#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২৩
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
(অনেক বড় একটা পর্ব তাই কোথাও ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)
সকাল হতেই মেম্বার বাড়িতে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির আঙিনা জুড়ে এখন উৎসবের ধুম। আত্মীয়-স্বজন আর কাছের মেহমানদের পদচারণায় চারপাশ মুখরিত। গ্রামের মানুষও দলে দলে আসছে এই মহা-আয়োজনে। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যারা মাত্র দুদিন আগেও মেম্বারকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ সমালোচনা আর গালিগালাজ করছিল, তারাই আজ স্বার্থের টানে কী অবলীলায় মধুর বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে! এটাই বোধহয় মানুষের প্রকৃত ও নিষ্ঠুর রূপ বিপদের দিনে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, উৎসবের আমেজ পেলেই তারা আবার ফায়দা লুটতে ভিড় জমায়।
সোহাগের পরিবার শিউলির ওপর লেপ্টে দেওয়া সেই কলঙ্কিত অপবাদের কথা জেনেই বিয়েটা নাকচ করে দিয়েছে। সোহাগ তবুও জেদ ধরেছিল, সব বাধা উপেক্ষা করে সে শিউলিকেই জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মা-বাবার অনড় অবস্থানের সামনে সেই ভালোবাসার পরাজয় ঘটেছে। তবে তারা রাজি হলেও হয়তো খুব একটা লাভ হতো না, কারণ ইদ্রিস খন্দকারের চোখে এখন ক্ষমতার মোহ।
পুরো বাড়ি এখন আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে, চারদিকে ফুলের ম ম গন্ধ। কিন্তু এই জাঁকজমকের ঠিক বিপরীতে শিউলি নিজের অন্ধকার ঘরে পাথরের মতো একা বসে আছে। হঠাৎ ছোট বোন ফুলঝুরির ডাকে তার ঘোর কাটল, “আপা…”
ফুলঝুরির কণ্ঠটা আজ বড় বেশি করুণ আর অসহায় শোনাল। শিউলি ধীরলয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে ছোট বোনটাকে পরম মমতায় টেনে নিজের কোলের ওপর বসাল। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আড়াল করে আদুরে গলায় জানতে চাইল, “কী হয়েছে রে?”
ফুলঝুরি বোনের বুকে মাথা রেখে ভিজে গলায় ফিসফিস করে বলল,
“আপা, সত্যিই কি ওই নিষ্ঠুর লোকটার সাথেই তোমার বিয়া হয়ে যাইবে? ওই লোকটাকে আমার একটুও ভালা লাগে না রে আপা!”
ফুলঝুরির সরল মাখানো কথা শুনে শিউলি এক চিলতে ম্লান হাসল। সে শান্ত গলায় বলল,
“বিয়ে হবে না রে… তুই একদম চিন্তা করিস না।”
শিউলির মুখে এমন কথা শুনে ফুলঝুরি বিস্ময়ভরা চোখে বড় বড় করে তাকাল। অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“বিয়ে হইবো না মানে!”
শিউলি পরম মমতায় ফুলঝুরির ফোলা ফোলা গাল দুটো টেনে দিয়ে আদুরে কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“না, হবে না। তবে খবরদার! এই কথা যেন ভুলেও কাউকে বলিস না, বুঝলি?”
