#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২৪]
বউ ভাতের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হয়েছে শাহ বাড়িতে। নিজেদের গ্ৰামের পাশাপাশি পাশের গ্ৰামের গন্যমান্য ব্যক্তিদেরও নিমন্ত্রণ করেছেন আমিরুল শাহ। যেন মাস্টার বাড়ির সঙ্গে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছেন তিনি। কোথাও কোনো ফাঁকফোকর থাকলেই প্রতিপক্ষের নিকট পরাজয় নিশ্চিত।
মিছরিকে ঘিরে আছে একঝাঁক অপরিচিতা রমণী। তাদের মধ্যে মাত্র এক জোড়া মুখই তার পরিচিত। একজন বড়ো জা আর অপরজন ছোটো চাচী শাশুড়ি। বিছানায় শাড়ি, গহনা দিয়ে ভরে আছে। সব আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে বাবার বাড়ির সবাই আজ এই বাড়িতে আসবে। তাই সকালের খাওয়া-দাওয়া শেষে শুরু হয়ে গিয়েছে তাকে সাজানোর তোড়জোড়। আমিরুল শাহ সবার উদ্দেশ্যে বলে দিয়েছেন,“গা ভর্তি গয়না পরাইয়া সুন্দর কইরা সাজাইবা ওরে। শাহ বাড়ির নতুন বউ দেইখা যাতে সবার তাক লাইগা যায়।”
শাড়িটা কোনো রকম নতুন বধূকে পরিয়ে নারীরা একে অপরের সঙ্গে খোশ গল্পে মেতে উঠেছে। এদের কোনো কথাই মিছরির ছোটো মাথায় ঢুকছে না। সে চুপচাপ বসে আছে। একবার এর তো আরেকবার ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ঠিক এমন সময় দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়ালো এক তরুণী। গায়ের রঙ চাপা হলেও মুখশ্রীর গড়নে ঠাঁই মেরে বসে আছে এক দুর্লভ মাধুর্য। উচ্চতা অবশ্য বেশি নয় বরং মিছরির থেকে দুই-তিন ইঞ্চি কমই হবে। তাকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে ঘুরে গেলো বিথী। মর্জিনা জিজ্ঞেস করলেন,“কিছু কইবা?”
লিলি ভেতরে প্রবেশ করে। হাতে খয়েরী রঙের একটি কাঠের বাক্স, বেশি বড়ো নয় বরং মাঝারি আকারের। দৃষ্টি সবার মধ্যমণি হয়ে বসে থাকা মিছরির দিকে স্থির করে বললো,“তেমন কিছু না, বড়ো জায়ের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছি।”
“পরে কইরো, এহন ওরে সাজানো হইবো। একটু পরে অতিথিরা আওয়া শুরু করবো।”
“সমস্যা নেই, আপনারা যান আমিই না হয় সাজিয়ে দেবো।”
“তুমি দিবা? দরকার নাই।”
“এ মা, কেন? আমি খুব ভালো সাজাতে পারি। আমার চাচাতো বোন একজন বিউটিশিয়ান। তার থেকেই এসব শিখেছি।”
বিথী কেমন করে যেন তাকালো। এই মেয়েটিকে প্রথম দিন থেকেই তার ভালো লাগে না। লাজ লজ্জার বালাই নেই, চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে, এমন ভাব যেন কাউকে গুনায় ধরে না। কর্কশ কণ্ঠে বললো,“আমগো ওইসব শিয়াল মিয়াল লাগে না। আমরা নিজেরাই সাজাইয়া লইমু। যাও তুমি। হিংসা কইরা কেমনে না কেমনে সাজাইবো কেডায় জানে? সম্মান যাইবো আমগো।”
এক ঘর বাইরের মানুষের সামনে বলা কথাটায় লিলি অপমানিতবোধ করল বলেই মনে হলো। কারো চোখ রাঙানি একদম সহ্য হয় না তার। বিশেষ করে একবার কাউকে নিয়ে বিরূপ ধারণা মনে গেঁথে গেলে তাকে সে সহ্যই করতে পারে না। এই যে, স্বামীর কথায় নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে এখানে ছুটে এসেছিল লিলি। অথচ তাকেই কিনা অপমানিত হতে হলো? চোখমুখ কুঁচকে চলে যাওয়ার জন্য মনস্থির করতেই পিছু থেকে ভেসে এলো পুরুষালি কণ্ঠস্বর,“সাজাইতে চাইতাছে যহন সাজাক। সবার সামনে এমন কইরা কথা কইতে হইবো ক্যান?”
