সূচনা_পর্ব #যাত্রাপথ

0
38

প্রাচীরের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছের ডালটা মটমট শব্দে ভেঙে পড়ল টিনের চালে। নির্জন নিশীথে এই একটা শব্দই চারিদিকে সৃষ্টি করল এক ভূতুড়ে পরিবেশ। সেই শব্দে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেলো প্রৌঢ় চৌকিদার জিন্নত আলীর। জানালার কপাট খুলে তিনি আশেপাশে তাকালেন। প্রচন্ড গরমে চারিদিকে বেহাল অবস্থা। কোথাও সামান্য বাতাসটুকু বইছে না। তখনি লাফানোর আওয়াজ হলো। মচমচে শুকনো পাতাগুলো ঝনঝন করে বেজে উঠলো। অজানা শঙ্কায় বৃদ্ধর বুক কাঁপলো বোধহয়। দেয়ালে হেলান দেওয়া কোঁচটা হাতে তুলে নিয়ে শব্দহীন পায়ে হেঁটে কাঠের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বাইরে। গ্ৰামে এখনো বিদ্যুৎ তেমনভাবে আসেনি। হাতে গোনা দুয়েকটা বাড়িতে আছে‌ হয়তো। তার মধ্যে মাস্টার বাড়ি অন্যতম। তবে এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেছে। চাঁদের সফেদ আলোয় আঁধার কিছুটা কমেছে যেন। সেই আলোতেই হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হলো চাদরে মোড়া এক ছায়ামানব।

গত বছর শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পর থেকেই গ্ৰামে ডাকাতের উৎপাত বেড়েছে। এর ওর বাড়িতে লুটপাট হচ্ছে। জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে মানুষ। এই তো কয়েকদিন আগে মধ্য পাড়ার দেলোয়ারের বাড়ির সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে পড়েছিল তারা। বেড়াতে আসা মেয়ে জামাইয়ের পিঠে কোপ বসিয়ে সোনা গহনা নিয়ে শেষ মুহূর্তে পালিয়ে বেঁচেছে। ছায়ামানবকে দেখে সেই আশঙ্কাই করলেন বৃদ্ধ। কোঁচটা নিয়ে তেড়ে যেতে যেতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেন,“ডাকাত পড়ছে! কে কোথায় আছোস? বাড়িত ডাকাত পড়ছে!”

ছায়ামানব চমকে পেছন ফিরে তাকালো। ততক্ষণে বৃদ্ধ চলে এসেছে তার নিকটে। কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই হাতে বসিয়ে দিয়েছে ধারালো কোঁচ। চাপা ব্যথাতুর চিৎকার ভেসে এলো। বৃদ্ধকে ঠেলে মাটিতে ফেলে দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরে পালানোর সহজ পথ খুঁজতে লাগলো।

রজনীর মধ্যভাগ।কারো চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠলো চারিপাশ। ধানের কাজ শেষ করে সবে ঘুমিয়েছিল মাস্টার বাড়ির সদস্যরা। চৌকিদারের হাঁকডাকে কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেলো সকলের। বাড়ির পুরুষেরা সজাগ হয়ে যে যা পারলো তাই অস্ত্র হিসেবে তুলে নিলো হাতে।

জিন্নত আলী তাঁর দুর্বল বয়স্ক শরীর নিয়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। মাটিতে বসেই একনাগাড়ে করে গেলেন চিৎকার। ডাকাত ধরেই যেন আজ নিস্তার মিলবে তাঁর। অন্ধকার বিলীন হয়ে আলো জ্বলে উঠলো বাড়ি জুড়ে। বিদ্যুৎ চলে এসেছে। তাও সঠিক সময়ে। সদর দরজা খুলে চারিদিক ঘেরাও করে ফেলল পুরুষেরা। পালানোর আর কোনো পথ নেই। কালো চাদরে মোড়া বিশাল দেহী লোকটি ফের প্রাচীর টপকে দৌড়ানোর জন্য স্থির হতেই পেছন থেকে কেউ দুই হাত প্রসারিত করে তাকে শক্ত করে চেপে ধরলো। চিৎকার করে বলে উঠলো,“পাইছি আব্বা, পাইছি। মাতারির পোলারে পাইছি।”