বোনের কথায় একরাশ স্বস্তি পেল ফুলঝুরি। খুশিতে ডগমগ হয়ে মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা, কাউরে কমু না।”
এরপর সে লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ফুলঝুরি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঘরে কয়েকজন মহিলার প্রবেশ ঘটল। তাদের হাতে একটা লালচে হলুদ রঙের শাড়ি। পাশের বাড়ির এক ভাবি শাড়িটা শিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে উৎসাহের সাথে বললেন,
“নেও শিউলি, এই শাড়িটা চট করে পরে নাও। এখন তোমারে হলুদ দিয়ে গোসল করাইতে হবে।”
শিউলির ভেতরটা প্রচণ্ড বিরক্তি আর বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। সে তিক্ত গলায় জবাব দিল,
“কিসের গোসল? আমি নিজের গোসল নিজেই করতে পারি। যেদিন দেহে প্রাণ থাকবে না, হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা থাকবে না সেদিন না হয় এসে তোমরা গোসল দিও।”
কথাগুলো বলেই শিউলি শাড়িটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিল এবং ধীরপায়ে গোসলখানার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
গ্রামের বাড়িগুলোতে শোবার ঘর থেকে গোসলখানা সাধারণত একটু দূরেই হয়। শিউলিকে উঠান পেরিয়ে সেদিকে যেতে হচ্ছে। হাতে হলুদ শাড়ি নিয়ে শিউলি যখন ধীর পায়ে এগোচ্ছিল, তখন সে অনুভব করল বিষাক্ত কিছু দৃষ্টি তার শরীরকে কুরে কুরে খাচ্ছে। উঠানে ভিড় করা কিছু মানুষের কামুক চোখ তাকে পরখ করছে নির্লজ্জভাবে, যেন তাদের লোলুপ দৃষ্টি দিয়েই শিউলিকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে নিতে চায়। পুরুষত্বের নামে এই কদর্যতা শিউলিকে ভেতর থেকে সংকুচিত করে তুলল।
সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে, শিউলি মাথার ওড়নাটা টেনে কপাল পর্যন্ত নামিয়ে দিল। নিজের সম্মানটুকু আড়াল করে সে দ্রুত গোসলখানায় ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল।
বাইরে চারদিকে এত আয়োজন, এত বিশৃঙ্খলা আর এত কলুষতা অথচ এই বদ্ধ দরজার আড়ালে শিউলির মনে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছে। এই নরক গুলজার থেকে মুক্তির পথ সে খুঁজে পেয়েছে। আজ গভীর রাতেই শিমুলের হাত ধরে সে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবে। ভাবতেই তার বুকটা এক অজানা সুখে কেঁপে উঠল। এই বিষণ্ন আবহেও শিমুলের কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল সেরে, নিজেকে পবিত্র করে নিয়ে শিউলি ধীরস্থিরভাবে বেরিয়ে এল।
★★★
গোধূলির আকাশ তখন ম্লান হয়ে দিনের শেষ লগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে গোধূলির আলো-ছায়ার খেলা, অথচ শিউলির মনের ভেতর অস্থিরতার পারদ ততটাই বাড়ছে। সে প্রহর গুনছে রাত নামার, কিন্তু আজকের এই অভিশপ্ত দিনটি যেন শেষ হতেই চাইছে না। কারো জন্য অপেক্ষার প্রহর বুঝি এভাবেই অনন্তকাল হয়ে দেখা দেয়। শিউলির মনে একরাশ আক্ষেপ দানা বাঁধছে,গতকাল রাতেই যদি সে শিমুলের হাত ধরে বেরিয়ে যেত, তবে এতক্ষণে তারা বৈধ পরিণয়ে আবদ্ধ হতে পারত।