সবার দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছু ফিরে তাকালো লিলি। ভাসুরকে দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। পরনের গেঞ্জি ঘামে ভিজে যাওয়ায় নাজির এসেছিল পোশাক বদলাতে। কিন্তু ঘরের ভেতরে মাছের বাজার দেখে বিরক্ত হলো। ফের বললো,“একটা মাইনষেরে এমন কইরা ঘিইরা ধরতে হইবো ক্যান? বউ জীবনে দেহেন নাই? কারো ভালো-মন্দ বুঝে না, হাগলের দল। যেয় সাজাইবো হেয় বাদে বাকি সব বাহির হন।”
মর্জিনা তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,“সবকিছুতে মাতব্বরি। তোর বউরে কী আমরা মাইরা ফেলাইতাছি?”
“ফেলতে কতক্ষণ? আমার সুখ তো আমনেগো সহ্য হয় না। বাহির হন তো। মহিলা মাইনষের সবকিছুতে যত বাড়াবাড়ি।”
তার কথায় কাউকে রাগতে দেখা গেলো না। বরং ভিড় থেকে ভেসে এলো চাপা গুঞ্জন,“বিয়া করতে না করতেই আমগো নাজিরে বউ পাগলা হইয়া গেছে।”
নাজির সেকথায় গুরুত্ব দিলো না। তারা ঘর থেকে বের হতেই সে ভেতরে ঢুকে আলনা থেকে আরেকটি গেঞ্জি নিয়ে নিজেও বেরিয়ে গেলো। অথচ একবারের জন্যও স্ত্রীর দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না।
লিলি দরজা চাপিয়ে বিছানায় এসে বসলো। বাক্সটা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল,“তোমার নাম কী?”
“মিছরি।”
“আমি লিলি, সম্পর্কে তোমার ছোটো জা।”
“আমার ছোটো?”
তার বিস্ময় ভরা মুখ দেখে লিলি হেসে ফেলল,“হ্যাঁ, সম্পর্কে ছোটো হলেও বয়সে কিন্তু আমি তোমার বড়ো। তবে তুমি চাইলে তোমায় আমি আপা বলে ডাকতেই পারি।”
“না, না, তুমি ডাকবে কেন? আমি তোমায় আপা বলে ডাকবো।”
“তোমার উচ্চারণ তো স্পষ্ট! একেবারে বইয়ের ভাষায় কথা বলো।”
“আমি আমার নানাবাড়িতে থেকে বড়ো হয়েছি। তাই বড়ো মামা আর মামাতো ভাইদের থেকেই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা শিখেছি।”
“পড়াশোনা কতদূর?”
“এবার অষ্টম শ্রেণীতে। তুমি?”
“আমি মাধ্যমিক দিয়েছি।” কথা শেষ করে কিছুক্ষণ মৌন রইল লিলি। দক্ষ হাতে সাজাতে সাজাতে আশেপাশে লক্ষ্য করে ফিসফিসিয়ে একসময় বললো, “সত্যি করে একটা কথা বলো তো, এই বিয়েটা কী তোমার ইচ্ছেতে হয়েছে? নাকি জোরপূর্বক তোমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে?”
মিছরির মুখখানায় মলিনতা এসে ভর করল। লিলি আশ্বস্ত করে বললো,“আহা, নির্ভয়ে বলতে পারো। আমি কাউকে জানাবো না।”
“জোর করে।”
“আমি তো শুনেছি, তোমরা নাকি এই বাড়ির শত্রু?”
“আমিও শুনেছি।”
“তাহলে?”
