যাত্রাপথ #মাশফিত্রা_মিমুই #পর্ব_০২

0
36

#যাত্রাপথ
#মাশফিত্রা_মিমুই
#পর্ব_০২

পশ্চিমাকাশে কমলা রঙের ছড়াছড়ি। সূর্যাস্তের সময় হয়ে এসেছে। সেই আয়োজনেই ব্যস্ত প্রকৃতি। সাদা বকগুলো রাশি রাশি মেঘের মতো দলবদ্ধ হয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে ঘরে ফিরছে। যেতে যেতে জমিনে ফেলে যাচ্ছে ছন্দময় শব্দ, ডানা ঝাপটানোর প্রতিধ্বনি।

শাহ বাড়ির পেছনে ধানের কাজের জন্য বরাদ্দ জমিটি খলা নামেই পরিচিত। দুপুরের কেটে আনা ধানগুলো আঁটি ধরে ধরে মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত মুজুরের দল। বটতলা থেকে ফিরে এতক্ষণ ধরে সেসবেরই তত্ত্বাবধান করছিল নাজির শাহ। বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ পেটে টান পড়ল যেন। বাড়ির ভেতরে হাঁটা ধরলো। উঁচু কণ্ঠে বললো,“আমি ভিতর থাইক্যা ঘুইরা আসি। তুই এনেই থাক, বল্টু।”

মিল্টন নীরব সায় জানালো। কদবেল গাছের নিচে বসে রইলো চুপচাপ। বয়স তার একুশের গন্ডিতে পড়েছে সবে। তাগড়া যুবক ছেলে। নাজিরের থেকে হবে বছর পাঁচেকের ছোটো হয়তো। একই এলাকায় বাড়ি। বাবা নেই, মা এর ওর বাড়িতে কাজ করে যা পায় তা দিয়েই এতকাল সংসার চলেছে। ভাই-বোন তারা সাতজন। তবুও ছেলেটা নাজিরের ভীষণ ন্যাওটা। ভোরের আলো ফোটতে না ফোটতেই এসে হাজির হয় শাহ বাড়িতে। তারপর সারাদিন সেখানেই থাকে। গোসল, খাওয়া সব বিনামূল্যে। দিনশেষে অবশ্য মজুরিও পায়। নিতে না চাইলেও নাজির জোর করেই দেয়। ভীষণ কাজের কিনা! যখন যা বলে তাই করে। নাজির ইচ্ছে করেই করায়‌।

শাহ বাড়ির তিনদিকেই শুধু বাড়ি আর বাড়ি। দুদিকে টিনের চালার দুটো ইটের পাকা বাড়ি। আর বিপ্রতীপ দিকে দুটো মাটির বাড়ি। তার মধ্যে ফাটল ধরা পুরোনো মাটির বাড়িটি নাজিরের বাবা সুবহান আলী শাহর। পৈতৃক সূত্রে পিতা ফতেহ আলী শাহর থেকে পেয়েছেন। এরপর সেই যে কোন এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিছানার সঙ্গে সন্ধি করলেন! আর শেষ হলো না সেই সন্ধি। ততদিনে দুই চাচার বহু উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে করেছে ইটের ঘর। পাশেই আছে দুটো গোয়াল ঘর। গরু, বাছুর, গাভী দিয়ে ভর্তি। তার মধ্যে অবশ্য একটা নাজিরের। বাড়ির সাথে লাগোয়া গৃহিণীদের মুরগির খোপ, একপাশে ধানের গোলা আর ছনের ছোট্ট ঘর।

নাজির এক বাটি খই আর নলেন গুড় নিয়ে নিজেদের খোলা বারান্দায় পেতে রাখা মোড়াতে বসলো। অদূরে বড়ো চাচী ফরিদা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে চাল থেকে কুমড়ার বড়ি আর গতকাল তৈরি করা নকশি পিঠা নামাচ্ছেন। তখনি হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলেন আমিরুল শাহ। দ্বিগিদিক না তাকিয়েই ছুটে এসে স্ত্রীর কোমর বরাবর লাথি মারলেন। চিৎকার করে বললেন, “বান্দির ঘরের বান্দি! সারাদিন কই থাকোস? কোন ভাতারের লগে সময় কাটাস? রাইতে পোলায় কী কইরা বেড়ায় দেখোস না?”

