#যাত্রাপথ
#মাশফিত্রা_মিমুই
#পর্ব_০৩
সন্ধ্যার পর বৈশাখের মেলা জমজমাট হয়ে উঠেছে। গ্ৰামের জোয়ান, বুড়ো সকলেই এসে শামিল হয়েছে সেখানে। মিল্টনের সাথে কিছুক্ষণ নাগরদোলায় চড়ে মুড়কি খেতে খেতে আরো ভেতরে চলে এলো নাজির। অদূরে দেখানো হচ্ছে সাপের খেলা। সেখানেই লেগে আছে মানুষের ভিড়। কেউ বা সারাতে এসেছে বিভিন্ন অসুখ। যদিও নাজির এসবে একদম বিশ্বাস করে না। আর সেই অবিশ্বাসের জেরেই বহুবার সাপুড়েদের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছে। সাথে মাথা পেতে নিয়েছে অভিশাপের পাহাড়। সেদিকেই এগিয়ে গিয়ে ভিড় ঠেলে উঁকি দিলো সে।
ঝোলার ভেতর থেকে বিশাল এক সাপ বের করে খেলা দেখাচ্ছে সাপুড়ে। বাকিরা উৎসুক দৃষ্টিতে তা দেখছে আর হাত তালি দিচ্ছে। হঠাৎ সুজনকে নজরে পড়তেই চোখমুখ কুঁচকে নিলো সে। ললাটের ভাঁজে জমলো বিরক্তি। সুজনের গম্ভীর দৃষ্টিও তার পানেই স্থির। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাসুম আর তালেব। এতে যেন আরো চটে গেলো নাজিরের মস্তিষ্ক। মিল্টনের কাঁধে হাত রেখে ঠোঁটের কোণে কৌতুকপূর্ণ হাসি ঝুলিয়ে উঁচু কণ্ঠে বিদ্বেষ প্রকাশ করে বললো,“এইসব মোডা দড়ির মতন লম্বা সাপের খেলা দেইখা লাভ নাই। আমগো গেরামেই চাইর হাত-পা বিশিষ্ট যেই বিষধর সাপ আছে! একেবারে পুরা বংশ একলগে গাইরা বইছে। হেগো বিষ এর থাইক্যাও বিষাক্ত।”
মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলো মিল্টনের। কিছু বুঝতে না পেরে অবাক নয়নে মাথা তুলে তাকালো তার চেয়েও কয়েক ইঞ্চি লম্বা নাজিরের মুখ পানে। নাজির তার কৌতূহলী দৃষ্টি দেখে ইশারায় সুজনকে দেখালো। যা দৃষ্টি এড়ালো না সুজনেরও। রাগে ফুঁসে উঠলো সে। তবে কিছু বলার সুযোগ পেলো না। তার পূর্বেই ভিড় থেকে হারিয়ে গেলো ছেলে দুটো। মাসুম চোয়াল শক্ত করে বললো,“দেখলা, ভাই? হারামজাদায় আমগো সাপ কইয়া গেলো।”
সুজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুত্র সিফাতের হাত ধরে সামনে হাঁটতে হাঁটতে বললো,“কুত্তার লেজ যেমন সোজা হয় না তেমনি শাহ বংশের পুরুষ মাইনষেগো চরিত্র আর খোঁচা মারা স্বভাবও কহনো ঠিক হইবো না।”
ভাইয়ের উপস্থিতিতে রাগটা মনেই পুষে রাখলো মাসুম। সুজাতা কোত্থেকে যেন ছুটে এলো তাদের দিকে। বাপ-চাচার কাছে আবদার করল,“ফুফু টাকা দিতে বলেছে, বাবা। বায়োস্কোপ দেখবো।”
তার হাতের ইশারায় সামনে তাকালো দুই ভাই। অদূরে অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েরা ভিড় জমিয়েছে বায়োস্কোপের সামনে। ভালো করে নজর ঘুরাতেই দৃষ্টিগোচর হলো ছোটো বোন দুটোকে। সেদিকেই এগিয়ে গেলো তিনজন। গত রাতেই মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে নানা বাড়ি থেকে ফিরেছে সবার ছোটোজন। কয়েকদিন এখানে থাকবে। তাদের জন্যই তো সব কাজ ফেলে ভাইয়েরা এসেছে মেলায় ঘুরতে।
_________
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। মেলা থেকে বেরিয়ে ভাতের হোটেলে পেট পুরে খেয়ে রাস্তা থেকে ধানের জমিতে নেমে পড়ল নাজির। হাতের ব্যাগটা মিল্টনের হাতে গছিয়ে দিয়ে পরনের প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত ভাঁজ করতে করতে বললো,“এই ব্যাগটা আমার আব্বার ঘরের বিছানায় রাইখা সোজা বাড়ির পথ ধরবি।”
“আমনে কই যাইবেন?”