সবাই দৌড়ে এলো সেখানে। আকবর মিয়া নিজের শখের এয়ারগানটা লোকটার দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে ধমকালেন,“শালার ঘরের শালা! আমার বাড়িতে ডাকাতি করতে আইছোস? কত্ত বড়ো সাহস! এই সুজন, এরে আগে গাছের লগে শক্ত কইরা বাইন্ধা ফেল‌। ওই মাসুম মুখ খোল ওর। চাঁদ মুখখানা দেখি।”

দাদার আদেশে কালো চাদরটা টেনে মুখ থেকে সরিয়ে দিলো মাসুম। ঢেকে রাখা মুখমণ্ডল উন্মুক্ত হতেই আরো একদফা চমকে উঠলো সকলে। কাশেম আলী বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললেন,“শাহ গো পোলা না এইডা?”

এয়ারগান নামিয়ে ভালো করে মুখের দিকে তাকালেন আকবর মিয়া। ভ্রু দুখানা কুঁচকে নিলেন। ধমক দিয়ে বললেন,“এই তুই পারভেজ না? শেষমেশ শাহ বংশরা পোলা দিয়া রাতবিরাইতে ডাকাতি শুরু করছে?”

পারভেজের চোখেমুখে লজ্জা আর ভয়। ফর্সা মুখখানা দরদর করে ঘামছে। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে আকুল কণ্ঠে বললো,“আমি ডাকাত না। ডাকাতি করতে আসি নাই। বিশ্বাস করেন, দাদা। একটু ভুল বোঝাবুঝি হইছে।”

চৌকিদার জিন্নত আলী চেঁচিয়ে উঠলেন,“মিছা কথা কইলে মুখ ভাইঙা দিমু। আম গাছ বাইয়া ভিতরে আইছোস ক্যান তাইলে? আমি নিজ চোখে দেখছি তুই এই বাড়ির ভিতরে যাওয়ার পাঁয়তারা করতাছিলি। আমার আওয়াজ হুইন্না দৌড় মারছোস।”

প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে পারলো না পারভেজ। অজানা ভয়ে ভীত হলো মন। রুহুলকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুজন এগিয়ে এসে জলপাই গাছটার সাথে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল ছেলেটাকে। আর কিছু মুহূর্ত পর ফজরের আজান হবে। এরপর সকাল হতে আর বেশি দেরি নেই। কাশেম আলী পিতার উদ্দেশ্যে কঠিন গলায় বললেন,“অনেক লাফাইছিল শাহ বংশরা। এইবার তাগো সব জারিজুরি কেমনে দশ গেরামের মাঝে খালাস কইরা দেই তা আমনে শুধু চাইয়া চাইয়া দেখেন, আব্বা। সকালডা একবার হইতে দেন।”

বাড়ির নারীরা ঘরের বাইরে বের হওয়ার সাহস পেলো না। বারান্দার ভেতর থেকেই উঁকিঝুঁকি মেরে বাইরে ঘটমান দৃশ্য যতটুকু পারলো দেখলো। তাদের মধ্য থেকে এক কিশোরীর চোখ যেন ঘোলাটে হয়ে উঠলো। বুকের ওড়নাটা শক্ত করে চেপে ধরে ছুটে গিয়ে খিল আঁটলো ঘরের দরজায়।

গ্ৰামের খ্যাতিমান পরিবারগুলোর মধ্যে মাস্টার বাড়ি সুপরিচিত। একতলা বাড়িটি আধ খাওয়া চাঁদের মতো গোলাকার। পারভেজ শাহকে সেই একতলা বিশিষ্ট ইটের পাকা বাড়িটির সামনের জলপাই গাছটিতেই বেঁধে রাখা হলো। বসানো হলো তার সামনে পাহারা। এখন সকাল হওয়ার অপেক্ষা শুধু।