পিঠার ডালা হাতেই মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেলেন মধ্যবয়সী ফরিদা। কপালে আঘাত লাগলো। তবুও ব্যথায় টু শব্দটি করলেন না। তাতেই যেন প্রশ্রয় পেয়ে গেলেন লোকটা। একনাগাড়ে দিয়ে গেলেন অশ্রাব্য সব গালি। আশপাশ থেকে খুঁজে আনলেন একটি চ্যালা কাঠ। সেটা নিয়ে এগিয়ে যেতেই খই খেতে খেতে মুখ বিকৃত করে নাজির বলে উঠলো,“পিডাইয়া ঠ্যাং ভাইঙ্গা দেন ফিকিন্নির ঝির। সকালডা হইতে দেরি কিন্তু শাড়ি কাছা দিয়া গাধার মতো কাম করতে দেরি নাই। মাইর খাইয়া যদি একটু কমে এইসব।”

থেমে গেলেন আমিরুল শাহ। মারতে গিয়েও মারলেন না। ফেলে দিলেন চ্যালা কাঠ। ভস্ম করে দেবেন এমন দৃষ্টিতে একবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন অন্দরে। ফরিদা উঠে বসলেন। আঁচলে চোখের পানি মুছে তাকালেন সামনে। লুঙ্গি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো নাজির। গামছা গলা থেকে নামিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো,“পইড়া পইড়া মাইর খাইতে শরম লাগে না? নির্লজ্জ বেডি মানুষ।”

“তো কী করমু?”

“চাইলে অনেক কিছুই করা যায়। রাইতের বেলা তো এক খাটেই শোয়। গলার টুটিডা চিপ দিয়া ধরলেই সব লেটা চুইক্কা যায়।”

ভেতর থেকে চিৎকার দিলেন আমিরুল শাহ,“নাজির! যদি আসি তাইলে তোরটাই কিন্তু চিপ দিয়া ধরমু।”

“আর আমি বুঝি বইয়া থাকমু? হাত ভাইঙা গলায় ঝুলাইয়া দিমু।”

আমিরুল শাহ কিছু বললেন না। রাগে ফুঁসছেন তিনি। বিচার কার্য শেষ হতেই সামিউলকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে রেখে এসেছেন পারভেজকে। গ্ৰামে ছিঃ ছিঃ পড়ে গিয়েছে এই কান্ডে। অর্জিত মানসম্মান যেন অল্প সময়েই খোয়া গেছে। নাজির উঁকি দিলো ঘরে।জিজ্ঞেস করল,“সামান্য হাতেই তো কাটছে। তার লাইগা হাসপাতালে ভর্তি কইরা রাইখা আইতে হইবো ক্যান?”

“আইজকার রাতটা থাকুক। শরীর দুর্বল। স্যালাইন দিছে ডাক্তার।”

নাজির আর কিছু বললো না। চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই শান্ত কণ্ঠে পিছু ডাকলেন আমিরুল শাহ, “শোন, নাজির।”

“কন।”

“হাছাই মাস্টার বাড়ির মাইয়ার লগে পারভেজের সম্পর্ক আছে?”

“সম্ভবত।”

“সম্ভবত?”

“হ, নিশ্চিত জানি না। অনেকবার একলগে দুইডারে দেখছি। তাই ওই পরিস্থিতি থাইক্যা বাঁচানোর লাইগা তখন কথাডা কওয়া ছাড়া আর উপায় আছিলো না।”

“আচ্ছা।” প্রসঙ্গ বদলালেন আমিরুল শাহ। জিজ্ঞেস করলেন,“ধানের কাম কতদূর? সব কাটা শেষ?”

“আমার পশ্চিম পাড়ার ক্ষেতেরটা আজ দুপুরেই কাটা শেষ করছি। এখন মাড়াই চলতাছে। বেলাইয়েরটা এক সপ্তাহ পর কাটতে হইবো। মনে হয় আরেকটু পাকবো। বাকিগুলার খবর মমিন চাচা আর সামিউল ভাই জানে।”

“কয় মন হইছে?”

“এহনো মাপি নাই। তবে ধরা যায় পনেরো ষোলো মণের উপরে হইবো। বেশিও হইতে পারে।”

“আলহামদুলিল্লাহ!”

