#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:০৪]
মাঠ জুড়ে রোদে শুকাতে দেওয়া ধানগুলো আচমকাই ঝড়ো হাওয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার হয়ে উঠলো। নীলিমা জুড়ে দেখা মিললো ধূসর বর্ণের মেঘদলের। সপ্তাহ জুড়ে চলমান তীব্র তাপদাহ বিলীন হয়ে হঠাৎ ধরণীতে ভূপাতিত হলো কালবৈশাখী ঝড়। তৎক্ষণাৎ হাতের কাজ ফেলে কর্তাদের সঙ্গে মাঠের ধান ঘরে তুলতে বাড়ির গৃহিণীরাও ছুটলো। ভয়ংকর শব্দে গর্জে উঠলো আকাশ। কিছু কিছু জমিতে এখনো ধান কাটা বাকি। মুজুরেরা দ্রুত হাত চালালো। রাস্তায় মেলে দেওয়া খড়কুটো তুলে পুরুষেরা নেমে পড়ল মাচা তৈরির কাজে।
তবে এতকিছুর মধ্যেও অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েদের যেন তাতে কিছুই আসে যায় না। তাদের লোভাতুর দৃষ্টি শুধু গাছ ভর্তি কাঁচা আমের উপর। বাতাসের তোড়ে মাটিতে পড়লেই যেন শিকারি পাখির মতো লুফে নেবে তা।
নাজির শাহ বসে আছে বট গাছের নিচে। হাতে ধরা পুরোনো আমলের রেডিও থেকে ভেসে আসছে ঝড়ের পূর্বাভাস। খবরের মাঝখানেই ঝট করে রেডিওর শব্দ থেমে গেলো। ব্যাটারি শেষ নাকি বাতাসে বেতার তরঙ্গ উধাও, বুঝা গেলো না। কিন্তু তাতে নাজিরের ভাবনার রেশ কাটলো না। মহুয়ার গানের একচিলতে সুর মস্তিষ্ক জুড়ে ভাসতে লাগলো। ধীরে ধীরে ঠোঁটের ডগায় উঠে এলো সেই গান—
‘পূবেতে বন্দনা করলাম পূবের ভানুশ্বর।
এক দিকে উদয় রে ভানু চৌদিকে পশর॥
দক্ষিণে বন্দনা গো করলাম ক্ষীর নদী সাগর।
যেখানে বানিজ্জি করে চান্দ সদাগর॥
উত্তরে বন্দনা গো করলাম কৈলাস পর্বত।
যেখানে পড়িয়া গো আছে আলীর মালামের পাথ্থর॥’
এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়ছে এখন। দূরের কোনো গৃহস্থালি বাড়ি থেকে ভেসে আসছে হাঁসের প্যাক প্যাক শব্দ। আকাশের গর্জনের তালে তালে গর্জে উঠছে গোয়ালের গরুও। হাম্বা হাম্বা শব্দে চট করে উঠে দাঁড়ালো নাজির। দুধ ধোয়াতে আজ ভুলে গিয়েছে বেচারা। তখনি পথে দেখা হলো সেলিম মোল্লার সঙ্গে। বয়স্ক দেহের চামড়া ভেদ করে হাড়গোড় যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। হন্তদন্ত পা ফেলে যেতে যেতে বললো,“ধানের কাম কতদূর, নাজির? এত শান্ত হইয়া ঘুইরা বেড়াইতাছোস কেমনে?”
“পুরাপুরি শেষ হয় নাই। প্রথম দফা শেষ কইরা দ্বিতীয় দফারটা আজ সকালে কাটা শেষ করছি। এর মধ্যেই ঝড়, তুফান শুরু।”
“আর আমারটা কাইলকা সিদ্ধ করছি মাত্র। পুরাপুরি শুকায় নাই। কী করি ক তো? আর দুইটা দিন রোদে দিলেই হইতো।”
“সেই আশা ভুইল্যা যান, চাচা। খবরে হুনলাম নতুন ঘূর্ণিঝড় আইতাছে। এমন তুফান আগামী কয়দিন চলতেই থাকবো।”
চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো সেলিম মোল্লার মুখমন্ডলে। উনার সঙ্গে কথা শেষ করে নিজের পথ ধরলো নাজির। বাড়ি ফেরার ভীষণ তাড়া।
মধ্যপাড়ার মাঠের পাশ ঘেঁষে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছায়া ঘেরা ফজলি আমগাছ। হাওয়ার ভারে ডাল থেকে ঝরে পড়া কাঁচা আমগুলো আগেই কুড়িয়ে নিয়ে গেছে পাড়ার ছেলে-মেয়েরা। মিছরি আর সুজাতার সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে একটু দেরি হলো। চারিদিক খুঁজেও আম না পেয়ে হতাশ দৃষ্টিতে তাকালো গাছের ডালে। মুখ ভার করে বললো,“দেখলি তো? সব আম বিচ্ছুগুলো নিয়ে গেছে। আমাদের আরো আগে আসা উচিত ছিল। আচ্ছা, তুই গাছে উঠতে পারিস?”