“জানি না, আমাদের বাড়িতে দাদার কথাই শেষ কথা। দাদা যা বলেন তাই আমার বাপ, চাচারা বিনাবাক্যে মেনে নেয়।”
“কাউকে পছন্দ ছিল? থাকলে পালাতে পারতে। সবার মানসম্মান বাঁচানোর দায়িত্ব বুঝি আমাদের মেয়েদের উপরে পড়েছে?”
“পছন্দ! না, ছিল না।”
“বোন মনে করে বলতে পারো। আমার বাবাও অন্য জায়গায় আমার বিয়ে ঠিক করেছিল। অনেকবার বুঝালাম, কিন্তু বুঝলোই না। পরে তোমার দেওরের হাত ধরে বিয়ের দিন পালিয়ে এসেছি। কই, কিছু হয়েছে? পরে তো ঠিকই সবাই মেনে নিলো। এখন স্বামী নিয়ে ওখানেই থাকি।”
মিছরি অবাক হলো, বিপরীতে প্রশ্ন করল। লিলিও হেসে হেসে তার প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলো। গল্পের ফাঁকেই তাকে আবারো সাজিয়ে দেওয়া হলো বধূ।
দুপুরের রোদটা প্রকট হতেই লোকারণ্যে ভরে গেলো শাহ বাড়ির দোরগোড়া। নিকটীয়দের জন্য আয়োজন করা হয়েছে বাড়ির ভেতরে, আর বাকিদের জন্য করা হয়েছে বাড়ির পাশের পুকুরের কাছে খালি পড়ে থাকা জমিতে। দীর্ঘ বছর পর মাস্টার বাড়ির সদস্যরা শাহ বাড়িতে পা রাখলো। তবে ভেতরের বিদ্বেষ, শত্রুতা প্রকাশ্যে আনা হলো না। বরং তাদের যা আপ্যায়ন করা হলো তাও লোক দেখিয়ে।
আকবর মিয়া লাঠিতে ভর দিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখছেন। এক যুগেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে, অথচ এই ফাঁকে কতকিছুরই না বদল ঘটেছে! পুরোনো ভিটের দিকে কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে ভেসে এলো নওশাদের কণ্ঠস্বর, “আপনাদের বসার ব্যবস্থা ওদিকে নয়, এদিকে করা হয়েছে।”
সহসা পিছু ফিরে তাকালেন বৃদ্ধ। অপরিচিত মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,“তুই জানি কেডা?”
“নওশাদ, নাজির ভাইয়ের ছোটো ভাই।”
“ওহ, এর লাইগাই খালি চেনা চেনা লাগতাছিল। বিয়া উপলক্ষে শহর থাইক্যা আইছোস বুঝি?”
“হ্যাঁ।”
“তোর আব্বার ঘর কোনডা? লইয়া চল। বহুদিন তারে দেখি না।”
নওশাদ ইতস্তত করল। আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলো কাউকে। আকবর মিয়া সজাগ কণ্ঠে বললেন,“আমি দেখছি, পাগলায় আশেপাশে নাই। লইয়া চল, দাদা। একটু কথা কই।”
বৃদ্ধর স্নেহভরা আবদার উপেক্ষা করতে পারলো না নওশাদ। আরেকবার আশেপাশে লক্ষ্য করে তাকে নিয়ে গেলো বাবার ঘরে।
নওশাদকে নিয়ে সকালেই বাবাকে গোসল করিয়েছে নাজির, নতুন পোশাক পরিয়েছে, রাঁধুনির রান্না শেষ হলে খাবার এনে সর্বপ্রথম তাকেই খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে।
নওশাদের সাথে পুরোনো ঘরটায় প্রবেশ করলেন আকবর মিয়া। বাড়িটা আগের মতোই রয়েছে। শুধু একটু লেপ ঝোপ করে বদলানো হয়েছে ঘরের দেয়াল, মেঝে আর ঘুণে খাওয়া দরজাটা। সুবহান আলী শাহ জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখ বুজে আছেন। নওশাদ চাপা স্বরে বললো,“আমি দরজার বাইরে আছি। আপনার হয়ে গেলে চলে আসবেন।”
“আইচ্ছা।”
নওশাদ ঘর থেকে বেরিয়ে চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়ালো। আকবর মিয়া ছোটো ছোটো কদম ফেলে এগিয়ে এসে বসলেন চৌকিতে। কোমল স্বরে ডাকলেন, “সুবহান! ও সুবহান! সুবহান রে!”