“বহুদিন সামাদ মিয়ার ট্রলারে কইরা মাছ ধরতে যাই না। আজ একটু ঘুইরা আসি।”
“আমিও আসি?”
“না, বাড়িত যা। ভোরে ধান সিদ্ধ করতে হইবো।”
মিল্টনের মুখখানায় মলিনতা ভর করল। মুখ ভার করে মেনে নিলো আদেশ। নাজির তা দেখলো। গম্ভীর মুখে বললো,“ধানের কাম শেষ হোক। বর্ষাডা আইতে দে। তারপর দুইজনে মিল্যা সারারাত খালে বিলে শুধু মাছ ধরমু। এহন বাড়িত যা।”
নাজিরের সামনে মিল্টনের রাগ হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো। হুট করে ফুলেফেঁপে উঠলেও অল্পতেই গলে যায়। এবারেও গলে গেলো। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বিদায় জানিয়ে বাঁধানো সড়ক ধরেই হাঁটা ধরলো বাড়ির পথে। তবে আজ নাজির বাড়ি ফিরবে বলে মনে হয় না। সুবহান আলী শাহর সঙ্গে মিল্টনের ভীষণ ভাব। নাজির বাড়িতে না থাকলে মাঝেমধ্যে রাতটা ওখানেই সে কাটায়। রাতভর গল্প করে।
চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিস্তব্ধ পরিবেশে শোনা যাচ্ছে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। আটটা, সাড়ে আটটা মানে গ্ৰামে গভীর রাত। শুনশান ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে সামাদ মিয়ার ট্রলার। বাঁশের ডগায় জ্বলন্ত হারিকেনের আলোয় জাল নিয়ে জেলেদের ট্রলারে ওঠার দৃশ্য সুস্পষ্ট। প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে ট্রলার ছাড়ার অভিমুখে হন্তদন্ত হয়ে উঠে পড়ল নাজির। গিয়ে বসলো খোলা আকাশের নিচে হাতলের পাশ ঘেঁষে পেতে রাখা ছোট্ট চৌকিতে। হঠাৎ তাকে দেখে সামাদ মিয়ার চক্ষু চড়কগাছ। সাথে বেশ অবাকই হলেন বোধহয়। পানের পিক পানিতে ফেলে বললেন,“আরে নাজির শাহ যে! ভুল দেখতাছি না তো?”
নাজির দুই আঙুলের সাহায্যে ঘাড় চুলকায়। কপালে এসে বিরক্ত করা চুলগুলোকে ঠেলে দেয় পেছনে। হেসে বলে,“চোখে ছানি পড়ছে। ভুলই দেখতাছেন, ভাই।”
“তা কী মনে কইরা আজ এই পথে?”
“এমনি আইলাম, ভাল্লাগে না।”
“কেমনে ভাল্লাগবো? বিয়ার বয়স হইছে যে। বিয়া কর। ঘরে সুন্দর একটা বউ তোল।”
“মাইয়া পামু কই? খুঁইজা দেন।”
“নাজির শাহর লাইগা মাইয়া মানুর অভাব পড়বো রে? কবে যাবি শুধু কইস। এমন সুন্দর সুন্দর মাইয়া দেখামু না!”
নাজির প্রত্যুত্তরে হাসলো শুধু। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সামাদ মিয়ার ছেলে হৃদয়। হাতে তার চুরুট আর হুক্কা। চুরুটটা ধরিয়ে বাবার হাতে দিলো। বসে পড়ল মেঝেতে। হুক্কায় তামাক ভরতে ভরতে বললো, “দিবা নাকি এক টান, নাজির চাচা?”
