে পরপর তিনডা।”

চোয়াল শক্ত করে চোখমুখ কুঁচকে নিলেন মর্জিনা। ঠোঁট নাড়িয়ে গালিও দিলেন বেশ কয়েকটা। পাছে যেন শুনতে না পায়‌। শুনলেই মহাবিপদ। তাল পাখার হাওয়ায় একপর্যায়ে হঠাৎ করেই জ্বলে উঠলো উনুনের আগুন।

চাঙের উপর ধানগুলো বস্তাবন্দি। রোদের অভাবে সিদ্ধ করা হয়নি। যেগুলো সিদ্ধ করে রোদে শুকানো হয়েছে সেগুলো ভাঙানো শেষ। নাজির ধান মিলে এসে প্রথমে তার ক্রয়কৃত ধানগুলোর একটা ব্যবস্থা করল।কর্মচারীদের দিয়ে গোছগাছ করিয়ে গুদামজাত করতে করতে একেবারে হয়ে গেলো বিকাল। তার মধ্যে অবশ্য গ্ৰামের বেশ কয়েকজন লোকও এসেছিল কিছু কাজে। কাজ তদারকি করতে করতে একসময় বিরক্ত হয়ে সে উঠে গেলো। বাকিটা ম্যানেজারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সোজা চলে এলো ধানক্ষেতে। এক রাতের বৃষ্টিতেই পানি জমে গিয়েছে বিভিন্ন ক্ষেতে। তার মধ্যে কিছু ক্ষেতে ধান কাটা শেষ আবার কিছু ক্ষেতে এখনো কাটা বাকি। যা এখন পানির মধ্যে বন্দি। আর দুদিন বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

মিল্টনকে দিয়ে বাড়ি থেকে পাতিল আর বাঁশ দিয়ে বাঁধা ছোট্ট জাল আনিয়ে ওই অবস্থাতেই লুঙ্গি কাছা দিয়ে মাছ ধরার কাজে লেগে পড়ল নাজির। বৃষ্টির পানিতে বিভিন্ন নদ-নদী থেকে প্রচুর মাছ ভেসে আসে জমিতে। পাঁচমেশালি মাছ নাজিরের ভীষণ পছন্দের।
জাল দিয়ে ক্ষ্যাপ দিতেই উঠে আসতে লাগলো বাইম, গুতুম, ট্যাংরা, মাগুর, পুটিসহ ছোটো ছোটো চিংড়ি মাছ। সেসব দেখে মিল্টনের আনন্দ যেন আর ধরে না। উৎফুল্ল হয়ে বললো“ভাইজান, পাতিল তো ভইরা গেছে!”

“কস কী!” নাজির ফিরে তাকালো মাছে কিলবিল করা পাতিলের দিকে। ফের জাল ফেলল হাঁটু পর্যন্ত পানিতে। আদেশের সুরে বললো,“মতিন চাচার কলপাড় থাইক্যা চুপিচুপি বালতি নিয়া আয়। আজ মাছ বেইচ্চা বড়লোক হইয়া যামু।”

“আমনে তো এমনিতেই বড়লোক, ভাইজান।”

“পাম দেইস না, বল্টু। যা দৌড়া।”

মিল্টন দৌড়ালো। ক্ষেতে দাঁড়ালেই স্পষ্ট দেখা যায় মতিন মিয়ার চৌচালার বাড়িটা। কিছুটা উঁচু স্থানে। বন্যা থেকে বাঁচতে বছর দশেক আগেই বাড়িটা করা হয়েছে। তাই টিনের চালায় তেমনভাবে জং ধরেনি এখনো। রোদের ঝিলিকে মাঝে মাঝে চকচক করে ওঠে চোখে লাগে।

মাছ ধরতে ধরতে হঠাৎ জালে উঠে এলো একটি সাপ। মোটাসোটা, ধূসর রঙের। ছোবল দেওয়ার জন্য জিভ বের করতেই নাজির শক্ত হাতে চেপে ধরলো সাপের মাথা। এসবে তার ভয় নেই। লেজ ধরে শরীরের সর্বশক্তি লাগিয়ে আছড়ে আছড়ে কত সাপ যে সে মেরেছে! বনে বাদারে ঘুরে বেড়ানো বন্যপ্রাণী নাজির শাহ। এসব ছোটখাটো বিষয়ে ভয় পেলে চলে?