কিন্তু গত রাতে না যাওয়ার পেছনে এক রূঢ় বাস্তবতা ছিল অর্থ। এই কঠিন পৃথিবীতে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতেও তো অর্থের প্রয়োজন। শিউলি জানত, শিমুলের কাছে যে সামান্য টাকা আছে, তা দিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সে একটু আগেই তার অতি যত্বের মাটির ব্যাংকটি ভেঙেছে। সেখানে জমে থাকা প্রায় পঁচিশ টাকা সে সযত্নে কুড়িয়ে নিয়েছে। এছাড়া বিয়ের জন্য গড়া নিজের কিছু গয়নাও সে সাথে রেখেছে এটাই এখন তার আগামীর সম্বল।
হঠাৎ বাইরে থেকে তামিমের কর্কশ কণ্ঠ ভেসে আসতেই শিউলি চমকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে টাকাগুলো বালিশের নিচে গুঁজে দিয়ে সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। সে জানত, এই সুযোগ সন্ধানী লোকটা ঠিকই তার ঘরে হানা দেবে। তার আশঙ্কাই সত্যি হলো এক বুক ধৃষ্টতা নিয়ে তামিম ঘরে প্রবেশ করল।
রুমে ঢুকেই শিউলিকে দেখে তামিম থমকে দাঁড়াল। পরনে হলুদ শাড়ি, সিক্ত কেশ আর ফর্সা শরীরে হলুদের সেই উজ্জ্বলতা শিউলিকে যেন স্বর্গের কোনো অপ্সরীর মতো ফুটিয়ে তুলেছে। তামিমের সেই লোলুপ ও কামুক চাহনি দেখে শিউলির গা ঘিনঘিন করে উঠল। ইচ্ছে করছিল এখনই নখ দিয়ে ওর চোখ দুটো উপড়ে ফেলতে, কিন্তু নিরুপায় শিউলি কেবল ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিল।
তামিম নির্লজ্জের মতো আয়েশ করে বলে উঠল,
“আহা শিউলি! তোমাকে এভাবে দেখলে তো যেকোনো পুরুষই পাগল হয়ে যাবে। এত রূপ আল্লাহ তোমাকে কেন দিল বলো তো?”
“এই রূপই তো আজ আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে!” শিউলি দাঁত চেপে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে কথাগুলো বলল। “যদি রূপ না থাকতো, তবে তোদের মতো নরপশুরা আমার জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার সাহস পেত না।”
তামিম মোটেও লজ্জিত হলো না, বরং মাথায় হাত বুলিয়ে এক কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,
“ইসস! জানো শিউলি, শখের নারীর তেজি কথাগুলোও শুনতে মধুর মতো লাগে। কিন্তু দেখো, আমি তোমাকে কত সম্মান দিয়ে ‘তুমি’ বলছি, আর তুমি আমাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করছো? এটা কি ঠিক হচ্ছে? আজ বাদে কালই তো তোমার স্বামী হতে যাচ্ছি, একটু ভালোবেসেও তো ডাকতে পারো, নাকি?”
শিউলির রাগে-ঘৃণায় শরীর কাঁপছে। তামিম কিছুক্ষণ নীরব থেকে তার অস্থিরতা উপভোগ করল, তারপর আরও একধাপ এগিয়ে বলল,
“সুইটহার্ট, এক কাজ করলে কেমন হয়? চলো এখনই বিয়েটা সেরে ফেলি! তারপর আজ রাতেই না হয় বাসরটা জাঁকিয়ে করা যাবে।”
কথাটা শুনে শিউলি আক্ষরিক অর্থেই আঁতকে উঠল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল এখনই বিয়ে মানে তো সব শেষ! শিমুলের সাথে পালানোর সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। শিউলি ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। কাঁপাকাঁপা গলায় তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“মানে? এখন… এখন বিয়ে মানে কী?”
শিউলির চোখেমুখে ফুটে ওঠা সেই চরম আতঙ্ক দেখে তামিম পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠল। সে অট্টহাসি দিয়ে ঘর কাঁপিয়ে বলল,
“আরে এত ভয় পেও না! এখনই বিয়ে করা সম্ভব না, জাস্ট মজা করলাম। তবে চাইলে কিন্তু এখনই কাজী ডাকা যায়। তুমি যদি রাজি থাকো, তবে আমার কোনোই আপত্তি নেই!”