সামাদ মিয়া ধমকালেন ছেলেকে,“ইলিয়াস কই? তোরে কইছি না তামাকের থাইক্যা দূরে থাকবি?”
নাজির শুয়ে পড়ল লম্বা হয়ে। দৃষ্টি তারা ঝলমল করা আকাশের দিকে নিবদ্ধ করে বললো,“পোলা বড়ো হইছে, ভাই। সুযোগ পাইলে তামাকে টানও মারে। দূরে থাকবো কেমনে?”
সামাদ মিয়া সেকথায় বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। পুত্রকে চোখ রাঙিয়ে ফের পুরোনো প্রসঙ্গ টেনে এনে বললেন,“কী রে, মাইয়া দেখমু?”
নাজির উঠে বসলো। হৃদয়ের হাত থেকে হুক্কাটা টেনে নিয়ে নিজেই বানানো শুরু করল। সে আবার এসব খুব ভালোই বানাতে পারে। ছোটো চাচার থেকে শিখেছিল। অনুৎসুক কণ্ঠে বললো,“এহনি না।”
“কী কস? এইডাই তো বিয়ার উপযুক্ত সময়। আমি তো সেই উনিশ বছর বয়সেই বিয়া কইরা ফেলাইছিলাম। এহন আমার বয়স চল্লিশ, আর আমার হৃদয়ের বয়স উনিশ। ওরেও ভাবতাছি এই বছরই করাইয়া দিমু। সামনের বছর থাইকা তোর ভাবির আরাম। বিয়া যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই শান্তি।”
“আমনের আর কী? বাপের হোটেলে খাইয়া আকাম কইরা বেড়াইছেন। বিয়ার পর হাল ধরছেন বাপের দাঁড় করাইন্না ব্যবসায়। পোলায়ও তাই করবো। কিন্তু আমার কী আর সেই কপাল আছে?”
“তোর লাইগা আমার খারাপই লাগে। তয় তোর দম আছে। তোর জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতদিনে হাল ছাইড়া দিতো।”
নীরব রইল নাজির। বানানো শেষ হতেই বড়ো একটা টান দিয়ে চোখ বুজলো। ভদ্রলোক ফের বললেন,“তা রোজগার তো ভালাই তোর।”
“ভালা হইলে কী হইবো? এহনো মাডির ঘরে থাকি। যা চাচাগো ইটের পাকা দালানের সামনে মুরগির খোপের মতন দেখায়। পরে বউয়ের যদি আফসোস হয়?”
“এইডা কোনো কথা? ট্যাহা লাগলে আমারে কইবি। আমি আছি না?”
“কত যে আছেন তা জানা আছে। কড়া সুদে টাকা লাগান। কোনো প্রয়োজন নাই। নিজের পয়সায় ঘর করমু।”
হাসলেন সামাদ মিয়া। চুরুটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দিলেন বাতাসে। ওপাশ থেকে ভেসে এলো জেলেদের হৈ হৈ কলরব। আওয়াজ হলো নদীর অবাধ্য পানির ঢেউয়ের। গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“মাছ উঠছে রে, জাকির?”
“হ ভাইজান, উঠছে।”
“কী মাছ?”
“পাঁচমেশালি ছুডো ছুডো মাছই বেশি। সাথে এক হাত সমান তিনডা শৈল মাছও আছে।”
সামাদ মিয়ার চোখেমুখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পেলো। পুত্রকে আরেকটি চুরুট ধরানোর নির্দেশ দিয়ে নাজিরের উদ্দেশ্যে বললেন,“বুঝলি নাজির, বর্ষা ছাড়া মাছ ব্যবসায় লাভ নাই।”
“তাইলে ট্রলার নিয়া বাহির হন ক্যান? ব্যবসা বাণিজ্যের তো অভাব নাই।”
প্রসঙ্গ বদলে ফেললেন তিনি। প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“তা তোর কথা ক। কয় মণ ধান হইছে?”
“আল্লাহর রহমতে ভালাই হইছে।”
“আমার কাছে পাঁচ, ছয় মণ বেইচ্চা দে। যত দাম তার থাইক্যা না হয় বেশি দিলাম।”
“এইবার আর ধান বেচমু না। ধান বিক্রিতে বহুত লস হইয়া যায়।”
“তাইলে কী করবি?”