নাজির চুপ রইলো কিছুক্ষণ। তারপর কঠিন স্বরে বললো,“বয়স তো কম হইলো না। পোলাপাইন বড়ো হইছে, নাতি-নাতনিও আছে। তারপরেও বউ পিডান ক্যান? এসব যেন আর না দেখি।”

“বড়ো গো মতো কথা কবি না। বয়স কত তোর? কী বুঝোস সংসারের বিষয়ে? মাইয়া মানুষ হইলো কাল নাগীন। হেগো লাইগাই সংসারে অশান্তি হয়, সম্পর্ক নষ্ট হয়। জীবনেও এইসব নাগীনের চক্করে পড়বি না। একলা থাকবি, তবুও অশান্তির দরকার নাই। জীবন জাহান্নাম বানাইয়া ছাড়বো।”

“আমনের জীবন আবার কে জাহান্নাম বানাইলো? আমি তো ফুরফুরাই দেখতাছি।”

“জলজ্যান্ত প্রমাণ তোর মা। দেখোস না তোর বাপের অবস্থা?”

“একজনের লাইগা সবাইরে খারাপ বলা উচিত না। সবাই যদি খারাপ হইতো তাইলে দুনিয়া চলতো কেমনে?”

তপ্ত শ্বাস ফেলে কেদারায় হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন তিনি। উত্তরের অপেক্ষা না করে বাড়ির পাশের খলায় পুনরায় চলে এলো নাজির। আঁটি বেঁধে রাখা ধানের উপর বসলো। মিল্টনের কাঁধে চাপড় মেরে বললো, “রাইতে ঘাটে যামু ইলিশ কিনতে। আব্বার ইলিশ অনেক পছন্দ। আইয়া পড়িস।”

মিল্টন মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়।

মাস্টার বাড়ির অন্দরে গোল মিটিং বসেছে। আকবর মিয়া আর নজরুল আলম বাদে সকলের মুখশ্রীতে ভর করেছে গাম্ভীর্য। আকবর মিয়ার দুই পুত্র, তিন কন্যা। নজরুল, তমিজা, আবেদা, কাশেম, সরলা।
পিতার মতোই নজরুলেরও দুই পুত্র, তিন কন্যা। সুজন, রেশমা, কাজল, রুহুল আর ফাহমিদা। রেশমা, কাজল দুজনেই বিবাহিতা। তাই তারা থাকে শ্বশুরবাড়ি। বোনেদের মতো সুজনও বিবাহিত। ছয় আর চার বছরের দুটো ছেলে-মেয়ে আছে।

কাশেম বাবার দ্বিতীয় পুত্র। তাঁর আবার ছেলে-মেয়ে সংখ্যা তিনজন। তালেব আর মাসুম তাঁরই ছেলে। মেয়ে অবশ্য বাড়িতে থাকে না। নানার বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করে। এই তো গত বছরই ধুমধাম করে বড়ো ছেলের বউ এনেছেন বাড়িতে। স্ত্রী, সন্তান, নাতি, পুতি নিয়েই ভরা সংসার আকবর মিয়ার।

নজরুল আলমের স্ত্রী দিলারা বেগম মেয়ে ফাহমিদাকে নিয়ে উপস্থিত হলো বসার ঘরে। ঘোমটা টেনে মাথা নিচু করে সালাম দিলেন শ্বশুরকে। আকবর মিয়া সেদিকে না তাকিয়েই জবাব দিলেন সালামের। ফাহমিদা নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে মায়ের পাশে। বুকের ভেতর থর থর করে কাঁপছে আসন্ন কোনো ঝড়ের শঙ্কায়। চোরা চোখে একবার সামনে জোট বেঁধে বসে থাকা বাপ, চাচা আর ভাইদের দিকে তাকালো। একমাত্র ভরসা যেন এখন দাদা। তার মধ্যেই কাশেম চেঁচালেন,“গেরাম ভরা মানুষের সামনে আমগো মানসম্মানে আঘাত লাগছে। এই শিক্ষা দিছি তোরে? নামকরা বাড়ির মাইয়া হইয়া শত্রু গো লগে আকাম করো?”