গ্ৰীষ্মের ভোর আসে খুব দ্রুত। ভ্যাপসা গরমে পাখিরাও জেগে ওঠে খুব দ্রুত। গলায় সুর তুলে আকাশে ডানা ঝাপটে উড়তে উড়তে ধরণীর মানুষদেরও জাগিয়ে তোলে দায়িত্ব সহকারে। সকাল নয়টার দিকে মাসুম আর রুহুল দুই ভাই মিলে পারভেজকে নিয়ে গেলো পুব পাড়ার বটতলায়। গ্ৰামে ঘটিত যেকোনো শালিস পূর্ব পুরুষের আমল থেকে এখানেই হয়ে আসছে। সেই নিয়ম এখনো অব্যাহত। কখনো খন্ডন করেনি কেউ।

ঘটনাটা চারিদিকে ছড়াতে বেশি একটা সময় লাগলো না। শাহ বাড়িতে খবরটা পৌঁছাতেই লাঠি নিয়ে ছুটে এলো জোয়ান মর্দরা। বাড়ির ছেলেকে এভাবে বাঁধা অবস্থাতে দেখতেই রাগে ক্ষোভে জ্বলে উঠলো পারভেজের চাচাতো ভাইয়েরা। মাস্টার বাড়ির সমস্ত ছেলেরাও চলে এলো বাপ চাচাদের ঢাল হয়ে। শুরু হলো বড়সড় ঝগড়া। গ্ৰামের মানুষদের কারণেই হাতাহাতিটা আর শেষমেশ হলো না।
___________

সাল ১৯৯৬।

চৈত্রের শেষ দুপুর। সোনা ঝরা রোদের আলোয় পাকা ধানের শীষগুলো যেন সোনালী রেশম চাদরে মোড়ানো। বনখড়িয়া গ্ৰামের পশ্চিম পাড়ায় কপালে ও কোমরে গামছা বেঁধে কাস্তে হাতে ধান কাটতে ব্যস্ত মুজুরের দল। ক্লান্ত দুপুরের হালকা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে পাকা ধানের সোঁদা গন্ধ। সেই গন্ধ সরাসরি নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে ভুলিয়ে দেয় মন খারাপের তত্ত্ব। ধান কাটার ছন্দে, গোছার মড়মড় শব্দ পেরিয়ে হঠাৎ দল থেকে উঁচু স্বরে ভেসে আসে গান—

‘আংগিনায় বসিয়ারে পাখি খায়রে পাকা ধান
আজো তো আইলোনা আমার বন্ধু সোনার চান
আমার মন ভালোনা ও কিছু ভালো লাগে না।’

মাঠের নীরবতা ভেঙে বাকিরাও সেই কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সুর তোলে। গানের ফাঁকে কাস্তে থামিয়ে মুছে নেয় কপালে লেপ্টে থাকা ঘাম। কেউ বা উত্তপ্ত আকাশ পানে তাকিয়ে দেখে উড়তে থাকা ক্ষুধার্ত চিলের ডানা ঝাপটানো। মাটির উঁচু ঢিবিতে ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসে থাকা তরুণ উঠে দাঁড়ায়। পরনের লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত উঁচু করে কোমরে গিঁট বেঁধে আরেকটি কাস্তে হাতে নেমে পড়ে বাকিদের সাথে ধান কাটতে। রোদে পোড়া শক্তপোক্ত দেহে খেটে খাওয়ার লক্ষণ সুস্পষ্ট। বাকিদের সাথে আউশ করে সেও গলায় সুর তুলে গান ধরে—

‘তারে ধরতে পারলে মনোবেড়ী
ধরতে পারলে মনোবেড়ী
দিতাম পাখির পায়
কেমনে আসে যায়
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়!’

গাইতে গাইতে হাতটাও বোধহয় কেটে গেলো খানিকটা। ক্ষতস্থান থেকে বেরিয়ে এলো তরল তাজা রক্ত। অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে সে।

“নাজির ভাইজান! নাজির ভাইজান!”