“এমনে আর কতদিন? ব্যবসা করমু। কয়দিন আগে ধানের মিল খুলছি।”
“ভালা কাম করছোস। ডিলার পাইছোস? না পাইলে কইস আমারে।”
“হ পাইছি। গত বছর আড়তে গিয়া পরিচয় হইছে। সেইখান থাইক্যাই আরকি এই ব্যবসায়ের বুদ্ধি আইলো।”
“তোর চাচারা জানে?”
“না, জমি আমার, ফসল আর পয়সাও আমার। ওরা জানবো কেমনে? ব্যবসা ভালো কইরা দাঁড়াক তারপর এমনি এমনি জানবো।”
“ট্যাহা পয়সা লাগলে আমারে কইস। আমি সবসময় আছি।”
“সুদ ছাড়া দিতে চাইলে কইয়েন।”
“না রে, ভাই। লস হইয়া যাইবো। বাইচ্চা আছিই তো এইডার উপরে।”
“সুদ হারাম।”
“কত কিছুই তো হারাম। যেই তামাক খাস হেইডাও হারাম। মানে কয়জন?”
উত্তর দিলো না নাজির। হেলান দিয়ে বললো,“কম দামি, ব্যবহার করা পিকআপ লাগবো দুইটা। আপাতত হাতে ট্যাহা কম। খোঁজ থাকলে দিয়েন।”
“খোঁজ তো নাই। তাও তোর জন্য দেখমু নে।” একটু থেমে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,“নওশাদের কী খবর? লেখাপড়া শেষ হয় নাই? চাকরি-বাকরি কিছু করে?”
“না, এহনি কীয়ের? আরো এক দেড় বছর লাগবো মনে হয়।”
“খরচপাতি সব তুই দেস নাকি নিজেও কিছু করে?”
“আমি ছাড়া আর কেডায় দিবো?”
“বাপের কামাই নাই, অসুইখ্যা মানুষ। তার পিছনেই কত খরচ লাগে। ওয় এত লেখাপড়া কইরা করবো কী? গেরামে চইলা আইতে ক। ক্ষেতে খামারের কামে লাগাইয়া দে। তোর ঠ্যাকা পড়ছে খরচ চালানোর?”
“আমি তো পড়তেই পারলাম না। ওয় পড়তাছে যহন পড়ুক। লেখাপড়ায় ভালো আছে।”
“কোনো লাভ নাই। বাপেরেই শিক্ষিত পোলারা দেখে না আর তুই তো ভাই। কত দেখলাম! চাকরি-বাকরি পাইয়া তোরে মুইত্তাও মারবো না। তাই সময় থাকতে থাকতে নিজের লাইগা সঞ্চয় কর। দুনিয়াতে কেউ কারো না রে, নাজির। একলা আইছি, একলাই যাইতে হইবো। মাঝখানে দুনিয়ার জীবনে যেইগুলার লগে দেখা হয় সবকয়টা হারামজাদা।বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোন, সন্তান কেউ আপন না। এরা আমগো জীবনেই আসে পুটকি মারা দেওয়ার লাইগা। বড়ো করার দায়িত্ব করছোস। এবার তারে বল নিজের রাস্তা নিজে দেইখা নিতো।”
নাজির নীরব শ্রোতার মতো সেসব শুধু শুনলো। গত কয়েক বছর ধরে এসব শুনতে শুনতে সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। তাই এখন আর তার মস্তিষ্কে কথাগুলো প্রভাব ফেলতে পারে না।
হঠাৎ করেই আকাশটা গর্জে উঠলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো জেলেদের আহাজারি। আকাশ ফুঁড়ে ঝুমঝুম বৃষ্টি নামার জন্য দোয়া চেয়ে হাত তুললো রবের নিকট।
________
বৈশাখে গ্ৰামের মানুষের ব্যস্ততা থাকে একটু বেশিই। বিশেষ করে যাদের ধানের জমি আছে তাদের ব্যস্ততা আকাশচুম্বী। কাক ডাকা ভোরে দৈত্যের মুখের মতো বিশালাকৃতির আটটি চুলায় ধান ভর্তি হাড়ি চেপেছে। পরপর চারবার সেসব ধান সিদ্ধ করতে করতে বেলা বেড়ে ধরণীতে বেড়েছে রোদের উত্তাপ।