ভয়ে দেহটাও দোলাচল খেয়ে গেলো ফাহমিদার। শক্ত করে টেনে ধরলো মায়ের আঁচল। আকবর মিয়ার নজর এড়ালো না তা। অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বললেন,“আহা, কাশেম! কইছি না বাড়ির মাইয়া, বউ গো লগে কখনো উঁচু গলায় কথা কবি না।”

“কিন্তু আব্বা…

“চুপ থাক। মাইনষের কথায় নিজের বাড়ির মাইয়াগো ক্যান অবিশ্বাস করবি? আমি কথা কইতাছি ওর লগে।”

বৃদ্ধ এখনো এ বাড়ির কর্তা। বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ থেকে শুরু করে পোষা বিড়াল পর্যন্ত উনার কথা মান্য করে চলে। তাই কাশেম আলী চুপ হয়ে গেলেন। আকবর মিয়ার কণ্ঠে এবার নমনীয়তা ঝরে পড়ল। নাতনির উদ্দেশ্যে স্নেহ ভরা কণ্ঠে বললেন,“যা জিজ্ঞাসা করমু তার সঠিক উত্তর দিবা, ঠিক আছে?”

“আচ্ছা, দাদাজান।”

“আমিরুল শাহর ছেলে পারভেজ গত রাতে ক্যান আইছিলো?”

“আমি জানি না।”

“আজ শালিসে তোমার নামে অপবাদ উঠছে। তোমার নাকি পারভেজের লগে প্রেমের সম্পর্ক?”

“এটা মিথ্যা, দাদাজান।”

“তাইলে সত্যটা কী?”

উত্তর দেওয়ার জন্য কিছুটা সময় নিলো ফাহমিদা। মিনমিনে অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো,“তার প্রতিবেশী চাচাতো বোন আমার সহপাঠী। তার হাত দিয়েই অনেকবার প্রেমপত্র পাঠিয়েছিল। কিন্তু আমি কখনো সেসবের জবাব দেইনি। মাঝেমধ্যে স্কুল ছুটি হলে বটতলা পর্যন্ত পিছু পিছু আসতো। এতটুকুই।”

“এসব তুমি কাউরে জানাওনাই ক্যান?”

“কখনো সামনে এসে কিছু বলেনি, বিরক্তও করেনি। তাই তেমন গুরুত্ব দেইনি। তবে আম্মা সব জানে।”

সন্তুষ্ট হলেন আকবর মিয়া। শুরু থেকেই নাতনির প্রতি উনার বিশ্বাস ছিল। বাড়ির ছেলে-মেয়েরা আর যাই হোক, পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে এমন কাজ করতে পারে না। এবার বড়ো পুত্রবধূর দিকে তাকাতেই দিলারা বেগম গড়গড় করে বলে দিলেন সত্য,“আমিই কইতে নিষেধ করছিলাম, আব্বা। অযথা ঝামেলার কী দরকার? তবে এও কইছিলাম, যদি সরাসরি কথা কওনের চেষ্টা করে তাইলে সোজা আইসা আমারে কবি। আমি তোর বাপেরে জানামু।”

মাথা নাড়ালেন আকবর মিয়া। ছেলেদের উদ্দেশ্যে বললেন,“কইছিলাম না সত্যটা না জাইন্না কহনো কারো সম্পর্কে বিরূপ ধারণা মনে রাখবি না?”

কাশেম আলী মাথা নিচু করলেন লজ্জায়। রুহুল দাঁতে দাঁত পিষে ক্ষুব্ধ স্বরে বললো,“সব দোষ ওই নাজিরের। হারামজাদারে ক্ষেতে ফালাইয়া কয় ঘা দিতে পারলে শান্তি পাইতাম। কয়দিন ধইরা অনেক বেশি লাফালাফি করতাছে।”

“উহু, ঝামেলা করিস না। কাল বছরের প্রথমদিন। মনে যা রাগ, ক্ষোভ আছে সব ধুইয়া মুইছা সাফ হইয়া যাক। হাটে যা, বাজার কইরা আন।”

এবারও দাদার কথা মেনে নিলো নাতিরা। দিলারা স্বামীর ইশারা লক্ষ্য করে মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন ঘরে।
______