হাঁক ছেড়ে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে এলো মিল্টন। হাত আর গান দুটোই থেমে গেলো নাজির শাহর। পেছন ফিরে ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞেস করল,“সারাদিন কই ছিলি, গোলামের পুত?”

মিল্টন দাঁত দিয়ে জিভ কেটে মাথায় হাত রাখলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“বিশাল সর্বনাশ হইয়া গেছে, ভাইজান। পারভেজ ধরা খাইছে।”

“কেমনে খাইছে? চুরি করতে গেছিলো নাকি?” নির্লিপ্ত ভঙিতে জিজ্ঞেস করল।

“মাস্টার বাড়িতে মাঝরাইতে ধরা খাইছে। ভেইন্না বেলাত্তে তারে বটগাছের লগে বাইন্ধা রাখছে। অপবাদ দিছে ডাকাতির।”

“জটিল বিষয়!”

পুনরায় সে মনোযোগ দিলো ধান কাটায়। মিল্টন আর কিছু বলার সাহস পেলো না। উশখুশ করতে করতে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। বেশ কিছুক্ষণ পর দুই হাতে বিশাল বড়ো বড়ো দুটো ডেকচি নিয়ে হাজির হলেন কলিমের মা। ঘাসের উপর গামছা বিছিয়ে তার উপর ডেকচি দুটো রেখে একে একে বের করলেন খাবারগুলো। তার পেছনে জগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে কলিম। হাঁক ছেড়ে সে ডাকলো,“খাইতে আইয়েন আমনেরা!”

কাজ করতে করতে সকলেই ক্লান্ত এবং ভীষণ ক্ষুধার্ত। খাওয়ার জন্য ডাক পড়তেই কাজ থামিয়ে নিচু জমি থেকে উপরে উঠে এলো সকলে। কপাল ও কোমর থেকে গামছা খুলে মাটিতে বিছিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে বসে পড়ল খেতে। নাজির শাহও তাদের সাথেই বসলো সেখানে। ভ্রু কুঁচকে বললো,“কলা পাতা লইয়া আয় তো, বল্টু।”

আদেশ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওপাশের আইল ধরে দৌড় দিলো মিল্টন। কলিমের মা হেঁড়ে গলায় বললেন, “এনে খাবি নাকি? বড়ো ভাবি তো তোরে বাড়িত যাইতে কইছে।”

“ক্ষুধা লাগছে, আগে খাইয়া লই।”

কারো কথা শোনার নয় নাজির শাহ। সরিষার বাগার দিয়ে রান্না করা লাউ, সজনে ডাটার ডাল, আলু ভাজি দিয়ে কাঁচা মরিচ চিবোতে চিবোতে এক গামলা ভাত কলা পাতায় নিয়ে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে উঠে দাঁড়ালো সে।

“আমি না আসা পর্যন্ত লতিফরে এনে আইয়া বইয়া থাকতে ক।”

কলিমের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে মিল্টনকে নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরলো সে। বাড়ির পেছনের বিশাল খলায় বাকি মুজুররা আঁটি থেকে ধান ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত। গৃহস্থ নারীরা গোসল সেরে নামাজ পড়ে বাড়ির খোলা বারান্দায় খেজুর পাতার তৈরি মাদুরে খেতে বসেছে। নাজিরকে দেখে মুখের খাবার গিলে বিচলিত কণ্ঠে বড়ো চাচী ফরিদা বলে উঠলেন,“এহন তোর বাড়িত ফিরার সময় হইছে? পুব পাড়ার বটতলায় পারভেজরে লইয়া কীয়ের জানি বিচার বইছে। তোর ছুডো চাচা আর ভাইয়েরা সেইখানেই গেছে। যাওয়ার আগে কইয়া গেছে তোরেও যাতে পাডাইয়া দেই।”

“গোসলডা কইরা লই, শরীর চুলকায়।”