তামিমের কথা শুনে শিউলি যেন এক পশলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। খাঁচায় বন্দি পাখির মতো তার ছটফটে প্রাণটা যেন কোনোমতে প্রাণে বাঁচল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“দয়া করে এখন এখান থেকে যান। অন্তত আজকের দিনটা আমাকে একটু একা থাকতে দিন, অনুরোধ করছি।”
তামিম বাঁকা হেসে উত্তর দিল, “ঠিক আছে, যাচ্ছি।”
সে দরজার দিকে পা বাড়িয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তারপর আবার শিউলির দিকে ফিরে, অনেকটা ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“তবে একটা কথা সত্যি বলছি শিউলি তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আমার এই নিজের জীবনের চেয়েও বেশি! এখন তুমি হয়তো বলবে, তবে কেন তোমার ওপর এত বড় কলঙ্ক লেপে দিলাম? আসলে শোনো, তোমাকে পাওয়ার আর কোনো উপায় আমার হাতে ছিল না। যেকোনো মূল্যে তোমাকে আমার চাই-ই ছিল। আর তার জন্যই এই পথ বেছে নেওয়া। এসবের জন্য আমি সত্যিই তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।”
শিউলি অসীম তিক্ততায় মুখ ফিরিয়ে নিল। এই ভালোবাসার ব্যাখ্যা তার কাছে বিষের মতো মনে হলো। শিউলির নীরবতা দেখে তামিম এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভীষণ কঠিন গলায় বলল,
“আর শোনো, খবরদার! কোনো ধরনের উল্টাপাল্টা করার চেষ্টা করবে না। তার পরিণতি কিন্তু খুব ভয়াবহ হবে। আমার কথা মেনে চললে ভালো, আর অবাধ্য হলে তামিম কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটা ভাবতেও পারবে না!”
বলেই তামিম তার সেই চিরাচরিত কুৎসিত হাসিটি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
★★★
সন্ধ্যা পেরিয়ে অন্ধকার রাত নামতে শুরু করেছে। শিমুল নিঝুম পুকুরঘাটে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ সেখানে নিজের কিছু প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় আর মা আছিয়া বেগমের পরম মমতায় গুছিয়ে দেওয়া কিছু শুকনো খাবার। শিমুল যখন মাকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল, মা তাকে ফিরিয়ে দেননি,বরং অসীম সাহসে উৎসাহ দিয়েছেন শিউলিকে নিয়ে এই গ্রাম ছেড়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার জন্য। অন্য কোনো মা এমন পরিস্থিতিতে কী করতেন জানা নেই, কিন্তু আছিয়া বেগম সন্তানের ভালোবাসার মূল্য বুঝেছিলেন।
শিমুল অনেকক্ষণ ধরে নির্জন এই ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। ঝোপঝাড়ের মশাগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে এসে তার হাতে-পায়ে কামড়াচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। আধঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ শিউলির আসার কোনো নামগন্ধ নেই। শিমুলের বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল “যদি শিউলি শেষ মুহূর্তে আসতে না পারে? যদি ধরা পড়ে যায়?”
এই ভয়টা তিমির অন্ধকারের মতো তাকে ক্রমেই গ্রাস করতে লাগল। অপেক্ষার প্রহর যত দীর্ঘ হচ্ছে, দুশ্চিন্তার পাহাড় ততটাই ভারি হচ্ছে। শিমুলের দুচোখ ছাপিয়ে জল আসতে চাইল। এত বড় ছেলের কান্না পায় শুনলে হয়তো যে কেউ হাসবে, কিন্তু মানুষ যখন চরম অসহায়ত্বের শেষ প্রান্তে পৌঁছায়, তখন কান্না ছাড়া আর কোনো ভাষা থাকে না। সেখানে বয়সের কোনো বাছবিচার চলে না।
শিমুল আজ বড় একা, বড় নিরুপায়। এই পালিয়ে যাওয়া ছাড়া তো তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
হঠাৎ আবছা অন্ধকারে দূরে কার যেন অবয়ব চোখে পড়ল। শিউলি! মেয়েটা প্রায় দৌড়ে এই দিকেই আসছে। মুহূর্তেই শিমুলের বিষণ্ণ ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। তবে দুশ্চিন্তার ভারে সেই হাসি মুখে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। শিউলি শিমুলের কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে কেবল দুটি শব্দ বলল,
“চলো শিমুল ভাই, এখনই চলো।”
শিমুল কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“এত দেরি হলো যে বড়?”
শিউলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাড়িতে আজ মানুষের মেলা, সেটা তো জানোই। সবার ঘুমাতে যেতে বড্ড দেরি হচ্ছিল, তাই আমারও বেরোতে সময় লাগল।”
শিমুল অন্ধকারেও শিউলির মুখটার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। শিউলি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাইল না। সে শক্ত করে শিমুলের হাতটা আঁকড়ে ধরে হাঁটা শুরু করল। চলতে চলতেই দৃঢ় গলায় বলল,
“শোনো, আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হলো বিয়ে করা। তারপর অন্য সব কিছু ভাবা যাবে।”
শিউলির কথা শুনে শিমুলের ঠোঁটে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি দেখে শিউলি মৃদু ধমক দিয়ে বলল,
“এখন অত হেসো না তো! এমনিতে তোমার হাসিতে আমি পাগল হয়ে যাই। এখন এই গভীর রাতে যদি ওভাবে হাসো, তবে দেখা যাবে আমি হাঁটা ভুলে তোমার হাসির দিকেই তাকিয়ে বসে আছি।”
শিমুল সহজভাবে স্বীকারোক্তি দিল,
“আমি তাকাইয়া থাকি, এটা কি আমার দোষ? আমার চোখগুলো আজ বড় বেশরম হইয়া গেছে রে শিউলি। আমি না চাইতেই সেগুলো বারবার তোর দিকেই চইলা যায়।”
শিমুল ভাইয়ের এমন সহজ স্বীকারোক্তি শুনে শিউলি খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে আবেগমাখা কণ্ঠে বলল,
“জানো শিমুল ভাই, কত দিনের ইচ্ছা আমার পরম ভালোবাসায় তোমার বুকের ঠিক মাঝখানে মাথা রেখে একটু জিরিয়ে নেব। এতদিন পর আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। তোমাকে স্বামী রূপে বরণ করে নিয়ে তোমার বুকে মাথা রাখব, আর ভীষণ আয়েশে চোখ বন্ধ করে সেই সুখটুকু অনুভব করব।”
শিমুল কোনো উত্তর দিতে পারল না।শিউলির প্রতি তার ভালোবাসা আজ মৌনতায় রূপ নিয়েছে। তারা আবার দ্রুতপায়ে হাঁটা শুরু করল। সামনেই একটা ঘন জঙ্গল, যার বুক চিরে চলে গেছে সরু এক মেঠোপথ। এই জঙ্গলটা পার হতে পারলেই পাকা রাস্তা। কিন্তু এই শেষ রাতে সেখানে কোনো যানবাহন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শিমুলের মনে সংশয় দানা বাঁধছে।
চারদিক নিঝুম, নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ সেই নির্জনতা চিরে এক কর্কশ কণ্ঠের ডাক ভেসে এল,
“কী! পালিয়ে যাচ্ছো নাকি?”