বৈশাখের প্রথম সকাল, বাংলা ১৪০৩ বঙ্গাব্দ।
ভোরের আলো তখন পুব দিগন্তে কেবল ছড়াতে শুরু করেছে। চারিদিকে নেই কোনো শীতল বাতাসের অস্তিত্ব, বরং ভর করেছে তীব্র তাপদাহ।

বাড়ির উঠোন ধূলোমুক্ত। ভোর হওয়ার আগেই গৃহিণীরা সেরে ফেলেছে পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতার কাজ।রান্নাঘরের মাটির চুলায় ভাজা হচ্ছে ইলিশ মাছ, পোড়ানো হচ্ছে শুকনো মরিচ। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ভাজা ইলিশের ঘ্রাণ।

পাশের শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে ডুব দিয়ে গায়ে গামছা জড়িয়ে বাড়ি ফিরলো নাজির। মর্জিনা পেছন থেকে ডাক দিলেন,“আইজ আমগো ঘরে খাবি। তোর চাচায় বড়ো ইলিশ আনছে ঘাট থাইক্যা।”

চুল ঝেড়ে গামছা রোদে মেলে দিলো নাজির। প্রত্যুত্তরে বললো,“আমিও আনছি। বড়ো চাচী রানছে।”

মুখ বাঁকালেন মর্জিনা। হাতের ঝাঁটা ছুঁড়ে মারলেন মুরগির খোপের সামনে। বললেন,“হ খালি, বড়ো চাচী আর বড়ো চাচী। আমরা তো রানতে পারি না। বানের জলে ভাইসা আইছি। ওই মহিলাই মাথা খাইছে।”

কথা না বাড়িয়ে নিজ কক্ষে প্রবেশ করল সে। আসার পথে কিনে আনা আকাশি রঙের নতুন ফতুয়া আর কালো রঙের বাংলা প্যান্ট পরিধান করে চলে এলো বাবার ঘরে। সুবহান আলী শাহ টানটান হয়ে শুয়ে আছেন বিছানায়। দৃষ্টি রোদ আসা জানালায় স্থির। নাজির আনন্দে আটখানা হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগতাছে, আব্বা?”

শ্রবণালী পর্যন্ত সেই কণ্ঠ পৌঁছাতেই ঘাড় ফিরিয়ে পুত্র পানে তাকালেন সুবহান আলী শাহ। বিষণ্ণে আবিষ্ট মুখখানিতে ফুটে উঠল একফালি ঝলমলে হাসি। মুখ দিয়ে অ্যা অ্যা শব্দ করে কাছে ডাকলেন ছেলেকে। খোলা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলো আধ ফালি কাটা জিভ। শব্দগুলো অস্পষ্ট হলেও সহজেই নাজির যেন তা বুঝে গেলো। অধরের হাসি চওড়া হলো। যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। রান্নাঘরে ঢুকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা গতরাতের হাঁড়ি ভর্তি পান্তা ভাত থালায় তুলে সাথে পেঁয়াজ, কয়েক পদের ভর্তা আর ভাজা দুটো ইলিশ মাছের টুকরা নিয়ে ফিরে এলো ঘরে। বালিশ উঁচু করে পিঠে হেলান দিয়ে বসালো বাবাকে। ভাত মাখাতে মাখাতে বললো,“আইজ বছরের প্রথম দিন। তাই ইলিশ আনছি। মাঝরাইতে ঘাটে গিয়াই দেখি সামাদ মিয়া ট্রলার ভর্তি ইলিশ নিয়া ফিরতাছে। লগে লগে কিইন্না আনলাম।”

“নওয়া… কাআআআওও?”

“নওশাদ? ও আসে নাই।ওর নাকি কয়দিন পর পরীক্ষা শুরু হইবো। চিঠি পাঠাইছিল গত সপ্তাহে। ধানের কাম শেষ কইরা শহরে যামু ভাবতাছি।”

“বাআলি… কিইই…?”