সুজাতা দুদিকে মাথা নাড়ালো,“না, তুমি ওঠো।”
“আব্বা জানলে বকবে।”
“ছোটো চাচ্চুও পারে। ডেকে আনবো?”
“থাক, দরকার নেই। বাড়ি চল।”
“আম ভর্তা খাবো না?”
উত্তর দিলো না মিছরি। তখনি আচমকা কোথা থেকে যেন ছুটে এসে এক ছড়া আম বরাবর লাগলো শুকনো মাটির শক্ত খন্ড। নিশানা ঠিক থাকায় মুহূর্তেই শূন্য থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ল কয়েক জোড়া কাঁচা ফজলি আম। তা দেখে মিছরির চোখ জোড়া চকচক করে ওঠে। এগিয়ে যায় সেগুলো তুলতে। কিন্তু তার আগেই কোথা থেকে এসে আম দুটো ছোঁ মেরে হাতে তুলে নেয় নাজির।
“বাড়িতে আমগাছ নাই? ঝড় তুফানের মধ্যে বাহিরে ঘোরাঘুরি ক্যান?”
কণ্ঠে বিদ্রুপ ঝরে পড়ল যেন। সুজাতা দৌড়ে লুকিয়ে পড়ল ফুফুর পেছনে। নাজির একটা আম নিজের কাছে রেখে বাকিগুলো বাড়িয়ে দিলো মিছরির দিকে। মিছরি ধরলো না তা। নাজির ভ্রু কুঁচকালো। সুজাতার উদ্দেশ্যে বিরক্ত কণ্ঠে বললো,“তগো বাড়িতে কী চুলা আলাদা হইয়া গেছে রে, সুজাতা? আলাদা খাস তোরা?”
ফুফুর পেছন থেকে আর বের হলো না সুজাতা। ওখান থেকেই উত্তর দিলো,“না তো। সবাই একসঙ্গেই খাই।”
“তাইলে তগো দুইডার অবস্থা আলাদা ক্যান? তুই পাটকাঠি, আর তোর ফুফু একেবারে বটগাছ! কোন চাইলের ভাত খায় তোর ফুফু? আমারেও ক। আমিও খাইয়া একটু মোডা হই।”
সুজাতা হেসে দিলো। বাচ্চা হলেও পাকাবুড়ি একটা। কিন্তু মিছরির মোটেও হাসি পেলো না। তার রাগ হলো। লোকটা সপ্তাহ খানেক আগে কয়েকটা বেগুন তোলার কারণে তাকে চোর উপাধি দিয়েছিল। আজ আবার তাকে মোটা বলে অপমান করছে? কত বড়ো সাহস! ভাইয়ের কথাই তবে ঠিক। শাহ বংশের পুরুষরা একেকটা বেয়াদব, অমানুষ। তাই নীরবে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সামনে পা বাড়ালো সে।
কিন্তু নাজির চুপ থাকলো না। এইটুকু মেয়ে তাকে অবজ্ঞা করছে! ভারি লজ্জার ব্যাপার। তাই জোরপূর্বক হাতের মধ্যে আমগুলো গুঁজে দিয়ে বললো,“এই মিছরি নামডা কেডায় রাখছে? এইডা কোনো নাম হইলো?”
মিছরি এবার মুখ খুললো,“কেন? সুন্দর নামই তো।”
“একদম সুন্দর না। মিছরি তো মানুষ খায়। তোরে কী খাওয়া যায়? তা তুই কোন মিছরি? তালমিছরি নাকি আখের মিছরি?”
সুজাতা ঝট করে উত্তর দিলো,“তালমিছরি।”
নাজির সামান্য হাসলো। বললো,“এবার সোজা বাড়িত যা। নইলে ঠাডা কিন্তু দুইডার মাথার উপর পড়বো। তখন আর বিয়া হইবো না।”
কথা শেষ করে যেতে গিয়েও ফিরে এলো। কিছু একটা মনে পড়ার ভঙিতে বললো,“কয়দিন আগে যে আমারে লইয়া ভয়ংকর মশকরা করছে, এইডাই তোর সেই ফুফু না রে, সুজাতা?”