দীর্ঘদিন পর নিজের ডাকনাম শুনে চট করে বন্ধ চোখ জোড়া খুলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন সুবহান আলী শাহ। সরল দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। আকবর মিয়ার চোখে বোধহয় অশ্রু জমলো। মুক্তো দানার মতো চিকচিক করে উঠলো।
“আমারে চিনছোস? আমি তোর আকবর চাচা।”
শায়িত লোকটার শান্ত মুখমন্ডল অস্থির হয়ে উঠলো। অবস হাতখানা নাড়িয়ে বাড়িয়ে দিতে চাইলেন সামনে। কিন্তু পারলেন না। উত্তেজিত হয়ে মুখ দিয়ে অদ্ভুত সব শব্দ বের করতে লাগলেন। শক্তপোক্ত বয়োজ্যেষ্ঠ বৃদ্ধ তা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। শেষ যবে এই বিমূঢ়, অর্ধমৃত লোকটাকে তিনি দেখেছিলেন তখন সে ছিল যুবক। একেবারে তাঁর সুজনের বয়সী। স্ত্রী আর দুই পুত্র নিয়ে কি সুন্দর সংসার! অথচ তাকে যে এভাবেও একদিন দেখতে হবে কখনো কী ভাবতে পেরেছিলেন বৃদ্ধ? ভার হয়ে আসা কণ্ঠে বললেন,“পারলে আমারে মাফ কইরা দেইস, বাপ। তহন আমার কোনো উপায় আছিলো না। কিচ্ছু আছিলো না আমার হাতে। মাপ কইরা দেইস আমারে।”
সুবহান আলী শাহর চোখেও অশ্রু জমলো। একপর্যায়ে তা গড়িয়েও পড়ল। বাইরে থেকে ভেসে এলো মুমিনুল শাহর কণ্ঠস্বর। কিছু সময় পর তা মিলিয়ে গেলো। নওশাদ দৌড়ে এসে তাড়া দিলো, “এবার চলেন। ভাই দেখলে আমাকে বকবে।”
চোখের পানি আড়ালে মুছলেন বৃদ্ধ। শেষবারের মতো শুয়ে থাকা অপ্রয়োজনীয় মানুষটার দিকে একবার তাকিয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। নওশাদের উদ্দেশ্যে বললেন,“বাপের খেয়াল রাখিস। যতদিন বাঁচে, কাছে গিয়া না হয় একটু বসিস। মাথায় হাত বুলাইয়া মনোযোগ দিয়া কথা হুনিস। না বুঝলেও হুনিস। যহন থাকবো না তহন আফসোস করতে হইবো।”
“আমাদের বাপের এই অবস্থার জন্য দায়ী তো আপনারাই। আপনারা যদি এমন না করতেন তাহলে কী আজ বাপ থাকতেও আমাদের এতিমের মতো ঘুরতে হতো?”
নওশাদের দৃষ্টি সম্মুখপানে স্থির। আকবর মিয়া কিছু বললেন না। নীরবে তার সব অভিযোগ মাথা পেতে মেনে নিলেন।
পারুল এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। কাশেম আলী অবশ্য স্ত্রীর মতো এত ভালোবাসা প্রকাশ্যে দেখাতে পারলেন না, তাই মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন,“শ্বশুরবাড়ি কেমন, আম্মা?”
মিছরি কৃত্রিম হেসে উত্তর দেয়,“ভালো, আব্বা।”
“তুমি কেমন?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“আর জামাই?”
উত্তর দিতে পারলো না মিছরি। তার হয়ে জবাব দিলেন সৈয়দুন নেছা,“কেডা কেমন এহনি কেমনে বুঝবো? কয়দিন যাক, সংসার করুক। তারপর না দেখতে পাইবো কার আসল রূপ কেমন।”
একে একে সকলে এসেই কথা বললো মিছরির সঙ্গে। তারপর গেলো খাবার খেতে। কিন্তু মাসুম গেলো না। বোনের কাছেই বসে রইল সে। তালেব এসে বোনের হাতে একটা থলে ধরিয়ে দিলো।
“এহনো রাগ কইরা আছোস?”