মিল্টন বালতি এনে উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। সাপকে তেমন একটা ভয় না পেলেও সরাসরি এত বড়ো সাপ হাত দিয়ে ধরা তার পক্ষে অসম্ভব। দেখেই শরীরটা ভয়ে কেঁপে উঠলো।গলা উঁচিয়ে বললো,“হায় আল্লাহ। এত্ত বড়ো হাপ! ছোবল দিবো, ভাইজান। লাডি আনি? মাইরা ফেলান তাড়াতাড়ি।”

নাজির ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। চোখেমুখে দুষ্টুমি খেলা করছে। বললো,“তার নিকটীয় মানুষগো লগে দেখা না করাইয়াই মাইরা ফেলমু? তুই জাল ফেল। পুরা বালতি মাছ দিয়া ভইরা তারপর বাড়িত আইবি কইয়া দিলাম। আর পাতিলেরগুলা অর্ধেক তোর মায়ের কাছে দিয়া বাকি অর্ধেক আমার বড়ো চাচীর কাছে পাঠাইয়া দেইস।”

বলেই সে শরীর দুলিয়ে সাপের লেজ আর মাথা চেপে ধরে হাঁটা ধরলো কোথাও।
____________

মাস্টার বাড়ির উঠানটা বেশ বড়ো। তবে বৃষ্টির পানিতে সেখানে চিকচিক করছে কাঁদা। পা দিলেই ডেবে যাচ্ছে মাটি। তাই ঘটক লাল মিয়াকে বসানো হয়েছে বাড়ির বিশাল বারান্দায়। বাড়ির বারান্দাটা বাড়ির মতোই গোলাকার। গ্ৰীল দিয়ে চারপাশ আটকানো। মাঝামাঝি বড়ো একটা ফটক। পেছনেও অবশ্য একটা আছে।

পান চিবোতে চিবোতে লাল মিয়া ছাতায় ভর করে চারপাশ দেখছেন। ঠোঁট দুটো নামের মতোই লাল হয়ে আছে তাঁর। বাড়ির চৌকিদার জিন্নত আলী তাকে চা আর কিছু বিস্কুট দিয়ে গেলো। এর কিছুক্ষণ পরেই বাড়ির কর্তা আকবর মিয়া এসে বসলেন তাঁর সম্মুখে। একে একে এলেন সৈয়দুন নেছা, নজরুল। কাশেম আলী বাড়িতে নেই। সকালে ছেলেদের নিয়ে ধান ভাঙাতে গিয়েছেন।

আকবর মিয়া বাড়তি কথা বললেন না। সোজা চলে গেলেন মূল প্রসঙ্গে,“যেই কারণে তোমারে খবর দেওয়া হইছে। আমার নাতনির লাইগা ভালা ঘরের শিক্ষিত একটা পোলা লাগবো। নজরুল তো মনে হয় কইছেই সব।”

লাল মিয়া হাতের বিস্কুটটা আস্ত মুখে ঢুকিয়ে ঝোলা থেকে ছবি বের করলেন কয়েকটা। এগিয়ে দিয়ে বললেন,“হ কইছে। সেই অনুযায়ী খোঁজাখুঁজি কইরা এই পোলাগো সন্ধান পাইছি।”

আকবর মিয়া ছবিগুলো ধরলেন না। সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলেন পুত্র নজরুলের উপর। নজরুল আলম ছবিগুলো একটা একটা করে দেখছেন আর ঘটকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ছেন,“কে কী করে? পরিচয় কী? বাড়ি কই?”

“প্রথম ছবির পোলার নাম শামসুল। বাড়ি শহরে। বোন আছে চাইরটা তবে সবাই থাকে নিজেগো শ্বশুরবাড়ি। বাপ-মায়ের একমাত্র পোলা। পৌরসভায় চাকরি করে। তিন জনের সংসার তাগো।”

সৈয়দুন নেছা ছবিটা পুত্রের হাত থেকে নিয়ে নিলেন নিজের হাতে। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“এইডা বাতিল।”

নজরুল জিজ্ঞেস করলেন,“ক্যান ছুডো আম্মা? পোলা তো খারাপ না। একদিন আসুক, দেখি।”

“তুই ব্যাডা মানুষ, বুঝবি না। বাপ-মায়ের একমাত্র পোলা, বোইনগো একমাত্র ভাই। তাই হেগো আশা বেশি। ওই বাড়িত মাইয়া দেওন যাইবো না।”

“কী যে কন না চাচী? বোইনরা নিজেগো সংসারে ব্যস্ত। হেগো পোলাপাইনও আছে।” লাল মিয়া বললেন।

“আমারে শিখাইয়ো না, লাল মিয়া। এমন বহু দেখছি আমি। নিজের সংসার রাইখা ভাইয়ের সংসারে মাতব্বরি করে। আমার নাতনি সংসারের কুটকাচালি বুঝে না।”