এই ভয়টাই যেন এতক্ষণ পাচ্ছিলো ছোট্ট মেয়েটা। শক্ত করে ধরে রাখলো ফুফুর ওড়না। উত্তরের অপেক্ষায় নাজির তাকিয়ে আছে তার দিকে। মিছরি কিছু বুঝতে না পেরে সরল কণ্ঠে বললো,“নাম নিয়ে মজা করেছি! কবে? কখন? আমি তো আপনাকে দেখলামই এক সপ্তাহ আগে, ওই যে ক্ষেতে?”
“আবার মিছা কথা? আলবাত কইছোস। তুই কইছোস। শালিসের দিন এই মাঠে দাঁড়াইয়া কইছোস। সুজাতা আমারে কইছে।”
মিছরি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই সুজাতা তাকে একটু শান্তি দেয় না। নিজে অন্যায় করে সব জায়গায় ফাঁসিয়ে দেয় ফুফুকে। অথচ সেদিন সে গ্ৰামেই ছিল না। ফিরেছিল রাতে। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে কথাটা জানিয়ে বললো,“ভয়ে সুজাতা মিথ্যা বলেছে। মাঝেমধ্যেই ও এমন করে।”
মেজাজ চটে গেলো নাজিরের। ইচ্ছে করল ফাজিল পিচ্চিটাকে দু ঘা দিয়ে গাল লাল করে দিতে। কিন্তু ইচ্ছেটা এই মুহূর্তের জন্য দমিয়ে রাখলো। আকাশের অবস্থা ভালো নয়। দৃষ্টি দিয়েই শাসিয়ে বিড়বিড় করল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে মিছরির দিকে আরেকটু এগিয়ে ফিসফিস করে বললো,“তালমিছরি খাইতে আমার খুব ভাল্লাগে।”
বলেই সে নিজ রাস্তায়, নিজ গন্তব্যে অগ্ৰসর হলো। মিছরি একপলক তাকিয়ে দেখলো সেদিকে। বিড়বিড় করে বললো,“লোকটা আস্ত বেয়াদব।”
সুজাতা হাত থেকে কেড়ে নিলো আমগুলো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে লোভাতুর কণ্ঠে বললো, “তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো, ফুফু। একেবারে চটকে চটকে মাখবে। যেন অনেক ঝোল হয়।”
“তোকে একটুও দেবো না। তুই ফের আমার নামে মিথ্যা বলেছিস? তাও ওই লোকটাকে?”
উত্তর দিলো না সুজাতা। আসল কথাটা বললে নির্ঘাত ওই লোকের কাছে মার খেতে হতো। তাই তো বাঁচার জন্য ফুফুর নাম নিয়েছিল সে। বড়ো বোন থাকলে কী আর ফুফুর নাম নিতো? মিছরি আর কিছু বললো না। হাওয়ার তেজ বাড়ছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। তাই হাঁটা ধরলো বাড়ির পথে।
আজ মাস্টার বাড়িতে রোজকার চেয়ে ব্যস্ততা কিছুটা বেশি। হঠাৎ আসা ঝড়ে সবকিছু গোছগাছ করে ঘরে আনতে আনতে ক্লান্ত সকলে।
পিতা নজরুল আলমের তত্ত্বাবধানে ফাহমিদার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। সেই জন্যই বাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের গন্ধ। আজ ঘটক আসার কথা ছিল। কিন্তু আকস্মিক ঝড়ের তান্ডবে তার আগমনের আশা ছেড়েই দিলো সকলে।
সুজাতার সঙ্গে বাড়ি ফিরে প্রথমেই রান্নাঘর থেকে বঁটি নিয়ে বারান্দায় বসলো মিছরি। আমগুলো ছিঁলে কুচি কুচি করে কাটলো। একে একে মেশালো কুচি করে কেটে রাখা কাঁচা মরিচ, সদ্য পোড়ানো শুকনো মরিচ গুঁড়া, লবণ, আর সামান্য চিনি। তারপর চটকে চটকে তা মাখলো। সেই মাখা দেখেই জিভে পানি চলে এলো সুজাতার। মিছরি অল্প একটু তার দিকে বাড়িয়ে দিলো,“চেখে দেখ তো কেমন হয়েছে।”
পরনের হাঁটু সমান ফ্রকে হাতটা ডলে মুছলো সুজাতা। ফুফুর দেওয়া আম মাখা তালুতে নিয়ে জিভ দিয়ে পুরোটুকু মুখে ঢুকিয়েই চোখ বুজলো আবেশে। মুহূর্তেই শরীরটা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। সন্তুষ্ট কণ্ঠে বললো,“অনেক মজা, ফুফু!”