সেই কণ্ঠস্বর শুনে শিমুল আর শিউলি দুজনেরই পায়ের তলার পৃথিবী যেন কেঁপে উঠল। শিউলি আতঙ্কে শিমুলের হাতটা পাথরের মতো শক্ত করে চেপে ধরল, আর শিমুলও নিঃশব্দে বুঝিয়ে দিল, সে পাশে আছে। কিন্তু দুজনে যখন ধীরপায়ে পেছনে ফিরে তাকাল, তখন তাদের সমস্ত চেতনা যেন অসাড় হয়ে গেল। শিমুলের হাত থেকে ব্যাগটা ধপাস করে ধুলোয় পড়ে গেল, আর শিউলির আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে গেল তার আগামীর সম্বলটুকু। এই গভীর রাতে কোনো অশরীরী ছায়া দেখলেও হয়তো তারা এতটা কুঁকড়ে যেত না, কিন্তু তাদের সামনে স্বয়ং যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছেন ইদ্রিস খন্দকার আর পৈশাচিক হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তামিম।
ভয়ে শিউলির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। চোখের সামনে পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে আসছে, পা দুটো যেন মাটির গভীর তলদেশে হারিয়ে যাচ্ছে। এতটা অসহায় বোধ সে তার পুরো জীবনেও কখনো করেনি। ঝাপসা চোখে সে একবার শিমুলের দিকে তাকাল। দেখল, সেই শান্ত ছেলেটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও তার চোখেমুখে এক ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। সে শিউলির হাতটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরল, যেন মৃত্যু না আসা পর্যন্ত এই বাঁধন আলগা হবে না।
তামিম ঠোঁটের কোণে সিগারেট চেপে আয়েশ করে এগিয়ে এল। তার চোখে এক পৈশাচিক তৃপ্তি। সে উপহাসের সুরে বলল,
“তোকে বারণ করেছিলাম না শিউলি, এমন ভুল করিস না? তোরা এত বড় দুঃসাহস দেখালি কীভাবে? তোরা কী ভেবেছিলি আমি তোর বাড়ির চারদিকে পাহারাদার বসিয়ে রাখব না, আর তোরা হাত ধরাধরি করে পালিয়ে যাবি?”
শিমুল নিজের ভেতরের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে বজ্রকণ্ঠে বলল, “তামিম, আমাদের পথ ছাড়। আমাদের যাইতে দে!”
শিমুলের কথা শুনে তামিম এক বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সাথে সাথে ইদ্রিস খন্দকার আর তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের পৈশাচিক হাসি বনের স্তব্ধতা ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলল। ইদ্রিস খন্দকার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শিউলির একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার চোখের চাউনি যেন বিষ ঢালছে। তিনি গর্জে উঠে বললেন,
“কত্ত বড় সাহস তোর! আমাদের মুখে চুনকালি দিয়ে তুই পলাইয়া যাচ্ছিস? এই স্পর্ধা তোদের কে দিল? এই বংশের মান-সম্মান এভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার ফল কী হতে পারে, তা কি তোরা জানিস না?”
শিমুল এবার সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিয়ে দুই হাত জোড় করে ইদ্রিস খন্দকারের সামনে দাঁড়াল। ভাঙা গলায় সে আকুতি জানাল,
“চাচা, আমাদের একটু দয়া করেন। আমাদের যেতে দিন। আমরা এই গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব, কেউ কোনোদিন আমাদের ছায়াও দেখবে না।”
শিউলি কোনো কথা বলল না। সে জানে, এই পাথরহৃদয় নরপিশাচদের কাছে মিনতি করা মানে অরণ্যে রোদন। শিউলি শিমুলের হাতটা শক্ত করে ধরে অন্ধকারের বুক চিরে উল্টো দিকে দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু দেখল চারপাশটা বিষধর সাপের মতো তামিম আর তার বাবার লোকেরা ঘিরে রেখেছে। মুক্তির সব কটা দরজা এক নিমেষে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। তাদের এক হওয়ার যে রঙিন স্বপ্নটুকু তারা এতক্ষণ বুকে লালন করছিল, তা বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল।
তামিমের ইশারায় কয়েকজন লোক বুনো পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে শিমুলকে শিউলির কাছ থেকে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিল। শিমুল রাগে-যন্ত্রণায় হুংকার ছেড়ে উঠল, “ছাড় আমাকে! হাত ছাড় তোরা!”