নজরুল আলম মেনে নিলেন মায়ের কথা।বৃদ্ধা সম্পর্কে নজরুল আর কাশেমের সৎ মা। তাদের মা বহু বছর আগেই মারা গিয়েছেন। তারপর আকবর মিয়া বিয়ে করে ঘরে তুললেন তালাকপ্রাপ্তা, বন্ধ্যা সৈয়দুন নেছাকে। প্রথম প্রথম ছেলে-মেয়েরা তাকে মা হিসেবে না মেনে নিলেও তাঁর আচার, ব্যবহার, নমনীয়তা আর সংসারটাকে আগলে রাখার ধরণ দেখে একসময় ঠিক মেনে নিয়েছিল। সম্পর্ক এখন এমন হয়েছে যে, কেউ বুঝতেই পারে না তারা যে সৎ মা-ছেলে।

পরের ছবিগুলো দেখিয়ে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন নজরুল আলম। লাল মিয়া একে একে উত্তর দিলেন, “দুই নম্বরটার নাম রেজওয়ান। পুলিশের চাকরি করে। তিন ভাই, কিন্তু বোন নাই। তিন নম্বরটা বকুল । পোস্ট আফিসের বড়ো সরকারি আফিসার। বাপ নাই। দুই ভাই, এক বোইন। তবে বোইন থাকে জামাইয়ের লগে বগুড়া। ভাইয়ের সংসার আলাদা। হেয় ছুডো পোলা। মায় হের লগেই থাহে। আমারে কইলো একটা ভালা দেইখা সংসারী মাইয়া খুঁইজা দিতে। তহনি আমগো ফাহমিদার কথা মনে পড়ল। চাইর নম্বরটা মাহমুদ। হের বাড়ি আবার আমগো পাশের ইউনিয়নে। ইশকুলের অংকের মাস্টার। বাপ-মা, ভাই লইয়া একান্নবর্তী গৃহস্থ পরিবার। জায়গা জমির কোনো অভাব নাই।”

নাজমুল আলম সন্তুষ্ট চিত্তে মাথা নাড়িয়ে বললেন, “বকুল আর মাহমুদের পরিবাররে আলাদা আলাদা দিন আইতে কও। দেখি, কথা কই তারপর যারে বেশি ভালো লাগবো তার লগেই না হয় শুভ কাম সম্পন্ন হইবো।”

“পাঁচ নম্বরটাও হুনেন। ওইডার নাম কাজল। পেশায় মস্ত বড়ো ডাক্তর। এলাকায় এক নামে পরিচিত।”

আকবর মিয়া হাস্যোজ্জ্বল মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “কীসের ডাক্তর?”

“পশুর ডাক্তর। এলাকার সব গরু, ছাগলের চিকিৎসা হেয়ই করে। রোজগার ভালা।”

সৈয়দুন নেছা মুখ বাঁকিয়ে অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বললেন, “কিহ! পশুর ডাক্তর? ভাবলা কেমনে আমার নাতনিরে এমন এক পোলার লগে বিয়া দিমু? নামডাও তো মাইয়াগো।”

ভড়কে গেলেন ঘটক লাল মিয়া। ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে প্রসঙ্গ বদলাতে চাইলেন।

মিছরি আর পলি জানালায় উঁকি দিয়ে তাদের দেখছে আর সমস্ত কথা শুনছে। পলি ফিসফিস করে বললো, “দেখছো, পানের লগে ব্যাডায় আবার বিস্কুট খায়।”

“অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের দাদীও খায়।”

“তোমার কী মনে হয়? ফাহমিদার লগে কারে বেশি মানাইবো?”

“পশুর ডাক্তাররে।”

ফিক করে হেসে দিলো পলি। মিছরি দ্রুত তার মুখ চেপে ধরে টেনে আনলো জানালার কাছ থেকে। স্বর নিচু করে বললো,“বড়ো ভাইয়ের ধমক খেতে মন চাচ্ছে? জোরে হাসো কেন?”

“তোমার ভাই একটা রাক্ষস। এমনিতেই খালি ধমকায়। আব্বায় যে ক্যান এমন এক ব্যাডার লগে বিয়া দিলো? সামলাইতে পারি না।”

“কথা বলবো ভাইয়ের সঙ্গে? বলবো, অন্য জায়গায় তোমারে বিয়ে দিয়ে দিতে?”

“হায় আল্লাহ! মাইয়া কী কয়? এমনে ভাইয়ের সংসার ভাঙতে চাও?”