“আরো ঝাল লাগবে?”
“না, ঠিকই আছে।”
“যা তাহলে কাঁঠাল পাতা নিয়ে আয়। কলপাড় থেকে ধুয়ে আনিস কিন্তু।”
সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ালো সুজাতা। বাড়ির উঠোনের পাশে মোটা একটা কাঁঠালগাছ তাদের। সেই কাঁঠালগাছের নিচু ডাল থেকেই বেশ কতক পাতা ছিঁড়ে কলপাড় থেকে ধুয়ে আনলো সে। পরের কাজটা করল মিছরি। দক্ষ হাতে তা প্যাঁচিয়ে বাটির মতো তৈরি করে একে একে পরিমাপ করে বাড়লো আম মাখা। পরিবেশকের মতো সুজাতা ছুটে গিয়ে সবাইকে দিয়ে এলো সেই আম মাখা। প্রথমে নিজের মা জেসমিন, দাদী, ছোটো দাদী, বাপের দাদীসহ বাকি ফুপু আর চাচীকে।
মিছরি গিয়ে বসলো ফাহমিদার ঘরে। তার পিছুপিছু ছুটে এলো চাচাতো ভাই সুজনের ছেলে সিফাতও। যে সুজাতার ছোটো। সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে বোধহয়। ফোলা ফোলা চোখে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে বললো, “আমিও কাবো, দাও।”
মিছরি দিলো না তার হাতে, আবার না ও করল না। পাছে কান্না করলে? এই বিচ্ছুর কান্না থামানো ভীষণ কঠিন একটি কাজ। তবে ভর্তায় ঝাল হয়েছে। যা এর পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। তাই ছোট্ট একটা টুকরো শুধু জিভে ছোঁয়ালো। তাতেই চোখমুখ কুঁচকে নিলো সিফাত। আ উ করতে করতে বললো,“দাল, দাল!”
“আরো খাবি?”
উত্তর দিলো না সে। বরং দৌড়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। ফাহমিদা শুধু সেসব চেয়ে চেয়ে দেখলো কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া করল না। অন্যসময়ের মতো তার বিছানায় এসে খাওয়ার অপরাধে ধমকও দিলো না। হাতের বাটিটা চাচাতো বোনের দিকে এগিয়ে দিলো মিছরি। বললো,“তোমাকে নাকি বিয়ে দিয়ে দেবে, ছোটো আপা?”
“বয়স হইছে, দিবোই তো।”
“শুনেছি তোমার নাকি কারো সঙ্গে প্রেম চলে? সেই ছেলে এ বাড়ি থেকে ধরাও খেয়েছে?”
“কে কইছে এই কথা? নাজির শাহ?”
তেতে উঠলো ফাহমিদা। সরল মুখখানি থেকে উপচে পড়ছে রাগ। মিছরি ভয় পেলো না। নিজের মতো ভর্তা খেতে খেতে বললো,“সে আবার কে? আমি কী চিনি? পাশের বাড়ির মানিক চাচার মা আমাদের দাদীর সঙ্গে গল্প করছিল, তখনই শুনেছি।”
কিছুটা শান্ত হলো ফাহমিদা। নীরবতা পালন করল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর সজাগ কণ্ঠে বললো,“শাহ বংশের লগে আমগো বাপ, দাদার বহু বছরের শত্রুতা। তাই সত্য জানতে পারলে হয়তো আব্বায় আমারে মাইরাই ফেলবো। কুরুক্ষেত্র বাঁইধা যাইবো। কেউ মানবো না।”
“তাহলে ঘটনা সত্য?” অবাক হলো মিছরি।
“আংশিক সত্য। পারভেজ বহুদিন ধইরা আমার পিছনে পইড়া আছিলো। ওর পাগলামিতে একসময় আমিও সারা দেই। সেদিন রাইতেও আমার সাথেই…
থেমে গেলো ফাহমিদা। মিছরি মনোযোগ দিয়ে তা শুনলো। তবে কতটুকু বুঝলো কে জানে? এসব বিষয়ে সে অনভিজ্ঞ বললেই চলে। সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছে। আধবেলা তো বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই তার যায়। বাকি সময়টুকু যায় লেখাপড়ায়। তবুও সে বললো,“তাহলে কী করবে এখন? ঘটকের নিয়ে আসা পাত্রকেই বিয়ে করে নেবে?”