রাতে আকাশ গর্জে উঠলেও বৃষ্টি আর নামেনি। পানির অভাবে গাছগাছালি কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। রাতটা সামাদ মিয়ার ট্রলারে কাটিয়ে কাক ডাকা ভোরে গ্ৰামে ফিরে এসেছে নাজির। তবে বাড়িতে এখনো সে যায়নি। বাজারে নাশতা সেরে ডিপকল থেকে পানি তুলে সোজা চলে এসেছে তার সবজি চাষের জমিতে। কিন্তু সামনে এগোতে গিয়েও এগোলো না। আচমকা থেমে দাঁড়ালো পথিমধ্যে। দৃষ্টিগোচর হলো অদূরে ক্ষেত থেকে বেগুন তোলা একটি মেয়েকে।
নাজির কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেদিকে। তারপর দ্রুত গতিতে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় পাশে। কিন্তু মেয়েটি যেন তার উপস্থিতি টের পেলো না। পরনে ছাপা সালোয়ার কামিজ, মাথায় ওড়না। মাটি মাখা হাতে সে তুলে যাচ্ছে একের পর এক কালো কুচকুচে বেগুন। নাজিরের স্বাভাবিক মুখখানা হঠাৎ করেই কঠিন হয়ে উঠলো। ভ্রু কুঁচকে, রাগত স্বরে ধমক দিয়ে বললো, “এই ছেরি, এই! বেগুন তুলোস ক্যান? দিনদুপুরে আমার ক্ষেতে চুরি? বল্টু! ওই বল্টু! আমার বেতের লাঠিটা নিয়া আয় তো!”
মিল্টন আশেপাশে কোথাও নেই। তবুও ভয় দেখানোর জন্যই হয়তো তাকে ডাকলো নাজির। মেয়েটি ধীরে মাথা তুলে একবার তাকালো নাজিরের দিকে। তারপর চোখ নামিয়ে নিলো। কাজ জারি রেখে বিব্রত কণ্ঠে বললো,“চুরি? আমি? কই না তো। নিজেদের জমিতে আবার চুরি করে কীভাবে?”
নাজির এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। ব্যবহার বদলে অবাক হয়ে বললো,“নিজেগো জমি? কই আমি তো তোমারে চিনি না।”পরপর আবারো কণ্ঠস্বরে কাঠিন্য ভর করল,“বেগুন চুরি করতে আইয়া এহন আমার জমি হাতানের মতলব? দেইখা তো এই গেরামের মাইয়া মনে হয় না। কথাবার্তায়ও অন্য টান। গেরামের হইলে আলবাত আমি চিনতাম। নাম কী? বাপের নাম কী? বাড়ি কই? তাড়াতাড়ি কও। না হইলে কিন্তু বট গাছের লগে বাইন্ধা রাখমু।”
মেয়েটির মুখশ্রীতে এবার দেখা দিলো আতঙ্ক। দুরু দুরু বুকে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজলো। নাজির ভাবলো, হয়তো পালানোর পথ খুঁজছে মেয়েটা। তাই হাতের বালতিটা মাটিতে রেখে দু হাত ছড়িয়ে পথ আগলে দাঁড়ালো সে। মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা। চোখে ভয় থাকলেও তার কণ্ঠস্বর দৃঢ়,“আমি এই গ্ৰামেরই মেয়ে। এই জমিটাও আমাদেরই। আমার দাদার।”
“নাম কী দাদার?”
কিন্তু উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেলো না সে। পেছন থেকে চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো কেউ,“এই মিছরি! ওইখানে কী করোস? চইল্যা আয় এইদিকে।”
সেই কণ্ঠস্বরে নাজিরও পিছু ফিরে তাকালো। দেখলো মাসুম দাঁড়িয়ে। এবার কিছুটা হলেও ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারলো নাজির। হালকা অবহেলায় বললো,“ওহ, আকবরের নাতনি?”
মেয়েটি যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই হঠাৎ তার হাত থেকে একটি বেগুন টেনে ধরলো নাজির। মাসুমের মতোই গলা চড়িয়ে বললো,“এইডা আবার কোন পক্ষের? কার মাইয়া?”
উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না মাসুমের। তবুও বললো, “আমার বোইন।”
“কেমন বোইন? আমি চিনি না ক্যান?”