“না।”
জড়তার সাথে উত্তর দিলো মিছরি। তালেব হয়তো আরো কিছু বলতে চাইলো কিন্তু পারলো না। ছোটো বোনের সাথে তার মনের দূরত্বটা সবসময়কার মতোই একটু বেশি। নইলে মাসুমের মতো করে ভালোবাসাটা সে প্রকাশ করতে পারে না কেন?
চারিদিকে চাপা গুঞ্জন চলছে। সিদ্দিক মুরগির রানে কামড় বসিয়ে চেয়ারম্যানের চামচা মকবুলের উদ্দেশ্যে বললো,“আমি কইছিলাম না, দুইডার মধ্যে কিছু একটা আছে? না হইলে চাচাগো বিরুদ্ধে গিয়া শত্রুর মাইয়ার পক্ষে কথা কওয়ার মানুষ নাজিরে?”
“আর থাকলেই বিয়া দিবো? ঘাপলা আছে ভিতরে। কী যে চলে বুঝি না। যা জীবনে ভাবতে পারি নাই তাই গেরামে হইতাছে।” মকবুল বললো।
“আরো কত কী যে দেখা লাগবো!”
“ক্যান, আমগো শত্রুতা শেষ হইছে এতে তোরা খুশি হোস নাই?”
দুজনের কথা থেমে গেলো। খাওয়া থামিয়ে পাশ ফিরে তাকাতেই নজরে পড়ল হাস্যোজ্জ্বল আকবর মিয়াকে। আমতা আমতা করল তারা। আকবর মিয়া বললেন, “অন্যের পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ কর, বাপ। জোয়ান পোলা আমগো বাড়িতেও আছে, আর জোয়ান মাইয়া তগো বাড়িতেও আছে। কহন আবার কার না কার বদনাম হইয়া যায়! দিনকাল ভালা না, আমার বাড়ির পুরুষ মানুষ বইল্যাই যে সবাই ভালা এমনও তো না। হাওয়া খুব খারাপ রে সিদ্দিক, মকবুল। প্রভাবশালী মাইনষের উপর দিয়া বইলে হয় ঠান্ডা, সাধারণ মাইনষের উপর দিয়া বইলে হয় দূষিত। সারা জীবন সবাই মনে রাখে। দাগ সহজে যায় না।”
হাসতে হাসতে কত সাধারণভাবেই না কথাটা বলে গেলেন তিনি। অথচ মকবুল, সিদ্দিকদের কাছে তা-ই ভারী পড়ে গেলো। মনে হলো যেন ঠান্ডা মাথায় বুড়ো তাদের হুমকি দিয়ে গিয়েছে। তাই এই বিষয়ে আর কথা বাড়ালো না। তাদের কাজও তো, হাওয়া যেদিকে বয়ে চলে সেদিকেই দৌড়ানো।
মুমিনুল শাহ আপ্যায়ন করতে করতে কাশেম আলীর উদ্দেশ্যে বিদ্রুপ করেই বললেন,“শেষমেশ শাহ বাড়ির পোলার হাতেই মাইয়া দিতে হইলো? কতটা বেশরম তোরা।”
কাশেম আলী রাগ করলেন না। বাবা বলেন, রাগ হলো মানুষের বড়ো শত্রু। তাই শত্রুদের সামনে রাগ নামক শত্রুকে পরিচয় করাতে নাই। তাই হেসে জবাব দিলেন,“ডর লাগতাছে নাকি?”
“ডর তগো লাগার কথা। খাল কাইট্টা কুমির ঢুকাইছোস বাড়িত। নাজির কিন্তু বড়ো ভাইজানের থাইক্যাও এক কাঠি উপরে।”
“ঢুকাইছি? নাকি পাঠাইছি?”