“তাছাড়া আর উপায় কী?”
“থাক, দুঃখ পেও না।”
“শোন মিছরি, এই কথা কারো কানে যাতে না যায়। কী কইলাম বুঝছোস?”
“হুম।”
সুজাতা দৌড়ে এলো ঘরে। বাটির তলায় অবশিষ্ট দুই টুকরো আম আর একটু ঝোল দেখে অবাক হয়ে বললো,“তুমি সব খেয়ে নিলে, ফুফু! তাহলে আমি কী খাবো এখন?”
“তোকে না দিয়ে এলাম?”
“ওইটুকুন? তুমি বেশি খেয়েছো।”
“তো? বানিয়েছে কে? যে বানায় সে বেশি খায়। তুই ছোটো মানুষ কম কম খাবি।”
ঠোঁট উল্টালো সুজাতা। ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দেবে বলে। নাক টেনে যেতে যেতে বললো,“এই জন্যই তুমি আলুর বস্তা। সব একাই খেয়ে নাও।”
“কী বললি? এত বড়ো কথা? আজ তোর একদিন কী আমার একদিন।”
সুজাতা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ালো। মিছরি এঁটো বাটিটা বিছানায় ফেলে রেখেই ভাতিজির পিছুপিছু ছুটলো। তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফাহমিদা। এরা আর এমুখো হবে বলে মনে হয় না। এই বাটি তাকেই সরাতে হবে।
সন্ধ্যা পর্যন্ত তর্জন গর্জনের পর ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো ধরণীতে। ভিজিয়ে দিতে লাগলো শুকনো, খড়খড়ে জমিন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলো তখনি। বাড়ির ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পাকা বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে বসলো। দাদী সৈয়দুন নেছা বসেছেন তাদের থেকে কিছুটা দূরে একটি কাঠের কেদারায়। স্বামী আর পুত্ররা যে যার ঘরেই শুয়ে আছে। তারা আর বের হলো না। বৃষ্টির মধ্যে জম্পেশ একটা ঘুম দেওয়া যাবে।
এই বৃষ্টির মধ্যেই দূর থেকে ভেসে আসছে পাখির কু কু ডাক। তালেবের স্ত্রী পলি জিজ্ঞেস করল,“এইডা কোন পাখির ডাক, দাদী?”
সৈয়দুন নেছা পান চিবোচ্ছেন। থুথুর সাথে একদলা পিক গ্ৰীল দিয়ে বাইরে ফেলতেই পানিতে ধুয়ে গেলো তা। বললেন,“আমরা তো এইডারে কু পাখি নামেই চিনি। ছুডোবেলায় মা, চাচী গো কাছ থাইক্যা হুনছি।”
পলি অল্প বয়সী মেয়ে। ফাহমিদার সমবয়সী হবে। গত বছর নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হতেই বাবা ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়ে দিলেন এ বাড়ির ছেলের সঙ্গে। শ্বশুর কাশেম আলী অবশ্য পুত্রবধূকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তা লেখাপড়া কী আরো করতে চাও, মা?”
মুখে উত্তর না দিয়ে শুধু দুদিকে মাথা নাড়িয়েছিল পলি। বিয়ের দিন তার বাবা অনেক কিছুই শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিল। সে শুধু শেখা বুলি আওড়েছিল। বয়স অল্প হওয়ায় সংসারের অনেককিছুই এখনো তার নখদর্পণের বাইরে। শাশুড়ি চোখ সরিয়ে নিলেই শুরু হয়ে যায় ননদদের সঙ্গে দৌড় ঝাঁপ। এবারও সে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল,“কু পাখি বৃষ্টির মধ্যে ক্যান ডাকে, দাদী?”
“এর পিছনে লম্বা একটা কাহিনী আছে। হুনবি?”