কিন্তু পাষাণদের কানে সেই চিৎকার পৌঁছাল না। ইদ্রিস খন্দকার নির্দয়ভাবে আদেশ দিলেন শিমুলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। মুহূর্তের মধ্যে শিউলির চোখের সামনে কতগুলো ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো মানুষ শিমুলকে ঘিরে ধরে নির্বিচারে মারতে শুরু করল। শিউলি পাগলের মতো সেদিকে ছুটে যেতে চাইল, কিন্তু ইদ্রিস খন্দকার নিজের মেয়ের হাত লোহার মতো শক্ত করে চেপে ধরলেন।
অন্ধকার জঙ্গলের নিস্তব্ধতা চিরে শিমুলের গগনবিদারী আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সেই চিৎকারে আকাশ-বাতাস যেন কেঁপে উঠছে। শিউলি ডুকরে কেঁদে উঠল, “আমার শিমুল ভাইরে মেরো না তোমরা! দোহাই লাগে তোমাদের, ওরে ছেড়ে দাও! ও আল্লাহ, তুমি আমার শিমুল ভাইরে বাঁচাও!”
শিউলির সেই আকাশ ফাটানো আর্তনাদ বোরো ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে বজ্রপাতের মতো বয়ে গেল। গাছের ডালে ডাকতে থাকা প্যাঁচাগুলোও সেই বীভৎস দৃশ্য সইতে না পেরে স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রকৃতির বুক হয়তো এই হাহাকারে কেঁপে উঠছে, কিন্তু পরম মায়ায় শিউলিকে যে বাবা বড় করেছিলেন, সেই বাবার মনে আজ লেশমাত্র মায়া নেই।
শিউলি এবার মরিয়া হয়ে তার বাবার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে শিমুলের রক্তাক্ত দেহের ওপর গিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পিশাচদের লাঠির আঘাত আর কিলঘুষি থামল না। ইদ্রিস খন্দকার মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সেই নারকীয় ধ্বংসলীলা দেখছেন, আর তামিম এক কোণে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির অট্টহাসি হাসছে। শিউলি যখন দেখল কোনো আকুতিতেই কাজ হচ্ছে না, তখন সে দেখল তার ভালোবাসার মানুষটার নাক-মুখ ফেটে তাজা র’ক্তে মাটি ভিজে যাচ্ছে। শিমুলের প্রাণভোমরা যেন ধীরে ধীরে নিভে আসছে।
শিউলি এবার দিকভ্রান্ত হয়ে দৌড়ে গিয়ে তার বাবার পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল। তার মাথার ওড়নাটা ধস্তাধস্তিতে কোথায় যে খসে পড়েছে, সেই খেয়ালটুকুও তার নেই। দুহাতে বাবার পা দুটো জাপ্টে ধরে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে, তবুও সে অনুনয় করে বলছে,
“ও আব্বা, ওরা আমার শিমুল ভাইরে মেরে ফেলবে গো আব্বা! তুমি ওদের বারণ করো। আব্বা, শিমুল ভাইয়ের খুব কষ্ট হচ্ছে, ওই দেখো ও কেমনে ছটফট করছে! ও মরে গেলে আমি বাঁচব না আব্বা, আমি নিশ্চিত মরে যাব। একবার একটু মায়া করো আব্বা, আমি তোমার পায়ে ধরি!”
শিউলির এই বুক ফাটানো বিলাপে বনের বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও ইদ্রিস খন্দকারের পাষাণ হৃদয় একটুও টলল না। তিনি অবিকল এক কাঠের পুতুলের মতো নিস্পৃহ চোখে দূরে তাকিয়ে রইলেন। বাবার কাছে কোনো দয়া না পেয়ে শিউলি এবার ধুলোয় গড়াগড়ি খেয়ে তামিমের পায়ে গিয়ে পড়ল। আর্তনাদ করে বলল,
“তামিম, তুই ওদের থামতে বল! আমার শিমুল ভাই মরে যাবে রে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তামিম, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমায় একটু বাঁচতে দে! আমি তোকেই বিয়ে করব, কথা দিচ্ছি তুই যা বলবি আমি তা-ই শুনব, শুধু শিমুলকে ছেড়ে দিতে বল!”