“আর কইয়ো না। পারভেজ আছে না? মাস্টার বাড়ির মাইয়ার লগে পিরিত করতে গিয়া ধরা খাইছে। বিচার বইছিলো কাইল। গোলামের পুতে শত্রু গো বাড়িতেই মরতে গেছে।”

ভদ্রলোক আরো কিছু হয়তো বললেন। কিন্তু নাজির প্রত্যুত্তরে মুখ বাঁকিয়ে বললো,“হইছে চুপ থাকো। সাফাই গাইতে হইবো না। ওই অমানুষের বাচ্চাগো লাইগাই আজ এই অবস্থা তোমার। বাপ সঠিক মানুষ চিনতে পারে নাই বইল্যা পোলায় ভুগতাছে। একবার যদি সুযোগ পাই তাইলে বুইড়ার বিষ দাঁত আমি ভাইঙা দিমু।”

হাত নাড়িয়ে পুত্রকে ঝামেলা করতে নিষেধ করলেন তিনি। নাজির সেকথায় গুরুত্ব দিলো না। বরং প্রসঙ্গ বদলালো। ওই বাড়ির পুরুষদের নাম শুনলেই তার মাথায় খুন চেপে বসে।

এভাবেই খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কথা চললো দুজনার। অলৌকিকভাবেই হোক বা অভ্যাসবশতই হোক, পিতার মুখ থেকে নিঃসৃত অস্পষ্ট প্রত্যেক শব্দ খুব সহজেই বুঝে যায় নাজির। সুবহান আলী শাহ বিছানা থেকে নামতে পারেন না। বা পায়ের হাড় ভাঙা, ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটাও কেটে ফেলেছে কেউ। সাথে কাটা হয়েছে জিভের ডগা। হয়তো কোনো কিছু গোপন করার লক্ষ্যে। যা রহস্য রয়ে গেছে আজো। সেই রহস্য চলছে এখনো, একুশ বছর ধরে।

খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো নাজির। বড়ো তেঁতুল গাছটা পেরোতেই দেখা মিললো মিল্টনের। গত রাতে তিনটা মাছ কিনেছিল সে। তার মধ্যে একটা আবার গছিয়ে দিয়েছিল মিল্টনের হাতে। তাই আজ সকালের খাবারটা বাড়ি থেকেই খেয়ে এসেছে সে। চত্বর বাজারের মুদির দোকানে আজ হালখাতার অনুষ্ঠান। সেখানেই প্রথমে যাবে তারা। তারপর ক্ষেতে, খামারে ঘুরে বিকালে যাবে মেলায়।

হাঁটতে হাঁটতে কাউকে নজরে পড়তেই হাতের ইশারায় চিৎকার করে ডাকলো,“এই ছেরি! এই! এইদিকে আয়।”

বাচ্চা মেয়েটি এগিয়ে এলো। চোখেমুখে তার আতঙ্ক। নাজির ভ্রু কুঁচকে ধমক দিয়ে বললো,“কাইল বিকালে তুই আমারে লইয়া মশকরা করছিলি না?”

মেয়েটি দুদিকে মাথা নাড়ালো। মিল্টনও এবার ধমক দিলো,“তুই সুজনের মাইয়া সুজাতা না? বাপ, চাচায় এইগুলাই শিখাইছে? বেয়াদব!”

“বাদ দে, বংশের রক্ত পাইছে না? একেবারে দুই নম্বরী পোলাপাইন।”

সুজাতা ফের দুদিকে মাথা নাড়ালো। নিষ্পাপ মুখ করে বললো,“আমি না, আমি না। ওই ছড়া ফুফু বলেছে।”

“কোন ফুফু? ফাহমিদা? নাকি বিয়াইত্তাগুলা?”

“আরেক ফুফু।”

মিল্টন নাকোচ করে দিয়ে বললো,“মিছা কথা কয়, ভাইজান। কয়দিন আগে আমার গায়ে জামাল গোডা ছুঁইড়াও অস্বীকার করছিল।”

নাজির কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বললো,“না রে, বল্টু। শুদ্ধ ভাষায় যহন কইতাছে তহন হাছা কথাই কইতাছে মনে হয়।”

সেই সুযোগে পা থেকে জুতা খুলে হাতে নিয়ে ভো দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করল সুজাতা। কিন্তু পুনরায় পথ রোধ করে দাঁড়ালো নাজির। শাসানোর ভঙিতে বললো,“আমার পাদ লইয়া সবার সামনে মশকরা! তার উপর আবার বংশ বদলাইয়া নাজিরের লগে ভূঁইয়া লাগাইছে। তাই তোর ফুফুরে লইয়া আমার লগে দেখা করবি। না হইলে হাড্ডি গুড্ডি ভাইঙা রাইখা দিমু।”

চলবে __________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here