মাথা নাড়ালো সে সহ বাকিরাও। ওপাশে বসে সরিষার তেল দিয়ে মাখানো মুড়ি খেতে খেতে রুহুল আর মাসুম কান খাড়া করে রাখলো শোনার জন্য। সুজাতা ঘুমিয়ে আছে মিছরির কোলে মাথা রেখে। ও এসব গল্পের আগামাথা বোঝে না। ওর কাছে ঘুম, খাওয়া আর দৌড় ঝাঁপ করাই ভালো লাগে। সৈয়দুন নেছা সোজা হয়ে বসে পা দুলাতে লাগলেন। বাতাসে মাথার ঘোমটা এক পাশে সরে যেতেই তা টেনে ঠিক করে শুরু করলেন তাঁর মা, চাচী থেকে শোনা গল্প,“এক গেরামে আছিলো এক দুষ্ট রাখাল। তার কাম আছিলো মালিকের গোয়াল ভর্তি গরু পালা, সময় মতোন তাগো খাওন দেওয়া, রোদ উঠলেই মাঠে ছাইড়া দেওয়া, আর সকাল হইলে গোয়ালারে দিয়া দুধ ধোয়ানো। মালিক খুব ব্যস্ত মানুষ। সারাদিন বাইরে বাইরে থাকতো। তেনার ফিরতে ফিরতে হইতো রাত। ফিইরাই উনার কাম আছিলো রাখালের থাইক্যা সব খবরাখবর নেওয়া। কিন্তু রাখাল তো দুষ্ট। গরুরে ঠিকমতো পানি দিতো না। সারাদিন মাঠে ছাইড়া রাখতো, দুধ ধোয়ানোর ট্যাহা মাইরা খাইতো। আর সন্ধ্যা হইলেই সেই যে গোয়ালে ঢুকাইতো তারপর আর খোঁজ নিতো না। কিন্তু মালিক তো আর তা জানে না। এমনে কইরাই কয়ডা গরু মরছে। সেই মরা আর অসুইখ্যা গরুর অভিশাপ লাইগাই একসময় রাখাল হইয়া গেলো কু পাখি। যার মুখের ছিদ্র হইলো গিয়া গলার নিচে। অন্যান্য পশু, পাখির মতো চুমুক দিয়া পানি খাইতে পারে না। একমাত্র বৃষ্টি হইলেই আকাশের লাহান হা কইরা থাকে। যতটুক পানি মুখে ঢুকে আরকি। তাই বৃষ্টি আইলে এই পাখি কু কু কইরা ডাকে।”
মিছরি অবাক হয়ে বললো,“এটা সত্য ঘটনা, দাদী?”
“হ।”
রুহুল মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললো,“দূর গাধী! মিছা কথা। বানাইনা গল্প।”
সৈয়দুন নেছা তেতে উঠলেন। পানদানি থেকে সুপারির দানা নাতির দিকে ছুঁড়ে মেরে ধমকালেন,“তুই বেশি জানোস? আগেকার দিনে এইসব অভিশাপ লাইগা যাইতো। শুধু কী পক্ষি? খারাপ কামের লাইগা অনেক মানুষ বান্দর আর কুমির পর্যন্ত হইছে। দেহোস না, বান্দরের কাম কাজ মানুষের লাহান?”
“কুমির হইলো ক্যান, দাদী?” পলি পুনরায় প্রশ্ন করল।
“ভাইগনা বউয়ের মুখ দেখার লাইগা।”
এই পর্যায়ে রুহুল এবার শব্দ করেই হেসে দিলো। বললো,“আমনে ভাইয়ের কাছে যান তো, ভাবি। দাদীর গল্প হইন্না আর ছোট্ট মাথা নষ্ট কইরেন না।”
সৈয়দুন নেছা অসন্তুষ্ট হলেন নাতিদের অবিশ্বাস আর ঠাট্টায়। মুখে আর কিছু বললেন না। এরা একেকটা বজ্জাত, ইতর শ্রেণীর প্রাণী। কিছু বলেও লাভ নেই। ফাহমিদা ভাইদের ধমকালো,“বিরক্ত করোস ক্যান? বিশ্বাস না হইলে যা এইখান থাইক্যা। আমরা হুনমু। হুনতে দে।”
মাসুম এগিয়ে এসে তার মুখে এক খাবলা মুড়ি ঠেসে দিয়ে বললো,“তোর কথায় যামু? এইডা আমগোও দাদী। তাই সব মিছা মিছা গল্প আমরাও হুনমু। ঠিক কইছি না, দাদী?”
দাদীর মতো করেই নাটকীয় সুরে কথাটা বললো সে। নাতির কথায় মুখ বাঁকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে লাঠিতে ভর করে ঘরে চলে গেলেন সৈয়দুন নেছা। রুহুল বললো,“দিলি তো বুড়িরে রাগাইয়া? এহন দাদার কাছে গিয়ে বিচার দিবো।”
চলবে _________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