তামিমের পৈশাচিক আকাঙ্ক্ষা যেন এতক্ষণে তৃপ্ত হলো। সে এক দম্ভভরা চিৎকারে লোকগুলোকে থামতে বলল। লোকগুলো সরে দাঁড়াতেই শিউলি দেখল, শিমুল নিথর হয়ে মাটির সাথে মিশে আছে। তার শুভ্র শরীরটা এখন মাটি আর কালচে রক্তের এক বীভৎস সংমিশ্রণ। শিউলি পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে শিমুলের রক্তাক্ত মাথাটা নিজের উরুর ওপর তুলে নিল। কাঁপাকাঁপা হাতে তার মুখটা আগলে ধরে গুমরে গুমরে কেঁদে বলল,
“ও শিমুল ভাই… ও শিমুল ভাই! তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা? একবার তাকাও!”
শিমুলের চোখের পাতা নড়ছে না। শিউলি এবার আকাশের দিকে মুখ তুলে এক আকাশ সমান হাহাকার নিয়ে চিৎকার করল,
“ও আল্লাহ! তুমি আমার শিমুল ভাইকে ফিরিয়ে দাও! ওরে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না আল্লাহ!”
শিউলির সেই আর্তনাদ যখন বনের নীরবতায় মিলিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই শিমুল অনেক কষ্টে তার কাঁপাকাঁপা ঠোঁট দুটো একটু নাড়াল। অতি মৃদু, প্রায় অস্ফুট স্বরে সে ডাকল “ফুল…”
শিউলি অস্ফুট স্বরে শিমুলকে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই তামিম হিংস্র হায়েনার মতো এসে শিউলির হাতটা হ্যাঁচকা টানে ধরে ফেলল। শিউলিকে দাঁড় করিয়ে সে কর্কশ গলায় গর্জে উঠল,
“অনেক হয়েছে এসব ন্যাকামি! এবার বাড়ি চল। তোর এই প্রেমের নাটক আর সহ্য হচ্ছে না। মনটা চাইছে এই বলদের বাচ্চাকে এখনই জ্যান্ত কবর দিয়ে দিতে!”
কথাটা শেষ করেই তামিম তার সবটুকু শক্তি দিয়ে শিমুলের পেটে এক প্রচণ্ড লাথি মারল। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে শিমুলের নিথর শরীরটা ধুলোমাখা মাটিতে ছিটকে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল। শিউলি এবার ডুকরে কেঁদে উঠে অনুনয় করল, “দোহাই লাগে তোর, ওরে আর মারিস না তামিম! ওর অবস্থা দেখ, ও তো এমনিতেই শেষ হয়ে গেছে!”
তামিম এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল,
“আরে এত দুশ্চিন্তা করিস না! আমি ওর কিছু করব না। আমার লোকেরাই পরম যত্নে এই বলদটাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে।”
বলেই তামিম শিউলির কোনো আপত্তি না শুনে তাকে পশুর মতো টেনে-হিঁচড়ে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে থাকল। পেছনে পড়ে রইল রক্তাক্ত শিমুল। সে মাটির সাথে মিশে থেকেও তার অবশ হয়ে আসা হাতটা শিউলির দিকে বাড়িয়ে দিল। অসীম যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে শেষবারের মতো করুণ স্বরে ডাকল,
“ফুল… শিউলি, যাস না তুই… যাস না!”
শিমুলের সেই শেষ আকুতি অন্ধকারের নির্জনতায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, কিন্তু শিউলি তখন তামিমের কবলে পড়ে ক্রমশ তার স্বপ্নের কাছ থেকে অনেক দূরে হারিয়ে যাচ্ছে।
#চলবে…
( 3000+ Words)