এবারও তার গাছাড়া উত্তর। ছোটো চাচী মর্জিনা চোখমুখ কুঁচকে বিড়বিড় করলেন,“একেবারে ঘাউড়া হইছে। কেউর কোনো কথাই হুনে না। যা ইচ্ছা কইরা বেড়ায়‌। ভাইডাও হইছে হের মতোই। মায় তো চইল্যা গিয়াই বাঁচছে।”

নাজির শাহর কান পর্যন্ত সেকথা পৌঁছেছে কিনা ঠিক বুঝা গেলো না। গুনগুন করতে করতে গামছা নিয়ে সে চললো কলপাড়।

বনখড়িয়া গ্ৰামের সব শালিস পুব পাড়ার বটতলাতেই বসে। পারিবারিক কলহ বা কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে শালিসের রায় দেয় মেম্বার হেলাল এবং মাতব্বর আফাজ উদ্দিন। আর বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে আসেন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান। তবে আজকের ঘটনা মাস্টার এবং শাহ বাড়ির মধ্যকার হওয়ায় চেয়ারম্যান সাহেবকেই খবর দেওয়া হয়েছে। গন্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটায় বেজে গিয়েছে দুপুর আড়াইটার এদিক ওদিক। ততক্ষণে গ্ৰামের মানুষেরা সেখানে ভিড় জমিয়েছে তামাশা দেখার জন্য।

আতাউর রহমান এসেই কেদারায় আরাম করে বসলেন। তাঁর আপ্যায়নে গ্ৰামের চটকদার মতিন গাছ থেকে আগেই পেড়ে রাখা ডাবটা কেটে ধরিয়ে দিলেন হাতে। তখনি বড়ো পুত্র সামিউলকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন আমিরুল শাহ। এসেই সর্বপ্রথম নজর গেলো গাছে বেঁধে রাখা পুত্রের দিকে। তাগড়া জোয়ান ছেলেটা ঝিমুচ্ছে। ক্ষত স্থানে বাঁধা গামছার উপর দিয়ে শুকিয়ে আছে তাজা রক্ত। সেসব যেন সহ্য করতে পারলেন না তিনি। দাঁতে দাঁত পিষে চেঁচিয়ে উঠলেন,“কার এত্ত বড়ো সাহস? কে আমার পোলারে বাইন্ধা রাখছে এমনে? যেই একটু গেরামের বাহিরে গেছি সেই সাহস বাইড়া গেছে?”

চেয়ারম্যান লাফিয়ে উঠলেন। শাহ বংশের মানুষদের এখানকার চেয়ারম্যান, মেম্বাররা বেশ মান্য করে চলে। তিনিও তার ব্যতিক্রম নন।তাঁর বাবা যখন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন আমিরুল শাহ’র সঙ্গে বেশ খাতির ছিল। চেয়ারম্যান হতেও নাকি অনেক সাহায্য করেছিলেন এই লোক। তিনিও অবশ্য কিছুটা সাহায্য পেয়েছিলেন। তাই মন রাখতে ভ্রু কুঁচকে বললেন, “সত্যিই তো! এমন সুন্দর পোলাডারে বাইন্ধা রাখছে ক্যান? অ্যাই মকবুল! দড়ি খুইল্লা দে।”

আদেশটা মকবুলকে দিলেও সে যাওয়ার পূর্বেই দ্রুত গিয়ে দড়ি খুলে দিলো সামিউল। কাশেম আলী কর্কশ কণ্ঠে বললেন,“রাতবিরাইতে পোলায় ডাকাতি করতে গিয়া ধরা খায়, আর বাপে বুক উঁচা কইরা বিচার সভায় আহে। এরেই কয় চোরের মায়ের, না না চোরের বাপের বড়ো গলা।”

বাবার কথায় হেসে উঠলো মাসুম আর তালেব। রুহুল সায় দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বললো,“হেগো থাইক্যা শরম আশা কইরা লাভ আছে, চাচা? তাড়াতাড়ি বিচার শুরু করতে কও। মেলা কাম পইড়া আছে।”