“আপন মায়ের পেটের একমাত্র বোইন।”
ভারি অবাক হলো নাজির। চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে বললো,“ওই যে নাক দিয়া হিঙ্গল পড়তো মাইয়াডা? ও মা, এত্ত ডাঙর হইয়া গেছে!”
বিস্ফোরিত নেত্রে তাকালো মিছরি। ভারি লজ্জা পেলো যেন। মাসুম পুনরায় তাগাদা দিলো,“তোরে চইল্যা আইতে কইছি না? এহনো দাঁড়াইয়া আছোস ক্যান?”
নাজির বললো,“বোনরে আমার জমিতে বেগুন চুরি করতে পাঠাইয়া এহন আবার চইল্যা যাওয়ার পাঁয়তারা করোস? এত সহজ? বেগুনের ক্ষতিপূরণ কেডায় দিবো?”
মাসুম এগিয়ে আসছিল। তখনি নাজির ধমকালো, “এক পা আগাইলেই পা ভাইঙ্গা রাইখা দিমু। আমার জমিতে খারাপ মানুষ ঢোকা নিষেধ।”
“তুই ভালা মানুষ?”
“হ।”
“ওই মিছরি! হেগো বেগুন ছিঁড়ছোস ক্যান?”
“বড়ো চাচীই তো বললো, ক্ষেত থেকে বেগুন নিয়ে আয়। ভর্তা বানাবো। তাই তো সুজাতাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু উনি বলছেন এটা নাকি উনাদের ক্ষেত।”
“ঠিকই বলছে। এইডা না, আমগো ক্ষেত হইতাছে ওই পাশেরটা।”
আঙুল তাক করে দেখালো মাসুম। নাজিরের ক্ষেতের বিপরীত পাশের ক্ষেতটাই আকবর মিয়ার। দীর্ঘদিন গ্ৰামে না থাকায় বিভ্রান্ত হয়েছে মিছরি। তাই আবারো লজ্জা আর অপরাধবোধ ঘিরে ধরলো তাকে। আমতা আমতা করে বললো,“দুঃখিত, আমি জানতাম না।”
নাজির বিড়বিড় করল,“দাদার মতনই সবকয়টা ধান্দাবাজ, বাটপার!”
লুঙ্গির ভাঁজ থেকে টাকা বের করল মাসুম। বললো, “ওর মতো মগার কাছে মাফ চাইতে হইবো না। এই নে ধর, তোর বেগুনের দাম।”
নাজির টাকাটা নিলো না। কিছুটা অহংকার করেই বললো,“শত্রু গো ট্যাহা নাজির শাহ নিবো, ভাবলি কেমনে?”
বলেই হাত থেকে রেখে দিলো সবকয়টা বেগুন। বলতে গেলে একপ্রকার কেড়েই নিলো। সেগুলো একপাশে ঘাসের উপর রেখে বালতি নিয়ে ক্ষেতে পানি দিতে দিতে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,“বোইন নিয়া সামনে থাইক্যা দূর হ।”
মিছরি মাঝখানে বিপাকে পড়ল। ফ্যালফ্যাল নয়নে অপরিচিত লোকটার দিকে একপলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে স্থির করল বড়ো ভাইয়ের মুখপানে। মাসুম অযথা তর্ক বা ঝামেলায় জড়াতে চাইলো না। তাই ইশারায় চলে আসতে বললো। নিজেদের ক্ষেত থেকে বেগুন তুলতে গিয়ে দেখা পেয়ে গেলো সুজাতার। মেয়েটা আইসক্রিম খেতে খেতে অপর হাতে ধরা বাকি তিনটা আইসক্রিম দেখিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো,“এক টাকায় চারটা আইসক্রিম পেয়েছি, ফুফু।”
তখন আইসক্রিমের ঢাকনার শব্দ শুনেই সে ফুফুকে রেখে দৌড়েছিল। তাই কথাটায় খুশি হলো না মিছরি। বরং চোখ রাঙালো। বাড়িতে ফিরেই যেন তুলকালাম কাণ্ড বাঁধাবে আজ। এই মেয়ের জন্যই তো অন্যের থেকে চোর অপবাদ শুনতে হয়েছে তাকে!
চলবে _________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