কাশেম আলী রসিক স্বরে হাসলেন। মুমিনুল শাহর মুখ চুপসে গেলো। ললাটে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে রইলেন। কাশেম আলী বললেন,“রসিকতা করছি, বেয়াই। এহন তো আমগো রসিকতার সম্পর্কই! আসা-যাওয়া লাইগা থাকবো।”
লোকটার হাসি আগুনের ফুলকির মতো যেন জ্বালিয়ে দিলো মুমিনুল শাহর অন্তর। লোক সমাগমে তেমন কিছু বললেন না শুধু। বড়ো ভাইজান যে আরো একটি ভুল করে ফেলেছে তা খুব ভালো করেই বুঝে গেলেন।
শাহ বাড়ির সব পুরুষেরাই অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। নারী আর পুরুষদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে আলাদা। নারীদের খাওয়া শেষে তারা নতুন বউয়ের কাছে বসে আছে। এখন খাচ্ছে পুরুষেরা। সবার সাথে নাজিরও তদারকি করছে। লম্বাটে দেহে সফেদ পাজামা ও পাঞ্জাবি। মাথাভর্তি ঘন কালো চুল, দাড়িটা একটু বেড়েছিল তাই পরশু ছাঁটাই করেছে, চওড়া বুকটা একেবারে টানটান, দেখতে যেন লাগছে কোনো এক সুপুরুষ। হাঁক ছেড়ে হঠাৎ সে ডাকলো,“বল্টু! ওই বল্টু! আমার সম্বন্ধির পাতে মাছের মুন্ডুডা দিয়া যা! লগে আমার হালাগো লাইগা দুইডা রানও আনিস।”
চট করে মাথা তুলে তার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকালো সুজন আর তালেব। রুহুল দাঁতে দাঁত পিষে বললো,“মাস্টার বাড়িত তোর কোনো শালা নাই, মফিজ। সবকয়ডাই সম্বন্ধি।”
“ওই দুই ঘাউড়ারে মানলেও তোরে আর মাসুমরে আমি সম্বন্ধি হিসাবে মানি না। তোরা আমার হালা। এহন দুলাভাই কইয়া ডাক দে, লজেন্স খাওয়ামু।”
রুহুল রাগে ফুঁসে উঠলো। সুজন ইশারায় শান্ত থাকার নির্দেশ দিলো তাকে। মিল্টন নাজিরের কথামতো মাছের মাথা আর রান এনে তুলে দিলো তাদের পাতে। কোনো বারণ শুনলো না। নাজির এবার সিফাতের পিঠে আলতো করে থাপ্পড় বসিয়ে বললো,“কী রে, সম্বন্ধির ছাও! খাওন দাওন ঠিক আছে?”
সিফাত না বুঝেও উপরনিচ মাথা নাড়ালো। নাজির বোধহয় তাতে সন্তুষ্ট হতে পারলো না। চোখমুখ কুঁচকে বললো,“মাথা নাড়াস ক্যান? মুখ দিয়া ক, ফুফা খাওন একসের মজা হইছে।”
বাবার দিকে একপলক তাকিয়ে সিফাত শিখিয়ে দেওয়া বুলি আওড়ানোর চেষ্টা করল,“পুপা, কাওন অ্যাকছের মুজা হইছে।”
“ধুর, সম্বন্ধির পুতে তোতলা।”
উপস্থিত সকলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিশেষ করে বোন যে এর সাথে কীভাবে সংসার করবে? ভেবে ভেবে হতাশ হলো তালেব। আকবর মিয়া সেখানে উপস্থিত হলেন। দূর থেকে দেখে ভাবলেন হয়তো তারা গল্প করছে। স্বর নিচু করে বললেন,“আমার নাতিন কেমন, নাজির? পছন্দ হইছে না?”
নাজির ভোঁতা মুখে উত্তর দিলো,“মাইয়া এক সাইজ ছুডো হইয়া গেছে। জামাইরে সন্তুষ্ট করা বুঝে না। পাল্টা-পাল্টির সুযোগ আছে?”
“নাই, তোর বউ তুই পাইলা পুইষা বড়ো কইরা ল। বিয়ার পর যত সমস্যা দেহা দিবো তার সব দায় তোর।”
“ওরে বুইড়া! এই আছিলো মনে?”
চলবে ________