“তুমিই তো বললে আমার ভাই রাক্ষস।”

“ভুল কী কইছি?”

তালেব বাড়িতে এসে বারান্দা থেকে গামছাটা নিয়েই কলপাড় থেকে গোসল সেরে ঘরের সামনে এসে সবে দাঁড়িয়েছে। স্ত্রী আর বোনের শেষ কথাটা শুনেই তার ভ্রু দুটো কুঁচকে গেলো। পর্দা সরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,“কেডায় রাক্ষস? আমি?”

ননদ, ভাবি দুজনেই লাফিয়ে উঠলো ভয়ে। মিছরি তার বাহুতে খোঁচা মেরে দৌড়ে ভাইকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে বললো,“আমি না, ভাবি বলেছে।”

পলির বুকটা ধক করে উঠলো। শাড়ির আঁচল মুঠোয় নিয়ে পালানোর পথ খুঁজলো। কিন্তু যাওয়ার আগেই তাকে খপ করে ধরে ফেলল তালেব। ভেজা চুলের পানি তার দিকে ছিটিয়ে দিয়ে বললো,“রাইতটা আইতে দেও। রাক্ষস কারে কয় বুঝামু।”

পলি ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। আজ রাতে আর ঘরে আসা যাবে না। কিছুতেই না।
________

দুপুরের রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া শেষে বাড়ির নারীরা বিকেলে বারান্দায় বসে গল্প করছে। সামিউলের বউ বিথী নিজের সাড়ে তিন বছরের ছেলে আব্দুল্লাহর পেছনে ভাত নিয়ে ছুটছে। নাজির বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। তাদের বাড়ির চারিদিক জুড়ে ইটের প্রাচীর তোলা। প্রতিবেশীর সঙ্গে মুরগি আর ছাগল নিয়ে চুলাচুলির মতো ঝগড়া হওয়ায় আমিরুল শাহ তার পরেরদিনই কাজটা করেছিলেন।

নাজিরকে দেখে আব্দুল্লাহ থেমে দাঁড়ালো। হেসে এগিয়ে এসে ডাকলো,“নাদি তাতা!”

নাজির ধমকালো,“পুসকুনিত নিয়া চুবামু তোরে। নামের পিন্ডি চটকাস ক্যান, গোলামের পুত? তোর মায় তোরে শেখায় না কিছু?”

বিথীও ছেলের পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে। চোখ তুলে নাজিরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো ঘাড়ে বিশাল বড়ো একটি সাপ ঝুলছে। তৎক্ষণাৎ হাত থেকে বাংলা ছবির মতো ভাতের থালাটা পড়ে গেলো মাটিতে। দেহের সর্বশক্তি দিয়ে সে চেঁচিয়ে উঠলো,“হাপ! হাপ!”

নাজিরের মুখ বেজার হলো। শাসন করার ভঙিতে বললো,“চিল্লাইয়েন না তো, ভাবি। হাপ আবার কী? এইডা হইলো আমনের চাচতো নানা শ্বশুর। বহুদিন পর দেখা পাইছি। তাই বাড়িত লইয়া আইলাম দাওয়াত খাওয়াইতে। তা হের মাইয়াডা কই? ডাকেন। বাপেরে দেখলে খুশি হইবো।”

সেকথা বিথীর শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছালো বলে মনে হলো না। ছেলেকে রেখেই সে দৌড়ালো ঘরে। নাজির মুখ ভার করে ভাতিজার দিকে তাকিয়ে বললো, “নিজে বাঁচলে বাপের নাম প্রবাদটা সত্য হইয়া গেলো। দেখ তোর মায় তোরে রাইখা পলাইছে।”

আব্দুল্লাহ কী বুঝলো কে জানে? শুধু হাসলো। বিথীর চিৎকারে বারান্দা থেকে উঠে এসেছে মর্জিনা।

“এই ছেরি আবার চিল্লান মারলো ক্যা?”

কর্কশ কণ্ঠে কথাটা বলতে বলতে সামনে তাকাতেই তিনিও লাফিয়ে উঠলেন। নাজির খুশি হলো। এগোতে এগোতে বললো,“আমনের আব্বারে লইয়া আইলাম, চাচী। নেন ধরেন।”

“ও মা গো! এইডা কী? ও বুবু গো!”

“হায় আল্লাহ! চিনতে পারতাছেন না? আমনের আব্বা।”

“হারামজাদা! থাপড়ামু তোরে। মার, মার। নাজমুল, ও নাজমুল!”