আকবর মিয়া চেয়ারম্যানের সোজাসুজি একটি কেদারায় গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। আশেপাশে চলমান কথায় টু শব্দটি করছেন না। বৃদ্ধর পিতা এই গ্ৰামেরই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিল। যা ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখান থেকে সবাই তাদের বাড়িটিকে মাস্টার বাড়ি হিসেবেই চেনে, জানে এবং মান্য করে। তিনি এবার মুখ খুলে চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে বললেন, “বিচার শুরু করো, আতাউর। প্রমাণ হিসাবে জিন্নত ভাই আছে। সে স্বচোক্ষে সব দেখছে। এখনো তার কোঁচে রক্ত শুকাইয়া আছে। মিছা কথা কইয়া তো আর আমগো লাভ নাই। আশা করি তুমি নিরপেক্ষ বিচারটাই করবা।”

আতাউর রহমান ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে আড়চোখে চেয়ে দেখলেন আমিরুল শাহকে। তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে রাগে গজগজ করছে নিজের বড়ো ছেলে আর ছোটো ভাইয়ের ছেলেরা। পাশে বসা ছোটো ভাই মুমিনুল শাহ। ভাইয়ের উপস্থিতিতে সে আপাতত মৌন।

শালিস বৈঠক যথাসময়ে শুরু হলো। বটগাছের পাশে ইট দিয়ে বাঁধানো বসার স্থানটিতে কুঁজো হয়ে বসে আছে পারভেজ। কারো দিকে মুখ তুলে তাকানোর সাহসটুকুও তার নেই। মাতব্বর আফাজ উদ্দিন একে একে সমস্ত ঘটনা জিন্নত আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সবার সামনে বের করে আনলেন। আতাউর রহমান এবার বড়োই বিপদে পড়ে গেলেন। কী রায় দেবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। নিয়ম অনুযায়ী তো ছেলেটার মুখে চুনকালি মাখিয়ে পুরো গ্ৰাম ঘুরানো উচিত, নয়তো করা উচিত জরিমানা ধার্য করে কয়েকদিনের জন্য গ্ৰাম থেকে নির্বাসিত। তবে এসব করলে আবার মহাঝামেলা!

তাঁর এতসব ভাবনার মধ্যেই সেখানে এসে হাজির হলো নাজির শাহ। পরনে বাংলা প্যান্ট আর ছাপা শার্ট, যা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। সে এসেই ধপাস করে বসে পড়ল পারভেজের পাশে। দুই হাতে ভর দিয়ে ধমকানোর সুরে বললো,“গোলামের পুত! মাঝ রাইতে শত্রু গো বাড়িত গেছিলি ক্যান?”

তার কথা শেষ হতেই আমিরুল শাহ একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠলেন,“এই নাজির, গোলাম ক্যাডা? কারে গোলাম কইলি তুই? আমি গোলাম?”

“তো কী মহারাজা ধিরাজ?” আশ্চর্য হওয়ার ভান ধরে প্রশ্ন ছুঁড়লো নাজির শাহ।

চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো আমিরুল শাহর। একে তো নিজের ছেলে গ্ৰামের মধ্যে অর্ধেক মানসম্মান ডুবিয়ে দিয়েছে, ওদিকে ভাইয়ের ছেলেও বাকিটুকু ডুবিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। নাজির শাহ চেয়ারম্যানের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “শালিসের রায় দিয়া দিছেন?”

“না, অহনো দেই নাই।”

“ভালা করছেন। এইবার আসল ঘটনা আমার কাছ থাইক্যা হুনেন।”

সকলে উৎসুক হয়ে উঠলো। কাশেম আলী বললেন, “কীয়ের আসল ঘটনা? তুই আছিলি ওইখানে?”

তাকে বিশেষ পাত্তা দিলো না নাজির শাহ। নিজের মতো করেই বলে ফেলল আসল কথা,“ওইসব ডাকাতি ফাকাতি কিছু না। সবই মাইয়া মাইনষের চক্কর, বাবু ভাই। মাস্টর বাড়ির তৃতীয় প্রজন্ম নজরুল আলমের মাইয়া ফাহমিদার লগে আমগো পারভেজের প্রেমের সম্পর্ক। ওই মাইয়াই রাতবিরাইতে ওরে ডাইকা নিয়া গেছে। বিচার যদি করতেই হয় তাইলে দুইডারে একলগে বাইন্ধা পিডান, নয়তো বিয়া দিয়া দেন। বউ লইয়া বাড়িত যাইগা। পোলা বইলা একলা একলা মান সম্মান বিসর্জন দিবো ক্যান?”