নাজির সাপের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ ভার করে বললো,“এইডা কেমন মাইয়া পয়দা করলেন, চাচতো নানা? মাইয়া তো আমনেরে চিনে না।”

বলতে বলতে সে এগিয়ে গেলো মর্জিনার দিকে। মর্জিনা ভয় পেলো। নাজিরকে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাদের বনেও না তেমন। সারাক্ষণ দুটোতে শত্রুর মতো ঠুকরাঠুকরি করে। তার উপর সাপকে ভীষণ ভয় পান ভদ্রমহিলা। তাই দুই হাতে শাড়ি ধরে তিনি ছুটলেন। ছুটতে ছুটতে একবার এই মাথা তো আরেকবার ওই মাথা যাচ্ছেন। নাজিরও তাঁর পিছু ছুটছে আর বলছে,“এমনে দৌড় দিয়েন না, প্রাণের চাচী। বাপটারে ধরেন, দুধ খাইতে দেন। সকাল থাইক্যা না খাওয়া।”

“দূর হ, নাজির। দূর হ। এইডা আমার বাপ না। ও শাহরিয়ার রে! দেখ, নাজির পাগল হইয়া গেছে! তোর মায়রে মাইরা ফেলতে চাইতাছে।”

“ছিঃ, ছিঃ, কী কন, প্রাণের চাচী? আমনে মইরা গেলে আমি কী নিয়া বাঁচমু?”

চিৎকার চেঁচামেচিতে ফরিদাও উঠে এলেন। তিনি ঘরে ছিলেন এতক্ষণ। দুজনের কান্ড দেখে ধমকালেন,“এই নাজির! এইগুলা কী শুরু করছোস? এইডা তো দাঁড়াইশ হাপ! ছোবল দিবো। মার এইডা।”

“দেহো বুবু, দেহো। আমার পিছনে কেমনে লাগছে।”

দৌড়াতে দৌড়াতে ফরিদার পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়লেন মর্জিনা। ভয়ের চোটে কাঁদছেন তিনি। নাজির আর এগোলো না সামনে। শাহ বাড়ির ভেতরে একমাত্র ফরিদাকেই সে মান্য করে চলে। ছোটবেলায় যখন মা তাদের দুই ভাইকে ফেলে রেখে রাতের আঁধারে পরপুরুষের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিল তখন এই ফরিদা চাচীই তাদের তুলে নিয়েছিল নিজের কোলে। এরপর মায়ের আদর দিয়ে এত বড়ো করেছে। এখনো রান্না করে খাওয়ায়। তাই ফরিদার কথা শুনলো সে। দেহের সর্বশক্তি দিয়ে সাপের লেজ ধরে ইচ্ছেমতো মাটিতে আছাড় মারলো বেশ কয়েকবার। তাতেই চিৎপটাং।

ধীরে ধীরে বিথীও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ফরিদার আদেশে পানি এনে চাচী শাশুড়ির মুখের সামনে ধরলো। মর্জিনার দম আটকে গিয়েছে। হাঁপাচ্ছেন তিনি। হাঁপাতে হাঁপাতেই পানি পান করলেন। ফরিদা ফের ধমকালেন,“তোর আক্কেল গুড়ুম কী লোপ পাইছে? চাচীর লগে এমন কেউ করে? যদি কিছু হইয়া যাইতো?”

“কী হইবো? বাপ কী মাইয়ার ক্ষতি করে কহনো?”

মর্জিনা চেঁচিয়ে উঠলেন,“আরেকবার যদি আমার বাপজানরে হাপের লগে তুলনা দেস, নাজির!”

“তুলনা দিমু ক্যান? হেয় তো হাপই।”

“নাজির!”

নাজির দাঁত বের করে হাসলো। তখনি মিল্টন এলো বাড়িতে। মাছের পাতিলটা ফরিদার হাতে দিয়ে বললো,“এইগুলা নাজির ভাইজান ধরছে।”

ফরিদার মন লাফিয়ে উঠলো খুশিতে। পাঁচমেশালি মাছ তাঁরও ভীষণ পছন্দের। নাজির কলপাড় যেতে যেতে বললো,“রাইতে মাছ দিয়া ভাত খামু কিন্তু, চাচী। বেশি বেশি পেঁয়াজ দিয়া ভাজা ভাজা কইরা ফেলবেন।”

ফরিদা সায় জানিয়ে বঁটি নিয়ে চলে গেলেন রান্নাঘরের দিকে। মর্জিনা চলে গেলেন ঘরে। মাথাটা ঘুরছে।

চলবে _________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here