উৎসুক গ্ৰামবাসী চমকে উঠলো। শুরু হলো কানাঘুষা।শাহরা কথাটা শুনেই খুশি হয়ে গেলো। মুমিনুল শাহ বড়ো ভাইয়ের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বললেন, “দেখলা বড়ো ভাইজান? আমগো নাজিরে কেমনে খেলা ঘুরাইয়া দিলো, দেখলা? ব্যাডা মাইনষের চরিত্রের দাগ না হয় রাইতে লাগলে দিনে মুইছা যায় কিন্তু মাইয়া মাইনষের দাগ কেমনে মুছবো?”

আমিরুল শাহ মুখে উত্তর দিলেন না। শুধু নিঃশব্দে হাসলেন। নজরুল আলম আপাতত এখানে উপস্থিত নেই। সকাল হতেই পারিবারিক ব্যবসার কাজে চলে গিয়েছেন। তাই ছেলে রুহুল বোনের নামে মিথ্যা অপবাদ শুনে ক্ষেপে গেলো,“আর একটা মিছা কইলে তোর জিভ কিন্তু আমি টাইন্না ছিঁড়া ফেলমু, নাজির।”

নাজির শাহ শুরুর মতো এবারও এদের পাত্তা দিলো না। শুনেও যেন শুনলো না এমন এক ভাব। প্যান্ট ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। দুই হাত পেছনে রেখে চাচা আর চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে বললো,“আমার কথা বিশ্বাস না হইলে ফাহমিদারে ডাইকা আনেন। কিড়া কাইট্টা কইতে কন, পারভেজের লগে ওর কোনো সম্পর্ক নাই। আমি গেলাম। ধানের বহুত কাম পইড়া আছে। শালিস শেষ কইরা পারভেজরে লইয়া সদর হাসপাতালে যাইয়েন। এক রাইতে বেচারার কি অবস্থা করছে কাল নাগেরা!”

তারপর গুনগুন করতে করতে সেখান থেকে চলে এলো নাজির শাহ। কে কী ভাবলো, বললো তাতে যেন কোনো আগ্রহ নেই। তার আগ্রহ শুধু নিজেকে নিয়ে। মিল্টনও তার পিছুপিছু হাঁটছে। কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য উশখুশ করছে মন। নাজির শাহ হাঁটতে হাঁটতেই জিজ্ঞেস করল,“পেটের ভিতরে কৌতূহল আর কথা আটকাইয়া না রাইখা কইয়া ফেল, বল্টু।”

“আমনে কেমনে জানলেন যে পারভেজের লগে হেগো ফাহমিদার সম্পর্ক?”

“জানি জানি, তোরটাও জানি।” কৌতুক করে বললো।

মিল্টন ভড়কে গেলো। আমতা আমতা করে বললো, “কী জানেন?”

“কমু না।”

“কন না, ভাইজান।”

নাজির শাহ হাসলো। শিষ বাজাতে লাগলো। বটতলা থেকে বাড়িতে যাওয়ার জন্য মধ্য পাড়ার ছোট্ট মাঠটি পেরোনোর সময় দৃষ্টিগোচর হলো খেলতে থাকা ছেলে-মেয়েদের। হঠাৎ করেই সেখান থেকে ভেসে এলো এক বিদ্রুপপূর্ণ ছড়া,

“নাজির ভূঁইয়া, পাদ দেয় কুইয়া।”

নাজির শাহ চলতি পথে থেমে গেলো। আশ্চর্য হলো ভীষণ। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেলো বাচ্চা থেকে কিশোর-কিশোরী সবাই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

চলবে ________

#সূচনা_পর্ব
#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here